#অন্তহীন_প্রেম_আমার
#আফীফা_আফনান
#পর্ব_২১
[কপি করা নিষিদ্ধ]
আজ ভার্সিটি ক্যাম্পাসের চারপাশটা যেন জীবন্ত এক মিলনোৎসব—চারদিকে ফুটে উঠেছে হাসির ঝিলিক, বন্ধুদের কোলাহল, আর উচ্ছ্বাসের রঙিন ঢেউ। সকালের সোনাঝরা রোদে ভার্সিটি প্রাঙ্গণটি আজ শিক্ষার্থীদের প্রাণবন্ত পদচারণায় মুখরিত। কেউ গাছের ছায়ায় গোল হয়ে আড্ডায় মত্ত, কেউবা হাতে চায়ের কাপ নিয়ে তর্কে বহাল। করিডোর দিয়ে একঝাঁক শিক্ষার্থীর হাসাহাসি আর দ্রুত পায়ে হেঁটে যাওয়ার শব্দে চারদিকে যেন এক অদম্য তারুণ্যের স্পন্দন বয়ে চলেছে।
কিন্তু এই হইচই আর কোলাহলের ঠিক উল্টো চিত্রটা দেখা যাচ্ছে লেকচারারদের অফিস রুমে। সেখানে নিজস্ব ডেস্কে অত্যন্ত নিবিষ্ট মনে বসে আছে“বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ প্রভাষক শাহজাদা মোস্তাফা। শাহাজের এই 'প্রভাষক' রূপটি যেন তার ব্যক্তিত্বের সাথে একদম মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। গায়ে তার হালকা নীল রঙের ফিটেড শার্ট, হাতা দুটো নিখুঁতভাবে ফোল্ড করা, আর কবজিতে একটি নামী ব্র্যান্ডের ক্লাসিক ঘড়ি। চোখে তার পাতলা ফ্রেমের চশমা, যা তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে যেন এক অন্যরকম গাম্ভীর্য ও বুদ্ধিমত্তার ছাপ ফেলে গেছে।
কোলাহল মিশ্রিত ক্যাম্পাসে ক্লাসের ফাকে বিশ্রামের সময়টাতে যখন অন্যান্য শিক্ষকরা কফি পানে বা সামাজিক আলোচনায় ব্যস্ত, শাহাজ তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাতুতে গড়া। তার ডেস্কের ওপর ছড়িয়ে আছে বেশ কিছু রেফারেন্স বুক আর তার নিজের করা গবেষণাপত্র। সে আজ তার কাজের প্রতি এতটাই ডেডিকেটেড যে, বাইরের কোনো শব্দই তার কানে পৌঁছাচ্ছে না। সে মনোযোগ সহকারে তার পরবর্তী লেকচারের জন্য অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে নোট তৈরিতে ব্যস্ত।
তার লেখার প্রতিটি লাইন যেন বিজ্ঞানের কোনো জটিল রহস্যের সহজ সমাধান। শিক্ষার্থীরা যাতে কঠিন বিষয়গুলো সহজে আত্মস্থ করতে পারে, সেজন্য সে নিজেই বিভিন্ন ডায়াগ্রাম আর মেথড নিয়ে গবেষণা করছে। তার পেশার প্রতি এই সততা আর গভীর অনুরাগী সত্তা তাকে অন্যদের চেয়ে যোজন যোজন দূরে রাখে।
শাহাজের মধ্যে সবসময় এক ধরনের তীব্র ব্যক্তিত্বের আভা কাজ করে। তার স্মার্টনেস কেবল নিখুঁত পোশাকেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে তার বসার ভঙ্গিমায়, সংযত আচরণে আর শান্ত অথচ গভীর চোখের চাহনিতে।
অফিস রুমের সামনে দিয়ে এগিয়ে যাওয়া কোন শিক্ষার্থী বা সহকর্মী যখন হঠাৎ তার সামনে দিয়ে হেটে যায়,তখন একবারের জন্য হলেও তারা তার দিকে তাকাতে বাধ্য, এবং ওই তাকানোতেই তারা অজান্তেই এক মুহূর্তের জন্য হলেও থমকে যায়। শাহাজের পাথুরে গাম্ভীর্য আর স্বাভাবিক সৌন্দর্য মিলিয়ে যেন তৈরি হয় এক অনন্য উপস্থিতি, যা সহজেই যে কারো দৃষ্টি কেড়ে নিতে সক্ষম।
ক্লাস চলাকালীন, শাহাজ যখন বই থেকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তুলে সামনে তাকায় এবং একের পর এক প্রশ্নের মাধ্যমে বিষয় বোঝাতে থাকে, তখন তার চোখে থাকে এক নীরব আত্মবিশ্বাসের গভীর ছাপ। সেই দৃষ্টিতে একটি অদ্ভুত আকর্ষণ থাকে—শব্দহীন, তবু প্রভাবশালী—যা উপস্থিত সবার কথার আগ্রহকে থমকে দেয়। তার কণ্ঠস্বর, শান্ত অথচ শক্তিশালী, যেন এক অদ্ভুত ঘোরে সবাইকে নিমগ্ন করে রাখে।
শাহাজ কথা কম বলেন, কিন্তু তার উপস্থিতিই চারপাশে এক অনস্বীকার্য ছাপ রেখে যায়।
ক্লাসের ঘন্টা বাজতেই অফিস রুম থেকে বের হয়ে শাহাজ যখন করিডোর দিয়ে ক্লাসরুমের দিকে এগোচ্ছে, তার জুতোর প্রতিটি শব্দ যেন এক গম্ভীর সতর্কবার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছিল। হাতে তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফাইল আর মার্কার পেন। করিডোরে আড্ডা দেওয়া দু-চারজন শিক্ষার্থী তাকে দেখেই স্বয়ংক্রিয়ভাবেই একপাশে সরে দাঁড়াল। শাহাজের উপস্থিতিতে এক অদ্ভুত আভিজাত্য মিশে থাকে, যা বুঝিয়ে দেয় শাহাজ বিনা বাক্যব্যয়েই মানুষকে শাসন করতে জানে।
ক্লাসরুমের ভেতরে এতক্ষণ ছিল রীতিমতো বিশৃঙ্খলা। কেউ বেঞ্চ বাজিয়ে গান গাইছিল, কেউ কেউ নিজেদের মথ্যেই হাসাহাসিতে ঘর ফাটাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ ক্লাসের দরজায় শাহাজের দীর্ঘ ছায়া পড়ামাত্রই যেন কোনো এক জাদুমন্ত্রে সব স্তব্ধ হয়ে গেল। যে হইচইটা একটু আগেও যেন আকাশ ছুঁই। তা মুহূর্তেই যেন এক ভারী নীরবতায় রূপ নিল।
শাহাজ ধীরস্থির পায়ে পডিয়ামের সামনে এসে দাঁড়াল। ক্লাসের প্রতিটি কোণা থেকে শিক্ষার্থীদের উৎসুক ও মুগ্ধ দৃষ্টি তখন কেবল একজনের ওপর নিবদ্ধ।
শাহাজ কারো দিকে সরাসরি না তাকিয়েই পডিয়ামের ওপর তার ফাইলগুলো রাখল। কবজির ঘড়িটার দিকে একবার তাকিয়ে সময় মিলিয়ে নিয়ে শান্ত কিন্তু গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, "গুড মর্নিং এভরিওয়ান। প্রিভিয়াস ক্লাসের টপিকটা সবার মনে আছে তো?"
পুরো ক্লাসে পিনপতন নীরবতা। শাহাজের কণ্ঠস্বর খুব চড়া নয়, কিন্তু তাতে এমন এক অদ্ভুত ব্যক্তিত্ব আর কাঠিন্য আছে যে কারো কথা বলার সাহস নেই। সে ডাস্টার তুলে নিয়ে ব্ল্যাকবোর্ড বা হোয়াইটবোর্ডটা নিখুঁতভাবে পরিষ্কার করল। এরপর মার্কারের ক্যাপ খুলে খুব আয়েশি অথচ দৃঢ় ভঙ্গিতে আজকের লেকচারের শিরোনামটি বড় বড় অক্ষরে লিখল।
অতপর সে যথারীতি তার ক্লাস আরম্ভ করল। শাহাজ লেকচার দিতে শুরু করলে মনে হয় সে যেন এক দক্ষ শিল্পী। তার পড়ানোর ধরনে কোনো কৃত্রিমতা নেই। সে জটিল বৈজ্ঞানিক তত্ত্বগুলোকে বাস্তব জীবনের সাথে মিলিয়ে এমনভাবে বিশ্লেষণ করতে শুরু করল যে, ক্লাসের পেছনের সারির অমনোযোগী ছেলেটিও নড়েচড়ে বসল। কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে সে তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পুরো ক্লাসরুম পর্যবেক্ষণ করছিল। মাঝে মাঝে চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে যখন সে কোনো কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছিল, তখন শিক্ষার্থীদের মনে হচ্ছিল যেন তারা কোনো এক মহাজ্ঞানী ব্যক্তিত্বের সামনে বসে আছে।
শাহাজের মধ্যে কোনো বাড়তি চপলতা নেই, সে অপ্রাসঙ্গিক কথা এক বিন্দুও বলে না। তার প্রতিটি শব্দ ও অঙ্গভঙ্গি অত্যন্ত পরিমাপিত। তার ব্যক্তিত্ব আর প্রফেশনাল লেকচারার লুক দেখে ছাত্রীরা যেমন অপলক তাকিয়ে , তেমনি ছাত্ররাও তার স্মার্টনেস দেখে মনে মনে তাকে আইডল মানতে শুরু করলো।
শাহাজ যখন লেকচার দিতে ব্যস্ত ঠিক তখন ক্লাসরুমের শেষ সারির বেঞ্চে বসে থাকা একদল মেয়ের চোখে এখন লেকচারের চেয়ে লেকচারার বেশি আকর্ষণীয়। শাহাজ যখন পডিয়ামের সামনে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত গম্ভীর ভঙ্গিতে জটিল এক সমীকরণ বোঝাচ্ছে, তখন পেছনের সারির সাথী নামের মেয়েটির দুচোখ যেন বিস্ময় আর মুগ্ধতায় চকচক করছে। সে পলকহীনভাবে শাহাজকে অবলোকন করে , ঠিক যেন কোনো এক দুর্দান্ত অ্যাকশন মুভির হিরোকে সামনে দেখছে।
সাথীর পাশে বসা তানিয়া আর মিমও একই দশা। তারা তিনজনই শাহাজের প্রতিটি মুভমেন্ট—চশমা ঠিক করা থেকে শুরু করে মার্কার ধরার ভঙ্গি—সবটা গোগ্রাসে গিলছে। সাথী মুখটা একদম কানের কাছে নিয়ে তানিয়াকে ফিসফিস করে বলল, “দোস্ত, এই কড়ক মাল কবে আসলো আমাদের ভার্সিটিতে? আমি তো এর আগে দেখিনি!”
তানিয়া হালকা হেসে উত্তর দিল, “দেখবি কোত্থেকে? তুই তো গত কয়েকদিন ধরে ভার্সিটির আসেপাশে ও আসিস নি। আজ বেশ কিছুদিন হলো স্যার জয়েন করেছে। আর যবে থেকে এসেছে, এসেই তো পুরো আগুন লাগিয়ে দিয়েছে!”
সাথী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পস্তানোর ভঙ্গিতে বলল, “আহারে! ভার্সিটিতে না এসে তো আমি বিরাট কিছু মিস করে ফেললাম মনে হচ্ছে! এটা তো দেখি একদম হেব্বি মাল! জাস্ট লুক অ্যাট হিম, দোস্ত! ওনার পার্সোনালিটি দেখেই তো আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।”
মিম এবার আলোচনায় যোগ দিয়ে চাপা গলায় বলল, “শুধু তুই না রে সাথী, পুরো ভার্সিটির অর্ধেক মেয়েরই এখন ন্যাশনাল ক্রাশ—শাহজাদা স্যার।”
সাথী নামটা শুনে বিড়বিড় করে আওড়ালো, “শাহজাদা! বাহ্, নামটাও তো হেব্বি জোস । স্যারের নামের সাথে তো ওনার কিলিং ভাবটা একদম মিশে গেছে। আই জাস্ট লাইক ইট!
সাথী মনোযোগ সহকারে ক্লাস করাতে থাকা শাহাজের দিকে চোখ তুলে তাকালো, এর পরেই তার দিকে দৃষ্টি রেখে নিজের জিব দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলে উঠলো, "তা দোস্ত, কেউ কি প্রপোজ-টোপজ করেছে স্যারকে? নাকি সবাই দূর থেকেই কেবল লোল ফেলছে?”
তানিয়া তটস্থ হয়ে সাথীর মুখ চেপে ধরার উপক্রম করল, “আরে চুপ কর! প্রপোজ করবে তাও শাহজাদা স্যারকে, কার সাধ্য? স্যার যা রাগী আর গম্ভীর , ওনার সামনে গেলেই তো সবার হাড় হিম হয়ে যায়। ওনার চোখের চাউনি দেখেছিস? যেন এক্সরে মেশিন, এক দেখাতেই একদম এক্স-রে করে ফেলে! ভুল করেও এসব বাদরামি বা ফ্লার্ট করার চিন্তা মাথায় আনিস না, স্যার যদি জানে একদম সোজাসুজি শোকজ করে দেবেন!”
সাথী তবুও দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে চিবুকে হাত দিয়ে আড়চোখে শাহাজের সেই ‘কিলিং ভাইব’ অবলোকন করতে করতে বাঁকা হেসে বলল, “রাগী ছেলেদের সাথে টক্কর দিতেই তো মজা বেশি দোস্ত । এই শাহজাদা স্যার তো আসলে আমার স্বপ্নে দেখা রাজপুত্র রে! আর এসব রাগ ছুটানো আমার মতো সুন্দরীদের জন্য ওয়ান টুর ব্যাপার। তোরা দেখিস, একদিন এই লোককে যদি আমার প্রেমে পাগল বানিয়ে ঘুড়ির মতো না উঠিয়েছি তাহলে আমার নাম সাথী নয়।”
শাহাজের লেকচার তখন মাঝপথে। হঠাতই পেছনের বেঞ্চের ফিসফাস শব্দ তার কানে পৌঁছাতেই রুমের তাপমাত্রা যেন কয়েক ডিগ্রি নেমে গেল। সে হাত থেকে মার্কারটা পডিয়ামে রেখে এক জোড়া তীক্ষ্ণ ও বরফশীতল দৃষ্টিতে পেছনের সারির দিকে তাকালো।
"লাস্ট বেঞ্চ, স্ট্যান্ড আপ!"
শাহাজের সেই বাজখাঁই গলার চিৎকারে পুরো ক্লাস হঠাৎই থমকে উঠলো। সাথী আর তার বান্ধবীরা যেন চোর ধরা পড়ার মতো সিঁটিয়ে গেল। শাহাজ আবার কঠোর স্বরে আবারও গর্জে উঠল, "আই সেইড, স্ট্যান্ড আপ এভরিওয়ান ইন দ্যি লাস্ট রো!"
একে একে তানিয়া, মিম আর সবশেষে সাথী দাঁড়িয়ে পড়ল। তাদের সবার চেহারা তখন ফ্যাকাশে, অপরাধী ছাত্রের মতো মাথা নিচু। শাহাজ কয়েক পা এগিয়ে এসে তাদের সামনে দাঁড়াল। তার দৃষ্টি তখন যেন আগুনের গোলার মতো জ্বলছে।
"ক্লাসে কি ক্লাস করতে আসেন নাকি গল্প করতে?" শক্ত কন্ঠে শাহাজের প্রশ্ন।
বিপরীতে কারো মুখে কোনো শব্দ নেই।
অতঃপর শাহাজ তার গম্ভীর কণ্ঠস্বর আরও উঁচুতে তুলে বলল, "যদি কেউ আমার ক্লাসে গসিপ করতে এসে থাকো, আমি তাদের সাজেস্ট করব, আমার ক্লাসে প্রবেশ করার আগে স্বেচ্ছায় চলে যেতে। আর যদি না তাহলে বলবো যতক্ষন ক্লাস চলবে ততক্ষণ চুপচাপ মনোযোগী হতে।" এম আই ক্লিয়ার?"
পুরো ক্লাসের সকল ছাত্র-ছাত্রী একযোগে মাথা উপর নিচ করে শাহাজের কথায় সায় জানাল। এরপর শাহাজ সেই দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েগুলোর দিকে ফিরে ঠান্ডা গলায় রায় দিল, "যেহেতু আপনাদের ক্লাসে কোনো মনোযোগ নেই, তাই এখন আপনারা বাহিরে যেতে পারেন।"
শাহাজে এমন তিরস্কার পূর্ণ কথায় মেয়েগুলো তখনও মূর্তির মতো মাথা নিচু করে ঠাঁই দাঁড়িয়ে ছিল। এদের এভাবে দাড়িয়ে থাকতে দেখে শাহাজের মেজাজ আরো বিগড়ে গেলো, এবার সে ধমকের সুরে বলে উঠল—
"আউট!"
শব্দটি শোনামাত্রই সাথী আর তার বান্ধবীরা দ্রুত পা ফেলে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে গেল। শাহাজ আবার স্বাভাবিকভাবে লেকচারে ফিরে গেল, যেন কিছুই হয়নি। কিন্তু ক্লাসের বাইরে গিয়েও সাথীর চোখে তখনো শাহাজের ওই গম্ভীর মুখটাই ভাসছিল। সে জানালার আড়াল থেকে অপলক তাকিয়ে রইল শাহাজের দিকে।
তখনই পাশ থেকে তানিয়া বলে উঠলো, এতো কথা শুনেও তোর আক্কেল হয়নি তাই না, তুই এখনো স্যারকে দেখে যাচ্ছিস। স্যার যদি একবার দেখেন এখন তো ক্লাস থেকে বের করেছে পরে ভার্সিটি থেকে বিদায় করবে।
সাথী তানিয়ার কথায় রহস্যময় হাসি, বৃদ্ধা আঙ্গুল দিয়ে নিজের নাক ঘষতে ঘষতে বলে উঠলো, "সাথী লাইক হিম, আর সাথী একবার যা পছন্দ করে তা নিজের করেই ছাড়ে যে কোন মূল্যে।
দেখতে দেখতে এক ঘন্টার ক্লাসের সমাপ্তি ঘটলো, ক্লাস শেষে শাহাজ যখন নিজের ফাইল নিয়ে করিডোর দিয়ে গটগট করে হেঁটে যাচ্ছে, হঠাৎ করেই সাথী দৌড়ে এসে তার সামনে পথ আগলে দাঁড়াল। আকস্মিক কোন মেয়ে তার সামনে এভাবে আচমকা পথ আটকে দাঁড়ানোতে শাহাজ কিছুটা ভ্রু কুঁচকে চোখে মুখে বিরক্তি নিয়ে থামল।
শাহাজ থামতেই সাথী মুখে খানিকটা ন্যাকামি আর আত্মবিশ্বাসের হাসি ফুটিয়ে বলতে শুরু করল, "হ্যালো স্যার! আমি সাথী। আসলে আমি খুব দুঃখিত। অনেকদিন পর ভার্সিটিতে এসেছি তো, তাই আজ একটু মনোযোগ দিতে পারিনি। না হলে আমি ক্লাসের সবটাইতে মনোযোগী শিক্ষার্থী। আজ মিস হলেও নেক্সট টাইম থেকে একদম ফুল এটেনশন থাকবে আপনার ক্লাসে।"
সাথী নিজেকে একটু জাহির করার জন্য যোগ করল যে, আসলে স্যার আমার বাবা এই ভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের একজন প্রভাবশালী সদস্য। প্রিন্সিপাল স্যারের সাথে আমার বাবার অনেক ভালো পরিচয়। আপনার কখনো কোন হেল্প লাগলে আসাকে জানাবেন স্যার।
শাহাজ সাথীর কথা শুনরো কিন্তু তেমন একটা পাত্তা না দিয়ে সে কেবল ছোট্ট করে বলল, "হুম।"
অতপর শাহাজ চলে যেতে নিলেই সাথী আবারও তাকে বাধা দিয়ে আবদারের সুরে বলে উঠল, "স্যার, আপনার পার্সোনাল নাম্বারটা কি পাওয়া যাবে? কোনো টপিকে যদি আটকে যাই, তাহলে আপনার সাথে কন্টাক্ট করে জেনে নেওয়া যাবে।"
শাহাজ স্থির হয়ে দাঁড়াল। চশমার আড়ালে তার সেই গম্ভীর দৃষ্টি সাথীর দিকে ছুড়ে দিয়ে বলল, "ডিপার্টমেন্টের মেসেঞ্জার গ্রুপে অ্যাড আছো নিশ্চয় ?"
সাথী খুব অমায়িকভাবে বলল, "হ্যাঁ স্যার, আছি।"
"তাহলে ঠিক আছে। কোনো টপিক না বুঝলে গ্রুপে মেসেজ দিও, আমি সেখানেই সলভ করে দেব।"
সাথী দমে না গিয়ে আবার জোর দিয়ে বলল, "না স্যার, আসলে পার্সোনাল নাম্বারটা থাকলে একটু সুবিধা হতো আরকি...."
শাহাজ এবার তার সেই পরিচিত সুলভ গাম্ভীর্য আর আদর্শের মিশেলে সপাটে উত্তর দিল— “আসলে, আমি সবার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত নম্বর শেয়ার করতে পছন্দ করি না। কোনো সমস্যা থাকলে গ্রুপে মেসেজ করো, আমি সেখানেই বিষয়টি সমাধান করব। সো, এক্সকিউজ মি! গো ব্যাক টু ইউর ক্লাস ।”
সাথীকে রীতিমতো হতভম্ব করে দিয়ে শাহাজ দীর্ঘ পা ফেলে গটগট করে নিজেরে রুমের দিকে চলে গেল। সাথী করিডোরে দাঁড়িয়ে কেবল তাকিয়ে রইল সেই ব্যক্তিত্ববান মানুষটির প্রস্থানের দিকে। সে বুঝতে পারল, সে সবকিছু যতোটা সহজ ভেবেছিলো তা আদো ততোটা সহজ নয়। এই পাহাড়ের চূড়ায় ওঠা বেশ কঠিন।
★★★
আষাঢ়ের মাঝামাঝি সময় হলেও আজ আকাশের রূপ একদম ভিন্ন। বর্ষার মেঘের দেখা নেই, বরং সূর্যের প্রখর আলো আজ যেন মাটি পুড়িয়ে দিচ্ছে। রুহি কপালে জমে থাকা ঘামটুকু মুছে নিয়ে আপন মনে হেঁটে চলেছে। গত দুদিন হলো তার কোচিং এর টাইম পরিবর্তন হয়েছে আর এর নির্দেশ দাতা হলো স্বয়ং তার বাবা। বাবার হঠাৎ নেওয়া এই স্বীদ্ধান্ত তার বোধগম্য হয় নি, কিন্তু কিছু করার নেই।
আগে বিকেলে কোচিং করলেও এখন তাকে আসতে হচ্ছে সকালে। এতে রুহির খুব একটা সমস্যা না থাকলেও মনে বড় এক দুঃখ দানা বেঁধেছে। তার প্রাণপ্রিয় বান্ধবী বিন্তি সেই বিকেলের ব্যাচেই রয়ে গেছে। পারিবারিক সমস্যার কারণে বিন্তির পক্ষে সকালে আসা সম্ভব নয়, যার ফলে দুই বান্ধবীর দীর্ঘদিনের বন্ধনে যেন ছেদ পড়েছে।
বিরস মনে রাস্তার একপাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রুহি বিন্তির কথাই ভাবছিল। হঠাৎ সামনে কেউ একজন আকস্মিকভাবে চলে আসায় রুহি নিজেকে সামলাতে পারল না। ধাক্কা খাওয়ার ভয়ে সে দ্রুত চোখ-মুখ খিঁচিয়ে বন্ধ করে ফেলল। কিন্তু সব স্বাভাবিক দেখে কয়েক সেকেন্ড পর সাবধানে চোখ মেলতেই সে থমকে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই পাতি নেতা গোছের ছেলেটি, যে আগে একবার তাকে বিরক্ত করার চেষ্টা করেছিলো।
রুহি বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই ছেলেটি হাত জোড় করে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলে উঠল, “ভাবি, আসসালামু আলাইকুম! কেমন আছেন? ভাই কেমন আছে?”
রুহি আকাশ থেকে পড়ল। বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে সে তোতলামো স্বরে বলল, “ভাবি! ভাই! কী বলছেন এসব আপনি? আমি কার ভাবি? আর ভাই-ই বা কে?”
ছেলেটি মুহূর্তেই থতমত খেয়ে গেল। নিজের জিভ কামড়ে ধরে অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলল, “নাহ নাহ আপুমনি, আমার ভুল হইছে! আসলে রোদ তো, চোখের ধাঁধায় আপনারে অন্য কারো সাথে গুলাই ফেলছি। কিছু মনে করবেন না। তা কেমন আছেন আপুমনি?”
রুহি নিজেকে কিছুটা স্বাভাবিক করে নিয়ে সংক্ষেপে জবাব দিল, “জ্বি, আলহামদুলিল্লাহ, ভালো।”
এরপর ছেলেটির ব্যবহারে আমূল পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল। সে অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে রুহিকে জিজ্ঞেস করল, “আপুমনি, এই ভরদুপুরে একা একা কেন হাঁটছেন? এই গরমে হাঁটলে তো অসুখ করবে। রিকশা করে যান। এই খালি এদিকে আয়!”বলেই ছেলেটি রিক্সা থামাতে ব্যস্ত হয়ে উঠলো।
রুহি মাথা নেড়ে বারণ করল, “নাহ নাহ দরকার নেই, আমি হেঁটেই যেতে পারব।”
কিন্তু ছেলেটি কোনো কথাই শুনল না। সে যেন নাছোরবান্দা, এক প্রকার জোর করেই রাস্তা থেকে একটি খালি রিকশা ডেকে থামাল সে। রুহিকে রিকশায় উঠতে অনুরোধ করে নিজের পকেট থেকে আগাম ভাড়া মিটিয়ে দিল। রুহি বারবার নিষেধ করা সত্ত্বেও সে বিনীতভাবে বলল, “আপনি আমাদের বোনের মতো, এটুক করতে দেন।”
অবশেষে উপায়ান্তর না দেখে রুহি রিকশায় উঠে পড়ল। রিকশাটি চলতে শুরু করলে ছেলেটি হাত নাড়িয়ে পেছন থেকে তাকে বিদায় জানাল। রুহি দৃষ্টির আড়ালে চলে যেতেই ছেলেটি ত্বরিত পকেট থেকে ফোন বের করে কাউকে কল লাগালো।
রিসিভ হতেই ওপাশে থাকা ব্যক্তিকে বেশ বিনয়ের সাথে জানালো, "হ্যালো ভাই, ভাবিকে রিকশায় উঠাই দিয়েছি। উনি এখন বাড়ির দিকে যাচ্ছেন। জ্বি ভাই, একদম সেফলি রিকশায় তুলে দিয়েছি।"
★★★
খন্দকার বাড়িতে আজ এক শান্ত ও নরম আবহাওয়া বিরাজ করছে। সেই সাথে দুপুরের তপ্ত রোদ একটু একটু করে ম্লান হয়ে আসছে। রুহি যখন কোচিং শেষ করে বাড়ি ফিরল, তখন দুপুরের খাবারের তোড়জোড় প্রায় শেষ পর্যায়ে। ইয়াছমিন বেগম রান্নাঘরের শেষের দিকের ব্যস্ততা সামলাচ্ছেন। আরঅন্যদিকে তানজিনা তখন ব্যস্ত হাতে ডাইনিংএ মমতাজ বেগমের খাবার সাজাচ্ছেন। বাড়ির পুরুষ সদস্যরা—বাবা এবং চাচারা সহ সবাই নিজ নিজ কর্মস্থলে ব্যস্ত। বাড়িতে তখন কেবল মায়েরা, দাদি আর ছোট মুগ্ধর খুনসুঁটি।
রুহি বাড়ি ঢুকেই নাছরিন বেগমকে ডাকতে শুরু করলো, কিন্তু তার কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে তানজিনাকে জিজ্ঞেস কররো, "বড় মা, মা কোথায় দেখছিনা যে! "
তানজিনা কাজ করতে করতেই জবাব দিলেন, " তোর বাবা মা দুজনই তোর নানুকে দেখতে গেছে রুহি, বিকেলের মধ্যে চলে আসবে। তুই রুমে যা গোসল করে নিচে আয় আমি ভাত বাড়ছি।"
বাইরের ধুলোবালি আর ক্লান্তি দূর করতে রুহি দ্রুত রুমে চলে গিয়ে গোসল সেরে নিল। এরপর সবার সাথে ডাইনিং টেবিলে বসে দুপুরের খাবার খেয়ে আবারও সোজা নিজের রুমে চলে এল। রেজাল্টের দিন যতো এগোচ্ছে রুহির বুকের ধুকপুকানি যেন ততো তিব্র হচ্ছে।
রুহি রুমে এসেই লম্বা হয়ে খাটে শুয়ে পড়ে, ইদানিং তার সব কাজেই কেমন যেন অনিহা কাজ করছে। সহজে কিছুতে মন স্থির করতে পারছে না। বারংবার কিছু অযাচিত ভাবনা মনের গহীনে হামলে পড়ছে। এক অদ্ভুত অনুভূতি তাকে যেন ধীরে ধীরে কাবু করে ফেলছে। আর এই সবকিছুই হচ্ছে সেদিনের ছোয়া ও বিন্তির বলা কথা গুলোর পর থেকে।
রুহি উঠে বসলো, নিজের মাথাটাকে দুপাশে ঝেড়ে ফেলার মতো করে, নিজেই নিজেকে বলে উঠলো, "রুহি চুপকর, চুপকর এসব কি ভাবছিস তুই। কাকে নিয়ে ভাবছিস বুঝতে পারছিস। সে যদি তোর এসব তাঁরছেড়া ভাবনার কথা জানতে পারে তাহলে তোকে মাথার ওপড় থেকে এমন এক আছাড় মেরে নিচে ফেলবে যে তোর সব চিন্তা ভাবনা ভেতর থেকে বেরিয়ে মাটিতে গড়াগড়ি খাবে। এর পর ওগুলোকেই কুড়িয়ে এনে জুস বানিয়ে তোকেই গেলাবে।
অতপর রুহি আবারও শুয়ে পড়লো, বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে করতেই কিছুক্ষনের মাঝেই তার চোখে ঘুমের রাজ্যরা হামলে পড়লো। এক পরম শান্তির ঘুমের পর রুহি যখন উঠলো তখন আসরের নামাজের সময় প্রায় হয়ে এসেছে। দূর দূরান্ত থেকে তার কানে মৃদুস্বরে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। রুহি উঠলো ওয়াশরুমে গিয়ে ওযু করে এসে বিছানা বিছিয়ে নামাজ পড়ে নিলো। এর পরেই রুম থেকে বেরিয়ে স্টাডি রুমের দিকে অগ্রসর হলো, সেখানে গিয়ে চেয়ার টেনে পড়তে বসলো। রুহি মাঝে আজ পড়ার এক তীব্র তাগিদ কাজ করছে। সামনে ভর্তি পরীক্ষা, তাই হেলাফেলা করার কোনো সুযোগ নেই।
রুহি পড়ার টেবিলে বসে বইয়ের পাতায় নিজেকে ডুবিয়ে দিল। জানলা দিয়ে আসা হালকা বাতাসে তার চুল ছুঁয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তার পূর্ণ মনোযোগ এখন কঠিন সব গাণিতিক সূত্র আর তত্ত্বের ওপর। পড়ার টেবিলের বাতিটা জ্বালিয়ে সে গভীর নিবিষ্ট মনে নোট তৈরি করছে। একেকটি পাতা উল্টানোর শব্দ ছাড়া পুরো ঘর নিস্তব্ধ। একনাগাড়ে কয়েক ঘণ্টা পড়ার ফলে মস্তিষ্কে এক ধরনের একঘেয়েমি আর ক্লান্তি ভর করলে। রুহি একটু আড়মোড়া ভেঙে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকাল। দেখল মাগরিবের সময় হয়ে এসেছে।
সে উঠলো রুমেই কিছুক্ষণ পায়চারি করলো, এরিমাঝে আজান দিয়ে দিলে সে নামাজও পড়ে নিল। দীর্ঘক্ষণ একাসনে বসে থাকায় শরীরটা একটু ভারী হয়ে এসেছে। সে ভাবল, এই মুহূর্তে একটু খোলা হাওয়া আর আকাশের বিশালতা খুব প্রয়োজন। পড়ার টেবিল গুছিয়ে রুহি রুম থেকে বের হলো। মমতাজ বেগম কুসংস্কার মতে এই সময়ে সকলকে ছাদে যেতে বারণ করেন, কিন্তু রুহি প্রায়ই সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে এই অসময়ে ছাদে উঠে যায়। আজও ব্যতিক্রম হয় নি, সে জানে নাস্তার জন্য ডাক পরতে এখনো কিছুটা দেরি আছে। তাই ধীরপায়ে সে ছাদের সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। তার মনে হলো, ছাদের কার্নিশে দাঁড়িয়ে এই সন্ধ্যার বর্ণিল আলোকসজ্জার স্নিগ্ধতাটুকু গায়ে মাখলে মনের এই একঘেয়েমিটুকু নিমেষেই কেটে যাবে।
রুহি ছাদে পা রাখতেই এক পশলা হিমেল হাওয়া তাকে অভ্যর্থনা জানাল। সে দুহাত প্রসারিত করে গভীর একটা শ্বাস নিল। পুরো ছাদটার ওপর একবার চোখ বুলিয়ে নিতেই তার মনটা ভালো হয়ে গেল। গত কিছুদিনের বৃষ্টির পর ছাদের টবগুলোতে থাকা গাছগুলো যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। প্রতিটি গাছ আজ বড্ড সতেজ আর সজীব। রুহি ধীরপায়ে কার্নিশের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। আকাশের এক কোণে সূর্যটা হেলে পড়ছে, আর চারপাশজুড়ে গোধূলির এক মায়াবী আভা ছড়িয়ে পড়ছে। সন্ধ্যার এই মনোরম নিস্তব্ধতা রুহির মনের সব ক্লান্তি যেন ধুয়ে মুছে দিল।
★★★
রুহি যখন ছাদের পরিবেশে মাতোয়ারা, ঠিক সেই মুহূর্তেই খন্দকার বাড়ির সদর দরজায় একটা বাইকের আওয়াজ পাওয়া গেল। আজ পিয়াসের জীবনের এক বড় দিন—সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে তার প্রথম চাকরির জয়েনিং ছিল আজ। কর্মক্ষেত্রের প্রথম দিনটি সফলভাবে শেষ করে সে ঠিক সময়েই বাড়িতে ফিরেছে।
বাইক থেকে নেমে পিয়াস হেলমেটটা হাতে নিয়ে একবার ওপরের দিকে তাকাল। তার পরনে একটা ফর্মাল হালকা রঙের শার্ট, চোখেমুখে সারাদিনের কাজের ক্লান্তি থাকলেও তার সাথে মিশে আছে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি আর আভিজাত্যের ছাপ। একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে তার যে তীক্ষ্ণ ব্যক্তিত্ব, তা যেন তার হাঁটাচলায় আজ স্পষ্ট ফুটে উঠছে। সে অত্যন্ত গটগট করে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল। প্রথম দিনের অফিসের অভিজ্ঞতা, কোডিংয়ের জটিলতা আর নতুন কলিগদের সাথে আলাপচারিতা—সব মিলিয়ে পিয়াস এখন এক অন্যরকম প্রফেশনাল ভাইব নিয়ে বাড়িতে পা রাখল।
ছাদের কার্নিশ থেকেই রুহি পিয়াসকে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে দেখল। পিয়াসের এই নতুন রূপ আর তার কর্মজীবনের সূচনা খন্দকার বাড়িতে যে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে, তা রুহির অজানা নয়। রুহি জানে এখন বাড়িতে শুধু পিয়াস চর্চাই হবে, তাই পিয়াস বাড়িতে এসেছে দেখে রুহি দ্রুত নিচে নামার কোনো তাগিদ অনুভব করল না। বরং পিয়াসকে এড়ানোর জন্য সে আরও কিছুক্ষণ ছাদেই দাঁড়িয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নিল।
অন্যদিকে, পিয়াস রাস্তায় থাকতেই ছাদে দাড়িয়ে থাকা রুহিকে খেয়াল করেছে। আজ কয়েকদিন ধরেই রুহির সাথে কথা বলার একান্ত একটা সুযোগ খুঁজছিল সে । তাই রুহিকে ছাদে দেখেই সে বাড়িতে ঢুকে মা আর চাচিদের সাথে অল্প কিছু কাজের কথা সেরে, কালক্ষেপণ না করে দ্রুত পায়ে ছাদের দিকে পা বাড়াল।
রুহি তখন আনমনে গোধূলির আকাশের দিকে তাকিয়ে । হঠাৎ পেছনে ছাদের দরজার কাছে কারো পায়ের শব্দ পেয়ে সে ঘুরে তাকাল। দেখল দরজায় পিয়াস দাঁড়িয়ে আছে। রুহি কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে পিয়াসকে পাশ কাটিয়ে নিচে নামতে উদ্যত হলো। কিন্তু পিয়াস চট করে ওর পথ আগলে দাঁড়াল।
রুহি বিরক্ত স্বরে বলল, "পথ ছাড়ুন পিয়াস ভাইয়া, আমি নিচে যাবো।"
পিয়াস বাধা দিয়ে বলল, "এত তাড়াহুড়ো কিসের? তোর সাথে আমার জরুরি কিছু কথা আছে।"
রুহি তবুও পাশ কাটিয়ে যেতে চাইলে পিয়াস এবার সরাসরি রুহির হাতের কবজি শক্ত করে চেপে ধরল। আকস্মিক এই স্পর্শে রুহির মেজাজ চড়ে গেল। রুহি তার সর্বশক্তি দিয়ে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু এতে পিয়াসের হাতের চাপ যেন আরো গাঢ় হতে থাকে।
রুহির এই ছটফটানি আর নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা দেখে পিয়াস ওকে হঠাৎই হেঁচকা টানে আরও নিজের কাছে নিয়ে এল। পিয়াসের এমন কাজে অপমানে আর রাগে রুহি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পিয়াসকে সজোরে একটি ধাক্কা মেরে দিল। অপ্রস্তুত পিয়াস কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়েও নিজেকে সামলে নিয়ে দাঁড়াল।
রুহি হঠাৎ রণচণ্ডী মূর্তিতে গর্জন করে উঠল, "একদম আমার কাছে আসার চেষ্টা করবেন না! নিজের সীমানায় থাকুন পিয়াস ভাইয়া, নাহলে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে।"
পিয়াস কয়েক মুহূর্ত অবাক হয়ে রুহির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর পকেটে দুহাত গুঁজে মুখে এক শয়তানি হাসি ফুটিয়ে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল, "তুই আমাকে ধাক্কা দিলি? তুই মনে হয় অতীত একদম ভুলে গিয়েছিস রুহি। এক সময় তো তুই আমাকেই ভালোবাসতিস, লাটিমের মতো আমার পেছন পেছন ঘুরঘুর করতি শুধু আমার একটুখানি মনোযোগ পাওয়ার জন্য। তাহলে এখন কী হলো? এত সহজে সব ভুলে গেলি? নাকি নিজের দুর্বলতা আড়াল করতেই এতো চোটপাট! "
পিয়াসের কথাগুলো শুনে রুহি একটুও অবাক হলো না, বরং সে হয়তো জানতো এমন কোন উত্তরই আসবে, তাই তো ওর চোখেমুখে ফুটে উঠল চরম অবজ্ঞা আর ঠোঁটের কোণে এক সূক্ষ্ম হাসির রেখা।
রুহি কঠিন স্বরে জবাব দিল, " ওই এক সময় আমার 'আবেগ' কাজ করেছিল আর 'বিবেক' অক্কা পেয়েছিল। কিন্তু এখন আমার বিবেক জাগ্রত হয়েছে আর আবেগটা ঠুস করে মরে গেছে।"
পিয়াস যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। রুহির প্রতিটি কথায় যেন চাবুকের মতো ধার ছিল। পিয়াস কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু রুহি হাত উঁচিয়ে তাকে থামিয়ে দিল। "কাল খাবার টেবিলে কী যেন বলছিলেন? আমি পেটুক? হ্যাঁ, আমি পেটুক, তাতে আপনার কী? আমি তো আর আপনার ঘাড়ের ওপর বসে খাই না! আমার বাপ-চাচারা সামর্থ্যবান, আমি তাদেরটাই খাই। এই বাড়িতে আপনার যতটুকু অধিকার, আমারও ঠিক ততটুকুই। শুধু শুধু আমাকে ঘাঁটাতে আসবেন না, হিতে কিন্তু বিপরীত হয়ে যাবে পিয়াস ভাইয়া।"
কথাগুলো শেষ করে রুহি এক মুহূর্তও আর সেখানে দাঁড়াল না। গটগট করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল সে। পেছনে পড়ে রইল পিয়াস। বিকেলের ম্লান আলোয় পিয়াসের মুখটা তখন অপমানে আর রাগে অন্ধকার হয়ে গেছে। রুহির এই আমূল পরিবর্তন আর অবজ্ঞা যেন তার দম্ভের দেয়ালে এক বিশাল ফাটল ধরিয়ে দিয়ে গেল।
চলবে_________