ফন্ট সাইজ:
থিম:
আতিশের পারিজাত

২য় পর্ব

লেখক: মেহজাবিন নাদিয়া

#আতিশের_পারিজাত

#লেখনীতে_মেহজাবিন_নাদিয়া
পর্ব-২
হঠাৎ দরজায় পরপর কয়েকবার কলিংবেল বেজে উঠতেই।কে এসেছে দেখার জন্য,পারিজা চুলাটা একবারে কমিয়ে দিয়ে সেদিকে পা বাড়াল। কিন্তু দরজার কাছে পৌঁছানোর আগেই সোনিয়া বেগম হন্তদন্ত হয়ে মেয়ের সামনে এসে দাঁড়ালেন। উসখুস কণ্ঠে তাড়া দিয়ে বললেন,
"পারিজা, তুই সোজা ঘরে গিয়ে পড়তে বোস! তোর বাবা এসেছে। এখন তোকে পড়ার টেবিলে না দেখলে আবার তুলকালাম কাণ্ড বাঁধাবে।"
বাবা এসেছে কথাটা শুনতেই পারিজার পিঠের চামড়া শুঁটকি হয়ে গেল! আর এক মুহূর্তও দেরি না করে সে হনহনিয়ে নিজের রুমে গিয়ে পড়ার টেবিলে বসে বই খুলে পড়তে শুরু করলো।মেয়ে সরতেই সোনিয়া বেগম গিয়ে দরজা খুলে দিলেন। বাইরে পুলিশের ইউনিফর্মে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছেন পারিজার বাবা, আফজাল মাহমুদ। ঘরে প্রবেশ করেই তীক্ষ্ণ চোখে চারপাশটা একবার পরখ করে নিলেন তিনি। সোনিয়া বেগম শাড়ির আঁচল চেপে ধরে খানিকটা ভীত চোখে স্বামীর দিকে তাকালেন-কখন যে কোন খুঁত ধরে বসে লোকটা!
তবে আজ ভাগ্যবশত তেমন কিছু ঘটল না। সোফায় বসে আফজাল সাহেব স্ত্রীর কাছে এক গ্লাস পানি চাইলেন। সোনিয়া বেগম দ্রুত রান্নাঘর থেকে পানি এনে দিলে তিনি এক চুমুকে তা শেষ করে গ্লাসটা ফিরিয়ে দিলেন। এরপর থমথমে গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
"তোমার ছেলেমেয়েরা কোথায়? কাউকেই তো দেখছি না।"
সোনিয়া বেগম আমতা আমতা করে বললেন,
"সবাই পড়তে বসেছে। কোনো দরকার থাকলে ডেকে দিচ্ছি।"
আফজাল সাহেব হাত তুলে থামিয়ে বললেন,
"না, ডাকার দরকার নেই। পড়ছে পড়ুক, আমি নিজেই গিয়ে দেখে আসব।"
সোনিয়া বেগম খালি গ্লাসটা নিয়ে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াতেই পিছন থেকে আফজাল সাহেবের হাঁক আসল,
"তোমার বড় মেয়েকে বলে দিয়ো, কাল যেন অ্যাডমিশন পরীক্ষাটা মন দিয়ে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স না পেলে সমাজে আর মুখ দেখানো যাবে না।"
সোনিয়া বেগম এবার খানিকটা ক্ষুণ্ন হয়ে বললেন,
"আমাকে না বলে নিজের মেয়েকে গিয়ে বলুন! আপনার কথা অন্তত একটু গুরুত্ব দেবে। আমাকে তো কেউ গুনেই ধরে না।"
কথাটা শুনেই তেতে উঠলেন আফজাল সাহেব,
"গুনে ধরে না মানে কী? তুমি ওদের মা, তুমিই তো শেখাবে! তোমার এই ঢিলেমির কারণেই ছেলেমেয়েগুলোর আজ এই অবস্থা। পারিজা মেয়েটা আগে পড়াশোনায় কত ভালো ছিল! অথচ তুমি ওর হাতে ফোন তুলে দিয়ে সব নষ্ট করলে। সমাজে মুখ দেখাব কীভাবে, বলো তো? আমার মেয়ে পরপর চার সাবজেক্টে ফেল করেছে! ছিঃ!"
স্বামীর খোঁটা শুনে সোনিয়া বেগমও আর মেজাজ ধরে রাখতে পারলেন না,
"এতই যখন সমাজ সমাজ করেন, তবে সমাজের লোকদের এসে আপনার সংসার সামলাতে বলেন! আমি বাপের বাড়ি চলে যাচ্ছি!"
"বাপের বাড়ি চলে যাচ্ছি -এই একটা মুখস্থ ডায়লগ ছাড়া আর কিছু পারো তুমি? এতই যখন চাচ্ছো, তবে একদিন গিয়ে দেখাও!"
বলেই আফজাল সাহেব গটগট করে রুমের দিকে চলে গেলেন। সোনিয়া বেগম স্বামীর দিকে বিরবির করে তাকিয়ে গালমন্দ করতে করতে রান্নাঘরে ফিরে এলেন।
আফজল মাহমুদ।একজন সৎ ও দায়িত্ববান পুলিশ ইনস্পেক্টর। স্বভাবটা তাঁর একটু খুঁতখুঁতে; একুশ বছরের দাম্পত্য জীবনে স্ত্রী সোনিয়া বেগমের সাথে বাকবিতণ্ডা তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী।পাঁচ রুমের একটি ফ্ল্যাট কিনে পরিবার নিয়ে বাস করছেন তিনি পাবনায়। তাঁদের তিন সন্তান-বড় মেয়ে ফিহা তাবাসসুম, মেজো মেয়ে নিলীশা জাহান পারিজা এবং ছোট ছেলে মাহিন মাহমুদ, যে মাত্র নবম শ্রেণীতে পড়ে।মাহিন ঢাকাতে হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা করার ফলে,তার বাড়ি আসা খুব কম হয়।
একই ভবনের অন্য একটি ফ্ল্যাটে থাকে পারিজার বড় মামা ইকবাল হোসেন। তাঁর দুই জমজ সন্তান-রাইসা আর ইফান।দুজনেই পারিজার সমবয়সী। এ ছাড়া পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে মেঝো খালার মেয়ে মাহাম। পড়াশোনার সুবাদে পারিজাদের ফ্ল্যাটেই থাকে মাহাম। পারিজা এবার ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রী; মেয়েটা এমনিতে মেধা খারাপ ছিল না। কিন্তু ইদানীং উপন্যাসের কাল্পনিক জগতেই বেশি মগ্ন থাকে।তবে ফিহা মেয়েটা তার উল্টো।দিনরাত এক করে চেষ্টা করছে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের জায়গা সুনিশ্চিত করতে।
পড়ার টেবিলে বসে আছে পারিজা। সামনে খোলা হিসাববিজ্ঞান বই। কিন্তু বইয়ের দিকে তার মন নেই একটুও। পড়ার কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে বইয়ের পাশে ফোনটা লুকিয়ে রেখেছে। আজকে তার প্রিয় অনলাইন উপন্যাসের নতুন পর্ব এসেছে। গল্প পড়তে পড়তে বারবার হাসি ফুটছে ঠোঁটে।ঘরের দরজাটা হালকা ভেড়ানো ছিল। হঠাৎ করেই রুমে ঢুকলেন আফজল সাহেব। সারাদিন ডিউটি করে এসে ইউনিফর্ম বদলে সাধারণ জামা পরে আছেন।
বাবাকে দেখেই পারিজার বুক কেঁপে উঠল। তাড়াতাড়ি ফোনটা বইয়ের ভাঁজে ঢুকিয়ে বই নিয়ে বসে পড়ার ভান করল।আফজল সাহেব মেয়েকে মন দিয়ে পড়তে দেখে সন্তুষ্ট হলেন। আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে টেবিলের সামনে দাঁড়ালেন। বাবা কাছে আসতেই পারিজা ভয় লুকাতে আরও জোরে জোরে পড়তে লাগল।আফজল সাহেব একবার তীক্ষ্ণ চোখে মেয়ের দিকে তাকালেন।কিছুক্ষন চুপ থেকে তারপর গম্ভীর গলায় বললেন,  
"তোমার গত সপ্তাহে ক্লাস টেস্ট ছিল না? রেজাল্ট কী হলো? আমাকে দেখাও।"
বাবার কথা শুনে পারিজার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। মনে পড়ে গেল কয়েকদিন আগে সারপ্রাইজ টেস্ট হয়েছিল। রেজাল্ট খারাপ হওয়ায় ভয়ে সে কাউকে কিছু বলেনি। ভেবেছিল সবাই আস্তে আস্তে ভুলে যাবে। কিন্তু বাবা যে সব মনে রেখেছেন!তা পারিজা ভাবতে পারেনি হয়তো।
পারিজা কাঁপতে কাঁপতে বলল,  
"ইয়ে... মানে... বাবা আসলে..."
মেয়ের আমতা আমতা কথা শুনেই আফজল সাহেব বুঝে গেলেন রেজাল্ট খারাপ হয়েছে। রাগে তার চোখ লাল হয়ে গেল।বাবার রাগী চেহারা দেখে পারিজা ভয়ে কেঁদে ফেলল।  
"সরি বাবা! আমার ভুল হয়ে গেছে। আর কখনো এমন হবে না। পরের বার ভালো রেজাল্ট করব, সত্যি!"
কিন্তু আফজল সাহেব আর একটা কথাও শুনলেন না। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
পারিজা বুঝতে পারল এখন কী হবে। ভয়ে চিৎকার করে উঠল।একটু পরেই ড্রয়িংরুম থেকে ভেসে এল মায়ের চিৎকারের শব্দ। পারিজা দৌড়ে সেখানে গেল। গিয়ে দেখে আফজল সাহেবের হাতে একটা মোটা কালো রাবারের চাবুক। সোনিয়া বেগম দুই হাতে সেটা ধরে বলছেন,  
"ওকে মারবেন না! মেয়েটা বড় হয়েছে। দোহাই আপনার, ক্ষমা করে দিন!"
কিন্তু আফজল সাহেব স্ত্রীর কথা কানে নিলেন না। এক ধাক্কায় তাকে সরিয়ে দিলেন। তারপর দরজার কাছে দাঁড়ানো পারিজার দিকে এগিয়ে গেলেন। পারিজা প্রাণপণে দৌড় দিল। কিন্তু বাবা তাকে ধরে ফেললো।কিছু বুঝে উঠার আগেই। পারিজার শরীরে একের পর এক বাড়ি মারতে লাগলেন আফজল সাহেব।প্রতিটা আঘাতে পারিজার অন্তত আত্মা বেরিয়ে যায় যায় অবস্থা।সোনিয়া বেগম আবার দৌড়ে এসে মেয়েকে বাঁচাতে নিজের শরীর দিয়ে ঢাকলেন। কিন্তু আফজল সাহেব আজ থামছেনই না। পারিজা ব্যথায় চিৎকার করে বলতে লাগল,  
"বাবা! আর মেরো না... আমি মরে যাব!"
সোনিয়া বেগম কাঁদতে কাঁদতে স্বামীর হাত চেপে ধরলেন,  
"ওকে ছেড়ে দিন। মারবেন না আর। ওর ভালো রেজাল্টই তো চান? আমি কথা দিচ্ছি, পারিজা এখন থেকে দিনরাত পড়বে। ভালো রেজাল্ট করবে।"
আফজল সাহেব চিৎকার করে বললেন,  
"এই কথা আগে মনে ছিল না? এখন দায়িত্ব নিতে এসেছো?"
বাড়ির এত চিৎকার শুনে ছাদ থেকে দৌড়ে এল ফিহা, মাহাম, ইফান আর রাইসা। পাশের ফ্ল্যাট থেকে ইকবাল হোসেন ও তার স্ত্রী সুমা বেগমও ছুটে এলেন।ঘরে ঢুকেই ইকবাল হোসেন দেখলেন আফজল সাহেব মেয়েকে মারছেন। দেরি না করে তিনি চাবুকটা কেড়ে নিলেন।ফিহা, রাইসা, মাহাম, ইফান চারজন মিলে পারিজাকে ধরে রুমে নিয়ে গেল। মার খেয়ে খেয়ে পারিজার কান্নারও শক্তি নেই। সারা শরীর ব্যথা। ফিহা দৌড়ে গিয়ে ফ্রিজ থেকে আইসপ্যাক আনল। পারিজার পিঠে আর হাতে অনেক জায়গা ফুলে গেছে, কোথাও কোথাও কেটে রক্তও জমেছে।
এদিকে বাইরে ইকবাল হোসেন আর আফজল সাহেবের ঝগড়া শুরু হয়েছে।
ইকবাল হোসেন রাগে বললেন,  
"একটা টেস্টে রেজাল্ট খারাপ হয়েছে বলে মেয়েকে এভাবে মারবে? তুমি কেমন বাবা?"
আফজল সাহেব আরও রেগে বললেন,  
"আমি কেমন বাবা সেটা আপনাকে শেখাতে হবে না। আমার মেয়ে। আমার সংসার,আমি কি করব না করব।সেটা আমার ব্যাপার। কেউ এর মধ্যে কথা বলবে না।"
"সংসার?" ইকবাল হোসেন তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন।  
"যে সংসারে মেয়ের গায়ে দাগ বসে, সেটা সংসার না। ওটা জেলখানা।"
আফজল সাহেব আঙুল তুলে ইকবাল হোসেনকে দেখিয়ে বললেন,  
"আপনি বড় ভাই হয়ে সারাজীবন আমাকে জ্ঞান দিয়ে গেছেন। আমার মেয়ে পড়ায় ফাঁকি দেয়, দিনরাত ফোন টেপে, আর আপনি এসে বলেন আমি খারাপ বাবা?"
"ফোন টেপে তাই বলে মারবে?" 
সুমা বেগম এবার মুখ খুললেন।  
"মারধর করে কি পড়া হয় আফজল? ভালোবাসা দিয়ে বোঝাতে হয়।"
"আপনারা বুঝবেন না!" আফজল সাহেব গর্জে উঠলেন।  
"আমি সারাদিন ডিউটিতে থাকি।বাড়িতে আপনার বোন থাকে, সে বাচ্চাদের একটু শাসন করে না।উল্টো আরো তাদের তালে তাল মেলায়। মেয়েটা সারাদিন বই ফেলে ফোন নিয়ে বসে থাকে! ওর ভবিষ্যৎ কে দেখবে শুনি?"
ইকবাল হোসেন শান্ত গলায় বললেন,  
"ভবিষ্যৎ দেখার নামে তুমি ওর বর্তমানটাই নষ্ট করে দিচ্ছো। ভয়ে পড়লে মানুষ ভালো করে না আফজল।"
"আপনি আমার মেয়ের শিক্ষক না!আমার মেয়েকে আমি মানুষ করব। আপনার এতে নাক গলানোর দরকার নেই।আপনি তার মামা হন। মামা হয়েই থাকুন। পারলে নিজের বোনকে কিছু শিখান।"
পারিজা রুমের মধ্যে বসে বাইরে মামা আর বাবার ঝগড়া শুনছিল। বাবার বলা প্রত্যেকটা কথা তার বুকে তীরের ফলার মতো বিঁধছিল। মনে মনে পারিজা ঠিক করে নিল, সে এখন থেকে ভালোভাবে পড়াশোনা করবে; দেখিয়ে দেবে সবাইকে! আজ তার জন্যই তো এতো ঝামেলা হচ্ছে পরিবারে।
ফিহা আইসপ্যাক লাগানো শেষ করে সেটা রাইসার হাতে দিয়ে বলল, 
"এটা নিয়ে ফ্রিজে রেখে আয় রাইসা।"
রাইসা সেটাই করল-আইসপ্যাকটা নিয়ে ফ্রিজে রাখতে চলে গেল। মাহাম ততক্ষণে পারিজার ক্ষতস্থানে মলম লাগিয়ে দিয়েছে। ফিহা এবার পারিজার দিকে ঘুরে রাগী কণ্ঠে বলল, 
"এবার দেখলি তো, তোর কাল্পনিক চরিত্র তোকে কোথায় এনে দাঁড় করিয়েছে! এখনো সময় আছে পারিজা, বাবা কিন্তু বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। বাবা চুপ আছেন মানে তোর হাতে আরেকটা সুযোগ আছে। এবার সব ছেড়েছুড়ে শুধু পড়াশোনায় ফোকাস কর।"
ফিহার কথাগুলো শুনল পারিজা। চুপ থেকে শুধু মাথা নাড়ল। কিন্তু ফিহা তবুও নিশ্চিত হতে পারল না পারিজা আদেও মেনেছে কি না। তাই সে আবার জিজ্ঞেস করল, 
"আমি তোর মুখে শুনতে চাচ্ছি, পারিজা! দেখ, তোর ওইসব উপন্যাস পড়া টোটালি বন্ধ করতে হবে কিন্তু। আর ওই বাদ বাকি মন্ত্রীকে নিয়ে তোর মিথ্যা বিয়ের বানোয়াট গল্প বলা বন্ধ কর। দেখ, ক্রাশ সবারই থাকে-কার না থাকে? আমারও তো কত নায়ককে ভালো লাগে! ঠিক তেমনি তোরও হয়তো মন্ত্রীকে ভালো লাগা থেকে এসব বলিস। কিন্তু এখন থেকে আর কোনো মজা নয়, সিরিয়াস হ এবার।"
পারিজা ফিহার সব কথা মেনে নিলেও কেন যেন বারবার তার সত্যি বিয়েটাকে নিয়ে এভাবে মজা করা সহ্য হলো না। ওই অবস্থাতেই শরীরটা ঝাঁকিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলে উঠল, 
"তোদের সমস্যাটা কী? কেন বারবার আমার সত্যিকারের বিয়েটাকে মিথ্যা বানাতে চাইছিস? আমি তোদের মিথ্যা বলছি না, সত্যিই মন্ত্রীর সাথে আমার বিয়ে হয়েছিল! তোদের দিব্যি!"
পারিজার কথা শুনে মাহাম হতাশ হয়ে ফিহার উদ্দেশ্যে বলল, 
"একে কিছু বুঝিয়ে লাভ নেই ফিহা। মাঝখান থেকে আমাদের টাইম ওয়েস্ট হচ্ছে শুধু শুধু। এ মেয়ে শুধরানোর মতো নয়।"
পারিজা আরও তেতে উঠে বলল, 
"তোর যা ইচ্ছে বল আপু! তোদের কথায় তো আর আমার বিয়েটা মিথ্যে হয়ে যাচ্ছে না।"
ইফান এতক্ষণ দাঁড়িয়ে সকলের কথা শুনছিল। এবার সে মুখ খুলল, 
"ফিহা আর মাহাম আপু, তোরা দুজন কি পাগল হয়েছিস? এই হাফমেন্টালের সাথে কোনো যুক্তিতেই পারবি না। একে এর মন্ত্রী নিয়েই থাকতে দে! বরং আমরাই এখান থেকে চলে যাই।"
ফিহা হাতের ইশারায় তাকে থামিয়ে বলল, 
"দাড়া, এক মিনিট।" 
তারপর পারিজার দিকে তাকিয়ে বলল, 
"দেখ, কাল আমার অ্যাডমিশন পরীক্ষা। আজ রাতেই আমি ঢাকা যাচ্ছি। তুই চাইলে আমার সাথে যেতে পারিস। আমার মনে হয় বাড়িতে থেকে থেকে একঘেয়ে হয়ে যাওয়ার ফলেই তোর মাথায় এতো সব কল্পনা ঘুরে বেড়াচ্ছে।কোথা থেকে ঘুরে আসলে কিছুটা বেটার ফিল করবি। কি বলিস যাবি আমার সাথে।"
ফিহার দেওয়া প্রস্তাবে পারিজা কিছুক্ষণ চুপ থাকল। পরক্ষণেই কী যেন ভেবে রাজি হয়ে গেল, 
"আমি তোর সাথে ঢাকা যাব আপু।"
"ঠিক আছে, তাহলে রাত দেড়টার মধ্যে তৈরি হয়ে নিস। এখান থেকে সোজা বাসে করে যাব। আমার সাথে রুবিও যাচ্ছে, ওকে বলে তোর জন্যও একটা টিকিটের ব্যবস্থা করছি।"
এটুকু বলেই ফিহা রুম থেকে বেরিয়ে এল।
ফিহা বের হতেই মাহাম ও ইফান বের হওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়াল। যাওয়ার আগে মাহাম পারিজাকে বলে গেল, 
"তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে রেডি হয়ে নে। যা হওয়ার হয়েছে, এসব নিয়ে আর মন খারাপ করিস না।" বলেই মাহাম বেরিয়ে গেল।
ইফান যাওয়ার আগে কী যেন মনে করে পিছু ফিরে এসে দাঁড়াল। তারপর বলল, 
"ওহ, তোকে একটা কথা বলার ছিল! 
পারিজা ভ্রু উচিয়ে জিজ্ঞেস করলো।
"কি? কথা বল!"
"দেখ পারিজা। তোর এসব কাল্পনিক জামাইয়ের চিন্তা বাদ দিয়ে দে, কারণ তোর কপালে আমি ইফানই শেষমেশ জুটবো। সো শুধু শুধু অন্য ব্যাডাকে নিয়ে ভেবে মাথার ঘিলু নষ্ট করিস না আর।"
ইফানের কথা শুনে রেগে আগুন হয়ে গেল পারিজা। খাট থেকে বালিশটা তুলে ছুড়ে মারল তার দিকে। ইফান মুখ ভেঙচে বেরিয়ে গেল। পারিজা তার উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলে উঠল, 
"ইফানের বাচ্চা! হাতের কাছে পেলে তোর মুণ্ডু ফাটাব আমি!"
°°
রাতের বাস। সবকিছু গোছগাছ করে একদম রেডি হয়ে নিল ফিহা। এখন প্রায় একটা পনেরো বাজে; আর কিছুক্ষণ পরেই তারা রওনা হবে। বাস স্টেশন এখান থেকে খুব বেশি একটা দূরে নয়। রুবিকে আগে থেকেই বলা রাখা হয়েছে-মেয়েটা বাসার নিচে এসে পৌঁছালে কল করবে বলে জানিয়েছে। রুবি ফিহার একমাত্র বেস্ট ফ্রেন্ড, দুজনেই একই সাথে পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে।
ইতিমধ্যেই ফিহার সবকিছু গোছানো শেষ। নিজেও সুন্দর করে রেডি হয়ে নিয়েছে মেয়েটা। পারিজা রেডি হয়েছে কিনা দেখার জন্য সে রুম ছেড়ে বের হলো। যাওয়ার আগে পড়ার টেবিলে পড়তে বসা মাহামের উদ্দেশ্যে বলল, 
"আপু, আমাকে তোর বানানো কিছু ইম্পরট্যান্ট নোটস দিয়ে দিস তো, গাড়িতে বসে যেন পড়তে পারি।পারিজা রেডি হয়েছে কিনা দেখে আসি আমি।"
মাহাম জবাবে বলল, 
"তুই যা, আমি নোটস তোর ব্যাগে ঢুকিয়ে দিচ্ছি।"
ফিহা রুম ছেড়ে বেরিয়ে এলো। এদিকে পারিজা রুমে বসে নিজেকে সাজাতে ব্যস্ত! এমনিতেই মেয়েটা সুন্দর, তার ওপর মুখে ভারী মেকআপ মেখে মুখটাকে যেন সাদা ভূত বানাচ্ছে। পেছন থেকে ফিহা এসে এসব দেখে অবাক হয়ে বলে উঠল, 
"এসব কী করছিস পারিজা? আমরা পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি, কোনো বিয়েবাড়িতে নয়!"
পারিজা নির্বিকার ভঙ্গিতে মুখে মেকআপ ঘষতে ঘষতে বলল, 
"তো কী হয়েছে? তোর পরীক্ষা, সেটা তোর সমস্যা! আমাকে কেন টানছিস? তাছাড়া বুঝিসই তো, তোর বোন তার জামাইয়ের সাথে প্রথমবার দেখা করতে যাচ্ছে!"
ফিহা অবাক হলো। জিজ্ঞেস করল, 
"জামাইয়ের সাথে প্রথম দেখা মানে কী? দেখ পারিজা, আমাকে রাগাবি না বলে দিচ্ছি!"
"আশ্চর্য! আমি তোকে কোথায় রাগালাম? তুই নিজেই তো আমার রাজকপাল দেখে জ্বলছিস। বুঝি বুঝি, সব বুঝি!আমার জামাই মন্ত্রী কি না, তাই!"
ফিহা নিজের মাথায় হাত চেপে ধরল। পারিজার সাথে কথা বলতে গেলেই তার মাথা গরম হয়ে যায়। মেয়েটা কী যে বলছে, আদৌ নিজে তা জানে কিনা সন্দেহ! এর মধ্যে কিছুক্ষণ আগেই এত বড় একটা ঝরঝাপটা ঘটে যাওয়ার পরও পারিজার কাছ থেকে এমন ব্যবহার ফিহা মোটেও আশা করেনি।রাগ সামলে ফিহা বলল, 
"আচ্ছা পারিজা, তোর মধ্যে আল্লাহ কিঞ্চিৎ লজ্জাবোধও দেননি? এই মাত্র বাবার কাছ থেকে এত মার খেয়েও তোর শিক্ষা হলো না? আবার সেই সব কাল্পনিক চিন্তাভাবনা নিয়ে পড়ে আছিস!"
পারিজার মেকআপ করা প্রায় শেষ। কোমর সমান কোঁকড়ানো চুলগুলো সুন্দর করে বেণি করে থ্রিপিসের ওড়নাটা গায়ে সেট করে নিল। ফিহা যে তাকে এতগুলো কথা বলল, তা যেন সে কানেই তুলল না! ফিহা হতাশার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
ঠিক এমন সময় রুমে এলেন সোনিয়া বেগম। আফজল সাহেব এখন ঘুমাচ্ছেন, আর সেই সুযোগেই তিনি এখানে এসেছেন। এসে দেখলেন দুই মেয়েই যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে আছে। সোনিয়া বেগম ফিহার হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে বললেন, 
"এই টাকাগুলো নিজের কাছে রাখ। প্রয়োজন পড়লে খরচ করবি। আর পারিজা যা খেতে চায়, ওকে কিনে খাওয়াবি।"
ফিহা মায়ের কথায় মাথা নেড়ে সায় দিল। সোনিয়া বেগম পরম স্নেহে দুই মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। তিনি বের হতেই ফিহার ফোনে রুবির কল এলো। রুবি জানাল সে তাদের বাড়ির নিচে দাঁড়িয়ে আছে। ফিহা কল কেটে দ্রুত পারিজাকে তাড়া দিয়ে বলল, 
"জলদি বের হ পারিজা! রুবি চলে এসেছে, আমাদের এখনই বের হতে হবে।"
পারিজা ঝটপট জুতোদুটো পায়ে গলে নিল। ফিহা রুম থেকে প্রয়োজনীয় সবকিছু ব্যাগে পুরে বাইরে বেরিয়ে এলো। দুজনে একসাথে বাড়ি থেকে বের হলো। বের হওয়ার সময় সোনিয়া বেগমকে ভেতর থেকে দরজাটা লাগিয়ে দিতে বলে তারা নিচে নেমে এলো।
#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন