#অন্তহীন_প্রেম_আমার
#আফীফা_আফনান
#পর্ব_৩৮
[কপি করা নিষিদ্ধ]
বেলা এগোরোটার 'খরতপ্ত সকাল' সূর্য তখন মাথার ওপরের দিকে উঠতে শুরু করেছে। এই ঝকঝকে রোদে কোচিং সেন্টারের সামনের মস্ত বড় কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে আজ এক যেন এক অন্যরকম পরিবেশ। এইযে ঘাসের ওপর গোল হয়ে বসেছে চার বান্ধবী—রুহি, বিন্তি, পড়শি আর ছোঁয়া। ছোঁয়া আজ বেশ অনেকদিন পরই কোচিংয়ে এসেছে; গত কয়েক দিন সে কোচিং অনুপস্থিত ছিলো কারন সে বেড়াতে গিয়েছিলো চট্টগ্রামে তার নানুর বাড়িতে।
এতদিন পর প্রিয় বান্ধবীদের সাথে দেখা, তাই ছোঁয়া আজ খালি হাতে আসেনি। নানুর বাড়ি থেকে সে নিয়ে এসেছে চট্টগ্রামের খাঁটি সব ঐতিহ্যবাহী খাবার। এই যে একটু আগে বক্স খুলতেই সাথে সাথে চারদিকে একটা ম ম গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। ছোঁয়া একে একে বক্স থেকে বের করল—নরম হাতে পাকানো নারকেল নাড়ু, মুচমুচে খই-বাদাম ভাজা, আর চট্টগ্রামের বিখ্যাত আটকড়িয়া (আট রকমের শস্য দিয়ে তৈরি বিশেষ পদ)। এছাড়াও ছিল হাতের তৈরি মুড়লি আর গজা।
সবাই মিলে হাহা-হিহি করতে করতে গাছের নিচে বসে সেই খাবারে ভাগ বসিয়েছে।
এদিকে বিন্তি একটা নাড়ু মুখে দিয়ে চোখ বুজে বলল, "উফ! ছোঁয়া, তোর নানুর হাতের নাড়ুর কোনো তুলনা হয় না রে!"
পাশে পড়শিও খই-বাদাম ভাজা চিবোতে চিবোতে চট্টগ্রামের গল্প শোনার বায়না ধরল। ছোঁয়াও বেশ আয়েশ করে নানুর বাড়ির পাহাড়, সমুদ্র আর ওখানকার মেজবানি খাবারের গল্প শুনিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু রুহি আজ একটু চুপচাপ। সে যান্ত্রিকভাবে নাড়ু চিবোচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তার মনটা পড়ে আছে দুদিন আগের রাতের সেই চিরপরিচিত সুর আর কপালে পাওয়া সেই উষ্ণ স্পর্শের মাঝে। এই দুদিন সে কেবল এসব নিয়েই ভেবেছে, কিন্তু রুহি এখনো ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারছে না আদো কি তা সত্যি ছিলো নাকি স্বপ্ন? কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হয় এটা স্বপ্ন হতেই পারে না কারন রুহি যতোই ঘুমের ঘোরে থাকুক না কেন সেই খসখসে ঠোঁটে ছোয়া সে ঠিক অনুভব করেছিলো।
ছোঁয়া হঠাৎ রুহির কাঁধে ধাক্কা দিয়ে বলে উঠল, "কিরে রুহি? তুই কিছু বলছিস না কেন? এমনিতেও তোর পাহাড় সমুদ্র বেশ পছন্দের, তো তুই কি এখানে বসে বসেই সেই চট্টগ্রামের পাহাড় আর সমুদ্রে চলে গেলি নাকি? খাবারগুলো কেমন হয়েছে বললি না তো!"
রুহি সম্বিৎ ফিরে পেয়ে একটু অপ্রস্তুত হাসল। "খুব মজা হয়েছে রে ছোঁয়া! আসলে তোর নানুর হাতের এই আটকড়িয়াটা জাস্ট অসাধারণ । এমন স্বাদ আগে কখনো পাইনি।"
আজ যেন গাছের ওপর থেকে ঝরে পড়া দু-একটা লাল কৃষ্ণচূড়া ফুলও তাদের আড্ডার মাঝখানে এসে পড়ছে। অপরদিকে ভরা বেলার সেই স্নিগ্ধতায় চার বান্ধবীর হাসাহাসি আর চট্টগ্রামের সেই ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদে মুহূর্তটা যেন এক টুকরো সুখের ছবিতে রূপ নিচ্ছে। কিন্তু রুহির অবচেতন মনের কোনায় তখনো সেই ' মাউথ অর্গান এর সুর' আর 'অস্তিত্ব ও ছায়া'র অমীমাংসিত ধাঁধাগুলো ডালপালা মেলছে।
এদিকে বহুদিন পর সবাই একএিত হলো তাই কৃষ্ণচূড়া গাছের শীতল ছায়ায় বান্ধবীদের আড্ডায় রুহি যেন বিগত রাতের সেই ধোঁয়াশা আর রহস্যময় চিন্তাগুলো ঝেড়ে ফেলার এক চিলতে সুযোগ পেল। সে না চাইতেও মনে মনে নিজেকে বোঝাল, ওসব হয়তো গভীর ঘুমের ঘোরে দেখা কোনো অলীক দুঃস্বপ্ন ছাড়া আর কিছু নয়। তাই খই-বাদামের মচমচে শব্দ আর বান্ধবীদের হাসাহাসিতে তার মনটা এখন বেশ ফুরফুরে।
আড্ডার মাঝেই ছোঁয়া ব্যাগ থেকে টিস্যু বের করে সবার ভাগে কমবেশি নাড়ু, গজা আর আটকড়িয়া তুলে দিল। রুহিকে সে একটু বেশিই দিল, আদুরে গলায় বলল, "এই নে রুহি, এটা তোর জন্য আর বাকিটা মুগ্ধর জন্য। ও তো বরাবরই এসব নাড়ু খুব পছন্দ করে।"
ঠিক সেই সময় ছোঁয়ার নজর গেল কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ভেলপুরি বিক্রেতা মামার দিকে। "ঐ দেখ মামা এসেছে! চল, বহুদিন হলো ভেলপুরি খাইনি, আর ভেলপুরি ছাড়া আড্ডাটাও ঠিক জমছে না, "ছোঁয়ার প্রস্তাবে সবাই একবাক্যে রাজি হয়ে গেল।
রুহিও হাসিমুখে নিজের ভাগের খাবারগুলো ব্যাগে পুরে উঠে দাঁড়াল। চার বান্ধবী যখন ভেলপুরির ভ্যানটির সামনে গিয়ে দাঁড়াল, তখন তাদের চোখ ছানাবড়া! আগে যেখানে শুধু ভেলপুরিই মিলত, আজ সেখানে পসরা সাজিয়ে বসেছে নানা পদের মুখরোচক খাবার। একদিকে ছোট ছোট কাপে পেয়ারা আর পেঁপে মাখা, অন্যদিকে সারিবদ্ধভাবে রাখা টক-ঝাল-মিষ্টির সম্ভার—তেঁতুল, বরই, আম আর জিভে জল আনা মিক্সড ফ্রুট চাটনি।
কি খাবে কি খাবে চিন্তা করতে করতে একসময় শোরগোল করে তারা চারজনই রুহির কথায় ভেলপুরির সাথে স্পেশাল মিক্সড ফ্রুট চাটনির অর্ডার দিল।
মামা ব্যস্ত হাতে চার প্লেট ভেলপুরি সাজালেন। ভেলপুরি খাওয়ার পরে বিন্তি, পড়শি আর ছোঁয়ার প্লেটে চামচ ভরে সেই লোভনীয় চাটনি তুলে দিলেন তিনি। কিন্তু রুহি যখন নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে চাটনি চাইল, মামা ঝট করে হাতটা সরিয়ে নিলেন। রুহির চোখের দিকে না তাকিয়েই মাথা নেড়ে কর্কশ অথচ দৃঢ় স্বরে বলে উঠলেন—
"না আপা, আপনারে এই চাটনি দেওন যাইবো না। কড়া বারণ আছে!"
মামার এমন অদ্ভুত আর অপ্রত্যাশিত কথায় রুহি স্তম্ভিত হয়ে গেল। বিন্তি আর ছোঁয়াও খাওয়া থামিয়ে অবাক চোখে মামার দিকে তাকাল। যে চাটনি সবার জন্য বরাদ্দ, সেই একই চাটনি রুহির বেলায় কেন নিষিদ্ধ? রুহি বিস্ময় মেশানো গলায় জিজ্ঞেস করল, "কেন মামা? চাটনি দিতে বারণ কে করল?"
মামা তখন অন্য কাস্টমার সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন, যেন রুহির প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনটুকুও তিনি বোধ করছেন না। রুহির বুকটা ধক করে উঠল। আবারও কি সেই 'অস্তিত্ব আর ছায়া'র কেউ তার আশেপাশে নিঃশব্দে বিচরণ করছে?
ভরা বেলার এই আড্ডায় ভেলপুরি মামার এমন অদ্ভুত আচরণে সবাই যখন থমকে গেছে, ঠিক তখনই পাশ থেকে বিন্তি বেশ ঝঝাঁলো গলায় বলে উঠল, "মামা, এটা কেমন কথা? আপনি কেন ওকে চাটনি দেবেন না? কে বারণ করেছে আপনাকে? আর আপনি এমন করলে কিন্তু আমরা আর কোনোদিন আপনার দোকানে আসব না!"
বিন্তির ধমক শুনে মামা কিছুটা অপ্রস্তুত হলেন। তিনি ঝটপট নিচের থেকে একটি আলাদা ছোট কৌটা হাতে নিলেন। সেখান থেকে সযত্নে কিছুটা মিক্সড চাটনি একটি প্লেটে তুলে নিলেন। এরপর রুহির দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে বললেন, "আপামনি, ঐ বড় জারের চাটনি আপনারে দেওয়া বারণ। কিন্তু এই যে এইটা দেহেন, এইটা দেওয়া বারণ না। নেন, এইটা খাইয়া দেখেন কেমন লাগছে।"
রুহি আর তার বান্ধবীরা যেন আকাশ থেকে পড়ল। রুহি ভালো করে লক্ষ্য করল—বড় জারের চাটনি আর তাকে দেওয়া এই চাটনি দেখতে তো হুবহু এক! তবে কেন এই লুকোচুরি? সে অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, "মামা, এটাও তো চাটনি ওটার মতোই হুবুহু দেখতে একরকম, তবে ওইটা দিতে বারণ কেন আর এইটা দিতে সমস্যা নেই কেন? তফাৎটা কী?"
মামা এবার দাঁত বের করে একগাল হেসে রহস্য ভাঙলেন। "তফাৎ আছে গো আপামনি! ওই বড় জারের চাটনিতে আনারস মেশানো আছে। কিন্তু আপনার তো আনারসে নাকি বিষম অ্যালার্জি! তাই আপনার জন্য এইটা আলাদা কইরা বানানো হইছে। এইটাতে আনারসের ছিঁটা ফোঁটাও নাই। আপনার জন্যই স্পেশাল অর্ডার আছিল।"
মামার কথা শুনে রুহি যেন মুহূর্তের জন্য জমে পাথর হয়ে গেল। তার বান্ধবীরাও বিস্ময়ে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। এদিকে রুহি চাটনির প্লেটটা হাতে নিয়ে একটু সরে দাঁড়াল। বিন্তি, ছোঁয়া আর পড়শি তৎক্ষণাৎ তাকে ঘিরে ধরল। বিন্তি উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "কিরে রুহি? তোর কিসে অ্যালার্জি সেটা আমরা জানি না কিন্তু মামা জানল কীভাবে? আর তোকে আলাদা চাটনি দেওয়ার অর্ডারই বা কে দিল?"
রুহি তখন ঘোরের মধ্যে। সে তৎক্ষনাৎ গত দুইদিন আগে ঘটে যাওয়া সেই ভয়াবহ আনারস কাণ্ডের কথা সংক্ষেপে বান্ধবীদের জানাল। সব শুনে পড়শি ভাবুকের মতো কপালে হাত দিয়ে বলল, "আচ্ছা! তাহলে তুই এই কারণেই গতকাল কলেজে আসিসনি?" রুহি মাথা নেড়ে 'হ্যাঁ' বোঝাল।
পাশ থেকে বিন্তি আবারও প্রশ্ন ছুড়ল, "সব বুঝলাম, কিন্তু এই ভেলপুরি মামা জানল কীভাবে? তুই কি আগে কখনো ওনাকে বলেছিস?"
রুহি অসহায় বোধ করল। "আমি কীভাবে বলব? আর ভেলপুরি মামা তো আজ একমাস হলো এখানে ভেলপুরি বিক্রি করেন, তোরা তাকে যতোটা চিনিস আমিও ঠিক ততোটাই চিনি। তার ওপর কাল তো আমি কোচিংএ আসিনি, আর আজ এসে তো সারাক্ষণ তোদের সাথেই ছিলাম। আমি কিছু বললে তো তোরা শুনতে পেতি।"
চার বান্ধবীর মাথায় তখন চিন্তার পাহাড়। মিক্সড চাটনি মুখে দিয়েও যেন কারো কোনো স্বাদ লাগছে না। সবাই এক গভীর ভাবনায় ডুবে গেল। অবশেষে পড়শি বুদ্ধি দিল, "আরে, আমরা কেন শুধু শুধু মাথা ঘামাচ্ছি? মামাকে জিজ্ঞেস করলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। চলতো!"
ব্যাস, উত্তরের খোঁজে চারজন মিলে আবারও সেই ভেলপুরির ভ্যানটির সামনে গিয়ে হাজির হলো।
"মামা, আপনি কীভাবে জানেন আমার আনারসে অ্যালার্জি আছে?" রুহির কথায় চার জোড়া উৎসুক চোখ তখন ভেলপুরি বিক্রেতা মামার মুখের ওপর স্থির।
মামা হাতের কাজ থামালেন না, বরং আলুর পুর মাখাতে মাখাতে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন রুহির দিকে— "শাহাজ মামা আপনার কী হয় আপামনি?"
রুহি যেন বাক-হারা। এই সাধারণ ভেলপুরি বিক্রেতা শাহাজ ভাইকে চেনে কীভাবে! সে নিজের বিস্ময় সামলে নিয়ে চটজলদি জবাব দিল, "আপনি শাহাজ ভাইকে কীভাবে চেনেন?" রুহির মুখে 'ভাই' সম্বোধন শুনে মামা ভেবে নিলেন রুহি শাহাজের বোন তাই একটু হাসলেন। "শাহাজ মামার দেহি তার বোইনের প্রতি বেশ খেয়াল!"
রুহি কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু পাশ থেকে পড়শি গোয়েন্দার মতো চোখ ছোট ছোট করে আঙুল উঁচিয়ে মামার দিকে তাক করে একটু সামনে ঝুঁকে বলে বসল, "মামা, আপনি কি বলতে চাইছেন শাহাজ ভাই আপনাকে এসব বলেছে?"
মামা হেসে দিয়ে বললেন, "একদম! এই তো আপা ধরতে পারছেন।" মামার কথায় পড়শি নিজের কাঁধে নিজে থাপ্পড় দিয়ে আত্মপ্রশংসা শুরু করলেও রুহি যেন এক প্রচণ্ড ধাক্কা খেল।
এদিকে বিন্তি আর ছোঁয়া রুহির কানের কাছে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল, "কিরে রুহি, উনি শাহাজ ভাইকে চেনেন কীভাবে?"
রুহি অসহায়ভাবে বলল, "আমি কী জানি! উনি যে শাহাজ ভাইকে চিনতে পারেন, এটা আমার কল্পনার বাইরে ছিল।"
অতঃপর বিন্তি এবার এগিয়ে এসে সরাসরি জিজ্ঞেস করল, "মামা, শাহাজ ভাইয়ের সাথে আপনার পরিচয় কীভাবে?"
মামা এবার হাতের কাজ থামিয়ে স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন। তাঁর চোখেমুখে এক গভীর কৃতজ্ঞতার ছাপ। তিনি বলতে শুরু করলেন, "আমি আসলে আগে চোর আছিলাম। ছোটখাটো চুরি-চামারি করতাম, দুই-একবার জেলও খাটছি।
'চোর' শব্দটা শুনেই রুহি সহ বাকিরা কিছুটা ভগকে গেলো, রুহিকে ভয় পেতে দেখে মামা কিছুটা হাসলেন, অতঃপর বললেন ভয় ভাইয়েন না আপা আমি চোর ছিলাম ঠিকই কিন্তু স্বভাবে নয় অভাবের তাড়নায় এই পথে নামছিলাম। জন্মগত তো আর কেউ খারাপ থাকে না। গ্রামের পোলা আছিলাম, একটু-আধটু পড়াশোনা জানতাম। অন্য সবার মতো ভাগ্য পাল্টাইতে চাকরি করতে শহরে আইলাম, কিন্তু পকেটে টাকা আছিল না, পেটে আছিল খিদা। তাই অসৎ সঙ্গে পইড়া চুরি ধরলাম।"
থামলেন এরপরে একটু দম নিয়ে তিনি আবার বলতে শুরু করলেন, "দুই বছর আগের কথা। এক বাড়িতে চুরি করতে গিয়া ধরা খাইলাম। এর আগে যতবার ধরা খাইছি, মানুষ মাইরা নাক-মুখ ফাটাইয়া দিছিল। কিন্তু সেইবার যে বাড়িতে চুরি করতে গেলাম ওই বাড়ি ছিলো ব্যাচেলর পোলাপানের, তাগো হাতেও ধরা খাইলাম। চোর যেহেতু মারবো , তাই ওরাও আমারে মারছিল, তবে দুই গালে চাইরটা থাপ্পড় দিছিল শুধু। আমি তো ভাবছিলাম ওইদিনও খুব মাইর খামু। কিন্তু হঠাৎ ভিড়ের মাঝখান থেইকা এক লোক বাহির হইয়া আইল... আর সে ছিলো শাহাজ মামা।"
মামা শাহাজের সেই বলিষ্ঠ শরীরের বর্ণনা দিতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন। "তার চোখের কী ধার! আমার দিকে এমনভাবে তাকাইল যে আমার কলিজাডা বাহির হইয়া গেল। কিছুক্ষণ আমারে ঘুইরা দেইখা নিচে ফ্লোরে বইসা আমারে ডাকল। আমি তো ভাবছিলাম আজ আমি শেষ! কিন্তু মামা আমারে পাশে বসাইয়া নাম, ধাম, ক্যান চুরি করি সব জিগাইল। আমি সব খুইলা কইলাম।"
"এরপরে মামা আমারে দুইটা দিন নিজের কাছে রাখল। জন্মের পরে কবে গরুর মাংস দিয়া ভাত খাইছি মনে আছিল না, ভাই আমারে সেইদিন গরুর মাংস দিয়া পেট ভইরা খাওয়াইল। এরপর জিগাইল ভালো হইতে চাই কি না। চুপ ছিলাম কি কমু বুঝতে পারিনাই, একটু পরেই ভাই তার পরিবাররে কথা কইতে শুরু করলো, বুঝলাম খুব ভালোবাসে। আমিও সেদিন মায়ার দেখা পাইলাম। কয়েকদিন পরেই ভাই আমারে একটা রেস্টুরেন্টে চাকরি দিল। ওইখানে ৬ মাস কাম করছি, কিন্তু ওই যে কর্মফল অতীতে খারাপ কাম করছি তো, আল্লাহ শাস্তি দিল। রেস্টুরেন্টে চুরি হইল, যারে বন্ধু ভাইবা অতীত কইছিলাম সেই বিশ্বাসঘাতকতা কইরা আমারে ফাসাইল। তবে পরে প্রমাণ হইছে আমি চোর না, কিন্তু মানুষের বাঁকা নজর তো আর যায় না। চাকরি ছাইড়া দিলাম।"
এরপরে আবার বেকার তবে এবার আর খারাপ পথে যাই নাই, কয়েকদিন দিনমজুরের কাজ করলাম আয় কম কিন্তু সৎ উপার্জন, অতঃপর মামা নিজের ভ্যানটার গায়ে পরম মমতায় হাত বুলিয়ে বললেন, "কয়েক মাস অভাবে কাটল। হঠাৎ একদিন মামা ফোন কইরা ডাকলেন এবং দেখা করতে কইল। এই ভ্যানডা আমার রুজি-রুটি, ভাই আমার হাতে তুইলা দিল। রেস্টুরেন্টের কাম জানতাম বইলা ভেলপুরি শুরু করলাম। এখন মা-বাপ, বউ-বাচ্চা লইয়া এই শহরেই ভালো আছি। আর আপনার কথা ভাই আমারে কইছিল। ভাইরে কিছু জিগাইতে আমার ডর লাগে। এই চাটনি আলাদা রাখা—সবই ভাইয়ের বুদ্ধি। গত রাইতে কল দিয়া কইল আপনি যদি খাইতে আসেন, তাইলে যেন আপনারে আলাদা দেই। বারবার সর্তক করছে যেন আনারসের চামচও আপনারটাতে না ছোঁয়াই।"
রুহি যেন একের পর এক ঝটকা খাচ্ছে। সে যখন ভাবনায় ডুবে আছে, তখনই পড়শি পেছন থেকে একটা গুঁতো দিয়ে ফিসফিস করে বলল, "গরিবের কথা বাসি হলেও সত্যি হয় রে রুহি!" রুহি কিছু বলার আগেই পড়শি গদগদ হয়ে মামাকে বলল, "মামা, শাহাজ ভাই তো আপনার এত হেল্প করেছে, আর রুহি শাহাজ ভাইয়ের বোন, আমরা ওর বান্ধবী—তাহলে তো আমরা আপনার থেকে ফ্রিতেই খেতে পারি, কী বলেন?"
পড়শির কথা শেষ হতেই মামা বলে উঠলেন, "রুহি আপারে ফ্রিতে খাওয়াইতে পারি, কিন্তু আপনারে খাওয়ামু ক্যান? আপনি কি মামার বোন হন?"
এদিকে মামার এক কথায় পড়শির হাসি উধাও। অপরদিকে রুহি, বিন্তি আর ছোঁয়া ঠোঁট টিপে হাসতে লাগল। পড়শি মুখ কালো করে সবাইকে তাড়া দিল যাওয়ার জন্য। সবাই টাকা মিটিয়ে আবারও সেই কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে যেতে শুরু করল। কিন্তু হঠাৎ রুহির মনে কিছু একটা পড়তেই সে দাঁড়িয়ে পড়ল। সে ধীরপায়ে পেছন ঘুরে আবারও ভেলপুরি মামার কাছে এসে দাঁড়াল।
"মামা, আপনি কি নিশ্চিত যে শাহাজ ভাইয়ের সাথে আপনার ঠিক দুই বছর আগেই দেখা হয়েছে? আপনার হিসাবে কোথাও ভুল হচ্ছে না তো?" রুহির গলায় এক অদ্ভুত অস্থিরতা।
মামা রুহির দিকে কিছুটা অবাক হয়ে তাকালেন। রুহি মুহূর্তেই বুঝতে পারল প্রশ্নটা একটু বেশিই সরাসরি হয়ে গেছে। সে কিঞ্চিৎ বিভ্রান্ত হয়ে সামলে নিয়ে আবারও বলল, "না মানে, আমি বলতে চাইছি ঠিক দুই বছর আগের ঘটনাই কি এটা?"
মামা এবার মৃদু হাসলেন। "জি আপামনি, একদম দিন-তারিখ পাক্কা দুই বছর কি না জানি না, কয়েকদিন এদিক-ওদিক হইতে পারে। তবে এই দুই বছরের মতোই হইব। আর যে মানুষের উসিলায় আমার জীবনের এই পরিবর্তন, সেই মানুষ আর সেই দিনটা কি আমি ভুলতে পারি?" এরপর তিনি আবারও কাজের দিকে মনোযোগ দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনি কি আর কিছু খাইবেন আপামনি? দিমু কিছু?"
রুহি দ্রুত মাথা নেড়ে বলল, "নাহ নাহ মামা, আজ আসি। পরে অন্যদিন খাব।"
কথাটি বলে রুহি ঘুরে দাঁড়াল। বিন্তিরা ততক্ষণে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে চলে গেছে। রুহির মনের ভেতর তখন গণিতের কঠিন এক সমীকরণ ঘুরপাক খাচ্ছে। সবার জানামতে শাহাজ চার বছর আগে চট্টগ্রাম চলে গিয়েছিল এবং তারপর আর এই শহরে ফেরেনি। কিন্তু এই ভেলপুরি মামা বলছেন দুই বছর আগেও শাহাজ এই শহরেই ছিল! হিসাব কিছুতেই মিলছে না; বরং তার সব সমীকরণ যেন ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে।
রুহি গভীর ভাবনায় ডুবে তখনই ছোঁয়ার চিৎকার কানে এল— "এই রুহি! রুহি, এদিকে আয়!"
রুহি সেদিকে তাকাতেই দেখল ওর তিন বান্ধবী দাঁড়িয়ে আছে, আর তাদের সাথে আছেন কোচিংয়ের নতুন স্যার শাহাদাত। স্যারকে দেখা মাত্রই রুহির নাক-মুখ কুঁচকে এল। দেড় মাস আগে জয়েন করা এই লোকটাকে তার দু-চক্ষুর বিষ লাগে। শুরুতে ব্যবহার ভালো থাকলেও ইদানীং তিনি কেমন যেন অদ্ভুতভাবে তাকান। এইতো কিছুদিন আগে বিন্তির কাছ থেকে জোর করে আইডি নিয়ে রুহিকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে, ইনবক্সেও অদ্ভুত সব মেসেজ করেন। টিচার বলে রুহি ব্লকও করতে পারছে না আর না পারছে কিছু বলতে, তবে তার প্রচণ্ড ইচ্ছে করে এটাকে কষিয়ে একটা চড় মেরে ব্লক করে দিতে। তাই আপাতত মেসেজগুলো সে সিন না করে ইগনোর করে রেখেছিল।
ছোঁয়া আবার ডাকলে রুহি এবার বিরক্তি চেপে বড় বড় পা ফেলে তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল এবং স্যারকে দেখে দায়সারা একটা সালাম দিল। কিন্তু শাহাদাত স্যার কোন জবাব না দিয়ে সাথে সাথেই হন্তদন্ত হয়ে প্রশ্ন ছুড়লেন, "আরোহী, তুমি আমাকে ব্লক করেছ কেন? গত ক্লাসে তোমাকে সুন্দর লাগছিল বলে আমি তোমার হাসির প্রশংসা করেছি মাত্র। তোমার ভালো না লাগলে আমাকে বলতে পারতে, কিন্তু সরাসরি ব্লক করে দিলে? আমি এতে বেশ ইনসাল্ট ফিল করেছি।"
স্যারের কথা শুনে রুহি যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে কখন এই লোকটাকে ব্লক করল? আর কবেই বা তার সাথে কথা হলো? রুহি যখন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে, বিন্তি পাশ থেকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, "কিরে রুহি, তুই কি স্যারকে সত্যিই ব্লক করেছিস?"
রুহি নিচু স্বরে জবাব দিল, "না তো, করিনি। তবে করার খুব ইচ্ছে ছিল।"
"তাহলে কে করল? তোর ফেসবুক পাসওয়ার্ড আর কে জানে?" বিন্তির প্রশ্নে রুহি একটু ভাবল। তারপর মনে পড়ল, "রিমু আপু আর রুবি আপু তাকে আইডিটা খুলে দিয়েছিল, পাসওয়ার্ড তো ওদের কাছেও আছে।"
বিপরীতে শাহাদাত স্যার তখনও উত্তরের অপেক্ষায় উৎকণ্ঠা নিয়ে দাঁড়িয়ে। রুহির এই 'বেয়াদবি' যেন তার হজম হচ্ছে না। তিনি আবারও বললেন, "কী হলো আরোহী? তুমি আমাকে অপমান করেছ। তুমি এখনই আমার সামনে ব্লক খুলবে।"
রুহি মনে মনে মুখ বেঁকাল— 'এহ! আসছে আমার শাহরুখ খান! তাকে কৈফিয়ত দিতে হবে!' সে নিশ্চিত যে রিমু আপু মেসেজ দেখে ব্লক করে দিয়েছে, আর যে-ই করুক, কাজটা বেশ ভালোই করেছে। রুহি এবার একটু বানিয়ে আফসোসের সুরে বলল, "স্যার, আসলে আমি আপনাকে ব্লক করিনি। আমার ফেসবুক আইডিটা আমার বড় আপু দেখাশোনা করেন, পাসওয়ার্ডও ওনার কাছেই। উনিই বোধহয় ব্লক করেছেন। এখন আপুকে না বলে যদি ব্লক খুলি, তবে উনি আম্মুকে সব বলে দেবেন... তাই আর কি..."
রুহির এমন বুদ্ধিদীপ্ত জবাবে শাহাদাত স্যারের আর কিছু বলার থাকল না। একরাশ অপমান আর গ্লানি নিয়ে মুখ কালো করে তিনি সেখান থেকে গটগট করে চলে গেলেন।
এদিকে শাহাদাত স্যার যেতেই সেই অস্বস্তিকর আড্ডা শেষে বান্ধবীরা আর দেরি করল না। একে একে সবাই কোচিংয়ের গেট দিয়ে বেরিয়ে যার যার বাড়ির দিকে পা বাড়াল। বিন্তব আর রুহি কিছুটা এগোতেই দেখল তাদের জন্য ঠিক করে রাখা রিকশাটা মোড়েই দাঁড়িয়ে আছে। কোনো কথা না বাড়িয়ে দুজন চটপট উঠে বসল।
রিকশা চলতেই রুহি ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করল। কৌতূহলবশত ফেসবুক চেক করতেই দেখল, আসলেই শাহাদাত স্যারের আইডিটা ব্লক লিস্টে শোভা পাচ্ছে, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো—মেসেজ অপশনগুলো একদম পরিষ্কার, সব ডিলিট করা!
বিন্তিও রুহির হাত থেকে ফোনটা নিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে অবাক হয়ে আবিষ্কার করল, শুধু স্যার নন, তাদের কোচিংয়ের আরও বেশ কয়েকজন ক্লাসমেটের আইডিও একইভাবে ব্লকে পড়ে আছে।
বিন্তি যখন ফোনটা রুহিকে ফেরত দিতে যাবে, ঠিক তখনই তার নজর পড়ল ফোনের সাধারণ মেসেজ অপশনে। সেখানে একটি অপরিচিত নাম্বার থেকে আসা মেসেজের পাহাড়! রুহি একটিরও রিপ্লাই দেয়নি ঠিকই, কিন্তু প্রতিটি মেসেজ যেন একেকটি সুন্দর কাব্যিক পঙ্ক্তি। মেছেজ গুলো পড়ে মুগ্ধ হয়ে বিন্তি রুহিকে জিজ্ঞেস করল, "কিরে রুহি, এই মানুষটা কে? এত সুন্দর করে মেসেজ লিখলো !"
রুহি নির্লিপ্তভাবে জবাব দিল, "চিনি না রে। বেশ অনেকদিন ধরেই এমন মেসেজ আসে। নামধাম কিছু জানি না।" বিন্তি তাকে বোঝাতে চাইল যে হয়তো পরিচিত কেউ হবে, একবার কথা বলে দেখা উচিত। কিন্তু রুহি কোনো উত্তর দিল না, স্রেফ ফোনটা বিন্তির হাত থেকে নিয়ে ব্যাগে পুরে ফেলল।
কথায় কথায় বিন্তি হঠাৎ হেসেই জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা, তোর সেই উটকো আশিকের খবর কী? এখন আর চিরকুট-টিরকুট পাস নাকি?"
রুহি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "নাহ, আর পাই না। সেই যে একবার পেলাম, তারপর আর খবর নেই। একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে, এসব ঝামেলা আমার একদম ভালো লাগে না। চিনি না জানি না সব আজইরা ঝামেলা।"
গল্প করতে করতে রিকশাটা এক সময় রুহিদের বাড়ির গেটের সামনে এসে থামল। বিন্তিকে বিদায় জানিয়ে রুহি যেই না ভেতরে কদম রাখল, অমনি তার চোখ ছানাবড়া! বাড়ির সামনের আঙিনায় যেন আজ মেলা বসেছে। সেখানে তার মা নাসরিন বেগম, বড় মা তানজিনা বেগম, মেজো মা—সবাই উপস্থিত। এমনকি শাহরিয়ার কবির সাহেব, শাহাবুদ্দিন সাহেব, মুগ্ধ আর সচরাচর যাকে বাড়িতে পাওয়াই যায় না, সেই কাব্যও আজ সেখানে দাঁড়িয়ে।
সবাই গোল হয়ে কী একটা জিনিস ঘিরে ধরে উত্তেজিতভাবে কথা বলছেন। রুহি কৌতূহল নিয়ে ভিড় ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই তার হৃদপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। আড়ালে দেখা যাচ্ছে সামনেই দাঁড়িয়ে আছে ঝকঝকে এক সুন্দর খয়েরি রঙের বাইক!
এক নিমেষের জন্য রুহির মনটা খুশিতে নেচে উঠল। তার মনে হলো, তবে কি শাহাজ ভাই শেষমেশ নিজের জন্য নতুন বাইক কিনলেন? অপরাধবোধে ভুগতে থাকা রুহির ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। সে একপ্রকার দৌড়েই বাইকটার একদম কাছাকাছি চলে গেল। কিন্তু কাছে গিয়েই রুহি যেন থমকে দাঁড়াল।
কারন বাইকের ওপর তার শাহাজ ভাই নয়, বরং একগাল চওড়া হাসি নিয়ে আয়েশ করে বসে আছে— পিয়াস!
চলবে............
[আমি না আসলে আগের পর্বের পার্ট সমূহে কি লিখেছি অনেকটা ভুলে গেছি তাই যদি দেখেন কোনখানে মিলছেনা একটু বলবেন। ]