পুতুল বউ
পর্ব—৭
ছাদের সেই নীরব মুহূর্তটা আর বেশি সময় স্থায়ী হলো না।
মিষ্টি আবার মিউ মিউ করে ডাকতে লাগল।
ফারিয়া লজ্জায় দ্রুত জাহিদের কাছ থেকে সরে দাঁড়াল। তারপর নিচু গলায় বলল,
—“সরি... আমি আসলে মিষ্টিকে ধরতে গিয়ে...”
জাহিদ কিছু বলল না। শুধু মৃদু হেসে তাকিয়ে রইল।
ফারিয়া আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। মিষ্টিকে কোলে নিয়ে দ্রুত নিচে নেমে গেল।
জাহিদ তখনও সেখানেই দাঁড়িয়ে।
তার মুখে সেই অদ্ভুত হাসি।
ঠিক তখনই ছাদে উঠে এলো সাওন আর সাব্বির।
সাওন দূর থেকেই জাহিদের মুখের হাসি দেখে থমকে গেল।
—“কী ব্যাপার?”
সাব্বিরও জাহিদের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“ওই জাহিদ, তুই হাসতেছিস কেন?”
সাওন একটু চোখ ছোট করে জাহিদের দিকে তাকাল।
—“বেপারটা কী? ফারিয়াকে দেখছিস নাকি?”
জাহিদ কিছু বলল না।
মনে মনে শুধু বলল,
“দেখলাম মানে? আমার তো হুঁশটাই উড়ে গেল!”
সাওন জাহিদের মুখের দিকে তাকিয়ে আবার বলল,
—“কী রে? চুপ করে আছিস কেন?”
জাহিদ স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বলল,
—“কিছু না।”
সাব্বির হেসে বলল,
—“কিছু না মানে? মুখে তো অন্য কথা লেখা!”
জাহিদ আর কোনো উত্তর না দিয়ে ছাদ থেকে নিচে নেমে গেল।
সাওন আর সাব্বিরও তার পেছন পেছন নিচে নামল।
নিচে নামতেই মায়া দৌড়ে এসে জাহিদের কাছে দাঁড়াল।
মায়া জাহিদের গায়ে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে নানা কথা বলতে শুরু করল।
—“জাহিদ ভাইয়া, আপনি কোথায় ছিলেন এতক্ষণ? আমি আপনাকে কতক্ষণ ধরে খুঁজছি জানেন?”
জাহিদ বিরক্ত হয়ে একবার মায়ার দিকে তাকাল।
তারপর সাওনের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“সাওন, মায়ার সঙ্গে তুই কথা বল। আমার একটু কাজ আছে।”
সাওন কিছু বুঝে ওঠার আগেই জাহিদ মায়াকে সাওনের পাশে পাঠিয়ে নিজে সেখান থেকে চলে গেল।
সাব্বির হেসে সাওনের কানে কানে বলল,
—“বুঝলি?”
সাওন মাথা নেড়ে বলল,
—“একদম বুঝছি।”
এই প্রথম তারা ফারিয়াকে দেখেছে।
দূরে ফারিয়া তখন নানু আর মামিদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছে।
সাওন আর সাব্বির দুজনেই কিছুক্ষণ ফারিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর সাওন হঠাৎ বলে উঠল,
—“সালা! এই জন্যই তো জাহিদ এত বছর অপেক্ষা করল!”
সাব্বির হেসে বলল,
—“এখন বুঝলাম ব্যাপারটা!”
ঠিক তখনই জাহিদ তাদের কাছে ফিরে এলো।
সাওন আর সাব্বির দুজনেই একসঙ্গে জাহিদের দিকে তাকাল।
সাব্বির বলল,
—“ভাই, তুই ওই পুতুলের জন্য সাত বছর অপেক্ষা করছিস?”
সাওন সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“আমি তো সাত কোটি যুগও অপেক্ষা করতে রাজি!”
জাহিদ ভ্রু কুঁচকে বলল,
—“বেশি কথা বলিস না।”
সাব্বির হাসতে হাসতে বলল,
—“কেন? সত্যিই তো! এত সুন্দর একটা মেয়েকে সাত বছর পর সামনে পেয়ে তোর তো মাথা ঠিক থাকার কথা না।”
জাহিদ এবার গম্ভীর হয়ে বলল,
—“ও শুধু আমার।”
সাওন হেসে বলল,
—“ওহ! শুরু হয়ে গেছে!”
জাহিদ সাওনের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“আর একটা কথা বলবি না। ওর দিকে নজর দিবি না। ওর সঙ্গে আমার নামটা ছোটবেলা থেকেই জুড়ে গেছে।”
সাব্বির মজা করে বলল,
—“আচ্ছা ভাই, আমরা তো শুধু দেখলাম!”
জাহিদ আর কিছু না বলে ফারিয়ার দিকে তাকাল।
অন্যদিকে ফারিয়াও ঠিক তখন জাহিদের দিকে তাকিয়ে ছিল।
প্রথম দেখায় সে জাহিদকে এতটা খেয়াল করেনি।
কিন্তু এবার একটু ভালো করে তাকাতেই তার চোখ আটকে গেল।
কী সুন্দর লম্বা ছেলে!
ফারিয়ার মনে হলো জাহিদের উচ্চতা হয়তো পাঁচ ফুট আট কিংবা পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চির মতো।
গায়ের রং শ্যামলা।
চুলগুলো পরিপাটি করে আঁচড়ানো।
জাহিদ এর পড়ায় একটা নীল রং এর পাঞ্জাবি বেশ মানিয়েছে।
চেহারায় একটা আলাদা ব্যক্তিত্ব।
ফারিয়া মনে মনে বলল,
—“ছোটবেলার সেই জাহিদ ভাইয়া এত বড় হয়ে গেছে!”
তারপর নিজের অজান্তেই আবার জাহিদের দিকে তাকাল।
তারপর নিজের মনে একটা সুর ভেসে ল উঠলো ডুবে ডুবে ভালোবাসি তুমি না বাসলেও আমি বাসি.
জাহিদও তখন তার দিকেই তাকিয়ে।
দুজনের চোখ আবারও মিলল।
তখন হঠাৎ নিহা মজা করে গেয়ে উঠলো
পরে না চোখের পলক কি তোমার রুপের ঝল.
ফারিয়া সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে নিল।
আর নিহাকে বললো তোরা maybe always আমার পিছে লাগার জন্য এই রেডি আছস
---
হলুদ শেষ, এবার নাচের পালা
কিছুক্ষণ পর মেরিনের গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শেষ হলো।
বাড়ির সবাই এবার নাচের জন্য প্রস্তুতি নিতে লাগল।
মেহরিন ফারিয়ার হাত ধরে বলল,
—“ফারিয়া, এবার তুই নাচবি।”
ফারিয়া সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
—“না না, আমি নাচতে পারি না।”
মেহরিন বলল,
—“মিথ্যা বলিস না। আমরা জানি তুই নাচতে পারিস।”
জারিনও বলল,
—“হ্যাঁ, আজকে তোমাকে নাচতেই হবে।”
অনামিকা আর নিহাও এসে ফারিয়াকে ঘিরে ধরল।
সবাই একসঙ্গে বলতে লাগল,
—“ফারিয়া নাচবে!”
—“ফারিয়া নাচবে!”
—“ফারিয়া নাচবে!”
ফারিয়া লজ্জা পেয়ে বলল,
—“আচ্ছা বাবা, নাচব!”
সবাই আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল।
মিউজিক শুরু হলো।
চারপাশের আলো ঝলমল করছে।
ফারিয়া নীল শাড়ির আঁচল ঠিক করে মঞ্চের মাঝখানে দাঁড়াল।
তারপর শুরু হলো
গান হাতে চুড়ি ছমছম বাজে বসে না মন কোন কাজে প্রেম আসে যায় মনে তোকে না পাওয়ার কারণে
ফারিয়া নাচতে শুরু করতেই সবাই হাততালি দিতে লাগল।
তার খোলা চুল নাচের তালে দুলছে।
নীল শাড়ির আঁচল বাতাসে উড়ছে।
তার মুখে মিষ্টি হাসি।
আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে জাহিদ—
অবাক নয়নে শুধু ফারিয়ার দিকেই তাকিয়ে রইল।
সাওন জাহিদের পাশে এসে কানে কানে বলল,
—“ভাই, চোখটা একটু বন্ধ কর। না হলে শুকিয়ে যাবে!”
জাহিদ কোনো উত্তর দিল না।
মনে মনে বললো
My red rose
তার চোখ যেন ফারিয়ার ওপর থেকেই সরছে না।
মনে মনে শুধু একটা কথাই ঘুরছে—
“সাত বছর পরেও আমার পুতুলটা ঠিক আগের মতোই সুন্দর... শুধু এবার ওকে দেখে আমার হুঁশটাই উড়ে গেছে।”
আর ফারিয়া?
সে নাচতে নাচতে একবার জাহিদের দিকে তাকাল।
দেখল—
জাহিদ একদৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
ফারিয়ার গাল লজ্জায় লাল হয়ে উঠল।
তবুও নাচ থামাল না।
বরং অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল একটুকরো মিষ্টি হাসি।
চলবে…