ফন্ট সাইজ:
থিম:
অন্তহীন প্রেম আমার

৬০তম পর্ব

লেখক: Afifa Afnan

#অন্তহীন_প্রেম_আমার

#আফীফা_আফনান

#পর্ব_৪৮(ক)

[কপি করা নিষিদ্ধ]

শাহাজের মুখ থেকে ভালোবাসার সেই অমোঘ স্বীকারোক্তি শোনার পর রুহির পৃথিবীটা যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। যে মানুষটাকে সে সারাজীবন এক দুর্ভেদ্য পাহাড় ভেবে এসেছে, সেই পাহাড়ের আড়ালে যে এতটা গভীর এক ভালোবাসার ঝরনা লুকিয়ে ছিল, তা তার কল্পনারও অতীত ছিল।

​রুহি প্রথম কয়েক সেকেন্ড যেন নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো পায়ের তলার মাটিটা সরে যাচ্ছে, আর সে এক মায়াবী শূন্যতায় ভাসছে। এই যে কারো প্রতি মনে মনে দুর্বল থাকা, তাকে আড়ালে থেকে ভালোবাসা—এ এক বিচিত্র যন্ত্রণা। কিন্তু যখন সেই কাঙ্ক্ষিত মানুষটিই সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সর্বস্ব দিয়ে ভালোবাসার দাবি জানায়, তখন সেই অনুভূতির কোনো সঠিক শব্দ হয় না। রুহির বুকের ভেতরটা এখন যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তি আর হাহাকারের মিশ্রণে তোলপাড় করছে।

এদিকে ​ঠিক এই একই ছাদ, একই কার্নিশ—আজ থেকে চার বছর আগে এক পড়ন্ত বিকেলে রুহি এখানেই দাঁড়িয়ে ছিল। শাহাজের স্থানে সেদিন ছিল পিয়াস। নবকিশোরী রুহি তার হৃদয়ের সমস্ত আবেগ আর সাহসিকতা জড়ো করে নিজের হাতে বড় করা সবচেয়ে সুন্দর লাল গোলাপটি পিয়াসের দিকে বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু বিনিময়ে সে পেয়েছিল পিয়াসের তাচ্ছিল্য ভরা হাসি আর এক আকাশ সমান অপমান। সেদিন পিয়াস তাকে স্রেফ ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল।

​আর আজ? পিয়াসের সেই শূন্য স্থানে দাঁড়িয়ে আছেন শাহাজ। কিন্তু আজকের আবহাওয়া, আজকের অনুভূতি একদম ভিন্ন। রুহির চোখের সামনে একে একে ভেসে উঠতে লাগল সেই দিনগুলোর কথা, যখন সে ভেঙে পড়েছিল। পিয়াস আসেনি তার চোখের পানি মুছতে, বরং তার এই গম্ভীর শাহাজ ভাই-ই সবসময় ছায়ার মতো পাশে ছিলো। তাকে সাহস জুগিয়েছে জীবনে ঘুরে দাঁড়াতে, শিখিয়েছে কীভাবে নিজেকে ভালোবাসতে হয়।

এসব মনে করে ​রুহি কাঁপছে। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যেন তাকে বলছে, শাহাজ শুরু থেকেই সবটা জানতো। শাহাজ জানতো যে তাঁর আদরের রুহি তাঁরই ছোট ভাইয়ের প্রতি দুর্বল ছিল। পিয়াসের করা প্রতিটা অন্যায়ও শাহাজ আড়াল থেকে দেখেছে। রুহির মনে হতে লাগল—সে তো পিয়াসকে ভালোবেসে আঘাত পেয়ে প্রকাশ্যে কেঁদেছে, কিন্তু এই মানুষটা? শাহাজের ভালোবাসা তো ছিল একদম গোপনীয়। তিনি যখন দেখেছেন রুহি অন্য কারো জন্য পাগলপ্রায়, তখন তাঁর নিজের বুকে কতটা রক্তক্ষরণ হয়েছিল?

​রুহি আর ভাবতে পারলো না, এবার সে ভেজা চোখে শাহাজের দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলে উঠল, "আ..আপনি সবটা জানতেন তাই না শাহাজ ভাই? সব? তবুও আমার সামনে এমন ভান করে থেকেছেন যেন আপনি কিছুই জানেন না? যখন আমার মন পিয়াস ভাইয়ের জন্য কাঁদত, আপনি তখনও আমাকে ভালোবাসতেন? আপনার কি একবারও কষ্ট হয়নি? কেন আপনি আমাকে সেদিনই আটকে দেননি? কেন আমাকে ওই ভুল পথে যেতে দিলেন?"

​রুহির কণ্ঠে বহুদিনের জমানো অভিমান আর অভিযোগের পাহাড়। কান্নায় তার গলা বুজে আসছে। শাহাজ এবার রুহির খুব কাছে এসে উপস্থিত হলো। তাঁর হাতটা আলতো করে রুহির মাথার ওপর পরম মমতায় রাখলো। এই স্পর্শে কোনো অস্থিরতা ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত নমনীয়তা।

অতঃপর ​শাহাজ খুব নরম গলায় সুধালো, "ছোটরা তো ভুল করবেই চঞ্চলা। আর ভুল করেই তো তারা শিক্ষা পায়। এই যে তুই ভুল করেছিলি, সেই ভুল থেকেই তো তুই শিখেছিস কীভাবে নিজের দুর্বলতাকে শক্তিতে রূপান্তর করতে হয়। শিখেছিস কীভাবে মানুষের তাচ্ছিল্য উপেক্ষা করে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়। কিভাবে জীবনে এগিয়ে যেতে হয়। আর এটাই... ঠিক এই জিনিসটাই তো আমি চেয়েছিলাম।"

​শাহাজ একটু থেমে রুহির চোখের পানি মুছে দিয়ে আবার বলে উঠলো, "আমি যদি সেদিন তোকে বাধা দিতাম, তবে সেদিন তুই আমাকে তোর সবচেয়ে বড় শত্রু ভাবতিস। তুই ভাবতিস শাহাজ ভাই তোর ভালো চায় না। তাই আমি তোকে তোর মতো উড়তে দিয়েছিলাম। ঘুড়ি যেমন আকাশে ওড়ে, আমি তোকে তেমনই ছাড় দিয়েছিলাম—কিন্তু তোকে ছেড়ে দেই নি। লাটাইটা সবসময় নিজের হাতেই রেখেছিলাম। যাতে কোনো ঝড় তোকে ছিঁড়ে নিয়ে যেতে না পারে, যাতে তুই হারিয়ে না যাস।"

​রাতের এই গভীরতায় শাহাজের এমন গভীর বোধ আর অগাধ ভালোবাসা রুহিকে একদম নিঃস্ব করে দিল। সে বুঝতে পারল, সে যাকে পাথরের মতো কঠোর ভেবেছিল, আসলে সেই মানুষটাই তাকে তিলে তিলে গড়েছে নিজের সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে।

​রুহির চোখের পাতা ভিজে উঠল, কিন্তু এবার সেই পানিতে কোনো দুঃখের নয়। বরং এক অদ্ভুত প্রশান্তি আর পূর্ণতার আবেশে তার সারা শরীর কেঁপে উঠল। সে অপলক দৃষ্টিতে শাহাজের দিকে তাকিয়ে রইল। চাঁদের আলো শাহাজের তীক্ষ্ণ চোয়ালে আছড়ে পড়ছে, আর সেই চোখে এখন কেবল রুহিকে জয় করার নেশা। রুহির মনে হলো, চার বছর আগের সেই সব অভিমান, পাগলামী সেই সব ভয় আর দূরত্ব যেন এক মুহূর্তেই তার জীবন থেকে বাষ্প হয়ে উড়ে গেল।

এদিকে হঠাৎই ​শাহাজ এগিয়ে এসে ওর চিবুক ধরে নিজের দিকে স্থির করলো, আকস্মিক এমন কাজে রুহি নিজের অজান্তেই শাহাজের শার্টের হাতাটা খামচে ধরল। সে কাঁপা গলায় শুধু এটুকুই বলতে পারল, "আপনি... আপনি এত নিষ্ঠুর কেন শাহাজ ভাই? এত মায়া বুকে পুষে রেখে বাইরে কেন কঠোর সেজে থাকতেন?"

​শাহাজ কোনো উত্তর দিলা না, কেবল আরও একটু নিবিড় হলো। এদিকে রাতের গভীরতায় ছাদের ওই নির্জন পরিবেশে চারপাশটা যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। হিমেল হাওয়া বইছে, কিন্তু সেই হাওয়ায় আজ আর কোনো শীত নেই; বরং আছে এক তপ্ত ভালোবাসার স্পর্শ।

​রুহি এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে শাহাজের বুকের ওপর নিজের মাথা রাখল। তার এতদিনের জমে থাকা সব ক্লান্তি আর নীরবতা যেন এই একটি আশ্রয়ে এসে মুক্তি পেল। এদিকে রুহি শাহাজের বুকে মাথা এলিয়ে চোখ বুজলো, শাহাজের হৃদস্পন্দনের শব্দ সে স্পষ্ঠ শুনতে পাচ্ছে—প্রতিটি ধুকপুকানিতে যেন শুধু রুহিরই নাম লেখা।

এদিকে ​শাহাজও রুহিকে নিজের বাহুবন্ধনে আগলে নিলো। রুহির মনে হলো এই সেই ভালোবাসা যার জন্য রুহি সারাজীবন তৃষ্ণার্ত ছিল। রাতের আকাশে অজস্র তারাও যেন সাক্ষী হয়ে রইল—দুইটি বিচ্ছিন্ন আত্মা আজ যখন এক মোহনায় এসে মিলেছে। কোনো কথা নেই, কোনো দাবি নেই; কেবল একে অপরের সান্নিধ্যে হারিয়ে যাওয়ার এক অলৌকিক মুহূর্ত। যেন সেই লুকানো দীর্ঘশ্বাস আজ এক শান্তিতে পূর্ণ হলো।

এদিকে ​ছাদের কোণে ফুটে থাকা নতুন গোলাপের সুবাস আর শাহাজের গায়ের সেই চন্দন আর কস্তুরীর মাদকতাপূর্ণ ঘ্রাণ মিলেমিশে রুহিকে এক অন্য জগতে নিয়ে গেল। আজ থেকে সে আর একা নয়, আজ থেকে সে শাহাজের সেই ‘আসক্তি’ যার ওপর অন্য কারোর ছায়া পড়ারও অধিকার নেই।

এদিকে এতোক্ষন শাহাজের বুকে মাথা রেখে রুহি এক মুহূর্তের জন্য যেন সব ভুলে গেল। কিন্তু হঠাতই তার মনে এক অদ্ভুত শঙ্কা জেগে উঠল। সে শাহাজের শার্টের হাতাটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ভেজা গলায় বলে উঠল, "শাহাজ ভাই, যদি কখনো আপনার মনে হয় আমাকে ভালোবাসা আপনার ভুল ছিল... তখন কি আপনি আমাকে ছেড়ে দেবেন? তাড়িয়ে দেবেন আপনার জীবন থেকে?"

​রুহির এমন অবুঝ প্রশ্নে শাহাজের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিষণ্ণ কিন্তু গভীর মায়ার হাসি ফুটে উঠল। অতঃপর সে রুহিকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের বাহুবন্ধনে আগলে নিলো। তাঁর বলিষ্ঠ হাত দুটো রুহির পিঠে এক পরম নিরাপত্তার চাদর বিছিয়ে দিচ্ছে।

​শাহাজ রুহির কপালে নিজের চিবুক ঠেকিয়ে খুব শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলতে শুরু করলো, "আমাদের জীবনে যা কিছু ঘটে চঞ্চলা, তার সবটাই আমাদের ভাগ্যলিপি। তুই আমার ভাগ্যে লেখা ছিলি বলেই আজ এভাবে আমার জীবনে এসেছিস। স্রষ্টা যেখানে তোকে আমার ভাগ্যে লিখে দিয়েছেন, সেখানে আমার ক্ষুদ্র হৃদয়ের দুঃসাহস হয় কীভাবে তোকে দূরে ঠেলে দেওয়ার?"

​শাহাজ একটু থামল, তারপর রুহির চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে এক গভীর ধ্রুব সত্যের মতো করে বললো, "সবসময় একটা কথা মনে রাখবি রুহি—এই পৃথিবীতে কেউ তোর সাথে থাকুক বা না থাকুক, শাহাজ সর্বদা তোর পাশে আছে। যতদিন এই শরীরে প্রাণ আছে, এই আমি নামের অস্তিত্বটা একমাত্র তোর নামেই লেখা। আমাদের বিচ্ছেদ কেবল মৃত্যুতেই সম্ভব, তার আগে নয়।"

​রাতের নিস্তব্ধতায় শাহাজের এই অমর অঙ্গীকার যেন ছাদের প্রতিটি কোণে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। রুহির মনের সব ভয় আর শঙ্কাও যেন নিমেষেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে বুঝতে পারল, এই বিশাল বটবৃক্ষের ছায়াটি এখন সম্পূর্ণ তার।

অপরদিকে চারিদিকের গভীর অন্ধকার আর নক্ষত্রখচিত আকাশ সাক্ষী হয়ে রইল এক অসমাপ্ত গল্পের সার্থক পরিণতির—যেখানে ঘৃণা নয়, জেদ নয়, কেবল এক নিঃস্বার্থ অন্তহীন প্রেম জয়ী হলো।

★★★

একসময় অন্ধকার চিরে ফুটে উঠল কুয়াশাচ্ছন্ন এক মায়াবী শীতের সকাল। চারিদিকে শ্বেতশুভ্র কুয়াশার চাদর বিছানো, যেন প্রকৃতি নিজেই এক শান্ত শীতল আবহে নিজেকে মুড়িয়ে নিয়েছে। শিশিরভেজা ঘাসের ডগায় ভোরের প্রথম আলোর ঝিলিক আর কুয়াশার আড়ালে ঢাকা পড়া বাগান—সব মিলিয়ে এক অপার্থিব স্নিগ্ধতা।

এদিকে ​অন্ধকারচ্ছন্ন সেই নিঝুম রাত পেরিয়ে গেলেও রুহি বা শাহাজ কেউই আর নিজেদের রুমে ফিরে যায়নি। শাহাজের সুপ্ত ভালোবাসা যখন বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো প্রকাশ পেল, তখন রুহিও যেন এক চঞ্চল ঝরনা হয়ে উঠল। তার মনের ভেতরে জমে থাকা কথার ঝুড়ি সে এক নিমেষেই মেলে ধরল শাহাজের সামনে। সারারাত ছাদের ওই দোলনাটিতে পাশাপাশি বসে রুহি তার জীবনের প্রতিটি পৃষ্ঠা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শাহাজকে পড়ে শোনাল। তার ছোটবেলার জেদ, তার অভিমান, তার প্রতিটি ভুলের গল্প।

​আর শাহাজ? সে যেন আজ এক মনোযোগী প্রেমিক, তাই তো মনের মতো রুহির প্রতিটি কথা, প্রতিটি নিশ্বাসের শব্দ গভীর মমতায় শ্রবণ করল সে। সেই সাথে মাঝেমধ্যে রুহির চঞ্চলতা দেখে তাঁর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠছিল সেই বিরল প্রশান্তির হাসি। এদিকে রুহি কথা বলতে বলতে কখন যে শাহাজের মজবুত বাহুডোরে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছিল, সে নিজেও টের পায়নি।

কুয়াশার চাদরে ঢাকা সেই স্নিগ্ধ ভোরে রুহি যখন শাহাজের বাহুবন্ধনে তন্দ্রা ভেঙে চোখ মেলল, চোখ মেলে সে নিজেকে ছাদেই আবিষ্কার করল। তখন চারপাশটা যেন কোনো অপার্থিব স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিল। তার গায়ের ওপর শাহাজের সেই ভারী জ্যাকেটটি সযত্নে দেওয়া। যেন শাহাজের জ্যাকেটের ওম আর ভোরের হিমেল হাওয়া মিলে এক অদ্ভুত মাদকতা তৈরি করেছে। রুহির হঠাৎ মনে হলো এই কুয়াশাচ্ছন্ন সকালটি তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর উপহার।

অবশেষে একসময় ​রুহি শাহাজের দিকে তাকাল। সে দেখলো শাহাজ তখনও শান্তভাবে দোলনার এক কোণে হেলান দিয়ে অপলক তার দিকেই তাকিয়ে আছে।

রুহি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে ধীর গলায় জিজ্ঞেস করল, "আমরা কি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম শাহাজ ভাই?"

​শাহাজ তাঁর শান্ত গভীর দৃষ্টি রুহির মুখে স্থির রেখে মৃদু হাসলো। "আমরা না, তুই ঘুমিয়ে পড়েছিলি।"

​রুহি অবাক হয়ে সোজা হয়ে বসল। "আপনি ঘুমাননি?"

​"না।"

​"কেন?" রুহির গলায় বিস্ময়।

​শাহাজ এবার একটু ঝুঁকে রুহির চোখের গভীরে তাকালো। "দেখছিলাম।"

​"কী দেখছিলেন?" রুহি কৌতূহলী।

​শাহাজ এবার তাঁর সেই ভরাট গলায় খুব নিচু স্বরে বললো,"আমার ব্যক্তিগত চাঁদকে।"

​মুহূর্তেই রুহির সারা শরীরে যেন এক বিদ্যুৎ খেলে গেল। লজ্জায় আর আরক্তিম আবেশে তার ফর্সা গাল দুটো লাল হয়ে উঠল। সে তড়িঘড়ি করে দু-হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল। রুহির এমন লাজুক ভঙ্গি দেখে শাহাজ এবার সশব্দে হেসে উঠলো। যে শাহাজকে গম্ভীর থাকতেই সবাই দেখেছে, তাঁর সেই প্রাণখোলা হাসি যেন ভোরের নির্জন ছাদে এক মায়াবী সুর তুলল।

​হাসি থামিয়ে শাহাজ কৌতুক করে বললো, "এখন মুখ ঢেকে আর লাভ কী? যা দেখার আমি সারারাত প্রাণ ভরে দেখে নিয়েছি।"

​রুহি হাতের ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে একটু অভিমানী সুরে বলল, "চাঁদেরও তো কলঙ্ক আছে শাহাজ ভাই। আমারও তো কত ভুল, কত খুঁত..."

​শাহাজ এবার গম্ভীর হলো, তবে সেই গাম্ভীর্যে ছিল সমুদ্রসম গভীরতা। সে বলে উঠলো , "থাকুক। কিছু জিনিসে কলঙ্ক থাকলেও তা অমূল্য। এই যেমন কলঙ্ক থাকার পরও মানুষ চাঁদের আলোটাকেই সবচাইতে বেশি ভালোবাসে। তুই আমার কাছে ওই চাঁদের আলোর মতোই পবিত্র।"

​রুহি আর কথা বাড়াতে পারল না। একরাশ ভালোলাগা নিয়ে সে বিষয় পাল্টাতে চাইল। "ভার্সিটি যাবেন না আজকে, শাহাজ ভাই?"

​"যাব।"

​"আমাকে নিয়ে যাবেন? আমার ভার্সিটিতে নামিয়ে দিবেন?" রুহির কণ্ঠে আবদার।

​"দিব।"

​"প্রতিদিন কিন্তু!" রুহি যেন নিজের অধিকারটুকু আদায় করে নিতে চাইল।

​"ঠিক আছে, প্রতিদিন।" শাহাজের গলার স্বরে এক অটুট নিশ্চয়তা।

​রুহি তবুও নিশ্চিত হতে চাইল, "মনে থাকবে তো? ভুলবেন না তো? আবার কাজের দোহাই দিয়ে এড়িয়ে যাবেন না তো?"

​শাহাজ এবার রুহির মাথায় হাত রেখে স্থির গলায় বললো, "ভুলব না । কিছু জিনিস চাইলেও ভোলা যায় না, আর কিছু মানুষ চাইলেও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। তুই আমার সেই অবাধ্য স্মৃতি, যাকে আমি সারাজীবন এভাবেই আগলে রেখে যাব তা তুই চাইলেও আর না চাইলেও।"

এদিকে ​যে ছাদে একসময় রুহির নবকিশোরী মন অপমানে বিধ্বস্ত হয়েছিল, আজ সেই ছাদেই ভালোবাসার এক নতুন মহাকাব্য রচিত হলো। অতীতের সব জরাজীর্ণ স্মৃতি পেছনে ফেলে তারা দুজন একসাথে পা বাড়াল সিঁড়ির দিকে। এই সিঁড়ি শুধু নিচে নামার পথ নয়, এ যেন রুহির এক নতুন জীবনে প্রবেশের সোপান—যে জীবনের একমাত্র ধ্রুবতারার নাম শাহজাদা মোস্তাফা।

ভোরের হালকা আলো তখন কেবল বাড়ির উঠোনে এসে পড়েছে। কুয়াশার চাদর এখনো পুরোপুরি সরেনি। রুহি আর শাহাজ যখন ছাদ থেকে অতি সন্তর্পণে নেমে আসছিল, তখনো খন্দকার বাড়ির বাকি সদস্যরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কেবল রান্নাঘরের দিক থেকে তানজিনা বেগমের চলাফেরার মৃদু শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। পাছে কেউ দেখে ফেলে, সেই ভয়ে রুহি খুব সাবধানে পা ফেললেও শাহাজ ছিলো একদম।স্বাভাবিক যেন কে কি বললো, কি ভাবলো তার কোন মাথা ব্যথাই নেই। একসময় দুজনেই নিজ নিজ রুমের সামনে এসে দাঁড়ালো, কিন্তু নিজের ঘরে ঢোকার ঠিক আগের মুহূর্তে করিডোরের আধো-অন্ধকারে তারা একে অপরের দিকে তাকাল। শাহাজের ঠোঁটের কোণে সেই বিরল প্রশান্তির হাসি, আর রুহির চোখে নবজাতক এক ভালোলাগার ঝিলিক। এক লহমার সেই মিষ্টি বিনিময় যেন সারাদিনের জ্বালানি হয়ে রইল।

​সময় গড়ালো। সকালের ব্যস্ততা শুরু হতেই রুহি তৈরি হয়ে নিচে নেমে এল। আজ যেন তাকে চিনতে কষ্ট হচ্ছে সবার। রুহির মনের মেজাজ আজ শান্তির সর্বোচ্চ শিখরে আসীন। প্রতিদিনের সেই জড়তা বা বিষণ্ণতা নেই, বরং চোখেমুখে এক অলৌকিক উজ্জ্বলতার দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ছে। সে গুন গুন করতে করতেই ডাইনিং টেবিলের কাছে এসেই প্রফুল্ল মনে নাস্তার কথা জিজ্ঞেস করল।

​টেবিলে তখন মোটামুটি অনেকেই উপস্থিত। শাহাবুদ্দিন সাহেব পত্রিকা পড়ছেন, মমতাজ বেগম নিজের চা নিয়ে ব্যস্ত। রুবি, রিমু, কাব্য আর মুগ্ধ নিজেদের মধ্যে টুকটাক গল্প করছে। একসময় একে একে বাকিরাও হাজির হলো। মোস্তফা কামাল আর কবির সাহেব নামার পরপরই সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখা গেল শাহাজ ও পিয়াসকে।

​পিয়াস আজ সকাল থেকেই কেমন যেন রুহির কাছাকাছি থাকার জন্য ছটফট করছিল। রুহিকে ওভাবে হাসতে দেখে তার ভেতরের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা আবারও চাড়া দিয়ে উঠেছে। সে লক্ষ্য করল রুহির ঠিক পাশের চেয়ারটি খালি পড়ে আছে। পিয়াস মনে মনে সুযোগটা লুফে নিতে চাইল। সে দ্রুত পায়ে শাহাজকে টপকে ওই চেয়ারটির দিকে এগোতে গেল।

​কিন্তু শাহাজ যেন পিয়াসের প্রতিটি পদক্ষেপ আগে থেকেই জানতো। তাই তো পিয়াস যখন চেয়ারের কাছে পৌঁছাতে যাবে, ঠিক তখনই শাহাজ অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় নিজের পা দিয়ে পিয়াসের পায়ে সামান্য একটু আঘাত করলো। এদিকে শাহাজের হঠাৎ এমন কান্ডতে পিয়াস অপ্রস্তুত হয়ে বেশ বড়সড় একটা হোঁচট খেল, তবে পড়লো না কারন পড়ে যাওয়ার আগেই সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিল।

আর এদিকে সেই সামান্য কয়েক সেকেন্ডের বিরতির সুযোগেই শাহাজ অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দে রুহির পাশের চেয়ারটিতে গিয়ে বসে পড়লো। এদিকে শাহাজকে রুহির পাশে বসতে দেখেই ​পিয়াস হকচকিয়ে গেল। সে অসহায়ের মতো দেখল রুহির ঠিক পাশেই শাহাজ বসে পড়েছে এবং রুহি এক মুহূর্তের জন্য শাহাজের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসল। কই রুহিতো তাকে দেখে হাসে না বরং দেখলেই পালিয়ে বেড়ায়। এমন দৃশ্যে পিয়াসের মনটা বিষাদে ভরে উঠল। রুহির আশেপাশে অন্য কাউকে সহ্য করার ক্ষমতা এখন তার নেই, আর এখন খোদ শাহাজকে সেখানে বসে থাকতে দেখে তার সমস্ত পরিকল্পনা মাটি হয়ে গেল।

একসময় সে নিজের ভেতরের এই হিংসে আর বিষণ্ণতা চেপে রেখে বাধ্য হয়ে সামনের একটি চেয়ারে গিয়ে ধপ করে বসে পড়ল। ডাইনিং টেবিলের এই ছোট নাটকটি বড়দের চোখে না পড়লেও, রুহির লাজুক চাহনি আর শাহাজের আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিমা বলে দিচ্ছিল—খন্দকার বাড়ির সমীকরণ আজ থেকে বদলে গেছে।

অন্যদিকে কুয়াশা কিছুটা কেটে গিয়ে সোনালী রোদ ঝলমল করছে খন্দকার বাড়ির বিশাল বাগানে। শাহাজ তার কালো রঙের চকচকে বাইকটিতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পকেটে হাত, চোখে সানগ্লাস, কারোর জন্য যেন অধীর অপেক্ষায়। এদিকে তার বাইকটি রোদে যেন আরও বেশি উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। শাহাজ যকন অপেক্ষাকৃত ​এমন সময় বাগান পেরিয়ে কাব্য হনহন করে এগিয়ে এলো। শাহাজকে তৈরি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একগাল হেসে বলল, "আরে শাহাজ ভাই! একদম রেডি দেখছি। আমাকে একটু সামনে মোড় পর্যন্ত নামিয়ে দাও না প্লিজ।"

​শাহাজ সানগ্লাসের ওপর দিয়ে কাব্যের দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত গলায় বলল, "সামনে যেহেতু যাবি, হেঁটেই যা। শরীর ভালো থাকবে।"

​কাব্য একটু রসিকতা করে, পায়ে হাত দিয়ে নাটুকে ভঙ্গিতে বলল, "আরে ভাই, হাঁটতে বড্ড কষ্ট হয় যে! একটু লিফ্ট দাও, ছোট ভাইয়ের আবদার বলে কথা। বড় ভাই হয়ে কি এতটুকু পূরন করবে না।"

​শাহাজ সরাসরি না সূচক মাথা নেড়ে বলল, "আমি আমার বাইকে কাউকে ওঠাবো না। আমার পছন্দ না, তবুও তো গতকাল উঠালাম তাতেই সন্তুষ্ট থাক।" বলেই পকেট থেকে পাঁচ টাকার একটি নোট বের করে কাব্যের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "পায়ে ব্যাথা এটা নে, যেখানে যাবি রিকশা করে যা।"

​কাব্য যেন আকাশ থেকে পড়ল। "পাঁচ টাকা! এই যুগে পাঁচ টাকায় রিকশা পাওয়া যায়? আর তুমি আমাকে উঠাবে না? কেন হে আমি না তোমার ভাই। এটা তো ঘোর বৈষম্য!" বলেই কাব্য মেয়েদের মতো গজগজ করতে করতে সামনে এগোতে থাকল।

​ঠিক তখনই বাড়ির ভেতর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এলো রুহি। পরনে ভার্সিটির ড্রেস, কাঁধে ব্যাগ। শাহাজকে দেখেই চেঁচিয়ে উঠল, "শাহাজ ভাই, দেরি হয়ে যাচ্ছে তো! তাড়াতাড়ি চলুন।" বলেই সে এক লাফে শাহাজের বাইকের পেছনে উঠে বসল। শাহাজ মৃদু হেসে বাইক স্টার্ট দিল।

​তারা দুজনে বেরিয়ে যাবে, এমন সময় কাব্য কোথা থেকে এসে বাইকের সামনে দু-হাত মেলে দাঁড়িয়ে পড়ল। মুখে চরম নাটকীয় অভিব্যক্তি। "বাহ ভাই বাহ! আমি বাইকে উঠতে চাইলাম, তুমি সাফ বলে দিলে কাউকে ওঠাবে না। তাহলে পেছনের এটা কী? এটা কি কোনো অদৃশ্য মানুষ? নাকি হাওয়া। বলো! বলো! রুহি তোমার বাইকে উঠতে পারলে আমি কেন নয়।"

এদিকে শাহাজ একদম চুপচাপ, ​সে জানে কাব্য এসব ড্রামা করছে তাইতো কাব্যের নাটকে সে বিন্দুমাত্র পাত্তা দিল না। বরং সে বাইকের ক্লাচ ছেড়ে একটু কায়দা করে কাব্যের পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল। এদিকে শাহাজ যেতেই কাব্য পেছন থেকে চিৎকার করে বলল, "আল্লাহ! তুমি এই জুলুম সহ্য করো না! এত বৈষম্য! হয় ওদের বাইকটা ঠুস করে নষ্ট করে দাও, না হলে আমাকে একটা বাইক দাও!"

​কাব্য যখন আপনমনে বকবক করছে, রুহি তখন পেছন ফিরে ওকে মুখ ভেঙচি কেটে হাসছে। দেখতে দেখতে শাহাজের বাইক মুহূর্তেই ধুলো উড়িয়ে চোখের আড়াল হয়ে গেল। এদিকে যে কাব্য এতোক্ষণ গজগজ করছিলো হঠাৎ সে মুচকি হেসে গেটের দিকে পা বাড়াল।

​অন্যদিকে এতক্ষণ বাগানে যা যা ঘটল, তার সবটাই তিন তলার বারান্দা থেকে দেখছিল পিয়াস। রুহির শাহাজের প্রতি এত কাছাকাছি হওয়া, ওর বাইকে উঠে হাসিমুখে চলে যাওয়া—কিছুতেই সহ্য করতে পারছে না পিয়াস। তার বুকের ভেতরটা ঈর্ষায় জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে। পিয়াসের ফর্সা মুখমণ্ডল যেন মুহূর্তেই অমাবস্যার রাতের মতো অন্ধকার হয়ে গেল। সে মুঠো করে বারান্দার গ্রিলটা চেপে ধরল। তার মন যেন অস্থির, রুহিকে ও এভাবে হারিয়ে ফেলতে চলেছে , তা হয়তো সে স্বপ্নেও ভাবেনি।

চলবে..........

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন