#অন্তহীন_প্রেম_আমার
#আফীফা_আফনান
#পর্ব_৩৯
[কপি করা নিষিদ্ধ]
তখন বাতাসে বিকেলের এক মিষ্টি আমেজ, কিন্তু রুহির মনে সেই আমেজটুকু যেন ধরা দিচ্ছে না। ঘরের ভেতর দীর্ঘক্ষণ একলা বসে থাকা আর সামনের খোলা মোটা ভর্তি পরীক্ষার বইগুলোর সাথে লড়াই করতে করতে তার মস্তিষ্ক যেন এখন বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। এমনিতেও আজ কোচিং থেকে ফিরে আসার পর থেকেই রুহির মনটা এক অদ্ভুত ভারে ছেয়ে আছে। তখন বাড়িতে পা রাখতেই এক মুহূর্তের জন্য যে খুশিটা তার মনে উঁকি দিয়েছিল, পিয়াসকে সেই বাইকের ওপর বসে থাকতে দেখে তা যেন কর্পূরের মতো উড়ে গেছে। এরপরেই বাড়িতে প্রবেশ করে কোনোমতে দায়সারাভাবে দু-মুঠো খেয়েই রুহি নিজের রুমে ঢুকে পড়েছিলো। আর এখন পর্যন্ত সে ড্রয়িং রুমের ত্রিসীমানাতেও যায়নি।
রুহির এই স্বেচ্ছায় বন্দি হওয়ার পেছনে অবশ্য যুৎসই একটি কারণ আছে। আর সেই কারণটা হলো—পিয়াসের সেই নতুন খয়েরি বাইক। বাইকটি অবশ্য পিয়াস তার নিজের টাকায় কেনেনি; শাহরিয়ার কবির সাহেবই পিয়াসের অফিসের যাতায়াত সুবিধার্থে এবং সামনের জন্মদিন উপলক্ষে তাকে এই দামি উপহারটি দিয়েছেন। অনেকদিন পর বাড়িতে নতুন একটি বাহন আসায় সবার মধ্যে যেন খুশির বন্যা বয়ে যাচ্ছিলো। একদিকে বড়দের উৎসাহ আর ছোটদের হইহুল্লোড়ে সব মিলিয়ে দুপুরের সেই সময়টায় যেন পুরো বাড়িটাই এক আনন্দঘন উৎসবে পরিণত হয়েছিলো।
এদিকে খুশির এই জোয়ারে সবচেয়ে বেশি ভেসেছে মুগ্ধ। বড় ভাইয়ের নতুন বাইক আসার আনন্দে সে পিয়াসের কাছে আবদার করে বসল এক জবরদস্ত ট্রিটের। পিয়াসও আজ বেশ খোশমেজাজে ছিলো। তাইতো সে উদার মনে প্রমিস করে ফেলেছে যে, আজ সন্ধ্যাতে সে বাড়ির সবাইকে নিয়ে ভালো কোনো রেস্টুরেন্টে ডিনার করতে যাবে।
কিন্তু এই আনন্দ-আয়োজনের কোনো কিছুতেই রুহির বিন্দুমাত্র রুচি নেই। বাইক কেনা বা পিয়াসের সাথে বাইরে খেতে যাওয়া—পুরো বিষয়টাই তাকে এক ধরণের মানসিক অস্বস্তিতে ফেলছে। তার মনে তখন বারবার শাহাজের সেই পুড়ে যাওয়া কালো বাইকটি আর তার সেই গাম্ভীর্যপূর্ণ চেহারাই ভাসছিলো।
নিজের ওপর এক ধরণের বিরক্তি আর অভিমান নিয়ে রুহি দুপুরের হালকা খাবার শেষ করে দ্রুত পায়ে নিজের রুমে আশ্রয় নিয়ে নেয়। খেতে খেতেই সে ঠিক করে ফেলেছে, বাইরের এই আনন্দর সে নিজেকে শামিল করবে না। তাই তো সে জানালা-দরজা ভেজিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার বইয়ের ভেতরে এতোক্ষণ মুখ গুঁজে বসে ছিলো, যাতে বাইরের ওই হাসাহাসি আর বাইকের হর্নের শব্দ তাকে স্পর্শ করতে না পারে।
একনাগাড়ে অনেকটা সময় পরিক্ষার প্রস্তুতির এই পাহাড়সম চাপ আর একঘেয়েমি কাটাতে একসময় তার মনে হলো এখন এক চিলতে বিশ্রামের বড্ড প্রয়োজন।
তাই হাতের মোটা বইটি নিয়ে সে প্লাস্টিকের মোড়াটা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। এক হাতে বইটা বুকের কাছে আগলে রেখে অন্য হাত দিয়ে নিজের ঘাড় আর গলার একপাশটা মৃদু ম্যাসাজ করতে শুরু করল। একটানা ঘাড় গুঁজে পড়ার কারণে পেশিগুলো যেন জমে শক্ত হয়ে আছে। মৃদু চাপে সেই জড়তা কাটাতে কাটাতে রুহি ধীর পায়ে ব্যালকনির রেলিংয়ের দিকে এগিয়ে গেল।
লোহার গ্রিলের একদম সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়া এসে তার অবাধ্য চুলগুলোকে উড়িয়ে দিল। রুহি চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অতঃপর একসময় চোখ খুললো, দৃষ্টি তুলে সামনে তাকালো ঠিক তখনই তার নজর পড়ল ব্যালকনির একদম সামনে রাস্তার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল মেহগনি গাছটার একটি সরু ডালের ওপর। সেখানে থাকা এক জোড়া কাঠশালিকের খুনসুটি দেখে রুহির ঠোঁটের কোণে আপনাআপনিই এক চিলতে মায়াবী হাসি ফুটে উঠল।
দৃশ্যটি যেন কোনো রোমান্টিক উপন্যাসের পাতা থেকে উঠে আসা। পাখি দুটোর কাণ্ড দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে—স্ত্রী পাখিটি কোনো কারণে প্রচণ্ড অভিমান করেছে, আর পুরুষ পাখিটি তার মান ভাঙাতে নাছোড়বান্দা। স্ত্রী পাখিটি যখনই রাগে ডানা ঝাপ্টে এক ডাল থেকে অন্য ডালে লাফিয়ে যাচ্ছে, অমনি পুরুষ পাখিটিও কিচিরমিচির শব্দে প্রেম নিবেদন করতে করতে তার পিছু নিচ্ছে। কখনো সে তার চঞ্চু দিয়ে স্ত্রী পাখিটির পালক একটু ছুঁয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে, আবার পরক্ষণেই প্রত্যাখ্যাত হয়ে করুণ সুরে ডেকে উঠছে।
মহিলা পাখিটি কখনো আড়চোখে তাকাচ্ছে, আবার পরক্ষণেই মুখ ঘুরিয়ে আরও দূরে চলে যাচ্ছে। কিন্তু পুরুষ পাখিটি হার মানার পাত্র নয়; সে যেন প্রতিজ্ঞা করেছে আজ সে ভালোবাসা দিয়ে সব মান-অভিমান ধুয়ে মুছে দেবেই। এই অবুঝ দুই প্রাণীর মাঝে বয়ে চলা এক অদ্ভুত প্রেমের টানাপোড়েন রুহিকে মুগ্ধ করে ফেলল।
এদিকে ব্যালকনির গ্রিলে হাত রেখে রুহি যেন নিজের জীবনের সাথে এই দৃশ্যটার এক অদৃশ্য মিল খুঁজে পেল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল কোনো এক পরিচিত ছায়ামূর্তি, যে হয়তো এভাবেই আড়ালে থেকে তার খেয়াল রাখে, ঠিক যেমন এই পুরুষ পাখিটি তার সঙ্গিনীকে আগলে রাখছে। বিকেলের এই মরা রোদে পাখির সেই খুনসুটি আর ডানা ঝাপটানোর শব্দে চারপাশটা যেন এক রোমান্টিক আবেশে আচ্ছন্ন হয়ে গেল। রুহি একনিমিশেই যেন পড়াশোনার সব ক্লান্তি ভুলে এক মোহগ্রস্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেই মেহগনি ডালের দিকে, যেখানে ছোট ছোট দুটি প্রাণীর মাঝে চলছে এক অনন্ত প্রেমের মান-অভিমানের মহাকাব্য।
এদিকে পাখি দুটোর প্রতিটি চঞ্চল অঙ্গভঙ্গি যখন রুহির ঠোঁটের কোণে এক স্নিগ্ধ আর পবিত্র হাসি ফুটিয়ে তুলছিল, সে নিজেও জানত না সেই হাসির ছটা কতখানি মায়াবী ছিলো। রুহি এতটাই বিভোর ছিল যে, বাড়ির লোহার গেটের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক জোড়া গভীর ও তৃষ্ণার্ত চোখের অস্তিত্ব তার টেরই পাওয়া হলো না।
শাহাজ গেটের কাছে দাঁড়িয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল ব্যালকনির ওই মানবীটির দিকে। রুহির প্রতিটি পলক ফেলা, তার আনমনা হাসি আর চোখের গভীরতা—সবকিছুই শাহাজ যেন নিজের হৃদয়ে গেঁথে নিচ্ছিল। আচ্ছা রুহি কি জানে তার এই ক্ষুদ্রতম মায়াবি হাসি আর চোখের পলক ফেলা সামনে দাঁড়িয়ে আছে থাকা এই কঠিন মানুষটির মনেও অসম্ভব কম্পন সৃষ্টি করে। নাহ রুহি জানে না, জানলে হয়তো এই বেখেয়ালি হাসি হাসার আগেই তার আত্মা কেঁপে উঠতো।
হঠাৎই রুহির নজর অনুসরণ করে শাহাজও মেহগনি গাছটির ডালের দিকে তাকাল। তার নজরেও এলো সেই দুষ্টুমিভরা ভালোবাসার মুহূর্তটি। শাহাজ মুচকি হাসল, তবে পরক্ষণেই নজর ফিরিয়ে নিলো রুহির দিকে। যেন এই ব্রহ্মাণ্ডের আর কোনো দৃশ্যেরই আজ তার কাছে কোনো মূল্য নেই।
কিন্তু পরক্ষণেই শাহাজের মধ্যে এক অদ্ভুত পরিবর্তন এলো। নিজেকে সামলে নিয়ে সে অত্যন্ত সজোরে আর শব্দ করে লোহার গেটটি টেনে খুলল। সেই আকস্মিক ধাতব শব্দে পুরো নিস্তব্ধতা হঠাৎ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। আকস্মিক শব্দে রুহির মোহ ভাঙল নিমেষেই; সে ঝট করে নজর ঘুরিয়ে নিচে গেটের দিকে তাকাতেই দেখল শাহাজ ধীর অথচ বলিষ্ঠ পায়ে বাড়ির সীমানার ভেতর প্রবেশ করছে।
রুহি একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল নিচের দিকে। এদিকে শাহাজ মাএ যে কাজটি করলো তার একমাএ কারন হলো রুহির মনোযোগ আকর্ষন আর সে তাতে সফল। কারন শাহাজ স্পষ্ট বুঝতে পারছিল ওপর থেকে এক জোড়া জিজ্ঞাসু আর কৌতূহলী চোখ তাকে বিঁধছে, কিন্তু সে একবারের জন্যও মাথা তুলে ওপরের দিকে তাকাল না। সে এমন এক নির্লিপ্ত ভঙ্গি করল যেন সে জানেই না রুহি ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে, কিংবা একটু আগে এই মেয়েটির মায়াবী হাসিতেই সে বুঁদ হয়ে ছিল।
শাহাজকে এভাবে সাধারণের মতো পায়ে হেঁটে ভেতরে প্রবেশ করতে দেখে রুহির বুকের ভেতরটা কেন জানি একটু মোচড় দিয়ে উঠল। গত কয়েকদিন ধরেই সে লক্ষ্য করছে, শাহাজ তার সেই কালো জিপ গাড়িটি নিয়ে বের হচ্ছে না। বা তা নিয়ে বাড়ি ফিরছেনা। ওইদিনও তার সামনে শাহাজ রিকসা নিয়েই ভার্সিটি গিয়েছিলো। এর পেছনে অবশ্য একটি মানবিক কারণ আছে, যা রুহি গতকালই মা আর বড় মা’র কথোপকথন থেকে আড়চোখে শুনেছিল।
তানজিনা বেগমের ভাষ্যমতে, শাহাজ যখন অনিকের ফ্ল্যাটে ছিল, তখন অনিকের সাথেই সে থাকত। অনিক পেশায় ডাক্তার হওয়ায় প্রায়ই গভীর রাতে বা ইমারজেন্সি প্রয়োজনে তাকে হাসপাতালে দৌড়াতে হতো । এদিকে শাহাজ বাড়িতে ফিরে আসায় অনিকের ইদানিং এ যাতায়াতে খুব সমস্যা হচ্ছিল। বন্ধুর সেই অসহায়ত্বের কথা ভেবে শাহাজ নিজের গড়িটি অনিককে ব্যবহার করতে দিয়ে দিয়েছে। এমন নয় যে শাহাজ গাড়িটি একদমই আনছে না, মাঝেসাঝে বিশেষ প্রয়োজন পড়লে নিয়ে আসে; কিন্তু অনিকের ইমারজেন্সি ডিউটির কারণে গাড়িটি বেশিরভাগ সময় তার কাছেই থাকে।
এদিকে শাহাজ এতক্ষণ খেয়াল না করলেও, দরজার কাছে আসতেই পিয়াসের সেই নতুন চকচকে বাইকটি তার নজরে পড়ল। মুহূর্তের জন্য শাহাজের বুকের ভেতরটা কেন যেন মোচড় দিয়ে উঠল, মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল এক তপ্ত দীর্ঘশ্বাস। যেন অনেকদিন আগে হারিয়ে ফেলা খুব প্রিয় কোনো কিছুর দহন তাকে আবারও গ্রাস করল। সেই বিভীষিকাময় দিনটির কথা মনে পড়ে গেল, যখন তার অতি প্রিয় বাইকটি চোখের সামনেই জ্বলে-পুড়ে ছারখার হয়ে গিয়েছিল। সেই ঘটনার পর সে আর কোনোদিন বাইক কেনেনি, এমনকি অন্য কারো বাইকে চড়তেও তার পিত্তি জ্বলে যেত। আজ নিজের বাড়ির আঙিনায় অন্য কারো একটি নতুন বাইক দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পুরনো ক্ষতগুলো যেন নতুন করে জেগে উঠল।
শাহাজ ধীর পায়ে বাইকটির একদম সামনে এসে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে খুব আলতোভাবে বাইকটির গায়ে হাত ছোঁয়াল সে। এক সময়ের তুখোড় বাইকার শাহাজের স্মৃতিতে ভিড় করল তার শখের বাইক নিয়ে ঝড়ের বেগে ছুটে চলা আর হাজারো স্মৃতির মহাকাব্য। কিন্তু সেই ঘোর বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। পাশ থেকে ভেসে আসা এক উজ্জ্বল কণ্ঠ তার ভাবনায় ছেদ ফেলল।
"বাইকটা দেখতে দারুণ না ভাই? একদম লেটেস্ট মডেল, চলে একদম মাখনের মতো!"
পিয়াস একগাল হাসি নিয়ে ঠিক শাহাজের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। শাহাজকে নিজের বাইকের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে বেশ উৎসাহের সাথে এগিয়ে এসে বলল, "একবার চালিয়ে দেখবে নাকি ভাই? মনের মতো একটা জিনিস, এক রাউন্ড দিয়ে দেখ অন্তত।" পিয়াসের গলার স্বরে একধরণের জয়ের আনন্দ থাকলেও শাহাজ যেন তা গায়ে মাখল না। সে হাত সরিয়ে নিয়ে খুব শীতল কিন্তু মার্জিত একটা হাসি দিয়ে বলল—
"আমার অন্যের জিনিসপত্রে তেমন একটা নজর নেই পিয়াস। তোর জিনিস তুইই উপভোগ কর।"
কথাটি বলেই শাহাজ আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে গটগট করে ঘরে প্রবেশ করল। এদিকে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে রুহি প্রতিটি কথা আর দৃশ্য নিখুঁতভাবে অবলোকন করছিল। শাহাজের সেই প্রত্যাখ্যান আর বাইকের দিকে তাকানোর ধরন দেখে রুহির বুকটা জ্বলে উঠলো। সে জানে, শাহাজের প্রিয় বাইকটি হারিয়ে যাওয়ার পেছনে কোথাও না কোথাও সে-ই দায়ী। এতক্ষণ যে পাখি জোড়ার খুনসুটি দেখে সে হাসছিল, তা মুহূর্তেই মিলিয়ে গিয়ে রুহির চোখে জল আসার উপক্রম হলো। একরাশ অপরাধবোধে সে যেন ভেতরে ভেতরে কুঁকড়ে গেল।
এদিকে শাহাজ ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখল ড্রয়িংরুমে এক উৎসবমুখর পরিবেশ। বাড়ির বড়রা এবং মুগ্ধ সবাই কমবেশি রেডি হয়ে সোফায় বসে আছেন। শুধু নেই পুরুষ সদস্যরা আর রুবি, রুহি ও রিমু। শাহাজ সোজা তার মায়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, "কোথায় যাচ্ছ তোমরা সবাই?"
ছেলের কথায় তানজিনা বেগম এক অমায়িক হাসি দিয়ে বললেন, "পিয়াস নতুন বাইক নিয়েছে বাবা, সেই খুশিতে আজ আমাদের সবাইকে বাইরে নিয়ে যাবে ডিনারের জন্য।"
শাহাজ একবার উপস্থিত সবার দিকে নজর বুলাল। মমতাজ বেগম, ইয়াসমিন বেগম ও নাসরিন বেগম আর মুগ্ধ—সবার চোখেমুখেই এক নির্মল আনন্দ। হঠাৎই নাসরিন বেগম হেসে উঠে বললেন, "জানি না কার কেমন লাগছে শাহাজ বাবা, কিন্তু আমার তো খুব ভালো লাগছে। অন্তত কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও আজ রান্নাঘর থেকে ছুটি পাওয়া যাবে!"
সেঝ মায়ের মুখে এমন সরল স্বীকারোক্তি শুনে শাহাজও হালকা একটু হাসল। সে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে সোফায় বসে থাকা মমতাজ বেগমের পাশে গিয়ে ধপ করে বসল। বাইরের সেই তিক্ততা সে ভেতরে কাউকেই বুঝতে দিল না, কিন্তু তার গম্ভীর শান্ত ভাবটি ঘরের কোলাহলের মাঝেও যেন এক আলাদা অস্তিত্ব জানান দিচ্ছিল।
★★★
এদিকে খাটের এক কোণে নির্জীবের মতো বসে আছে রুহি। তার মস্তিষ্কের পর্দায় তখন বারবার একটি দৃশ্যই সিনেমা রিলের মতো ঘুরপাক খাচ্ছে—বাইকের পাশে দাঁড়ানো শাহাজের সেই বিষণ্ণ অবয়ব। শাহাজ যখন পিয়াসের বাইকটিতে হাত ছুঁইয়েছিল, সেই মুহূর্তের শূন্যতা আর দীর্ঘশ্বাস রুহিকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে। নিজের অজান্তেই তার চোখ দুটো ভিজে এল।
ঠিক সেই মুহূর্তে বেজে উঠল তার ফোনটা। মেসেজ আসার পরিচিত শব্দ —টুং-টুং । কিন্তু রুহির কোনো প্রতিক্রিয়া নেই; সে যেন এক গভীর ঘোরের মধ্যে ডুবে আছে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর আবারো টুং করে আরেকটি নোটিফিকেশন বেজে উঠতেই সে বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে ফোনের দিকে তাকাল। সেই অপরিচিত নম্বর যা থেকে রুহি মেছেজ পেয়ে থাকে!
অতঃপর এতক্ষণ নিজের ওপর আর শাহাজের পরিস্থিতির ওপর থাকা সবটুকু ক্ষোভ গিয়ে পড়ল ওই অচেনা মেসেজদাতার ওপর। মনে মনে একগাদা গালি আর বিরক্তি নিয়ে রুহি দাঁতে দাঁত চেপে ভাবল—মানুষটার কি আর কোনো খেয়েদেয়ে কাজ নেই? এই উটকো ঝামেলাটা এখন সহ্য হচ্ছে না আর। রুহি ঠিক করল, আজ সে কড়া গলায় এই মানুষটাকে কিছু কথা শুনিয়ে দেবে যাতে আর কখনো তাকে বিরক্ত করার সাহস না পায়। এটা ভেবেই সে মাত্রই মেসেজ অপশনে ঢুকতে যাবে, ঠিক তখনই দরজার ওপার থেকে মুগ্ধর চিৎকারে তার চিন্তার সুতো ছিঁড়ে গেল। দরজা ভেতর থেকে আটকানো থাকায় মুগ্ধ সমানে চেঁচিয়ে যাচ্ছে, "রুহিপু! ও রুহিপু! দরজা খোল!"
মুগ্ধের ডাকে রুহি মোবাইলটি বিছানাতেই ছুঁড়ে ফেললো অতঃপর অনিচ্ছাসত্ত্বেও উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই মুগ্ধ হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকল। রুহিকে এখনো ঘরোয়া পোশাকে আলথালু অবস্থায় দেখে মুগ্ধর মুখটা হা হয়ে গেল। সে চোখ বড় বড় করে বলল, "একী আপুনি! তুমি এখনো রেডি হওনি কেন? দেখো, আমরা সবাই নিচে রেডি হয়ে বসে আছি আর তুমি এখনো সেই আগের বেশেই বসে আছো! চলো চলো, জলদি করো।"
রুহি খুব স্বাভাবিকভাবেই জবাব দিল, "আমি কোথাও যাব না মুগ্ধ। শরীরটা খুব একটা ভালো লাগছে না, তোরা গিয়ে ঘুরে আয়।"
মুগ্ধ যেন আকাশ থেকে পড়ল। "তুমি যাবে না মানে? বাড়িতে কি একা একা থাকবে নাকি? সবাই তো রেডি হয়ে নিচে চলে এসেছে।"
মুগ্ধ অনেকক্ষণ জোরাজুরি করল। রুহির হাত ধরে টানল, আবদার করল—কিন্তু রুহি তার সিদ্ধান্তে অটল। পিয়াসের নতুন বাইকের সেলিব্রেশনে অংশ নেওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে তার নেই। এক সময় মুগ্ধ হাল ছেড়ে দিল। ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে গজগজ করে বলে উঠল, "ঠিক আছে, যেও না। আমি গিয়ে শাহাজ ভাইকে বলে দিচ্ছি যে তুমি আমাদের সাথে যাচ্ছ না!"
'শাহাজ ভাই' নামটা কানে যেতেই রুহির পুরো শরীরে যেন বিদ্যুতের ঝিলিক খেলে গেল। সে অবাক হয়ে পেছন থেকে মুগ্ধকে ডাকল, "এই মুগ্ধ! শাহাজ ভাইকে বলবি মানে? তোরা না পিয়াস ভাইয়ের সাথে যাচ্ছিস? তোদের সাথে শাহাজ ভাইও যাচ্ছে নাকি?"
মুগ্ধ পেছন ফিরে উদাস গলায় বলল, "পিয়াস ভাইয়ের সাথে যাওয়ার কথা ছিল ঠিকই। কিন্তু ওনার নাকি হঠাৎ কী এক জরুরি কাজ পড়ে গেল, তাই আমাদের রেখেই কোথায় যেন বেরিয়ে গেলেন। আমাদের সবার মন খারাপ দেখে শাহাজ ভাই এখন আমাদের সবাইকে নিয়ে বেরোচ্ছে।"
মুগ্ধর কথা শেষ হওয়ার আগেই রুহির চোখের মণি খুশিতে চিকচিক করে উঠল। পিয়াস নেই, বদলে শাহাজ ভাই সাথে যাবে—এই তথ্যটি রুহির ভেতরের সব ক্লান্তি আর অসুস্থতা নিমেষেই উড়িয়ে দিল। মুগ্ধ দরজার দিকে পা বাড়াতেই রুহি হুরমুড় করে বলে উঠল, "মুগ্ধ, শোন! দশটা মিনিট অপেক্ষা কর, আমি আসছি।"
মুগ্ধ অবাক হয়ে ফিরে তাকাল। "সত্যি যাবে তুমি? এই না বললে তোমার শরীর খারাপ?"
রুহি একটু আমতা আমতা করে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, "আরে... ইয়ে... ওই একটু হালকা মাথা ধরেছে তো, একটা প্যারাসিটামল খেয়ে নেব, সব ঠিক হয়ে যাবে। তুই নিচে গিয়ে বল আমি দশ মিনিটে আসছি।"
রুহির কথা শুনেই মুগ্ধর মুখে চওড়া হাসি ফুটে উঠল। সে দ্রুত নিচে নেমে গেল খবরটা দিতে। ওদিকে রুহি এক মুহূর্ত দেরি না করে আলমারি খুলে নিজের সবচেয়ে পছন্দের জামাটা বের করল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে পরিপাটি করে সাজিয়ে তোলার সে কী এক উন্মাদনা! শাহাজ ভাইয়ের সাথে ঘুরতে যাওয়ার এই সুবর্ন সুযোগ সে কোনোভাবেই হাতছাড়া করতে চায় না।
এদিকে মুগ্ধ সিঁড়ি দিয়ে নেমেই সোফায় বসে থাকা সবার উদ্দেশ্যে ঘোষণা করল, "রুহিপু আসছে, বলেছে দশটা মিনিট অপেক্ষা করতে। ওর দশ মিনিট সময় লাগবে।" মুগ্ধের কথা মতে সবাই রুহির জন্য অপেক্ষা করতে রাজি হলো। এদিকে শাহাজও ততক্ষনে ওপর থেকে ফ্রেশ হয়ে নেমে এসেছে; পরনে তার কালো রঙের একটি পোলো শার্ট, যা তার বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বে এক আভিজাত্যের ছাপ ফেলেছে।
রুহি বলেছিল দশ মিনিট, কিন্তু পাক্কা পনেরো মিনিট পর সে যখন সিঁড়ি দিয়ে নামল, ড্রয়িংরুমের আড্ডা যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল তার আগমনে। রুহির পরনে হালকা মিষ্টি রঙের একটি জর্জেট সেলোয়ার-কামিজ। কামিজের হাতা আর ওড়নার পাড়ে থাকা সূক্ষ্ম কাজের সাথে তাল মিলিয়ে সে তার কার্লি চুলগুলো একপাশে ছেড়ে রেখেছে, যা তার কাঁধ বেয়ে নিচে নেমে এসেছে। সাজগোজ বলতে শুধু চোখে সামান্য কাজল আর ঠোঁটে হালকা গোলাপি আভা।
এদিকে রুহিকে দেখা মাত্রই নাসরিন বেগম একটু ঝঝাঁলো স্বরে বলে উঠলেন, "কত দেরি করলি বল তো? এতোক্ষন লাগে নিচে নামতে? সবাই তোর জন্য কখন থেকে বসে আছে।" কিন্তু হঠাৎই তানজিনা বেগম এগিয়ে এসে নাসরিনকে থামিয়ে দিলেন। তিনি পরম মমতায় রুহির গালে হাত রেখে বললেন, "আহা সেজো বউ, মেয়েটাকে বকিও না তো। দেখো, কত সুন্দর লাগছে আমার লক্ষ্মী মা-টাকে!" পাশ থেকে ইয়াসমিন বেগমও মাথা নেড়ে সায় দিলেন।
শাহাজ রুহি নামার পর একবারও তার দিকে সরাসরি তাকাল না। সে ঘড়ি দেখে গম্ভীর কণ্ঠে সবাইকে তাড়া দিতে লাগল, "অনেক রাত হয়ে যাচ্ছে, চলো সবাই।"
একসময় একে একে বাড়ির সবাই বেরিয়ে গাড়িতে গিয়ে বসল। শাহাজ এসে ড্রাইভিং সিটে বসেই মোস্তফা কামালকে তাদের গন্তব্যের লোকেশন মেসেজ করে দিল। সবার সামনে ড্রাইভিং সিটে শাহাজ, তার পাশের সিটে মুগ্ধ। পেছনের সিটে মমতাজ বেগম, তানজিনা বেগম, রুবি আর রুহি। বাকিরা পেছনে।
রুহি বসেছে একদম সিটের মাঝ বরাবর যার ফলে গাড়ির রিয়ার-ভিউ মিররে তার প্রতিচ্ছবি একদম দৃশ্যমান। আর যা শাহাজের নজর এড়ালো না। এক সময় গাড়ি চলতে শুরু করলো, আর পুরো যাএাতে শাহাজের নজর ছিলো রিয়ার-ভিউ-মিররে। সময় গড়িয়ে গাড়ি শহরের কোলাহল ছাড়িয়ে একটু দূরে নির্জন এক ছাদখোলা রেস্টুরেন্টের সামনে এসে থামল। রেস্টুরেন্টের প্রবেশপথ থেকেই নজরে এল চমৎকার আলোকসজ্জা আর সবুজের সমারোহ। লিফটে করে ছাদে উঠতেই সবাই যেন মুগ্ধ হয়ে গেল। খোলা আকাশের নিচে মৃদু বাতাস আর শহরের ঝিকমিকে আলোয় পরিবেশটা ছিল দেখার মতো। এসেই মুগ্ধ, রিমু আর রুবি সাথে সাথেই সেলফি তোলায় মত্ত হয়ে গেল। এর মধ্যেই মোস্তফা কামালরাও সেখানে এসে পৌঁছালেন।
সবাই বড় একটি টেবিল ঘিরে বসার পর মেনু কার্ড এল। তবে শাহাজ কাউকেই কষ্ট করতে দিল না। সে নিজেই সবার রুচি আর পছন্দ অনুযায়ী খাবারের অর্ডার দিল। রুহির খুব ইচ্ছে ছিল মেনুতে থাকা 'চকোলাভা কেক উইথ ভ্যানিলা আইসক্রিম' খাওয়ার। কিন্তু নাসরিন বেগমের কড়া শাসন আর তার ঠান্ডার সমস্যার কথা ভেবে সে মুখ ফুটে কিছুই বলতে পারল না।
খাবার টেবিলে আসার আগে মোস্তফা কামাল সাহেব সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "সবাই যার যার ফোন সাইলেন্ট করো। পরিবারের সবাই সাথে আছি, এই সুন্দর সময়টাতে যেন কারো জন্য কোনো রকম ডিস্টার্ব না হয়।"
সবাই মোস্তফা কামালের আদেশ মেনে সাথে সাথেই ফোন সাইলেন্ট করে রাখল। এক সময় খাবার এলো, মূল খাবার শেষ করে যখন ডেজার্ট পরিবেশন করা হলো, রুহি তো অবাক! তার এবং মুগ্ধের প্লেটে ঠিক সেই 'চকোলাভা কেক উইথ আইসক্রিম'ই এসেছে। রুহির চোখ-মুখ খুশিতে ঝলমল করে উঠল। সে ভাবল এটা হয়তো নিছকই কাকতালীয়, কিন্তু অন্যপাশে আড়ালে শাহাজ রুহির সেই অমলিন হাসি দেখে নিজের অজান্তেই একটু মুচকি হাসল।
খাওয়া শেষ করে সবাই যখন রেস্টুরেন্টের এক এক কোণে গল্পগুজব আর ঘোরাঘুরিতে ব্যস্ত, রুহি হঠাৎ দেখল শাহাজ একদম এক কোণে নির্জন জায়গায় দাঁড়িয়ে দূর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে আছে। রুহি চারপাশে একবার চোখ বুলাল; সবাই যার যার মতো ব্যস্ত দেখে সে পা টিপে টিপে শাহাজের দিকে এগিয়ে গেল।
একটু দূরত্ব রেখে রুহি যখন দাঁড়াল, তখনই সেই চিরচেনা পারফিউমের মিষ্টি আর মাদকতাময় সুবাস তার নাকে এসে লাগল। রুহি যেন এক নিমেষেই আবেশে বিভোর হয়ে গেল। এদিকে শাহাজ একবারও না তাকিয়েই বুঝলো তার ঠিক পাশে কে দাঁড়িয়েছে। কারন কিছু অনুভূতি না দেখেই অনুভব করা যায়। আর রুহি হলো শাহাজের জীবনে ঠিক তেমনই এক অনুভূতি। রুহি শাহাজের পাশে দাড়িয়েছে কিছু সময় অতিবাহিত হলো, রুহিও শাহাজকে অনুসরণ করে দূরে তাকিয়ে। কিন্তু হঠাৎই শাহাজের সেই চিরচেনা গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল—
"এখানে কী চাই?"
শাহাজের হঠাৎ প্রশ্নে রুহি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে সম্বিৎ ফিরে পেল। সে কি বলবে ভেবে না পেয়ে আশেপাশে তাকালো হঠাৎই নিচে তাকাতেই তার চোখ পড়লো একটি কালো বাইকের দিকে। এবার রুহি একটু সাহস সঞ্চয় করে মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—
"শাহাজ ভাই, আপনি নতুন বাইক কিনছেন না কেন? আপনার সেই কালো বাইকটার কথা আমার খুব মনে পড়ে।"
রুহির প্রশ্নে শাহাজ নিরুত্তর রইল, কিন্তু তার চোখের দৃষ্টিতে যেন এক মুহূর্তের জন্য পুরোনো স্মৃতির ঝিলিক খেলে গেল। হঠাৎই শাহাজ বেশ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতেই বলে উঠলো, "বাইকটা নষ্ট করেছে তোর বড় আব্বু জনাব মোস্তফা কামাল সাহেব। তাকে বল নতুন একটা কিনে দিতে। আমার কি টাকার গাছ আছে নাকি যে নষ্ট করবো? "
এদিকে রুহি স্তব্ধ, রুহির স্তব্ধ ভাব দেখে শাহাজ আবার যোগ করল, "আর তোর যদি বাইকটার জন্য খুব আফসোস হয়ে থাকে, তবে একটা কাজ করতে পারিস—তুই-ই না হয় আমাকে একটা বাইক কিনে দিলি! আফটার-অল মোস্তফা কামাল সাহেবের আদরের ভাইঝি বলে কথা "
আকস্মিক শাহাজের মুখে এমন কথা শুনে রুহি প্রথমে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে তুললো। সে একটু সাহস সঞ্চয় করে ভ্রু নাচিয়ে বলে উঠল, "ঠিক আছে শাহাজ ভাই, আপনার কথামতো আমি না হয় আপনাকে বাইক কিনে দিলাম। কিন্তু আমারও একটা শর্ত আছে। সেটা কি আপনি পালন করতে পারবেন?"
শাহাজ এবার ভ্রু কুঁচকে রুহির দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন করল, "কী শর্ত?"
রুহি মিষ্টি করে হেসে দুষ্টামির ছলে বলল, "আপনাকে আমায় বাইক চালানো শেখাতে হবে। তবেই আমি আপনাকে বাইক কিনে দেব।"
রুহির কথা শেষ হতেই শাহাজের মুখাবয়ব মুহূর্তেই কঠোর হয়ে উঠল। সে রুহির চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর স্বরে বলল, "সাহস কি একটু বেশি হয়ে গেছে তোর? বাইক চালানো শিখবি তাও আমার থেকে?"
শাহাজের গলার স্বর আর চাউনির হঠাৎ পরিবর্তনে রুহির বুকের সবটুকু সাহস এক নিমেষেই যেন জল হয়ে গেল। সে আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস পেল না। কোনোমতে বললো, "আমাকে মনে হয় বড় মা ডাকছে!"
কথাটি বলেই সে মাথা নিচু করে সেখান থেকে সরে এসে একটু দূরে রেলিংয়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। শাহাজ তখনও দূর থেকে রুহির সরে যাওয়া দেখছে, তার চোখেমুখে ফুটে উঠলো এক রহস্যময় মুচকি হাসি।
এদিকে রুহি রেলিং ধরে দূরের শহরের আলোকসজ্জা দেখে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। পরিবেশটা এত সুন্দর যে হঠাৎ তার সেলফি তোলার শখ হলো। ফোন বের করে কয়েকটা অ্যাঙ্গেল থেকে সুন্দর কিছু সেলফিও তুলল সে। সেলফি তোলা শেষ করে ফোনটা ব্যাগে রাখতে যাবে, ঠিক তখনই আবারো মেসেজ আসার শব্দ হলো। রুহি ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখলো আবারও সেই অপরিচিত নাম্বার থেকে একটা মেসেজ এসেছে। কেন জানি রুহির মনে হলো মেসেজটা দেখা দরকার।
সে ইনবক্স ওপেন করতেই তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল! স্ক্রিনে ফুটে উঠেছে তারই একটি ছবি, যা মাত্র কয়েক সেকেন্ড আগে রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে সেলফি নেওয়ার সময় পেছন থেকে তোলা হয়েছে। ছবির নিচে লেখা— "আজ তোমাকে অপ্সরীর মতো লাগছে প্রিয়া।"
আকস্মিক এমন কাণ্ডে রুহির শরীর অপার্থিব এক ভয়ে হিম হয়ে এল। সে দ্রুত পেছন ফিরে তাকাল, কিন্তু সেখানে নিজের পরিবারের সদস্য আর রেস্টুরেন্টের দু-একজন ওয়েটার ছাড়া অপরিচিত কাউকেই দেখল না। হঠাৎ রুহির সন্দেহ হলো ওয়েটারদের মধ্যে কেউ নাই তো। কিন্তু ওয়েটারদেরও সন্দেহ করার কোন কারণ সে দেখছে না কারণ কারো হাতে এই মুহুর্তে ফোন নেই। আর সবার হাতেই ট্রে রাখা যাতে করে তারা তার পরিবারের সদস্যদেরই এটা ওটা পরিবেশন করে চলেছে। আতঙ্কিত রুহি কাঁপাকাঁপা হাতে দ্রুত ওই নাম্বারে মেসেজ পাঠাল, "কে আপনি? আর এই ছবি আপনাকে কে পাঠালো? কোথায় পেয়েছেন আপনি আমার ছবি?"
মুহূর্তের মধ্যেই ওপার থেকে উত্তর এল— "তোমার ছবি কাউকে পাঠাতে হয় না জান , কারণ আমি সেই জন যে তোমার অস্তিত্বে মিশে আছি। তাই তুমি যেখানে, আমিও সেখানে। শুধু সামনে থেকেও অদৃশ্য, স্নিগ্ধ প্রিয়া।"
মেসেজটি পড়েই 'স্নিগ্ধ প্রিয়া' নামটি উচ্চারণ করতেই রুহির মস্তিষ্কে এক পুরোনো নাম হাতুড়ি পেটাতে শুরু করল। সেই নামটি মনে পড়তেই তার শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী হয়ে এল। রুহি অস্পষ্ট স্বরে নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে বলে উঠল—
"আশিক... কাসাফাদ্দৌজা আশিক!"
চলবে__________