#অন্তহীন_প্রেম_আমার
#আফীফা_আফনান
#পর্ব_২৮(ক)
[কপি করা নিষিদ্ধ]
দেয়াল ঘড়ির কাঁটা এখন রাত ৮টা বেজে ১০ মিনিট। পুরো খন্দকার বাড়িতে রাতের নিস্তব্ধতা নামতে শুরু করলেও রুহির রুমে এখন যেন এক ছোটখাটো সম্মেলন চলছে। বিছানার মাঝখানে চার মাথা এক হয়ে গোল হয়ে বসে আছে রুবি, রিমু, মুগ্ধ আর রুহি। সবার আকর্ষণের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো রুহির সেই সদ্য কেনা চকচকে স্মার্টফোনটি।
ফোনটি এখন রিমুর দখলে। সে বেশ দক্ষ হাতে ফোনের সব সেটিংস ঠিকঠাক করে দিচ্ছে। নতুন জিমেইল আইডি থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সব অ্যাপস নামানো শেষ। মুগ্ধ পাশে বসে হাঁ করে দেখছে তার রুহিপুর দামী ফোনের ডিসপ্লের কারুকাজ। এদিকে রুবি মাঝেমধ্যে ফোড়ন কাটছে, আর রুহি উত্তেজনায় নখ কামড়াচ্ছে—এই বুঝি তার স্বপ্নের ডিজিটাল দুনিয়ার দুয়ার খুলে গেল!
রিমু স্ক্রিনে আঙুল চালাতে চালাতে বলল, "নে রুহি, তোর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট একদম রেডি। প্রোফাইল পিকচারটা পরে দিস, আপাতত পরিবারে সবাইকে ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট দিচ্ছি।"
"সবাইকে দাও কিন্তু পিয়াস ভাইয়াকে বাদে।" রুহির কাটখোট্টা জবাব।
রুহির রুমের আড্ডাটা এখন বেশ জমে উঠেছে। রিমুও বোনের কথা অনুযায়ী দক্ষ হাতে একের পর এক পরিবারের প্রায় সব সদস্যকে রুহির নতুন ফেসবুক আইডি থেকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দিল। কাজ শেষ করে সে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ফোনটা রুহির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো,"নে তোর কাজ শেষ।"
রুহি ফোনটা হাতে নিয়ে কিছুটা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, "সবাইকে দিয়েছ? কাউকে বাদ রাখোনিতো?"
রিমু খাটে হেলান দিয়ে বসে উত্তর দিল, "হ্যাঁ রে, মোটামুটি সবাইকে দেওয়া শেষ। তবে দুজনকে দিইনি—শাহাজ ভাই আর পিয়াস ভাই। তুই তো পিয়াস ভাইকে দিতে বারন করলি। পিয়াস ভাইকে রিকোয়েস্ট দিলেও যা, না দিলেও তা-ই; ও তো ফেসবুক খুব একটা চালায় না। কিন্তু শাহাজ ভাইকে দিইনি।"
শাহাজ ভাইয়ের নাম শুনে রুহির কপালে ভাঁজ পড়ল। সে কিছুটা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, "কেন? শাহাজ ভাইকে কেন দিলে না? ওনাকে দেওয়া তো সবার আগে দরকার ছিল।"
রুহির প্রশ্ন শেষ হতে না হতেই পাশ থেকে রুবি বলে উঠল, "আরে না দেওয়াই ভালো রুহি। আমাদের কারও সাথেই তো ভাইয়ার ফেসবুক কানেকশন নেই। আমরা ভাইয়াকে ব্লক করে রেখেছি।
রুহি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো, "কেন! কেন!"
রুবি আবারও বললো,"তুই তো জানিসই ভাইয়া কতটা রাগী আর গম্ভীর! আমরা ভার্সিটিতে বন্ধুদের সাথে যেসব দুষ্টামি করি বা যেসব ছবি দিই, ভাইয়া যদি কোনোদিন ফেসবুকের কল্যাণে সেগুলো দেখে ফেলে, তবে আমাদের আর রক্ষা নেই। একদম শেষ করে দেবে আমাদের!।দেখবি বাড়ি থেকেই বের করে দিলো।"
রুহি বড় বড় চোখে দুই বোনের দিকে তাকিয়ে রইল। রিমুও রুবির কথায় সায় দিয়ে বলল, "হুম, রুবি ঠিকই বলেছে। আর তাছাড়া আমার মনে হয় না শাহাজ ভাই রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করবেন। আমি নিজে একবার উনাকে রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিলাম, কয়েক মাস ঝুলে ছিল কিন্তু উনি একসেপ্টই করেননি। শেষে লজ্জা পেয়ে আমি নিজেই রিকোয়েস্ট ক্যানসেল করে দিয়েছি।"
দুই বোনের কথা শুনে রুহির মনের কোণে হঠাৎই একটা কালো মেঘ জমে উঠল। তার বুকের ভেতরটা যেন একটু মোচড় দিলো। সে জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবতে লাগল, "শাহাজ ভাই কি তবে আমার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টটাও একসেপ্ট করবেন না? সবার জন্য কি উনি একই রকম কঠোর? নাকি আমার জন্য তাঁর মনে আলাদা কোনো জায়গা আছে?"
রুহির মনে এক অদ্ভুত দোলাচল শুরু হলো। একদিকে দামী ফোনের নতুন আইডির আনন্দ, অন্যদিকে শাহাজের প্রত্যাখ্যানের ভয়—সব মিলিয়ে এক অস্থিরতা তাকে ঘিরে ধরল।
এদিকে মুগ্ধর অস্থিরতা দেখার মতো। তিন বোনের কোন কথাই তার মগজে ডুকলো না কারন তার পুরো মনোযোগ রুহির নতিন মোবাইলের ওপর। সে রুহির একদম গা ঘেঁষে বসে চাতক পাখির মতো ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে। তার মনে মনে বিশাল পরিকল্পনা—কখন আপুর হাত থেকে ফোনটা একটু ফুরসত পাবে আর সে টপাটপ নিজের পছন্দের কয়েকটা গেম ডাউনলোড করে নেবে। দামী ফোনের প্রসেসরে গেমগুলো কেমন চলে, সেটা দেখার জন্য তার তর সইছে না।
মোবাইল কেনা হলেও রুহির জন্য এখনো নতুন সিম কার্ড কেনা হয়নি। আপাতত ঠিক হয়েছে নাসরিন বেগমের একটা পুরনো সিম সে ব্যবহার করবে। রিমু সেই সিমটাই ফোনে সেট করে দিল। সিম সচল হতেই রুহি প্রথমেই তার জানের বন্ধু বিন্তিকে খুঁজে বের করে অ্যাড করে নিল। বিন্তিতো চরম অবাক, তার কাছে অবিশ্বাস্য ছিলো ব্যাপারটা। মুহূর্তের মধ্যে রিকোয়েস্ট এক্সেপ্ট করে রুহিকে তাদের চার বান্ধবীর সেই চিরচেনা 'ফ্রেন্ডস গ্রুপ'-এ জয়েন করিয়ে দিল।
রুবি আর রিমু একপাশে বসে নিজেদের মধ্যে নিচু স্বরে হাসাহাসি করছে, আর মুগ্ধ উৎসুক চোখে রুহির চ্যাটবক্সের দিকে তাকিয়ে আছে। এদিকে মেসেঞ্জার গ্রুপে তখন যেন তুফান শুরু হয়েছে। চার বান্ধবীর উচ্ছ্বাস আর থামানো যাচ্ছে না।
ছোঁয়া: "ওরে আল্লাআআআ! অবশেষে আমাদের মহারানী রুহি ডিজিটালাইজড হলো! অভিনন্দন খন্দকার বাড়ির ছোট শিশু অবশেষে আপনি বড় হয়েছেন !"
পড়শী: "বিশ্বাসই হচ্ছে না! রুহি এখন আমাদের সাথে গ্রুপে চ্যাট করছে? সূর্য কি আজ পশ্চিম দিকে উঠেছিল নাকি রে? রুহি,এট্ কি আসলে তুই! না মানে আমার তো বিশ্বাস হচ্ছে না। তোদের বাড়িতে যা কড়াকড়ি কিভাবে হলো এটা?"
বিন্তি: "আরে না, আমরা মনে হয় স্বপ্ন দেখছি! আর নাহলে আমি এখনো ঘোরের মধ্যে আছে। কিরে রুহি এখনো একটাও রিপ্লাইও দিচ্ছিস না কেন!"
রুহি: (লাজুক ইমোজি দিয়ে) "চুপ কর তোরা! সারাদিন অনেক ধকল গিয়েছে। বড় আব্বু নিজে পছন্দ করে ফোনটা কিনে দিয়েছেন। আমি তো ভেবেছিলাম আজ বকুনি খাব, কিন্তু হয়ে গেল উল্টো!"
ছোঁয়া: "বকুনি তো খাবিই, তবে সেটা আমাদের কাছে। যদি ট্রিট না পেয়েছি তো। কাল কিন্তু কোচিংয়ে গ্র্যান্ড ট্রিট চাই!"
পড়শী: "একদম! নতুন ফোনের খুশিতে কাল আমাদের আইসক্রিম খাওয়াতে হবে।
বন্ধুদের এমন খুনসুটি আর ভালোবাসামাখা চ্যাট দেখে রুহির মুখে হাসি আর ধরছে না। তার মনে হচ্ছে, এই ছোট একটা ডিভাইসের ভেতরে যেন পুরো পৃথিবীটা বন্দি হয়ে আছে। চার বান্ধবীর এই নির্মল আড্ডা আর নতুন ফোনের রোমাঞ্চে রুহির রাতটা আজ সত্যি অন্যরকম হয়ে উঠেছে।
এদিকে মুগ্ধর এতক্ষণের জমানো ধৈর্য যেন এবার বাঁধ ভাঙল। রুহিকে চ্যাটে মগ্ন দেখে সে আর থাকতে না পেরে আদুরে গলায় আবদার করে বসল, "রুহিপু, অনেক তো হলো! এবার তোমার ফোনটা একটু দাও না আমাকে। লক্ষ্মী আপু আমার!"
মুগ্ধর করুণ মুখ আর বিড়ালছানার মতো চাহনি দেখে রুহি হেসে ফেলল। সে জানে, এই ফোনের ওপর মুগ্ধর নজর অনেক আগে থেকেই। রুহি ফোনটা মুগ্ধর দিকে বাড়িয়ে দিতেই ওর চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে এক ঝটকায় ফোনটা নিয়ে বিছানার এক কোণে গিয়ে বসল।
রিমু হেসে বলল, "কী রে মুগ্ধ, ফোন হাতে পেয়েই কি গেমের ভাণ্ডার নামানো শুরু করলি নাকি?"
মুগ্ধ দাঁত বের করে হেসে বলল, "আরে না মেজো আপু, শুধু চেক করে দেখছি ডিসপ্লেটা কেমন স্মুথ। আর ওই যে একটা নতুন গেম বের হয়েছে না? ওটা জাস্ট একটু ডাউনলোড দিয়ে দেখব এই ফোনে গ্রাফিক্স কেমন আসে।"
রুবি পাশ থেকে টিপ্পনি কাটল, "হ্যাঁ হ্যাঁ, আমরা বুঝি না! একবার গেম ঢুকলে তো রুহি আর এই ফোন ফেরত পাবে না। তুই তো আর ফোনের মায়া ছাড়বি না।"
রুহি তখনো হাসছে। সে জানে মুগ্ধর এই পাগলামি। সে মুগ্ধকে ধমক না দিয়ে বরং ভালোবেসেই বলল, "ঠিক আছে, যা নামানোর নামা। কিন্তু খবরদার, ফোনের চার্জ যেন একদম শেষ করে ফেলিস না। আর শোন, না পড়ে মোবাইল চালালে মা দেখলে কিন্তু আবার বকবে, সাবধানে।"
মুগ্ধ যেন এখন অন্য জগতে। সে রুহির কোনো কথাই ঠিকমতো শুনছে না, তার আঙুলগুলো দামী ফোনের স্ক্রিনে ঝড়ের গতিতে চলছে প্লে-স্টোরে গেম খোঁজার জন্য। এদিকে রুহি, রুবি আর রিমু তিন বোন মিলে মুগ্ধর এই কসরত দেখে নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করছে।
হঠাৎই নিচতলা থেকে নাসরিন বেগমের গম্ভীর ডাক ভেসে এল—"মুগ্ধ! একবার নিচে আয় তো বাবা!"
গেমসের দুনিয়ায় মজে থাকা মুগ্ধর কাছে এই ডাকটা একদম বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো শোনাল। গুরুত্বপূর্ণ একটা গেমিং পেজ দেখার মাঝখানে মায়ের এই ডাক তার বিরক্তির সীমা ছাড়িয়ে গেল। কপালে ভাঁজ ফেলে সে রুহির দিকে তাকাতেই রুহি হালকা হেসে মিষ্টি সুরে বলল, "যা না, দেখে আয় কেন ডাকছে। মা তো আর অকারণে ডাকবে না। কাজটা সেরে এসে আবার ফোন নিস, আমি দিচ্ছি তোকে।"
বোনের আশ্বাসে কিছুটা শান্ত হয়ে মুগ্ধ ফোনটা রুহির হাতে দিয়ে গটগট করে রুম ছেড়ে নিচে চলে গেল। এদিকে রুবি আর রিমু তখন নিজেদের ভার্সিটির কোনো এক টপিক নিয়ে খোশগল্পে মত্ত। রুহি সেই সুযোগে বিছানায় একটু আয়েশ করে বসল। নিজের সদ্য কেনা দামী ফোনটা হাতে নিতেই ওর মনের ভেতর এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ খেলে গেল।
ফেসবুকে ঢুকতেই রুহির মুখে হাসি ফুটে উঠল। দেখল, পরিবারের বড়রা বেশ চটপটে! মোস্তফা কামাল আর কাব্য ও আখতারুজ্জামান ইতিমধ্যেই তার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এক্সেপ্ট করে নিয়েছে। রুহি কৌতূহল নিয়ে বড় আব্বুর ওয়ালে ঢুকে দেখল তিনি বেশ কিছু ইসলামিক পোস্ট আর পারিবারিক ছবি শেয়ার করেছেন। রুহি ভালোবেসে সেগুলোতে 'লাভ' রিঅ্যাক্ট দিল। এরপর কাব্য ভাইয়ের আইডিতে ঢুকতেই তার চোখ যেন আটকে গেল।
কাব্যের ফ্রেন্ডলিস্টের একদম ওপরের দিকেই জ্বলজ্বল করছে সেই পরিচিত নাম—শাহজাদা মোস্তাফা। প্রোফাইল পিকচারে সেই একই মায়াবী অথচ গম্ভীর চাহনি। শাহাজের আইডির ওপর আঙুলটা নিতেই রুহির বুকের ভেতরটা হঠাতই ধুকপুক করে উঠল। একটা তীব্র দ্বন্দ্ব শুরু হলো মনের ভেতর। রিমু তো একটু আগেই বলল যে শাহাজ ভাই তার রিকোয়েস্ট ঝুলািয়ে রেখেছিলেন। রুবিও বলল ভাইয়া অনেক কড়া-একসেপ্ট করবে না।
"শাহাজ ভাই কি আমাকেও এড়িয়ে যাবেন? নাকি আমি ওনার কাছে স্পেশাল কেউ?"—এই প্রশ্নটা রুহির মনে হাতুড়ির মতো বিঁধতে লাগল। একপাশে সামাজিক গাম্ভীর্যের ভয়, অন্যপাশে মনের গহীন কোণে পুষে রাখা সেই তীব্র ভালো লাগা। রুহির হাতটা কাঁপছিল। ফোনের স্ক্রিনের আলোয় তার কপালে জমে ওঠা বিন্দু বিন্দু ঘাম চকচক করে উঠল।
শেষমেশ সব দ্বিধা আর ভয়কে হার মানিয়ে রুহি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। চোখ বুঁজে বিড়বিড় করে কী যেন একটা প্রার্থনা করল,খন্দকার বাড়ির সেই ছোট্ট শান্ত মেয়েটি আজ যেন তার জীবনের সবচাইতে বড় 'ঝুঁকি'টা নিয়ে নিল। তারপর কাঁপা কাঁপা আঙুলে 'এড ফ্রেন্ড' বাটনটিতে ক্লিক করে দিল। রিকোয়েস্টটা পাঠানো মাত্রই রুহির মনে হলো তার হৃৎপিণ্ডটা বুঝি খাঁচা ছেড়ে বেরিয়ে আসবে। এক বুক আশা আর হাজারো উৎকণ্ঠা নিয়ে সে তাকিয়ে রইল নীল বাটনটির দিকে, যা এখন 'রিকুয়েষ্টেড' দেখাচ্ছে।
আর ওদিকে শাহাজের ফোনে টুং করে বেজে উঠল রুহির নতুন আইডির প্রথম নোটিফিকেশন।
★★★
ফোনের স্ক্রিনে 'আরোহী রুহি' নামটা ভেসে ওঠার পর শাহাজ আর নড়ল না। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেই নোটিফিকেশনের দিকে। তার ঠোঁটের কোণে তখন এক অদৃশ্য হাসি—বিশ্বাস আর ভালোবাসার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। ঠিক তখনই দূর থেকে বন্ধুদের চিল চিৎকার ভেসে এল। শাহাজ ফোনের স্ক্রিনটা অফ করে পকেটে রেখে দিল। রিমু বা রুবি যা ভেবেছিল ঠিক তাই হলো; শাহাজ রিকোয়েস্টটা দেখল ঠিকই, কিন্তু একসেপ্ট করল না। ঝুলিয়ে রাখল।
আজন্মের এই প্রতীক্ষার শেষে একটু তৃপ্তির ব্যবধান রাখা যেন তার স্বভাব।
শাহাজ ধীরপায়ে বন্ধুদের আড্ডার মধ্যমণিতে ফিরে এল। ঠিক সেই মুহূর্তে ক্যাফেটেরিয়ার গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকল শাহাজের আরেক বন্ধু মাহবুব। মাহবুব একা নয়, তার ঠিক পেছনেই আছে কাউছার মোল্লা। মাহবুব আসতেই আড্ডার তেজ যেন আরও বেড়ে গেল। সে এসেই শাহাজকে জড়িয়ে ধরে বাকি সবার সাথে কুশল বিনিময় করল।
অন্যদিকে কাউছার মোল্লা খানিকটা জড়োসড়ো হয়ে শাহাজদের সামনে এসে দাঁড়াল। সে নিচু স্বরে বলল, "আসসালামু আলাইকুম ভাই, কেমন আছেন?"
শাহাজ শান্ত চোখের মণি জোড়া তুলে একবার কাউছারের দিকে তাকাল। সেই চাহনি ছিল তীরের মতো তীক্ষ্ণ। শাহাজ কোনো উত্তর দিল না, তবে তার নীরবতা যেন গোপনে অনেক অপ্রিয় সত্য বলে দিচ্ছিল।
অনিক সুযোগ বুঝে কাউছারকে খোঁচা দিয়ে বলে উঠল, "তো ভাই মোল্লা সাহেব! কেমন আছেন! মানুষ হয়েছেন নাকি আগের মতোই আছেন?
কাউছার হালকা হাসলো, কিন্তু কিছু বললো না, যেন কন্ঠে শব্দ বিঁধে গিয়েছে।"
অনিক আবারও মজা করে বললো, " তো আপনার কাজ কতদূর? আমাদের হবু ভাব্বীর ওপর নজরদারি কেমন চলছে? সবকিছু ঠিকঠাক তো?"
কাউছার এক পলক শাহাজের দিকে তাকাল। তার চোখেমুখে স্পষ্ট দ্বিধা। অনিক আবারও রসিকতা করে বলল, "আরে ওদিকে ওভাবে তাকাতে হবে না মোল্লা লবন! আমরা আছি তো। আজ আর শাহাজ তোমারে গাছের সাথে ঝুলিয়ে মারবে না। বলো, নির্ভয়ে বলো!"
অনিকের কথা শেষ হতে না হতেই কাউছারের চোখের সামনে সেই ভয়ংকর রাতের দৃশ্য ভেসে উঠল। রুহিকে সামান্য বিরক্ত করার অপরাধে শাহাজ তাকে পশুর মতো পিটিয়ে আস্ত একটা গাছের সাথে সারা রাত ঝুলিয়ে রেখেছিল। কাউছার এমনিতে এলাকার পাতি নেতা ছিলো, তাই শাহাজের বন্ধু কাউন্সিলর মাহবুব ছাড়া কাউকে বিশেষ পাত্তা দিতো না, কিন্তু সেই রাতের পর থেকে মাহবুবের চেয়েও শাহাজকে সে বাঘের মতো ভয় পায়। শাহাজ মানেই তার কাছে এক জীবন্ত আতঙ্ক।
ভাবনা থেকে বেরিয়ে কাউছার একটা লম্বা ঢোক গিলল। সে জড়তা কাটিয়ে সবার সামনে বলতে শুরু করল, "ভাই, আর বইলেন না! নজরদারি কি আর ওভাবে রাখা যায়? রুহি আপা যে পরিমাণ বিরক্ত হইছে আমাদের ওপর! আমরা পিছু নিলেই এমনভাবে তাকায় যেন জ্যান্ত চিবিয়ে খাইবো। আর ওই যে গত পরশু... আমরা মোড়ে দাঁড়ায়ে ছিলাম, আপায় কোথা থেকে এক লাঠি যোগাড় করে আনল আর আমাদের যেভাবে তেড়ে আসল! বাপরে বাপ! আমরা তো জান বাঁচায়া দৌড় দিছি। উনি স্পষ্ট বলে দিছেন—আর যদি কেউ ওনার ছায়াও মাড়ায়, তবে পা ভেঙে হাতে ধরায়া দিবেন।"
কাউছারের করুণ বর্ণনা শুনে পুরো আড্ডায় হাসির রোল পড়ে গেল। বন্ধুরা সবাই হাসলেও শাহাজ কিন্তু হাসল না। তার চোখের কোণে এক বিচিত্র গর্ব খেলা করছিল। তার 'চঞ্চলা' এখন ডানা মেলা শিখছে, প্রতিবাদ করতে শিখছে—এটা ভেবেই তার মনের ভেতরের অস্থিরতাটুকু যেন প্রশান্তিতে রূপ নিল। সে মনে মনে আওড়ালো, "বাঘিনীর সামনে শিয়ালের দল টিকবে কেন? সে বাঘিনী আমার বাঘিনী, আমার চঞ্চলা।"
আড্ডার মাঝখানে শাহাজের কণ্ঠস্বর হঠাৎ গম্ভীর হয়ে উঠল। সে কাউছারের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে হুকুমের সুরে বলল, "কাল থেকে আবার ওর ওপর নজর রাখবি। তবে সাবধান, দূরত্ব বজায় রেখে—যাতে ও বিন্দুমাত্র টের না পায়। আর যদি এবার কোনো গড়বড় হয়েছে, তবে..." শাহাজ কথাটা শেষ না করে শাসানোর ভঙ্গিতে তাকাল। সেই চাহনিতেই কাউছারের কলিজা শুকিয়ে আমসি হওয়ার উপক্রম।
পাশ থেকে মাহবুব হেসে উঠে পরিস্থিতি হালকা করার চেষ্টা করল, "আরে দোস্ত! এমনে ভয় দেখাস কেন বেচারাকে? যে ডেমো দেখাইছিস ওইদিন, এখন তো মনে হয় ও স্বপ্নেও তোরেই দেখে!"
অনিক সুযোগ বুঝে রসিকতা জুড়ে দিল, "তা মোল্লা লবণ! শাহাজকে যে স্বপ্নে দেখিস, তা কি করে? তোরে আদর করে নাকি থাপ্পড় মারে?" অনিকের কথায় আবারও হাসির রোল উঠল পুরো টেবিলে। এদিকে কাউছার লজ্জায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
★★★
রাত তখন অনেক। খন্দকার বাড়ির সবাই রাতের খাবার শেষ করে প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছে, কিন্তু রুহির চোখে ঘুম নেই। সে নিজের খাটে বসে আছে, সামনে খোলা তার প্রিয় ডায়েরিটা। হাতে কলম নিয়ে সে গুটি গুটি অক্ষরে লিখে চলেছে মনের গহীনে নতুন করে জেগে ওঠা কিছু অনুভূতি। আর সেই অনুভূতির রাজা ছিলো শাহজাদা মোস্তাফা। প্রতিটি শব্দ যখন সে শাহাজকে নিয়ে লিখছে, তার ফর্সা চেহারায় এক অদ্ভুত লাজুকতা আর আবেশ ফুটে উঠছে।
লিখতে লিখতে রুহি একটু থামল। ঘড়ির কাটার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে সময়টা একপলক দেখে নিলো। অতপর ডায়েরিটা খোলা রেখেই সে উঠে দাঁড়াল, পা বাড়ালো ওয়াশরুমের দিকে উদ্দেশ্য, ফ্রেশ হয়ে নিজেকে একটু হালকা করা। এদিকে রুমের জানালাটি ছিলো খোলা, বাহিরে তাঁরা ঝলমলে আকাশে মেঘ আর চাঁদের লুকোচুরি খেলা চলছে। আর খোলা জানালার পাশেই ছিল রুহির প্রিয় ডায়েরিটা। হঠাৎ একঝলক দমকা বাতাসে ডায়েরির পাতাগুলো ওলটপালট হতে শুরু করল। বাতাসের ঝাপটায় পৃষ্ঠাগুলো উল্টে গিয়ে অনেক আগের একটি পাতায় গিয়ে স্থির হলো। সেই পাতার আগের সব পৃষ্ঠা ছেঁড়া। দেখে মনে হবে কেউ হৃদয়ে একরাশ ঘৃনা ও জেদ নিয়ে ইচ্ছা করে টেনে ছিরে ছুরে ফেলেছে। কিন্তু সেই ছেঁড়া পৃষ্টার পাশের পৃষ্ঠাটিতে কিছু শুকনো গোলাপের পাপড়ি যা এখন বিবর্ণ কালচে আর তার ঠিক মাঝে বড় বড় অক্ষরে লেখা— 'R + P' যেন কারো নব-প্রেমের সূচনার সৃতি বহন করছে।
বেশখানিকটা পর রুহি ফ্রেশ হয়ে মুখ মুছতে মুছতে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো, সে মনে মনে কিছু একটা ভাবছে যার ফলে তার ঠোঁটে ফুটে উঠেছে এক চিলতে মিষ্টি হাসি। রুহি হাসি মুখেই ডায়েরিতে আরো কিছু লিখবে ওই হিসেবেই ডায়েরির দিকে তাকাতেই তার চোখ স্থির হয়ে গেল। পৃষ্ঠার ওপর জ্বলজ্বল করছে তারিখ। রুহি তারিখ দেখে বুঝল এটা আজ থেকে চার বছর আগের লেখা। আকষ্মিক পুরনো সেই অপমান আর অবহেলার স্মৃতিগুলো তীরের মতো তার বুকে বিঁধল। রাগে রুহির কপাল কুঁচকে এলো, সে ঝুঁকে চোখের পলকে ঝটকা দিয়ে সেই পৃষ্ঠাটিও ছিঁড়ে ফেলল এবং ঘৃণাভরে বিড়বিড় করে বলল, "নর্দমা! রুহি কাউকে ভালোবাসে না, কাউকে না!"
ডায়েরিটা সশব্দে বন্ধ করে সে বিছানায় শুয়ে পড়ল। ঘুমানোর চেষ্টা করলো, মনের কোনে উঁকি দেওয়া কষ্ট গুলো ভুলতে চাইলো কিন্তু পারলো আর কই, চোখ বন্ধ করতেই স্মৃতিরা তাকে টেনে নিয়ে গেল চার বছর আগের এক হাড়কাঁপানো শীতের রাতে। তখন সে নবকিশোরী, চঞ্চলতা আর দুষ্টুমিতে মেতে থাকাই ছিল তার কাজ। সেই শীতের এক রাতেই না ঘুমিয়ে গল্পের বই পড়ছিলে সে।
— হঠাৎই তার কানে ভেসে এসেছিল এক অপূর্ব সুর। রুহি তখন রুবি আর রিমুর সাথে একই রুমে ঘুমাত। প্রথম প্রথম সুর শুনেও রুহি তেমন পাত্তা দেয় নি, কিন্তু কোনো এক প্রয়োজনে সেই রাতে করিডোরে বের হতেই রুহি স্পষ্ট শুনল মায়াবী মাউথঅর্গানের সুর চারদিকের নিস্তব্ধতা ভেঙে দিচ্ছে।
রাত ছিলো গভীর , চার পাশ নিস্তব্ধ কিন্তু সেই রাতে তার কিশোরী মনে সুরটা অদ্ভুত এক দোলা দিল। ভয় নিয়েও সেই রাতে সুরের সন্ধানে ব্যাকুল হয়ে রুহি সুরের উৎস খুঁজতে শুরু করলো। একসময় বুঝলো এটি ছাদ থেকেই আসছে। সে পা বাড়াল ছাদের দিকে। কিন্তু সিঁড়ির গোড়ায় পৌঁছাতেই দেখল কেউ একজন হন্তদন্ত হয়ে ওপর থেকে নেমে আসছে। রুহি দ্রুত আড়ালে লুকাল। রাত হলেও হালকা নীল আলোয় অন্ধকারেই রুহি দেখল পিয়াস ওপর থেকে নেমে আসছে, হাতে তার মাউথঅর্গানের মতো কিছু একটা। সেই মুহূর্তেই রুহির অবুঝ মন ভুল করে বসল। সে ভাবল, এই সুর বোধহয় পিয়াসেরই ছিল। আর সেই ভুল ধারণাই ছিল তার জীবনের সবচাইতে বড় সর্বনাশ। তার নবকিশোরী মন ঝুঁকে পড়লো এক হৃদয়হীন পুরুষের প্রতি।
ভাবনা থেকে বাস্তবে ফিরে এল রুহি। তার চোখের কোণ দিয়ে নোনা জল গড়িয়ে বালিশ ভিজিয়ে দিয়েছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে আপন মনে বলে উঠলো, "আই হেট ইউ পিয়াস ভাই! আমি আপনাকে ঘৃণা করি, খুব ঘৃনা করি। ভুল বললাম আসলে আপনি আমার ভালোবাসা তো দূর ঘৃনার যোগ্য ও না। আফসোস... আমার অবুঝ মনটা এক হৃদয়হীনকে ভালোবেসেছিল, যার যোগ্য আপনি কোনোদিনই ছিলেন না।"
চলবে________