ফন্ট সাইজ:
থিম:
অন্তহীন প্রেম আমার

২০তম পর্ব

লেখক: Afifa Afnan

#অন্তহীন_প্রেম_আমার

#আফীফা_আফনান [পোষ্টটি সামনে গেলে রেসপন্স করবেন]

#পর্ব_১৯ (খ)

[কপি করা নিষিদ্ধ]

বৃষ্টি মাখা বর্ষণে সকালের সেই অদ্ভুত শিহরণ আর শাহাজের স্বীকারোক্তির পর অনিকের ফ্ল্যাটে নেমে এসেছিল এক গভীর নীরবতা। দেখতে দেখতে আষাঢ়ের মেঘলা দিনটিও যেন ফুরিয়ে এল। রাতের আকাশে এখন আর বজ্রের গর্জন নেই, তবে আষাঢ়ের ঝিরঝিরে বৃষ্টি অবিরাম ঝরে চলেছে।

​রাত তখন নয়টার কাছাকাছি। পুরো শহর যেন বৃষ্টির চাদর গায়ে দিয়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। অনিক তার ঘরে ঘুমানোর তোড়জোড় করছিল, কিন্তু শাহাজের তখনকার বলা কথাগুলো তার মস্তিষ্কে বারবার যেন হাতুড়ি পিটছে। সে মনে মনেই ভাবল, বন্ধুর মনের ওই গোপন খবরটা আজ না জানলে তার রাতে আর ঘুম হবে না।

যেমন ভাবনা তেমন কাজ, ​অনিক ধীরপায়ে গিয়ে শাহাজের ঘরের দরজায় নক করল। ভেতর থেকে শাহাজের গম্ভীর আওয়াজ , "আয়।"

​অনিক ভেতরে ঢুকেই দেখল, শাহাজ জানালার কাছে দাঁড়িয়ে বাইরে রাতের অন্ধকারে প্রকৃতি লীলাখেলা দেখছে। রুমের বাতি নেভানো, শুধু রাস্তার ধারের ল্যাম্পপোস্টের হলদেটে আলো জানালার পর্দা গলে ঘরের দেয়ালে যেন এক মায়াবী ছায়া ফেলেছে। পুরো রুমে এখনো হালকা চন্দন আর কস্তুরীর সুবাস যেন মৃদু স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে দিয়েছে।

​অনিক গিয়ে শাহাজের কাঁধে হাত রাখল। কিছুটা মজা আর কিছুটা বিস্ময় নিয়ে বলে উঠল, "শোন হতচ্ছাড়া, দিনের বেলা তো বলে দিলি 'প্রেম করতে' মেইন সুইচ অফ করেছিস। কিন্তু পুরো ঘটনাটা না শুনলে তো আমার পেটের ভাত হজম হচ্ছে না। তুই আর রুহি... মানে ব্যাপারটা ঠিক কী?"

​শাহাজ জানালা থেকে দৃষ্টি ফেরাল না। তার শান্ত আর গভীর চোখে যেন রাতের অন্ধকারের চেয়েও বেশি রহস্য। সে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "ব্যাপারটা খুব সহজ অনিক। মেয়েটা আমার সুখ শান্তি, রাতের ঘুম সব কেড়ে নিয়েছে সব। তাই শাস্তি দিচ্ছিলাম।"

​অনিক এবার বেশ অবাক হলো। সে জানত শাহাজ প্রচণ্ড নীতিবান আর গম্ভীর মানুষ, সেই সাথে বেশ ভদ্র কিন্তু একটু চাপা স্বভাবে। অনিকের মতে,

শাহাজ না কখনো কারো সাথে বেয়াদবি করেছে, আর না তাকে কখনো কোন অন্যায়ের সাথে আপোষ করতে দেখেছে। এমনকি শাহাজ কোন মেয়ের সাথে কথা বললেও তার নজর থাকে পায়ের নখের দিকে। সেই শাহাজ আজ এমন কথা বলছে! তা যেন অনিকের কাছে অবিশ্বাস্য।

অনিক মুচকি হাসে অতপর বলে, "তুই তো দেখি বড় খতরনাক খিলাড়ি! অন্ধকারে মেইন সুইচ অফ করে রুহিকে ভয় পাইয়ে দিয়ে রোমান্স থুরি থুরি শাস্তি দিচ্ছিলি? বাহ্! আর আমি ভাবলাম কথাটি বলেই সে দাঁত কেলিয়ে হেসে ওঠে!"

​শাহাজ এর দৃষ্টি তখনও জানালার বাহিরে, সে মুচকি হাসল তবে সেই হাসিতে ছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তি। সে বাহিরেই দৃষ্টি রেখে বলল, "প্রেম তো আসলে ওই কারেন্টের বাল্বের মতোই অনিক। যখন আলো থাকে, তখন আমরা সবকিছুই যুক্তিতে বিচার করি। কিন্তু যখন অন্ধকার হয় তখন ওই আলোরই গুরুত্ব বেশি দেখা যায়।

তেমনই অন্ধকারের ওই সামান্য কয়েকটা মিনিট আমাকে বুঝিয়ে দিয়ে গেছে যে, রুহিহীন আমার জীবনটা কতটা ফ্যাকাসে। ও যখন আমার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল, ওর সেই দৃষ্ট, সেই চাহুনি ওর হৃদস্পন্দন আর আমার নিশ্বাস যেন এক হয়ে গিয়েছিল।"

​অনিক এবার হাসফাস করতে করতে সোফায় বসে পড়ল। "লে হালুয়া! আমার কড়া মেজাজের বন্ধু তো দেখি আস্ত এক কবি হয়ে গেছে! আন্টি আর আঙ্কেল যদি জানতে পারে তুই কারেন্ট অফ করে অন্ধকারে তাদের আদরের ভাইজির সাথে চোখের লুকোচুরি খেলছিলি, তাহলে তোকে আর আস্ত রাখবে না।"

"বাবা সব জানে"! শাহাজের নির্লিপ্ত জাবাব।

অনিক কথাটি শুনে সাথে সাথে দাড়িয়ে গেলো, অবাক হয়ে বললো আঙ্কেল জানেন! আর আন্টি?

"হয়তো না! হয়তো বাবা জানতে দেয়নি!" শাহাজের সহজ স্বীকারোক্তি।

​শাহাজ আর কিছু বলল না। সে এগিয়ে গিয়ে আলতো করে টেবিলের ওপর রাখা সেই পারফিউমের বোতলটি হাতে নিল, যেটি সকালে রুহি ছুঁয়েছে। রাতের এই নীরবতায়, বৃষ্টির শব্দকে সঙ্গী করে সে যেন আরও একবার রুহিকে অনুভব করল।

অনিক শাহাজকে দেখলো মাথা দুপাশে নেড়ে মুচকি হসলো অতপর বিদায় নিয়ে যাওয়ার সময় পেছন ফিরে আরেকবার টিপ্পনি কাটল, "বন্ধু, পরের বার রোমান্স করতে চাইলে আমাকে আগে থেকে বলিস, আমি নিজ হাতে সুইচ অফ করে দিয়ে বাইরে থেকে তালা মেরে তারপর ঘুরতে যাব!"

​শাহাজ ততক্ষণে বিছানার পাশে দাড়িয়েছে, অনিকের দুষ্টামি কথায় বিছানা থেকে ছোট একটা বালিশ ছুঁড়ে মারল বন্ধুর দিকে। অনিক ততক্ষণে পগাড় পাড়। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হতেই শাহাজ আবার জানালার কাছে ফিরে গেল। রাতের আকাশে মেঘের আড়ালে চাঁদ ঢাকা পড়ে আছে, ঠিক যেমন শাহাজের মনে রুহির প্রতি ভালোবাসাটা এতদিন সবার অগোচরে ঢাকা পড়ে ছিল। কিন্তু আজকের ওই অন্ধকারের কয়েকটা মিনিট কারো হৃদয়ে হয়তো সবকিছু পরিষ্কার করে দিয়ে গেছে।

*************

রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে জানালার ওপাশে বৃষ্টির রিনিঝিনি শব্দ হচ্ছে। রুহি তার ডায়েরিটা কোলে নিয়ে বসেছে। আজকের ওই কয়েক মিনিটের অন্ধকার যেন তার পুরো অস্তিত্বকে ওলটপালট করে দিয়েছে। কলম হাতে নিয়ে সে ডায়েরির শেষ পাতায় কাঁপা কাঁপা হাতে মনের গভীরের অনুভূতিগুলো লিখতে শুরু করল:

​"আজকের সকালটা ছিল এক অন্যরকম, যেন মেঘের আচ্ছনতা মাখা কুয়াশায় ঘেরা। শাহাজ ভাইয়ের ওই শান্ত ঘরের অন্ধকারে যখন আমি পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম, তখন হঠাৎ মনে হলো পৃথিবীটা থমকে গেছে। ভয় আর একরাশ উৎকন্ঠা আমাকে গ্রাস করছিলো, কিন্তু হঠাৎ কারো বলিষ্ঠ বুকের উষ্ণতা আর দেশলাইয়ের ওই ক্ষণস্থায়ী আলোতে আমি যাকে দেখেছি, তার চোখের গভীরতা আমাকে যেন এক অদ্ভুত ঘোরে নিয়ে গিয়েছে। আমার তীব্র হৃদস্পন্দন কি উনি শুনতে পেয়েছেন? জানি না এটা মোহ নাকি অন্যকিছু, কিন্তু ওই কয়েকটা মুহূর্তের জন্য আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। উনার শীতল কণ্ঠের শাসন আর ওই রহস্যময় চাহনি—সব মিলিয়ে শাহাজ ভাই যেন এক জটিল উপন্যাস, যার প্রতিটা পাতা আমি বারবার পড়তে চাই! কিন্তু চেষ্টা করেও আমি যেন ব্যর্থ, ভিষণভাবে ব্যর্থ।"

​লেখা শেষ করে রুহি যখন ডায়েরিটা বন্ধ করল, ঠিক তখনই নিচ থেকে তানজিনা বেগমের কণ্ঠ ভেসে এল— "রুহি, মা নিচে আয়! রাতের খাবার দেওয়া হয়েছে। তোর বড় আব্বু অপেক্ষায় আছেন।"

​রুহি বরাবরের মতো বিছানার তোশকের নিচে ডায়েরিটা লুকিয়ে রেখে দ্রুত নিচে নেমে গেল। ডাইনিং টেবিলে আজ সবাই উপস্থিত। খাওয়া শেষে বড়দের আড্ডায় পিয়াস আজ বেশ ফুরফুরে মেজাজে বসে আছে, সবাই খোশ গল্পে মাতোয়ারা। ডাইনিং টেবিলে তখন শুধু তানজিনা বেগম, নাসরিন বেগম ও রুহি বসে খাবারের শেষ পর্বে আছে। রুবি, মুগ্ধ, রিমু ইতিমধ্যে খেয়ে যার যার রুমে শুতে চলে গেছে, অন্যদিকে ইয়াছমিন বেগম আছে মমতাজ বেগম এর রুমে তাকে রাতে ঔষধ দিবেন।

আড্ডার আসরে কথায় কথায় শাহাবুদ্দিন সাহেব হঠাৎ পিয়াসের কাজের খবর জানতে চাইলে পিয়াস গলা ঝেড়ে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করল। সে আড়চোখে ডাইনিং এ খেতে থাকা রুহিকে দেখে নিয়ে মোস্তফা কামালের দিকে তাকিয়ে বেশ চড়া গলায় বলে উঠলো :

​"আসলে বড় আব্বু, আমি তো প্রফেশনাল সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, আমার ডিমান্ড তো সবসময়ই বেশি। দেশের নামকরা একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি থেকে আজ বড় অংকের স্যালারিতে জবের অফার পেয়েছি। ওরা আমার মতো ট্যালেন্ট হাতছাড়া করতে চায় না।"

​পিয়াস কথাগুলো রুহিকে শুনিয়েই বলছিল, যেন সে রুহিকে বোঝাতে চায় যে সে কতটা সফল আর ক্ষমতাবান। বাড়ির সবাই পিয়াসের কথায় খুশি হয়ে বাহবা দিতে শুরু করলো কিন্তু রুহি ছিলো একদম স্বাভাবিক, খাবার শেষ করে টেবিল থেকে প্লেটটা সরিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। রান্না ঘরে প্লেট রেখে বেসিনে হাত ধুয়ে সে পিয়াসের দিকে একটিবারের জন্যও না তাকিয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালো। পিয়াসের আত্মগর্বী কথাগুলো যেন তার কানেই পৌঁছায়নি।

​রুহি হাত ধুয়ে ধীর পায়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সাথে মনে মনে হাসল। পিয়াস যখন ভাবছিল রুহি অন্তত একবার তার সাফল্যের কথা শুনে অবাক হবে, অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাবে, কিন্তু রুহি তেমন কিছু না করেই তাকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করে গটগট শব্দে উপরে চলে গেল।

​পড়ন্ত রাতে পিয়াসের সকল ভাবনায় পানি ঢেলে রুহি যখন নিজ গন্তব্যে ছুটলো, তখন আরো একবার অপমানে পিয়াসের চেহারার রং পাল্টে গেলো। সে আবারও নিজের দাঁত কিড়মিড় করতে লাগল। রুহির এই উপেক্ষা যেন এখন তার হৃদয়ে তার সদ্য হওয়া জবের অফারের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়াল।

**********

রুহি নিজের রুমে খাটের ওপর গা এলিয়ে বসে আছে। কোলের ওপর ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির একগাদা বই খোলা থাকলেও, রুহির মনটা যেন কোনো এক সুদূর কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে গেছে। অনিকের ফ্ল্যাট থেকে ফেরার পর থেকেই এক অদ্ভুত অস্থিরতা তাকে পেয়ে বসেছে। বইয়ের পাতায় চোখ রাখলেই শব্দগুলো ঝাপসা হয়ে আসছে, আর সেখানে বারবার ভেসে উঠছে শাহাজ ভাইয়ের সেই গম্ভীর মুখ আর দেশলাইয়ের আলোর সেই মায়াবী আবেশ। পড়াশোনা বা অন্য কোনো কিছুতেই সে যেন মন বসাতে পারছে না; সকালের সেই শিহরণ জাগানিয়া অনুভূতিগুলো বারবার না চাইতেও তার মস্তিষ্কে হানা দিচ্ছে।

​ঠিক এই সময় রুমে মুগ্ধর প্রবেশ ঘটে । সে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এসে নাসরিন বেগমের ফোনটা রুহির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে, “তোমার জন্য কল এসেছে আপুই।” রুহি হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিতেই মুগ্ধ যেভাবে এসেছিল ঠিক সেভাবেই দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

​রুহি ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখল বিন্তির নাম্বার জ্বলজ্বল করছে। ফোনটা কানে নিয়ে ‘হ্যালো’ বলতেই ওপাশ থেকে বিন্তি চিল চিৎকার দিয়ে বলে উঠল, “কী করিস কিউটি?”

রুহি নিস্পৃহ কণ্ঠে জবাব দিল, “বই নিয়ে বসে আছি।”

“পড়ছিস?”

“নাহ্।”

“না পড়লে বই নিয়ে ওভাবে বসে আছিস কেন?”

বিন্তির প্রশ্নে রুহি এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “কারণ পড়ার মতো মনোযোগ বা ধ্যান—কোনোটাই পাচ্ছি না রে।”

​বিন্তি এবার উদ্বিগ্ন হলো, “কেন? কী হয়েছে তোর? অসুখ-বিসুখ করল নাকি?”

রুহি আনমনেই উত্তর দিল, “হয়তো, আবার হয়তো না।”

বিন্তি বিরক্ত হয়ে বলল, “কী আবল-তাবল বকছিস! কী অসুখ হয়েছে খোলসা করে বলবি তো?”

“কে জানে!”

“আরে বাবা, জ্বর-ঠান্ডা-সর্দি—কিছু একটা তো হবে?”

“উঁহু।”

“তবে কী অসুখ? জটিল কিছু?”

রুহি এবার ফিসফিস করে নিজের অজান্তেই বলে ফেলল, “সম্ভবত প্রেমের অসুখ।”

​“কীইই! কী বললি তুই?” ওপাশ থেকে বিন্তির অবাক হওয়া কন্ঠের শব্দ পাওয়া গেল।

রুহি টনক নড়তেই সামলে নিয়ে বলল, “নাহ্ নাহ্, কিছু না! তুই কচু এত কথা বলিস কেন? এত রাতে কেন ফোন দিয়েছিস সেটা বল।”

​বিন্তি হাসতে হাসতে কাজের কথায় এলো, “কাল বৃষ্টি না হলে কলেজে যাব। পড়সী কিছু কাগজ সত্যায়িত করবে, তোকে বলে দিতে বলল। বৃষ্টি না থাকলে রেডি থাকিস।”

রুহি একটু ভাব দেখিয়ে বলল, “এত আগে থেকে রেডি হতে পারব না। যদি সিওর যাস, তবে সকালে কল দিয়ে বলবি, তারপর রেডি হব। দেখা যাবে আমি আগের মতো রেডি হয়ে বসে আছি আর পড়সী মহারানির পাত্তাই থাকবে না। বুঝলি?”

“হুম বুঝেছি। আচ্ছা রাখি দোস্ত, কাল দেখা হবে।”

“আচ্ছা।”

​ফোনটা রেখে রুহি আবারও বইয়ের পাতায় মনোযোগ দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করল। কিন্তু ব্যর্থ! এক অদ্ভুত অনুভূতি তাকে বারবার দিগভ্রান্ত করছে। রুহির যখন নিজের ওপর চরম বিরক্তি কাজ করছে, ঠিক তখনই সেই বিরক্তিকে আরও একধাপ বাড়িয়ে দিতে মুগ্ধ আবারও রুমে ঢুকল। তবে এবার তার হাতে সেই কমলা রঙের কভার জড়ানো ট্যাবটি—যা রুহি পিয়াসের হাতে ফিরিয়ে দিয়েছিল। মুগ্ধ খুব মনোযোগ দিয়ে তাতে গেম খেলতে খেলতে রুহির গা ঘেঁষে বসল।

​ট্যাবটি দেখামাত্রই রুহির চোখের সামনে পিয়াসের সেই উদ্ধত চেহারা ভেসে উঠল। সে ঘৃণাভরে চোখ-মুখ কুঁচকে নিল। নিজেকে সামলে নিয়ে স্বাভাবিক কণ্ঠে মুগ্ধকে জিজ্ঞেস করল, “এটা তুই কোথায় পেলি ?”

মুগ্ধ ট্যাবের স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই জানালো, “পিয়াস ভাইয়া দিয়েছে আপুনি। আমার ট্যাবটা খুব পছন্দ হয়েছিল দেখে ভাইয়াকে বলেছিলাম, আর ভাইয়া সাথে সাথে দিয়ে দিল।” কথাটি শেষ করে মুগ্ধ তার সেই অমায়িক, স্বচ্ছ আর নিষ্পাপ হাসি নিয়ে রুহির দিকে তাকাল।

​মুগ্ধর ওই দেবতুল্য হাসি দেখে রুহি আর কিছু বলতে পারল না। কিন্তু মনের ভেতর পিয়াসের প্রতি বিরক্তিটা আগ্নেয়গিরির মতো ফুটছিল। সে হঠাৎ গম্ভীর হয়ে মুগ্ধকে বলল, “তুই এই জিনিসটা নিয়ে আমার রুমে কখনো আসবি না।”

​মুগ্ধর মুখ থেকে হাসিটা মুহূর্তেই গায়েব হয়ে গেল। সে কাঁচুমাচু হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেন আপুনি?”

রুহি এবার বিপাকে পড়ল। ছোট্ট মুগ্ধকে তো আর আসল কারণ বলা যায় না! তাই বুদ্ধি খাটিয়ে বলল, “এই কালারটা আমার একদম পছন্দ না। আর আমি চাই না আমার অপছন্দের কোনো জিনিস আমার রুমে আসুক।”

​বোনের কথা শুনে মুগ্ধ বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়ল। তবে মিনতিভরা স্বরে বলল, “একটু থাকি আপুনি? একটু পর চলে যাব, আর কখনো এটা তোমার রুমে আনব না।”

​রুহি আর কিছু বলল না। সে একরাশ বিরক্তি আর শাহাজ ভাইয়ের সেই স্মৃতি—দুটোকেই ঝেড়ে ফেলে জোর করে বইয়ের পাতায় নিজেকে ডুবিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল।

**********

আকাশের মুখ আজ যেন ভার। আষাঢ়ের চিরচেনা বৃষ্টির দাপট নেই ঠিকই, কিন্তু থমথমে এক মেঘলা ভাব চারপাশকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। রোদের ছিটেফোঁটা নেই, শীতল এক হাওয়া বইছে যা মনকে উদাস করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। গাছের সবুজ পাতাগুলো কয়েকদিনের বৃষ্টির স্পর্শে যেন সতেজ হয়ে আছে, আর আকাশের ধূসর মেঘের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অন্যরকম গাম্ভীর্য। আষাঢ় মাসের এমন গুমোট কিন্তু শান্ত দিনগুলো যেন প্রকৃতির এক বিচিত্র রূপ।

​রুহি আজ তার বান্ধবীদের সাথে তাদের প্রিয় কলেজে এসেছে। এই কলেজ থেকেই কিছুদিন আগে তারা এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে কলেজের গণ্ডি পেরিয়েছে। এখন কেবল ফলাফলের অপেক্ষা, তারপরই শুরু হবে জীবনের আরেকটি নতুন অধ্যায়। কলেজে এসে পৌছানোর তাদের ২০-২৫ মিনিটের মতো হয়েছে।

কলেজের পরিবেশটা বেশ মোনরম, প্রবেশপথের দুপাশে সারিবদ্ধ কৃষ্ণচূড়া আর সোনালু গাছগুলো যেন রাজকীয় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। যদিও সোনালু ফুলের মূল সময় গ্রীষ্মকাল, তবুও আষাঢ়ের এই আগাম বৃষ্টিতে কিছু অবাধ্য সোনালু ফুল এখনো ডালপালা জুড়ে সোনালী আভা ছড়িয়ে উঁকি দিচ্ছে।

​এই বড় গাছগুলোর গোড়ায় আবার কলেজ কতৃপক্ষ থেকে সিমেন্ট দিয়ে গোল করে বসার জায়গা বাঁধানো হয়েছে, ছাএছাএীদের বসার জন্য। আর সেই গোল বসার জায়গাগুলোতে এই মুহুর্তে ছাত্রছাত্রীদের জটলা। তারা চার বান্ধবীও কলেজে থাকাকালীন সব সময় যে সোনালু গাছটির নিচে বসত, আজও সেখানেই কাকতালীয় ভাবে জায়গা পেয়ে আস্তানা গেড়েছে। সামনে একটি কাঠের বেঞ্চ থাকায় তারা চারজন মুখোমুখি হয়ে খোশগল্পে মাতোয়ারা। পড়শীর কাজটা এখনো হয়নি, কারণ প্রিন্সিপাল স্যার আসতে আরও ঘণ্টাখানেক সময় লাগবে।

​সবাই যখন নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত, হঠাৎ বিন্তি গেট দিয়ে একটি বাইক প্রবেশ করতে দেখে রুহিকে ধাক্কা দিয়ে বলে উঠল, “দোস্ত, ওটা তোর পিয়াস ভাই না?”

​বিন্তির কথায় রুহি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখল, সত্যিই পিয়াস কারো বাইকের পেছনে চড়ে বেশ আয়েশ করে কলেজের গেট পার হচ্ছে। হয়তো তারা কোথাও যাচ্ছে। পিয়াসকে দেখামাত্রই রুহি তার তাচ্ছিল্যে নজর সরিয়ে নিল। কিন্তু ছোঁয়া আর পড়শী তখনো হা করে সেদিকে তাকিয়ে। বাইকটি স্টার্ট দিয়ে বাতাসের গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যেতেই পড়শী মুগ্ধ হয়ে বলে উঠল, “দোস্ত, তোর ভাইটা তো হেব্বি হ্যান্ডসাম!”

​ছোঁয়ার হঠাৎ কিছু একটা মনে হতেই রুহিকে জিজ্ঞেস করল, “এটা কি তোর সেই ভাই, যে তোকে অপমান করে অনেক কষ্ট দিয়েছিল?”

রুহি নিস্পৃহ কণ্ঠে উত্তর দিল, “হুম...।”

​পড়শী প্রথমে হ্যান্ডসাম পিয়াসকে দেখে যতটা কুপোকাত হয়েছিল, পিয়াস তার বান্ধবীর সাথে জঘন্য আচরণ করেছিল শুনে মুহূর্তেই তার মোহ কেটে গেল। সে মুখ কুঁচকে বলে উঠল, “দেখতে তো মাশাল্লাহ, কিন্তু আচরণ তো একদম ভালো না!”

​রুহি চুপচাপ বসে রইল। হঠাৎই তাদের হাস্যরস আড্ডার মাঝে যেন এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল। সেই নীরবতা ভেঙে হঠাৎ পড়শী রুহিকে বলে উঠল, “দোস্ত, 'টিট ফর ট্যাট' (Tit for Tat) বা ইটের বদলে পাটকেল—এই কথাটা শুনেছিস?”

রুহি ভ্রু কুঁচকে বলল, “হ্যাঁ শুনেছি, কিন্তু হঠাৎ এটা কেন বলছিস ?”

রুহির কথায় পড়শী একটু বাঁকা হাসলো অতপর বললো,“তুইও তোর পিয়াস ভাইয়ের সাথে ‘টিট ফর ট্যাট’ করতে পারিস।”

“বুঝলাম না, কী বলতে চাস?”রুহির পাল্টা প্রশ্ন!

​পড়শী বেশ উৎসাহ নিয়ে বুঝিয়ে বলল, “আমি বলতে চাইছি, ওই ঘটনাটা যখন হয়েছিল তখন তো তুই অনেক ছোট ছিলি। কিন্তু এখন তো যথেষ্ট বড় হয়েছিস, মাশাল্লাহ দেখতেও অনেক সুন্দর। তুই এখন পিয়াস ভাইয়ের সাথে এমন নাটক করবি যাতে ও তোর প্রেমে পড়ে পাগল হয়ে যায়, আর তারপর ঠিক একইভাবে তুইও তাকে রিজেক্ট করবি। একদম মধুর প্রতিশোধ!”

​পড়শীর এমন ‘মহা-বুদ্ধি’ শুনে রুহি, বিন্তি আর ছোঁয়া একসাথে নাক-মুখ কুঁচকে ফেলল। বিন্তি রাগ সামলাতে না পেরে বলে উঠল, “তোর মাথায় কি আসলেই কিছু আছে নাকি সব গোবরে ভর্তি ? কী বলিস ভেবে বলিস নাকি যা মুখে আসে তাই বলা শুরু করিস?”

বিন্তির এমন কথায় ​পড়শীর মুখটা সাথে সাথেই কালো হয়ে গেল। সে মিনমিন করে বলল, “আমি তো ভালো বুদ্ধিই দিলাম! রুহির ভালোর জন্যই বলছিলাম।”

ছোঁয়া তেতে ধমক দিয়ে বলল, “লাইক সিরিয়াসলি? এটা তোর কাছে ভালো বুদ্ধি মনে হলো? মানে যা তা!”

ছোঁয়া বরাবরই বন্ধুদের মাঝে সবচাইতে কর্কশ। সে রিতিমতো পড়শীকে তুলোধুনো করা শুরু করেছে।

“থাম তোরা! এভাবে চিৎকার চেচামেচি করছিস কেন, সবাই কি ভাববে।”

আকস্মিক ​সবাইকে থামিয়ে দিয়ে রুহি অত্যন্ত শান্ত ও গম্ভীর কণ্ঠে পড়শীকে উদ্দেশ্য করে বলল, “মানুষের অনুভূতিগুলো না খুব যত্নের, পড়শী। কেউ একজন কোনো এককালে আমার অনুভূতি নিয়ে খেলেছে বলে আমিও তার সাথে একই কাজ করব, সেটা কখনো সম্ভব না। কারণ আমি তো এমন শিক্ষা পাইনি। আমার বাবা-মা আমাকে সবাইকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন, বড় মা বড় বাবা বড়দের সম্মান করতে আর ছোটদের স্নেহ করতে শিখিয়েছেন।”

​রুহি একটু থেমে আবার বলল, “পড়শী ধর তুই রাস্তা দিয়ে হাটছিস, হঠাৎ একটা কুকুর যদি তোকে দৌড়ে এসে হাঁটুর ওপর কামড় দেয়, তুই কি এরপর প্রতিশোধ নিতে ওই কুকুরকে হাঁটুর ওপর কামড় দিতে পারবি?

পড়শী মুখ অন্ধকার করে মাথা নাড়ে, যার অর্থ পারবে না। রুহি এটা দেখে আবারও বলে," পারবি না তো!"

তাই তুইও যেটা বলেছিস সেটা আমার পক্ষে ইহকালেও সম্ভব না। আর ওই ‘ঝান্ডু বাম’কে দেখলে আমার এমনিতেই মেজাজ খারাপ হয়ে যায়, তার সাথে প্রেম করব আমি? কক্ষণো না!”

একসময় তো ভালোবাসতি? পড়সীর নত মস্তকে উৎসুক হয়ে করা প্রশ্ন!

হে একসময়, আর এই একসময় এখন অতীত। আর অতীত কখনো ফিরে

আসে না। যা আসে তা হলো বর্তমান এবং তার পরে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।

আর আমার বর্তমানেই যার প্রবেশ নিষিদ্ধ তাহলে ভবিষ্যৎতে তো তার অস্তিত্ব বিলীন। রুহির অকপটে দেওয়া উত্তর।

​রুহির ব্যক্তিত্বদীপ্ত উত্তরে বাকিরা চুপ হয়ে গেল। মেঘলা আকাশের নিচে সোনালু গাছের ছায়ায় রুহির স্পষ্টবাদিতা যেন তাকে আজ আরও একটু অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেল।

হঠাৎই নিরবতা ভেঙ্গে বিন্তি বলে ওঠে, "সব বুঝলাম কিন্তু ঝান্ডু বাম এটা আবার কি!" বিন্তির বিষ্ময়কর কন্ঠে করা প্রশ্ন।

"ঝান্ডু বাম আমার অপছন্দের একটা বস্তু,এই জিনিসের ঘ্রানেও আমার মেজাজ বিগড়ে যায় তাই আমি ওই পিয়াস ভাইয়ার নামও ঝান্ডু বাম রেখেছি।" রুহির সহজ স্বীকারোক্তি।

রুহির এমন কথাতে এতোক্ষণের উত্তেজনা ও থমথমে পরিবেশে হঠাৎ হাসির কলকাকলীতে ভরে ওঠে, ছোঁয়া হাসতে হাসতে বলে, "এতো কিছু থাকতে শেষমেশ কিনা ঝান্ডু বামের সাথে তুলনা ----- হা হা হা! বান্ধবীদের হাসিমুখ দেখে রুহির থমথমে মুখেও হাসির রেখা ফুটে ওঠে।

আড্ডার মাঝখানেই হাসাহাসির বিরতি দিয়ে উৎসুক হয়ে পড়শী হঠাৎ একটি প্রশ্ন ছুড়ে দিল, "আচ্ছা রুহি, তোর না আরেকজন বড় ভাই আছে? কী যেন নামটা?"

​নামটা শোনা মাত্রই রুহি উৎফুল্ল হয়ে বলে উঠল, "শাহাজ ভাই! আমার শাহাজ ভাইয়ের কথা বলছিস।"

​নামটি উচ্চারণ করার সাথে সাথেই রুহির সারা মুখে যেন এক অন্যরকম দ্যুতির আভা ছড়িয়ে পড়ল। একটু আগেই পিয়াস সম্পর্কে বলতে গিয়ে তার চোখে-মুখে যে রাগী আর গম্ভীর ভাব ছিল, এক নিমেষেই তা যেন কর্পূরের মতো উড়ে গেল।

পিয়াসের প্রতি একরাশ অনীহা আর বিরক্তি ছাপিয়ে শাহাজের নাম নিতেই রুহি এখন কতোটা শান্ত আর প্রাণবন্ত হয়ে উঠল, তাকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন এই একটি নামেই তার জগত সংসারের সকল সুখ লুকিয়ে আছে।

রুহি পরম আবেশে পড়শীর কাছে শাহাজ ভাইয়ের গল্প করতে শুরু করল। পড়শী যতো শাহাজকে নিয়ে প্রশ্ন করছে, রুহি চঞ্চল মনে হাসিমুখে আগ্রহ নিয়ে তার প্রতিটির উত্তর দিয়ে যাচ্ছে। রুহির এই আকস্মিক পরিবর্তন বিন্তি আর ছোঁয়ার তীক্ষ্ণ নজর এড়ালো না। তারা একবার হাস্যজ্বল রুহিকে দেখছে তো একবার নিজেদের দিকে তাকাচ্ছে। যেন কোন এক গোপন রহস্যের গন্ধ পেয়েছে।

​বেশ কিছুটা সময় পেরিয়ে গেল। এর মধ্যেই প্রিন্সিপাল স্যার কলেজে আসায় পড়শী তার কাজ করতে ভেতরে চলে গেল। ছোঁয়াও গিয়েছিলো পড়শীর সাথে কিন্তু ভেতরে সে যায়নি, তাই পড়শীকে রেখে সে একাই ফিরে আসে।

ছোঁয়া ফেরার পর সে আর বিন্তি দুজন মিলে রুহির সামনে এসে বসল। তাদের দৃষ্টিতে অন্যরকম এক কৌতূহল। দুই বান্ধবীকে এভাবে একনাগাড়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে রুহি কিছুটা ঘাবড়ে গেল, তবে নিজেকে সামলে নিয়ে স্বাভাবিক স্বরেই বলল, "কী হয়েছে তোদের? এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন?"

​রুহির কথায় বিন্তি সরাসরি প্রশ্ন করল, "কী হয়েছে তোর, বল তো?"

রুহি কাঁচুমাচু হয়ে বলল, "কী হবে আমার? কিছুই হয়নি।"

বিন্তিও ছাড়ার পাত্রী নয়, "উঁহু, কিছু একটা তো হয়েছেই। কাল রাতেও ফোনে অদ্ভুত সব কথা বললি। সত্যি করে বল তো কী হয়েছে?"

রুহি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে বলল, "কিছু হয়নি রে, এমনিতেই মনে হচ্ছে তোদের।"

​"তুই কী ভাবিস রুহি? মিথ্যা বলে বেঁচে যাবি? আমি তোকে তোর নিজের চেয়েও বেশি চিনি। এতো বছরের বন্ধুত্ব আমাদের। কি হয়েছে পরিষ্কার করে বলতো।"

বিন্তির এই নাছোড়বান্দা জেদের মুখে রুহি আর চেপে রাখতে পারল না। সে অনিকের ফ্ল্যাটের সবটা না বললেও শাহাজের প্রতি গত রাত থেকে তার যে এক অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করছে, কোনো কিছুতেই যে মন বসছে না—সেই সবটা খুলে জানাল।

​সব শুনে রুহি আর বিন্তির কথার মাঝেই ছোঁয়া হঠাৎ বলে উঠল, "রুহি, তুই কি বাই এনি চান্স প্রেমে পড়েছিস?"

রুহি এক মুহূর্তের জন্য বাকহারা হয়ে ছোঁয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। বিন্তি আর ছোঁয়া দুজনেই উত্তরের আশায় তার চোখের দিকে চেয়ে আছে। রুহি আমতা আমতা করে বলল, "আমি আবার কার প্রেমে পড়ব? ছোঁয়া, কী আবল-তাবল বকছিস!"

​ছোঁয়া আর বিন্তি একে অপরের দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টি বিনিময় করল। তারপর সমস্বরে বলে উঠল, " তোর শাহাজ ভাইয়ের ওপর!"

​শুনেই রুহি একদম স্তব্ধ হয়ে গেল। গোল গোল চোখে সে দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন আকাশ থেকে পড়েছে। তাকে এভাবে নির্বাক হতে দেখে বিন্তি এবার বুঝিয়ে বলল, "তুই কি জানিস, তুই তোর অজান্তেই তোর শাহাজ ভাইয়ের প্রেমে পড়ে গেছিস?"

​রুহি অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করল, "তোরা... তোরা কীভাবে বুঝলি?"

​বিন্তি আর ছোঁয়া মৃদু হেসে উঠল। বিন্তি বিশ্লেষণ করে বলল, "তখন পিয়াস ভাইকে নিয়ে যখন তুই কথা বলছিলি, তোর চোখে-মুখে ছিল এক অন্যরকম তেজ, জেদ আর চরম উপেক্ষা। কিন্তু যখনই তোকে পড়শী শাহাজ ভাইয়ের কথা জিজ্ঞেস করলো, মুহূর্তেই তোর মুখের ভাব পাল্টে গেল। এক অদ্ভুত প্রশান্তি আর খুশি ফুটে উঠল তোর হাসিতে। আর এটা তখনই হয় যখন আমরা আমাদের খুব পছন্দের মানুষের কথা ভাবি। তুই তোর অবচেতন মনেই তোর শাহাজ ভাইকে ভালোবেসে ফেলেছিস বুদ্দু। "

​রুহি অস্বীকার করার চেষ্টা করে বলল, "তোরা ভুল ভাবছিস আর ভুল বলছিস। এমন কিছুই না।"

​ছোঁয়া এবার জোর দিয়ে বলল, "আমরা মোটেও ভুল ভাবছি না আর ভুল ও বলছিও না। আমরা যা বলছি একদম ঠিক। তুই নিজে একান্তে চিন্তা করে মিলিয়ে নিস, দেখবি উত্তরটা তোর কাছেই আছে! এবং যা একদম পানির মতো স্বচ্ছ ।"

​এরই মাঝে পড়শি তার কাজ শেষ করে সেখানে চলে আসায় তাদের ব্যক্তিগত কথা সেখানেই থেমে গেল। সবাই মিলে কলেজ থেকে বের হওয়ার জন্য উঠে দাড়ালো ও রাস্তার দিকে রওনা দিলেও রুহির মনের কোণে তখনো বিন্তি আর ছোঁয়ার কথাগুলো অবিরাম বেজে চলেছে এক অদ্ভুৎ অনুভূতি ও রোমাঞ্চকর ভাবে।

চলবে________

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন