#অন্তহীন_প্রেম_আমার
#আফীফা_আফনান
#পর্ব_২০ (খ)
[কপি করা নিষিদ্ধ]
আখতারুজ্জামান সাহেব কর্মজীবি মানুষ, চাকরির ব্যস্ততায় তার নিজের জন্য অবসরটুকু বড্ড কম। তার জীবনে ছুটির দিনগুলোর দেখা মেলে যেন চাতক পাখির বৃষ্টির মতো—খুব প্রতীক্ষিত কিন্তু বড্ড সীমিত। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। দুদিন হলো তিনি বাড়িতে এসেছেন, আর হাতে অবশিষ্ট আছে কেবল দুদিনের অমূল্য সময়। এই ক্ষণস্থায়ী সময়ের পরশেই পুরো বাড়িতে এখন এক বর্ণাঢ্য উৎসবের আমেজ খেলা করছে। বাড়ির প্রতিটি ইটে, প্রতিটি কোণায় যেন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে।
সেদিন আসাদুজ্জামান সাহেব নিজের একান্ত জেদে আর শাহাজের জীবনে ঘটে যাওয়া এক গোপনীয় ঘটনার জোরে শাহাজকে একপ্রকার বাধ্য করেই বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন। আসাদুজ্জামান জানতেন, শাহাজকে বাগে আনা সহজ নয়; তাই তিনি তাকে এক অদ্ভুত 'ব্ল্যাকমেইল' করেছিলেন যাতে তিনি সফলও হন । তবে সেই সাথে শাহাজেরও ছিলো একটি শর্ত যা হলো,—শাহাজ বাড়িতে আসবে, কিন্তু বিনিময়ে আসাদুজ্জামান তাকে থাকার জন্য কোনো প্রকার জোরাজুরি করতে পারবেন না।
শাহাজ সেই শর্ত মেনেই এসেছিল। সেই মতে সারাটা দুপুর ও বিকেল পরিবারের সাথে কাটিয়ে সন্ধ্যার আবছা আঁধার ঘনানোর আগেই, মোস্তফা কামাল সাহেব বাড়ি ফেরার ঠিক পূর্বমুহূর্তে শাহাজ বিদায় নেওয়ার প্রস্তুতি নেয়। বাড়ির অন্যান্য সদস্যরা মায়ায় আর আবদারে তাকে আরও কিছুক্ষণ থেকে যাওয়ার জন্য বড্ড জোরাজুরি করেছে। দাদি মমতাজ বেগম তো প্রায় চোখের জল ফেল ছিলেন। কিন্তু শাহাজ ছিল অটল। সে যখন ধীর পায়ে বাড়ির মেইন গেট দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল, তখন সবার মনেই এক বিষণ্নতার সুর বেজে উঠল। রুহির ব্যাকুল হৃদয় ও বারবার বলতে চাইছিলো, "শাহাজ ভাই থেকে যান এবার," কিন্তু সে পারলো না কথাটি উচ্চারণ করতে।
সবার মতো আসাদুজ্জামান চাইলেও শাহাজকে আটকাতে পারেননি, কারণ তিনি নিজের দেওয়া শর্তের বেড়াজালে নিজেই বন্দি ছিলেন। তবে শাহাজ চলে গেলেও বাড়ির মানুষগুলোর মনে তখন একটা অদ্ভুত তৃপ্তি বিরাজ করছিল। শাহাজ যে এতদিন পর নিজে থেকে এসে সারাদিন সবার সাথে সময় কাটিয়েছে, সবার হাসি-ঠাট্টায় শামিল হয়েছে—এইটুকু প্রাপ্তিই যেন তাদের কাছে পরম সুখের সমতুল্য। বিষণ্নতার রেশটুকু ছাপিয়ে বাড়ির বাতাসে তখনো শাহাজের সেই গম্ভীর ব্যক্তিত্বের ঘ্রাণ আর তার উপস্থিতির রেশ লেগে ছিল, যা সবাইকে যেন এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এক পশলা শান্তির ছোঁয়া দিয়ে গেছে।
★★★
প্রতি দিনের ন্যায় আজও সূর্য ওঠার সাথে সাথেই খন্দকার বাড়ির আঙিনায় শুরু হয় কর্মব্যস্ততার এক চিরচেনা সুর। পুব আকাশে রোদের ঝিলিক পড়তেই রান্নাঘরে গৃহিণীদের ব্যস্ততা যেন কোনো উৎসবে রূপ নেয়। প্রতিদিনের ন্যায় আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সকালের নাস্তা সেরে সবার তৃপ্তিময় মুখের হাসি দেখেই যেন শুরু হয়েছে দুপুরের এলাহি আয়োজনের প্রস্তুতি।
আজ রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা সুবাস অন্য দিনের চেয়েও বেশি মোহনীয়। উনুনে মাটির হাঁড়িতে রান্না হচ্ছে গরুর মাংস—এটি ইয়াসমিন বেগমের ‘সিগনেচার ডিশ’। মাটির হাঁড়িতে ধীর আঁচে মাংস রান্নার এই বিশেষ কৌশলটি ইয়াসমিন বেগমের নিজস্ব, যার স্বাদ আর ঘ্রাণে পুরো বাড়ি ম-ম করে। বিশেষ করে আখতারুজ্জামান সাহেবের কাছে এই রান্নার কদর সবকিছুর ওপরে। প্রিয় দেবর রুপি ভাইয়ের এই প্রিয় খাবারটি পরম মমতায় রেঁধে দিতে ইয়াসমিন বেগমও বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেন না।
খন্দকার এই বাড়ির মেলবন্ধন যেন এক অবিচ্ছেদ্য শৃঙ্খলের মতো মজবুত। এখানে দেবর-ভাবিদের সম্পর্কের মাঝে কোনো আনুষ্ঠানিকতা বা দূরত্ব নেই; বরং তাদের খুনসুঁটি আর গভীর আস্থার দিকে তাকালে মনে হয় তারা যেন একই মায়ের পেটের ভাই-বোন। মমতাজ বেগম এই সংসারের গোড়ার শিকড়টিকে নিজ হাতে এমন মজবুতভাবে গেড়েছেন যে, কোনো ঝড়ো হাওয়া তাকে নাড়াতে পারেনি। সম্পর্কের পবিত্রতা আর পরিবারের একতাকে তিনি ধর্মের মতো লালন করেছেন।
হ্যাঁ, স্বামীর অবর্তমানে এই পরিবারটিকে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে আসতে মমতাজ বেগমকে অনেক চড়াই-উৎরাই পার করতে হয়েছে। মাঝপথে অনেক কাছের মানুষ বিদায় নিয়েছে, বিচ্ছেদের দীর্ঘশ্বাস দীর্ঘ হয়েছে, কিন্তু মমতাজ বেগম দমে যাননি। এই লৌহমানবীর একটাই কথা—"আমি না খেয়ে দিন কাটাব, তবুও কারও কাছে মাথা নত করব না।" তার সেই তেজস্বী মূল্যবোধ আর অটুট ব্যক্তিত্বই আজ খন্দকার বাড়ির প্রতিটি সদস্যের মেরুদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ এই ভরা সংসারে যে হাসি-আনন্দের ফোয়ারা বয়ে যাচ্ছে, তার মূল কারিগর এই বিদুষী নারীই।
রান্নাঘরে আজ তিল ধারণের ঠাঁই নেই। উনুনে মাটির হাঁড়িতে মাংসের ম-ম গন্ধে চারপাশ আমোদিত। তানজিনা বেগম ছুরি হাতে নিয়ে সবজি কাটায় ব্যস্ত, নাসরিন বেগম একমনে শিল-পাটায় মশলা বাটছেন, আর রান্নার প্রধান কারিগর ইয়াসমিন বেগম নিজের সিগনেচার স্টাইলে হাঁড়ির ভেতরে মাংসের সাথে একে একে সব মশলা মেশাতে ব্যস্ত।
আজ রান্নাঘরে শুধু বাড়ির তিন রমণীই নন, সাথে আছে খন্দকার বাড়ির তিন আদুরে কন্যা—রিমু, রুবি আর রুহি। ইয়াসমিন বেগমের সেই বিখ্যাত রান্নার রেসিপি শেখার জন্যই আজ তারা রান্নাঘরে ভিড় জমিয়েছে। রিমু নিপুণভাবে মোবাইলের ক্যামেরা দিয়ে ভিডিও করছে , তো রুবি খাতা-কলম নিয়ে বসেছে প্রতিটা উপকরণের মাপ লিখে নিতে। আর রুহি? সে ইয়াসমিন বেগমের একদম গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে হাঁড়ির ভেতরটা খুঁটিয়ে দেখছে। তার একাগ্রতা দেখে মনে হচ্ছে, এক পলকের জন্য দৃষ্টি সরালে বুঝি অনেক বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যাবে।
সবজি কাটতে কাটতে তানজিনা বেগম এতোক্ষন পূর্বের সকল কথা ভাবছিলেন। হঠাৎ আবারও তিনি এক গভীর ভাবনায় ডুব দিলেন। তার মনের আয়নায় আবারও ভেসে উঠল গত দুদিন আগের সেই দৃশ্য। কোনো আগাম খবর না দিয়েই অনেকটা সারপ্রাইজের মতো আখতারুজ্জামান যখন ড্রয়িং রুমে এসে দাঁড়ালেন, বাড়ির সবাই তখন হতবাক। রুহি কলেজে, রুবি ভার্সিটিতে আর রিমু তার মেডিকেল কলেজের সেকেন্ড প্রফেশনাল পরীক্ষার জন্য পড়ার টেবিলে ব্যস্ত ছিল। মুগ্ধও তখন স্কুল থেকে ফিরল মাত্র।
আকস্মিক আখতারুজ্জামানের ডাক শুনে একে একে সবাই যখন ড্রয়িং রুমে এসে দাঁড়াল, তখন সামনে আখতারুজ্জামানকে দেখে তাদের মুখে হাসির রেখা ফুটলো, মুগ্ধ গিয়ে জড়িয়ে ধরলো বাবাকে, হঠাৎই সেই হাসির রেখা মিলিয়ে,সবাই স্তব্ধ হয়ে গেলো, উপস্থিত সবার বিস্ময় যেন তখন আকাশ ছুঁল। কারণ হঠাৎ আখতারুজ্জামানের পেছনে ছায়ার মতো এগিয়ে এসে দাঁড়ালো শাহাজ!
খন্দকার বাড়ির যে ছেলেকে শত অনুরোধেও ভেতরে ঢোকানো সম্ভব হচ্ছিল না, তাকে আসাদুজ্জামান সাহেব কী অবলীলায় না সঙ্গে নিয়ে এলেন! সবাই যখন কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করছিল যে এই অসাধ্য সাধন তিনি কীভাবে করলেন, আসাদুজ্জামান সাহেব কেবল এক রহস্যময় হাসি দিয়ে সকলকে এড়িয়ে গিয়েছেন।
সেদিন দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সময়টা যেন এক অলৌকিক আনন্দের মতো ছিল। সবাই ভেবেছিল শাহাজ বুঝি চিরদিনের জন্যই ফিরে এসেছে। কিন্তু সন্ধ্যা ঘনাতেই যখন শাহাজ বিদায় চাইল, সবার হৃদয়ে এক বিষণ্নতার সুর বেজে উঠল। শাহাজ জানত, তার বাবা মোস্তফা কামাল অফিস থেকে আজ জলদি ফিরবে। কারন ইতিমধ্যে ভাইয়ের আসার খবর তার কাছে পৌছে গিয়েছে। তাই বাবার সাথে যেন কোনোভাবেই দেখা না হয়, তাই তিনি আসার ঠিক আগমুহূর্তেই শাহাজ বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
শাহাজ যাবার একটু পরেই অফিস থেকে ফিরে মোস্তফা কামাল যখন ছোট ভাইয়ের সাথে বহুদিন পর দেখা করলেন, তখন তাদের মাঝে যেন এক পশলা আবেগ উপচে পড়ল। কথায় কথায় যখন তিনি শুনলেন যে শাহাজ আজ বাড়িতে এসেছিল, তখন তার চোখের কোণে এক চিলতে চিকচিক করা আভা দেখা গেলো। কিন্তু পরক্ষণেই যখন শুনলেন যে তার ফেরার আগেই শাহাজ চলে গিয়েছে, তখন তার মুখটা গম্ভীর আর থমথমে হয়ে গেল। কেউ বুঝতে না পারলেও স্ত্রী হিসেবে তানজিনা ঠিকই ধরতে পেরেছেন—ছেলে ফিরে এসেও যে তার সাথে দেখা না করেই চলে গেল, এই অভিমানে মোস্তফা কামালের বুকের ভেতরে কোথাও যেন রক্তক্ষরণ হচ্ছে। কিন্তু ওই যে এক পাহাড় সমান ইগো আর আত্মগরিমা! তিনি মনে মনে চান শাহাজ ফিরে আসুক, কিন্তু নিজে গিয়ে কখনোই ছেলেকে ডাকবেন না।
"বড় মা, দেখো!"
হঠাৎ রুহির ডাকে তানজিনা বেগমের ভাবনার সুতো ছিঁড়ে গেল। তিনি চোখের কোণটা আলতো করে মুছে রুহির দিকে তাকিয়ে বললেন, "কী দেখব রে মা?"
রুহি অত্যন্ত উৎফুল্ল কণ্ঠে জবাব দিল, "মাংসের কালারটা দেখো? এখনই তো আমার খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে!"
রুহির কথা শুনে পাশ থেকে রুবি নাক-মুখ কুঁচকে বলে উঠল, "তুই কি রাক্ষস নাকি? তোর এই কাঁচা মাংস খেতে মন চাইছে?"
রুহি দাঁত কিড়মিড় করে রেগেমেগে বলল, "এই রুবি আপু, আমাকে একদম রাক্ষস বলবে না! আমি কি বলেছি যে আমি কাঁচা মাংস খাব? জাস্ট বললাম কালারটা সুন্দর হয়েছে। খেতে মন চাইছে, খাবো বলেছি কি?"
"খেয়ে ফেলতে মন চাওয়া আর খাওয়া তো একই কথা!" রুবি টিটকারি কাটল।
দুই বোনের এই খুনসুঁটি যখন চরমে, তখনই হঠাৎ রিমু হুঙ্কার দিয়ে উঠল, "এই তোরা দুইটা চুপ করবি? তোদের কারণে আমার ভিডিওটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আর একটা কথা বললে আমি একদম তোদের দুজনের গলা টিপে ধরব!"
রিমুর ধমক শুনে রুহি আর রুবি একে অপরের দিকে তাকিয়ে জিভ ভেঙাল। মেয়েদের এই হাসি-তামাশা, মেকি ঝগড়া, রান্নাঘরের মশলার ঝাঁঝ, মাটির হাঁড়ির ধোঁয়া আর বড়দের প্রাণখোলা হাসাহাসি—সব মিলিয়ে বাড়িটি যেন একটি জীবন্ত স্বর্গ, যেখানে প্রতিটি সম্পর্ক স্পষ্ট, অকৃত্রিম আর ভালোবাসার চাদরে মোড়া।
★★★
রান্নাঘর থেকে ডাইনিং টেবিল পর্যন্ত ম-ম গন্ধে মৌতাত ছড়িয়ে পড়েছে। দুপুরের রান্নার শেষ পর্ব এখন মধ্যগগনে। ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত, মাটির হাঁড়িতে ইয়াসমিন বেগমের সেই বিশেষ গরুর মাংস, ডাল আর ভাজাভুজির বাহারি পদ একে একে টেবিলে সাজানো হচ্ছে। খাবারের সেই রাজকীয় সুঘ্রাণে বাড়ির বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠেছে, যা ক্ষিধেকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
খাবার পরিবেশন প্রায় শেষ পর্যায়ে, ঠিক তখনই সদর দরজায় চাবির শব্দ শোনা গেল। একসাথে বাড়িতে প্রবেশ করলেন মোস্তফা কামাল, শাহরিয়ার কবির এবং শাহাবুদ্দিন সাহেব। বাড়ির পুরুষদের এমন অসময়ে একসাথে ফিরতে দেখে ডাইনিংয়ে থাকা তানজিনা ও ইয়াসমিন বেগম কিছুটা অবাক হলেন। তানজিনা বেগম ত্বরিত পায়ে এগিয়ে গিয়ে আদর্শ স্ত্রীর মতো মোস্তফা কামালের হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে, মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলেন, "আজ হঠাৎ এত তাড়াতাড়ি ফিরলেন যে সবাই?"
পেছন থেকে নাসরিন বেগমও ততক্ষণে ট্রেতে করে পানির গ্লাস নিয়ে হাজির হয়েছে। মোস্তফা কামাল ট্রে থেকে পানির গ্লাস নিয়ে তাতে থেকে এক চুমুক পানি খেয়ে তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, "আজ অফিসে কাজের চাপ কিছুটা কম ছিল তানজিনা। ভাবলাম প্রতিদিন তো অফিসেই পড়ে থাকি, আজ না হয় একটু তাড়াতাড়ি গিয়ে সবার সাথে বসে দুপুরের খাবারটা খাই। পরিবারকে সময় দেওয়াটাও তো জরুরি, তাই না?"
স্বামীর মুখে এমন পারিবারিক টান দেখে তানজিনা বেগমের ঠোঁটে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। ইয়াসমিন বেগমও সাথে সাথেই সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "খুব ভালো করেছেন। আপনারা দ্রুত হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে আসুন, খাবার একদম রেডি। আজ সবাই একসাথে বসে গরম গরম খাবেন।"
স্ত্রীর কথায় কবির সাহেব আর শাহাবুদ্দিন সাহেবও হাসিমুখে নিজ নিজ ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন।
এদিকে ওপরতলায় রুবির রুমে তখন চলছে তিন বোনের অন্যরকম এক আসর। রুহি, রুবি আর রিমু—তিনজনেই বিছানায় গোল হয়ে বসে খুনসুঁটিতে মত্ত। কিছুক্ষণ আগে রান্নাঘরে যে রান্নার পাঠ চলেছে, তা নিয়েই এখন শুরু হয়েছে মহাযুদ্ধ।
রুবি হাত নেড়ে বেশ জোর দিয়ে বলছে, "লিখে রাখ তোরা, যখন আমি রান্না করব না, মেঝ মার রান্নাকেও হার মানিয়ে দেব। আমার হাতের জাদুই হবে আলাদা!"
রিমু ভ্রু কুঁচকে পাল্টা জবাব দিল, "খাতায় লিখে রাখলেই রান্না হয়ে যায় না রে রুবি। আমি যে নিখুঁত ভিডিও করেছি, ওটা দেখে যখন আমি রান্না করব, তখন তোরা আঙুল চাটবি। ডাক্তার হতে এসেছি বলে কি ভাবছিস রান্না পারব না?"
রুহি এতক্ষণ দুজনের কথা শুনছিল, এবার সে নাক কুঁচকে বলে উঠল, "আহা! কী আমার রাঁধুনিরা সব! তোমরা তো সব মেপে মেপে দিবা। কিন্তু আমি তো চাচির একদম পাশে দাঁড়িয়ে অন্তর দিয়ে দেখেছি। রান্নায় আসলে মন লাগে, যা তোদের নেই। দেখবা একদিন আমিই তোদের সবাইকে তাক লাগিয়ে দেব।"
রুহির আত্মবিশ্বাস দেখে রুবি আর রিমু হোহো করে হেসে উঠল। রুমের ভেতর ভেসে বেড়াতে লাগল তিন বোনের অমলিন হাসির শব্দ। বাইরের মেঘলা আকাশ আর নিচের তলার রান্নার সুঘ্রাণ—সব মিলিয়ে খন্দকার বাড়িতে এখন এক অনাবিল সুখের আবহ।
ঠিক তখন নিচ থেকে রিমুর উদ্দেশ্যে ইয়াসমিন বেগমের স্নেহমাখা ডাক ভেসে এলো। রিমু ওপর থেকেই সাড়া দিল, "আসছি মেজো মা!" রিমু নিচে চলে যেতেই ওপরতলায় রুবি আর রুহি আবার নিজেদের খুনশুটিতে মজে উঠল।
রিমু নিচে নামতেই ইয়াসমিন বেগম সবার অগোচরে তাকে আড়ালে ডেকে নিলেন। রিমুর হাতে সযত্নে একটি বড় টিফিন বক্স ধরিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বললেন, "এটা জলদি গিয়ে শাহাজকে দিয়ে আয় রে মা। তোর আব্বুর মতো শাহাজেরও আমার হাতের এই রান্নাটা খুব পছন্দের। ও তো একা থাকে, কি খায় না খায় কে জানে! মন ভরে খেতেও পারে না বোধহয়।" ইয়াসমিন বেগমের কণ্ঠে শাহাজের প্রতি এক প্রগাঢ় মাতৃত্ব ফুটে উঠল। শাহাজ ইয়াসমিন বেগমের নিজের সন্তান না হয়েও যেন তার হৃদয়ের বিশাল একটা অংশ দখল করে আছে।
রিমু মৃদু হেসে বক্সটি নিয়ে বের হতে যাবে, ঠিক তখনই ছোট্ট মুগ্ধ পেছন থেকে ওর ওড়না টেনে ধরল। রিমু পেছন ফিরে ভ্রু নাচিয়ে ইশারায় জিজ্ঞেস করল, "কী হয়েছে?"
মুগ্ধ দাঁত কেলিয়ে এক চিলতে হাসি দিয়ে বলল, "তুমি শাহাজ ভাইয়ার বাসায় যাচ্ছো না? আমিও যাবো তোমার সাথে রিমুপু!"
মুগ্ধের কথায় রিমু আর বারণ করল না; আদরের ছোট ভাইয়ের হাত ধরে শাহাজের ফ্ল্যাটের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল।
তারা বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই বাড়িতে প্রবেশ করল পিয়াস। ড্রয়িং রুম পার হওয়ার সময় ইয়াসমিন বেগম তাকে দেখে রান্নাঘর থেকেই বলে উঠলেন, "পিয়াস, হাত-মুখ ধুয়ে নিচে নাম বাবা। তোর বাবারা এখনই খেতে বসবে , সবাই একসাথে খাবি।" মায়ের কথায় পিয়াসও নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল।
কিছুক্ষণ পরই পরিবারের সকল সদস্য ডাইনিং টেবিলে সমবেত হলেো। প্রতিদিনের নিয়ম অনুযায়ী বাড়ির বউরা অত্যন্ত যত্নে সবাইকে খাবার পরিবেশন করতে শুরু করে। চার ভাই—মোস্তফা কামাল, শাহরিয়ার কবির, শাহাবুদ্দিন এবং আখতারুজ্জামান আজ এক সারিতে খেতে বসেছে। মাঝখানে দাদি মমতাজ বেগম। বাকি চেয়ারগুলোতে পিয়াস, রুবি এবং শাহাবুদ্দিনের ঠিক পাশেই রুহি বসেছে। রিমু আর মুগ্ধর চেয়ার দুটো তখনো খালি।
খাওয়া শুরু হতেই কবির সাহেব স্ত্রী ইয়াছমিন বেগমকে জিজ্ঞেস করলেন, "কাব্য ফোন করেছিলো, কাব্য কবে ফিরবে কিছু বলেছে?"
ইয়াসমিন বেগম মাংসের বাটি হাতে নিয়ে বলেন, "হ্যাঁ, দু-একদিনের মাঝেই ফিরবে বলেছে।"
এরই মাঝে মোস্তফা কামাল খেয়াল করলেন দুই সদস্য অনুপস্থিত। তিনি প্রশ্ন করলেন, "সবাই আছে, কিন্তু মুগ্ধ আর রিমু কোথায়? খেতে আসেনি কেন?"
এতক্ষণ কেউ বিষয়টি খেয়াল করেনি। রুহিও অবাক হয়ে নিজের মাকে জিজ্ঞেস করল, "আপু কোথায় আম্মু? মুগ্ধটাকেও তো দেখছিনা গেলো কই!""
ঠিক তখনই হাতে একগাদা চকলেট নিয়ে নাচতে নাচতে ঘরে ঢুকল মুগ্ধ। ওর চোখে-মুখে উপচে পড়া খুশি। রিমুও পেছনে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে।
মোস্তফা কামাল জিজ্ঞেস করলেন, "কোথায় ছিলে আম্মু?"
রিমু চেয়ারে বসতে বসতে বিনয়ের সাথে বলল, "শাহাজ ভাইয়ার ফ্ল্যাটে গিয়েছিলাম বড় আব্বু।"
সে আর কিছু বলার আগেই ইয়াসমিন বেগম পরিস্থিতি সামাল দিয়ে বললেন, "আমিই পাঠিয়েছিলাম ভাইজান। ওরও আমার হাতের মাংস খুব পছন্দের।"
মোস্তফা কামাল আর কিছু বললেন না; অতপর সবাই খাবারে মনোযোগী হলো। এদিকে মমতাজ বেগম বয়সের ভারে বেশি খেতে পারেন না, তাই অল্প খেয়েই সবার আগে ঘরে চলে যায়।
তিনি যেতেই খাবার টেবিল এক প্রাণবন্ত আড্ডায় মুখরিত হয়ে উঠল। চার ভাইয়ের শৈশবের খুনশুটি আর ঘরোয়া হাসাহাসিতে এক চমৎকার পরিবেশ তৈরি হলো। খেতে খেতে হঠাৎ আখতারুজ্জামান স্মৃতিকাতর হয়ে উঠলেন। তিনি চোখের চশমাটা ঠিক করে বলে উঠলেন, "মনে আছে মেজো ভাবি? তুমি যখন নতুন বিয়ে করে এই বাড়িতে এসেছিলে, তখন প্রথমবার এই মাংসটা রান্না করেছিলে। সে কী ঝাল! খেয়ে আমাদের নাকের পানি চোখের পানি একাকার! তখন তো ঝাল একদম খেতে পারতাম না, বড় ভাবি সবার জন্য তরকারিতে ঝাল দিলেও আমার টা ঝাল দেওয়ার আগেই তুলে রাখতো। এরপর বিয়ের পরে আরেক ঝালখোর আসলো আমার জীবনে, আজ দেখো—তোমরাই আস্তে আস্তে ঝাল খাইয়ে খাইয়ে আমাকে দক্ষ করে তুলেছ।"
আখতারুজ্জামানের কথা শুনে নাছরিন বেগম মুখ বাঁকালেন, অন্যদিকে ইয়াসমিন বেগম হাসলেন। অতপর বললেন, "ঝাল ছিল ঠিকই, কিন্তু এতো ঝালের পরেও তো তুমি চেটেপুটে সবটা সাবার করতে ভাই! নিজেরটা খেয়ে শেষে শাহেবের পাতেও নজর দিতে।"
শাহাবুদ্দিন সাহেব হাসলেন এবং ভাইয়ের সাথে দুষ্টামি করে বললেন, "সেজো ভাই বরাবরই খাদ্যরসিক ভাবি। ভাই দুনিয়ার আর কিছু জানুক বা না জানুক, এই এলাকার কোন দোকানের কোন খাবারটা ভালো, সেটা ভাই ঠিক জানতেন।" তাদের এই হাসাহাসিতে টেবিলের সবাই যোগ দিল।
হঠাৎ এই আনন্দের মাঝেই পিয়াস বাঁকা হেসে টিপ্পনি কাটল, "তাহলে কি রুহিও সেজো আব্বুর মতো পেটুক হয়েছে নাকি? সারাদিনই তো দেখি এটা সেটা খেতেই থাকে।"
রুহি এতক্ষণ বড়দের আড্ডা মন দিয়ে উপভোগ করছিল, কিন্তু পিয়াসের এমন তচ্ছিল্যভরা কথা শুনে ওর মুখটা মুহূর্তেই অন্ধকার হয়ে গেল। অনঢদিকে পিয়াস ওর দিকে তাকিয়ে কুটিল এক হাসি হাসছে।
পিয়াসের এমন কথায় মোস্তফা কামাল কিছুটা বিরক্ত হলেন কিন্তু তা প্রকাশ না করেই পিয়াসকে জিজ্ঞেস করলেন, "তো পিয়াস, জয়েনিং কবে থেকে?"
পিয়াস বেশ আভিজাত্যের সাথে বলল, "আগামীকালই জয়েনিং বড় আব্বু।"
পিয়াসের কথায় শাহরিয়ার সাহেব একটু ক্ষুদ্ধ হয়ে অভিযোগের সুরে বললেন, "তুমি চাইলে আমাদের ব্যবসাটা সামলাতে পারতে । এই চাকরি-বাকরি করার কী দরকার ছিল?"
পিয়াস রুহির দিকে তাকিয়ে দম্ভের সাথে বলল, "কী বলছ বাবা! এত পড়াশোনা করে আমি সামান্য ব্যবসা করব? এটা আমার পক্ষে সম্ভব না। আমার স্বপ্ন অনেক বড়, এসব ব্যবসা করে আমি আমার স্বপ্ন কখনোই পূরন করতে পারবো না।" আর তোমাদের ব্যবসায়ের যা অবস্থা কোনদিন সব বন্ধ করতে হয় কে জানে!"
পিয়াসের এই অহংকারী কথায় খাবার টেবিলের সেই প্রাণবন্ত আবহ যেন নিমিষেই পাংশুটে হয়ে গেল। সবাই একদম।চুপ হয়ে গেল। এক ধরনের নিস্তব্ধতা নেমে এলো সেখানে।
এমন থমথমে নীরবতা কাটাতে আখতারুজ্জামান শব্দ করে হেসে উঠলেন, "আরে তোমরা এখন এসব রাখো তো! মেজো ভাবি, আমাকে আর একটু মাংস দাও।"
ইয়াসমিন বেগম এতোক্ষন ছেলের কথায় বিব্রত হয়ে স্বামীর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। আখতারুজ্জামানের কথায় তিনি দ্রুত মাংসের বাটি হাতে তুলে নিয়ে বেড়ে দিতে লাগলেন । আখতারুজ্জামান পরিবেশ স্বাভাবিক করতে একে একে সবার সাথে কথা বলতে শুরু করেন। কিন্তু কথা বলতে বলতে হঠাৎ তিনি অতীতের এমন এক নাম উচ্চারণ করলেন, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলল।
মাংসের একটি টুকরো মুখে নিয়ে চিবাতে চিবাতে তিনি সাবলীলভাবে বলে ওঠেন, "ভাবি, এই বাড়িতে তোমার মতো মাংস আর কেউ রান্না করতে পারে না। তোমার হাতের মাংস, বড় ভাবির হাতের পিঠা-পায়েস, নাসরিনের হাতের ভর্তা... আর অঞ্জলির হাতের মুড়িঘণ্ট!"
'অঞ্জলি' নামটি উচ্চারিত হতেই শাহাবুদ্দিনের হাত মাঝপথেই থমকে গেল। নাসরিন বেগম স্বামীর ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনি আতঙ্কে আখতারুজ্জামানের বাহু খামচে ধরলেন। তানজিনা বেগম তটস্থ হয়ে শাশুড়ির রুমের দিকে তাকালেন, মনে মনে প্রার্থনা করলেন যেন নামটি তার কানে না যায়।
অন্যদিকে খাবার টেবিলের সেই হাসি-খুশি মানুষগুলোর চেহারা মুহূর্তে বিকৃত হয়ে গেল। সবাই চুপ হলেও রুহি,রুবি ও রিমু হঠাৎ এমন হওয়ার কারন টা বুঝলো না। তারা তিনজন বাড়ির বড়দের দিকে তাকিয়ে পরিস্থিতি বুঝার চেষ্ট করছে, অন্যদিকে আখতারুজ্জামান নিজের ভুল বুঝতে পেরে চুপসে গেলেন, তার মুখও উদাস হয়ে গেল।
শাহাবুদ্দিন সাহেব আর এক লোকমাও মুখে নিলেন না। তিনি আধখাওয়া প্লেট রেখে নিঃশব্দে টেবিল থেকে উঠে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন। এক সময়ের কোলাহলপূর্ণ ডাইনিং টেবিলটা এখন এক শ্মশানের মতো স্তব্ধতায় ডুবে গেল।
★★★
দেখতে দেখতে বিকেলের মিষ্টি আবহাওয়া চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে, এক মনোরম পরিবেশে যেন আশপাশের সব কিছু ছাপিয়ে গেছে। বিকেলের সোনাঝরা রোদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়লেও শাহাবুদ্দিনের মনের গহীনে তখন জমাটবদ্ধ অন্ধকার। তিনি বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু তাঁর দৃষ্টি বর্তমান ছাড়িয়ে বহুদূরের এক ধূসর অতীতে নিমজ্জিত। ঠিক সেই মুহূর্তে কাঁধে একটি শীতল ও কম্পিত হাতের ছোঁয়া অনুভব করলেন। পাশ ফিরতেই চোখে পড়ল আখতারুজ্জামানের মুখ। সেই হাসিখুশি মানুষটির চেহারায় এখন কেবলই অপরাধবোধের কালো ছায়া।
খুব অপরাধীর মতো ধরা গলায় আখতারুজ্জামান বলে উঠলেন, “আমাকে মাফ করিস শাহেব! তখন কথায় কথায় কী বলতে কী বলে ফেললাম, একদম খেয়াল ছিল না। আমার এক মুহূর্তের অসতর্কতায় তোর পুরনো ক্ষতগুলো আবারও তাজা হয়ে গেল। মাঝে মাঝে আমি যে কী করি, নিজেই জানি না!”
ভাইয়ের কণ্ঠে এমন গভীর অনুশোচনা দেখে শাহাবুদ্দিনের বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। বড় ভাই তাঁর কাছে বাবার সমতুল্য। ভাইকে এই অপরাধবোধের যন্ত্রণা থেকে মুক্ত করতে এবং নিজের ভেতরের হাহাকারকে আড়াল করতে শাহাবুদ্দিন জোর করে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তুললেন। অতপর শান্ত স্বরে বলেন, “ওসব নিয়ে আর ভেবো না ভাই। যা গেছে তা শুধুই অতীত। ভাগ্যের লিখন তো কেউ বদলাতে পারে না, যা হওয়ার ছিল তা-ই হয়েছে। তুমি ওসব ভেবে মন খারাপ করিও না।”
আখতারুজ্জামান বুঝলেন, শাহাবুদ্দিন কেবল তাঁকে স্বস্তি দেওয়ার জন্যই এই কথাগুলো বলছে; কিন্তু অজান্তেই যে তিনি ছোট ভাইয়ের মনের পুরনো ক্ষতটা নতুন করে রক্তাক্ত করে দিয়েছেন, যা তাঁর হৃদয়ে বিঁধছিল। আর এই অপরাধ বোধের কষ্টটা তার চেহারায় স্পষ্ট।
শাহাবুদ্দিন বুঝলেন ভাইয়ের মনের অবস্থা, অতপর ভাইয়ের মন থেকে মেঘ সরাতে শাহাবুদ্দিন হঠাৎ কোনো কিছু না ভেবেই আখতারুজ্জামানকে জাপটে ধরে কাতুকুতু দিতে শুরু করলেন। গম্ভীর মানুষটির এই শিশুতোষ আচরণে আখতারুজ্জামান আর হাসি ধরে রাখতে পারলেন না। বারান্দার নিস্তব্ধতা ভেঙে ঝংকার তুলল দুই ভাইয়ের প্রাণখোলা হাসির শব্দ।
ঠিক সেই মুহূর্তে সেখানে যোগ দিলেন মোস্তফা কামাল ও শাহরিয়ার কবির। যেন পূর্ণতা পেল খন্দকার বাড়ির ভ্রাতৃত্বের এক দুর্লভ চিত্র। চার ভাই একে অপরকে ঘিরে হাসাহাসিতে মেতে উঠেছে। বিকেলের মায়াবী আলোয় তাদের এই বন্ধন যেন এক কালজয়ী কাব্যের মতো মনে হচ্ছিল।
মোস্তফা কামাল একপাশে দাঁড়িয়ে গর্বভরে ভাইদের এই দৃশ্যটি অবলোকন করছিলেন। তাঁর চোখে ফুটে উঠল এক দৃঢ় সংকল্প। তিনি মনে মনে বলে উঠলেন, “আমাদের এই সম্পর্কের মাঝে আমি কখনো কোনো ফাটল ধরতে দেব না। এই মোস্তফা কামাল যতদিন জীবিত আছে, কারো সাধ্য নেই আমাদের এই ভালোবাসার শিকড় ছিন্ন করার। এর জন্য যদি আমাকে আমার খুব কাছের এবং অতি প্রিয় মানুষদেরও ত্যাগ করতে হয়, এমনকি নিজের জীবন থেকে চিরতরে মুছে ফেলতে হয়—আমি হাসিমুখে তাতেও রাজি।”
এই আত্মত্যাগের সংকল্প আর ভালোবাসার দৃঢ়তায় চার ভাইয়ের সেই মুহূর্তটি বিষাদ ছাপিয়ে এক অনন্য গৌরবে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ঠিক তেমনই অতীতের দীর্ঘশ্বাস বর্তমানের অটুট বন্ধনে যেন এক অদ্ভুত সান্ত্বনা খুঁজে পেল।
চলবে_____