#অন্তহীন_প্রেম_আমার
#আফীফা_আফনান
#পর্ব_৩২
[কপি করা নিষিদ্ধ]
মানুষের আকাঙ্ক্ষা আর ভাগ্যের লিখন সবসময় এক বিন্দুতে মেলে না। খন্দকার বাড়িতে বড় হতে হতে রুহি তার দাদির কাছে একটা কথা খুব ভালো করে শিখেছে—যেকোনো বিপদ বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে তার দাদি মমতাজ বেগম সবসময় বলেন, "ভাগ্যে লেখা ছিল, তাই হয়েছে। ভাগ্যে না থাকলে কি হতো নাকি? এই পৃথিবীতে আমাদের সাথে যাই হয় সবই ভাগ্যর জোড়ে।"
রুহিও তাই শাহাজকে নিয়ে তার মনের ভেতরে দানা বাঁধা পরিপক্ক ও অপ্রকাশিত আবেগের অধ্যায়টিকে ভাগ্যের লিখন হিসেবে মেনে নিয়ে একপাশে সরিয়ে রেখেছে। সে নিজেই নিজেকে বুঝিয়েছে, "এই আবেগ সে অতীতে করা বোকামির মতো কখনো করো সামনে প্রকাশিত হতে দিবে না। এটি একান্ত তার হৃদয়ের গহীনে লুকিয়ে রাখবে।"
এদিকে সেদিনের সেই কঠিন শাসনের পর রুহি নিজেকে বদলে ফেলার এক অঘোষিত যুদ্ধে নেমেছে। বাড়ি ফিরেই সে পড়াশোনার টেবিলটাকে নিজের প্রধান আশ্রয় বানিয়ে নিয়েছে। অবাধ্য মনটা যে মাঝেমধ্যে শাহাজের সেই গম্ভীর চাহনি আবার সম্মোহনী দৃষ্টির কথা ভেবে কেঁপে ওঠেনি, তা নয়; কিন্তু রুহি এবার দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে নিজেকে এতটাই ব্যস্ত করে তুলেছে যে, আবেগের প্রজাপতিরা ডানা মেলার আর সময় পাচ্ছে না।
এতোকিছুর পরেও মাঝখানের কিছু দিনগুলো বেশ স্বাভাবিক নিয়মেই কেটে গেল রুহির । প্রতিদিন কোচিংয়ে যাওয়া, শাহাজের ভর্তি করিয়ে দেওয়া সেই অনলাইন ক্লাস করা আর নোট সাজানো, ফোনে আইন সম্পর্কিত বিষয়ে ঘাটাঘাটি করাই যেন এখন তার ধ্যানজ্ঞান।
কিন্তু এতোকিছুর পরেও সময় পেলেই বেহায়া মন তাকে একবার হলেও শাহাজের প্রফাইলে ডু মারার জন্য তাকে নিয়ে ভাবার জন্য উস্কে দিয়ে যায়। নিজের মনকে নিয়ন্ত্রিত রাখতে চেয়েও অনেক সময় রুহি পেরে ওঠে না। ঘুরে ফিরে আবারও হোচটখায় চেনা জানা সেই অগ্নিকুন্ডে।
এদিকে আবার বন্ধু মহলেও রুহি কড়া সতর্কতা জারি করেছে—শাহাজ ভাইকে নিয়ে কোনো আলতু-ফালতু আলোচনা করা চলবে না। রুহি সোজা বলেছে শাহাজ এসব পছন্দ করে না, তাই তারা ভুল ভাবছে। সেদিনতো ছোঁয়া আর বিন্তিরা রুহির মুখে শাহাজের সেই রুদ্রমূর্তির বর্ণনা শুনে দমে গিয়েছিলো; তারা ভেবে নিয়েছে হয়তো তাদের আন্দাজ সত্যিই ভুল ছিল। তবে পড়শী এখনো অনড়, তার মতে আগ্নেয়গিরি শান্ত থাকা মানেই তার ভেতরে লাভা নেই—এমনটা ভাবা বোকামি। কিন্তু রুহি সেসব অগ্রাহ্য করে নিজের লক্ষ্যে স্থির রইল।
সব মিলিয়ে বাড়ির আবহাওয়াও এখন বেশ থিতু। সবই আগের মতোই চলছে, রিমুও আগের চেয়ে অনেকটা সুস্থ হলেও তার শরীর বেশ ভেঙে পড়েছে। সারাক্ষণ এক অদ্ভুত নীরবতা তাকে ঘিরে থাকে, আগের সেই হাসিখুশি রিমুকে যেন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। শুকিয়ে পাটখড়ির মতো হয়েছে।
এদিকে সব ছাপিয়ে আগামীকাল রুহির জন্য এক বিশেষ দিন—তার ফাইনাল পরীক্ষার কাঙ্ক্ষিত রেজাল্ট। এই একটি দিনকে ঘিরেই রুহির সারা বছরের পরিশ্রম আর আগামীর স্বপ্ন ঝুলে আছে। অতীতের সেই অপমানের জবাব এবং ভবিষ্যতের রঙ্গিন স্বপ্ন সব যেন এই এক রেজাল্টের ওপড়ই নির্ভর। এসব ভেবেই এখন রুহির দুশ্চিন্তার শেষ নেই; সে হাত-পা ঠান্ডা করে ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে ভাবছে, "যদি রেজাল্ট মনের মতো না হয় তবে শাহাজ ভাইকে সে মুখ দেখাবে কীভাবে? বড় আব্বুকেই বা কি বলবে? আর মা সেতো কাঁচা গিলে খাবে।"
★★★
অপরদিকে দৃশ্যপটের অন্য প্রান্তে, বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার্স কমন রুমে এক নিস্তব্ধ পরিবেশ। জানালার পাশেই রাখা বড় একটি দেয়াল ক্যালেন্ডারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে শাহাজ। পরনে তার সেই চেনা ফর্মাল শার্ট, এক হাত পকেটে গোঁজা আর অন্য হাতে একটি লাল কালির কলম।
শাহাজ ক্যালেন্ডারের একটি নির্দিষ্ট তারিখের ওপর কলম দিয়ে বড় একটি 'ক্রস' চিহ্ন দিল। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, বিগত অনেকগুলো তারিখেই সে এভাবে লাল কালির আঁচড় টেনেছে। যেন প্রতিটি দিন সে গুনে গুনে পার করেছে কেবল একটি লক্ষ্যের দিকে তাকিয়ে—আর সেই লক্ষ্য এখন দোরগোড়ায় এসে উপস্থিত ।
আগামীকাল রুহির পরীক্ষার ফল প্রকাশ হবে। শাহাজ ক্যালেন্ডারের সেই তারিখটির ওপর কলম দিয়ে দুবার টোকা দিল। তার চোয়ালের হাড় শক্ত হয়ে আছে, চোখের দৃষ্টিতে সেই চিরচেনা গাম্ভীর্য। সে কী ভাবছে বা রুহির এই রেজাল্ট নিয়ে তার মনে কী ধরণের পরিকল্পনা কাজ করছে, তা বোঝার কোনো উপায় নেই। তবে তার প্রতিটি অঙ্গভঙ্গিতে মিশে আছে এক তীব্র কর্তৃত্ববোধ। সে যেন কেবল একটি অভিভাবক হিসেবে নয়, বরং এক অদৃশ্য নির্মাতার মতো রুহির জীবনটাকে নিখুঁত ছাঁচে গড়তে চাইছে।
ক্যালেন্ডারের লাল ক্রস চিহ্নটি যেন জানান দিচ্ছে—আগামীকাল কেবল রুহির রেজাল্ট নয়, শাহাজ আর রুহির মধ্যকার সমীকরণেও হয়তো কোনো নতুন বাঁক আসতে চলেছে। হঠাৎ তার ফোন কেঁপে উঠলো, এগিয়ে গিয়ে শাহাজ তা হাতে তুলে নিয়েই স্কিনে তাকালো, অতপর রিসিভ করেই বলে উঠলো, "অপেক্ষা করো আমি আসছি।"
অপরপ্রান্তে দ্বিপ্রহরের নীল আকাশটার নিচে একরাশ টেনশন আর চিন্তার ভার নিয়ে রাস্তার ধার ধরে হেঁটে আসছে রুহি। কাল বহুকাঙ্খিত রেজাল্ট—এই একটি বাক্যই যেন তার মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষে হাতুড়ি পেটাচ্ছে। একটু আগেই কোচিং স্যার রেজাল্ট নিয়ে নানান উপদেশ দিলেন। আজ ক্লাস কম কথাই বেশি হয়েছে, তাই তার কাছে ক্লাসটা আজ পুরোপুরি বোরিং ছিলো, আজ সাথে আরো বিন্তি নেই; মেয়েটা হঠাৎ জ্বরে পড়ে বিছানায়, তাই রুহিকে আজ একা এসে, একাই ফিরতে হচ্ছে। ইদানীং মোস্তফা কামাল এর আদেশে সময় বাঁচাতে আর ক্লান্তি এড়াতে রুহি রিকশা করেই বাড়ি ফেরে, কিন্তু আজ ভাগ্যটা যেন তার সাথে আড়ি পেতেছে। কোনো রিকশাই সে খালি পাচ্ছে না।
কিছুক্ষণ পরপর রুহি থামছে, গলার ওড়নাটা ঠিক করে নিয়ে উৎসুক চোখে তাকিয়ে এদিক ওদিক দেখছে রিকশার আশায়। চারদিকের ব্যস্ত শহরের কোলাহল তার কানে পৌঁছাচ্ছে না, তার সমস্ত মনোযোগ কালকের ওই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল দিকে।
আজ যেন তার পা ও চলছে না, তাই রাস্তার এক মোড়ে দাঁড়িয়ে রুহি যখন আবারও একটা রিকশা খোঁজার চেষ্টা করছিল, তখনই হঠাৎ তার চোখ গেল রাস্তার উল্টো দিকের এক অভিজাত রেস্টুরেন্টের দোতলার বিশাল কাঁচের জানালার দিকে। রুহি মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চোখের মণি স্থির হয়ে গেল সেই জানালার ওপারে থাকা দৃশ্যটিতে।
সেখানে রুবি আর রিমু বসে আছে। কিন্তু রুহিকে সবচাইতে বড় ধাক্কাটা দিল তাদের পাশে বসে থাকা মানুষটি। স্বয়ং শাহজাদা মোস্তাফা! দূর থেকে হলেও রুহির তীক্ষ্ণ নজর এড়াতে পারল না এক অদ্ভুত দৃশ্য—শাহাজ খুব নিবিড়ভাবে রিমুর হাতটা আগলে ধরে রেখেছে। শাহাজের সেই কঠোর গাম্ভীর্য আজ যেন কোথায় উধাও, তার পুরো মনোযোগ রিমুর দিকে। রিমুও বেশ শান্ত হয়ে শাহাজের হাতের ওপর নিজের হাত রেখে কথা বলছে।
রুহির মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। তার পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছে বলে মনে হলো। সে অস্পষ্ঠ স্বরেই উচ্চারন করলো, "শাহাজ ভাই আর রিমু আপু?"
শাহাজ ভাই তো রিমু আপুর দিকে কোনোদিন সেভাবে তাকাননি , তবে আজ এভাবে হাত ধরে থাকা মানে কী? রিমু আপুর এই হঠাৎ নীরব হয়ে যাওয়া আর অসুস্থতার পেছনে কি তবে শাহাজ ভাই-ই ছিলেন? হাজারটা প্রশ্ন রুহির মনে ঘূর্ণিঝড়ের মতো পাক খেতে লাগল, কিন্তু সে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারল না।
ঠিক সেই মুহূর্তে একটি খালি রিকশা রুহির একদম সামনে এসে ব্রেক কষল। "আপা যাইবেন?"
চালকের ডাকে রুহির সম্বিৎ ফিরল। কোনমতে মাথে নেড়ে যান্ত্রিকভাবে সে রিকশায় উঠে বসল ঠিকই, কিন্তু তার শরীর রিকশায় থাকলেও মন আর দৃষ্টি পড়ে রইল সেই দোতলার জানালার ওপারে। রিকশাটা চলতে শুরু করেছে, রুহি ঘাড় ঘুরিয়ে বারবার সেই দৃশ্যের সত্যতা যাচাই করার চেষ্টা করছে। বাতাসের ঝাপটায় তার কয়েক গাছি চুল মুখে এসে পড়ছে, কিন্তু সেদিকে তার খেয়াল নেই।
চোখের সামনে থেকে রেস্টুরেন্টটি আড়াল হওয়ার আগ পর্যন্ত রুহি দেখল—শাহাজ ঠিক আগের মতোই রিমুর হাতটা শক্ত করে ধরে রেখেছে। রুহির বুকের ভেতরটা এক অজানা হাহাকারে দুমড়ে-মুচড়ে গেল। কালকের রেজাল্টের টেনশন যেন এক নিমিষেই তুচ্ছ হয়ে উঠল এই নতুন পাওয়া রহস্যের কাছে।
এক বুক দোটানা আর অস্থিরতা নিয়ে রুহি বাড়ির গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকল। রেস্টুরেন্টের সেই দৃশ্যটা এখনো তার চোখের সামনে হুবহু ভাসছে—শাহাজ ভাই আর রিমু আপু! তবে কি শাহাজ ভাইয়ের সেই গাম্ভীর্যের আড়ালে রিমু আপুর জন্য অন্য কোনো অনুভূতি ছিল? তাহলে সেদিনের বলা এতো কিছু? রুহি আর ভাবতে পারছে না, ভাবতেই কেমন দম বন্ধ হয়ে আসছে।
ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই রুহি দেখল দাদি মমতাজ বেগম আয়েশ করে সোফায় বসে পান চিবোচ্ছেন, আর পাশে বসে ফুফু পারভীন তাঁর সাথে নিচু স্বরে গল্প করছেন। মিমি আর সিমিও সেখানে আছে, ঘরটা বেশ সরগরম। রুহি কোনোমতে নিজেকে সামলে ফুফুর সাথে দুটো কথা বলে সোজা রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে বড় মা তানজিনা আর মেজো মা ইয়াসমিন বেগম বেশ ব্যস্ত হাতে রাতের রান্নার তোড়জোড় করছেন। কিন্তু নিজের মাকে সেখানে না দেখে রুহি একটু ইতস্তত করতেই মেজো মা ইয়াসমিন বেগম বলে উঠলেন, "কী রে রুহি, মাকে খুঁজছিস? তোর মায়ের খুব মাথা ধরেছে রে মা, তাই রুমে শুয়ে আছে।"
রুহি আর দেরি করল না, সোজা মায়ের ঘরে চলে গেল। দেখল নাসরিন বেগম কপালে একটা গামছা শক্ত করে বেঁধে চোখ বুঁজে নিথর হয়ে শুয়ে আছেন। রুহি সাবধানে মায়ের বিছানার পাশে গিয়ে বসল। মানুষের উপস্থিতি টের পেয়ে নাসরিন বেগম চোখ মেললেন। রুহিকে দেখে খুব ক্ষীণ স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, "কখন এলি রে মা?"
--- "এই তো মাত্রই এলাম। মাথা কি খুব বেশি ব্যথা করছে? ওষুধ খেয়েছ তো?" রুহির কণ্ঠে স্পষ্ট উদ্বেগ।
--- নাসরিন বেগম মাথা নেড়ে আশ্বস্ত করলেন যে ওষুধ খাওয়া হয়েছে। রুহি পরম মমতায় মায়ের কপালের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, "মাথাটা একটু টিপে দেব মা?"
--- নাসরিন বেগম ম্লান হেসে বললেন, "লাগবে না রে, তোর মেজো মা এতক্ষণ অনেক সেবা করেছে। তুই বরং যা, হাত-মুখ ধুয়ে কিছু খেয়ে নে। সকালেও তো তেমন কিছুই পেটে দিসনি।"
মায়ের কথায় রুহি উঠে দাঁড়াল। রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় আবার ফিরে তাকিয়ে খুব সাবধানে জিজ্ঞেস করল, "মা, রিমু আপু কোথায়?"
নাসরিন বেগম চোখ বন্ধ রেখেই উত্তর দিলেন, "রিমু ওর এক বান্ধবীর বাড়ি গেল দুপুরে। সেখানে নাকি খেয়ে ফিরবে।"
মায়ের কথা শুনে রুহির ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। রিমু আপু বান্ধবীর বাড়ি যাওয়ার কথা বলে শাহাজ ভাইয়ের সাথে রেস্টুরেন্টে! অথচ বাড়ির কেউ কিচ্ছু জানে না। রুহি আর কথা বাড়াল না, বেরিয়ে এল রুম থেকে।
দুপুরের খাবারটা রুহির জন্য একটা যন্ত্রণার মতো হলো। খিদের চেয়েও মনের ভেতরে হাজার টন ওজনের প্রশ্নেরা তাকে পিষ্ট করছে। টেবিলে জোর করে বসে দু-চার লোকমা মুখে তুলেই সে উঠে পড়ল। দিনটা যেন কাটতেই চাইছে না। একে তো কালকের রেজাল্ট নিয়ে টেনশন, তার ওপর রিমু-শাহাজ রহস্য, আর বাড়িতে ফুফুদের সপরিবারে মানে মিমি থাকা—সব মিলিয়ে এক অসহ্য গুমোট পরিস্থিতি। এদিকে একটুপর পর মিমির উচ্চকণ্ঠ আর হাসাহাসি রুহির কানে বিষের মতো বাজছে। সে কেবল সময়ের দিকে চেয়ে আছে, কখন দিনটা শেষ হবে আর কখন সে এই ধোঁয়াশা থেকে মুক্তি পাবে।
★★★
সময় গিয়ে বিকেল চারটা বাজে। নাসরিন বেগম তাকে সমানে ডেকে চলেছে। তাই মায়ের ডাক শুনে রুহি স্টাডি রুমের বই-খাতা গুছিয়ে বেরিয়ে এল। দুপুরে সেই যে দায়সারা গোছের খাওয়ার পর পড়তে বসেছিল, এখন উঠল। মায়ের রুমে গিয়ে রুহি জিজ্ঞেস করলো, "মাথার যন্ত্রণাটা কিছুটা কমেছে।"
নাসরিন বেগম উঠে বসেছেন, ঠান্ডা কন্ঠে জবাব দিলেন, "হ্যা! কমেছে।"
--- রুহি মায়ের কাছে যেতেই নাসরিন বেগম বললেন, "রুহি, মুগ্ধকে নিয়ে একটু শাহাজের কাছে যা তো মা। ওকে ওখানেই রেখে আসবি।"
--- মায়ের কথা শুনেই রুহির বুকটা ধক করে উঠল। শাহাজ ভাইয়ের সামনে যাওয়ার নাম শুনলেই এখন ওর পা কাঁপতে শুরু করে। সে সাথে সাথে মাথা নেড়ে না করে দিল, "না মা, আমি পারব না। আমার অনেক পড়া বাকি আছে।"
--- নাসরিন বেগম একটু কড়া স্বরে বললেন, "পড়া বাকি থাকলে ওখানেই বই নিয়ে যা। রিমু বাড়ি থাকলে তো তোকে বলতাম না। ও এখনো ফেরেনি, তাই তুই-ই আজ ওকে নিয়ে যা মা। তুই তো জানিস ও কেমন দুষ্টু। "
মায়ের কথা শুনে রুহির মনে হঠাৎ টনক নড়ল। মুগ্ধর টিউশনি শাহাজ ভাইয়ের কাছে শুরুর পর থেকে তো রিমু আপুই প্রতিদিন ওকে নিয়ে যায়। রেস্টুরেন্টের সেই দৃশ্য আর মায়ের এই কথা—সব মিলিয়ে রুহির মনের ভেতর দোলাচল আরও তীব্র হলো। সে বুঝল, নাসরিন বেগমের ওপর কথা বললে এখন বকা খাওয়া নিশ্চিত। অগত্যা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে রাজি হলো।
রুম থেকে বের হতে নিলেই নাসরিন বেগম পেছন থেকে মনে করিয়ে দিলেন, "তোর বড়মাকে জিজ্ঞেস করিস, শাহাজের জন্য কিছু খাবার দেবে কি না।"
রুহি এগিয়ে গেলো বড় মা তানজিনা বেগমের কাছে, গিয়ে শাহাজের বাড়ি যাওয়ার কথা বলতেই তিনি একটি টিফিন বক্স এগিয়ে দিলেন। খাবারটা হাতে নিয়ে রুহি মুগ্ধকে খুঁজতে কাব্যের রুমে গেল। সেখানে গিয়ে দেখে মুগ্ধ আর কাব্য ভিডিও গেমে বুঁদ হয়ে আছে। রুহি গিয়ে ডাক দিতেই মুগ্ধ ঝটপট রেডি হয়ে বেরিয়ে এল। বড় বক্সটা রুহির হাতে আর ছোট পানির বোতলটা মুগ্ধর হাতে। দুজনে মিলে শাহাজের ফ্ল্যাটের উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরল।
রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে রুহির মনের কৌতূহল আর বাঁধ মানল না। সে আড়চোখে মুগ্ধকে দেখে নিয়ে বেশ স্বাভাবিক হওয়ার অভিনয় করে জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা মুগ্ধ, প্রতিদিন যখন আপু তোকে নিয়ে যায়, তখন রিমু আপু আর শাহাজ ভাই কী গল্প করে নাকি? শাহাজ ভাই তো যা গম্ভীর!"
মুগ্ধ সরল মনেই জবাব দিল, "গল্প করে তো, অনেক করে।"
রুহি এবার একটু উৎসুক হয়ে আবারও জিজ্ঞেস করল, "কী কথা বলে? তুই শুনিস না?"
মুগ্ধ এবার একটু পাকনামি করে মাথা নেড়ে বলল, "আরে না! ওনারা তো দূরে বসে নিচু স্বরে কথা বলেন, আমি কিছুই শুনতে পাই না। তবে রিমু আপু আমাকে একদিন বলেছিল—ওনারা নাকি খুব গোপন কথা বলেন, যা ছোটদের শুনতে নেই!"
মুগ্ধর মুখে 'গোপন কথা'র কথা শুনে রুহির পায়ের তালু যেন ঘামতে শুরু করল। সে মনে মনেই ভেবে নিলো, তার মানে রেস্টুরেন্টের সেই দৃশ্য আর এই গোপন আলাপ—সবই এক সুতোয় গাঁথা? শাহাজ ভাইয়ের সেই 'উপদেশ' আর 'আবেগ নিয়ন্ত্রণ' কি তবে শুধু রুহির জন্যই ছিল, আর নিজের ক্ষেত্রে সব ছাড়? রুহির মনে এক অদ্ভুত অভিমান আর সংশয় দানা বাঁধল। এদিকে রুহি তার শাহাজ ভাইয়ের ফ্ল্যাটের সামনে পৌঁছাতেই তার বুকটা অবাধ্যভাবে ধড়ফড় করতে শুরু করল।
শাহাজের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রুহি যেন হঠাৎ কোনো এক ভাবনার অতলে তলিয়ে গেল। এদিকে মুগ্ধ বারবার তাকে কলিং বেল বাজাতে তাগাদা দিলেও রুহি যেন এক অদ্ভুত জড়তায় জমে আছে। অবশেষে মুগ্ধ ধৈর্য হারিয়ে নিজেই বেল টিপে দিল। কয়েক মুহূর্ত পরই দরজা খুলে দিয়ে সামনে দাঁড়াল অনিক।
"আরে রুহি যে! কেমন আছো?" অনিকের হাসিখুশি কণ্ঠস্বরে রুহির ধ্যান ভাঙল।
রুহি ম্লান হেসে বিনয়ের সাথে জবাব দিল, "ভালো আছি ভাইয়া। আপনি কেমন আছেন?"
অনিকও সহাস্যে কুশলাদি জানিয়ে দরজা থেকে সরে দাঁড়াতেই, রুহি আর মুগ্ধ ভেতরে প্রবেশ করল।
ঘরে প্রবেশ করেই মুগ্ধ আর এক মুহূর্ত দেরি না করে সোজা শাহাজের রুমে ঢুকে গেল এবং কিছুক্ষণ পরই শাহাজকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে এল। শাহাজ ঘর থেকে বের হতেই একবার গভীর দৃষ্টিতে রুহিকে দেখল। সেই শান্ত অথচ প্রখর চাহনি। তবে কোনো কথা না বলে সে মুগ্ধকে নিয়ে সোফায় পড়াতে বসল। রুহি তখনও মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে। শাহাজ ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই ইশারায় তাকে বসতে বলল। রুহির ইচ্ছে ছিল মুগ্ধকে রেখেই চলে যাবে, কিন্তু শাহাজ হঠাৎ তার কাছে চায়ের আবদার করে বসল। শাহাজের এরুপ আবদারে রুহি না করতে পারল না। সে পরম যত্ন তার শাহাজ ভাইয়ের জন্য কড়া লিকারের চা বানিয়ে আনল।
এদিকে চা খেতে খেতেই আকস্মিক শাহাজ রুহিকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো, "রুমে যা, কিছু জরুরি কাগজ এলোমেলো হয়ে আছে, সেগুলো একটু গুছিয়ে দিয়ে আয় তো।"
শাহাজ তাকে নিজের রুমে যেতে বলেছে, যা শুনে রুহি কাচুমাচু করতে শুরু করলো। এদিকে শাহাজ মুগ্ধকে অংক বুঝাতে বুঝাতে আবারও জোড়ালো কন্ঠে বরে উঠলো, "কিরে পারবি?"
আনমনেই শাহাজের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে রুহি বলে ফেললো, "হে পারবো শাহাজ ভাই।"
কথাটি বলেই রুহি চুপসে গেলো, অতঃপর অনিচ্ছা সত্ত্বেও শাহাজের ঘরে সে ঢুকল। খাটের পাশে কিছু কাগজ এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। রুহি গুন-গুন করতে করতে যখন আপন মনে কাগজগুলো গুছিয়ে রাখছিল, হঠাৎ তার মনে হলো পেছনে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। রুহি ধড়ফড় করে পেছনে ঘুরতেই শাহাজের শক্ত বুকের সাথে সজোরে এক ধাক্কা খেল। টাল সামলাতে না পেরে সে যখন পড়ে যেতে নিচ্ছিল, শাহাজ বিদ্যুৎবেগে ওর কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল। রুহির মাথাটা শাহাজের কণ্ঠদেশে গিয়ে ঠেকল। এদিকে সময়টা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল; ঘরের ভেতরের ঘড়ির টিকটিক শব্দ আর দুজনের হৃদস্পন্দন ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না।
ঠিক সেই মুহূর্তে অনিক শাহাজের কাছে কিছু একটা নিতে এসে দরজায় থমকে দাঁড়াল। দৃশ্যটা দেখে সে অপ্রস্তুত হয়ে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল এবং দুষ্টু হেসে কৃত্রিম চিৎকার করে বলে উঠল, "বন্ধু! তুই কোথায়? তোকে তো খুঁজে পাচ্ছি না! তুই কি রুমে আছিস?"
অনিকের গলার আওয়াজে রুহির হুঁশ ফিরল। লজ্জায় তার মুখ কান লাল হয়ে উঠেছে। শাহাজও আলতো করে রুহিকে ছেড়ে দিল। শাহাজ খুব স্বাভাবিক স্বরে দরজার দিকে তাকিয়ে বলল, "কী চাই?"
অনিক বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে হাসতে হাসতে ঘরে ঢুকল এবং শাহাজের গলা জড়িয়ে ধরে একপ্রকার টেনে হিঁচড়ে লিভিং রুমের দিকে নিয়ে গেল, যেন কোনো মস্ত বড় গোপন কথা বলতে যাচ্ছে। রুহি ওখানেই কয়েক মুহূর্ত পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। নিজের অবাধ্য অনুভূতিগুলোকে কোনোমতে দমিয়ে সে কাজ শেষ করে দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে মুগ্ধর পাশে গিয়ে বসল। হৃদয় যেন তার ছিটকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। কিন্তু শাহাজ একদম স্বাভাবিক যেন কিছুই ঘটেনি এমন।
এরপরের সময়টুকু রুহির কাছে এক অদ্ভুত ঘোরের মতো কাটল। কী ঘটছে, অনিক কী বলছে—কিছুই যেন তার মাথায় ঢুকছিল না। শাহাজের দিকে তাকানোর সাহস সে পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছে। লজ্জায় তার দৃষ্টি মেঝের দিকে নিবদ্ধ। সাধারণত শাহাজ মুগ্ধকে দেড় ঘণ্টা পড়ায়, কিন্তু আজ সময় যেন কাটতেই চাইছে না। দুই ঘণ্টা পার হতে চলল, অথচ শাহাজের ছুটি দেওয়ার কোনো নামগন্ধ নেই। রুহির মনে হলো আজ সময়টাও তার সাথে শত্রুতা করছে।
অবশেষে শাহাজ পড়ার ইতি টানল। রুহি মুগ্ধর হাত ধরে যখন দরজার কাছে পৌঁছাল, তার মনটা একবার অবাধ্যভাবে চাইছিল শাহাজ হয়তো কালকের রেজাল্ট নিয়ে কিছু বলবে বা কোনো শেষ পরামর্শ দেবে। রুহি একবার পিছু ফিরে তাকালো, কিন্তু শাহাজ তাকে কোনো সুযোগ না দিয়েই নিজের ঘরে ঢুকে পড়ল। শাহাজের এই চরম অবহেলা বা দূরত্ব রুহির মনের কোণে এক গভীর ক্ষতের মতো বিধল। হঠাৎ রুহি আর শাহাজের সেই দৃশ্য মনে করতেই তার সকল চিন্তার অবসান ঘটলো।
অতঃপর সে একরাশ নিস্তব্ধতা আর অব্যক্ত অভিমান নিয়ে মুগ্ধকে সাথে নিয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়ালো।
খন্দকার বাড়িতে পা রাখতেই রুহির কানে ভেসে এল হইহুল্লোড়ের শব্দ। ড্রয়িংরুমে যেন এক ছোটখাটো মেলা বসেছে। সোফায় আর কার্পেটে গোল হয়ে বসে রুবি, রিমু, মিমি, সিমি আর কাব্য লুডু খেলায় মগ্ন। দাদি একপাশে বসে পানের বাটা সামনে নিয়ে বেশ আয়েশ করে খেলা দেখছেন আর পাশেই ফুফু নাস্তা করছেন।
রুহি ড্রয়িংরুমে ঢুকেই সবার আগে রিমুর দিকে তাকাল। তার দুপুরের দেখা সেই রেস্টুরেন্টের দৃশ্যটি মনের কোণে খচখচ করছে। কিন্তু রিমুকে দেখে রুহি অবাক হলো। গত কয়েকদিনের সেই নির্জীব আর নীরব রিমু আজ যেন উধাও; অন্যদিনের তুলনায় তাকে আজ বেশ খুশি আর প্রাণোচ্ছল দেখাচ্ছে। রিমুর হাসিতে আজ যেন কোনো কৃত্রিমতা নেই। সে প্রান খুলে হাসছে দেখে মনে হচ্ছে অনেক দিনের জমানো হাসি।
মুগ্ধ আর রুহিকে ঘরে ঢুকতে দেখে মিমি উচ্চস্বরে বলে উঠল, "আরে রুহি! আয় আয়, আমাদের সাথে যোগ দে!"
রুহি ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে রিমুর পাশেই দাঁড়ালো। রিমু সাথে সাথে হেসে রুহিকে নিজের পাশে বসার জায়গা করে দিল। রুহি বসতে বসতে আড়চোখে একবার রিমুর সতেজ মুখখানা দেখল, তারপর খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, "কোথায় ছিলে আপু সারাদিন?"
রুহির হঠাৎ এমন সোজাসাপ্টা প্রশ্নে রিমু যেন মুহূর্তের জন্য কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। তার চোখের মণি একটু কেঁপে উঠল ঠিকই, কিন্তু পাশ থেকে রুবি চট করে সামলে নিয়ে বলে উঠল, "সারাদিন তো বান্ধবীর বাসায় ছিলাম রুহি! আমি সহ অনেকদিন পর গিয়েছি তো, তাই ফিরতে একটু দেরি হলো। তুই তো বাড়ি ছিলি না, থাকলে তোকেও নিয়ে যেতাম।"
রুবির কথা শুনে রুহি হাসলো, এই হাসি কিসের ইঙ্গিত দিলো বোঝা গেলো না। এদিকে সবাই আবারও লুডুর ছক্কায় মনোযোগ দিল। কিন্তু রুহির মনে ভাবনার ঝড় থামল না। সে রিমু আর রুবির দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল—এরা তো শুধু বোন নয়, একদম 'বেস্ট ফ্রেন্ড'। একজনের গোপন কথা অন্যজন জানবে না, এটা হতেই পারে না। আমার আর বিন্তির কথাই ধরা যাক, আমাদের মাঝে কি কোনো কথা লুকানো থাকে? নিশ্চয়ই শাহাজ ভাইয়ের সাথে রিমুর যদি কিছু চলে থাকে, তা রুবি আপু খুব ভালো করেই জানে। আর রুবির মতো বন্ধু পাশে থাকলে গোপন কথা গোপনই থেকে যাবে।
রুহি মনের গভীরে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সবার এই আনন্দের মাঝে হঠাৎই মোস্তফা কামাল তাঁর অন্য ভাইদের নিয়ে সেখানে উপস্থিত হলেন। ড্রয়িংরুমের গুমোট ভাবটা যেন বড়দের আগমনে আরও গম্ভীর কিন্তু স্নেহপূর্ণ হয়ে উঠল। মোস্তফা কামাল সবার মাঝে রুহিকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে তাকে নিজের কাছে ডাকলেন। রুহি কাছে যেতেই তিনি পরম আদরে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
"কাল তো রেজাল্ট বের হবে মা, খুব ভয় করছে কি?" মোস্তফা কামালের কণ্ঠে অসীম মমতা।
রুহি ম্লান হেসে মাথা নেড়ে বোঝালো—হ্যাঁ, হালকা ভয় করছে।
মোস্তফা কামাল হালকা হাসলেন। "একদম টেনশন করিস না। আমার বিশ্বাস, আমার রুহি মা অনেক ভালো রেজাল্ট করবে।"
পাশ থেকেই শাহরিয়ার কবির সাহেব রসিকতা করে বলে উঠলেন, "রুহি যদি ভালো রেজাল্ট করে, তবে বড় আব্বুর কাছে কী চাস সেটা এখনই বলে ফেল!"
ভাইয়ের রসিকতা ধরতে পেরে মোস্তফা কামালও তাল মেলালেন। "হ্যাঁ মা, বল তো, ভালো রেজাল্ট করলে তুই আমার কাছে কী চাস?"
ঠিক সেই সময় রান্নাঘর থেকে হাতে নাস্তার প্লেট নিয়ে বেরিয়ে এলেন তানজিনা আর ইয়াসমিন বেগম। দুজনেই একযোগে বলে উঠলেন, "এই তো সুযোগ রুহি! তোর বড় আব্বু আর মেজো আব্বুর কাছ থেকে ভালো কিছু চেয়ে নে। এমন সুযোগ বারবার আসে না।"
রুহি বাবার মতো বড় আব্বুর আশ্বস্ত চাহনির দিকে তাকিয়ে লাজুক হাসল। তারপর বলল, "এখন কিছু চাইব না বড় আব্বু। আগে রেজাল্টটা বের হোক, ভালো রেজাল্ট করলে তখন যা যা লাগবে সব চেয়ে নেব।"
পাশ থেকে শাহাবুদ্দিন সাহেব হঠাৎ টিপ্পনী কেটে বললেন, "আমরা কিন্তু সবাই সাক্ষী আছি বড় ভাই! আপনি কিন্তু আটকা পড়ে গেলেন।"
মোস্তফা কামাল উচ্চস্বরে হাসলেন। রুহির দিকে তাকিয়ে দরাজ গলায় বললেন, "ঠিক আছে মা। রেজাল্টের পর তুই যা চাইবি, আমি তোকে তা-ই দেব। এটা মোস্তফা কামালের মুখের জবান, যার কোনোদিন নড়চড় হবে না।"
বড় আব্বুর এই আশ্বাসে রুহির মনটা কিছুটা হালকা হলো ঠিকই, কিন্তু শাহাজ আর রিমুর সেই রহস্যময় হাত ধরার দৃশ্যটি তার হৃদয়ের এক কোণে কাঁটার মতো বিঁধে রইল।
হঠাৎই মিমি বরে উঠলো, "আমিও তো পরিক্ষা দিয়েছি, রুহি পেলো আমি পাবো না কেন?"
মোস্তফা কামাল ভাগনীর দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, ভালো রেজাল্ট করলে অবশ্যই পাবে কিন্তু রেজাল্ট হতে হবে নজরকাড়া। যাতে গর্ব করে বলতে পারি আমার ভাগনী এতো পয়েন্ট পেয়েছে।
মোস্তফা কামাল এর কথায় সবাই সাই দিলো কিন্তু অন্যদিকে মামার কথা শুনে মিমি মনে মনেই বিড়বিড় করে বললো, "ভালো পয়েন্ট.... টেনে টুনে কোনমতে পাশ করতে পারলেই আমি খুশি, এরপর যা লাগবে সেটা কিভাবে নিতে হয় আমার খুব করে জানা আছে।
সময় পেরিযে রাত বাড়লো। রুহি যখন গভীর চিন্তায় ডুবে নিজের রুমে একা বসে ছিল, তখন হঠাৎ তার ফোনটি মৃদু শব্দে কেঁপে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখল সেই রহস্যময় অচেনা নম্বর থেকে দুটো মেসেজ। একটিতে লেখা— "টেনশন করো না, ভালো কিছু হবে।"
অন্যটিতে লেখা, "ভালোকিছুর জন্য একটু অপেক্ষা করতে হয়। কথায় আছে ধৈর্যের ফল মিষ্টি হয়।"
কোনো নাম নেই, কোনো পরিচয় নেই। হাজারো ভাবনার ভিড়ে রুহি এই মুহূর্তে নম্বরটি নিয়ে আর মাথা ঘামাতে চাইল না। তাই ফোনটি উপুড় করেি ফেলে রাখলো। তবে সেই রাতটি তার জন্য ছিল এক দীর্ঘ যন্ত্রণার মতো। নির্ঘুম পাখির মতো বিছানায় ছটফট করতে করতে কখন যে ভোরের আলো ফুটল, সে টেরও পেল না।
★★★
সকাল থেকেই খন্দকার বাড়িতে এক থমথমে উত্তেজনা বিরাজ করছে। সবার মনেই কেবল রুহির রেজাল্ট নিয়ে জল্পনা-কল্পনা। পিয়াস অফিসিয়াল ট্রেনিংয়ের কাজে শহরের বাইরে, তবে তার অনুপস্থিতি রুহির মনে বিন্দুমাত্র রেখাপাত করল না। সবচাইতে বেশি অস্থির হয়ে আছেন নাসরিন বেগম। তিনি একটু পরপরই রুহিকে এটা-সেটা জিজ্ঞেস করে অস্থির করে তুলছেন। "পাশ করবি তো? রেজাল্ট ভালো আসবে তো? শেষমেশ আমার নাক কাটাবি না তো মা?"—নাসরিন বেগমের এসব কথায় রুহি যেন আরও বেশি কুঁকড়ে যাচ্ছিল।
পুরো বাড়িতে টেনশন থাকলেও ব্যতিক্রম কেবল বড় মা তানজিনা বেগম। তিনি শতভাগ নিশ্চিত যে তার রুহি বাজিমাত করবেই। সেই খুশিতে তিনি সকাল থেকেই রান্নাঘরে কাচ্চি আর পায়েশ তৈরিতে ব্যস্ত।
অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এসে উপস্থিত হলো। ড্রয়িং রুমে ল্যাপটপ নিয়ে বসেছে রুবি আর রিমু। পাশে রুহির অ্যাডমিট ও রেজিস্ট্রেশন কার্ড নিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে বড়দের মতো দাঁত দিয়ে নখ কাটতে কাটতে বসে আছে মুগ্ধ। মিমি আর সিমিও সেখানে হাজির। প্রথমে মিমির রেজাল্ট দেখা হলো। টেনেটুনে 'টু পয়েন্ট সামথিং' পেয়ে সে যখন পাস করল, তখন পারভিন সুলতানা আর মিমির আনন্দ দেখে কে!
এবার সবার দৃষ্টি রুহির দিকে। রুবি অতি সাবধানে শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটে গিয়ে রুহির তথ্যগুলো টাইপ করতে শুরু করল।
Roll No: *********
Registration No: ***************
Candidate Name: AROHI ZAMAN
ক্যাপচা কোড সাবমিট করার পর কয়েক সেকেন্ডের লোডিং। ড্রয়িং রুমের বাতাস যেন স্থির হয়ে গেছে। হঠাৎ স্ক্রিন জ্বলে উঠতেই রুবি চিৎকার করে উঠল, "জিপিএ ৫! রুহি এ প্লাস পেয়েছে!"
মুহূর্তেই পুরো বাড়িতে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। নাসরিন বেগম, যার প্রাণ এতক্ষণ যেন ওষ্ঠাগত ছিল, মেয়ের এমন সাফল্যে তাঁর চোখ দিয়ে আনন্দের অশ্রু ঝরতে লাগল। তিনি সাথে সাথেই স্বামী আখতারুজ্জামানকে ফোন করে এই খুশির খবর জানালেন।
মোস্তফা কামাল আদেশ জারি করলেন, "মিষ্টি আনো পুরো এলাকাতে বিতরন করো,কেউ যাতে বাদ না যায়, যতো আত্মীয় স্বজনরা আছে সবার বাড়িতে পাঠানো হবে।
বাড়ির সবাই যখন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আনন্দ করছে, ঠিক তখনই কাব্য দুই হাত ভর্তি মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করল। সবাই ভাবল বড় আব্বু মোস্তফা কামাল হয়তো মিষ্টির অর্ডার আগেই দিয়েছিলেন।
কবির সাহেব বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে," ভাই এতো তাড়াতাড়ি মিষ্টিও হাজির বাহ!" মিষ্টির কথা জিজ্ঞেস করতেই মোস্তফা কামাল কিছু বলবে তার আগেই কাব্য সবার ভুল ভেঙে দিয়ে বলল, "বড় আব্বু না! রুহির রেজাল্ট শাহাজ ভাই অনেক আগেই দেখে ফেলেছেন। উনিই আমাকে ফোন করে বললেন যত দ্রুত সম্ভব মিষ্টি কিনে বাড়িতে আর আশেপাশে পরিচিত সবার কাছে পৌঁছে দিতে।"
কথাটা শুনে রুহি মুহূর্তের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গেল। সে ভেবেছিল শাহাজ ভাই হয়তো নিজের কাজে এতটাই ব্যস্ত যে তার রেজাল্টের কথা ভুলেই গিয়েছেন। অথচ মানুষটা সবার আগে রেজাল্ট দেখে মিষ্টিও পাঠিয়ে দিয়েছেন! শাহাজের এই নিঃশব্দ প্রশ্রয় আর আড়ালে থাকা যত্নের কথা ভেবে রুহির অভিমানী মনে এক চিলতে খুশির হাসি ফুটে উঠল।
দুপুরটা খন্দকার বাড়িতে উৎসবের আমেজেই কাটলো। ভুড়িভোজ আর হাসাহাসির মাঝে রুহির জিপিএ-৫ পাওয়ার আনন্দটা যেন পূর্ণতা পেল। আগের রাতে দুচোখের পাতা এক করতে না পারায় ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে দুপুরে একটু গড়িয়ে নিয়েছিল রুহি। যখন ঘুম ভাঙল, তখন মসজিদের মিনারে আছরের আজান প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
রুহি চটপট উঠে মুখ-হাত ধুয়ে নিজেকে একটু পরিপাটি করে নিয়ে নিচে নামল। ড্রয়িংরুমে তখন আড্ডা জমে উঠেছে। গল্পের মূল বিষয়বস্তু হলো—মেয়েরা ভবিষ্যতে কে কী নিয়ে পড়বে। রুহিকে দেখেই ফুফু হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন, "তা রুহি মা, আমাদের জিপিএ-৫ জয়ী এখন কোন পথে এগোবে? কী নিয়ে পড়ার ইচ্ছা?"
রুহি দ্বিধাহীন কণ্ঠে জানাল, সে আইন নিয়ে পড়তে চায়। হঠাৎ কথাটি শুনে দাদি সহ অনেকেরই মুখ কিছুটা বেজার হলেও বড় আব্বু মোস্তফা কামাল ও কবির সাহেব সাথে সাথে সমর্থন দিয়ে বসলেন, "খুব ভালো সিদ্ধান্ত। ওর যেটা ভালো লাগে, সেটাই করুক।" বড় আব্বুর কথার ওপর আর কেউ উচ্চবাচ্য করার সাহস পেল না।
এদিকে নিরবতা পালন করলের শাহাবুদ্দিন সাহেব, যেন পুরোনো কোন কিছু মস্তিষ্কে হানা দিলো।
কথাবার্তার মাঝেই কিছুক্ষণ পর বড় মা তানজিনা বেগম সবার জন্য পায়েসের বাটি সাজিয়ে নিয়ে এলেন। পায়েস খেতে খেতে দাদি হঠাৎ আক্ষেপ করে বললেন, "আহারে! আমার শাহাজ বড় পছন্দ করত আমার হাতের পায়েস। একা থাকে কি খাচ্ছে না খাচ্ছে?"
দাদির কথায় রুহির চামচ থেমে গেলো, বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। হে এটা তো সত্য তার কারনেই শাহাজ আজ ঘরছাড়া। রুহির মনটা খারাপ হয়ে গেলো, তখনই ইয়াছমিন বেগম শাহাজের পাঠানো মিষ্টি প্লেটে সাজিয়ে আনলেন।
মিষ্টি গুলো দেখেই রুহি ভাবলো, "শাহাজ ভাই নিজের কথা না ভেবে সবার আগে ওর জন্য মিষ্টি পাঠিয়েছে, তবে কি ওর উচিত না তার প্রিয় পায়েসটা পৌঁছে দিয়ে আসা? রুহি মনে মনে ভাবল, মুগ্ধকে সাথে নিয়ে চট করে দিয়ে আসবে, এতে তো দোষের কিছু নেই। যে ভাবা সেই কাজ!
সে রান্নাঘরে গিয়ে তানজিনা বেগমের পাশে দাঁড়ালো, "বড় মা আমাকে একবাটি পায়েস দিবে।"
তানজিনা বেগম বাটিতে পায়েশ বাড়তে গেলে সে বলে, "এভাবে না বড় বাটিতে দাও শাহাজ ভাইকে দিয়ে আসবো।"
রুহি বড় মায়ের কাছে আবদার করতেই তানজিনা বেগম খুশি হয়ে ফ্রিজ থেকে একটা বড় বাটি বের করে দিলেন। তিনি নিজেও মুগ্ধের হাতে শাহাজকে পাঠানোর কথা ভাবছিলেন তাই আগেই পায়েস বেড়ে রেখেছিলেন।
রুহি একবার চারপাশটা দেখে নিয়ে বড় মাকে জিজ্ঞেস করল, "বড় মা, রুবি আপুরা আর মুগ্ধ কোথায়?"
তানজিনা বেগম বললেন, "রুবি আর রিমু মার্কেটে গিয়েছে কিছু কেনাকাটার জন্য। আর মুগ্ধ পাড়ার ছেলেদের সাথে মাঠে খেলছে।"
রুহি বুঝতে পারল রিমু আপু বাড়িতে নেই। সে চুপিচুপি টিফিন বক্সটা নিয়ে একা হাতেই বেরিয়ে পড়ল। ভাবল—মুগ্ধকে ছাড়াই যাওয়া যাক। গিয়েই তো চলে আসবে।
একসময় হাটতে হাটতে রুহি শাহাজের ফ্ল্যাটে পৌঁছে দেখল দরজা খোলা, ভেতরে অনিক বা শাহাজ কেউ নেই; কেবল কাজের খালা ফাতেমা ঘর গোছাচ্ছেন। পায়েসের বাটিটা তার হাতে দিয়ে শাহাজের খোঁজ করতেই ফাতেমা খালা আঙুল দিয়ে ইশারা করলেন, "শাহাজ বাবা তো ছাদে আছে।"
রুহি কথা না বাড়িয়ে ফিরে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ তার মনে হলো—শাহাজ ভাই তার পড়াশোনায় কতো হেল্প করেছে, তিনি নিজ থেকে রেজাল্ট দেখলেও একবার তো অন্তত নিজের মুখে বলা উচিত, "শাহাজ ভাই, আমি এ প্লাস পেয়েছি!" এই কৃতজ্ঞতাবোধ থেকেই সে উল্টো ঘুরে ছাদের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল।
এক বুক সাহস নিয়ে রুহি ছাদের দরজার কাছে পৌঁছাতেই এক দমকা বাতাস তার চুলগুলোকে এলোমেলো করে দিল। কিন্তু পা বাড়াতে গিয়েই রুহি যেন এক অদৃশ্য দেয়ালে ধাক্কা খেল। দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে সে যা দেখল, তাতে তার পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। চারপাশের পৃথিবীটা এক নিমেষে দুলে উঠল।
ছাদের মাঝবরাবর রিমু দাঁড়িয়ে আছে। শুধু দাঁড়িয়ে নেই, সে শাহাজকে জাপটে ধরে হিঁচকি তুলে কাঁদছে, তার কান্নার শব্দে আশপাশটা যেন ভারী হয়ে আসছে। অপরদিকে শাহাজের এক হাত নিচে ঝুলানো থাকলেও অন্য হাতটি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে রিমুর মাথায় রাখা। শাহাজ শান্ত ও ধীর কণ্ঠে বলছে, "কাঁদছিস কেন? আমি আছি তো। আমি থাকতে তোর কিসের ভয়?"
দৃশ্যটা রুহির চোখে তীরের মতো বিঁধল। শাহাজের সেই শীতল ও গম্ভীর ব্যক্তিত্ব যেন রিমুর কান্নার সামনে পুরোপুরি নুয়ে পড়েছে। রুহির মনে হলো, শাহাজ ভাইয়ের এই 'আবেগ নিয়ন্ত্রণ'-এতো জ্ঞান কেবল তার জন্যই ছিল, রিমু আপুর জন্য নয়। সে বুঝতে পারল, এই সমীকরণে তার কোনো জায়গা নেই। সে আবারও ভুল মানুষকে মন দিয়ে ফেলেছে, যেখানে তার অস্তিত্ব নেই। রিমু আপু আর শাহাজ ভাইয়ের মাঝে যে গভীর বন্ধন সে দেখছে , তা হয়তো তার কল্পনারও বাইরে।
রুহির আর এক কদম পা বাড়ানোর শক্তি রইল না। যেভাবে সে একরাশ কৃতজ্ঞতা নিয়ে এসেছিল, সেভাবেই বুকভরা হাহাকার আর পরাজিত মন নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিঃশব্দে নিচে নেমে গেল। সে টেরও পেল না যে তার চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা জল সাদা ওড়নার ওপর টুপ করে গড়িয়ে পড়েছে।
এদিকে ছাদের ওপর শাহাজের হঠাৎ মনে হলো—দরজার আড়াল থেকে কেউ একজন সরে দাঁড়িয়েছে। ছায়াটা বড্ড চেনা মনে হলেও রিমুর কান্নার দাপটে সে মুহূর্তে আর কিছু ভেবে উঠতে পারল না।
চলবে_______