কলমে: আহমেদ বাঁধন
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)
[৪৯তম খণ্ড —
হাসপাতালে তখন যেন এক মহাপ্রলয় বা প্রকাণ্ড ভূমিকম্পের পূর্বাভাস শুরু হয়ে গিয়েছে! হাসপাতালের প্রতিটি করিডোর, ডাক্তারদের রুম আর নার্সিং স্টেশনে চরম হুড়োহুড়ি ও আতঙ্ক। কারণ, স্বয়ং মাফিয়া সম্রাট বাঁধন মির্জা এক ভয়ংকর গর্জন করে সমস্ত স্পেশালিস্ট ডাক্তারদের তলব করেছে!
হাসপাতালের গেটের বাইরে প্রকাণ্ড কাঠের মতো হাত ভাজ করে সতর্ক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে অ্যালবার্ট ও জোসেফ। বাঁধনের রাগের পারদ যে আজ পুরো আকাশ স্পর্শ করেছে, তা তাদের অভিজ্ঞ চোখ মুহূর্তেই বুঝে ফেলেছে। নূরের কেবিনের পাশে বেডে শুয়ে থাকা দুর্বল নূর কিছুই বুঝতে পারছে না—
চারপাশে কীসের এত হইচই, আর কেনই বা লোকটা এভাবে উন্মাদের মতো গর্জন করছে! কারণ, তার স্মৃতি থেকে এই লোকটার নাম-পরিচয় যে সম্পূর্ণ মুছে গেছে!
প্রধান ডাক্তার ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাাঁপতে, কপালে জমে থাকা ঘাম মুছতে মুছতে একপ্রকার দৌড়ে কেবিনে প্রবেশ করল। বাঁধনের রক্তচক্ষুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল—
"জি... জি স্যার! আমাকে ডেকেছিলেন?!"
বাঁধনের চোখ দুটো পৈশাচিক রাগে লাল টকটকে হয়ে আছে। ভেতরের ভয়ংকর আগ্নেয়গিরিটা ফেটে পড়ার অপেক্ষায়। সে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর ও থমথমে গলায় হুকুম দিল—
"অ্যালবার্ট! কাম ইনসাইড নাও!"
বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা অ্যালবার্ট এক মুহূর্ত দেরি না করে সোজা ভেতরে এসে সোজা হয়ে দাঁড়াল—
"জি, ভাই!"
বাঁধনের মুখ দিয়ে বরফের মতো শীতল ও মারাত্মক এক হুংকার বের হলো—
"টেক মাই গান! আমার বন্দুকটা বের করে দে!"
‘বন্দুক’ শব্দটা শোনামাত্রই প্রধান ডাক্তারের শরীরের সমস্ত রক্ত যেন নিমেষে হিম হয়ে গেল! বাঁচবার শেষ তাগিদে সে কোনো কিছু না ভেবেই আচমকা এসে বাঁধনের বুট পরা পা দুটো ধরে কেঁদে ফেলল!
"প্লিজ স্যার! দয়া করে আমাকে মারবেন না! আমার যদি কোনো ভুল হয়ে থাকে, আমাকে বলুন... স্যার প্লিজ!"
ডাক্তারের এই কান্না বা আকুতি বাঁধন মির্জার পাষাণের মতো কঠিন বুকে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলতে পারল না। বাঁধনের চোখ দিয়ে যেন আগুনের স্ফুলিঙ্গ ঠিকরে বের হচ্ছে! সে গর্জে উঠে বলল—
"মিষ্টেক?! হোয়াট দ্য হেল ভুল?! এই বাঁধন মির্জার কাছে মিস্টেক করার সুযোগ লাইফে একবারই পাওয়া যায়! সেকেন্ড টাইম মিস্টেক করার মানে সোজা ওপরে চালান হয়ে যাওয়া!"
অ্যালবার্ট ততক্ষণে বাঁধনের নির্দেশে নিজের পকেট থেকে বাঁধনের প্রিয় কাস্টমাইজড ব্ল্যাক পিস্তলটি বের করে তার হাতে তুলে দিল।
ডাক্তার ডুকরে কেঁদে উঠে বলল—
"স্যার, বিশ্বাস করুন! আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে ম্যাডামকে সুস্থ করেছি! ওনার শরীর এখন পুরোপুরি বিপদ মুক্ত! কিন্তু স্মৃতি হারিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আমার বা কোনো
'' চিকিৎসকের তো কিছু করার নেই স্যার! ম্যাডামের কি আগে অতীতে কোনোদিন মেমোরি লস হয়েছিল?!"
