ফন্ট সাইজ:
থিম:
যে গল্পের শুরুটা ছিল স্কুলের বেঞ্চে

অধ্যায় ১ — পরিচয়

লেখক: মোঃ ইয়াছিন

সকালটা ছিল একেবারে নতুন।

সূর্যের আলো তখন ধীরে ধীরে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছিল। রাস্তার পাশে ছোট ছোট দোকান খুলছিল, কেউ স্কুলের পোশাক পরে দ্রুত হাঁটছিল, কেউ আবার বাবা-মায়ের সঙ্গে স্কুলের দিকে যাচ্ছিল। চারপাশে একটা অদ্ভুত ব্যস্ততা। মনে হচ্ছিল, সবাই যেন নতুন কোনো অধ্যায় শুরু করতে যাচ্ছে।
ইয়াসিনও সেদিন খুব সকালে ঘুম থেকে উঠেছিল।
অ্যালার্ম বাজার আগেই তার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। বিছানায় কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থেকে সে ভাবছিল, আজ থেকে তার স্কুলজীবনের নতুন একটা অধ্যায় শুরু হবে।
নতুন স্কুল।
নতুন ক্লাস।
নতুন শিক্ষক।
আর সবচেয়ে বড় কথা—নতুন বন্ধু।
ইয়াসিন উঠে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে তখন সকালের আলো। পাখির ডাক শোনা যাচ্ছিল। সে কিছুক্ষণ বাইরে তাকিয়ে থাকার পর নিজের স্কুলের পোশাক গুছিয়ে নিতে শুরু করল।
ঠিক তখনই দরজার কাছে এসে দাঁড়াল তার ছোট ভাই নিবির।
নিবির কিছুক্ষণ চুপচাপ ইয়াসিনের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
— ভাইয়া, আজ এত সকালে উঠছ কেন?
ইয়াসিন হাসতে হাসতে বলল,
— আজ স্কুলে যাব। ভুলে গেছিস?
নিবির সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— ওহ! আজকে নতুন স্কুলের প্রথম দিন?
— হ্যাঁ।
— তাহলে এত চিন্তিত মুখ করে আছিস কেন?
ইয়াসিন হেসে বলল,
— চিন্তিত না। ভাবছি, নতুন বন্ধু পাব কি না।
নিবির একটু হেসে বলল,
— তুই যেখানে যাবি, সেখানে বন্ধু তৈরি হতে বেশি সময় লাগবে না।
ইয়াসিন কিছু বলল না। শুধু মুচকি হাসল।
কিছুক্ষণ পর সে প্রস্তুত হয়ে নিল। ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে একবার ঘড়ির দিকে তাকাল।
সময় হয়ে গেছে।
সে রওনা দিল স্কুলের উদ্দেশ্যে।
রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ইয়াসিনের মনে নানা ধরনের চিন্তা ঘুরছিল। নতুন স্কুলে তাকে সবাই কেমনভাবে নেবে? সে কি সহজে বন্ধু বানাতে পারবে? ক্লাসের পরিবেশ কেমন হবে?
এমন হাজারো প্রশ্ন মাথায় ঘুরছিল।
কিন্তু সে জানত না, তার এসব প্রশ্নের উত্তর খুব দ্রুতই পেয়ে যাবে।
স্কুলের গেটের সামনে পৌঁছাতেই ইয়াসিন থেমে গেল।
বড় একটা গেট।
গেটের ভেতরে অনেক ছাত্রছাত্রী। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলছে, কেউ ক্লাস খুঁজছে, কেউ আবার দৌড়ে যাচ্ছে।
ইয়াসিন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে চারপাশটা দেখল।
তারপর ধীরে ধীরে স্কুলের ভেতরে ঢুকে পড়ল।
প্রথম দিন বলে চারপাশের সবকিছুই তার কাছে নতুন লাগছিল। করিডোর, ক্লাসরুম, মাঠ, নোটিশ বোর্ড—সবকিছু সে মন দিয়ে দেখছিল।
হঠাৎ পেছন থেকে একটা কণ্ঠ শুনতে পেল।
— ভাই, তুমি কি এই ক্লাসেই?
ইয়াসিন পেছনে ফিরে তাকাল।
একজন ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।
ছেলেটা হাসিমুখে বলল,
— আমি রায়হান।
ইয়াসিনও হাসল।
— আমি ইয়াসিন।
রায়হান বলল,
— আমিও নতুন। ক্লাসটা ঠিকমতো খুঁজে পাচ্ছিলাম না।
ইয়াসিন বলল,
— আমিও খুঁজছি।
দুজন একসঙ্গে ক্লাসরুমের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
সেদিনের সেই ছোট্ট কথোপকথনটাই ছিল ইয়াসিনের নতুন বন্ধুত্বের শুরু।
ক্লাসরুমে ঢুকে তারা দেখল, অনেকেই ইতিমধ্যে এসে গেছে।
কেউ সামনের বেঞ্চে বসেছে, কেউ পেছনের দিকে।
ইয়াসিন আর রায়হান মাঝামাঝি একটা বেঞ্চে গিয়ে বসল।
কিছুক্ষণ পর আরেকজন ছেলে এসে তাদের পাশে দাঁড়াল।
— এখানে বসা যাবে?
রায়হান বলল,
— অবশ্যই।
ছেলেটা ব্যাগ রেখে বসে পড়ল।
— আমার নাম দেব।
ইয়াসিন বলল,
— আমি ইয়াসিন। আর ও রায়হান।
দেব হাসল।
— তাহলে আজ থেকেই আমরা তিনজন বন্ধু?
রায়হান সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— তিনজন কেন? আরও লোক লাগবে।
ইয়াসিন হেসে ফেলল।
সত্যিই, বন্ধুত্ব কখনো কখনো খুব অদ্ভুতভাবে শুরু হয়।
কোনো বড় পরিচয়ের দরকার হয় না।
শুধু পাশাপাশি বসা, একটা ছোট কথা আর একটা হাসিই যথেষ্ট।
কিছুক্ষণ পর ক্লাসে এল তাহমিদ।
তাহমিদ একটু চঞ্চল ধরনের ছেলে ছিল। ক্লাসে ঢুকেই সে চারপাশে তাকিয়ে একটা খালি জায়গা খুঁজছিল।
দেব তাকে ডাকল,
— এইদিকে আসো, এখানে বসো।
তাহমিদ এসে বসতেই রায়হান বলল,
— নাম কী?
— তাহমিদ।
— ঠিক আছে, আজ থেকে তুমিও আমাদের দলে।
তাহমিদ অবাক হয়ে বলল,
— কোন দল?
দেব বলল,
— এখনো দল তৈরি হয়নি। কিন্তু তৈরি হবে।
সবাই হেসে উঠল।
কিছুক্ষণ পর আখলাক আর ঈশানও তাদের সঙ্গে পরিচিত হলো।
আখলাক ছিল শান্ত স্বভাবের। অন্যদিকে ঈশান ছিল বেশ হাসিখুশি। অল্প সময়ের মধ্যেই ছয়জনের মধ্যে একটা ভালো বোঝাপড়া তৈরি হয়ে গেল।
ইয়াসিন তখন বুঝতে পারছিল, নতুন স্কুল নিয়ে তার যে ভয় ছিল, সেটা হয়তো অকারণই ছিল।
প্রথম দিনেই সে পাঁচজন বন্ধুকে পেয়ে গেছে।
রায়হান, দেব, তাহমিদ, আখলাক আর ঈশান।
ছয়জনের সেই ছোট্ট দলটা তখনও জানত না, সামনে তাদের একসঙ্গে কাটানো কত শত দিন অপেক্ষা করছে।
প্রথম ক্লাস শুরু হলো।
শিক্ষক এসে সবাইকে চুপ করতে বললেন।
ক্লাসরুমে নীরবতা নেমে এলো।
শিক্ষক একে একে সবার সঙ্গে পরিচিত হতে লাগলেন।
যখন ইয়াসিনের পালা এল, সে দাঁড়িয়ে নিজের নাম বলল।
— আমার নাম ইয়াসিন।
শিক্ষক মাথা নেড়ে বললেন,
— ঠিক আছে, বসো।
ইয়াসিন বসে পড়ল।
তার পাশে রায়হান নিচু গলায় বলল,
— এত ছোট পরিচয় দিলি কেন?
ইয়াসিন বলল,
— আর কী বলব?
রায়হান বলল,
— নিজের সম্পর্কে অনেক কিছু বলতে হয়।
ইয়াসিন মুচকি হেসে বলল,
— প্রথম দিনেই সব বলে দিলে পরে কী বলব?
দুজনেই চুপচাপ হেসে ফেলল।
শিক্ষকের চোখ তাদের দিকে পড়তেই দুজন সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে বসল।
প্রথম দিনটা এভাবেই চলতে লাগল।
এক ক্লাস শেষ হয়, আরেক ক্লাস শুরু হয়।
কখনো শিক্ষক পড়াচ্ছেন, কখনো সবাই খাতায় লিখছে, আবার কখনো সুযোগ পেলেই বন্ধুরা ফিসফিস করে কথা বলছে।
টিফিনের ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে যেন পুরো ক্লাসরুমের চেহারাই বদলে গেল।
সবাই বেরিয়ে গেল।
ইয়াসিন, রায়হান, দেব, তাহমিদ, আখলাক আর ঈশান একসঙ্গে মাঠের পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
তাহমিদ ব্যাগ থেকে খাবার বের করে বলল,
— সবাই ভাগ করে খাবি?
রায়হান বলল,
— অবশ্যই।
দেব বলল,
— তবে আমার খাবার কেউ বেশি নেবি না।
ঈশান সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— তোর খাবার আগে থেকেই কম।
সবাই হেসে উঠল।
সেদিনের টিফিনের সময়টা ছিল তাদের প্রথম একসঙ্গে কাটানো সময়।
তারা নিজেদের বাড়ির কথা বলল।
কে কোথায় থাকে, কার কত ভাইবোন, কে কোন বিষয় পছন্দ করে—এসব নিয়ে গল্প করতে লাগল।
ইয়াসিন নিজের ছোট ভাই নিবিরের কথাও বলল।
— আমার একটা ছোট ভাই আছে। নাম নিবির।
রায়হান বলল,
— ছোট ভাই থাকলে তো বাসায় সবসময় ঝামেলা।
ইয়াসিন হেসে বলল,
— ঝামেলা আছে, আবার ভালোবাসাও আছে।
তাহমিদ বলল,
— আমারও ছোট ভাই আছে। ওর সঙ্গে আমার প্রতিদিন ঝগড়া হয়।
আখলাক বলল,
— ছোট ভাই-বোন থাকলে ঝগড়া না করে থাকা যায় নাকি?
সবাই আবার হেসে উঠল।
সেদিন তারা জানত না, ভবিষ্যতে তাদের বন্ধুত্ব কতটা গভীর হবে।
দিনগুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে লাগল।
একদিন।
দুইদিন।
তারপর এক সপ্তাহ।
কিছুদিনের মধ্যেই ছয়জনের বন্ধুত্ব পুরো ক্লাসে পরিচিত হয়ে গেল।
ইয়াসিন আর রায়হান প্রায় সবসময় একসঙ্গে থাকত।
দেব আর তাহমিদ ছিল দুষ্টুমির মূল পরিকল্পনাকারী।
আখলাক প্রায়ই তাদের থামানোর চেষ্টা করত।
আর ঈশান সবকিছুকে মজার করে তুলত।
ক্লাসে কোনো ঘটনা ঘটলে ছয়জনের মধ্যে কেউ না কেউ অবশ্যই জড়িয়ে থাকত।
তবে তাদের গল্পের আরেকটি দিক তখনও ইয়াসিনের অজানা ছিল।
সেই দিকের শুরু হয়েছিল স্কুলের অন্য একটি ক্লাসরুমে।
সেখানে ছিল মিম্মা।
মিম্মা প্রথম থেকেই শান্ত স্বভাবের হলেও তার চারপাশে সবসময় বন্ধুদের একটা ছোট দল থাকত।
ময়না, আয়শা, দিঘী আর মিম।
তাদের মধ্যে দিঘী আর মিম ছিল মিম্মার সবচেয়ে কাছের বন্ধু।
তিনজনকে প্রায়ই একসঙ্গে দেখা যেত।
ক্লাসে পাশাপাশি বসা, টিফিনে একসঙ্গে থাকা, স্কুল ছুটির পর একসঙ্গে বের হওয়া—সবকিছুতেই তাদের একটা আলাদা বন্ধুত্ব ছিল।
দিঘী ছিল মিম্মার এমন একজন বন্ধু, যার সঙ্গে মিম্মা প্রায় সবকিছু নিয়ে কথা বলতে পারত।
মিমও ছিল তেমনই।
মিম্মা কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তিত হলে দিঘী আর মিম সেটা বুঝে ফেলত।
আবার মিম্মা কোনো কারণে হাসলে তারাও হাসত।
ময়না আর আয়শাও তাদের খুব কাছের বন্ধু ছিল।
পাঁচজন মিলে যেন একটা ছোট্ট পৃথিবী তৈরি করেছিল।
একদিন টিফিনের সময় মিম্মা, দিঘী, মিম, ময়না আর আয়শা মাঠের একপাশে বসেছিল।
ময়না বলল,
— আজকে ক্লাসটা এত লম্বা লাগছিল কেন?
মিম বলল,
— কারণ তুই পড়াশোনা করিস না। তাই সময় বেশি লাগে।
ময়না সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— আর তুই খুব পড়াশোনা করিস?
মিম হাসতে হাসতে বলল,
— তোর থেকে তো বেশি করি।
দিঘী তাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল,
— তোমরা দুজন ঝগড়া শুরু করলেই আর শেষ হয় না।
মিম্মা হাসল।
সে বলল,
— তোমরা দুজন না থাকলে স্কুলটা অনেক চুপচাপ লাগত।
দিঘী বলল,
— আর তুই না থাকলে আমাদের গল্পই হতো না।
মিম্মা হেসে মাথা নাড়ল।
সেই মুহূর্তে তাদের কেউই জানত না, তাদের এই সাধারণ বন্ধুত্বের সঙ্গে খুব শিগগিরই আরেকটি পরিচয় যুক্ত হতে চলেছে।
ইয়াসিনের দল আর মিম্মার দল তখন একই স্কুলে, একই সময়ে, একই পরিবেশে দিন কাটাচ্ছিল।
কিন্তু তারা তখনও একে অপরের গল্পের অংশ হয়ে ওঠেনি।
স্কুলের দিনগুলো এভাবেই চলতে লাগল।
কখনো পরীক্ষার প্রস্তুতি।
কখনো ক্লাসের কাজ।
কখনো খেলাধুলা।
কখনো বন্ধুদের সঙ্গে হাসাহাসি।
কখনো শিক্ষকের বকা।
সব মিলিয়ে প্রতিটি দিন আগের দিনের চেয়ে একটু আলাদা ছিল।
একদিন স্কুলের মাঠে একটা অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছিল।
সব ক্লাসের কিছু ছাত্রছাত্রী সেখানে কাজ করছিল।
ইয়াসিন আর তার বন্ধুরাও সেখানে ছিল।
রায়হান একটা কাজ করতে করতে বলল,
— ইয়াসিন, ওইদিকে একটু যাবি?
ইয়াসিন বলল,
— কেন?
— একটা জিনিস আনতে হবে।
দুজন মাঠের অন্য পাশে গেল।
সেখানেই প্রথমবার ইয়াসিনের চোখ পড়ল মিম্মার দিকে।
মিম্মা তখন দিঘী আর মিমের সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল।
ইয়াসিন শুধু এক মুহূর্তের জন্য তাকাল।
তারপর নিজের কাজে ফিরে গেল।
সে তখনও জানত না মেয়েটির নাম কী।
মিম্মাও জানত না, একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটির নাম ইয়াসিন।
তাদের মধ্যে কোনো কথা হয়নি।
কোনো পরিচয়ও হয়নি।
শুধু একই জায়গায় থাকা দুইজন অচেনা মানুষ।
কিন্তু গল্পের অনেক বড় অধ্যায়ের শুরু কখনো কখনো এমনই ছোট একটা মুহূর্ত থেকে হয়।
রায়হান ইয়াসিনকে ডাকল।
— কী দেখছিস?
ইয়াসিন বলল,
— কিছু না।
— তাহলে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?
— চল।
দুজন আবার ফিরে গেল।
সেদিনের ঘটনা সেখানেই শেষ হয়ে গেল।
কিন্তু স্কুলের দিন তো থেমে থাকে না।
পরের দিন আবার ক্লাস।
আবার বন্ধুদের সঙ্গে দেখা।
আবার টিফিন।
আবার হাসি-ঠাট্টা।
কয়েকদিন পর ইয়াসিন জানতে পারল, মেয়েটির নাম মিম্মা।
নামটা সে শুনেছিল অন্যদের কথায়।
তারপরও তাদের কোনো সরাসরি পরিচয় হয়নি।
দিঘী আর মিম একদিন মিম্মাকে নিয়ে কথা বলছিল।
মিম বলল,
— ওই ছেলেটার নাম কী যেন?
দিঘী বলল,
— কোন ছেলেটা?
— ওই যে রায়হানের সঙ্গে থাকে।
মিম্মা বলল,
— জানি না।
দিঘী বলল,
— মনে হয় ইয়াসিন।
মিম্মা শুধু মাথা নাড়ল।
তার কাছে বিষয়টা খুব সাধারণ ছিল।
একজন সহপাঠীর নাম জানা—এর বেশি কিছু নয়।
অন্যদিকে ইয়াসিনও মিম্মার নাম জানার পর আর বিষয়টা নিয়ে বেশি ভাবেনি।
তার কাছে তখন বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
একদিন স্কুল ছুটির পর ইয়াসিন বাড়ি ফিরছিল।
রায়হান, দেব আর তাহমিদও সঙ্গে ছিল।
পথে তারা নানা বিষয় নিয়ে গল্প করছিল।
দেব হঠাৎ বলল,
— আমাদের স্কুলজীবন কিন্তু অনেক মজার হবে।
তাহমিদ বলল,
— এখনো তো শুরুই হলো।
রায়হান বলল,
— শুরু হয়েছে বলেই তো বলছি।
ইয়াসিন চুপচাপ তাদের কথা শুনছিল।
কিছুক্ষণ পর সে বলল,
— জানিস, আমার মনে হয় এই সময়টা একদিন অনেক মনে পড়বে।
রায়হান বলল,
— এখনই এত আবেগী হচ্ছিস কেন?
সবাই হেসে ফেলল।
ইয়াসিনও হাসল।
কিন্তু তার কথাটা সত্যি ছিল।
সে তখনও জানত না, স্কুলের এই দিনগুলো একদিন সত্যিই তার কাছে খুব মূল্যবান হয়ে উঠবে।
দিন যেতে লাগল।
বন্ধুত্ব আরও শক্ত হলো।
ইয়াসিন ও তার পাঁচ বন্ধু একসঙ্গে থাকত।
মিম্মা ও তার চার বন্ধু নিজেদের মতো করে দিন কাটাত।
দুটি আলাদা দল।
দুটি আলাদা বন্ধুত্ব।
দুটি আলাদা জগৎ।
কিন্তু একই স্কুল।
একই মাঠ।
একই করিডোর।
একই ঘণ্টার শব্দ।
আর সময় ধীরে ধীরে তাদের পথগুলোকে একে অপরের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল।
একদিন দুপুরে হঠাৎ স্কুলে বৃষ্টি শুরু হলো।
আকাশ কালো হয়ে এল।
ছাত্রছাত্রীরা সবাই করিডোরে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখতে লাগল।
ইয়াসিন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
রায়হান বলল,
— আজ মনে হয় বাড়ি ফিরতে পারব না।
দেব বলল,
— বৃষ্টি থামার অপেক্ষা কর।
তাহমিদ বলল,
— আর যদি না থামে?
ঈশান বলল,
— তাহলে স্কুলেই রাত কাটাব।
সবাই হেসে উঠল।
অন্যদিকে মিম্মা, দিঘী আর মিমও করিডোরে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল।
দিঘী বলল,
— বৃষ্টি আমার অনেক ভালো লাগে।
মিম বলল,
— আমারও।
মিম্মা চুপচাপ বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ছিল।
তারপর হেসে বলল,
— বৃষ্টি হলে স্কুলটাকে অন্যরকম লাগে।
দিঘী বলল,
— সত্যি।
কেউ জানত না, সেই বৃষ্টির দিনটিও ভবিষ্যতের গল্পে একদিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইয়াসিনের বন্ধুত্ব আরও গভীর হতে লাগল।
রায়হান ছিল তার সবচেয়ে বেশি সময়ের সঙ্গী।
দেব আর তাহমিদ ছিল হাসি-ঠাট্টার সঙ্গী।
আখলাক ছিল প্রয়োজনে পরামর্শ দেওয়ার মানুষ।
ঈশান ছিল দলের আনন্দের কারণ।
আর নিবির ছিল বাড়ির সেই ছোট ভাই, যার সঙ্গে দিনের শেষে দেখা হলেই স্কুলের সব গল্প বলা হতো।
একদিন বাড়ি ফিরে ইয়াসিন ব্যাগ রেখে বসতেই নিবির এসে জিজ্ঞেস করল,
— আজ স্কুলে কী হয়েছে?
ইয়াসিন বলল,
— অনেক কিছু।
নিবির বলল,
— তাহলে বল।
ইয়াসিন একে একে বন্ধুদের কথা বলতে লাগল।
রায়হান কী করেছে, দেব কী বলেছে, তাহমিদ কীভাবে সবাইকে হাসিয়েছে—সব।
নিবির মন দিয়ে শুনছিল।
শেষে সে বলল,
— তোমার স্কুলে মনে হয় অনেক মজা।
ইয়াসিন বলল,
— হ্যাঁ। মনে হচ্ছে ভালোই কাটবে।
নিবির তখনও জানত না, তার ভাইয়ের স্কুলজীবন শুধু বন্ধুত্বের গল্পে থেমে থাকবে না।
সেই গল্পে আরও অনেক মানুষ আসবে।
কেউ থাকবে কিছুদিন।
কেউ থাকবে অনেকদিন।
আর কেউ কেউ স্মৃতি হয়ে গেলেও তাদের কথা কখনো পুরোপুরি ভুলে যাওয়া যাবে না।
কিন্তু তখন এসব কিছুই জানা ছিল না।
সবকিছু তখন ছিল একেবারে শুরুতে।
পরিচয়ের শুরু।
বন্ধুত্বের শুরু।
স্কুলজীবনের শুরু।
এক বিকেলে স্কুল ছুটির পর ইয়াসিন গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
তার বন্ধুরা একটু দূরে।
মিম্মা তার বন্ধুদের সঙ্গে অন্য দিক দিয়ে বের হচ্ছিল।
হঠাৎ দিঘীর হাত থেকে একটা বই নিচে পড়ে গেল।
মিম্মা বইটা তুলে দিল।
ঠিক সেই সময় ইয়াসিনের সঙ্গে তাদের চোখাচোখি হলো।
মাত্র কয়েক সেকেন্ড।
কেউ কিছু বলল না।
তারপর দুজনই নিজের নিজের পথে চলে গেল।
কিন্তু সেই ছোট্ট মুহূর্তটা যেন অদৃশ্যভাবে গল্পের প্রথম পাতায় একটা দাগ টেনে দিল।
পরের দিনও তারা একই স্কুলে যাবে।
আবার দেখা হবে।
আবার বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটবে।
আর হয়তো কোনো একদিন সেই অচেনা পরিচয় সত্যিকারের পরিচয়ে বদলে যাবে।
ইয়াসিন তখনও জানত না, মিম্মা নামের এই মেয়েটি তার জীবনের গল্পে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
মিম্মাও জানত না, ইয়াসিন নামের এই ছেলেটি একদিন তার স্কুলজীবনের অনেক স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে যাবে।
তাদের গল্পের শুরুটা তাই কোনো বড় ঘটনার মধ্য দিয়ে হয়নি।
শুরু হয়েছিল একটি স্কুলের গেট দিয়ে।
একটি ক্লাসরুম দিয়ে।
কিছু নতুন বন্ধুর হাসি দিয়ে।
রায়হান, দেব, তাহমিদ, আখলাক আর ঈশানের বন্ধুত্ব দিয়ে।
নিবিরের সঙ্গে ইয়াসিনের ছোট ভাইয়ের সম্পর্ক দিয়ে।
ময়না, আয়শা, দিঘী আর মিমকে ঘিরে মিম্মার বন্ধুত্ব দিয়ে।
আর সবশেষে—
একটি অচেনা মুখকে প্রথমবার দেখে মনে রাখার মধ্য দিয়ে।
তখনও গল্পের আসল অধ্যায় শুরু হয়নি।
কারণ পরিচয় মাত্র শুরু হয়েছে।
সামনে ছিল আরও অনেক দিন।
আর সেই দিনগুলোর প্রতিটিতে জমা হতে থাকবে নতুন নতুন স্মৃতি।
কেউ হাসবে।
কেউ রাগ করবে।
কেউ ভুল বুঝবে।
কেউ আবার বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেবে।
স্কুলের সেই পুরোনো বেঞ্চগুলো একদিন অনেক গল্পের সাক্ষী হবে।
আর ইয়াসিন তখনও জানত না—
কিছু পরিচয় জীবনে আসে শুধু পরিচিত হওয়ার জন্য নয়, পুরো গল্পটাকে বদলে দেওয়ার জন্য।
সেদিনের সূর্য ধীরে ধীরে অস্ত যাচ্ছিল।
স্কুলের গেট বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল।
ছাত্রছাত্রীরা সবাই বাড়ি ফিরে যাচ্ছিল।
ইয়াসিনও বন্ধুদের সঙ্গে বাড়ির পথে হাঁটছিল।
তার পাশে রায়হান, দেব, তাহমিদ, আখলাক আর ঈশান।
আর কিছুটা দূরে মিম্মা হাঁটছিল ময়না, আয়শা, দিঘী আর মিমের সঙ্গে।
দুটি দল আলাদা পথে চলে গেল।
কেউ পিছনে ফিরে তাকাল না।
কিন্তু সময় যেন তাদের গল্পের পরের পাতাটা আগেই লিখে রেখেছিল।
সেদিনের মতো স্কুল শেষ হলো।
কিন্তু গল্পের শুরু হলো মাত্র।
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে অধ্যায় ১ — পরিচয় শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন