ফন্ট সাইজ:
থিম:
অন্তহীন প্রেম আমার

১৯তম পর্ব

লেখক: Afifa Afnan

#অন্তহীন_প্রেম_আমার

#আফীফা_আফনান

#পর্ব_১৯ (ক)

[কপি করা নিষিদ্ধ]

অনিকের শান্ত-নিরিবিলি ফ্ল্যাটটি আজ যেন এক জনাকীর্ণ উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু। যে ফ্ল্যাটে মাত্র দুজন মানুষের নীরব বসবাস , সেখানে আজ অনেকগুলো মানুষের হাসাহাসি আর প্রাণবন্ত আড্ডার গুঞ্জন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে বাসনের টুং-টাং শব্দ আর ঘষামাজার আওয়াজ। শাহাজ ঘরের কোণের সোফায় বসে স্তব্ধ হয়ে অনিকের সাজানো ফ্ল্যাটে ঘটে যাওয়া এই মধুর ‘তাণ্ডব’ অবলোকন করছে।

​ভোরের সেই স্নিগ্ধ আবহাওয়া আর ঝিরঝিরে বৃষ্টির মাঝেই খন্দকার বাড়ির রমণীকুল অতর্কিতে হানা দিয়েছে অনিকের ফ্ল্যাটে। তখন ঘুমকাতুরে চোখে শাহাজ যখন দরজা খুলেছিল, সামনে রুহিকে দেখে সে চমকে গিয়েছিল। বিশ্বাসই করতে পারছিল না এত ভোরে রুহি এখানে আসবে। কিন্তু মুহূর্ত কয়েকের মাঝেই শাহাজকে বড় ধাক্কা দিয়ে আড়াল থেকে হাসিমুখে বেরিয়ে এলেন তানজিনা বেগম, ইয়াসমিন বেগম, নাসরিন বেগমসহ রুবি, রিমু আর ছোট মুগ্ধ। প্রত্যেকের ঠোঁটে অমায়িক হাসি। মুগ্ধ তো শাহাজকে দেখামাত্রই এক লাফে তার কোলে উঠে পড়ল। এরপরেই শাহাজকে একপাশে ঠেলে দিয়ে একে একে তারা সগৌরবে ফ্ল্যাটের ভেতর প্রবেশ করলেন।

​বিস্ময় কাটিয়ে শাহাজ যখন তার মাকে জিজ্ঞেস করল, “এত সকালে তোমরা এখানে মা? তোমরা জানলে কীভাবে আমি কত তলায় কোন ফ্ল্যাটে থাকি?”

শাহাজের কথায় তার কোলে থাকা মুগ্ধই সবার আগে জট খুলল, “বড় ভাইয়া রুহিপু বলেছে তুমি এখানে থাকো!”

শাহাজ এবার রুহির দিকে কিছুটা সন্দিহান চোখে তাকাল। রুহি সাথে সাথেই দৃষ্টি সরিয়ে নিল। শাহাজ এবার মায়ের দিকে তাকিয়ে আবারও জিজ্ঞেস করল, “এখানে এসেছো বাবা জানে? বাবা কিছু বলেনি? আজ ছুটির দিন, আর তোমরা না থাকলে বাড়িতে সবার জন্য রান্না কে করবে?

​ইয়াসমিন বেগম আশ্বস্ত করে বললেন, “টেনশন করিস না শাহাজ, বড় ভাই কিছুই বলেনি। সবাই জানে আমরা এখানে আসব। আর রান্না? সে তো ভোরে উঠেই সব সেরে তবেই এসেছি।” এরপর আর কোন কথা না, শুধু শুরু হলো মা-চাচিদের চিরচেনা কর্মযজ্ঞ।

​শাহাজ দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকালো; ৮:২০ বাজতে চলেছে, কিন্তু তাদের কাজের যেন শেষ নেই। শাহাজ অনেকবার বারণ করেছে। কারণ তার অপরিষ্কার স্থানে থাকা বা অন্যের ব্যবহৃত ময়লা জিনিসপত্রে বড্ড সমস্যা হয়, যা শাহাজের দীর্ঘদিনের অভ্যাস। তাই ফ্ল্যাটে ওঠার আগেই অনিক একজন মহিলা দিয়ে পুরো ঘর ক্লিন করিয়ে রেখেছিল যেন শাহাজের কষ্ট না হয়। শাহাজ কথাটি তানজিনা বেগমকে জানিয়ে এসব কাজ করতে বারণ করল। কিন্তু তানজিনা আর নাসরিন বেগমের এক কথা—হাজার পরিষ্কার থাকলেও বাইরের মানুষের কাজ আর ঘরের মানুষের হাতের কাজের মাঝে আকাশ-পাতাল তফাৎ!

​তানজিনা বেগম আর ইয়াসমিন বেগম এখন রান্নাঘর সামলাচ্ছেন। তানজিনা বেগম তাক, কৌটা আর মেঝের টাইলস ঘষে চকচকে করছেন, আর ইয়াসমিন বেগম চুলায় রান্না চাপিয়েছেন। ওদিকে অনিক প্রথমে সবাইকে দেখে ঘাবড়ে গেলেও এখন সে-ও শাহাজের মা আর মেজো মায়ের সাথে রান্নাঘরে বসে পেঁয়াজ-রসুন কাটছে আর জমিয়ে গল্প জুড়েছে। অন্যদিকে, নাসরিন বেগম অনিক আর শাহাজের সারা সপ্তাহের জমানো ময়লা কাপড়, বেডশিট আর পর্দা নিয়ে ঢুকেছেন বাথরুমে। অনিক আর শাহাজ দুজনেই বহু বারণ করেছে, অনিক তো লজ্জায় একপ্রকার টেনে নিয়েছিলো কাপড়ের স্তুপ কিন্তু নাসরিন বেগম সেসব কানেই তুললেন না।

​পিছিয়ে নেই রুবি, রিমু আর রুহিও। রুবি আর রিমু মিলে রুমের নতুন পর্দা টাঙাচ্ছে আর কুশনগুলো বদলে ঘর গুছিয়ে দিচ্ছে। রুহিও সোফার পাশে থাকা ফুলদানি আর সুন্দর শোপিসগুলো কাপড় দিয়ে মুছে সযত্নে সাজিয়ে রাখছে। আর মুগ্ধ করছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ—সে রুবির ফোন নিয়ে ঘুরে ঘুরে সবার ভিডিও করছে, বাড়িতে গিয়ে দাদিকে দেখাবে বলে।

​বাইরে তখন ঝিরঝিরে বৃষ্টির বদলে এখন শুরু হয়েছে ঝুম বৃষ্টি। আকাশ ফেটে মেঘের গর্জন আর বজ্রের বাহারি ঝিলিক থাই গ্লাসের আড়ালে ভেসে উঠছে। কালো মেঘের আচ্ছাদনে দিনের বেলাতেও যেন সন্ধ্যার অন্ধকার ধরনীতে নেমে এসেছে। তবে ঘরের ভেতরে বিদ্যুতের আলো থাকায় সব ঝকঝকে।

​রুহির বরাবরই মেঘের গর্জন আর বিদ্যুতের চমকানিতে ভীষণ ভয়। প্রচণ্ড শব্দে যখন চারপাশ কেঁপে উঠছিল, রুহি আর স্থির থাকতে পারল না। হাতের কাজ শেষ করে সে দ্রুত শাহাজের পাশে গিয়ে চুপচাপ বসে পড়ল। তার ভীত দৃষ্টি বারবার শাহাজের দিকেই নিবদ্ধ। কিন্তু শাহাজ তখন গভীর মনোযোগে সামনের দিকে তাকিয়ে। রুহি যখন তার দৃষ্টি সরিয়ে নিল, ঠিক তখনই শাহাজ আড়চোখে রুহির দিকে তাকালো। আসলে রুহি আসার পর থেকেই শাহাজের চোখজোড়া বারবার ওর দিকেই ফিরছিল, কিন্তু রুহি তাকালেই সে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিচ্ছে। এ যেন এক অদ্ভুত চোখের লুকোচুরি খেলা—যা এই বৃষ্টির দিনে অনিকের ফ্ল্যাটে এক নিরব কাব্য তৈরি করছে

বাইরে তখনো মেঘের গর্জন আর বজ্রের তাণ্ডব বহমান। রুহি এক প্রকার জড়সড় হয়ে শাহাজের পাশে সোফায় বসে আছে। এরই মাঝে রুবি আর রিমু শাহাজের সামনে এসে দাঁড়ালো। রুবি সরল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “ভাইয়া, তোমার রুম কোনটা?”

​অনিকের এই ফ্ল্যাটটি বেশ বড়। সাধারণত তিনটি বেডরুম—দুটো মাস্টার বেডরুম, একটি গেস্ট রুম, সাথে বিশাল ড্রয়িং রুম আর কিচেন।

শাহাজ রুবির দিকে তাকিয়ে প্রতিউত্তর করল, “ডান পাশের রুমটা আমার, কিন্তু কেন?”

​রুবি বলে উঠল, “মা বলল তোমার রুমে নতুন বেডশিট আর পর্দা টাঙিয়ে দিতে, তাই যাচ্ছিলাম।”

​শাহাজ মাথা নাড়লে তারা রুমের দিকে অগ্রসর হয়। হঠাৎ শাহাজ কিছু একটা ভেবে রুহির দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, “রুহি, তোর কি কোনো কাজ আছে?”

​রুহির দৃষ্টি তখন থাই গ্লাস পেরিয়ে বাইরের বৃষ্টির দিকে নিবদ্ধ ছিল। শাহাজের কণ্ঠ কানে আসতেই সে মুখ ঘুরিয়ে তাকালো এবং মাথা দুপাশে নেড়ে জানালো যে তার এই মুহূর্তে আর কোনো কাজ নেই।

শাহাজ এবার রুবি আর রিমুকে ডাকলো, রুবি ও রিমু সবে মাএ শাহাজের রুমের দরজা খুলে ভেতরে পা রেখেছিলো, কিন্তু শাহাজের ডাকে আবারও তার কাছে ফিরে আসে, তারা আসতেই শাহাজ দুজনকে উদ্দেশ্য করে বলল, “তোরা আগে অনিকের রুমটা সুন্দরভাবে গুছিয়ে দে, আমার রুমটা রুহি গুছিয়ে দেবে।”

এরপর রুহির দিকে ফিরে শীতল কিন্তু গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “পারবি না আমার রুম গোছাতে?”

​শাহাজ ভাই কাজ দিয়েছে আর রুহি পারবে না, তা কি হয়? সে হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলল, “পারব শাহাজ ভাই।”

অতপর রুবি ও রিমু অনিকের রুমের দিকে গেলে, ​রুহিও শাহাজের রুমের দিকে পা বাড়ালো। ভেতরে ঢুকতেই তার চক্ষু চড়কগাছ! রুমটি অত্যন্ত পরিপাটি। নেভি ব্লু আর গ্রে কালারের সংমিশ্রণে দেয়ালের রঙ যেন আভিজাত্য ছড়াচ্ছে। রুমের প্রতিটি আসবাবপত্র—খাট থেকে শুরু করে কাবার্ড, সবকিছুর মধ্যেই এক অদ্ভুত রুচির ছাপ। কাবার্ডের সাথে অ্যাটাচড ড্রেসিং টেবিলের ওপর শাহাজের নিত্যব্যবহার্য জিনিসগুলো নিখুঁতভাবে সাজানো। রুহি কৌতূহলী হয়ে হাত দিয়ে প্রতিটি জিনিস নাড়াচাড়া করে দেখতে লাগল। হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল একটি দামী পারফিউমের ওপর। অত্যন্ত সুন্দর সেই কাঁচের বোতল। রুহি ঢাকনা খুলে একটু স্প্রে করতেই রুমের চারপাশ 'Tom Ford Private Blend' এর চন্দন আর কস্তুরীর মনমাতানো সুবাসে ভরে উঠল।

​এরই মাঝে হঠাৎ মুগ্ধ রুমে ঢুকে বলল, “আপুই, তোমার রুম গোছানো শেষ?”মুগ্ধ আসায় রুহি চট করে পারফিউমটি সাবধানে রেখে তড়িঘড়ি নিজ কাজে মন দিল। সে প্রথমে জানালার পর্দাগুলো টাঙালো, তারপর বালিশের কভার বদলে নতুন বেডশিট বিছিয়ে পুরো রুমটি আয়নায় মতো ঝকঝকে করে তুলল। মুগ্ধ এক কোণায় দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। হঠাৎ বাইরে থেকে শাহাজের কন্ঠে মুগ্ধের ডাক পড়লো। বাহিরে বৃষ্টির তেজ কমলেও বিদ্যুতের ঝলকানি তখনো থামেনি। শাহাজের ডাক শুনে মুগ্ধ রঁহিকে রেখেই দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

​রুহির কাজ প্রাই শেষ, সে তার কাজ শেষ করে যেই না রুম থেকে বের হতে যাবে, অমনি পুরো ফ্ল্যাটের বাল্বগুলো হঠাৎই বন্ধ হয়ে যায়। একদিকে আকাশে মেঘাচ্ছন্ন অন্ধকার, তার ওপর ভারি পর্দা টাঙানো, তার ওপর হঠাৎই কারেন্ট চলে গেলো—মুহূর্তেই শাহাজের ঘরটি যেন ঘুটঘুটে অন্ধকারে নিমজ্জিত হলো। রুহি বেশ ভয় পেল। সে অন্ধকারেই হাতড়ে হাতড়ে এগোতে এগোতে মুগ্ধ আর রুবিকে ডাকতে শুরু করলো।

রুহি যখন দরজার খুব কাছাকাছি হঠাৎ সে শক্ত কোনো কিছুর সাথে ধাক্কা খেল—কারো বলিষ্ঠ বুক! অন্ধকারে আবছা দেখা যাচ্ছে এক দীর্ঘদেহী অবয়ব যার চেহারা অন্ধকারে অস্পষ্ট। রুহি ভয়ে পেছাতে শুরু করলো, পেছাতে পেছাতে সে গিয়ে পেছনে থাকা কাঠের আসবাবের সাথে ধাক্কা খেল। যার ফলে সে আর নড়তে পারছে না।

রুহি ভয়ে আতঙ্কে কম্পিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “কে... কে এখানে?”

​সামনের জন নীরব। যেন রুহির কথা তার কানে পৌছায়নি!

রুহি এবার ধমকানো কণ্ঠে বলল, “কথা বলছেন না কেন?”

​হঠাৎ সামনে থেকে শব্দ এলো— “হুঁশশশশ!”

রুহি এবার ভয়ে আরো জড়োসড়ো হয়ে যায়, সে ভয়ে চিৎকার দিতে যাবে, তখনই সেই বলিষ্ঠ হাতের তালু রুহির মুখ চেপে ধরল। রুহি নড়াচড়া করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো। রুহি মোচড়ানো শুরু করেছে, কিছুক্ষণ পর তার মুখের বাঁধন হঠাৎ হালকা হলো। সাথে সাথেই রুহি ভয়ে চোখ-মুখ খিঁচে বন্ধ করে ফেলে। তখনই দেশলাই কাঠি জ্বালানোর খসখস শব্দ শোনা গেল। রুহি চোখ খুলতেই দেখল তার ঠিক সামনে একটি জ্বলন্ত কাঠি। সেই হলদেটে আলোয় ফুটে উঠেছে তার শাহাজ ভাইয়ের মুখমণ্ডল।

​শাহাজ এক অদ্ভুত ঘোর লাগানো দৃষ্টিতে রুহির দিকে তাকিয়ে আছে। রুহি দেখলো দেশলাইয়ের শিখা শাহাজের তীক্ষ্ণ ফিচারের ওপর এক মায়াবী ছায়া ফেলেছে। রুহি হঠাৎ খেয়াল করল তার হৃদস্পন্দন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। যেন হৃদয় ভেতর থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। এদিকে ততক্ষনে শাহাজের হাতে থাকা জ্বলন্ত কাঠিটি জ্বলে নিভে গেলো। রুহিও নিজের চোখজোড়া বন্ধ করে নিজের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করছে। শাহাজ আরও একটি কাঠি জ্বালালো। রুহি আবারও চোখ খুলল। এই নিবিড় নৈঃশব্দ্যে দুজনের নিঃশ্বাস একে অপরের মুখে আছড়ে পড়ছে। রুহি খেয়াল করলো তাদের দুজনের মাঝে মাত্র কয়েক সেন্টিমিটারের ব্যবধান। রুহি কিছু বলতে চাইল, কিন্তু কথাগুলো যেন গলায় এসে আটকে আছে। এটি কি কেবল ভয়, নাকি এক অমোঘ আকর্ষণ? রুহি দিশেহারা বোধ করছে।

​বাইরে তখন হৈচৈ শুরু হয়েছে। জানা গেল, বিল্ডিং এর সবার ফ্ল্যাটে বিদ্যুৎ আছে শুধুমাত্র অনিকের ফ্ল্যাটেই নেই। পাশের বাসার এক উৎসুক মহিলা অনিকের বাড়িতে আজ এতো মানুষ আসায় দেখতে এসেছিলো। এসে অনিকের সাথে কথা বলার সময় হঠাৎ দেখতে পান মেইন সুইচ অফ করা। এদিকে শাহাজ ও রুহি এখনো রুমে একে অপরের সামনে দাড়িয়ে। যেন কোন দিকেই তাদের খেয়াল নেই। হঠাৎ কারেন্ট ফিরে আসতেই পুরো অন্ধকার রুম আলোকিত হয়ে উঠল। কারেন্ট আসার সাথে সাথেই শাহাজ রুহি থেকে ছিটকে দূরে সরে দাঁড়ালো।

কণ্ঠস্বর আবার সেই আগের মতো গম্ভীর ও শীতল— “তোর কাজ হয়ে গেলে রুম থেকে বেরিয়ে যা।”

​শাহাজের কথা শেষ হওয়ার আগেই রুহি প্রায় ছুটে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। এরপরে যতক্ষন সে ফ্ল্যাটে ছিলো আর একবারের জন্যও শাহাজের সামনে আসেনি।

​এদিকে নাসরিন, তানজিনা আর ইয়াসমিন বেগম পুরো ফ্ল্যাট ধুয়ে-মুছে সাফ করে ফেলেছেন। ইয়াসমিন বেগম শাহাজের জন্য কয়েক দিনের রান্না একবারে করে রেখেছেন। কাজ শেষে দুপুর বারোটার দিকে তারা ফেরার প্রস্তুতি নিলো। যাওয়ার আগে অনিকের সাথে নাসরিন বেগমের বেশ সখ্যতা তৈরি হয়েছে। অনিক পেশায় একজন কার্ডিওলজিস্ট বা হৃদরোগের ডাক্তার। ছোটবেলায় মা-বাবাকে হারিয়ে সে নিঃসঙ্গ জীবন কাটায়। তার একমাত্র বোন নিজ সংসার নিয়ে সিলেটে থাকে। অনিকের একাকীত্বের কথা শুনে নাসরিন বেগমের খুব মায়া হলো। তিনি পরম মমতায় তাকে ছেলের মতোই আগলে নিলেন। রিমুর সাথেও অনিকের পরিচয় করিয়ে দিলেন, যেহেতু রিমুও একজন মেডিকেল স্টুডেন্ট।

অন্যদিকে ​মোল্লা বাড়ির সেই বৃষ্টির সকালটি রুহির মনে এক অন্যরকম রোমাঞ্চ আর অব্যক্ত অনুভূতির ছাপ রেখে গেল, যা সে হয়তো কখনোই ভুলতে পারবে না।

*********

সবাই বেরিয়ে যাওয়ার পর অনিক এসে শাহাজের পাশের সোফাটায় ধপাস করে বসল। তার মুখটা রাগে থমথমে। শাহাজের দিকে তাকিয়ে বিরক্তি নিয়ে সে বলে উঠল, “কোন এক হতচ্ছাড়া আজ কত বড় ফালতু কাজ করেছে তুই জানিস?”

​শাহাজ তখন ইয়াসমিন বেগমের বানিয়ে দিয়ে যাওয়া কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিল। সে স্বাভাবিক কণ্ঠেই জিজ্ঞেস করল, “কী কাজ?”

​অনিক এবার যেন ফেটে পড়ল, “কোন শয়তানের বাচ্চা শয়তান কে জানে আমাদের ফ্ল্যাটের মেইন সুইচ অফ করে দিয়েছিল? পুরো দশটা মিনিট কারেন্ট ছিল না! ওই শয়তানটাকে যদি একবার পাই, আমি...”

​অনিক তার কথা শেষ করার আগেই শাহাজ শীতল আর শান্ত গলায় বলে উঠল, “আমার বাবা-মাকে একদম শয়তান বলবি না, নাহলে থাপ্পড় মেরে তোর ৩২টা দাঁত নড়িয়ে দেব।”

​শাহাজের মুখে এমন কথা শুনে অনিক পুরো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে শাহাজের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আমতা আমতা করে বলল, “আস্তাগফিরুল্লাহ দোস্ত ! আমি কেন আন্টি-আঙ্কেলকে শয়তান বলতে যাব? এমন কথা বলার আগে আল্লাহ যেন আমার জবান বন্ধ করে দেন!”

​শাহাজ কফির কাপটা ধীরস্থিরভাবে টেবিলের ওপর রাখল। তারপর অনিকের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “মাত্রই তো বললি শয়তানের বাচ্চা শয়তান।”

​অনিক এবার সত্যিই হোঁচট খেল। সে চোখ ছোট ছোট করে সন্ধিহান কণ্ঠে প্রশ্ন করল, “আমি তো বলেছি ওই শয়তানটাকে যে কারেন্টের মেইন সুইচ অফ করেছে। ওটা তো আর তুই করিসনি...”

হঠাৎ কিছু একটা মাথায় আসতেই অনিক বড় বড় চোখ করে শাহাজের দিকে তাকিয়ে আর্তনাদ করে উঠল, “তার মানে কি মেইন সুইচ তুই অফ...?”

​বাক্যটি শেষ হওয়ার আগেই শাহাজ নির্লিপ্ত স্বরে স্বীকার করল, “আমিই করেছিলাম।”

​অনিক এবার পুরোপুরি স্তম্ভিত। সে অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করল, “তুই মেইন সুইচ অফ করেছিস? কিন্তু কেন দোস্ত?”

​শাহাজ এবারও সেই একই রকম নির্লিপ্ত আর গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিল, “প্রেম করতে।”

​কথাটি বলেই শাহাজ টেবিল থেকে নিজের কাপটি তুলে নিল এবং গটগট করে নিজের রুমে ঢুকে দরজাটা সজোরে বন্ধ করে দিল। রুমের ভেতরে পা রেখেই সে এক দীর্ঘ ও প্রাণভরা নিশ্বাস নিল। চারদিকের বাতাসে এখনো সেই চন্দন আর কস্তুরীর সুবাসের সাথে মিশে আছে রুহির স্নিগ্ধ অস্তিত্ব। শাহাজ যেন রুমের প্রতিটি কোণায়, প্রতিটি ধূলিকণায় রুহিকে অনুভব করতে লাগল।

হঠাৎ শাহাজ বিড়বিড় করে গেয়ে উঠলো,--------

চাঁদেরও আলো দিয়ে

মুখখানি দেখবো....

পেয়ো নাকো লজ্জা

খুব কাছে রাখবো....

~~~~~~

সইতে পারবো না

হারানোর ব্যাথা....

বলে তো দিয়েছি

আমি হৃদয়ের কথা..... "চঞ্চলা"

​অন্যদিকে, ড্রয়িং রুমের সোফায় অনিক তখনো বোকার মতো হতবিহ্বল হয়ে বসে আছে। শাহাজ তাকে মাত্র কী বলে গেল, সেটা মাথায় ঢোকাতেই তার বেশ সময় লাগল। হঠাৎ অনিকের মনে পড়ল, কারেন্ট আসার সময় সে ড্রয়িং রুমে সবাইকে দেখলেও রুহিকে একটিবারের জন্যও দেখেনি। এমনকি চলে যাওয়ার সময়ও রুহি সবার আগে নিচে নেমে গিয়েছিল। অনিক একে একে দুই আর দুইয়ে দুইয়ে চার মেলালো। এতক্ষণের ধোঁয়াশা কাটিয়ে সবকিছু এখন তার কাছে পানির মতো পরিষ্কার।

​হঠাৎ করেই অনিকের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে আপন মনেই হেসে কুটি কুটি হয়ে বলে উঠল, “লে হালুয়া! ঠেলা এবার সামলা! বন্ধু আমার তো দেখি তলে তলে অনেক দূর এগিয়েছে!”

চলবে__________

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন