ফন্ট সাইজ:
থিম:
পুতুল বউ

৬ষ্ঠ পর্ব

লেখক: Binti Fariya islam
পুতুল বউ
পর্ব—৬
সময় দেখতে দেখতে আরও দুইটা বছর কেটে গেল।
ফারিয়া এবার এসএসসি দিয়েছে। আর জাহিদ ইন্টারমিডিয়েটে পড়ে।
শৈশবের সেই দিনগুলো অনেক দূরে চলে গেছে। কিন্তু কিছু স্মৃতি সময়ের সঙ্গে মুছে যায় না।
আজ সেই পুরোনো স্মৃতিগুলোই আবার জীবন্ত হতে চলেছে।
---
খান বাড়িতে বিয়ের আমেজ
ঢাকার খান বাড়ি আজ যেন আলোয় ঝলমল করছে।
খান বাড়ির বড় মেয়ে মেরিন খানের বিয়ে ঠিক হয়েছে বড় ব্যবসায়ী পরিবারের ছেলে সাকিলের সঙ্গে।
আজ মেরিনের গায়ে হলুদ আর মেহেদির অনুষ্ঠান।
বাড়ির প্রতিটি কোণ ফুল, আলো আর হলুদের সাজে সেজে উঠেছে।
সালমা ইসলামকে অনেক আগেই নাসরিন সুলতানা বলে দিয়েছিলেন,
—“সালমা, তুই কিন্তু কয়েকদিন আগেই চলে আসিস। বিয়ের এত কাজ, তোকে ছাড়া তো হবে না।”
সালমাও যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অফিসের কিছু জরুরি কাজ থাকায় আগে আসতে পারেননি।
অবশেষে আজ সব কাজ গুছিয়ে ফারিয়াকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন।
সঙ্গে ফারিয়ার দুই প্রিয় বান্ধবী—অনামিকা আর নিহা।
গাড়িতে বসে অনামিকা বারবার ফারিয়াকে দেখছিল।
—“কী রে? এত চুপচাপ কেন?”
ফারিয়া জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
—“কিছু না।”
নিহা হেসে বলল,
—“খান বাড়িতে সাত বছর পর যাচ্ছিস। নিশ্চয়ই অনেক কিছু মনে পড়ছে।”
ফারিয়া মৃদু হেসে বলল,
—“হ্যাঁ। ছোটবেলার কথা মনে পড়ছে।”
অনামিকা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“আর জাহিদ ভাইয়ার কথা?”
ফারিয়া সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকাল।
—“চুপ কর!”
দুজনেই হেসে উঠল।
---
সাত বছর পর খান বাড়ি
বিকেলের দিকে গাড়ি খান বাড়ির সামনে এসে থামল।
গাড়ি থেকে ফারিয়া নামতেই নাসরিন সুলতানা ছুটে এলেন।
—“আমার পুতুল!”
ফারিয়া দৌড়ে গিয়ে নানুকে জড়িয়ে ধরল।
—“নানু!”
নাসরিন ফারিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
—“সাত বছর পর আমার নাতনিটাকে দেখলাম!”
আবদুল হাকিম খানও এগিয়ে এসে বললেন,
—“এই যে আমার পুতুলটা! আমাকে কি ভুলে গেছিস?”
ফারিয়া হেসে বলল,
—“নানু, তোমাকে কীভাবে ভুলব?”
এক এক করে সবাই ফারিয়াকে ঘিরে ধরল।
মামা-মামি, মামাতো ভাই-বোন—সবাই যেন আনন্দে আত্মহারা।
রাফিদ বলল,
—“ফারিয়া, তুই তো একদম বড় হয়ে গেছিস!”
মেহরিন বলল,
—“সাত বছর পর তোকে চিনতেই পারছি না!”
জারিন ফারিয়াকে জড়িয়ে ধরে বলল,
—“ফারিয়া আপু, তুমি কিন্তু আমাদের অনেক মিস করিয়েছ!”
ফারিয়া হেসে বলল,
—“আমিও তোদের অনেক মিস করেছি।”
অনামিকা আর নিহাকেও সবাই খুব আদর করে ভেতরে নিয়ে গেল।
---
গায়ে হলুদের প্রস্তুতি
বাড়ির মেয়েরা সবাই শাড়ি পরছে।
কেউ হলুদ শাড়ি পরেছে, কেউ লাল, কেউ আবার নীল।
ফারিয়া একটা শাড়ির দিকে তাকিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“আমি কিন্তু শাড়ি পরব না।”
নাসরিন বললেন,
—“কেন?”
—“আমি কখনো শাড়ি পরিনি নানু।”
মেহরিন হেসে বলল,
—“আজই প্রথম পরবি।”
ফারিয়া মাথা নাড়ল।
—“না, আমি অন্য কিছু পরব।”
সবাই মিলে অনেক জোরাজুরি করল।
শেষ পর্যন্ত ফারিয়াকে রাজি করানো গেল।
তার জন্য বের করা হলো একটা সুন্দর নীল শাড়ি।
ফারিয়া শাড়ি পরে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই সবাই কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল।
চুল খোলা।
নীল শাড়ি।
চোখে মায়া।
অনামিকা বলল,
—“ও মা! এটা আমাদের ফারিয়া?”
নিহা হেসে বলল,
—“সত্যিই অসাধারণ লাগছে।”
ফারিয়া লজ্জা পেয়ে বলল,
—“তোরা দুজনও শুরু করলি!”
---
জাহিদের নীল পাঞ্জাবি
অন্যদিকে জাহিদও আজ নীল পাঞ্জাবি পরেছে।
সাওন আর সাব্বির তাকে দেখে হাসতে লাগল।
সাওন বলল,
—“ভাই, আজ তোকে একেবারে নায়ক লাগছে!”
জাহিদ হেসে বলল,
—“চুপ কর।”
সাব্বির বলল,
—“কেন এত সাজগোজ?”
জাহিদ কিছু না বলে শুধু হাসল।
---
প্রথম দেখা—কিন্তু পেছন থেকে
গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে।
বাড়ির উঠানে সবাই মিলে দাঁড়িয়ে গল্প করছে।
ফারিয়াও সবার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে।
তার পাশে অনামিকা, নিহা, মেহরিন, নাওরিন আর জারিন।
ফারিয়ার খোলা চুল বাতাসে দুলছে।
নীল শাড়ির আঁচল বাতাসে একটু একটু করে উড়ছে।
ঠিক তখনই জাহিদ দূর থেকে সেখানে এসে দাঁড়াল।
সে প্রথমে শুধু সবার পেছন দিকটা দেখতে পেল।
তারপর হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল একজনের ওপর।
একজন মেয়ে।
নীল শাড়ি।
কোমর ছাড়িয়ে নেমে আসা ঘন কালো চুল।
জাহিদ থমকে দাঁড়াল।
কেন জানি মেয়েটাকে তার অসম্ভব পরিচিত মনে হলো।
সে কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল।
তারপর হঠাৎ তার চোখের সামনে অতীতের একটা ঘটনা ভেসে উঠল।
---
কয়েক বছর আগের কথা
খান বাড়ির উঠানে ছোট্ট ফারিয়া বসে খেলছিল।
তার লম্বা দুই বেনুনি পিঠের ওপর ঝুলছিল।
জাহিদের বড় আব্বুর ছেলে রাফিদ তখন দুষ্টুমি করে ফারিয়ার একটা বেনুনি ধরে টান দিল।
ফারিয়া ব্যথায় চিৎকার করে উঠল,
—“আহ!”
জাহিদ দূর থেকে সবটা দেখে ফেলেছিল।
সে দৌড়ে এসে রাফিদের সামনে দাঁড়াল।
—“তুই ফারিয়ার চুল টানলি কেন?”
রাফিদ হেসে বলল,
—“এমনিই তো! মজা করছিলাম।”
জাহিদের চোখ রাগে লাল হয়ে গেল।
—“ও ব্যথা পেয়েছে!”
রাফিদ বলল,
—“তাতে কী হয়েছে?”
জাহিদ আর এক মুহূর্তও দেরি করল না।
রাফিদের সঙ্গে তার হাতাহাতি শুরু হয়ে গেল।
—“জাহিদ! কী করছিস?”
কেউ একজন চিৎকার করলেও জাহিদ থামল না।
শেষ পর্যন্ত জাহিদ রাগ করে বলল,
—“ও আমার পুতুল বউ!”
সবাই থমকে গেল।
জাহিদ রাফিদের দিকে আঙুল তুলে বলল,
—“আমি ছাড়া কেউ ওর গায়ে হাত দিলে ওই হাত ভেঙে ফেলব!”
ছোট্ট ফারিয়া তখন অবাক হয়ে জাহিদের দিকে তাকিয়ে ছিল।
সে কিছুই বুঝতে পারছিল না।
শুধু জাহিদের রাগী মুখটা দেখছিল।
---
বর্তমান
হঠাৎ অতীতের সেই স্মৃতি থেকে জাহিদ বর্তমানের ফিরে এলো।
তার চোখ আবার সেই মেয়েটার দিকে।
মেয়েটা তখনও সবার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে।
জাহিদের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
সে আস্তে করে বলল,
—“ফারিয়া...?”
কিন্তু মেয়েটা শুনল না।
জাহিদ আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকল না।
চুপচাপ ছাদের দিকে চলে গেল।
---
ছাদে সাব্বির আর অনামিকা
অন্যদিকে অনামিকাও কিছুক্ষণ পর ছাদে উঠছিল।
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে হঠাৎ তার পা শাড়ির আঁচলে আটকে গেল।
—“আহ!”
সে পড়ে যেতে যাচ্ছিল।
ঠিক তখনই সামনে থাকা সাব্বির দ্রুত হাত বাড়িয়ে তাকে ধরে ফেলল।
অনামিকা নিজেকে সামলে নিয়ে সাব্বিরের দিকে তাকাল।
—“এই!”
সাব্বির হেসে বলল,
—“সাবধানে হাঁটতে পারো না?”
অনামিকা ভ্রু কুঁচকে বলল,
—“আমি তো পারিই।”
—“হ্যাঁ, দেখলাম। খুব ভালো পারো।”
অনামিকা চোখ ছোট করে বলল,
—“ভাই, সুন্দরী মেয়ে দেখলে হুঁশ থাকে না নাকি?”
সাব্বির হেসে বলল,
—“আমি সুন্দরী মেয়ে কোথায় দেখলাম?”
অনামিকা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“তাহলে আমাকে ধরলে কেন?”
সাব্বির একটু থেমে বলল,
—“পড়ে যাচ্ছিলে বলে ধরেছি।”
—“ওহ! তাই?”
—“হ্যাঁ।”
—“তাহলে হাতটা ছাড়ুন।”
সাব্বির সঙ্গে সঙ্গে হাত ছেড়ে দিল।
অনামিকা একটু হোঁচট খেয়ে আবার সামলে নিল।
সাব্বির হেসে ফেলল।
—“এই তো! আবার পড়ে যাচ্ছিলে!”
অনামিকা রাগ করে বলল,
—“আপনি হাসছেন?”
—“না, কাঁদছি।”
—“আপনার সঙ্গে কথা বলাই ভুল।”
—“আমারও তাই মনে হচ্ছে।”
দুজনেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল।
---
মিষ্টির খোঁজে ফারিয়া
এদিকে ফারিয়ার আদরের বিড়াল মিষ্টি হঠাৎ সবার চোখের আড়াল হয়ে গেল।
ফারিয়া চারদিকে তাকিয়ে বলল,
—“মিষ্টি কোথায় গেল?”
অনামিকা তখন ছাদে ছিল।
সে নিচে তাকিয়ে বলল,
—“ওই তো মনে হয় ছাদের দিকে গেছে!”
ফারিয়া দ্রুত সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
—“আমি মিষ্টিকে নিয়ে আসছি।”
সে ধীরে ধীরে ছাদে উঠতে লাগল।
জীবনে প্রথমবার শাড়ি পরেছে।
হাঁটার সময় বারবার শাড়ির নিচের অংশ সামলাতে হচ্ছে।
---
ছাদে জাহিদ
ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল জাহিদ।
সে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল।
তার মাথায় তখনও সেই মেয়েটার কথা।
ফারিয়া কি সত্যিই হতে পারে?
সাত বছর পর?
ঠিক তখনই পেছন থেকে মিষ্টি দৌড়ে এসে ছাদের এক পাশে চলে গেল।
ফারিয়া মিষ্টিকে দেখে বলল,
—“মিষ্টি! দাঁড়া!”
সে দ্রুত তার পেছনে যেতে লাগল।
কিন্তু শাড়ি সামলাতে গিয়ে হঠাৎ তার পা শাড়ির ভাঁজে আটকে গেল।
—“আহ!”
ফারিয়া ভারসাম্য হারিয়ে সামনে পড়ে যেতে লাগল।
আর ঠিক সামনেই ছিল জাহিদ।
ফারিয়া গিয়ে সরাসরি জাহিদের গায়ে ধাক্কা খেল।
জাহিদও হঠাৎ করে তাকে ধরে ফেলল।
এক মুহূর্তে দুজনের চোখে চোখ পড়ল।
সবকিছু যেন থেমে গেল।
---
সাত বছর পর
জাহিদ ফারিয়াকে ধরে রেখেই তাকিয়ে রইল।
তার চোখ বড় হয়ে গেছে।
মুখে কোনো কথা নেই।
সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না।
সাত বছর আগে যে ছোট্ট মেয়েটা দুইটা বেনুনি করে পুতুল নিয়ে ঘুরত—
আজ সেই মেয়েটা তার সামনে।
নীল শাড়ি।
খোলা চুল।
মায়াভরা চোখ।
জাহিদ কয়েক সেকেন্ড একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
সত্যিই যেন হা করে তাকিয়ে আছে।
ফারিয়াও লজ্জায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ যেন সে নিজেই শুনতে পাচ্ছে।
জাহিদের চোখ ধীরে ধীরে ফারিয়ার মুখ থেকে চুলের দিকে গেল।
তারপর আবার চোখে চোখ।
সাত বছর পরও সে চিনে ফেলেছে।
তার পুতুল বউকে।
জাহিদের ঠোঁটে অজান্তেই একটা মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলো না।
ফারিয়া লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল।
দূরে মিষ্টি মিউ মিউ করে ডাকতে লাগল।
আর ছাদের সেই নীরব মুহূর্তে— 
সাত বছরের দূরত্ব যেন এক মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেল।
চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬ষ্ঠ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন