"স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আনফাল আতিশ তালুকদার আমার স্বামী! তিন বছর আগে একটা ভুল বোঝাবুঝির জেরে গ্রামের মানুষ জোর করে ওনার সাথে আমার বিয়ে দেয়।"
পারিজার কথাটা শেষ হতে না হতেই পুরো কাজিন মহল একসাথে হো হো করে হেসে উঠলো। যেন সবাই মিলে এইমাত্র দারুণ কোনো কৌতুক শুনলো!
তাদের মধ্য থেকে পারিজার বড় মামার মেয়ে রাইসা হেসে উঠে বলল,
"সত্যি পারিজা, তুই দারুণ জোকস বলতে পারিস! অ্যানিওয়ে, তুই কিন্তু রুলস ব্রেক করছিস। কথা ছিল 'ট্রুথ'-এ নিজের কোনো গোপন কথা শেয়ার করবি, আর তুই নেহাতই বানোয়াট একটা গল্প ফেঁদে বসলি? এর জন্য পানিশমেন্ট তোকে পেতেই হবে!"
বলেই রাইসা বাকিদের দিকে তাকাল। পারিজা অসহায় চোখে পাশে বসে থাকা নিজের আপন মায়ের পেটের বোনের দিকে তাকাল। ফিহা তার বোনের আকুতি বুঝতে পেরে দুই হাত জোড় করে বলল,
"আমাকে ক্ষমা করিস বোন! থাপ্পড় খেতে না চাইলে এসব কাল্পনিক গল্প থামা। গত তিন বছর ধরে এই এক কথা শুনে শুনে আমার কান পচে গেছে!"
খালাতো বোন মাহাম সাথে তাল মিলিয়ে বলে উঠলো,
"আমার তো মনে হয় পারিজা আজকাল বেশি ডার্ক রোমান্টিক উপন্যাস পড়ছে। ওসব পড়েই কল্পনার জগতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিজের স্বামী বানিয়ে বসে আছে! এটা তোর কল্পনা ছাড়া আর কিছুই না, পারিজা।"
মাহামের কথা কাটতে না কাটতেই মামাতো ভাই ইফান পকেট থেকে ফোন বের করে গুগলে সার্চ দিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যাকগ্রাউন্ড আর যাবতীয় তথ্য স্ক্রিনে এনে পারিজার চোখের সামনে ধরে বলল,
"এই দেখ, আমাদের দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আনফাল আতিশ তালুকদার। লোকটা অলরেডি এনগেজড! ওনার ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড খেয়াল করেছিস? বাবা শিক্ষামন্ত্রী, মা এত বড় কোম্পানির চেয়ারম্যান! ওনারা কোথায় আর তুই কোথায়, একটু ভেবে দেখেছিস? কাজের তাগিদে ওনারা বেশিভাগ সময় দেশের বাইরে থাকেন। ওনাদের জীবনযাত্রা আর লাইফস্টাইল সম্পূর্ণ আলাদা, এমনকি জুতো পরিষ্কার করার জন্যও আলাদা লোক রাখা হয়! আর আমরা মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ, তুই থাকিস পাবনা। একবারও ভাবিস না, ওনার সাথে তোর কোনো সমীকরণই মেলে না? মানলাম উপন্যাস পড়তে পড়তে তুই ওনাকে গল্পের নায়কের জায়গায় বসিয়ে ফেলেছিস। তোর মনে হচ্ছে কোনো একদিন অলৌকিকভাবে ওনার সাথে তোর দেখা হবে, কিন্তু এটা তোর ফিকশনাল ভাবনা! এসব চিন্তা তোকে বাস্তবে না রেখে অন্য দুনিয়ায় নিয়ে যাচ্ছে। এখনো সময় আছে, এসব উপন্যাস পড়া বন্ধ করে পড়ার টেবিলে বস।"
রাইসা সায় জানিয়ে বলল,
"ইফান একদম ঠিক বলেছে, পারিজা। উপন্যাস পড়ে সময় নষ্ট করে তুই গতবার চারটে সাবজেক্টে ফেল করেছিস!"
ফিহা ভয় দেখিয়ে বলল,
"এখনি শুধরে যা বোন। নইলে বাবা এসব জানতে পারলে কোনো প্রবাসী দেখে তোকে বিয়ে দিয়ে দিবে!"
মাহাম হেসে যোগ করল,
"তা আর বলতে! খালুজান যা রাগী মানুষ! শেষমেশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর স্বপ্ন দেখতে গিয়ে তোর কপালে না হাড়ি-পাতিল মাজা জোটে! তখন হাড়ি ঠেলতে ঠেলতে উপন্যাসের কথা ভাবিস, আর বাস্তবের জামাইয়ের লাথি খাস!"
এতক্ষণ ধরে মেজাজ আর ধৈর্য দুটিই চেপে রেখেছিল পারিজা। কিন্তু এবার আর পারলো না। চিৎকার করে সবাইকে শুনিয়ে বলে উঠলো,
"অনেক হয়েছে, আর না! যত ইচ্ছে মজা উড়িয়ে নে তোরা, তাতে সত্যটা তো আর বদলে যাবে না! ওই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আতিশ তালুকদারই আমার জামাই, এটা আল্লাহ সাক্ষী!"
পারিজার কথা শুনে ছাদে দ্বিতীয় দফায় হাসির রোল উঠলো। সবাই পারিজাকে আস্ত পাগল ছাড়া আর কিছুই ভাবলো না। তাদের মতে, উপন্যাস পড়তে পড়তে মেয়েটার বাস্তব আর কাল্পনিক দুনিয়ার ফিউশন ঘটে গেছে!
এভাবে অপমান সহ্য করা আর সম্ভব ছিল না। সপ্তদশী পারিজা গটগট করে ছাদ থেকে নেমে যেতে উদ্যত হতেই তার মা সোনিয়া বেগম সামনে এসে ডাক দিলেন,
"পারিজা শুন মা, তরকারিটা চুলায় বসিয়ে এসেছি। তোর খালা মালয়েশিয়া থেকে ফোন করেছে, দুই মিনিট কথা বলে আসি। তুই গিয়ে একটু তরকারিটা নেড়ে দে তো।"
বলতে বলতেই পারিজার হাতে খুন্তি ধরিয়ে দিয়ে ফোন কানে সোনিয়া বেগম রুমে চলে গেলেন। পারিজাকে কিছু বলার সুযোগো দিলেন না। পারিজার এই অসহায় অবস্থা দেখে ছাদে থাকা বোন আর কাজিনরা আবার উচ্চস্বরে হেসে উঠলো।
পারিজা কটমট চোখে সেদিকে তাকাল। সময় আসুক, একদিন ঠিক বুক ফুলিয়ে নিজের স্বামীকে নিয়ে এ বাড়িতে আসবে সে! সেদিন এই পরিবাই পারিজাকে রানীর মতো খাতির-যত্ন করবে। স্বামীকে ফিরে পাওয়ার আশায় প্রতিদিন মসজিদের দানবাক্সে পারিজার দুই টাকা করে মানত করা কি বৃথা যাবে? তা তো হতে পারে না!
তাছাড়া উপন্যাসে তো পারিজা পড়েছই-নায়িকা যত কঠিন পরিস্থিতিতেই পড়ুক না কেন, শেষমেশ তার নায়ক ঠিকই এসে তাকে উদ্ধার করে। ভেবেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনটাকে একটু ভালো করে নিচে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল সে।
দেখতে দেখতে আধঘণ্টা পার হয়ে গেল, অথচ সোনিয়া বেগমের 'দুই মিনিটের' ফোন কল আর শেষ হয় না! পারিজার তরকারি রান্না শেষ, এখন মাংস চড়ানোর পালা। মায়ের ওপর বেশ বিরক্ত হলো সে; মহিলা একবার কথা শুরু করলে থামার নামই থাকে না! বিরক্ত হয়ে মায়ের রুমের দিকে এগিয়ে গেল।গিয়ে দেখল, মা আলমারি খুলে বসে আছেন। একে একে নতুন সব থ্রিপিস ভিডিও কলে খালাকে দেখাচ্ছেন!
পারিজা রাগ সামলাতে না পেরে বলল,
"মা, তরকারি রান্না শেষ। মাংস রান্না বাকি,এসে করে নাও।"
সোনিয়া বেগম বোনকে জামা দেখানোতেই ব্যস্ত রইলেন। তড়িঘড়ি করে বললেন,
"পারিজা, মা আমার, যা তো তুই গিয়ে মাংসটা চুলায় দিয়ে একটু নেড়ে দে। আমি তোর খালার সাথে কথা বলে।এই আসছি।"
অগত্যা মহা বিরক্ত হয়ে আবার রান্নাঘরে ফিরে এল পারিজা। মাংসের কড়াইতে খুন্তি নাড়তে নাড়তেই মনের মধ্যে ভেসে উঠলো তার সেই অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়ের স্মৃতি। তিন বছর আগে কিভাবে গ্রামের মানুষ ভুল বুঝে সেদিন লোকটার সাথে তার বিয়েটা করিয়ে দিয়েছিল! পারিজা তখন বড্ড ছোট আর ভীতু ছিল, তাই ভয়ে লোকটাকে একলা ফেলে সেখান থেকে পালিয়ে এসেছিল। কে জানতো, তার কিছুদিন পর নিউজ ফিডে দেখতে পাবে লোকটা দেশের নবনির্বাচিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী! একদম পারিজার উপন্যাসের নায়কদের মতো রূপ আর ব্যক্তিত্ব!
আহা! সেই থেকে লোকটার প্রতি পারিজার এক অদ্ভুত দুর্বলতা কাজ করে। এই সত্যিটা সে কতবার তার পরিবারকে বলতে চেয়েছে, কিন্তু প্রতিবারই তারা হেসেই উড়িয়ে দিয়েছে। ওনাদের মতে পারিজা গল্প বানাতে ওস্তাদ!
ভাবনার জালে আটকে পড়া পারিজার ধ্যান ভাঙলো মাংস হালকা ধরে যাওয়ার পোড়া গন্ধে! পারিজা আঁতকে উঠলো। দ্রুত কিছুটা পানি ছিটিয়ে কড়াইয়ের তলা চাড়াতে চাড়াতে মনে মনে বিড়বিড় করে উঠলো,
"স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বউ হয়ে শেষমেশ আমাকে এসব রান্নাবান্নার মতো ডিসগাস্টিং কাজ করতে হচ্ছে!"
#সূচনা_পর্ব
#আতিশের_পারিজাত
#লেখনীতে_মেহজাবিন_নাদিয়া