#অন্তহীন_প্রেম_আমার
#আফীফা_আফনান
#পর্ব_৪০ (ক)
[কপি করা নিষিদ্ধ]
রাত তখন গভীর, চারপাশ নিস্তব্ধ। রুহি তার ঘরের জানলার পাশে অন্ধকারের মাঝে একা বসে আছে। ঘরের বাতিটাও নেভানো , কেবল হাতের মোবাইলের উজ্জ্বল আলোটা তার চিন্তিত ও বিষণ্ণ মুখে এসে পড়ছে। মনের ভেতর একরাশ অস্থিরতা নিয়ে সে মেসেজ লিখে চলেছে সেই মানুষটিকে, যার নাম মনে পড়লেই তার সারা শরীর এক অজানা আশঙ্কায় শিউরে ওঠে—কাসাফাদ্দৌজা আশিক।
রুহি দ্রুত হাতে টাইপ করল, "আপনি আমার নাম্বার কোথায় পেলেন?"
অপর পাশ থেকে তেমন কোনো উত্তর নেই। রুহি ফোনের স্ক্রিনের দিকে আগ্রহ তাকিয়ে আছে, কিন্তু কোনো টাইপিং স্ট্যাটাস দেখা যাচ্ছে না। রুহির ধৈর্য যেন বাঁধ মানছে না। সে আবারও লিখল—
"জবাব দিচ্ছেন না কেন? কোথায় পেয়েছেন আমার নাম্বার? কে দিয়েছে আপনাকে? আর আপনি এভাবে আমার পিছু কেন নিচ্ছেন? আপনি কি কোনোভাবে আমাকে স্টক করছেন?"
কয়েক মিনিট পার হওয়ার পর ফোনের স্ক্রিনটা এবার জ্বলে উঠল। ওপার থেকে মেসেজ এল। কোনো কৈফিয়ত নেই, নেই কোনো ভয়, আছে শুধু এক অদ্ভুত অধিকারবোধ। আশিক লিখেছে—
"হৃদয়ে যার স্থায়ী বসত, তাকে কি আর খুঁজতে হয়? ভালোবাসা থাকলে পিছু নিতে হয় না ; ভালোবাসার মানুষটির ছায়া কোথায় পড়ছে, তা বাতাসের গন্ধেই ভেষে আসে, তাতে চোখ জোড়া যদি বন্ধও থাকে তবু চেনা যায়। তাই তুমি যেখানেই যাও, আমার অস্তিত্ব তোমার চারপাশেই মিশে থাকে।"
মেসেজটি পড়ে রুহির কপালে ভাঁজ পড়ল। এই মানুষটি কি পাগল, নাকি কোনো ভয়ংকর নেশায় আচ্ছন্ন? সে আবারও রাগী স্বরে মেসেজ করল, "আপনার এই সব কাব্যিক কথা শুনতে আমি আসিনি। সোজাসুজি বলুন, আপনি আমার এতোটা কাছে আসার সাহস পান কোত্থেকে? আপনার উদ্দেশ্য কী?"
আশিকের দিক থেকে এবার দ্রুত রিপ্লাই এল—
"উদ্দেশ্য খুব সহজ। তোমাকে শুধু এটা জানানো যে, তুমি কখনো একা নও। মনে রাখবে অন্ধকার রাতেও তোমার ঘরের ওই জানলায় কারো অদৃশ্য চোখ পাহারা দেয়। এই যে তুমি এখন অন্ধকারে বসে আছো, অতিরিক্ত টেনশনে দাঁত দিয়ে নখ কাটছো, সেই সাথে তোমার অবাধ্য চুলগুলো কপালে এসে পড়ছে—এই দৃশ্যটা দেখার জন্য আমার কোনো ক্যামেরার প্রয়োজন নেই, আমার হৃদয়ের আয়নাতেই তোমার প্রতিচ্ছবি ভাসে।"
মেসেজটি পড়ার সাথে সাথে রুহি ঝট করে জানলার বাহিরে তাকালো কিন্তু নাহ কাউকেউ বাহিরে দেখলোনা, তবুও সে জানালার কাছ থেকে সরে এল। তার পুরো শরীর ঘামতে শুরু করেছে। এই মানুষটি কি সত্যি আশেপাশে কোথাও আছে? নাকি সে রুহির প্রতিটি অনুভূতি আগে থেকেই টের পেয়ে যায়? নাকি নিছকই আন্দজ করে কথাগুলো বলছে?
রুহি আর কোনো মেসেজ করার সাহস পেল না, কেবল ফোনটা বুকের কাছে চেপে ধরে অন্ধকারের মাঝে নিজের দ্রুত হৃৎস্পন্দনের শব্দ শুনতে লাগল।
কিছুটা সময় এভাবেই কাটলো, কিন্তু হঠাৎই রুহির ফোনের স্ক্রিনটা আবার জ্বলে উঠল। রুহি কাঁপাকাঁপা হাতে ফোনটা তুলে নিতেই দেখল মেসেজ— "ভয় পেয়ে গেলে নাকি জান?"
'জান' শব্দটা দেখা মাত্র রুহির মাথার রগ চনমন করে উঠল। ভয়ের জায়গাটা মুহূর্তেই দখল করে নিল প্রচণ্ড ক্রোধ। এত বড় সাহস! দাঁতে দাঁত চেপে রুহি টাইপ করতে শুরু করল— "নাক বরাবর একটা ঘুষি মেরে একদম জান বের করে দেব অসভ্য ইতর! চার বছর ধরে আপনি আমাকে বিরক্ত করছেন। আগে উদ্ভট সব চিঠি দিয়ে করতেন, এখন সরাসরি নাম্বারে মেসেজ করছেন? আর একবার যদি আমাকে মেসেজ দিয়েছেন তো সোজা পুলিশের কাছে যাব। আপনি আমার পরিবারকে চেনেন না? একদম জেলের ভাত খাইয়ে ছাড়বে আপনাকে! আর কখনো যদি আমার পিছু নিয়েছেন তো আপনার একদিন কি আমার একদিন! বস্তা পচা আলু কোথাকার!"
মেসেজটা সেন্ড হওয়া মাত্রই এক মুহূর্ত দেরি না করে রুহি নাম্বারটা ব্লক লিস্টে ফেলে দিল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা বিছানায় ছুড়ে ফেলল সে। নাম্বারটা ব্লক করতে পেরে মনের ভেতর যেন এক পশলা পরম শান্তি নেমে এসেছে তার।
এরপরেই রুহি আরও একবার জানলার বাইরে উঁকি দিলো। নাহ বাইরে কারো অস্তিত্ব নেই, শুধু ঘুটঘুটে অন্ধকার আর নিঝুম নিস্তব্ধতা; এমনকি গাছের একটা পাতা নড়ার শব্দও নেই। রুহি ভালোভাবে সবটা পরখ করেই দ্রুত জানলার ভারী পর্দাটা টেনে দিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল।
রেস্টুরেন্টের সেই মায়াবী পরিবেশে নিজের অগোচরে তোলা ছবিটা দেখার পর থেকে রুহির মনের ওপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে গেছে, তা কেবল সে-ই জানে। ওই ঘটনার পর বাকিটা সময় সে আর প্রাণখুলে হাসতে পারেনি, এমনকি শাহাজের সাথে সেই খুনসুটিও তিতা মনে হয়েছে। সারাক্ষণ মনে হচ্ছিল কোনো এক অদৃশ্য চোখ তাকে বিঁধছে। অবশেষে মোস্তফা কামালের নির্দেশে যখন সবাই বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল, পুরোটা পথ রুহি একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি। পাথরের মতো নিশ্চুপ হয়ে গাড়ির জানলার বাইরে তাকিয়ে ছিল সে।
বাড়ি ফিরে সেই যে টেনশন নিয়ে রুমে ঢুকেছিল, এখন ব্লক করার পর মাথাটা কিছুটা হালকা মনে হচ্ছে তার। এদিকে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই রুহির চোখের পাতা দুটো যেন ভার হয়ে আসছে। তাই রুহি কোনমতে একটা পাতলা কাঁথা টেনে নিজের শরীরটা ঢেকে নিল। অন্ধকারের চাদরে ঢাকা ঘরটাতে ফ্যানের’র মৃদু গুঞ্জন ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। দিনের সব ক্লান্তি আর উৎকণ্ঠাকে পিছে ফেলে রুহি যেন বিছানায় শোয়ার সাথে সাথেই এক সময় গভীর ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেল।
~~~~~ নিশুতি রাত। রুহি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তার কক্ষের ভেতর এখন কেবল ফ্যানের-র মৃদু গুঞ্জন আর শান্ত নিশ্বাসের শব্দ। ঠিক ঘণ্টাখানেক পর, দরজার পাল্লাটা একচুল পরিমাণ শব্দ না করেই হঠাৎ খুলে গেল। অন্ধকারের বুক চিরে ভেতরে প্রবেশ করল এক দীর্ঘ ছায়ামূর্তি—শাহাজ।
শাহাজের প্রতিটি পদক্ষেপ এতটাই হিসেবি আর সতর্ক যে, মনে হচ্ছে বাতাসের অণুরাশিও তার উপস্থিতির টের পাচ্ছে না। সে অতি সাবধানে রুহির বিছানার পাশে রাখা ছোট মোড়াটা টেনে বসল। তার এক হাতে একটি স্কেচ খাতা, আর অন্য হাতে একটি পেন্সিল। রুমের ভেতর আলো বলতে জানলার পর্দার ফাঁক দিয়ে আসা মরা চাঁদের আলোটাই উপস্থিত। আর যা রুহির ঘুমন্ত মুখে পড়ে যেন এক অপার্থিব স্নিগ্ধতা তৈরি করেছে। শাহাজ রুমে প্রবেশ করেই সেই স্নিগ্ধতার দিকে কয়েক মুহূর্ত স্থির চোখে তাকিয়ে রইল। তার চোখে এখন কোনো কঠোরতা নেই, আছে কেবল এক অতলান্ত তৃষ্ণা। অতঃপর শাহাজ খাতাটা খুলে পেন্সিল চালাতে শুরু করল। খসখস করে অতি সূক্ষ্ম শব্দে কাগজের বুকে রুহির ঘুমন্ত প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠতে লাগল। শাহাজের হাতের কাজ এতটাই নিপুণ আর ছন্দময় যে বোঝা যায়, এই মুখচ্ছবি আঁকতে সে দীর্ঘকাল ধরে অভ্যস্ত। রুহির বন্ধ চোখের পাতা, কপালে লেপ্টে থাকা অবাধ্য চুলের গোছা আর ঠোঁটের সেই শান্ত ভঙ্গি—সবকিছুই শাহাজ তার পেন্সিলের ডগায় পরম মমতায় বন্দি করে নিচ্ছে। প্রতিটি রেখায় যেন মিশে আছে কোনো এক অব্যক্ত হাহাকার।
এদিকে প্রায় অনেকটা সময় পার হওয়ার পর শাহাজ তার খাতাটা বন্ধ করল। স্কেচ করা শেষ হলেও তার মন যেন এই ঘর ছেড়ে যেতে চাইছে না। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে সে ধীরপায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। ঠিক দরজার চৌকাঠে পৌঁছে সে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। কী এক অজানা মায়ায় আবারও পেছন ফিরে ঘুমন্ত রুহিটাকে শেষবারের মতো দেখে নিল। এক মুহূর্তের সেই চাউনিতে ছিল এক পৃথিবী সমান আগলে রাখার আকুতি।
অতঃপর শাহাজ বেরিয়ে গেল। নিঃশব্দে দরজার পাল্লাটাও আগের মতোই লেগে গেল। রুহি টেরও পেল না যে তার শিয়রে বসে কেউ একজন প্রেমের এক নীরব মহাকাব্য লিখে দিয়ে গেছে। শাহাজ চলে গেলেও নিঝুম ঘরটাতে রেখে গেল তার উপস্থিতির সেই চিরচেনা, হালকা মিষ্টি আর মাদকতাময় সুগন্ধ। ঘুমের ঘোরেই রুহি অবচেতনে যেন সেই চেনা সুবাসটুকু অনুভব করে আরও একটু প্রশান্তিতে তলিয়ে গেল।
★★★
রাত পেরিয়ে সকাল হলো। ভোরের স্নিগ্ধ আলো জানলার পর্দা ভেদ করে ঘরে এলেও রুহির মনে বিন্দুমাত্র শান্তি নেই। সে একরাশ বিরক্তি আর বিস্ময় নিয়ে খাটের ওপর বসে আছে। কারন আজ সকালে তার ঘুমটা ভেঙেছে খুব তীক্ষ্ণ আর কর্কশ এক শব্দে; মনে হচ্ছে কেউ হাতুড়ি দিয়ে অনবরত শক্ত কিছু ভাঙছে। কিন্তু রুহির বিরক্তির আসল কারণ অন্য জায়গায়। গত রাতে যে নম্বরটিকে সে পরম তৃপ্তিতে ব্লক করেছিল, আজ সকালে সেই নম্বর থেকেই মোবাইলে ভেসে এসেছে— ‘গুড মর্নিং জান’।
রুহির মাথায় কিছুতেই ঢুকছে না এটা কীভাবে সম্ভব! ব্লক করা নম্বর থেকে মেসেজ আসার এই অলৌকিক ঘটনায় সে আগে দেখেনি। তার ওপর জান শব্তটি দেখেই সে আরো ক্ষোভে ফেটে পড়ল। বিরক্তি নিয়ে আবারও নম্বরটিকে ব্লক করে সে বিছানা ছাড়ল। এদিকে এতো সকালে হঠাৎ হাতুড়ির সেই শব্দটা তার কৌতূহল যেন বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই তো রুহি রুম থেকে বেরিয়ে শব্দ লক্ষ্য করে এগোতেই সে দেখল, বাড়ির একদম সাইডের সেই পরিত্যক্ত স্টোর রুম, যা বছরের পর বছর বন্ধ থাকে, খুব প্রয়োজন না হলে কেউ এর ভেতরেও যায় না, আজ সেখান থেকেই শব্দগুলো আসছে।
রুহি কৌতূহলী পায়ে রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। হাত উঁচিয়ে দরজাটায় হালকা ধাক্কা দিলো কিন্তু বুঝলো দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। কৌতুহল দমাতে না পেরে সে ভেতরে কি হচ্ছে তা দেখতে উঁকি দেওয়ার চেষ্টা করতেই পেছন থেকে ভেসে এল সেই গম্ভীর কণ্ঠ— "এখানে কী করছিস তুই?"
আকস্মিক শব্দে রুহি চমকে পেছনে তাকাল। সামনে শাহাজ দাঁড়িয়ে। পরনে তার বাড়ির সাধারণ একটি ধূসর রঙের ঢিলেঢালা টি-শার্ট আর কালো ট্রাউজার। সুঠাম দেহের ওপর ঘরোয়া এই পোশাকেও তার সেই চিরচেনা আভিজাত্য আর গাম্ভীর্য বিন্দুমাত্র কমেনি। সে রুহি থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে আছে, চোখে এক অদ্ভুত তীক্ষ্ণতা।
এদিকে রুহি নজর তুলে শাহাজের চোখের দিকে তাকালো কিন্তু বেশিক্ষণ থাকতে পারল না, দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল। আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল, "ভেতর থেকে এগুলো কিসের শব্দ আসছে শাহাজ ভাই?"
শাহাজ এক চুলও নড়ল না। শীতল গলায় জবাব দিল, "কিসের শব্দ আসছে সেটা তোর জেনে কোনো কাজ নেই। আর এদিকে আসার ও কোন প্রয়োজন নেই।"
শাহাজের এমন কথায় রুহি ভ্রু কুচকালো, অতোপর বিড়বিড় করে বলে উঠলো, "আসতে হবে না এমন ভাবে বলছে যেন ভেতরে গুপ্তধন রেখেছে! আর আমি তা দেখলেই চুরি কররে নিয়ে যাবো।"
"শুধু গুপ্তধন কেন এছাড়াও তুই অনেক কিছুই চুরি করতে ওস্তাদ। যা কেউ কল্পনাও করতে পারে না। আর আমি ভেতরে কি রেখেছি না রেখেছি তা তোকে ভাবতে হবে না। দ্বিতীয়বার যেন তোকে এই রুমের সামনে না দেখি। যা এখান থেকে!" শেষের কথাগুলো একপ্রকার ধমকের সাথেই বলে উঠলো শাহাজ।
আকস্মিক শাহাজের কড়া ধমকে রুহির আত্মা যেন কেঁপে উঠল। সে আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়ানোর সাহস পেল না। একপ্রকার দৌড়ে সেখান থেকে পালিয়ে নিচে নামতে শুরু করলো সে। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে গজগজ করে মনে মনে শাহাজকে বকতে শুরু করল— "সব সময় মুখটা টমেটোর মতো ফুলিয়ে রাখবে! জীবনে মনে হয় হাসেনি লোকটা। এত কঠোর কেন মানুষটা? চেহারা তো মাশাল্লাহ একদম নূরানী, একটু হাসলে কত সুন্দর লাগত! কিন্তু না, তাকে সব সময় গোমড়া মুখ করে থাকতে হবে।"
এমনভাবেই গজগজ করতে করতে রুহি রান্নাঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল দেখলো ভেতরে তানজিনা বেগম, নাসরিন বেগম আর ইয়াসমিন বেগম প্রতিদিনের মতোই সকালের নাস্তা তৈরিতে ব্যস্ত। রুহি গিয়েই তানজিনা বেগমের পাশে গ্যাসের চুলার পাশের স্ল্যাবে পা তুলে বসল। খুব আফসোসের সুরে বলে উঠল, "বড় মা, তোমার ছেলেটা এমন কেন? সব সময় শুধু আমাকে বকে। একটু ভালোভাবে কথা বলে না, কোনো প্রশ্ন করলে উল্টো ধমক দেয়। উনি কি জীবনেও হাসে নি? সব সময় মুখটাকে টমেটোর মতো ফুলিয়ে রাখে, ওনাকে কি তুমি ছোটবেলায় মধু খাওয়াওনি?"
রুহির এমন অদ্ভুত অভিযোগ শুনে তানজিনা বেগম কিছু না বলে শুধু মৃদু হাসলেন। কিন্তু পাশ থেকে ইয়াসমিন বেগম আটা বেলতে বেলতে বললেন, "শাহাজ আগে এমন ছিল না রুহি। বড় হতে হতে গম্ভীর হয়ে গিয়েছে। এখন তোকে বকছে ঠিকই, কিন্তু ছোটবেলায় ও সবার চাইতে তোকে বেশি আদর করত।"
সাথে সাথেই থেকে নাসরিন বেগমও বলে উঠলেন, "এখন এত অভিযোগ করছিস, অথচ ছোটবেলায় তোর সব আবদার নিয়ে তুই তো শাহাজের কোলেই গিয়ে বসতি। একবার ওর কোলে চড়ে বসলে তোকে কোনমতেই আর নামানো যেতো না। যতোক্ষন না তোর আবদার পূরন হচ্ছে। আমি বকলেও শাহাজ ভাইয়ের কাছে গিয়েই নালিশ করতি। শাহাজ ভাই শাহাজ ভাই বলে ওর পিছনে লেজের মতো ঘুরঘুর করতি। শাহাজ-পাগল মেয়ে ছিলি তুই!"
এদিকে রুহি চরম বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলল। "শাহাজ ভাই আমাকে আদর করত? আমি তার পিছন পিছন ঘুরতাম? বিশ্বাসই হয় না!"
নাসরিন বেগম হাতের কাজ করতে করতে হাসলেন। "ছেলেটাকে যে কী পরিমাণ জ্বালিয়েছিস তুই! ওর খাওয়া, ঘুম,পড়াশোনা—সবখানেই তুই থাকতি।"
হঠাৎ এসব কথার মাঝেই তানজিনা বেগমের বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। হাতের কাজ থামিয়ে তিনি আনমনা হয়ে বললেন, "আমার সেই হাস্যোজ্জ্বল শাহাজটা এখন একদম বদলে গেছে। আবার যদি আমি আমার সেই সহজ-সরল ছেলেটাকে ফিরে পেতাম!" ঘরের পরিবেশটা হঠাৎ কিছুটা ভারি হয়ে উঠল।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে রুবির চিৎকার ভেসে এল, "আম্মা, ভার্সিটি যাব, তাড়াতাড়ি নাস্তা দাও!" কয়েক সেকেন্ড পর রিমুর গলাও শোনা গেল একই সুরে। তানজিনা বেগম দ্রুত হাতের কাজ শুরু করলেন।
এদিকে রুহি তার মা আর বড় মা’দের কথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে বসে রইল। তার স্মৃতিতে কেন যেন সেই ছোটবেলার শাহাজ ভাইয়ের আদুরে ছবিগুলো ঝাপসা হয়ে গেছে। বা তার সাথে কাটানো মধূর কোন সময়ের কথাই মনে পড়ছে না।
রুহি যখন বসে বসে স্মৃতির পাতা উল্টানোর চেষ্টা চালাচ্ছে তখনই নাসরিন বেগম তাকে তাড়া দিয়ে বললেন, "এই, তুই এখনো হাত-মুখ ধুসনি তাই না?
রুহি শুধু মাথা নেড়ে 'না' বোঝাল,
"কোচিং যাবি না? যা জলদি তৈরি হয়ে আয়।"
কিন্তু রুহির যেন কোন তাড়া নেই। যেন সে এখনও ছোটবেলার সেই শাহাজ ভাইয়ের ভাবনায় ডুবে আছে।
এদিকে রুহিকে চুপ থাকতে দেখে নাসরিন বেগম আবারও ধমক দিয়ে তাকে হাত মুখ ধুয়ে নাস্তা করার জন্য তাড়া দিলেন।
~~~~~সকালের নাস্তার টেবিলে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা, কেবল চায়ের কাপে চামচের টুংটাং শব্দ শোনা যাচ্ছে। এদিকে মমতাজ বেগম তৃপ্তি করে নাস্তা করছেন, তার একপাশে পাশে বসে রুবি, রুহি আর অন্যপাশে রিমু ও মুগ্ধ। মোস্তফা কামাল সাহেব কিংবা অন্যরা এখনও এসে পৌঁছাননি।
খাওয়ার মাঝেই রুবি হঠাৎ রুহির দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, "রুহি, কাল তো আমাদের ভার্সিটিতে বড় একটা অনুষ্ঠান আছে। রিমুও যাবে এবার তুইও চল আমার সাথে?"
রুহি কৌতূহলী হয়ে তাকাল। রুবি উৎসাহ নিয়ে বলতে শুরু করল, "কাল আমাদের ডিপার্টমেন্টের কালচারাল প্রোগ্রাম। প্রতি বছরই তো হয়, তবে এবার নাকি অনেক বড় আয়োজন। রবীন্দ্রসংগীত থেকে শুরু করে লোকজ নাচ, নাটিকা—সবই থাকছে। পুরো ক্যাম্পাস কাল একদম উৎসবে মাতবে। যাবি নাকি বল?"
মুগ্ধ পাশ থেকে ফোড়ন কাটল, "যাও আপুনি, অনেক মজা হবে।"
কিন্তু রুহি প্রথমে একটু ইতস্তত করে বলল, "নাহ রে রুবি আপু , কাল আবার কোচিং আছে, তার ওপর পড়ার চাপ..."
রুহি আর কিছু বলতে পারলোনা কারন তার আগেই তানজিনা বেগম খাবার বেড়ে দিতে দিতে স্নেহমাখা স্বরে বললেন, "যা না মা, সারাদিন তো ঘরের কোণেই বসে থাকিস। একটু ঘুরে আয়, মনটা ভালো লাগবে।" বড় মা’র কথায় রুহি আর না করতে পারল না। সে মাথা নেড়ে যাওয়ার সম্মতি দিল।
কিন্তু হঠাৎ রুহির মনে এক অদ্ভুত প্রশ্ন জাগল। সে নিচু স্বরে রুবিকে জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা রুবি আপু, শাহাজ ভাই কি ওখানে থাকবে?"
রুবি একটু ভেবে বলল, "নাহ রে, ভাইয়ার ডিপার্টমেন্ট তো আলাদা। এই অনুষ্ঠানটা শুধু আমাদের ডিপার্টমেন্টের জন্য। তবে ভাইয়া থাকলেও থাকতে পারে, কারণ অনেক সময় অন্যান্য ডিপার্টমেন্টের টিচার বা গেস্টদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়। তবে শিওর না।"
ঠিক সেই মুহূর্তে গটগট শব্দে মোস্তফা কামাল সাহেব ডাইনিংয়ে ঢুকলেন। তাঁর কিছুক্ষন পরেই পেছন পেছন এসে উপস্থিত হলো শাহরিয়ার কবির আর শাহাবুদ্দিন সাহেব। ঠিক মিনিট দুয়েকের মাথায় ফরমাল গেটআপে পিয়াস এবং সবশেষে শাহাজ এসে নিজের জায়গায় বসল।
নাস্তা শুরু হতেই মোস্তফা কামাল সাহেব গম্ভীর কণ্ঠে শাহরিয়ার কবিরের দিকে তাকিয়ে বললেন, "কবির কাব্য এখনো ফেরেনি? ওর তো এবার অফিসের হাল ধরা দরকার। আর কতদিন এভাবে ফাঁকিবাজি করবে?"
এদিকে বড় ভাইয়ের কথায় শাহরিয়ার সাহেব চুপ করে রইলেন। তাঁর নিজেরও ছেলের এই খামখেয়ালিপনা একদম পছন্দ না। ছোট ভাইকে চুপ থাকতে দেখে মোস্তফা কামাল আবার বললেন, "জানোই তো ব্যবসার এখন কী অবস্থা। আমাদের পর ওকেই তো সব সামলাতে হবে। বিশেষ করে এই নতুন ডিলটা..."
তিনি একটু থেমে শাহাজের দিকে আড়চোখে তাকালেন অতঃপর শাহাজকে শুনিয়ে শুনিয়েই যোগ করলেন, "এই ডিলটা আমাদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা তোমরা জানো। আমি দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছি এটা সফল করতে। একবার ডিলটা হাতে পেয়ে নিই, তারপর কাউকে আর আমাদের প্রয়োজন পড়বে না। আমি নিজ হাতে কাব্যকে গড়ে তুলব। কাব্যই হবে আমাদের ভবিষ্যতের একমাত্র উত্তরাধিকারী। তাই ওকে বলো একটু দায়িত্বশীল হতে।"
ভাইয়ের কথা শুনে শাহরিয়ার কবির একটু লজ্জায় পড়লেন। এরপরেই স্ত্রী ইয়াসমিনের দিকে তাকিয়ে রাগী স্বরে বলে উঠলেন, "কখন ফিরবে তোমার লাটসাহেব? এত কিসের বন্ধুবান্ধব তার? এখানে-সেখানে ঘুরঘুর করা আর আজ এর বিয়ে তো কাল ওর বিয়ে খেয়ে বেড়ানো ছাড়া তার কি আর কোনো কাজ নেই?"
শাহরিয়ার কবির সাহেব সহজে রাগেন না। কিন্তু যখন রেগে যান বেশি চিৎকার চেচামেচি করেন। আকস্মিক স্বামীর রাগে ইয়াসমিন বেগম একটু ইতস্তত করে বললেন, "আজ-কালের মধ্যেই ফিরে আসবে বলেছে।"
এদিকে ইয়াসমিন বেগমের কথা শেষ হতেই মোস্তফা কামাল সাহেব ইয়াসমিন বেগমের দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন, "মেজো বউ, ও ফিরলে একটু বুঝিয়ে বোলো। এখন যদি না বোঝে, তবে আর কবে বুঝবে?"
ইয়াসমিন বেগম মাথা নিচু করে শুধু বললেন, "জি বড় ভাই। ও আসলেই আমি কথা বলবো।"
এদিকে মোস্তফা কামালের কথাগুলো যে শুধু কাব্যকে নয় অন্য কারোর দিকেও তীরের মতো কারো দিকে ধেয়ে যাচ্ছিল, তা ডাইনিং টেবিলে উপস্থিত সবাই বুঝতে পারছিল। শুধু কেউ প্রকাশ করতে পারলোনা। অপরদিকে মোস্তফা কামাল যেন বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন যে শাহাজকে ছাড়াও তিনি কাব্যকে দিয়ে সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে পারবেন। কিন্তু যাঁর উদ্দেশ্যে এই কথাগুলো বলা, সেই শাহাজ একদম নির্বিকার। তাঁর মুখে কোনো রেখাপাত হলো না, যেন কোনো কথাই তাঁর কানে পৌঁছাচ্ছে না। সে আপন মনে শান্তভাবে নিজের নাস্তা শেষ করে চলেছে। শাহাজের এই পাহাড়ের মতো অটল নীরবতা যেন মোস্তফা কামালের অহংকারে বারংবার ধাক্কা দিচ্ছিল।
★★★
দুপুর বারোটা। রোদের প্রখরতা আকাশ থেকে যেন আগুন ঝরিয়ে দিচ্ছে। রুহি মাত্র কোচিং থেকে ফিরল। তার গায়ের কামিজটা ঘামে ভিজে একদম শরীরের সাথে লেপ্টে আছে, কপালে জমেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। অগোছালো হয়ে আসা কয়েকটা চুল ঘামের কারনে গালে এসে আটকে আছে। গরমে সে এতটাই হাঁপিয়ে উঠেছে যে, ড্রয়িংরুমে ঢুকেই ব্যাগটা কোনমতে রেখে সে সোফায় নিজের শরীরটা এলিয়ে দিল।
পিপাসায় যেন তার বুক ফেটে যাচ্ছে। সে অস্ফুট স্বরেই মায়ের উদ্দেশ্যে ডাক ছাড়ল, "আম্মা, এক গ্লাস পানি দাও না গো, কলিজা শুকিয়ে যাচ্ছে!" মেয়ের ক্লান্ত স্বর শুনেই নাসরিন বেগম ফ্রিজ থেকে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি নিয়ে বেরিয়ে এলেন। রুহির পাশে বসে পরম মমতায় গ্লাসটা এগিয়ে দিলেন। রুহি গ্লাসটি নিয়েই যেন এক চুমুকেই গ্লাসের অর্ধেক পানি শেষ করে দিল।
গ্লাসটা সামনের টেবিলে রাখতেই নাসরিন বেগম মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলেন, "তোর পড়াশোনা কেমন চলছে রে মা? এই গরমে কষ্ট বেশি হচ্ছে অনেক তাই না। বাড়ির গাড়িও তো নিয়ে যাস না কতো বলি তাও! শরীর কি বেশি খারাপ লাগছে?"
রুহি মায়ের কোলের কাছে একটু ঘেঁষে বসে মিষ্টি হেসে জবাব দিল, "ঠিক আছে আম্মা। পড়াশোনার চাপ তো একটু থাকবেই, তবে সব সামলে নিচ্ছি।"
মেয়ের কথাতে নাসরিন বেগম হালকা হাসলেন, সেই সাথে রুহির কপালের এলোমেলো চুলগুলোকে একটু গুছিয়ে দিলেন। রুহিও মায়ের আদর পেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলো। মা-মেয়ের এই স্নিগ্ধ মুহূর্তটি যেন বাইরের তপ্ত দুপুরকেও হার মানাল। কিছুক্ষণ গল্প করার পর নাসরিন বেগম বললেন, "এবার যা মা, রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে। শরীরটা ঠান্ডা হবে।"
মায়ের কথায় রুহি সোফা ছেড়ে উঠে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল। কিন্তু প্রথম সিঁড়িতে পা রাখতেই কলিংবেলের শব্দ ভেসে এল। নাসরিন বেগম তখনও ড্রয়িংরুমে কিছু জিনিস গুছিয়ে রাখছিলেন। কলিংবেলের শব্দে তিনি দরজা খুলতেই দেখলেন একজন কুরিয়ার সার্ভিসের লোক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। নাসরিন বেগমকে দেখেই লোকটি বেশ বিনয়ের সাথে জিজ্ঞেস করল, "আরোহী জামানকে একটু ডেকে দেবেন? ওনার একটি পার্সেল আছে।"
রুহি সিঁড়ির কাছেই ছিল। নিজের নাম শুনে সে কৌতূহলী হয়েই এগিয়ে এল। নাসরিন বেগম ডাকার আগেই রুহি মায়ের পাশে এসে দাঁড়ালো। রুহি দাঁড়াতেই নাসরিন বেগম লোকটিকে দেখিয়ে বললেন, "এই হচ্ছে আরোহী জামান।" লোকটি তার ব্যাগ থেকে মাঝারি সাইজের একটি চমৎকারভাবে মোড়ানো বক্স রুহির দিকে এগিয়ে দিল। অপরদিকে রুহি অবাক হয়ে বক্সটির দিকে তাকিয়ে রইল। সে তো কিছু অর্ডার করেনি! তাহলে এই পার্সেল এল কোত্থেকে?
নাসরিন বেগম কৌতূহলী চোখে বক্সটির দিকে তাকিয়ে আছেন। মোড়কটি এত সুন্দর যে কারোরই নজর কাড়বে। এদিকে মা পাশে থাকায় রুহি কুরিয়ারের লোকটিকে কোনো প্রশ্নও করতে পারল না। কুরিয়ারের লোকটি পার্সেলটি বুঝিয়ে দিয়েই দ্রুত সেখান থেকে প্রস্থান করল। অতঃপর রুহি বক্সটি হাতে নিয়ে ভেতরে ঢুকতেই নাসরিন বেগম কৌতূহলী স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, "কী আছে রে এতে? তুই কি কিছু আনিয়েছিস?"
রুহি এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। কী বলবে ভেবে না পেয়ে চট করে মিথ্যে বলে ফেলল, "হ্যাঁ আম্মা, কাল রুবি আপুর ভার্সিটিতে অনুষ্ঠান না? ওইখানে পরে যাওয়ার জন্য সকালে একটা ড্রেস অর্ডার করেছিলাম।"
রুহির কথা শেষ হতেই নাসরিন বেগম অবাক হয়ে বললেন, "সকালে অর্ডার করলি আর এত তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দিল?"
রুহি সামলে নিয়ে বলল, "আমার পরিচিত একটা পেজ ছিল তো, আর এইতো কাছেই ছিলো তাদেন দোকান তাই তাড়াতাড়ি চলে এসেছে।" কথাটি শেষ করেই রুহি আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না, বক্সটি বুকে জাপটে ধরে সোজা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল।
এদিকে রুমে ঢোকার মুখেই শাহাজের সাথে তার মুখোমুখি দেখা। শাহাজ মাত্রই স্টোর রুমের কাজ শেষ করে হাত-মুখ ধুয়ে নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছিল। অপরদিকে রুহিও হন্তদন্ত হয়ে যাওয়ার কারণে প্রায় শাহাজের সাথে ধাক্কা লাগার উপক্রম হয়েছিল। এমন অবস্থায় রুহি ভয়ে কুঁকড়ে গেলেও শাহাজ অদ্ভুতভাবে একদম নীরব রইল। রুহিকে কিছু না বলেই বরং রুহিকে পাশ কাটিয়েই সে গম্ভীর মুখে নিচে নেমে গেল। রুহি একবার শাহাজের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আবার দ্রুত নিজের রুমে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে আটকে দিল।
এদিকে রুহির রুমের দরজা বন্ধের শব্দ হতেই শাহাজ নিচে নামতে নামতে একবার থমকে পেছন ফিরে রুহির বন্ধ দরজার দিকে তাকাল, তার চোখে এক রহস্যময় ছায়া। তারপর আবারও ধীরপায়ে নিচে নেমে গেল।
রুমে এসেই রুহি বক্সটি বিছানার ওপর রাখল। এরপরেই ভাবতে শুরু করলো কোথা থেকে এটি এলো বা কে দিতে পারে এসব, কিন্তু কিছুই মিলাতে পারলো না। অতঃপর এক বুক কৌতূহল আর অনিশ্চয়তা নিয়ে সে ধীরে ধীরে মোড়কটি খুলতে শুরু করল। ভেতরে কী থাকতে পারে? কোনো ড্রেস? না অন্য কিছু?
প্যাকেটটি খুলতেই রুহির হাত পা যেন জমে পাথর হয়ে গেল। বক্সের ভেতরে ভাঁজ করা একটি ঝকঝকে কালো কোট, ঠিক যেমনটি আইনজীবীরা কেস লড়ার সময় পরেন। রুহি স্তব্ধ হয়ে কোটটি হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখতে লাগল। তার চোখের কোণে বিস্ময় আর ভয় দুই-ই ভিড় করল।
রুহি যখন উল্টে পাল্টে কোটটি দেখছিলো তখনই হঠাৎ কোটটির ভাঁজের ভেতর থেকে একটি ছোট চিরকুট নিচে পড়ে গেল। চিরকুটটি দেখেই রুহি হাত বাড়িয়ে তা তুলে নিল। চিরকুটের লেখাটির ওপর নজর পড়তেই তার চোখ দুটো যেন কপালে উঠে গেল। সেখানে লেখা ছিল:
"স্বপ্নরা হাতছানি দিয়ে ডাকছে। তুমিও তাদের ছুঁতে প্রজাপতির মতো ডানা মেলে উড়ে চলো।"
— কাসাফাদ্দৌজা আশিক
আকস্মিক এমন কিছুতে রুহির পুরো শরীর যেন শিউরে উঠল। রুহি আপন মনেই ভাবতে লাগলো, ব্লক করার পরেও এই লোকটির হাত থেকে তার যেন নিস্তার নেই! এই মানুষটি কীভাবে জানল রুহির স্বপ্নের কথা? কেন সে বারবার এভাবে তার অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে? রুহি অস্পষ্ট স্বরে বিড়বিড় করে উঠল, "কে আপনি? কি আপনার অস্তিত্ব... আপনি কি আসলেই মানুষ নাকি কোনো ছায়া?"
চলবে______