পুতুল বউ
পর্ব—৪
কুমিল্লার বাড়িতে তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে।
আকাশে মেঘ জমে আছে। মাঝে মাঝে হালকা বাতাস জানালার পর্দা উড়িয়ে দিচ্ছে।
ফারিয়া বিছানায় শুয়ে আছে। জ্বরের কারণে শরীরটা দুর্বল হয়ে গেছে। কপালে এখনও হালকা জ্বর।
সালমা মেয়ের পাশে বসে কপালে হাত রাখলেন।
—“এখন কেমন লাগছে মা?”
ফারিয়া চোখ মেলে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
—“একটু ভালো লাগছে আম্মু।”
সালমা মেয়ের চুলে হাত বুলিয়ে বললেন,
—“আজকে তোকে নিয়ে খান বাড়িতে যাওয়ার কত ইচ্ছে ছিল।”
ফারিয়া একটু মন খারাপ করে বলল,
—“আমারও যেতে ইচ্ছে করছিল আম্মু। অনেকদিন পর সবাইকে দেখতে পারতাম।”
সালমা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—“জানি মা। কিন্তু তোর এই শরীর নিয়ে তোকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব না।”
ফারিয়া চুপ করে গেল।
তার মনে পড়ে গেল নানু-নানু, মামা-মামি, ভাই-বোনদের কথা।
আর অজান্তেই একজনের কথা মনে পড়ল—
জাহিদ।
অনেক বছর পর তাকে দেখার একটা অদ্ভুত ইচ্ছা হয়েছিল ফারিয়ার।
কিন্তু জ্বর এসে সবকিছু নষ্ট করে দিল।
---
নিলিমার ফোন
ঠিক তখনই সালমার ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে নাম দেখে সালমার মুখে হাসি ফুটল।
নিলিমা।
নিলিমা ছিল সালমার বহু বছরের সবচেয়ে কাছের বান্ধবী।
দুজনের বন্ধুত্ব এতটাই গভীর যে একজনের বাড়িতে কোনো সমস্যা হলে অন্যজনকে আলাদা করে বলতে হতো না।
সালমা ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে নিলিমা বললেন,
—“সালমা, তুই কি আজ খান বাড়িতে যাচ্ছিস?”
—“হ্যাঁ রে। কিন্তু ফারিয়াকে নিয়ে চিন্তায় আছি।”
—“কেন?”
—“ওর জ্বর হয়েছে। এই অবস্থায় তো আর নিয়ে যেতে পারি না।”
নিলিমা সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
—“তুই একদম চিন্তা করবি না। নিহা আর অনামিকাকে আমি তোদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিচ্ছি। ওরা আজ ফারিয়ার সঙ্গেই থাকবে।”
সালমা একটু স্বস্তি পেলেন।
—“সত্যি পাঠাবি?”
—“হ্যাঁ। তিন বান্ধবী একসঙ্গে থাকলে ফারিয়ার মনটাও ভালো থাকবে।”
সালমা মুচকি হেসে বললেন,
—“তুই না থাকলে আমি কী করতাম বল তো?”
নিলিমা হেসে বললেন,
—“বন্ধুত্বের আবার হিসাব আছে নাকি?”
দুজনেই হেসে উঠলেন।
---
ফারিয়ার বাড়িতে নিহা আর অনামিকা
কিছুক্ষণ পর নিহা আর অনামিকা ব্যাগ নিয়ে ফারিয়াদের বাড়িতে এসে পৌঁছাল।
ঘরে ঢুকেই নিহা বলল,
—“এই যে আমাদের রোগী সাহেবা!”
ফারিয়া মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—“আমাকে রোগী বলবি না।”
অনামিকা হেসে তার পাশে বসে বলল,
—“রোগী না হলে জ্বর হলো কীভাবে?”
—“জানি না।”
নিহা বলল,
—“আজকে কিন্তু আমরা এখানেই থাকব।”
ফারিয়া অবাক হয়ে তাকাল।
—“সত্যি?”
—“হ্যাঁ।”
অনামিকা বলল,
—“তুই একা থাকবি আর আমরা বাড়িতে চলে যাব—এটা হয় নাকি?”
ফারিয়ার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
—“তাহলে ভালোই হলো।”
ঠিক তখন করিমের মা ঘরে ঢুকলেন।
হাতে ছিল ওষুধ আর পানি।
—“মা, ওষুধ খাওয়ার সময় হয়েছে।”
ফারিয়া উঠে বসে ওষুধ খেয়ে নিল।
করিমের মা বললেন,
—“আর একটু পর স্যুপ করে দিচ্ছি। জ্বরের সময় ভারী কিছু খাবি না।”
—“আচ্ছা করিমের মা।”
করিমের মা ফারিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
---
সালমার বিদায়
সালমা মেয়ের পাশে এসে বসলেন।
—“মা, আমি তাহলে যাই।”
ফারিয়া মায়ের হাত ধরে বলল,
—“আম্মু, নানুকে আমার সালাম দিও।”
—“অবশ্যই।”
—“আর নানুকেও বলো, আমি ভালো হলে যাব।”
সালমা হেসে বললেন,
—“বলব।”
নিহা বলল,
—“খালা, আপনি নিশ্চিন্তে যান। আমরা আছি।”
অনামিকা বলল,
—“ফারিয়াকে আমরা ঠিকমতো দেখব।”
সালমা মুচকি হেসে বললেন,
—“তোমাদের ওপর আমার ভরসা আছে।”
তারপর মেয়ের কপালে চুমু দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
গাড়িতে ওঠার আগে একবার পেছন ফিরে বাড়িটার দিকে তাকালেন।
তারপর গাড়ি ধীরে ধীরে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
---
খান বাড়ি
অনেক বছর পর নিজের মায়ের বাড়িতে ফিরছিলেন সালমা।
খান বাড়ির সামনে গাড়ি থামতেই তার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
একসময় এই বাড়িতেই তার শৈশব কেটেছে।
আজ এত বছর পর আবার সেই পরিচিত গেট, সেই বিশাল উঠান, সেই পুরোনো দালান—সবকিছু দেখে তার চোখে যেন পুরোনো দিনের ছবি ভেসে উঠল।
গাড়ি থেকে নামতেই সামনে নাসরিন সুলতানা খান।
মেয়েকে দেখেই তিনি এগিয়ে এলেন।
—“সালমা!”
সালমা মাকে দেখেই এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলেন।
—“আম্মু!”
নাসরিন মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
—“কত বছর পর আমার মেয়েটা আমার বাড়িতে এলো!”
সালমার চোখ ভিজে উঠল।
—“আম্মু, আপনাদের অনেক মনে পড়ত।”
নাসরিন বললেন,
—“আমাদেরও তোকে অনেক মনে পড়ত। আর আমার নাতনিটা কোথায়?”
সালমা একটু মন খারাপ করে বললেন,
—“ফারিয়ার জ্বর হয়েছে আম্মু। তাই ওকে বাড়িতে রেখে এসেছি।”
নাসরিনের মুখটা সঙ্গে সঙ্গে চিন্তিত হয়ে গেল।
—“জ্বর? এখন কেমন আছে?”
—“একটু ভালো আছে। নিলিমা আছে, নিহা আর অনামিকাও ওর সঙ্গে আছে। করিমের মা-ও আছে।”
নাসরিন বললেন,
—“ঠিক আছে। তবে সকালে আমাকে ফোন করে খবর দিবি।”
—“অবশ্যই আম্মু।”
---
মিথিলার সঙ্গে সালমা
এসময় মিথিলা খানও এগিয়ে এলেন।
সালমাকে দেখে মিথিলা হাসিমুখে বললেন,
—“আফা! এত বছর পর!”
সালমা হেসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন।
—“কেমন আছিস?”
—“ভালো আছি আফা। তুমি কেমন আছ?”
—“আলহামদুলিল্লাহ।”
মিথিলা বললেন,
—“ফারিয়া আসেনি?”
সালমা বললেন,
—“ওর জ্বর হয়েছে। তাই রেখে এসেছি।”
মিথিলা আফসোস করে বললেন,
—“আহা! মেয়েটা তো আসতে চেয়েছিল।”
—“হ্যাঁ। ওরও অনেক ইচ্ছে ছিল।”
মিথিলা বললেন,
—“ও ভালো হলে একদিন নিয়ে এসো। অনেকদিন পর ওকে দেখব।”
সালমা মুচকি হেসে বললেন,
—“অবশ্যই।”
---
বাড়িতে উৎসবের আমেজ
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খান বাড়ির আনন্দও বাড়তে লাগল।
বাড়ির চারপাশে রঙিন বাতি জ্বলছে।
ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে উঠান।
বাড়ির একপাশে খাবারের আয়োজন।
অন্যদিকে গান-বাজনার ব্যবস্থা।
রাফিদ আর রায়ান ছেলেদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে।
মেহরিন, নাওরিন আর জারিন মেয়েদের নিয়ে ব্যস্ত।
কেউ ছবি তুলছে, কেউ গল্প করছে।
সব মিলিয়ে পুরো বাড়ি যেন আনন্দের মেলায় পরিণত হয়েছে।
---
মায়ার আগমন
এই সময় জাহিদের খালাতো বোন মায়া এসে জাহিদের পাশে দাঁড়াল।
মায়া ছোটবেলা থেকেই জাহিদের সঙ্গে খুব বেশি মিশত।
জাহিদ যেখানে থাকত, মায়া কোনো না কোনোভাবে সেখানেই হাজির হয়ে যেত।
আজও তার ব্যতিক্রম হলো না।
মায়া এসে বলল,
—“জাহিদ ভাইয়া।”
জাহিদ তাকাল।
—“কী?”
—“আমার সঙ্গে একটা ছবি তুলবে?”
—“এখন না।”
মায়া মুখ ফুলিয়ে বলল,
—“একটা ছবি তুলতেই তো বলছি!”
সে আবার জাহিদের পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
জাহিদ একটু সরে যেতে চাইতেই মায়া আবার তার পাশে এসে দাঁড়াল।
দূর থেকে সাওন আর সাব্বির সবকিছু দেখছিল।
সাওন হেসে বলল,
—“ওই দেখ! মায়া আবার জাহিদের গায়ে পড়ে আছে!”
সাব্বির হেসে বলল,
—“ভাই, ভাবি তো একেবারে সুযোগ পেলেই হাজির!”
জাহিদ সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“চুপ কর তোরা!”
সাওন আরও মজা করে বলল,
—“ফারিয়া যদি আজকে এখানে থাকত, তাহলে কিন্তু তোর খবর ছিল।”
জাহিদ হঠাৎ চুপ হয়ে গেল।
মায়াও তখন জাহিদের মুখের দিকে তাকাল।
জাহিদের চোখে যেন এক মুহূর্তের জন্য অন্যরকম একটা ভাব ফুটে উঠল।
ফারিয়ার কথা মনে পড়েছে।
মায়া সেটা বুঝতে পারল কি না, বোঝা গেল না।
---
নাচ-গান আর আড্ডা
কিছুক্ষণ পর গান শুরু হলো।
জারিন, মেহরিন আর নাওরিন নাচতে শুরু করল।
সবাই হাততালি দিচ্ছে।
সালমা বসে বসে হাসছিলেন।
নাসরিন বললেন,
—“সালমা, তুইও আয়।”
সালমা হেসে বললেন,
—“আম্মু, আমি বসেই ভালো আছি।”
জফিরা হেসে বললেন,
—“এত বছর পর এসেছিস, আজকে কিন্তু বসে থাকতে দেব না।”
সবাই মিলে সালমাকে উঠিয়ে দিল।
সালমাও হাসতে হাসতে সবার সঙ্গে নাচলেন।
অনেক বছর পর মেয়েটাকে এত হাসিখুশি দেখে নাসরিনের মন ভরে গেল।
---
জাহিদের গান
রাত আরও গভীর হলো।
একসময় সবাই গান গাওয়ার জন্য বসে পড়ল।
সাওন জাহিদের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“দোস্ত, এবার তুই একটা গান কর।”
জাহিদ মাথা নাড়িয়ে বলল,
—“আমি পারব না।”
সাব্বির বলল,
—“আজকে পারতেই হবে।”
সবাই একসঙ্গে বলতে লাগল,
—“জাহিদ! জাহিদ! গান!”
শেষ পর্যন্ত জাহিদ গিটার হাতে নিল।
সে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
তার চোখের সামনে হঠাৎ ছোটবেলার ফারিয়া ভেসে উঠল।
দুইটা লম্বা বেনুনি।
হাতে পুতুল।
তার সঙ্গে ঝগড়া।
রাগ করে চলে যাওয়া।
তারপর এতগুলো বছর।
জাহিদের চোখে অদ্ভুত একটা কষ্ট ফুটে উঠল।
সে গিটার বাজাতে শুরু করল।
তারপর নিচু গলায় গাইতে লাগল—
“আমি পারিনি তোমাকে আপন করে রাখতে…”
চারপাশ ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
জাহিদ গাইতে গাইতে যেন নিজের মনের কথাই বলে যাচ্ছিল।
তার কণ্ঠে ছিল অভিমান, কষ্ট আর না-বলা ভালোবাসা।
সে গানের পরের অংশে নিজের ভেতরের কথাগুলো যেন আরও গভীরভাবে প্রকাশ করল—
“আমি পারিনি তোমাকে আমার করে রাখতে…”
সাওন আর সাব্বির একে অপরের দিকে তাকাল।
তারা বুঝতে পারছিল, জাহিদ আজ কার কথা ভেবে গান করছে।
ফারিয়া।
জাহিদের চোখ তখন বন্ধ।
তার মনে শুধু একটা প্রশ্ন—
“ফারিয়া, তুই আমাকে এত বছর পরও ভুলে গেছিস?”
সে আবার গাইতে লাগল।
গানের প্রতিটি সুরে যেন পুরোনো দিনের সেই ছোট্ট মেয়েটাকে খুঁজে ফিরছিল।
গান শেষ হওয়ার পর কয়েক মুহূর্ত কেউ কিছু বলল না।
তারপর চারপাশে হাততালির শব্দ উঠল।
জাহিদ গিটারটা নামিয়ে রাখল।
সাওন তার কাছে এসে ধীরে বলল,
—“দোস্ত…”
জাহিদ তাকাল।
সাওন মুচকি হেসে বলল,
—“এত বছর পরেও তুই ওকে ভুলিস নাই, তাই না?”
জাহিদ কোনো উত্তর দিল না।
শুধু হালকা করে হাসল।
---
কুমিল্লার বাড়িতে
এদিকে ফারিয়া বিছানায় শুয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
নিহা আর অনামিকা তার পাশে বসে গল্প করছিল।
করিমের মা এসে স্যুপ দিয়ে বললেন,
—“মা, একটু খেয়ে নাও।”
ফারিয়া ধীরে ধীরে উঠে বসল।
অনামিকা বলল,
—“এই তো! আমাদের রোগী সাহেবা আবার ঠিক হয়ে যাচ্ছে।”
ফারিয়া মুচকি হেসে বলল,
—“আমি কালকে স্কুলে যাব।”
নিহা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“আগে পুরোপুরি ভালো হ। তারপর স্কুল!”
ফারিয়া চুপ করে জানালার বাইরে তাকাল।
তার মনটা আজ অদ্ভুত রকম খারাপ।
খান বাড়িতে আজ সবাই আছে।
নানু-নানু আছে।
সবাই আনন্দ করছে।
আর সে এখানে।
জ্বরের কারণে যেতে পারেনি।
সে জানত না—
ঢাকার খান বাড়িতে ঠিক সেই মুহূর্তে একজন মানুষ তার কথাই ভেবে গান গাইছে।
যে মানুষটার সঙ্গে ছোটবেলার সেই অভিমান আজও শেষ হয়নি।
আর ভাগ্য ধীরে ধীরে তাদের আবার মুখোমুখি হওয়ার পথ তৈরি করছে।
চলবে…