ফন্ট সাইজ:
থিম:
পুতুল বউ

১৫তম পর্ব

লেখক: Binti Fariya islam

 পুতুল বউ

পর্ব—১৫
ঢাকার পথে নতুন অধ্যায়
সকালের মিষ্টি রোদটা ধীরে ধীরে পুরো বাড়িটাকে আলোকিত করে তুলেছে।
প্রতিদিনের মতো ফারিয়ার ঘুম ভাঙল ভোরের আজানের শব্দে। ঘুম থেকে উঠে সে অজু করে নামাজ পড়ল। নামাজ শেষে জায়নামাজে বসে কিছুক্ষণ দোয়া করল।
তারপর ধীরে ধীরে উঠে জানালার পর্দা সরিয়ে দিল।
সকালের ঠান্ডা বাতাস এসে তার মুখ ছুঁয়ে গেল।
ফারিয়া কয়েক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
এরপর প্রতিদিনের অভ্যাস অনুযায়ী সে বাগানে চলে গেল।
হাতে পানির ক্যান।
একটার পর একটা ফুল গাছে পানি দিতে লাগল।
গোলাপ, জুঁই, বেলি, রজনীগন্ধা—সব ফুলই যেন তার যত্নে আরও সতেজ হয়ে উঠেছে।
মিষ্টিও তার পেছন পেছন চলে এসেছে।
ফারিয়া নিচু হয়ে মিষ্টির মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
—কী রে মিষ্টি? সকাল সকাল আমার পেছনে চলে এসেছিস?
মিষ্টি মিউ মিউ করে তার পায়ের সঙ্গে গা ঘষল।
ফারিয়া হেসে আবার গাছের দিকে মন দিল।
কিন্তু আজকের সকালটা যে অন্যরকম কিছু নিয়ে আসবে, সেটা সে তখনও জানত না।
হঠাৎ ঘরের ভেতর থেকে সালমা ইসলামের কণ্ঠ ভেসে এলো—
—ফারিয়া মা!
ফারিয়া গাছের পাশে পানির ক্যানটা রেখে দ্রুত ঘরের ভেতরে চলে গেল।
—জি আম্মু?
সালমা তখন হাতে ফোন নিয়ে বসে আছেন।
মুখটা কেমন যেন চিন্তায় ভারী।
ফারিয়া মায়ের মুখ দেখে থমকে গেল।
—কি হয়েছে আম্মু?
সালমা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—তোর মামা ফোন করেছিল।
—কেন?
সালমা ধীরে ধীরে বললেন,
—তোর নানুর শরীরটা হঠাৎ অনেক খারাপ হয়েছে।
কথাটা শুনেই ফারিয়ার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
—নানু?
—হ্যাঁ মা। রাতে নাকি হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ডাক্তার দেখানো হচ্ছে। তোর মামা বলেছে, আমরা যেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঢাকায় যাই।
ফারিয়ার চোখে চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল।
—আম্মু, আমরা এখনই যাব।
—হ্যাঁ। তাই তোকে বলছি তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নে।
ফারিয়া আর কোনো কথা না বলে নিজের ঘরে চলে গেল।
---
প্রস্তুতি
ফারিয়া আলমারি খুলে কিছুক্ষণ পোশাকের দিকে তাকিয়ে রইল।
শেষে একটা সুন্দর গ্রাউন বের করল।
তারপর প্রয়োজনীয় পোশাক, ওড়না, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ব্যাগে গুছিয়ে নিতে লাগল।
নানুর কথা মনে পড়লেই তার বুকটা কেমন করে উঠছিল।
ছোটবেলায় নানুর বাড়িতে গেলে নানু তাকে নিজের পাশে বসিয়ে কত গল্প করতেন।
তার জন্য নিজের হাতে খাবার তৈরি করতেন।
ফারিয়া মনে মনে বলল,
'আল্লাহ, আমার নানুকে ভালো রেখো।'
গোসল করে এসে সে পোশাক পরে নিল।
আয়নার সামনে বসে চুল আঁচড়াতে লাগল।
তার লম্বা কালো চুলগুলো কোমর ছাড়িয়ে নিচে নেমে এসেছে।
ফারিয়া চুলগুলো সুন্দর করে গুছিয়ে নিল।
আজ সাজগোজ করার কোনো ইচ্ছাই নেই।
তবুও মায়ের সঙ্গে বাইরে যেতে হবে বলে হালকা কাজল দিল, ঠোঁটে সামান্য লিপবাম লাগাল আর কপালে ছোট্ট একটা টিপ পরল।
আয়নায় নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো—
চোখেমুখে আজ অন্যরকম একটা চিন্তা।
নানুর জন্য ভয়।
---
নিচে
এদিকে নিচতলায় সালমা ব্যাগ গোছাচ্ছিলেন।
করিমের মা রান্নাঘরের কাজ শেষ করে বেরিয়ে এসে কিছুক্ষণ সালমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
—আপা, আপনারা কি আজ কই বাইর হইবেন নাকি?
সালমা ব্যাগে কাপড় রাখতে রাখতে বললেন,
—হ্যাঁ। আমার মা অসুস্থ হয়ে গেছে। তাই আজই ঢাকায় যাব।
করিমের মা একটু অবাক হয়ে বললেন,
—ওমা! আপার মা অসুস্থ?
—হ্যাঁ গো। আমার ভাই ফোন করে বলেছে শরীরটা ভালো না। ডাক্তার দেখাচ্ছে।
করিমের মা মাথা নাড়িয়ে বললেন,
—আল্লাহ ভালো করুক।
সালমা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—মায়ের কিছু হলে মনটা কেমন করে বুঝতেই পারছ।
—হ, আপা। মা তো মা-ই।
সালমা মাথা নাড়িয়ে বললেন,
—আমরা কয়েকদিন থাকতেও পারি। বাড়িটা তুমি দেখে রেখো।
—জ্বি আপা। আপনে কোনো চিন্তা কইরেন না।
সালমা বললেন,
—আর মিষ্টিটাকে ঠিকমতো খাবার দিও।
করিমের মা বললেন,
—ওরে আমি দেইখা রাখমু।
ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে ফারিয়া নিচে নামল।
করিমের মা তাকিয়ে বললেন,
—ছোট ম্যাডাম তৈরি হইছেন?
ফারিয়া মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ।
করিমের মা আবার নিজের কাজে চলে গেলেন।
ফারিয়া চারপাশে তাকিয়ে মিষ্টিকে খুঁজতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর মিষ্টি দৌড়ে এসে তার পায়ের কাছে দাঁড়াল।
ফারিয়া সঙ্গে সঙ্গে তাকে কোলে তুলে নিল।
—আমি কয়েকদিন থাকব না। আমাকে মিস করবি?
মিষ্টি মিউ করে উঠল।
ফারিয়া হেসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
সালমা মেয়েকে দেখে বললেন,
—এখন মিষ্টিকে রেখে আয়। গাড়ি এসে গেছে।
ফারিয়া মিষ্টিকে করিমের মায়ের কাছে দিয়ে বলল,
—ওকে ঠিকমতো খেতে দিও।
করিমের মা ছোট করে বললেন,
—জ্বি ছোট ম্যাডাম।
---
রওনা হওয়ার সময়
কিছুক্ষণ পর গাড়ি বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল।
ড্রাইভার ব্যাগগুলো গাড়িতে তুলে দিল।
সালমা শেষবারের মতো ঘরের দিকে তাকালেন।
তারপর করিমের মাকে বললেন,
—আমরা চললাম।
—জ্বি আপা। আপনারা সাবধানে যাইয়েন।
—তুমি বাড়িটা দেখে রেখো।
—আপনে নিশ্চিন্তে যান।
ফারিয়া দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একবার পুরো বাড়িটার দিকে তাকাল।
তারপর মিষ্টির দিকে তাকিয়ে বলল,
—আমি তাড়াতাড়ি ফিরে আসব।
মিষ্টি যেন কিছুই বুঝল না, শুধু মিউ মিউ করতে লাগল।
ফারিয়া গাড়িতে উঠে বসে গেল।
সালমাও পাশে বসলেন।
গাড়ি ধীরে ধীরে বাড়ির সামনে থেকে বেরিয়ে গেল।
করিমের মা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে গাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
---
পথের মধ্যে
গাড়ি ছুটে চলেছে ঢাকার দিকে।
ফারিয়া জানালার পাশে মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে।
রাস্তার দৃশ্য একের পর এক পেছনে চলে যাচ্ছে।
সালমা মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—এত চুপ করে আছিস কেন?
ফারিয়া আস্তে বলল,
—নানুর জন্য ভয় লাগছে আম্মু।
সালমা মেয়ের হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বললেন,
—ভয় পাবি না। ইনশাআল্লাহ কিছু হবে না।
ফারিয়া মায়ের কাঁধে মাথা রাখল।
—আমরা পৌঁছাতে কতক্ষণ লাগবে?
—আর কিছুক্ষণ।
ফারিয়া চোখ বন্ধ করল।
মনে মনে শুধু দোয়া করতে লাগল।
---
ঢাকায় পৌঁছানো
বেশ কয়েক ঘণ্টা পর তারা ঢাকায় পৌঁছাল।
গাড়ি বাড়ির সামনে থামতেই ফারিয়া প্রায় ছুটে গাড়ি থেকে নামল।
বাড়ির দরজা খোলার আগেই ভেতর থেকে তার মামি বেরিয়ে এলেন।
—ফারিয়া মা!
ফারিয়া এগিয়ে গিয়ে মামিকে জড়িয়ে ধরল।
—মামি, নানু কেমন আছে?
মামি তার মাথায় হাত রেখে বললেন,
—এখন একটু ভালো আছে মা। তুই আগে ওনার কাছে যা।
এর মধ্যেই তার মামাতো ভাই-বোনেরা ছুটে এলো।
—ফারিয়া আপু!
—আপু, এতদিন পর এলে!
ফারিয়া ওদের দেখে একটু হাসল।
—তোরা কেমন আছিস?
—ভালো আছি। কিন্তু তুমি একদম বদলে গেছো!
একজন হেসে বলল,
—আপু আগের থেকে অনেক সুন্দর হয়ে গেছে।
ফারিয়া লজ্জা পেয়ে বলল,
—এইসব বাদ দে। নানু কোথায়?
মামা তখন এগিয়ে এসে বললেন,
—ঘরে আছে। এখন আগের চেয়ে একটু ভালো।
সালমা ভাইয়ের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন।
—মা এখন কেমন আছে?
—ডাক্তার দেখানো হয়েছে। আপাতত চিন্তার কিছু নেই। তবে দুর্বল হয়ে গেছে।
সালমা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।
ফারিয়া আর দেরি করল না।
সে দ্রুত নানুর ঘরে ঢুকে গেল।
নানু বিছানায় শুয়ে ছিলেন।
ফারিয়া কাছে গিয়ে তার হাতটা ধরে বসে পড়ল।
—নানু...
নানু ধীরে চোখ খুললেন।
ফারিয়াকে দেখেই দুর্বল একটা হাসি দিলেন।
—আমার পুতুলটা এসেছে?
ফারিয়ার চোখে পানি জমে গেল।
—হ্যাঁ নানু, আমি এসেছি।
নানু তার হাতটা শক্ত করে ধরলেন।
—তোকে দেখলেই আমার ভালো লাগে।
ফারিয়া নানুর হাতটা নিজের গালে চেপে ধরল।
—তুমি তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে যাও। আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না।
নানু মৃদু হাসলেন।
কিন্তু ফারিয়া জানত না—
এই ঢাকায় আসার পর শুধু নানুর অসুস্থতার চিন্তাই তার সামনে থাকবে না।
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন