#অন্তহীন_প্রেম_আমার
#আফীফা_আফনান
#পর্ব_৩১
[কপি করা নিষিদ্ধ]
শাহাজের ফ্ল্যাটের লিভিং রুমে তখন এক থমথমে নীরবতা। রুহি সোফার এক কোণে দাঁড়িয়ে নখ খুঁটছে। তার পরনের সাদা চুরিদারটি ঘরভর্তি স্তব্ধতার মাঝেও এক চিলতে স্নিগ্ধতা ছড়াচ্ছে ঠিকই, কিন্তু রুহির মনের ভেতর তখন ঝোড়ো হাওয়া বইছে। সাহস সঞ্চয় করে সে অবশেষে বলে উঠল—
"আমি আপনাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট দিয়েছি শাহাজ ভাই, আপনি তা এখনো একসেপ্ট করেননি ?"
শাহাজ একদম নির্লিপ্ত। ল্যাপটপের স্ক্রিনে তার আঙুলগুলো ক্ষিপ্র গতিতে চলছে। ভার্সিটির অ্যাসাইনমেন্ট এর কাজে সে এতটাই মগ্ন যে, মনে হচ্ছে রুহির কথাটি তার কান পর্যন্ত পৌঁছায়নি। রুহি অধীর আগ্রহে উত্তরের অপেক্ষায় আছে। তার বুকের ধুকপুকানি বাড়ছে। সামনে বসা মানুষটির এই পাথরের মতো নীরবতা তাকে ক্রমেই যেন অস্থির করে তুলছে। কিন্তু ওদিক থেকে কোন সাড়াশব্দ পাওয়া গেলো না।
এভাবে মিনিট কয়েক কেটে যাওয়ার পর রুহি ধৈর্য হারিয়ে ফেলল। গলার স্বর কিছুটা উঁচিয়ে সে ডেকে বসল— "শাহাজ ভাই!"
শাহাজ এবার থামল। কি-বোর্ডের ওপর থেকে হাত সরিয়ে সে ধীরে ধীরে দৃষ্টি তুলল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রমণীর ওপর। শাহাজের সেই চাহনি যেন কোনো ধারালো ছুরির মতো তীক্ষ্ণ, যা রুহির সত্তাকে চিরে ভেতরে প্রবেশ করতে চাইছে। রুহি বেশিক্ষণ সেই চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারল না। এক অদ্ভুত সংকোচ আর ভালো লাগায় তার চোখের পাতা নুয়ে এল, সে মাথা নত করে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল।
সময় যেন থমকে গেছে। রুহি মাথা নিচু করে থাকলেও স্পষ্ট অনুভব করতে পারছিল, সামনের মানুষটির স্থির আর গভীর দৃষ্টি এখনো তার ওপরই তাক করা আছে। শাহাজের সেই মৌন চাহনিতে কী লুকিয়ে ছিল—তিরস্কার নাকি অন্য কিছু, তা বোঝার সাধ্য রুহির নেই। ল্যাপটপের নীলচে আলো শাহাজের চোয়ালের কঠোরতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে, আর অন্যদিকে রুহি শুধু তার নিজের দ্রুত হৃৎস্পন্দনের শব্দ শুনে চলেছে।
লিভিং রুমের থমথমে নীরবতা ভেঙে হঠাৎ রুহির হাতের ফোনটি মৃদু শব্দে কেঁপে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই তার আলোয় রুহির দুই চোখ যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠল। নোটিফিকেশন বারে জ্বলজ্বল করছে সেই কাঙ্ক্ষিত বার্তা—'Shahajada Mostafa accepted your friend request.' মুহূর্তেই রুহির ঠোঁটের কোণে এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসি ফুটে উঠল। এতক্ষণের সব জড়তা যেন এক নিমেষে উধাও। সে সাহস সঞ্চয় করে আড়চোখে একবার সামনের মানুষটির দিকে তাকাল। কিন্তু ততক্ষনে শাহাজ আবারও ল্যাপটপের স্ক্রিনে ডুবে গেছে, যেন একটু আগে সে কিছুই করেনি। রুহি এবার অপলক দৃষ্টিতে শাহাজকে দেখতে লাগল। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে তার চিরচেনা সেই অবয়ব। বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই তো সে এই মানুষটিকে চেনে। কত শত স্মৃতি, কত খুনসুটি, কতশত আবদার, ভয় আর শাসনের মুহূর্ত তাদের মাঝে জমে আছে। কিন্তু আগে তো কখনো এমন হতো না! শাহাজ ভাইয়ের সামনে দাঁড়ালে বুকটা এভাবে কাঁপত না, কিংবা তাঁর একটু দেখা পাওয়ার আশা করার জন্য চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকতে হতো না। তবে এখন কেন এমন হচ্ছে?
রুহির ভাবনার জালে ছেদ ঘটল শাহাজের শীতল কণ্ঠস্বরে। নিস্তব্ধ রুমটিতে তাঁর কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হতে শুরু করল— "চা বানাতে পারিস?"
রুহি চমকে উঠল। চট করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ছোট করে জবাব দিল, "জি।"
"কড়া লিকারের দুধ চা, চিনি কম। বানাতে পারবি?"—শাহাজ ল্যাপটপ থেকে দৃষ্টি না সরিয়েই প্রশ্নটি ছুড়ে দিল।
রুহি এবার বেশ উৎফুল্ল হয়ে উত্তর দিল, "পারব শাহাজ ভাই!"
চায়ের নেশা শাহাজ ভাইয়ের পুরনো, আর তাঁর পছন্দের চায়ের স্বাদ রুহির নখদর্পণে বড় মার কাছ থেকেই শেখা। সে সোফার ওপরেই নিজের ফোনটি রেখে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াতে নিলেই পেছন থেকে শাহাজের নির্লিপ্ত কণ্ঠ আবার ভেসে এল, "তাকের একপাশে সব সরঞ্জাম রাখা আছে। খুঁজে না পেলে বলিস।"
রুহি রান্নাঘরে ঢুকে পড়ার সাথে সাথেই লিভিং রুমের আবহাওয়া বদলে গেল। শাহাজ এতক্ষণ যে কাজে মগ্ন ছিল, তা একপাশে সরিয়ে রাখল। সে সোফায় আয়েশ করে বসলো অতপর সোফার ওপর পড়ে থাকা রুহির নতুন ফোনটি হাতে তুলে নিল। কিছুক্ষণ ফোনটি নেড়েচেড়ে দেখল, যেন পরখ করছে রুহির ছোট ছোট পছন্দগুলো। এরপর সে নিজের ফোনটি পকেট থেকে বের করে অত্যন্ত দ্রুত হাতে কিছু একটা করল—রুহির ফোনের সেটিংসের কোনো গোপন পরিবর্তন। সাথে ঠোঁটের কোণে তখন এক গূঢ় রহস্যময় হাসি।
চা বানানোর সুগন্ধি ঘ্রাণ যখন রান্নাঘর থেকে ড্রয়িং রুমে এসে পৌঁছাল, তার ঠিক কয়েক সেকেন্ড আগেই শাহাজ অত্যন্ত নিপুণভাবে রুহির ফোনটি যথাস্থানে রেখে দিয়ে আগের মতো ল্যাপটপে মনোযোগ দিল। যেন সে জায়গা থেকে এক চুলও নড়েনি।
একটু পরেই রুহি ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ড্রয়িং রুমে হাজির হলো। সাদা চুরিদারের হাতা কিছুটা গোটানো, কপালে জমেছে হালকা ঘাম। শাহাজ ল্যাপটপ থেকে মুখ না তুলেও অনুভব করতে পারল—একরাশ স্নিগ্ধতা আর চায়ের সুবাস নিয়ে কেউ একজন তার খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।
রুহি সাবধানে চায়ের কাপটি শাহাজের সামনে রেখে একপাশে সরে দাঁড়ালো। শাহাজও কাপটি হাতে তুলে ধীরেসুস্থে তাতে একটি চুমুক বসালো। চায়ের লিকার আর দুধের মিশ্রণটি ছিল একদম নিখুঁত, শাহাজের মেজাজ অনুযায়ী যা ছিল এককথায় পারফেক্ট। কিন্তু তার পাথুরে মুখমণ্ডলে কোনো অভিব্যক্তির প্রকাশ ঘটলো না। রুহি একদৃষ্টিতে শাহাজের চোখ-মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো, বোঝার চেষ্টা করলো চা-টা কি ওনার পছন্দ হয়েছে? কিন্তু শাহাজের সেই গম্ভীর নীরবতা রুহিকে আরও বিভ্রান্ত করে তুললো।
কিছু শোনার অপেক্ষায় রুহি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে সাহস সঞ্চয় করে জিজ্ঞেস করলো, "শাহাজ ভাই, চা ঠিক আছে?"
শাহাজ ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে দৃষ্টি না সরিয়ে এক শব্দে উত্তর দিলো, "হুম।"
এরপর আবারও সেই অসহ্য নীরবতা। রুহি কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে আশাহত হয়ে যেই না শাহাজের পাশ থেকে সরে যেতে যাবে, অমনি শাহাজ তার সেই চিরচেনা গম্ভীর কিন্তু সম্মোহনী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে বসলো, "পাশে বসতে পারিস?"
শাহাজের এই আচমকা আমন্ত্রণে রুহি যেন কথা হারিয়ে ফেললো। সে হাঁ করে কিছুক্ষণ শাহাজের দিকে তাকিয়ে রইল। শাহাজ এবার ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে রুহির পানে তাকালো। সেই শীতল কিন্তু গভীর দৃষ্টির সাথে দৃষ্টি মিলতেই রুহির সারা শরীরে যেন এক ভালোলাগার শিহরণ বয়ে গেল। হঠাৎ শাহাজ তার পাশের খালি জায়গাটুকুতে হাত দিয়ে ইশারায় রুহিকে বসতে বললো। শাহাজের ইশারাতে রুহি ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে অতি সাবধানে এবং মার্জিতভাবে শাহাজের পাশে সোফায় বসল।
--- "পড়াশোনা কেমন চলছে?" শাহাজের প্রশ্ন।
--- রুহি নরম কণ্ঠে জবাব দিলো, "ভালো চলছে।"
--- "কোচিং-এর সবটা পড়া বুঝতে পারিস? নাকি সমস্যা হয়?"
--- রুহি একটু ইতস্তত করে বললো, "আসলে স্টুডেন্ট তো অনেক, মাঝেমধ্যে একটু সমস্যা হয়, কিন্তু তাও ঠিক আছে।"
---শাহাজ এবার সরাসরি রুহির চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, "কোন বিষয় নিয়ে পড়বি, কিছু ঠিক করেছিস?"
--- "মা চাইছে আপুর মতো ডাক্তারি পড়ি আর..." রুহি আরও কিছু বলতে চেয়েছিল কিন্তু শাহাজ তাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে গম্ভীর স্বরে বললো, "কে কী চাইছে সেটা বড় বিষয় নয়, তুই কী চাইছিস সেটা হচ্ছে বড় কথা।"
শাহাজের এই কথায় রুহি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালো। দুজনের দৃষ্টির সেই মিলনে যেন এক আবেশিত আবহাওয়া তৈরি হলো। রুহির চোখে শাহাজের গাম্ভীর্যের আড়ালে থাকা সেই প্রচ্ছন্ন অধিকারবোধ এক মায়াবী আবেশ তৈরি করছিল। হঠাৎই রুহি এক বুক আত্মবিশ্বাস নিয়ে শাহাজকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো, "আমি আইন নিয়ে পড়তে চাই শাহাজ ভাই। ওই যে কালো কোটটা... ওটা আমার খুব ভালো লাগে।"
--- শাহাজ কিছুটা অবাক হয়ে রুহির দিকে তাকালো। কৌতূহলী চোখে প্রশ্ন করলো, "আইনজীবীরা যে কালো কোটটা পরে, ওটার নাম জানিস? আর কবে থেকে তা পছন্দ শুরু করলি?"
--- রুহি খুব সরলভাবে উত্তর দিলো, "তিন-চার মাস আগে শাহেব চাচ্চুর রুমে লন্ড্রি করা কাপড় রাখার সময় ওয়ারড্রোবের কোণা থেকে একটা পুঁটলি পড়ে গিয়েছিল। পুঁটলির ভেতর অনেকগুলো কাপড় ছিল যেগুলো পড়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। ওগুলো ভাঁজ করতে গিয়েই আমি কালো কোটটা দেখেছি।"
---- "তুই কীভাবে বুঝলি ওগুলো আইন নিয়ে যারা পড়াশোনা করে তারাই পরে?" শাহাজ ঠাট্টা করে আবারও প্রশ্ন করলো।
--- " মারা যখন হিন্দি সিরিয়াল দেখে, টিভিতে তো মাঝে মাঝে আমরা এগুলো দেখি, তাই না? তবে প্রথমে দেখে আমি বুঝিনি, ভেবেছিলাম বোরখা বা কোটি। কিন্তু আমি যখন ওটা ভাঁজ করার সময় হাতে ধরেছিলাম, তখনই কোত্থেকে শাহেব চাচ্চু এসে ওগুলো কেড়ে নিয়েছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করতেই উনিই বলেছেন আমাকে ওটার নাম লিগ্যাল গাউন।"
একটু থেমে রুহি ভাবুক চেহারা নিয়ে থুতনিতে আঙ্গুল রেখে শাহাজের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, "আচ্ছা শাহাজ ভাই, আমাদের বাড়িতে তো কেউ উকিল বা আইনের লোক নেয়, তবে শাহেব চাচ্চুর কাছে ওটা কোত্থেকে আসলো?"
শাহাজ রুহির এই কৌতূহলী প্রশ্নটি এড়িয়ে গিয়ে হঠাৎ বলল, " তোর শাহেব চাচ্চুকেই জিজ্ঞেস করতি। আমাকে করছিস কেন? এসব বাদ, এবার বল মুগ্ধের পড়াশোনার কী খবর?"
রুহি বুঝলো শাহাজ প্রশ্নটির উত্তর দিতে চাইছে না, তাই আর কিছু না বলে একটু দমে গিয়ে বলল, "ওর অবস্থা ভালো না, এবার রেজাল্ট খুব খারাপ করেছে।"
শাহাজ সাথে সাথে সিদ্ধান্ত দিয়ে বসলো, "কাল থেকে ওকে প্রতিদিন বিকেলে আমার এখানে পাঠিয়ে দিবি, আমি পড়াবো। আর তোর মোবাইলটা আমাকে দে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার এক ছোট ভাই অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষার ক্লাস করায়, তোকে ওখানে ভর্তি করিয়ে দিচ্ছি। প্রতিদিন নিয়ম করে ক্লাসগুলো করবি, আশা করি হেল্প হবে।"
শাহাজের কথায় রুহি সরল মনেই নিজের ফোনটি শাহাজের দিকে বাড়িয়ে দিল। শাহাজ নিজের ফোনের হটস্পট কানেক্ট করে যেই না নেট অন করলো, ঠিক তখনই রুহির সেই ফ্রেন্ডস গ্রুপের একের পর এক মেসেজের নোটিফিকেশনে ইনবক্স ভর্তি হতে শুরু করলো। রুহি একদম হতবাক! রাতের পর আর অনলাইন হয়নি সে।
এদিকে শাহাজ ভ্রু কুঁচকে ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলো। কিছু একটা দেখে তার চোখ যেন আটকে গেল। হঠাৎ শাহাজ মোবাইলটি ঘুরিয়ে রুহির চোখের সামনে ধরলো।
ফোনের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে ড্রিম গার্ল নিকনেইম দেওয়া ছোঁয়ার একটি মেসেজ— "ভাইয়ার সাথে কেমন প্রেম চলছে? জমেছে নাকি জমাতে হবে কোনটা? টিপস লাগবে কি?"
মেসেজটি দেখে রুহির হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছিল। ওদিকে শাহাজের মুখমণ্ডল মুহূর্তেই কঠিন হয়ে গেল। সে বজ্রকণ্ঠে বলে উঠলো, "এ ধরনের ফ্রেন্ড সার্কেল থেকে বেরিয়ে আয়। এই ধরনের অসভ্যতামি আমার টোটালি পছন্দ না। আমাদের বাড়ির মেয়েরা সর্বদা নম্রভদ্র আশা করি তুইও তার বাহিরে নস। আর এসব কি? ব্যক্তিগত জিনিস পাবলিক হবে কেন। কাউকে পছন অপছন্দ নিজের মাঝেই রাখতে হয়। এতোটুকু জ্ঞান কি নেই এদের? এগুলোও কেমন ফ্রেন্ড? মুখের ভাষা এমন কেন?"
রুহি কি করবে বুঝে উঠতে পারছেনা, শব্দরা যেন দলা পাকিয়ে আসছে, অতপর তোতলামি করেই নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করলো, "শা-শাহাজ ভাই, এটা তো ফ্রেন্ড গ্রুপ, হয়তো অন্য কোনো ফ্রেন্ডকে লিখেছে..."
যাকেই লিখুক তুই কেন এই গ্রুপে। শাহাজের ধমকে রুহি মাথা নিচু করে বসে রইলো। রুহি বুঝলোই না শাহাজের কথার অর্থ।
এদিকে শাহাজ আর কোনো উত্তর দিলো না। রুহির চোখের সামনেই সে ওই গ্রুপ থেকে রুহিকে রিমুভ করে দিয়ে গ্রুপটি ব্লক করে দিলো। এরপর সে রুহির ফেসবুক ও মেসেঞ্জারের সব সেটিং অতি নিপুণভাবে 'প্রাইভেট' করে দিল। কাজ শেষ করে শাহাজ রুহির দিকে তাকিয়ে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে বলল, "যা যেমন করে দিয়েছি, তা থেকে যেন এক চুলও পরিবর্তন না হয়।"
রুহি অপরাধীর মতো মাথা নাড়িয়ে সায় দিল। হঠাৎ শাহাজ অত্যন্ত গম্ভীর আর ভারিক্কি কণ্ঠে বলতে শুরু করল:
"শোন মেয়ে, হৃদয়ের গহীনে যখন আবেগের জোয়ার আসে, তখন সে আর কোনো বাঁধ মানতে চায় না। সেই সময়টুকুতে মানুষ যেন এক মায়াবী কুয়াশার মাঝে হারিয়ে যায়। চোখের সামনে সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দের স্পষ্ট রেখাগুলো তখন ফিকে হয়ে আসে। অতিরিক্ত আবেগ ঠিক সেই আগুনের মতো, যা শুরুতে উষ্ণতা দিলেও নিয়ন্ত্রণ হারালে নিজের অস্তিত্বকেই পুড়িয়ে ছাই করে দেয়।"
শাহাজ রুহির খুব কাছে এসে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলতে থাকলো, "নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখ। অতিরিক্ত আবেগ মানুষের বোধবুদ্ধি নষ্ট করে দেয়। ফলে মানুষ ভালো-মন্দের তফাৎ বুঝতে ভুলে যায়। জন্ম নেয় অনাকাঙ্ক্ষিত অনুভূতির, মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ে নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি—যা প্রলয়ের মতোই ধ্বংসাত্মক।"
সবশেষে শাহাজ একরাশ কর্তৃত্ব নিয়ে বলল, "এখন বয়সটা পড়াশোনার। এসব জিনিসের জন্য সামনে অনেক সময় পড়ে আছে।" শাহাজ থামলো
অতপর কন্ঠে শীতলতা এনে বলে উঠলো, "কিছু কথা নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে হয়। এসব উজবুক বন্ধুদের থেকে দূরে রাখ নিজেকে। যে লক্ষ্যটা ঠিক করেছিস, সেদিকে আগে পা বাড়িয়ে নিজের ভিত মজবুত কর। সময় আসলে সবকিছু নিজ থেকে হয়ে যাবে।"
শাহাজের এই শাসনের আড়ালে থাকা পাহাড় সমান ভালোবাসা আর অধিকারবোধ রুহি বুঝলো না। বরং সে বুঝলো, এই গাম্ভীর শাহাজ ভাই কেবল বরাবরের মতোই তাকে সঠিক পথ দেখিয়ে জীবনে এগিয়ে রাখতে চান এবং সবার থেকে আগলে রাখতে চায়।
★★★
শাহাজের সেই কঠিন শাসন আর গম্ভীর কথাগুলো শোনার পর রুহির মনের ভেতর যেন একরাশ ঠান্ডা জল ছিটিয়ে দিল কেউ। এতক্ষণ যে মায়াবী কুয়াশায় সে আচ্ছন্ন ছিল, শাহাজের যুক্তির তপ্ত রোদে তা নিমেষেই উধাও হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, ছোঁয়া বা বিন্তিরা যা বলেছে তা স্রেফ কল্পনা। শাহাজ মোস্তফা আর দশটা সাধারণ ছেলের মতো নন; আবেগ বা সস্তা প্রেম তাঁর অভিধানে নেই।
রুহি মাথা নিচু করে বসে রইল। তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত অপরাধবোধ দানা বাঁধতে শুরু করল। সে মনে মনেই নিজেকে বলতে লাগল— "শাহাজ ভাই ভালোবাসা-প্রেম এসব একদম পছন্দ করেন না। উনি তো বলেই দিলেন, অতিরিক্ত আবেগ মানুষের বুদ্ধি নষ্ট করে দেয়। আর আমি কিনা ভেবেছিলাম... ছিঃ! ছোঁয়ারা আমাকে ভুল পথে চালিত করেছে। ওরা শাহাজ ভাইকে চেনেই না। কিন্তু তুই তো ওনাকে চিনিস তাহলে এতোবড় ভুল?"
সে নিজেই নিজেকে একগাদা বকতে শুরু করল। তার চোখের কোণে এক চিলতে জল চিকচিক করে উঠেছে রুহি মনে মনে ভাবল— "কত্ত বড় ভুল করেছিস রুহি! মানুষ বলে না, একবার ভুল করে মানুষ গোবরে পিছলে যায়? তুই তো এবার জেনে-বুঝে সেই গোবরে পা দিয়েছিস। শাহাজ ভাই তোকে দায়িত্ব মনে করেন, আর তুই কিনা ওনার নামে এই সব ফালতু প্রেমের চিন্তা করছিস!"
শাহাজের থুতনিতে আঙুল ছোঁয়ানোর সেই দুঃসাহসিক মুহূর্তটির কথা মনে পড়তেই রুহির লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে হলো। শাহাজ ভাই হয়তো তখন রেগে গিয়েছিলেন বলেই আজ এত স্পষ্টভাবে আবেগকে 'ধ্বংসাত্মক' বলে অভিহিত করলেন। রুহি বুঝতে পারল, তার এই অনুভূতির কথা যদি শাহাজ ভাই কোনোদিন জানতে পারেন, তবে চিরকালের জন্য তাঁর চোখের বিষ হয়ে যাবে সে।
রুহি এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের মনের ওপর এক শক্ত পাথর চেপে রাখল। শাহাজের জন্য তার হৃদয়ে যে নতুন অনুভূতির চারাগাছটি বড় হতে শুরু করেছিল, সেটিকে সে এক নিমেষে উপড়ে না ফেললেও হৃদয়ের একদম গভীরতম অন্ধকার কোনো প্রকোষ্ঠে বন্দি করে ফেলার চেষ্টা করলো। সে নিজের সাথে নিজে এক কঠিন শপথ করল— "শাহাজ ভাইয়ের সামনে আর কখনোই নিজের দুর্বলতা প্রকাশ হতে দেওয়া যাবে না। উনি যেভাবে দেখতে চান, আমাকে সেভাবেই ওনার সামনে থাকতে হবে। আমি হব ওনার সেই লক্ষ্মী বোন, যে শুধু পড়াশোনা আর নিজের ক্যারিয়ার বোঝে।"
রুহি যখন নিজের মনের সাথে এই অসম লড়াইয়ে ব্যস্ত, তখন শাহাজ তার দিকে একপলক তাকিয়ে আবারও ল্যাপটপে মনোযোগ দিল। ঘরজুড়ে সেই আগের মতোই এক গাম্ভীর্য নেমে এসেছে। রুহি বুঝতে পারল না—এই নীরবতা তার জন্য জয়ের, নাকি এক দীর্ঘ বিরহের সূচনা।
লিভিং রুমের সেই থমথমে নীরবতা ভাঙল দরজার কলিং বেলের তীক্ষ্ণ শব্দে। রুহি নিজের মনের অস্থিরতা সামলে নিয়ে ধীরপায়ে গিয়ে দরজা খুলল। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল অনিক আর রুবি, দুজনেরই দুই হাত ভর্তি বাজারের ব্যাগ। অনিকের আজ সন্ধ্যার পর ডিউটি, তার ওপর শাহাজ বাড়িতে আছে, হঠাৎ রুবি আর রুহির আগমন ঘটে —এই সুযোগে সে রুবিকে সাথে নিয়ে নিচের বাজার থেকে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা সেরে ফিরল।
মূলত এটি ছিলো তার চালাকি, অনিক আর রুবি সোফায় বসতেই রুহি চটপটে হাতে দুজনের জন্য পানি নিয়ে এল। অনিক হাসিমুখে পানির গ্লাসটি নিতেই রুবি রুহিকে নিয়ে রান্না ঘরের দিকে গেল। এরপর দুই বোন মিলে দ্রুত রান্নাঘরে গিয়ে বাজারের ব্যাগগুলো গুছিয়ে ফেলল। কাজ শেষ করে খালি টিফিন বক্সটা নিয়ে রুহি আর রুবি যখন বেরিয়ে যাবে, ঠিক তখনই শাহাজ নিজের রুম থেকে বেরিয়ে এল। সে দু জনের হাতে একরাশ চকলেট ধরিয়ে দিয়ে কোনো কথা না বলেই আবার নিজের রুমে ঢুকে গেল।
রুহি হাতের চকলেটগুলোর দিকে তাকিয়ে থমকে দাঁড়াল। শাহাজ তাকে যে চকলেটটি দিয়েছে, সেটি তার সবচাইতে প্রিয় চকলেটের একটি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, মাত্র কয়েকদিন আগেই সে তার বাবা আখতারুজ্জামানের কাছে এই নির্দিষ্ট চকলেটটি খাওয়ার আবদার করেছিল। সচরাচর এই চকলেট মার্কেটে পাওয়া যায় না তাই তিনি ওয়াদা করেছিলেন খুব তাড়াতাড়ি রুহিকে তা খাওয়াবেন। আর আজ শাহাজ তাকে সেই চকলেটই দিলো, রুহির মনে প্রশ্ন জাগলো, "শাহাজ ভাই জানলেন কী করে? কাকতালীয় নাকি অতি সন্তর্পণে রাখা কোনো খেয়াল? রুহি এটিকে কাকতালীয় মনে করে নিল।
"কিরে রুহি! দাঁড়িয়ে আছিস কেন? চল, দেরি হয়ে যাচ্ছে তো!"—রুবির ডাকে রুহির ধ্যান ভাঙল। সে অনিকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রুবির পিছু পিছু ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে এল।
রুহিরা বেরিয়ে যেতেই অনিক বেশ উৎফুল্ল মেজাজে শাহাজের রুমের দিকে দৌড়ালো। গিয়ে দেখল, শাহাজ রুহির বানানো সেই আধখাওয়া ঠান্ডা চায়ের কাপটি হাতে নিয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরের গোধূলির আলো যেন তার মুখাবয়বে এক রহস্যময় ছায়া ফেলেছে।
অনিক গিয়ে শাহাজের পাশে দাঁড়াল। কনুই দিয়ে আলতো গুতো দিয়ে দুষ্টামির সুরে জিজ্ঞেস করল, "তো বন্ধু! একা ঘর, নিরিবিলি পরিবেশ... তা প্রেম কতদূর জমলো?"
শাহাজ নিরুত্তর। তার দৃষ্টি আকাশের কোনো এক অচেনা বিন্দুতে স্থির।
অনিক আবারও রসিয়ে জিজ্ঞেস করল, "আরে বল না দোস্ত! কী করলি এতক্ষণ? একটু শুনি! লজ্জা পাস না আমরাই তো।"
শাহাজ ঠান্ডা চায়ের কাপে একটা শেষ চুমুক দিয়ে শান্ত গলায় বলল, "উপদেশ দিয়েছি, আদেশ দিয়েছি, প্রশ্নবদ্ধ করেছি, প্রশ্নবিদ্ধ করেছি... ভেঙেছি, আবার জুড়ে দেওয়ার রাস্তাও দেখিয়েছি।"
অনিক হতাশ হয়ে মুখ বাঁকাল। "ধুর ধুর! তোকে এত সুন্দর একটা সুযোগ করে দিলাম, আর তুই সবটা এমন নিরসভাবে নষ্ট করলি? তোকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না!" একরাশ বিরক্তি নিয়ে অনিক রুম থেকে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে গেল।
কিন্তু শাহাজ তখনও ব্যালকনিতে স্থির দাঁড়িয়ে। তার দৃষ্টি এখন নিচের রাস্তার দিকে। রুহি মাত্র গেট দিয়ে বেরিয়ে মেইন রাস্তার দিকে হাঁটতে শুরু করেছে। সাদা চুরিদারের ওড়নাটা গোধুলি লগ্নে বাতাসে অবাধ্যভাবে উড়ছে, যেন কোনো এক সাদা মেঘের টুকরো মাটিতে নেমে এসেছে। রুহির প্রতিটি কদম যেন এক ছন্দময় কবিতা—একটু ধীর, কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব আর একরাশ নতুন সংকল্পে ঘেরা।
নিচে হেঁটে যাওয়া সেই শুভ্র রমনীর দিকে তাকিয়ে শাহাজের ঠোঁটের কোণে এক আকাশ সমান আবেগ নিয়ে এক চিলতে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। সে খুব মৃদু স্বরে বিড়বিড় করে বলে উঠল:
"সবাই তো বসন্তের রঙিন ফুল হতে চায় রুহি, কিন্তু আমি তোকে সেই শরতের শুভ্র কাশফুল হিসেবে গড়তে চাই—যাকে সহজে ছোঁয়া যায় না, শুধু দূর থেকে মুগ্ধ হয়ে দেখা যায়। আজ তোকে ভেঙেছি যাতে কাল তুই পাহাড়ের মতো শক্ত হতে পারিস।কেননা শাহজাদা মোস্তাফাকে পাওয়া তো এতোটা সরল হবে না 'চঞ্চলা'। কারন যুদ্ধ করে পাওয়ার মধ্যে যে শান্তি, সহজে বিনা যুদ্ধে পাওয়া জয়ে তৃপ্তি কোথায়।"
চলবে_________
[মন্তব্য আশা করছি]