#আমি_সেই_নীতু
#পর্ব_৪৪
#আনাবিয়া_বৃষ্টি
দুমাস কেটে গেছে।
এই দু’টি মাস যেন নিঃশব্দে অনেক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে নীতু আর শাহমীর এর জীবনে।
তার আর শাহমীর ভাইয়ের সম্পর্কটা আগের মতো কাঁটায় ভরা নেই আর। ধীরে ধীরে, খুব ধীরে..কিছুটা খুনসুটি, কিছুটা মান-অভিমান, আবার কখনো অপ্রত্যাশিত যত্নে....তাদের সম্পর্কটা ভালোর দিকেই এগোচ্ছে। কখন যে ঝগড়ার ফাঁকে ফাঁকে হাসি ঢুকে পড়েছে, নিজেরাও বুঝতে পারেনি।
এই দু’মাসে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা এসেছে রিমি বুবুকে ঘিরে।
ছয় বছর… টানা ছয় বছর বন্দী ঘরে থাকার পর অবশেষে তাকে মুক্ত করা হয়েছে। প্রথমদিকে শরীরটা ভেঙে পড়েছিল..দীর্ঘদিন আলো-বাতাস না পাওয়ার কষ্ট স্পষ্ট ছিল তার চোখেমুখে। কিন্তু সময়, চিকিৎসা আর মানুষের সান্নিধ্যে এখন সে আবার সুস্থ, স্বাভাবিক। শুধু শরীর নয়, মনটাও বদলে গেছে। সে এখন একদম অন্য মানুষ।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো..তার প্রতি নীতুর কোনো রাগ নেই।
বরং মনে হয়, সে যদি সেসব কাজ না করত, তাহলে হয়তো সে কখনোই জানতে পারত না তার বাবাকে খু*ন করা হয়েছে। জানতে পারত না এই গ্রামের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এত বড় একটা অন্ধকার চক্রের কথা। তাই রাগ নয়..শুধু এক ধরনের নীরব উপলব্ধি আছে।
সেদিন গভীর রাত।
চারপাশ নিস্তব্ধ। বাতাস যেন থেমে আছে। গরমে শরীর জ্বলছিল। আর ঘুম আসছিল না নীতুর । সহ্য করতে না পেরে শেষমেশ গোসলখানার দিকে পা বাড়াল।
ঠাণ্ডা পানি শরীর ছুঁতেই একটু স্বস্তি পেল।
গোসল শেষে তোয়ালে জড়িয়ে বাইরে বের হতেই..হঠাৎ থমকে গেল।
আধো আলো-আঁধারিতে…
একটা ছায়া।
ছায়াটা স্থির নয়।
ধীরে ধীরে… এক পা, আরেক পা করে…তার দিকেই এগিয়ে আসছে।
হৃদস্পন্দন আচমকা বেড়ে গেল। গলা শুকিয়ে এলো।
ছায়াটা সরে গিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠল এক লম্বা-চওড়া মানুষের অবয়ব।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে...
— আআআআআআআআআআ!
ভয়ে তোয়ালে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সে চিৎকার করে উঠল।
কিন্তু অবাক করার মতো ব্যাপার,
তার চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে সেও চিৎকার করে উঠল,
— আআআআআআআআ!
নীতু হতভম্ব।
ধীরে ধীরে তোয়ালের আড়াল থেকে মুখ বের করে বলল,
— আপনি…?
সে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
— এত জোরে কেউ চিৎকার দেয়, পেত্নী?
নীতুর রাগ মাথায় উঠে গেল।
— আমি পেত্নী?! আর আপনি কী? ভূত? জিন? লাল বান্দর?
একটু থেমে দম নিয়ে বলল,
— এইভাবে কেউ ভয় দেখায়? আর একটু হলেই তো হার্ট অ্যাটাক করতাম!
সে নির্বিকার ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
— ভয় আমি দেখাইনি, তুমি নিজেই পেয়েছ। এত রাতে কেউ গোসল করতে যায়? পানির শব্দ পেয়েই তো এখানে এলাম!
— আমার খুব গরম লাগছিল, তাই গোসল করতে এসেছি।
সে চোখ বড় করে বলল,
— আমি তো ভাবছিলাম কোনো ভূত-পেত্নী না চলে এসেছে!
নীতু চোখ রাঙিয়ে বলল,
— আপনি আবার আমাকে পেত্নী ডাকছেন?!
সে ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি নিয়ে বলল,
— পেত্নীকে পেত্নী ডাকব না তো কী ডাকব?
নীতু আর নিজেকে সামলাতে পারল না,
— শাহমীর ভাই!!!!!!
রাগে গলা কাঁপছে।
সে তৎক্ষণাৎ কানে আঙুল দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— ধীরে! মানুষ জেগে যাবে তো!
রাগে কিছু না বলেই নীতু ধীরে পা বাড়িয়ে গিয়ে বিছানার এক পাশে বসে পড়ল। বুকের ভেতর জমে থাকা অভিমানটা যেন শব্দ খুঁজে পাচ্ছিল না। ভেজা চুল থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ছিল সাদা চাদরের ওপর, কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়ালই নেই।
বিছানার পাশেই, হাঁটুর ওপর একটা বালিশ রেখে বসে আছে শাহমীর। তার চোখ দুটো স্থির..একদম নীতুর দিকেই। সেই দৃষ্টিতে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, নেই অস্বস্তি; বরং যেন গভীর কোনো অনুভূতি লুকিয়ে আছে।
নীতু ইচ্ছে করেই তাকে উপেক্ষা করার ভান করল। ফোনটা হাতে নিয়ে স্ক্রোল করতে লাগল, যদিও স্ক্রিনে কী আসছে সে নিজেও জানে না। তবু শাহমীরের চোখ তার দিক থেকে একচুলও নড়ল না।
শেষ পর্যন্ত নীতুর বিরক্তি চাপা থাকল না। গলা একটু কড়া করে বলল,
— এইভাবে কেন তাকিয়ে আছেন?
শাহমীর হালকা একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
— দেখছি, আমি কত বড় বোকা ছিলাম।
নীতু ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— মানে?
শাহমীরের ঠোঁটের কোণে ধীরে একটা হাসি ফুটে উঠল। চোখে তখন অদ্ভুত কোমলতা।
— এত সুন্দর বউ পাশে থাকতে জীবনের কত দুর্দান্ত সময় আমি নির্বোধের মতো নষ্ট করেছি… ভাবতেই অবাক লাগে।
নীতু কিছু বলল না। শুধু মুচকি একটা হাসি ঠোঁটে লেগে থাকল। সেই হাসি লুকোতে না চেয়েই সে উঠে দাঁড়াল। তোয়ালেটা তুলে নিয়ে ভেজা চুলগুলো ভালো করে মুছতে লাগল।
ঘরের আলোয় তার ভেজা চুল, নরম মুখটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আর শাহমীর? সে এখনো অপলক তাকিয়ে আছে..যেন চোখ সরাতে ভুলে গেছে।
নীতু একটু কেশে, অস্বস্তি লুকিয়ে বলল,
— কিছু বলবেন? এখনো এইভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?
শাহমীর শান্ত স্বরে জবাব দিল,
— ভাবছি না… দেখছি।
— কী দেখছেন?
এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে সে বলল,
— তেমন কিছু না। বাদ দাও।
তারপর গম্ভীরতা ফিরে এলো কণ্ঠে,
— কাল ফাইজুলদের সেই নারী পাচারের দিন। আমার ফোর্স আগেই সেখানে থাকবে। আমরা ঠিক সময়ে পৌঁছাবো।
নীতুর চোখে তখন দৃঢ়তা।
— অবশেষে ওদের হাতে-নাতে ধরতে পারবো। এইসব মহামারীকে বেশি দিন বাঁচিয়ে রাখার কোনো মানে নেই।
শাহমীর ঘড়ির দিকে তাকাল।
— অনেক রাত হয়েছে, নীল। ঘুমাবে না?
— এই তো আসছি। আপনি ঘুমাবেন না?
সে হালকা হাসল, একটু রসিকতার সুরে বলল,
— হ্যাঁ, ঘুমাবো। তবে আমার তো আর মিসেস শাহমীরের মতো কপাল না যে খাটে ঘুমাতে পারি! আমাকে তো সেই সোফাতেই রাত কাটাতে হবে।
একটু থেমে যোগ করল,
— তুমি শুয়ে পড়ো। আমিও গিয়ে ঘুমাচ্ছি।
এই কথা বলেই শাহমীর ভাই ধীর পায়ে সোফার দিকে এগিয়ে গেল।
হ্যাঁ...তাদের বিয়ের দুই মাস পার হয়ে গেছে, অথচ আজও তারা এক বিছানায় ঘুমাইনি।
সেই দিনটার কথা মনে পড়ে যায়… ঠিক দুই মাস আগে।
আসমান ভাই ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার পর,তারা দু’জনই যেন নিজেদের মতো করে গুছিয়ে নিয়েছিল।
নীতু ফ্রেশ হয়ে, তাড়াতাড়ি কিছু খেয়ে, মেয়েদের ফাইটিং শেখানোর জন্য বেরিয়ে পরে। দিনের বাকি সময়টা কাজেই কেটে যায়। আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ করে সন্ধ্যার দিকে বাড়ি ফিরে।
শরীরটা তখন ক্লান্তিতে ভারী, কিন্তু মাথার ভেতর কাজের হিসেব থামে না।
ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার শেষ করে সে শাহমীর ভাইয়ের ঘরে যায়।
সে বিছানার এক পাশে বসে ছিল।তাকে দেখে জিজ্ঞেস করল,
— সব কাজ ঠিকমতো করা হয়েছে?
নীতু একটু ভেবে উত্তর দিল,
— হ্যাঁ। কিছু ফাইল এখনো ডাউনলোড দেওয়া হয়নি, সেগুলো বের করতে সময় লাগবে। আর যাদের নাম পাওয়া গেছে, তাদের সব তথ্য জোগাড় করার জন্য লোক লাগানো হয়েছে। আশা করছি, কয়েক দিনের মধ্যেই সব পেয়ে যাব।
সে মাথা নাড়ল।
— ঠিক আছে। এবার একটু রেস্ট নাও। এসো, ঘুমিয়ে পড়ি। আমি আজ ঢাকা থেকে এসেছি, খুব ক্লান্ত।
কথাটা শুনে নীতু একেবারে স্থির হয়ে গেল।
ঘুমিয়ে পড়ি?
এক বিছানায়?
নীতু অবাক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। কোনো নড়াচড়া নেই তার।
সে অস্বস্তিটা ও ঠিকই বুঝে ফেলল।
হঠাৎই বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
— চিন্তা নেই। আমি স্বামীর অধিকার চাইব না। তুমি বিছানায় শুয়ে পড়ো। আমি বরং সোফায় শুয়ে পড়ছি।
কথাটা শুনে যেন নীতুর বুকের ভেতর আটকে থাকা নিঃশ্বাসটা ছেড়ে বেরিয়ে এলো। সে একটু হালকা হল।
ঠিক তখনই সে আবার বলল,
— তবে আমার একটা শর্ত আছে!
নীতু চমকে তাকাল।
— কী?
সে একটু থেমে, নরম গলায় বলল,
— আমি চাই তুমি আগের মতো প্রাণবন্ত হয়ে যাও। বলছি না সবার সাথে এমন করতে হবে..শুধু আমার সাথে করলেই হবে। আমাদের সম্পর্কটা আগের মতো হোক। সেই আগের মতো… আমার সাথে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করা।
নীতু চোখ কুঁচকে তাকাল, কোমরে হাত দিয়ে বলল,
— আমি আপনার সাথে পায়ে পা বেঁধে ঝগড়া করতাম?
ও তাড়াতাড়ি বলল,
— না না! আমি ওইভাবে বলিনি। আমি শুধু..
নীতু সঙ্গে সঙ্গে থামিয়ে দিল..
— থামুন!!!আপনি কী বলতে চাচ্ছেন?
আমি ঝগড়ুটে, তাই তো? সব বুঝি এখন! আমি এখন কিছু বলি না বলেই এসব কথা বলছেন!
শাহমীর ভাই তখন আর নিজেকে সামলাতে পারছে না।
মুখে সেই চিরচেনা মিঠিমিঠি হাসি।
ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে রাখার চেষ্টা করছে।
এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে, যেন হাসিটা লুকাতে পারবে।
নীতু রাগে বলল,
— আপনি হাসছেন কেন? এখানে হাসির কী আছে?আমায় কি পাগল মনে হচ্ছে?
সে হেসেই ফেলে, চোখে দুষ্টু ঝিলিক,
— পেত্নী………
রেগে যাওয়া অনুভূতি নিয়ে নীতু শাহমীর ভাইয়ের দিকে এগোচ্ছিল। তিনি নীতুকে ধীর গতিতে আয়নার সামনে নিয়ে এলেন।
—মুখটা এদিকে ঘুরাও
নীতু তার চোখ আয়নার কাচের দিকে আটকে দিল। প্রথমে কিছুটা ভয়, তারপর হঠাৎই নিজের প্রতিফলনে হেসে উঠল। এক মুহূর্তে বুঝতে পারল, সে এতক্ষণ নিজের ক্ষোভে এবং অহেতুক ঝগড়ায় পা বেঁধেছিলাম। বাহিরে বাতাস হালকা বইছিল, আর সেই হাওয়ায় চুলগুলো তার কপালের সামনে নেমে আসছিল, তাই নিজের প্রতিচ্ছবিটা কিছুটা অদ্ভুত লাগছিল।
শাহমীর ভাই হালকা হাসি দিয়ে বললেন,
—নীল, তোকে হাসলে খুব সুন্দর লাগে। সব সময় হাসিখুশি থাকবি।
নীতু মাথা হেলিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে সম্মতি জানাল। সেই ছোট্ট মুহূর্তটা তাদের সম্পর্ককে একটু স্বাভাবিক করে তুলল। তারা দুজনে হাসি বিনিময় করে সেই শান্তি উপভোগ করছিল।
হঠাৎ দরজায় ধাক্কা। রাতের এই নিস্তব্ধতায় দরজার শব্দটা আরও স্পষ্ট মনে হল। তারা দুজনেই চমকে উঠে একে অপরের দিকে তাকাল।
শাহমীর ভাই দরজা খুললেন, এবং সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন ফুয়াদ ভাই।তিনি বললেন,
—সরি ভাইয়া,একটা কাজ ছিল তাই আসতে হলো। কালকের জন্য সব লোক ঠিক করা হয়েছে, কাগজ-পত্র সব প্রস্তুত। তবে একটা সমস্যা হয়েছে।
তারা দুজনেই কৌতূহল ও অস্থিরতার মিশ্রণে তাকিয়ে রইল।
নীতু প্রশ্ন করল,
—কি সমস্যা?
—তাদের তথ্য অনুযায়ী, সকালে কাজ করার কথা ছিল। কিন্তু খবর এসেছে, তারা প্ল্যান পাল্টিয়ে ফেলেছে। এখন সকালেই, ঘণ্টা কয়েকের মধ্যে, মেয়েদের পাচার করে দেবে।
নীতুর কণ্ঠে অবিশ্বাস আর শঙ্কা মিশে গেল।
—কী!!!!!
—আসমান ভাইকে অনেক আগে পাঠানো হয়েছে, আমাদের সঙ্গে তো আর যেতে পারবে না। আমি তোমাদের জানাতে আসলাম, আমাদের এখনই বের হতে হবে। না হলে পরে বড় সমস্যা হবে। আমি বের হচ্ছি, তোমরা আসো।
শাহমীর ভাই ঘাড় নাড়লেন।
—তুই যা, আমরা আসছি। নীল, রেডি হয়ে যাও, আমাদের বের হতে হবে।
নীতু দ্রুত নিজের সব প্রস্তুতি শেষ করল। মনে হচ্ছিল, সময় যেন লাফিয়ে এগোচ্ছে। সবকিছু যেন আরও চাপ বাড়াচ্ছিল।
—হ্যাঁ, চলুন,
চলবে ......