#আমি_সেই_নীতু
#পর্ব_৪৩
#আনাবিয়া_বৃষ্টি
ফুয়াদ আর মারিয়াম আবার প্রায় হোঁচট খেতে খেতে দরজার সামনে থেকে সরে আসে। তাড়াহুড়োর মধ্যে দু’জনেই জামা-কাপড়ে লেগে থাকা ধুলো ঝাড়তে থাকে। হঠাৎ পেছন থেকে ভারী কণ্ঠে প্রশ্ন ভেসে আসে,
— তোরা দরজার সামনে কী করিস?
শাহমীর ভাইয়ের গম্ভীর কণ্ঠে মুহূর্তেই পরিবেশটা থমকে যায়।
মারিয়াম ভয়ে চোখ বড় বড় করে ফেলে। কথা জড়িয়ে যায় তার গলায়,
— আমরা… আমরা কিছুই দেখিনি!
কথাটা মুখ থেকে বেরোতেই ফুয়াদ দ্রুত মারিয়ামের হাতে আলতো কিন্তু সতর্ক ধাক্কা দেয়, যেন চুপ করতে বলে। তার চোখে আতঙ্ক, ঠোঁটে চাপা টান।
নীতু ভুরু কুঁচকে এক পা এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে,
— কি দেখনি?
ফুয়াদ তৎক্ষণাৎ সামলে নিয়ে নির্লিপ্ত গলায় বলে,
— কিছু না। আসলে আমরা ভাবছিলাম তোমাদের কিছু লাগবে কিনা, তাই জিজ্ঞেস করতে এসেছিলাম।
ঘরে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা নেমে আসে।
নীতু বিরক্তি লুকিয়ে হালকা স্বরে বলে,
— আচ্ছা ছাড়ো। আমাদের এখন বের হতে হবে।
মুহূর্তেই ফুয়াদ ভাই প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়,
— আজ কোথায় যাবে? আজ না তোমাদের.....
কথা শেষ করার সুযোগ না দিয়েই শাহমীর ভাইয়ের কণ্ঠ আরও কঠোর হয়ে ওঠে,
— কথা কম বলে চলে আয়! নীল, চলো।
এই কথা বলেই তিনি সামনে এগিয়ে যান। নীতু তাদের আসতে বলে চুপচাপ সরে পরে।
বারান্দার দিকে যেতে যেতে ফুয়াদ ফিসফিস করে মারিয়ামকে বলে,
— একটু হলেই তো সব ফাঁস করে দিচ্ছিলে!
মারিয়ামের চোখে এবার রাগের ঝিলিক। সে দাঁড়িয়ে পড়ে, চাপা স্বরে কিন্তু তীক্ষ্ণ ভাষায় বলে,
— আমি তোকে আগেই বারণ করেছিলাম! এইভাবে শাহমীর ভাইয়ের ঘরের দরজায় কান পেতে শোনা ঠিক না।
সে এক নিঃশ্বাসে বলে যায়,
— খুব শখ হয়েছিল না ভাই আর আপুর বাসর ঘরের কথা শোনার? এখন ঠিক হয়েছে? দেখলে না ভাইয়ের মুখ কতটা গম্ভীর ছিল! একদিন ঠিক তোমাকে ধরবে।
ফুয়াদ ভয়ে ঢোক গিলে বলে,
— এই না না… ভাইয়ার হাতের মার কিন্তু খুব জোরে লাগে!
মারিয়াম হেসে ফেলে, সেই হাসিতে খোঁচা আর মজা দুটোই..
— এই তোমাকে এত বড় অফিসার কে বানালো বল তো? শুনেছি তুমি নাকি একাই একশো জনকে পেটাতে পারো! তাহলে শাহমীর ভাইকে এত ভয় কেন পাও?
ফুয়াদ বুক ফুলিয়ে বলে,
— কোনো সন্দেহ আছে? আমি নিজের যোগ্যতাতেই অফিসার হয়েছি। শুধু ভাইয়াকে একটু ভয় পাই… এই আর কি!
তারপর গলার স্বর হঠাৎ নরম হয়ে আসে,
— আর শুধু ভাইয়াকেই না… আমি আর একজনকে ভয় পাই।
মারিয়াম কৌতূহলী হয়ে তাকায়,
— কে সে?
ফুয়াদ কিছু বলার আগেই সরে যেতে চায়।
ঠিক তখনই পেছন থেকে শাহমীর ভাইয়ের কণ্ঠ,
— তোদের কি বরণ ডালায় বসিয়ে নিয়ে যেতে হবে?
দু’জনেই চমকে ঘুরে দাঁড়ায়।
শাহমীর ভাই আবার বলেন,
— ওহ হ্যাঁ, মারিয়াম তুমিও আমাদের সাথে চলো। ক্যামেরাটা নিয়ে আসো। আমাদের কাজে লাগবে।
ফুয়াদ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কি হয়েছে ভাই? বললে না তো!
শাহমীর ভাই সিঁড়ির দিকে এগোতে এগোতে সংক্ষেপে বলে,
— গাড়িতে বলছি। তাড়াতাড়ি চলে আয়।
গভীর রাত।
বিয়েবাড়ির আলো-হুল্লোড় থেমে গেছে বহুক্ষণ আগেই। দীর্ঘ এক দিনের ক্লান্তিতে সবাই যে যার মতো ঘুমের অতল গহ্বরে তলিয়ে গেছে। চারপাশে এমন নীরবতা, যেন নিশ্বাসের শব্দও ভেঙে দিতে পারে এই রাতের শান্তি।
তারা ধীরে গাড়ি স্টার্ট দেয়,এতটাই সাবধানে, যেন ইঞ্জিনের শব্দ কারও ঘুমে ব্যাঘাত না ঘটায়। চারজন নিঃশব্দে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। অন্ধকার রাস্তা তাদের সামনে খুলে যায়।
গাড়ির ভেতরে নিস্তব্ধতা ভাঙে শাহমীর ভাইয়ের কণ্ঠে। এতক্ষণ চেপে রাখা সব কথা তিনি একে একে খুলে বলেন। তার কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা, কিন্তু চোখে লুকানো এক অদ্ভুত অস্থিরতা।
কিছু সময় পর তারা পৌঁছে যায় সেই জমিদার বাড়িতে,
যে বাড়ির দেয়ালে আজও লেগে আছে রক্তাক্ত স্মৃতি।
এই বাড়িতেই নীতুর বাবাকে হ*ত্যা করা হয়েছিল।
আর তাকেও মে*রে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল।
বুকের ভেতর চাপা এক অজানা শিহরণ নিয়ে তারা ভিতরে প্রবেশ করে।
সেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল সেই অফিসার।
তিনি তাদের নিচু গলায় বলেন,
—সরি স্যার… সরি ম্যাডাম। আজ আপনাদের বিয়ে হয়েছে, তাও আপনাদের এখানে ডাকতে হলো। কিন্তু আজই আমাদের হাতে একমাত্র সুযোগ ছিল।
তিনি জানালেন,
সন্ধ্যায় নারী পাচারকারীদের একটি বড় দল অনেকগুলো মেয়েকে নিয়ে এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তখনই শাহমীরকে ফোন করা হয়েছিল, কিন্তু যোগাযোগ না হওয়ায় গভীর রাতে ফোন দিতে বাধ্য হন।
এরপর তিনি সবাইকে নিয়ে যান সেই গোপন জায়গাটিতে,
মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা এক ভয়ংকর অন্ধকার জগৎ।
প্রথম দেখায় বোঝার উপায় নেই যে এই পুরনো জমিদার বাড়ির নিচে এত বড় গোপন ঘর থাকতে পারে। নতুন করে সাজানো হয়েছে সবকিছু। একের পর এক ছোট ছোট ঘর,যেগুলো দেখলেই বোঝা যায়, এখানে মানুষ নয়, বন্দি করে রাখা হতো অসহায় মেয়েদের।
হাঁটতে হাঁটতে গা শিউরে উঠছিল।
তারা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
হঠাৎ অফিসার বললেন,
—স্যার, এখানে একটা লকার আছে। মনে হয় ওদের বড় কোনো গোপন তথ্য এখানে রাখা।
ডিজিটাল লকার। পাসওয়ার্ড ছাড়া খোলার উপায় নেই।
একদিকে মারিয়াম আর ফুয়াদ ঘরের প্রতিটি কোণ ভিডিও করছে,কাগজপত্র, ঘর, দরজা...একটাও বাদ যাচ্ছে না।
সবাই যখন ভাবছে কীভাবে লকার খোলা যায়, ঠিক তখনই শাহমীর ভাই এগিয়ে এসে লকারে কিছু একটা টাইপ করেন।
এক মুহূর্তে,
লকার খুলে যায়।
সবাই বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে।
শাহমীর ভাই শান্ত গলায় বলেন,
—এটা ফাইজুলের কাজ। ও ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়েছে। ডিজিটাল সিস্টেম ও ভালো জানে। আর ও যাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে..তার নামটাই দিয়েছে পাসওয়ার্ড।
ধ্বংসবতী।
লকারের ভেতরে অসংখ্য ফাইল, ডকুমেন্ট।
একটা ল্যাপটপও ছিল সেখানে।
নীতু ল্যাপটপটা বের করে। এখানেও পাসওয়ার্ড।
শাহমীর ভাইয়ের মতোই অনুমান করে টাইপ করে...
ধ্বংসবতী।
স্ক্রিন খুলে যায়।
যা দেখে, তাতে শ্বাস আটকে আসে।
এই পাচার চক্রের প্রতিটি সদস্যের নাম।
বিভিন্ন দেশের প্রভাবশালী মন্ত্রী, মিনিস্টার।
নামকরা ব্যবসায়ী।
আন্তর্জাতিক লেনদেনের হিসাব।
সব প্রমাণ এই একটাই কম্পিউটারে।
তারা দ্রুত সব তথ্য একটি পেনড্রাইভে কপি করে।
মারিয়াম পুরো বাড়ির ভিডিও প্রমাণ সংগ্রহ করে নিচ্ছে।
তবু সবাই জানে,
এরা খুব বড় শক্তিশালী চক্র।
এত সহজে সরকারিভাবে সব প্রমাণ করা যাবে না।
তবে একটা জিনিস তাদের হাতে এসেছে,
মাসখানেকের মধ্যে বড় আকারে নারী পাচারের পরিকল্পনা।
তারিখসহ স্পষ্ট লেখা।
এই দিনটাই তাদের সুযোগ।
এই দিনই ওদের হাতেনাতে ধরতে হবে।
ভোরের আলো ফোটার আগেই তারা সবকিছু আগের মতো সাজিয়ে রাখে।
একটাও চিহ্ন রেখে যায় না..
যেন বোঝার উপায় না থাকে এখানে কেউ এসেছিল।
নীরবে জমিদার বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসে।
তারা সবাই ধীরে ধীরে তালুকদার বাড়ির সামনে এসে পৌঁছাল। বিশাল লোহার গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই বাড়ির ভেতরের চাপা নীরবতা যেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।নীতু সবার আগে পা রাখলাম ভেতরে। ঠিক তখনই বসার ঘর থেকে ফুপার কড়া কণ্ঠ ভেসে এলো...
— বাড়ির নতুন বউ এই সকালে এই পোশাকে কোথায় গিয়েছিলে?
তার চোখে ছিল সন্দেহ, কণ্ঠে ছিল রাগ আর সমাজের পুরনো নিয়মের অহংকার। নীতু এক মুহূর্তও দমে যাইনি। সোজা চোখে চোখ রেখে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
— আমি একজন ইনভেস্টিগেশন অফিসার। আমার কাজ অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করা। বউ সেজে ঘরে বসে থাকা আমার দায়িত্ব নয়।
তার কথায় ফুপার মুখ লাল হয়ে উঠল। রাগে গলা কাঁপতে কাঁপতে সে বলল,
— তাহলে বিয়ে কেন করেছিলে?
নীতু কিছু বলতে যাবে..ঠিক তখনই দরজা ঠেলে ঘরে প্রবেশ করল শাহমীর ভাই। তার চোখে ছিল আগুনের মতো দৃঢ়তা, কণ্ঠে ছিল আত্মবিশ্বাস।
— আমি আমার বউকে কোথায় নিয়ে যাবো, না নিয়ে যাবো..সেটা আপনাদের দেখার বিষয় নয়!
বাড়ির বউ বলেই যে সারাক্ষণ ঘরে বসে ঘরকন্না করতে হবে..এর কোনো মানে নেই।
আমাদের কাজ দেশকে রক্ষা করা। আমরা সেটাই করছি।
ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। কেউ আর কিছু বলার সাহস পেল না। কথা শেষ করে তারা যে যার মতো নিজেদের ঘরে চলে গেল।
তাদের কিছুক্ষণ পরই ফুয়াদ ভাই আর মারিয়াম বাড়িতে ঢুকল। ফুপা আবার প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,
— তোমরা কোথায় গিয়েছিলে?
ফুয়াদ ভাই শান্ত কিন্তু শক্ত কণ্ঠে উত্তর দিল,
— আমরা আমাদের কাজের সব তথ্য কাউকে জানাতে বাধ্য নই।
ফুপা আবার তীক্ষ্ণ প্রশ্ন করল,
— তাহলে মারিয়াম কোথায় গিয়েছিল?
ফুয়াদ ভাই এক মুহূর্ত দেরি না করে বলল,
— মারিয়াম একজন সিনিয়র জার্নালিস্ট। তার নিজের একটা জীবন আছে। সে ছবি তুলতে খুব পছন্দ করে..হয়তো কোথাও গিয়েছিল।
রাস্তায় আমাদের দেখা হয়ে যায়, তাই একসাথে চলে আসি। আর কিছু জানতে চান?
এই সময় বড় আব্বু সামনে এগিয়ে এসে ফুয়াদ আর মারিয়ামকে ভেতরে যেতে বললেন। তারা নিঃশব্দে ঘরে চলে গেল।
নীতু আর শাহমীর তাদের ঘরে ঢুকতেই কিছুক্ষণ পর দরজায় টোকা পড়ল। দরজা খুলতেই দেখা গেল আসমান ভাই দাঁড়িয়ে আছেন। মুখে চাপা উত্তেজনা।
— তোমরা কোথায় গিয়েছিলে?
সব ঘটনা খুলে বলতেই তার চোখ জ্বলে উঠল আনন্দে।
— আমাদের কাছে এখন অনেকগুলো প্রমাণ আছে,চাইলেই আমরা ওদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করতে পারি।
কিন্তু শাহমীর ভাই মাথা নেড়ে বলল,
— এখনো প্রমাণগুলো যথেষ্ট স্ট্রং নয়।এই চক্রের সাথে জড়িত আছে বড় বড় মন্ত্রী, মিনিস্টার, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী।ওরা তাদের ক্ষমতা দেখিয়ে সবকিছু মিথ্যা প্রমাণ করে দিতে পারে।
ঘরে নীরবতা নেমে এলো। তারপর সে আবার দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
— মাসখানেকের মধ্যে অনেক নারীকে বিদেশে পাচার করা হবে।সেই সময় আমরা ওদের হাতে-নাতে ধরব।আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করব..এই চক্রকে যেন সারা জীবনের জন্য বিলীন করে দিতে পারি।এরা দেশের জন্য মহামারীর মতো ক্ষতিকর।
কথাগুলো যেন ঘরের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনি তুলল।
আসমান ভাই তাদের একটু বিশ্রাম নিতে বলল।
তারপর সে চলে যায়....
? ........