ডাক্তারের এই প্রশ্নে বাঁধন মির্জার রাগে ফুটতে থাকা মুখটা হঠাৎ কিছুটা থমকে গেল। সে চিন্তিত ও কড়া গলায় বলল—
"হ্যাঁ... একবার হয়েছিল! ছোট থাকতে মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে স্মৃতি হারিয়েছিল!"
ডাক্তার এবার কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে মাথা নিচু করে বলল—
"স্যার! ঠিক এই কারণেই এমনটা হয়েছে! ম্যাডাম সাভারে কিডন্যাপ থাকা অবস্থায় মাথায় তীব্র আঘাত আর মারাত্মক ট্রমার শিকার হয়েছেন। সেই ধাক্কায় ওনার বর্তমান স্মৃতিগুলো সাময়িকভাবে মুছে গিয়ে পুরোনো সেই স্মৃতির ব্ল্যাঙ্ক জায়গায় ফিরে গেছে! তাই উনি আপনাকে চিনতে পারছেন না। আর এই রোগের কারণে ওনার মানসিক অবস্থা এখন ভীষণ এগ্রেসিভ... উনি খুব দ্রুত রেগে যাবেন, তাই ওনাকে এখন কোনো চাপ দেওয়া যাবে না!"
"কী বললি তুই?! এগ্রেসিভ?!"
—বাঁধনের চোখ দুটো বিস্ময়ে ও তীব্র ক্ষোভে বড় বড় হয়ে গেল।
ডাক্তার ভয়ে ঢোক গিলে বলল—
"জি ভাই! আর কিডন্যাপিংয়ের সময় ওনাকে যা শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার করা হয়েছে, তার ট্রমাতেই এমনটা ঘটেছে..."
ডাক্তারের মুখে 'অত্যাচার' শব্দটা শোনা মাত্রই মাফিয়া বাঁধন মির্জার রাগ এবার সপ্তম আসমান ছাড়িয়ে মহাবিশ্বে পৌঁছে গেল! তার কপালের আর হাতের রগগুলো নীল হয়ে ফুলে উঠল। নূরের মতো একটা নিষ্পাপ মেয়েকে সেই শয়তানরা কতটা কষ্ট দিলে তার মেমোরি লস হয়ে যায়?! রাগে বাঁধনের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো।
সে এক ঝটকায় তার পা ধরে থাকা ডাক্তারকে পা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে সিংহমতো গর্জন দিল—
"ইডিয়েট ফাকিং ডক্টর! গেট দ্য ফাক আউট অফ মাই সাইট! এখনই আমার চোখের সামনে থেকে দূর হ!"
ডাক্তার আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়ানোর দুঃসাহস করল না। যেন নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে ফিরে এক দৌড়ে কেবিন ছেড়ে পালিয়ে গেল!
অ্যালবার্ট আর জোসেফ দরজার ফাঁক দিয়ে দেখে বুঝল—
তাদের ভাইয়ের মেজাজ এখন যে চরম বিপজ্জনক মোডে আছে, তাকে আটকানোর ক্ষমতা স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা ছাড়া এই দুনিয়ায় কারও নেই!
বেডে শুয়ে থাকা নূর দুর্বল ও নরম কচি গলায় কপালে ভাজ ফেলে বলল—
"কী হয়েছে আপনার?! এত চিল্লাচ্ছেন কেন?!"
বাঁধন নিজেকে প্রচণ্ড কষ্টে শান্ত রাখার চেষ্টা করল। কিন্তু তার ভেতরের প্রতি হিংসার আগুন তো নেভার নয়! যে জিনিস তার নিজের, সেই নূরের এই অবস্থার জন্য যে দায়ী, তাকে তো সে জীবিত রাখবে না! বাঁধন নূরের দিকে মায়াবী কিন্তু কড়া চোখে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল—
"তুই চুপচাপ ঘুমা!"
এই বলে বাঁধন বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা জোসেফকে ইশারা করল। জোসেফ দ্রুত এক নার্সকে ডেকে আনল। নার্স ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে এসে নূরের স্যালাইনে একটি ঘুমের ইনজেকশন পুশ করে দিয়েই এক দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। নার্সের ইনজেকশনের প্রভাবে ধীরে ধীরে নূরের চোখের পাতা ভারী হয়ে এলো এবং সে গভীর ঘুমে ঢলে পড়ল।
নূর ঘুমিয়ে পড়তেই বাঁধন কেবিন থেকে বের হয়ে সোজা হাসপাতালের পার্কিংয়ের দিকে হাঁটতে লাগল।
সেখানে দাঁড়িয়ে আছে বাঁধন মির্জার ব্যক্তিগত স্বপ্নের যানবাহন—৮০ কোটি টাকা মূল্যের কাস্টমাইজড লিমিটেড এডিটর 'সুপারবাইক'! যার টপ স্পিড ঘণ্টায় ৮০০ কিলোমিটার! পুরো বিশ্বে এমন বাইক কেবল একটিই তৈরি করা হয়েছে, আর সেটি স্বয়ং গ্যাংস্টার মাফিয়া বস বাঁধন মির্জার জন্য কাস্টমাইজ করা!
বাঁধন কোনো কথা না বলে নিজের অল-ব্ল্যাক হেলমেটটা মাথায় পরে সোজা বাইকে উঠে বসল। বাইকের স্টার্ট বাটনে চাপ দিতেই ৮০০ সিসির মনস্টার ইঞ্জিনের ভয়াল গর্জনে পুরো হাসপাতালের পার্কিং লট কেঁপে উঠল!
"গ্রুউউউউম-গ্রুউউউউম!"
অ্যালবার্ট ও জোসেফ বুঝতে পারল ভাই এখন কোনো চরম রক্তক্ষয়ী ধ্বংসলীলা চালাতে যাচ্ছে! তারা দ্রুত নিজেদের বুলেটপ্রুফ সুভ (SUV) গাড়িতে উঠে বাঁধনের বাইকের পিছু নিল।
বাংলাদেশের রাজপথে বাইকের ফুল স্পিড দিলে রাস্তার পিচ গলে আগুন ধরে যাবে! তাই বাঁধন বাইকের স্পিড ৪০০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায় লক করে দিয়ে ঝড়ের গতিতে রাজপথ চিরে ছুটতে লাগল! বাঁধন মির্জা কেবল আন্তর্জাতিক মাফিয়া ডনই নয়, সে পৃথিবীর অন্যতম এক্সপার্ট ও ডেনজারাস বাইক রাইডার! প্রফেশনাল রেসাররাও তার রাইডিং স্কিলের সামনে বাচ্চা শিশু!
আকাশ পাতাল কাঁপিয়ে, সমস্ত ট্রাফিক সিগন্যাল দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে বাঁধনের সেই ভয়াল কাস্টমাইজড সুপারবাইক গিয়ে থামল সোজা শহরের সেন্ট্রাল পুলিশ স্টেশনের গেটের সামনে!
বাইকের ব্রেক কষার বিকট শব্দে পুরো থানা এলাকা থমকে গেল! থানার গেটে থাকা সশস্ত্র পাহারাদাররা বাঁধন মির্জাকে বাইক থেকে নামতে দেখেই আতঙ্কে শক্ত হয়ে সোজা স্যালুট ঠুকে দাঁড়াল। বাঁধনের পিছু পিছু অ্যালবার্ট আর জোসেফও গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়ল।
বাঁধন ধীর,ও থমথমে পায়ে থানার ভেতরে প্রবেশ করল। থানার ভেতরে থাকা সমস্ত সাব-ইনস্পেক্টর, কনস্টেবল ও সিআইডি অফিসাররা বাঁধনকে দেখা মাত্রই ভয়ে মাথা নিচু করে টেবিল ছেড়ে দাঁড়িয়ে স্যালুট দিল!
সোজা ওবায়দুল নামের প্রধান পুলিশ কমান্ডারের এসি রুমে গিয়ে ঢুকল বাঁধন। পুলিশ অফিসার ওবায়দুল চেয়ারে বসে ছিলেন। বাঁধন ভেতরে ঢুকেই কোনো তোয়াক্কা না করে সোজা কমান্ডারের কাঠের বিশাল এক্সিকিউটিভ টেবিলের ওপর নিজের বুট পরা দুটো পা উঠিয়ে দিয়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে হেলান দিয়ে বসল!
প্রধান পুলিশ অফিসার ওবায়দুলের বুক তখন ভয়ে দুরুদুরু করে কাঁপছে! কারণ তার সামনে যে বসে আছে, সে কোনো সাধারণ অপরাধী নয়
—সে স্বয়ং মাফিয়া সম্রাট বাঁধন মির্জা! তাকে কিছু বলার দুঃসাহস এই দেশের কোনো আইনি কর্মকর্তার নেই!
বাঁধন তার ব্ল্যাক লেদার জ্যাকেটের পকেট থেকে দামী চুরুট বের করে মুখে দিল। তারপর শান্ত কিন্তু পৈশাচিক চোখে প্রধান পুলিশের দিকে তাকাল।
প্রধান পুলিশ অফিসারটি নিজের মান-সম্মান বা লজ্জার কথা চিন্তা না করে, নিজের প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে দ্রুত নিজের টেবিল থেকে গোল্ডেন লাইটারটা তুলে নিল। এগিয়ে গিয়ে অত্যন্ত বিনীতভাবে বাঁধনের ঠোঁটের কোণে থাকা চুরুটে আগুন জ্বালিয়ে দিল! কারণ সে ভালো করেই জানে—
বাঁধন মির্জার সামনে নিজের ইগো দেখানো মানে সোজা নিজের বুকে গুলি খাওয়া!
বাঁধন চুরুটের এক দীর্ঘ ও গাঢ় টান মেরে ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছাড়ল। তার লাল টকটকে চোখ দুটো ধোঁয়ার আড়ালে জ্বলতে লাগল। বাঁধনের জীবনে মাত্র তিনটি জিনিস সবচেয়ে প্রিয়—
পুলিশ অফিসার ওবায়দুল বলে উঠলো ভয় ভরা দৃষ্টিতে বাধনের উদ্দেশ্যে,,,
,,,জি স্যার আপনি এখানে কেন এসেছেন জানতে পারি কি,,, না কিছু হয়েছে,,,
প্রথমত তার জান 'নূর', দ্বিতীয়ত তার চুরুটের ধোঁয়া, আর তৃতীয়ত তার সুপারবাইকের গতি!
বাঁধন চুরুট টানতে টানতে থমথমে কিন্তু বরফশীতল গলায় বলল—
"কী মনে হয় তোর অফিসার?! এই বাঁধন মির্জা কি এমনি এমনি তোর এই নোংরা থানায় পায়ের ওপর পা তুলে চুরুট ফুঁকতে এসেছে?!"
পুলিশ অফিসার ওবায়দুল কপালে জমে থাকা ঘাম মুছে তোতলাতে তোতলাতে বলল—
"জি... জি না স্যার! নিশ্চয়ই বিশেষ কোনো প্রয়োজন আছে... বলুন স্যার, আমি কীভাবে সাহায্য করতে পারি?!"
বাঁধনের মুখের অভিব্যক্তি আরও কঠোর হয়ে উঠল। সে বরফশীতল গলায় জিজ্ঞেস করল—
"নীলিমা কোথায়?!"
নামটা শুনে পুলিশ কমান্ডার কিছুটা চমকে উঠল। সিআইডি অফিসার সাদিক আইল্যান্ড থেকে অর্ধমৃত নীলিমাকে উদ্ধার করে গ্রেপ্তার দেখিয়ে এই থানায় হাই-সিকিউরিটি কাস্টডিতে পাঠিয়েছে।
পুলিশ কমান্ডার দ্রুত মাথা নিচু করে বলল—
"জি স্যার! নীলিমা আমাদের হাই-সিকিউরিটি জেলে বন্দি আছে... তার চিকিৎসা চলছে!"
বাঁধনের ঠোঁটের কোণে ভেসে উঠল এক ভয়ংকর, পৈশাচিক ও রহস্যময় বাঁকা হাসি! যে হাসির অর্থ মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ!
বাঁধন চুরুটের শেষ ছাইটুকু কমান্ডারের দামী টেবিলে পিষে ফেলে ধীর গলায় আদেশ দিল—
"ব্রিং হার হিয়ার! দিস ইজ মাই অর্ডার!"
কমান্ডার আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করল না। বাঁধন মির্জার আদেশের অমান্য করা মানে এই থানার সবাইকে লাশ বানিয়ে দেওয়া! সে দ্রুত এক মহিলা কনস্টেবলকে নির্দেশ দিল নীলিমাকে কাস্টডি থেকে নিয়ে আসার জন্য।
কয়েক মিনিটের মধ্যে মহিলা কনস্টেবল হাতকড়া পরিয়ে নীলিমাকে সেই রুমে নিয়ে এলো।
নীলিমার সারা শরীরে সাভারের তাণ্ডবের আঘাতের চিহ্ন। সে রুমে ঢুকে বাঁধন মির্জাকে রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখে ভয়ে প্রথমে কাঁপল, কিন্তু পর মুহূর্তেই তার অন্ধ ভালোবাসার ভূত মাথায় চেপে বসল! নীলিমা ভাবল—বাঁধন হয়তো তার মায়ায় পড়ে তাকে পুলিশ কাস্টডি থেকে ছাড়াতে এসেছে!
নীলিমা এক পা এগিয়ে গিয়ে আবেগপ্লুত গলায় বলে উঠল—
"আই রিয়েলি লাভ ইউ বাঁধন! আমি জানতাম তুই আমাকে এভাবে জেলে পচতে দিবি না! তুই আমাকে এখান থেকে মুক্ত করতে এসেছিস না?! আমি কত খুশি হয়েছি বাঁধন...!"
বাঁধন ধীর পায়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে টেবিল থেকে নামল। তার ঠোঁটে সেই একই মারাত্মক বাঁকা হাসি। সে শান্ত কিন্তু শয়তানের মতো থমথমে গলায় নীলিমার দিকে তাকিয়ে বলল—
"গুডবাই ইডিয়েট ফাকিং উইচ! তুই মৃত্যুর খেলায় বাঁধন মির্জার কাছে হেরে গেলি... আর আজ তোর এই দুনিয়া ছেড়ে চলে যাওয়ার দিন!"
নীলিমা বাঁধনের কথার অর্থ পুরোপুরি বোঝার আগেই—চোখের পলকে বাঁধন নিজের পকেট থেকে সাইলেন্সার লাগানো পিস্তলটি বের করল!
"ফাসসস!"
কোনো কথা বলার বা চিৎকার দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে, সোজা নীলিমার কপালের ঠিক মাঝখান বরাবর এক রাউন্ড বুলেট চালিয়ে দিল বাঁধন মির্জা!
ঝাঁঝরা হয়ে গেল নীলিমার মস্তিষ্ক! তার চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল, এবং রক্তে ভেসে সোজা মেঝতে লুটিয়ে পড়ে সঙ্গে সঙ্গে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল সে!
থানার ভেতরের পরিবেশ সম্পূর্ণ থমকে গেল! থানার সমস্ত পুলিশ অফিসার, কমান্ডার আর কনস্টেবলরা হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে ভয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল! থানার ভেতরে ঢুকে, পুলিশ প্রধানের সামনে দাঁড়িয়ে সোজা কোনো আসামির কপালে গুলি করে লাশ বানিয়ে দেওয়া—
এমন অবিশ্বাস্য ও রাজকীয় পৈশাচিকতা কেবল মাফিয়া বাঁধন মির্জার পক্ষেই সম্ভব!
সাধারণ কোনো মানুষ হলে এতক্ষণে তার ফাঁসির হুকুম হয়ে যেত, কিন্তু বাঁধন মির্জার ক্ষেত্রে যে দেশের সংবিধান আর আইনও হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে থাকে! নূরের ওপর শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার করে তার স্মৃতিশক্তি কেড়ে নেওয়ার চরম মাশুল নীলিমাকে নিজের প্রাণ দিয়ে দিতে হলো! বাঁধন মির্জার নূরের গায়ে হাত দেওয়ার শাস্তি কেবল একটাই—মৃত্যু!
পিস্তলটা পকেটে পুরে বাঁধন রক্তচক্ষু নিয়ে একবার থমকে থাকা পুলিশদের দিকে তাকাল। তারপর এক শব্দও না বলে ধীর পায়ে থানা থেকে বের হয়ে গেল।
প্রধান পুলিশ কমান্ডার ওবায়দুল নীলিমার লাশের দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘ ও করুণ শ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বলল—
"এটাই আসল মৃত্যুর খেলা... আর এই খেলার একমাত্র সম্রাটের নাম—মাফিয়া বাধন মির্জা! যার জীবনটাই রক্ত আর মৃত্যুর খেলা দিয়ে শুরু, আর ওটা দিয়েই শেষ..."
বাহিরে এসে বাঁধন নিজের সুপারবাইকে উঠে বসল। এক টানে ইঞ্জিন গর্জে তুলে ঝড়ের বেগে বাইক চালিয়ে ভিআইপি হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দিল সে। তার পেছনে পেছনে সুভ গাড়ি নিয়ে ছুটল অ্যালবার্ট ও জোসেফ।
প্রতিশোধ নেওয়া শেষ, কিন্তু এখন বাঁধন মির্জার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার জীবনের সবচেয়ে বড় ও কঠিন যুদ্ধ—
নিজের জান 'নূর'-এর স্মৃতিতে নিজের অস্তিত্বকে আবারও ফিরিয়ে আনা!