#ক্ষমতার_নেশা
#সাদিয়া_আফরিন
[কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ]
পর্ব ৫
গাজীপুর শহরের সকালটা আজ অন্য আর দশটা সাধারণ দিনের মতো নয়। সকালের স্নিগ্ধ রোদের আলো ফুটতেই না ফুটতেই শহরের বাতাসে যেন এক অদ্ভুত আলোড়ন আর উত্তেজনার আভাস ছড়িয়ে পড়েছে। পিচঢালা মূল রাস্তাগুলো প্রতিদিনের মতোই রিকশা, বাস আর পথচারীদের কোলাহলে মুখরিত, কিন্তু মানুষের জটলা আর কথাবার্তার মাঝখানে আজ ঘুরেফিরে একটা নামই সবচেয়ে বেশি প্রতিধ্বনি তৈরি করছে—জারিপ রেহান তালুকদার।
রাস্তার মোড়ের পুরোনো ও জমজমাট চায়ের দোকানগুলোতে তখন ধোঁয়া ওঠা চা আর খবরের কাগজের ফাঁকে গরম গরম আড্ডা জমে উঠেছে। কড়া লিকারের চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বয়স্ক থেকে শুরু করে তরুণ, সব বয়সের মানুষই নিজেদের মতো আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
একপাশে বেঞ্চে বসে থাকা এক যুবক তার পাশের বন্ধুকে কুনুই দিয়ে ধাক্কা দিয়ে বলে উঠল, "এই, তুই কি খবরটা শুনছিস? জারিপ রেহান তালুকদার নাকি খুব শিগগিরই আমাদের গাজীপুরে আসছে!"
তার বন্ধু চায়ের কাপটা নিচে রেখে বিস্ময় আর কৌতূহল নিয়ে তাকাল, "বলিস কী রে! ওই তালুকদার গ্রুপের বড় কর্তার কথা বলছিস তো? চট্টগ্রাম ছেড়ে হঠাৎ এই সাধারণ শহরে তার আসার পেছনে রহস্যটা কী?"
"আরে ভাই, রহস্য আর কী থাকবে! শুনলাম গাজীপুরের যে সুবিশাল প্রজেক্টটা দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে, সেটারই তদারকি করতে নাকি সে নিজে সরাসরি ড্রাইভ করে আসছে। লোকটা নাকি কাজের ব্যাপারে বিন্দুমাত্র অবহেলা সহ্য করে না।"
পাশ থেকে খবরের কাগজ পড়া এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক তাদের কথার মাঝে যোগ দিয়ে বললেন, "এত কম বয়সে ব্যবসা আর নিজের ক্ষমতার যে দাপট সে গড়ে তুলেছে, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য। এক নামে পুরো চট্টগ্রামের বন্দর এলাকা কাঁপায় সে। এই তরুণ বয়সেই প্রভাব-প্রতিপত্তি এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে বড় বড় শিল্পপতিরাও তার সামনে কথা বলতে গেলে দুবার ভাবে।"
চা দোকানের তরুণদের মধ্যে একজন রাজনীতির জটিল আলোচনা ছেড়ে জারিপের ব্যক্তিত্ব নিয়ে কথা বলতে শুরু করল, "আরে ব্যবসার কথা বাদ দে তো! সোশ্যাল মিডিয়ায় তার ছবিগুলো দেখেছিস? লোকটাকে দেখতে কী পরিমাণ গম্ভীর আর ড্যাশিং! শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে যখন সজাগ দৃষ্টিতে চোখের কড়া চশমাটা ঠিক করে, তখন আশপাশের মানুষ এমনিতেই চাপে পড়ে যায়। পুরো রয়্যাল অ্যাটিটিউড!"
তার কথা শুনে পুরো চায়ের দোকানে এক চোট হাসির রোল পড়ে গেল। অন্য এক বন্ধু হেসে চেপে ধরে বলল, "তুই কাজের খবর কিছুই বুঝিস না, শুধু মানুষের বাহ্যিক রূপ আর ভাবসাব দেখে মাতোয়ারা হস!"
চারপাশে এমন হাজারো আলোচনা, কৌতূহল আর গুঞ্জনের তরঙ্গ বয়ে চললেও শহরের এক শান্ত গলির ভেতর এসব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক ভিন্ন জগৎ বিরাজ করছিল। যার মনে এসব ক্ষমতা, প্রতিপত্তি কিংবা চটকদার নাম নিয়ে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই, সে তখন নিজের ছোট পড়ার ঘরে বসে শান্ত মনে কলেজের উদ্দেশ্যে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সাদিয়া আফরিন।
পাওয়ার, রাজনীতি, শত কোটি টাকার বিজনেস সাম্রাজ্য কিংবা চটকদার প্রভাবের দাপট সাদিয়ার কাছে সবসময়ই এক দূরবর্তী ও অর্থহীন জগতের মতো মনে হতো। সাদিয়ার মনের ক্যানভাসটা বড়ই ছিমছাম আর সাদা-মাটা। প্রতিদিন নিয়ম করে ক্লাসে যাওয়া, বন্ধুদের সাথে সাধারণ বিষয় নিয়ে খুনসুটি করা, পরিবারের প্রতি নিজের ছোট্ট দায়িত্বগুলো পালন করা আর দিনশেষে প্রিয় গল্পের বইয়ের পাতায় নিজেকে হারিয়ে ফেলা—এই সামান্য কিছু নিয়েই সাদিয়ার পুরো রাজত্ব। কোনো ক্ষমতাশালী ব্যক্তিত্বের প্রভাব তার সেই শান্ত রাজত্বে কখনো নাড়া দিতে পারেনি।
সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার ঠিক মুহূর্তে বিছানার ওপর রাখা নিজের মোবাইল ফোনটা হাতে তুলে নিল সাদিয়া। স্ক্রিনটা অন করতেই বেশ কয়েকটি নোটিফিকেশন চোখে পড়ল। বিভিন্ন নিউজ পোর্টাল থেকে শুরু করে স্থানীয় পেজগুলোতে একটাই খবর ভেসে উঠছে—জারিপ রেহান তালুকদার গাজীপুরের মাটিতে পা রাখতে চলেছেন।
সোশ্যাল মিডিয়া পেজগুলোতেও তাকে নিয়ে নানা রিলস আর পেপার কাটিং পোস্ট করা হচ্ছে। সাদিয়া বিরক্তি আর বিরস মুখে এক মুহূর্তের জন্য সেই নামটার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটার স্ক্রিন বন্ধ করে ব্যাগে পুরে নিল।
মনে মনে একটু বিরক্ত হয়েই নিজেকে বলল, "মানুষের কি সত্যি আর কোনো কাজ নেই! একজন মানুষকে নিয়ে পুরো শহরটা এভাবে মাথা খারাপ করার কী অর্থ হতে পারে!"
ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে ঘরের দরজা পার হয়ে সাদিয়া নিজের চেনা পথে কলেজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল।
সকালের হালকা মিষ্টি রোদ তখন শহরের গাছপালার পাতার ফাঁক দিয়ে পিচঢালা রাস্তায় এসে পড়েছে। রাস্তার একটা নির্দিষ্ট মোড়ে পৌঁছে সাদিয়া এসে থামল। এটি তাদের প্রতিদিনের চেনা জায়গা। সে তার প্রাণের বান্ধবী মারিয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। মিনিট পাঁচেক একা দাঁড়িয়ে থাকার পর দূর থেকে দেখা গেল মারিয়া তার ব্যাগটা সামলাতে সামলাতে কিছুটা দৌড়ে আসছে।
কাছে এসেই মারিয়া নিজের দুই হাঁটুতে হাত দিয়ে বুক ভরে দম নিল। হাসতে হাসতে থমকে যাওয়া গলায় বলল, "সাদু রে! খুব বেশি দেরি করে ফেললাম? অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছিস তো আমার জন্য?"
সাদিয়া নিজের ওড়নাটা কাঁধে ঠিক করতে করতে মিষ্টি হেসে শান্ত গলায় বলল, "না রে বোকা, এই তো মাত্র দুই-তিন মিনিট হলো এসেছি। চল, আর দেরি করলে আজ আর ক্লাসে ঢোকার মতো উপায় থাকবে না।"
মারিয়া সাদিয়ার সাথে তাল মিলিয়ে পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল। কিছুদূর যাওয়ার পরই মারিয়া সাদিয়ার দিকে ফিরে বেশ কৌতূহলী ও উত্তেজিত গলায় বলে উঠল, "সাদু, তুই কি আজকের সবচেয়ে বড় আর গরম খবরটা শুনছিস?"
সাদিয়া সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করল, "কীসের খবরের কথা বলছিস?"
"আরে তুই কি সত্যি কিছু জানিস না! জারিপ রেহান তালুকদার নাকি খুব শিগগিরই চট্টগ্রাম ছেড়ে আমাদের গাজীপুরে চলে আসছে! প্রজেক্টের কাজে নাকি কয়েকদিন এখানেই থাকবে!"
সাদিয়া নিজের চেহারায় কোনো পরিবর্তন না এনে একবারে নির্লিপ্ত গলায় বলল, "হুম, সকালে ফেসবুক অন করতেই দেখেছি। শুনেছি তো।"
মারিয়া থমকে দাঁড়িয়ে অবাক দৃষ্টিতে সাদিয়ার দিকে তাকাল। সাদিয়ার একটা হাত চেপে ধরে বলল, "তুই কীভাবে এত ঠাণ্ডা মাথায় 'হুম শুনেছি' বলছিস রে? পুরো শহর যেখানে তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে, বড় বড় ব্যবসায়ীরা তার আসার খবরে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে, আর তোর মুখে সামান্যতম অনুভূতির ছোঁয়াও নেই?"
সাদিয়া চোখ দুটো হালকা কুঁচকে হালকা বিরক্তি নিয়ে বলল, "এখানে আলাদা করে আবেগ প্রকাশ করার মতো কী আছে বল তো মারিয়া? কোনো এক বড় তালুকদার গ্রুপের মালিক কাজের সূত্রে এই শহরে আসছে, এতে আমাদের সাধারণ জীবনে কী এমন পরিবর্তন আসবে যে আমাদের লাফাতে হবে?"
মারিয়া মৃদু হেসে বলল, "আহা! তুই বুঝছিস না কেন! লোকটা শুধু কোনো সাধারণ বিজনেসম্যান নয়, ওনার ব্যক্তিত্ব একদম রাজকীয়! তোকে আমি ছবি দেখিয়েছি না? কী যে গম্ভীর আর ড্যাশিং একটা চেহারা! ওনার হাঁটাচলার স্টাইল দেখলেই যে কেউ মুগ্ধ হয়ে যাবে।"
সাদিয়া নিজের মাথা নেড়ে হালকা হেসে উত্তর দিল, "কী যে তোরা সকাল সকাল জারিপ জারিপ নাম জপতে শুরু করেছিস! তুই তো ভালো করেই জানিস, আমি এসব রাজনৈতিক ক্ষমতা, রাজকীয় অ্যাটিটিউড আর অহংকারী দাপট দেখানো মানুষদের একদম সহ্য করতে পারি না।"
মারিয়া সাদিয়ার চিবুক ধরে হালকা নাড়া দিয়ে রসিকতার ভঙ্গিতে বলল, "কিন্তু কেন বল তো সাদু? ক্ষমতা আর দাপট ওয়ালা মানুষদের গল্পগুলো তো দারুণ রোমাঞ্চকর হয়! আমি তো সবসময় স্বপ্ন দেখি, আমার জীবনে এমন একজন দাপুটে মানুষ আসবে যাকে পুরো পৃথিবী ভয় পাবে, কিন্তু সে শুধু আমার সামনে এসে বাচ্চা ছেলের মতো শান্ত হয়ে যাবে!"
সাদিয়া খিলখিল করে হেসে উঠল, "তোর এই সিনেমার মতো অবাস্তব স্বপ্ন যেন খুব দ্রুত সত্যি হয়, সেই দোয়াই করি।"
মারিয়া সঙ্গে সঙ্গে নিজের ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে কৌতুকপূর্ণ চোখে তাকাল, "তোর নিজের কখনো মনে হয় না যে এমন কোনো ক্ষমতাধর আর প্রভাব বিস্তারকারী মানুষের সাথে তোর জীবন জড়িয়ে যাক?"
সাদিয়া এক মুহূর্তও দেরি না করে দৃঢ় ও স্পষ্ট গলায় বলল, "আমার বাবা এসব রাজনৈতিক ক্ষমতা আর অহংকারী মানুষদের একেবারেই পছন্দ করেন না। আমার কাছে নিজের ছিমছাম, শান্ত আর সাধারণ জীবনটাই অনেক বেশি দামী।"
মারিয়া চোখের কোণ সরু করে সাদিয়ার মনের কথা জানার চেষ্টা করল, "তার মানে তোর নিজের মনের একদম কোনো কোণেও এমন ইচ্ছা কখনো উঁকি দেয় না?"
সাদিয়া সজোরে মাথা নেড়ে বলল, "একদম না! কোনোদিন সম্ভাবনাও নেই।"
সাদিয়ার এই চূড়ান্ত উত্তর শুনে মারিয়া আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। দুজন বান্ধবীর এই হাসাহাসি আর হালকা ঝগড়ার শব্দে সকালের কোলাহলপূর্ণ রাস্তাটা যেন এক মুহূর্তের জন্য আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।
কলেজের মূল ফটক পার হয়ে ভেতরের সবুজ আঙিনায় পা রাখতেই সাদিয়া আর মারিয়া বুঝতে পারল—শহরের কোলাহল আর চায়ের দোকানের আলোচনা এতক্ষণ শুধু বাইরের জগতেই সীমিত ছিল না। কলেজের পুরো চত্বরে আজ একই উত্তাপ ছড়াবে বলে অপেক্ষা করছিল।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েদের দল থেকে শুরু করে খেলার মাঠে বসে থাকা ছেলেদের আড্ডা, ক্যানটিনের আড্ডা কিংবা প্রশাসনিক ভবনের সামনে—সব জায়গায় একটাই আলোচনার বিষয়বস্তু। কেউ জারিপ রেহান তালুকদারের পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে কথা বলছে, কেউ তার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে মন্তব্য করছে, আবার কেউ ফোনে তার কোনো সাক্ষাৎকার বা ছবি অন্যদের দেখাচ্ছে।
সাদিয়া ক্লাসের দিকে যেতে যেতে চারপাশের এই অতিরিক্ত মাতামাতি লক্ষ করে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মারিয়ার দিকে তাকিয়ে হালকা বিরক্তি নিয়ে বলল, "কী একটা আজব পরিস্থিতি বল তো! কলেজের গেটে ঢোকার পর থেকে শুরু করে যেদিকে চোখ যাচ্ছে, সবাই শুধু ওই একটা নাম নিয়েই মেতে আছে! মানুষের কি পড়াশোনা বা কাজের কোনো চিন্তাই নেই?"
মারিয়া কোনো মন্তব্য করল না। সে সাদিয়ার মিষ্টি বিরক্তি দেখে ঠোঁটের কোণে রহস্যময় এক চিলতে হাসি ঝুলিয়ে রাখল। সাদিয়া তার এই রহস্যময় হাসি দেখে একটু সন্দেহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল, "তুই আবার এভাবে মিটিমিটি হাসছিস কেন বল তো?"
মারিয়া হাত দিয়ে নিজের ঠোঁট চেপে ধরে বলল, "কিছু না রে বোন! চল আগে ক্লাসে যাই, নয়তো জায়গা পাব না।"
সাদিয়া নিজের চোখের চশমাটা একটু ঠিক করে সোজাসুজি সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করল। তারা দুজন সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে নিজেদের নির্দিষ্ট শ্রেণীকক্ষের দিকে এগিয়ে গেল।
শ্রেণীকক্ষের দরজার সামনে পৌঁছাতেই তারা দেখতে পেল ভেতরটা অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ একটু বেশিই কোলাহলপূর্ণ। পেছনের সিটে তাদের তিন নম্বর বন্ধু তানভীর একা বসে একটা বড় খাতা উল্টে মনোযোগ দিয়ে কিছু দেখছিল। সাদিয়া আর মারিয়া ঘরে ঢুকে সোজা তানভীরের পাশের খালি রাখা দুটো সিটে গিয়ে বসল।
কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই এই তিনজনের বন্ধন দারুণ মজবুত। একে অপরের সুখ-দুঃখ, ভালো লাগা আর প্রতিদিনের খুচখাচ সব ঘটনার খবর শোনানো তাদের এক ধরনের প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
তানভীর বই থেকে মুখ তুলে দুজনের দিকে তাকাল। সাদিয়ার মুখের বিরক্তি আর মারিয়ার মুখের হাসি দেখে সে মৃদু হেসে বলল, "কী ব্যাপার বল তো? আজ সকাল সকাল দুজনের মুখ দুই মেরুর মতো কেন? বাইরে থেকে কী নিয়ে এত আলোচনা করতে করতে আসছিলি?"
মারিয়া উত্তর দেওয়ার আগেই সাদিয়া নিজের ব্যাগটা টেবিলে একটু জোরে রেখে বিরক্তি প্রকাশ করে বলল, "আর বলিস না তানভীর! পুরো শহর আর কলেজের মানুষ মনে হয় মাথা হারিয়ে ফেলেছে। ওই জারিপ রেহান তালুকদার নামটা শুনতে শুনতে আজ সকাল থেকে আমার কান পচে গেল!"
তানভীর সাদিয়ার কথা শুনে হা হা করে হেসে উঠল, "ওহ! তুইও তাহলে এই জোয়ারের কথা জেনে গেছিস? আসলে জারিপ তালুকদারের মতো তরুণ আর সফল ক্ষমতাধর ব্যক্তিত্ব এ শহরে আসা তো প্রতিদিনের সাধারণ ঘটনা নয়, তাই সবাই একটু বেশিই উত্তেজিত।"
সাদিয়া ভ্রূ কুঁচকে জবাব দিল, "তাই বলে পড়াশোনা ছেড়ে একটা অপরিচিত মানুষকে নিয়ে এতটা মাতামাতি করার তো কোনো যৌক্তিকতা দেখি না! সে ক্ষমতাশালী নাকি সাধারণ, তাতে আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের কী আসে যায়?"
মারিয়া পাশে বসে মাথা নেড়ে বলল, "তানভীর তুই ওকে বোঝাতে পারবি না। সাদিয়া এসব পাওয়ার আর গ্ল্যামারের গুরুত্ব বুঝতেই চায় না।"
সাদিয়া স্পষ্ট গলায় নিজের মতামত জানিয়ে বলল, "আমার এসব অহেতুক দাপট আর রাজকীয় জীবনের রূপ বোঝার কোনো ইচ্ছা বা প্রয়োজনও নেই। যে যার নিজের জায়গায় সফল, তা নিয়ে আমার কিছু বলার নেই। কিন্তু সবকিছুতে এই অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি আমার একদম পছন্দ নয়।"
ঠিক তখনই শ্রেণীকক্ষের কাঠের ভারী দরজাটা খুলে গেল। ক্লাসের দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যাপক গম্ভীর মুখে ভেতরে পা রাখলেন। তার হাতে মোটা বই আর এটেনডেন্স রেজিস্টার। শিক্ষকের আগমনে পুরো ক্লাসরুমের হইচই এক সেকেন্ডের মধ্যে নিভে গেল। সবাই নিজের নিজের সিটে সোজা হয়ে বসে পড়ার জন্য প্রস্তুত হলো।
অধ্যাপক চশমাটা নাকের ওপর একটু তুলে টেবিলের ওপর বইটা রাখলেন। শান্ত কিন্তু কড়া কণ্ঠে বললেন, "সবাই নিজেদের কথাবার্তা বন্ধ করো। খাতা বের করো, আমরা আজকের পাঠ শুরু করছি।"
শিক্ষকের আদেশে ক্লাসরুমের পরিবেশ সম্পূর্ণ শান্ত হয়ে এলেও শেষের দিকের কয়েকটা বেঞ্চে মৃদু আর অস্পষ্ট ফিসফাস কিন্তু পুরোপুরি থামানো গেল না। বইয়ের আড়ালে বা পাশের বন্ধুর কানে কানে অস্পষ্টভাবে সেই চেনা নামটাই বারবার উচ্চারিত হচ্ছিল—জারিপ রেহান তালুকদার।
আর সাদিয়া? সে তার খাতার নতুন পাতায় আজকের তারিখটা লিখে কলমের মুখ খুলে বসে রইল। সে নিজের সমস্ত মনোযোগ পড়ার দিকে ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। চারপাশের এই অতিরিক্ত মাতামাতি আর একটা অপরিচিত মানুষের নাম এভাবে ভেসে আসা তার মনের শান্তি বিঘ্নিত করছিল।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে, শত চেষ্টা সত্ত্বেও সাদিয়ার বুকের ভেতরের এক অচেনা কোণে যেন এক অজানা স্পন্দন বা কম্পন তৈরি হচ্ছিল। যে মানুষটিকে সে কখনো চোখের সামনে দেখেনি, যার সাথে তার জীবনের কোনো দূরতম যোগসূত্রও ছিল না, সেই সাধারণ একটা নামই আজ যেন চারপাশের বাতাসকে ভারী করে তুলছিল। সাদিয়া নিজের অজান্তেই খাতার এক কোণে কলম চেপে ধরে বসে রইল। সে তখনো বিন্দুমাত্র আঁচ করতে পারছিল না যে, যাকে সে এত অবহেলা আর বিরক্তি নিয়ে দূরে সরিয়ে রাখছে, সেই মানুষ্টির আগমনই তার পুরো ছিমছাম জীবনে এক ঝড় তুলে নিয়ে আসতে চলেছে—যে ঝড়ে বদলে যাবে তার সমস্ত ভবিষ্যৎ।
(চলবে...)