পুতুল বউ
পর্ব—৩
সকালটা ছিল শান্ত।
কুমিল্লার আকাশে তখনও পুরোপুরি রোদ ওঠেনি। পাখির ডাক আর মসজিদ থেকে ভেসে আসা আজানের শব্দে ফারিয়ার ঘুম ভাঙল।
ঘুম থেকে উঠে ফারিয়া ওযু করে নামাজ পড়ল। নামাজ শেষে কিছুক্ষণ জায়নামাজে বসে দোয়া করল।
তারপর জানালার পর্দা সরাতেই সকালের মিষ্টি বাতাস এসে তার মুখে লাগল।
ফারিয়ার ঘরের সামনে ছোট্ট একটা বাগান ছিল। বাগানটা ছিল তার সবচেয়ে প্রিয় জায়গাগুলোর একটি।
গোলাপ, জুঁই, বেলি, রজনীগন্ধা আর গাঁদা—নানা রকম ফুলে ভরা ছিল বাগানটা।
ফুলের প্রতি ফারিয়ার ভালোবাসা ছিল ছোটবেলা থেকেই।
প্রতিদিন সকালে গাছগুলোর কাছে গিয়ে একটু সময় না কাটালে তার দিনটাই যেন অসম্পূর্ণ লাগত।
আজও সে একটা গোলাপের গাছের কাছে গিয়ে পাতাগুলো ছুঁয়ে দেখছিল।
হঠাৎ পায়ের কাছে একটা ছোট্ট বিড়াল এসে মিউ মিউ করল।
ফারিয়া নিচু হয়ে বিড়ালটাকে কোলে তুলে নিল।
—“আবার এসেছিস?”
বিড়ালটা মিউ করে তার গায়ে মুখ ঘষল।
ফারিয়া হেসে বলল,
—“তুই তো আমার চেয়েও বেশি আদুরে হয়ে গেছিস।”
বিড়ালটাকে কিছুক্ষণ আদর করে সে আবার গাছগুলোর দিকে তাকাল।
তারপর একটা ফুলের গন্ধ নিয়ে মৃদু হাসল।
ঠিক তখনই ভেতর থেকে সালমার ডাক এলো—
—“ফারিয়া! নাস্তা করতে আয় মা।”
—“আসছি আম্মু!”
ফারিয়া বিড়ালটাকে নিচে নামিয়ে ঘরে চলে গেল।
---
ফারিয়ার চেহারা
ফারিয়া দেখতে ছিল ভীষণ মায়াবতী।
তার গায়ের রং ছিল উজ্জ্বল ও স্বাভাবিকভাবে সুন্দর। মুখে সবসময় একটা মিষ্টি ভাব লেগে থাকত।
তবে তার সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ত টানা টানা সুন্দর চোখ দুটো।
চোখ দুটোতে একসঙ্গে মায়া আর দুষ্টুমি—দুটোই ছিল।
আর ফারিয়ার সবচেয়ে পরিচিত বৈশিষ্ট্য ছিল তার চুল।
ছোটবেলা থেকেই তার চুল ছিল অসম্ভব লম্বা ও ঘন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চুল আরও বেড়ে কোমর ছাড়িয়ে অনেকটা নিচে নেমে এসেছিল।
কালো, ঘন চুলগুলো সে সবসময় দুই ভাগ করে সুন্দর করে দুইটা লম্বা বেনুনি করে রাখত।
এই লম্বা বেনুনি নিয়ে জাহিদের ছোটবেলার দুষ্টুমির শেষ ছিল না।
---
ছোটবেলার স্মৃতি
ছোট্ট ফারিয়া উঠানে বসে পুতুল নিয়ে খেলত।
জাহিদ একটু দূরে দাঁড়িয়ে সুযোগ খুঁজত।
হঠাৎ পেছন থেকে এসে তার একটা বেনুনিতে লাট দিয়ে হালকা করে দোর মেরে দৌড়ে পালাত।
—“জাহিদ!”
ফারিয়া রাগে চিৎকার করে উঠত।
—“দাঁড়া! তোকে আজ আমি ধরব!”
জাহিদ দূরে দাঁড়িয়ে হাসত।
—“আগে ধর, তারপর কথা বলিস!”
ফারিয়া দুই বেনুনি দুলিয়ে তার পেছনে ছুটত।
কখনো জাহিদ ধরা পড়ত।
আর ধরা পড়লেই ফারিয়া তার হাতে ছোট্ট একটা চিমটি কেটে বলত,
—“আর আমার চুলে হাত দিবি?”
জাহিদ হাসতে হাসতে বলত,
—“দেব!”
—“জাহিদ!”
আবার শুরু হয়ে যেত দুজনের ঝগড়া।
সেই সময় এসব ছিল নিছক ছোটবেলার দুষ্টুমি।
কিন্তু সেই দুষ্টুমিগুলোই একদিন তাদের জীবনের সবচেয়ে মধুর স্মৃতি হয়ে থাকবে—তা তারা কেউ জানত না।
---
নাস্তার টেবিলে
ফারিয়া চুল দুই বেনুনি করে নাস্তার টেবিলে এসে বসল।
সালমা মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“এত লম্বা চুল নিয়ে প্রতিদিন দুইটা বেনুনি করতে তোর কষ্ট হয় না?”
ফারিয়া হাসল।
—“না আম্মু। আমার তো ভালোই লাগে।”
—“চুল কাটবি না কখনো?”
ফারিয়া সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
—“একদম না!”
সালমা হেসে বললেন,
—“আচ্ছা, রাখ।”
ফারিয়া নাস্তা শেষ করে স্কুলের ব্যাগ নিল।
মাকে সালাম আদর করে স্কুলের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল।
---
স্কুলে ফারিয়া
স্কুলের গেটের কাছেই অনামিকা আর নিহা দাঁড়িয়ে ছিল।
ফারিয়াকে দেখেই অনামিকা বলল,
—“এই যে লম্বা বেনুনির রানী!”
ফারিয়া হেসে বলল,
—“চুপ কর!”
নিহা তার চুলের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“তোর চুল দিন দিন আরও লম্বা হচ্ছে।”
ফারিয়া চুলের বেনুনি হাতে নিয়ে বলল,
—“আমার চুল অনেক পছন্দ।”
অনামিকা মজা করে বলল,
—“ফুল পছন্দ, বিড়াল পছন্দ, লম্বা চুল পছন্দ—তোর পছন্দের তালিকা অনেক বড়।”
ফারিয়া হেসে বলল,
—“তোদের জন্যও একটা তালিকা বানাব।”
তিনজন হাসতে হাসতে ক্লাসে চলে গেল।
---
অন্যদিকে জাহিদের স্কুল
ঢাকার একটি নামী স্কুলে তখন টিফিনের সময়।
জাহিদ মাঠের এক পাশে সাওন আর সাব্বিরের সঙ্গে বসে আড্ডা দিচ্ছিল।
সাওন বলল,
—“দোস্ত, আজকে তুই এত চুপচাপ কেন?”
জাহিদ বলল,
—“আমি চুপচাপ কোথায়?”
সাব্বির হেসে বলল,
—“তুই যখন বেশি চুপ থাকিস, তখনই বুঝি তোর মাথায় কোনো একটা কাহিনি চলছে।”
সাওন বলল,
—“ফারিয়ার কাহিনি?”
জাহিদ চোখ রাঙিয়ে তাকাল।
—“তোরা আবার শুরু করেছিস?”
তিনজন হাসতে লাগল।
ঠিক তখনই মাঠের পাশ দিয়ে একটা মেয়ে হেঁটে গেল।
মেয়েটার চুল অনেক লম্বা।
দুই পাশে সুন্দর করে দুইটা বেনুনি করা।
জাহিদের চোখ হঠাৎ মেয়েটার চুলের দিকে আটকে গেল।
মুহূর্তেই তার চোখের সামনে ভেসে উঠল ছোট্ট ফারিয়া।
দুইটা লম্বা বেনুনি।
হাতে পুতুল।
আর জাহিদের হাতে সেই লাট।
সে মুচকি হেসে ফেলল।
সাব্বির বলল,
—“কী হলো?”
জাহিদ ধীরে ধীরে বলল,
—“কিছু না।”
সাওন বলল,
—“ফারিয়ার কথা মনে পড়েছে, তাই না?”
জাহিদ এবার আর অস্বীকার করল না।
শুধু মৃদু হেসে বলল,
—“অনেক বছর হয়ে গেল।”
---
খান বাড়িতে বিবাহবার্ষিকীর আয়োজন
এদিকে ঢাকার খান বাড়িতে সেদিন বেশ ব্যস্ততা।
নাহিদ খান ও তাহমিনা খানের বিবাহবার্ষিকী।
খান বাড়িতে ছোটখাটো একটা আয়োজন করা হয়েছে।
সকালে থেকেই বাড়ির সবাই ব্যস্ত।
নাসরিন সুলতানা খান কাজ কতো দুর হলো দেখছেন।
জফিরা খান আর মিথিলা খান অতিথিদের জন্য কী কী করা হবে, সেটা নিয়ে আলোচনা করছেন।
রাফিদ, মেহরিন, রায়ান, নাওরিন আর জারিন সবাই মিলে ঘর সাজাচ্ছে।
জাহিদও তাদের সঙ্গে ছিল।
মেহরিন একটা ফুলের মালা হাতে নিয়ে বলল,
—“জাহিদ, এটা একটু উপরে লাগিয়ে দে।”
জাহিদ বলল,
—“আমি একা কেন?”
রায়ান হেসে বলল,
—“তুই তো সবচেয়ে লম্বা।”
জাহিদ অনিচ্ছা সত্ত্বেও মালাটা নিয়ে সাজাতে লাগল।
জারিন তখন হঠাৎ বলল,
—“ভাইয়া, কালকে কিন্তু ফারিয়া আপুরা আসবে!”
জাহিদের হাত থেমে গেল।
সে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বলল,
—“আসবে?”
জারিন বলল,
—“হ্যাঁ। আম্মু তো বলেছে।”
জাহিদের মুখে অজান্তেই হালকা হাসি ফুটে উঠল।
সাওন আর সাব্বির তখনও বাড়িতে ছিল।
সাওন সঙ্গে সঙ্গে জাহিদের কানে কানে বলল,
—“ওহ! তাই বলি, আজকে এত খুশি কেন!”
জাহিদ ধমক দিয়ে বলল,
—“চুপ কর।”
সাব্বির হেসে বলল,
—“ফারিয়া আসছে শুনে তো মুখে হাসি থামছেই না।”
জাহিদ কিছু বলল না।
কিন্তু তার ভেতরে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছিল।
---
কুমিল্লায় ফারিয়া
অন্যদিকে ফারিয়াও জানত কালকে খান বাড়িতে অনুষ্ঠান।
সকাল থেকে তার মনটা ভালো ছিল।
অনেকদিন পর নানু-নানা আর মামাতো ভাই-বোনদের দেখতে যাবে—এই ভেবেই সে খুশি।
স্কুল থেকে ফিরে অনামিকা আর নিহাকে বলল,
—“আজ কিন্তু আমি ঢাকায় যাব।”
অনামিকা বলল,
—“ওহ! তাহলে জাহিদ ভাইয়ার সঙ্গে দেখা হবে!”
ফারিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“আবার শুরু করলি?”
নিহা হেসে বলল,
—“তোর মুখ দেখলেই বোঝা যায় তুই খুশি।”
ফারিয়া কিছু বলল না।
শুধু মুচকি হাসল।
---
বৃষ্টিতে ভেজা
পরদিন স্কুল ছুটির পর অনামিকা আর নিহার সঙ্গে বাইরে বের হলো ফারিয়া।
আকাশ তখন পরিষ্কার ছিল।
তিন বান্ধবী গল্প করতে করতে হাঁটছিল।
হঠাৎ কিছু বুঝে ওঠার আগেই আকাশ কালো হয়ে গেল।
নিহা বলল,
—“বৃষ্টি আসবে মনে হয়!”
অনামিকা বলল,
—“চল, তাড়াতাড়ি যাই।”
কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল।
তিনজনই দৌড় দিল।
কিন্তু ততক্ষণে তারা ভিজে একাকার।
ফারিয়ার কোমর ছাড়ানো লম্বা দুই বেনুনি পানিতে ভিজে পিঠের সঙ্গে লেপ্টে গেল।
অনামিকা হেসে বলল,
—“আজকে তো আমরা শেষ!”
ফারিয়াও হেসে ফেলল।
কিন্তু সেই হাসি বেশিক্ষণ থাকল না।
বাড়ি ফেরার পর রাতেই ফারিয়ার জ্বর চলে এলো।
সালমা মেয়ের কপালে হাত রেখে চিন্তিত হয়ে বললেন,
—“এত বৃষ্টিতে ভিজতে কে বলেছিল?”
ফারিয়া দুর্বল গলায় বলল,
—“আম্মু, আমি তো ইচ্ছা করে ভিজিনি।”
সালমা বললেন,
—“এখন আর কোথাও যাওয়া হবে না।”
ফারিয়ার চোখ সঙ্গে সঙ্গে মন খারাপ হয়ে গেল।
—“কিন্তু আম্মু... আজ তো নাহিদ মামার বিবাহবার্ষিকী। আমি নানু-নানুকে দেখতে চেয়েছিলাম।”
সালমা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে বললেন,
—“জানি মা। কিন্তু এই অবস্থায় তোকে নিয়ে ঢাকায় যাওয়া সম্ভব না।”
ফারিয়া চুপ করে গেল।
তার খুব ইচ্ছে ছিল খান বাড়িতে যাওয়ার।
কিন্তু জ্বরের কারণে সে আর যেতে পারল না।
---
খান বাড়িতে অপেক্ষা
সন্ধ্যার পর খান বাড়িতে অনুষ্ঠান শুরু হলো।
বাড়ি আলোয় ঝলমল করছে।
সবাই এসেছে।
শুধু একজন নেই—
ফারিয়া।
জাহিদ বারবার অজান্তেই গেটের দিকে তাকাচ্ছিল।
সাওন সেটা লক্ষ্য করে বলল,
—“কাকে খুঁজছিস?”
—“কাউকে না।”
সাব্বির হেসে বলল,
—“ফারিয়া আসেনি, তাই মন খারাপ?”
জাহিদ একটু চুপ করে থেকে বলল,
—“ওর আসার কথা ছিল।”
ঠিক তখন জারিন এসে বলল,
—“ভাইয়া, ফারিয়া আপু নাকি জ্বরে পড়েছে। তাই আসতে পারেনি।”
জাহিদের মুখটা মুহূর্তেই মলিন হয়ে গেল।
—“জ্বর?”
জারিন মাথা নাড়ল।
—“হ্যাঁ।”
জাহিদ আর কিছু বলল না।
তার মনে শুধু একটা কথাই ঘুরতে লাগল—
“ফারিয়া আসতে চেয়েও আসতে পারল না।”
---
সেই রাত
খান বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে জাহিদ আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল।
সাওন আর সাব্বির পাশে এসে দাঁড়াল।
সাওন বলল,
—“দোস্ত, এত মন খারাপ করিস না।”
জাহিদ মৃদু হেসে বলল,
—“মন খারাপ করছি না।”
সাব্বির বলল,
—“তোর চোখ কিন্তু অন্য কথা বলছে।”
জাহিদ চুপ করে রইল।
তার মনে পড়ে গেল সেই ছোট্ট মেয়েটার কথা।
দুইটা লম্বা বেনুনি।
পুতুল হাতে নিয়ে দৌড়ানো।
আর তার ওপর রাগ করা।
সে আস্তে করে বলল,
—“অনেক বছর হয়ে গেল... তবুও কেন জানি মনে হয়, ওকে আবার একবার দেখলে ভালো লাগত।”
কিন্তু জাহিদ জানত না—
এই দেখা আজ হলো না ঠিকই।
তবে ভাগ্য তাদের জন্য আরও বড় একটা দেখা জমিয়ে রেখেছে।
সেই দিনই বহু বছর পর জাহিদ আর ফারিয়া সত্যিকারের মুখোমুখি হবে।
আর সেই দেখা থেকেই শুরু হবে তাদের জীবনের নতুন অধ্যায়।
চলবে…