#অন্তহীন_প্রেম_আমার
#আফীফা_আফনান
#পর্ব_৪৮(খ)
[কপি করা নিষিদ্ধ]
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল সংলগ্ন সেই শতাব্দীপ্রাচীন গাছের ছায়ায় বসে আছে চার বান্ধবী। শীতের মিষ্টি দুপুর, রোদের তেজটা আজ খুব একটা গায়ে লাগছে না বরং বেশ আরামদায়ক মনে হচ্ছে সবার কাছে, সবাই যখন বসে গল্পে মশগুল তখন তাদের সামনেই পড়ে আছে কয়েক প্যাকেট বাদাম আর চিপস। সবাই মিলে আড্ডার ছলে সেগুলো খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে। সেই সাথে চারপাশটাও ছাত্রছাত্রীদের পদচারণায় মুখরিত, কারো হাতে চায়ের কাপ, তো কেউবা গিটার নিয়ে গান ধরেছে। কিন্তু এতো সবের মাঝেও রুহির মনোযোগ আজ যেন ঠিক সেখানে নেই।
ভার্সিটিতে আসার পর থেকেই রুহির সারা শরীরে এক অজানা বসন্তের ঢেউ খেলে যাচ্ছে। এর আগেও সে শাহাজের বাইকে চড়েছে কিন্তু আজ এই প্রথমবার জনসম্মুখে সে শাহাজের বাইকে চড়ে ক্যাম্পাসে এসেছে। রুহির মনে পড়ছে, শাহাজ তাকে গেটের সামনে নামিয়ে দেওয়ার পর রুহি যখন ধীর পায়ে ভেতরে প্রবেশ করছিল, সে ভেবেছিলো হয়তো শাহাজ চলে গেছে কিন্তু সে যতই ভেতরে প্রবেশ করছে তার মনে হচ্ছিল কেউ একজন তীক্ষ্ণ নজরে তাকে পাহারা দিচ্ছে। তাই রুহি গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকার ঠিক আগের মুহূর্তে নিজেকে সামলাতে না পেরে পেছন ফিরে তাকিয়েছিল। দেখল, শাহাজ যায়নি বরং ঠিক যেখানে রুহিকে নামিয়েছিলো সেখানেই বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এবং এক দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
রুহি দেখলো শাহাজের সেই গভীর চাহনিতে আজ কোনো ধমক ছিল না, বরং ছিল একরাশ পবিত্র ভালোবাসা আর আগলে রাখার নিশ্চয়তা। তখন শাহাজের সেই পলকহীন দৃষ্টি রুহির মনে এক অদ্ভুত শিহরণ জাগিয়ে দিয়েছিল যার রেশ এখনো তার হৃদয়ে গেঁথে আছে।
এদিকে সকাল থেকেই রুহির এই ডানা মেলা পাখির মতো ফুরফুরে মেজাজ বিন্তি, ছোঁয়া আর পড়শির চোখ এড়ায়নি। এই যেমন লাইব্রেরীতে বসেও পড়ার ফাঁকে ফাঁকে রুহি যখন আপনমনে হাসছিল, তখনই ওরা ইশারা দিয়ে জানতে চেয়েছিল কারণটা। কিন্তু তখন অনেকেই থাকায় রুহির আর কিছু বলার সুযোগ হয়ে ওঠেনি।
তাই এখন দুপুরের এই নিরিবিলি সময়ে পড়শি বাদাম চিবোতে চিবোতে চোখ ছোট ছোট করে বলল, "শোন রুহি, সকাল থেকে তোর এই 'বিনা কারণে মিচকি হাসি' কিন্তু আমাদের সহ্য হচ্ছে না। কী হয়েছে খুলে বল তো? আজ কি এমন করে এসেছিস যে এমন হাসি দিয়ে চলেছিস। সূর্য কি আজ তোর জন্য দক্ষিণ দিকে উঠেছে নাকি ?"
পড়শির কথা শেষ হতেই বিন্তিও কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে বলল, "আসলেই রে, আজ তোকে দেখে মনে হচ্ছে তুই কোনো রূপকথার রাজ্য থেকে ঘুরে এসেছিস। সেই যে এলি এর পর থেকে তোর চেহারাটা একদম পাল্টে গেছে। ব্যাপার খানা কি বলতো?"
এদিকে দুই বান্ধবির কথা শেষ হতেই ছোঁয়া রুহির দিকে তাকালো, এখন সে বসে বসেই বাদাম খেতে খেতে সবার কথা শুনছিল, কিন্তু এবার ছোঁয়া রুহির কাঁধে হাত দিয়ে আদর করে বলল, "আমরা তো বন্ধু, আমাদের কাছে আর লুকোস না। বল না , কি এমন জাদুমন্ত্র হলো যে আমাদের রুহিটা আজ এত খুশি? ঝেঁড়ে কাশতো দেখি, আচ্ছা ওদের বাদ দে আমাকে অন্তত বল।"
রুহি তার প্রাণপ্রিয় তিন বান্ধবী দিকে তাকালো অতঃপর একটা গভীর শ্বাস নিল। যার ফলে ওর গাল দুটো শীতের লাল আপেলের মতো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে হাতের ওড়নাটা আঙুলে জড়াতে জড়াতে নিচু স্বরে বলতে শুরু করল শাহাজের সেই গোপন অনুরাগের কথা, রাতের নিস্তব্ধতায় ছাদের ওপর জমানো অভিমান আর ভালোবাসার স্বীকৃতির গল্প।
ওর কথা শুনে বান্ধবীরা যেন এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল। শীতের এই তপ্ত দুপুরে চার বন্ধুর আড্ডায় হঠাৎ যেন এক মায়াবী নীরবতা নেমে এল। রুহির মুখে সেই 'প্রিয়তমর' গল্প শুনে বিন্তি আর ছোঁয়ারা অবাক হয়ে ভাবল—ভালোবাসা বোধহয় এভাবেই আসে, নিঃশব্দে আগলে রেখে, দীর্ঘ প্রতীক্ষার শেষে এক পশলা বৃষ্টির মতো সব তৃষ্ণা মিটিয়ে দিয়ে।
শীতের দুপুরের মিঠে রোদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের সামনে সেই আড্ডাটা যেন জমে ক্ষীর। চার বান্ধবী গোল হয়ে বসে বাদাম চিবোচ্ছে, কিন্তু সবার কান আর চোখ এখন শুধু রুহির দিকে। রুহি যখন গত রাতের সব কথা এক নিঃশ্বাসে বলে শেষ করল, তখন এক মুহূর্তের জন্য যেন পুরো চত্বরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
ছোঁয়া নিজের হাতের বাদামটা খোসা না ছাড়িয়েই রুহির দিকে এগিয়ে দিয়ে অবিশ্বাসের সুরে বলল, "দাঁড়া রুহি, আমি কি ঠিক শুনলাম? তুই বলছিস শাহাজ ভাই তোকে ইদানিং নয়, বরং ওই আরো আগে থেকে ভালোবাসে? যখন তুই তোর পিয়াস ভাইয়ের জন্য পাগল ছিলি, তখনও?"
ছোঁয়ার কথাতে রুহি লজ্জায় একদম কুঁকড়ে গেল। মাথা নিচু করে ওড়নার খুঁট আঙুলে জড়াতে জড়াতে বিড়বিড় করে বলল, "হ্যাঁ রে... উনি তো তাই বললেন। ওই চারটা বছর উনি সব জেনেও আড়ালে থেকে আমাকে পাহারা দিয়েছেন ভালোবেসেছেন।"
পড়শি রীতিমতো নিজের মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। ড্যাবড্যাব করে রুহির দিকে তাকিয়ে বলল, "একি শোনালি তুই! আমি তো ভেবেছিলাম শাহাজ ভাই হয়তো ইদানিং তোর প্রতি একটু নরম হয়েছেন। কিন্তু ওই পাথরের মতো শক্ত মানুষটা যে এত বছর ধরে তোকে মনে মনে ধারন করে আসছেন, এটা শুনে তো আমি রীতিমতো টাসকি খেলাম রে! আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না।"
পড়শির কথা শেষ হতেই বিন্তি এবার রুহির একদম গা ঘেঁষে বসল। তার হাতের কয়েকটা খোসা ছাড়ানো বাদাম রুহির হাতে আলতো করে দিয়ে বিজ্ঞের মতো বলে উঠলো, "তার মানে মূল ঘটনা এটা দাঁড়ায় যে—শাহাজ ভাই শুরু থেকে পিয়াস ভাইয়ের ব্যাপারে সবকিছু জানতেন। সব জেনে-শুনে তিনি চুপ ছিলেন, সেই সাথে নিজের ফিলিংস গুলো তোকে এক ফোঁটা বুঝতে না দিয়ে উল্টো তোকে সঠিক পথে আনার জন্য নিজেকে ভিলেন বানিয়েছেন?"
রুহি ইশারায় মাথা নাড়িয়ে সায় দিল এই বোঝাতে যে বিন্তি একদম ঠিক ধরেছে। রুহি যখন ইশারা করছিলো তখন ওর চোখের কোণে খুশির জল চিকচিক করছিলো আর যা বিন্তির চোখ এড়ালো না।
ঠিক তখনই পড়শি হঠাৎ নাটুকে ঢঙে পাশের বেঞ্চে হেলে পড়ল। দু-হাত দিয়ে বিন্তিকে জাপটে ধরে চিৎকার করে উঠল, "এই কেউ আমাকে ধর! আমার পুরো দুনিয়া ঘুরছে রে! আমি কি শুনলাম এসব? এগুলো তো অবিশ্বাস্য! সিনেমার স্ক্রিপ্টকেও হার মানিয়ে দিল আমাদের শাহাজ ভাই। রুহি, তুই তো লাকি নয়, তুই তো সুপার লাকি দোস্ত! এমন একটা শাহাজ ভাই আমি কোথায় পাবো?"
আকস্মিক পড়শির এমন হইহুল্লোড়ে পাশের কয়েকটা ছেলেমেয়ে কৌতূহলী হয়ে তাকাল। কিন্তু সেদিকে ওর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। এদিক ছেলে-মেয়েগুলোকে এভাবে তাকাতে দেখে রুহি লজ্জায় লাল হয়ে ছোঁয়ার কাঁধে মুখ লুকাল। শীতের এই দুপুরে বাদামের স্বাদের চেয়েও শাহাজের সেই গভীর ভালোবাসার গল্পটা যেন ওদের কাছে অনেক বেশি মিষ্টি আর মাদকতাময় মনে হতে লাগল।
কিন্তু হঠাৎ পড়শি কিছু একটা মনে হতেই সে রুহির হাতের কব্জিটা চেপে ধরল। আকস্মিক পড়শীর এমন কাজে রুহি ওর দিকে তাকালো দেখলো পড়শির চোখেমুখে দুষ্টুমির এক বিচিত্র ঝিলিক। আচমকা রুহি তাকাতেই পড়শি ফিক করে হেসে দিল। ওর অমন অকারণে হাসি দেখে তিন বান্ধবীই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।
"তুই এভাবে অকারনে হাসছিস কেন? কি হয়েছে তোর?" ; অবাক হয়ে প্রশ্নটি জিজ্ঞেস করলো রুহি।
রুহির প্রশ্নের বিপরীতে পড়শি এবার একটু লাজুক ভঙ্গি করে বলল, "কিছু মনে করিস না রুহি, কিন্তু আমার না একটা কথা ভেবে খুব হাসি পাচ্ছে, আবার মজাও লাগছে। আমি না রীতিমতো এক্সাইটেড!"
পড়শির কথা থামতে পাশ থেকে ছোঁয়া ওর পিঠে একটা কিল বসিয়ে দিয়ে বলল, "এত কিসের উত্তেজনা তোর? আর কী এমন ভাবছিস যে তোর হাসিই থামছে না?"
পড়শি কিল খেয়ে কুঁকড়ে গেল অতঃপর নিজের হাসি কিছুটা থামিয়ে রুহির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর হওয়ার ভান করল। "আগে প্রমিস কর তুই আমাকে মারবি না? প্রমিস?"
রুহি অবাক হলো বটে, তবে হাসতে হাসতে মাথা নাড়াল, "আচ্ছা বাবা, প্রমিস। এবার বলবি তো কী ভেবে হাসছিস?"
পড়শি এবার মুচকি হেসে বলে উঠল, "আমার না এটা ভেবে খুব মজা লাগছে যে—পিয়াজ্জা... থুক্কু, পিয়াস ভাইয়া যে তোকে একদিন তাচ্ছিল্য করে রিজেক্ট করেছিল, সেই পিয়াস যখন জানবে তুই এখন তাঁরই বড় ভাই শাহজাদা মোস্তাফার 'ব্যক্তিগত নেশা', তখন বেচারার মুখের অবস্থা কেমন হবে? এটা ভেবেই তো আমার হাসি থামছে না রে!"
কথাটা বলে পড়শি হোহো করে হাসতে শুরু করল। এদিকে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় ক্যাম্পাসের কয়েকজন সিনিয়র অদ্ভুতভাবে ওদের দিকে তাকালে রুহি লজ্জায় পড়ে পড়শীর মুখ চেপে ধরল। "বেয়াদব মেয়ে একটা! সবসময় শুধু উল্টাপাল্টা চিন্তা তোর মাথায় ঘোরে!"
রুহির কথা শুনে ছোঁয়াও তাল মেলালো। "পড়শি কিন্তু ভুল বলেনি রুহি। আমিও এটাই ভাবছিলাম। পিয়াস ভাই যখন এসব জানতে পারবে না, নিজের মাথা নিজেই দেওয়ালে ঠুকতে চাইবে এই বলে, যে হাতের লক্ষ্মী সে পায়ে ঠেলেছে!"
একসময় বিন্তিও হেসে সায় দিল। "আমার তো মনে হয় উনি আফসোস করারও সুযোগ পাবেন না। মানুষ যখন খুব সহজে কোনো কিছু পেয়ে যায়, তখন সেটার মূল্যায়ন করতে জানে না। রুহিও ওনার জীবনে ছিল খুব সহজে পাওয়া এক বস্তু, যার জন্য তাকে কোনো পরিশ্রম করতে হয়নি। কিন্তু শাহাজ ভাই... উফ! মানুষটা যে কতটা গভীর! হৃদয়ে আগ্নেয়গিরি পুষে রেখেও কী অদ্ভুত শান্ত থেকেছেন।"
বিন্তি এবার একটু থেমে রুহির চোখের দিকে তাকাল। ওর চাহনিটা এবার বেশ সিরিয়াস। "আচ্ছা রুহি, একটা কথা বল তো? ধর শাহাজ ভাই তোর জীবনে আসলেন না বা স্বীকার করলেন না যে উনি তোকে ভালোবাসেন। কিন্তু এর মাঝে যদি পিয়াস ভাই ফিরে এসে তোকে ভালোবাসার কথা জানাতেন, তবে কি তুই তাঁকে গ্রহণ করতি?"
আড্ডার চনমনে পরিবেশটা মুহূর্তেই থমকে গেল। রুহির চোখে এতোক্ষন থাকা সেই উজ্জ্বলতা পলকেই এক কঠিন গাম্ভীর্যে রূপ নিল। সে বিন্তির দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে বলল, "বিন্তি, মাটিতে ফেলা থুতু কি কেউ কখনো পুনরায় মুখে নেয়? রুহির কাছে পিয়াস হলো সেই ফেলে দেওয়া থুতু, যা সে কোনোদিন দ্বিতীয়বার ছোঁবে না। রুহি কোন খেলনা নয়, যে চাইলেই তাকে ছুড়ে ফেললে আবার দরকার পড়লে কাছে টেনে নিলে।"
রুহির কণ্ঠের সেই কাঠিন্য শুনে বিন্তি আর কথা বাড়াল না। পরিস্থিতিটা একটু থমথমে হয়ে পড়লে পড়শি ওর চঞ্চল স্বভাব দিয়ে আবারও আসর জমিয়ে তুলল। সে হইহই করে বলে উঠল, "আরে রাখ তো এসব ফালতু প্যাঁচাল! অনেক হয়েছে পিয়াস পুরাণ।" এরপর রুহির দিকে তাকিয়ে একেবারে ইনোসেন্ট একটা ফেস করে বলল, "রুহিইইইই! ট্রিট দিবি না আমাদের? শাহাজ ভাইয়ের পক্ষ থেকে হলেও দে! আমরা প্রানভরে দোয়া করব তোদের জন্য।"
পড়শীর এই চটপটে ভাব দেখে সবার গম্ভীর মুখগুলোতে আবারও হাসির রেখা ফুটল। "চল তবে ক্যান্টিনেই যাওয়া যাক," বলে চার বান্ধবী মিলে হাসাহাসি করতে করতে ছোট ক্যান্টিনের দিকে পা বাড়াল। শীতের সেই দুপুরটা বন্ধুদের একরাশ খুনসুটি আর নতুন এক জীবনের গন্ধে তালমাতাল হতে লাগল।
★★★
খন্দকার বাড়িতে আজ উৎসবের আমেজ। ভার্সিটি থেকে সবে মাএ ফিরেছে রুহি, বাড়িতে প্রবেশ করার জন্য সদর দরজা দিয়ে ভেতরে পা রাখতেই রুহির কানে এল খুশির কলরব। চারিদিকে একটা সাজসাজ রব, ড্রয়িংরুম থেকে ভেসে আসছে হাসাহাসির শব্দ। রুহি লক্ষ্য করল, সোফায় রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে আছে তার ফুপাতো বোন সিমি আর তার বর ফাহিম। তারা একা আসেনি সাথে পারভীন সুলতানা এসেছেন। আর তাদের ঘিরেই এতো হইচই, মমতাজ বেগম আর শাহাবুদ্দিন সাহেব সহ বাড়ির সকলে তাঁদের ঘিরে বসে গল্পে মেতেছেন। কিন্তু সবাই থাকলেও মিমিকে কোনদিকে দেখা গেল না।
এদিকে সদর দরজায় দাঁড়িয়ে রুহি একবার সিমির দিকে তাকাল। প্রচলিত একটা কথা আছে—বিয়ের পর নাকি মেয়েদের রূপ আরও বেড়ে যায়, সিমিকে দেখে আজ সেটাই সত্যি মনে হচ্ছে। সিমির মুখে বিষাদের কোনো ছিটেফোঁটা নেই, বরং সেখানে খেলা করছে এক অনাবিল উজ্জ্বলতা। গায়ের গয়না আর গাঢ় রঙের শাড়িটার সাথে তার গায়ের রঙটা যেন আরও বেশি দ্যুতি ছড়াচ্ছে। নতুন বউয়ের সেই চিরচেনা লাজুক অথচ তৃপ্ত ভাবটা তার চোখেমুখে স্পষ্ট।
রুহি এক মুহূর্তের জন্য ভাবল, হয়তো সিমিকে দেখে তার মনটা একটু খচখচ করবে, কিন্তু অদ্ভুতভাবে সে একদম স্বাভাবিক অনুভব করল। বরং নিজের অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে একটা হাসি ফুটে উঠল। সে ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে সবার সামনেই হাসিমুখে সিমিকে জড়িয়ে ধরল।
"কেমন আছ সিমি আপু? তোমাকে তো দারুণ দেখাচ্ছে!" রুহির কণ্ঠে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না।
সিমি একটু অবাক হলো সাথে পূর্বের করা কাজ মনে পড়তেই লজ্জিত হলো। কিন্তু সাথে রুহির এই আন্তরিকতায় ও বেশ খুশি হলো সে। এরপর রুহি সিমির বরের দিকে তাকিয়ে সৌজন্যমূলক হাসি দিয়ে বলল, "কেমন আছেন ফাহিম ভাইয়া? জার্নিতে খুব কষ্ট হয়নি তো?"
ফাহিমও হাসিমুখে ছোটবোন রুপি শালিকার সাথে কুশলাদি বিনিময় করল। বাড়ির বড়দের সাথে একটু কথা বলে রুহি ব্যাগটা কাঁধে ঠিক করে নিয়ে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। তার মনের ভেতরটা আজ এতটাই পূর্ণ যে, কোনো পুরনো স্মৃতি বা অপ্রাপ্তি তাকে আর স্পর্শ করতে পারছে না। নিজের অজান্তেই সে গুনগুন করে একটা সুর ভাঁজতে শুরু করল—হয়তো সেই মাউথ অর্গানের চেনা কোনো সুর।
~~~~~ খন্দকার বাড়ির ডাইনিং টেবিলে আজ রাজকীয় আয়োজন। নতুন জামাই ফাহিম আর আদরের মেয়ে সিমি এসেছে বলে কথা! তানজিনা বেগম, নাসরিন বেগম আর ইয়াসমিন বেগম—তিন জা মিলে যেন রান্নার প্রতিযোগিতা বসিয়েছেন। টেবিলে তিল ধারণের জায়গা নেই। ভাপা ইলিশের ম ম গন্ধ, বড় সাইজের গলদা চিংড়ির মালাইকারি, খাসির রেজালা, ডাল সবজি আর হরেক পদের ভর্তায় পুরো ডাইনিং রুম ম ম করছে। সিমিদের আগমনে মোস্তফা কামাল সাহেবও আজ দপ্তরে দেরি না করে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরেছেন। বাড়ির সবাই এখন তাঁর জন্যই অপেক্ষা করছেন, যাতে একসাথে বসে দুপুরের খাবারটা সারা যায়।
রুহি তার রুম হতে নিচে নেমে এসেছে প্রায় অনেক্ক্ষণ হলো, এসেছে ধরেই সে ডাইনিং এর একপাশে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ নয়নে খাবারগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। হাতে তার মোবাইল ফোনটি ধরা যাতে ক্যামেরা সেটআপ অন করা। রুহি একে একে বিভিন্ন এঙ্গেলে খাবারের ছবি তুলে যাচ্ছে, বিশেষ করে ওই বিশাল সাইজের চিংড়ি আর সরষে ইলিশের বাটিটার ওপর দিয়ে তার নজর যেন সরছেই না। সে এতটাই তন্ময় হয়ে খাবারের সুবাস নিচ্ছিল যে, বাইরের জগতের খেয়াল তার একদম নেই।
ঠিক তখনই শাহাজ বাড়িতে প্রবেশ করল। বাড়িতে এসেই ফাহিমকে দেখেই তার সাথে বেশ অমায়িকভাবে করমর্দন আর কুশলাদি বিনিময় সেরে নিল সে। সিমির সাথেও ছোট করে কিছু কথা বলে যখনই সে নিজের রুমের দিকে এগোতে চাইল, তখনই তার চোখে পড়ল ডাইনিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রুহি। রুহি যেভাবে একদৃষ্টিতে চিংড়ি মাছের দিকে তাকিয়ে আছে, তা দেখে শাহাজের ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। সে সিঁড়ি দিয়ে উপরে না উঠে ধীরপায়ে রুহির একদম পেছনে এসে দাঁড়াল। এতোটাই ধীরে সে এসে দাঁড়ালো যে রুহি টেরই পায়নি। অতঃপর শাহাজ একটু ঝুঁকে রুহির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, "আশেপাশে অনেক মেহমান আছে, তাই একটু সাবধানে।"
আকস্মিক শাহাজের তপ্ত নিশ্বাস আর কণ্ঠস্বর কানে আসতেই রুহি আঁতকে উঠে পেছনে ফিরল। রীতিমতো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তার মুখ যেন হা হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, শাহাজ নির্ঘাত এতোক্ষণ করা তার সব কান্ডকারখানা আড়াল থেকে দেখে নিয়েছে। চরম লজ্জায় আর অস্বস্তিতে রুহির ইচ্ছে করছে মাটির নিচে ঢুকে যেতে। তাই নিজেকে একটু বাঁচাতে সে তোতলাতে তোতলাতে কাঁচুমাচু মুখে বলল, "আ... আমি... আসলে... মাছি তাড়াচ্ছিলাম।"
হীরা এমন কথাতে শাহাজ এক ভ্রু কুঁচকে রুহির দিকে এমনভাবে তাকাল যে রুহি বুঝল তার মিথ্যেটা একদম ধোপে টেকেনি। এদিকে শাহাজের চোখের কোণে তখন চিকচিক করছে দুষ্টুমিভরা হাসি।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই রান্নাঘর থেকে ইয়াসমিন বেগম বেরিয়ে এলেন। শাহাজকে দেখে তিনি হাসিমুখে এগিয়ে এলেন। "চলে এসেছিস বাবা? খুব ভালো হয়েছে। যা, তাড়াতাড়ি হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে আয়। তোর আব্বুরা সবাই চলে এসেছেন, আমরা এখনই খাবার পরিবেশ করবো। জলদি আয় সবাই একসাথে খেতে বসবি।"
শাহাজ রুহির দিক থেকে নজর সরিয়ে ইয়াসমিন বেগমকে মৃদু হেসে বলল, "হ্যাঁ মেঝ মা, আসছি।" যাওয়ার আগে সে আড়চোখে রুহির দিকে একবার তাকাল, যার অর্থ ছিল—"তোর এই মাছি তাড়ানোর গল্পটা পরে শোনা যাবে।"
এদিকে ডাইনিং টেবিলে আজ উৎসবের পূর্ণতা। মোস্তফা কামাল সাহেব এসে তাঁর নির্দিষ্ট আসনে বসতেই একে একে বাড়ির পুরুষ সদস্যরা আর ছোটরা সবাই ডাইনিংয়ে এসে জড়ো হলো। বিশাল আকৃতির টেবিল হওয়ায় মোটামুটি প্রায় সবাই একসাথে বসার জায়গা পেয়েছে। তবে বাড়ির মহিলারা এখন পরিবেশনে ব্যস্ত। ইয়াসমিন বেগম আর পারভীন সুলতানা যেন ছায়ার মতো নতুন জামাই ফাহিমের দুপাশে দাঁড়িয়ে আছেন—এক মুহূর্তের জন্যও তাঁর থালা খালি হতে দিচ্ছেন না। অপরদিকে তানজিনা বেগম বাকিদের দেখভাল করছেন, আর নাসরিন বেগম রান্নাঘর থেকে গরম গরম পদগুলো নিয়ে এসে বাটি পূর্ণ করছেন।
এই বাড়ির একটা অলিখিত নিয়ম আছে। টেবিলের এক প্রান্তে বসেন মোস্তফা কামাল সাহেব আর অন্য প্রান্তে মুরুব্বি মমতাজ বেগম। আর মোস্তফা কামালের ঠিক পাশের চেয়ারটি যেন রুহির জন্য সংরক্ষিত এক নিজস্ব সিংহাসন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর অভ্যাস রুহিকে পাশে বসিয়ে খাওয়ানো। তবে ইদানিং ডাইনিংয়ের সমীকরণে একটা নতুন পরিবর্তন এসেছে—রুহির পাশের চেয়ারটিতে আগে যেখানে মুগ্ধ নয়তো রুবি বসত এখন নিয়মিত বসে শাহাজ। অন্যদিনের আজও তার ব্যতিক্রম হলো না; সবাই যখন খেতে শুরু করবে, ঠিক তখনই শাহাজ তাঁর স্বভাবসুলভ ধীরস্থির ভঙ্গিতে এসে রুহির পাশের চেয়ারটি টেনে বসল। এদিকে শাহাজ বসে দেখেই কেউ এখন ওই চেয়ারটিতে বসতে সাহস করে না। কিন্তু পিয়াস সুযোগে থাকে কখন চেয়ার টি খালি পেলে সেখানে রুহির পাশে বসবে কিন্তু তেমন একটা সুবিধা করতে পারে না।
এদিকে খাওয়ার পর্ব শুরু হতেই রুহি অধীর আগ্রহে বসে আছে তার প্রিয় পদগুলোর জন্য। একে একে সব তরকারি পাতে পড়তে শুরু করলেও সে খুব একটা কিছুই নিল না। অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এলো; নাসরিন বেগম বড় সাইজের গলদা চিংড়ির বাটি নিয়ে হাজির হলেন। রুহি যখন মনে মনে নিজের পাতে বড় চিংড়িটা কল্পনা করছে, ঠিক তখনই সে দেখল তার মা খুব যত্ন করে সবচেয়ে ছোট আর তার মতে অপুষ্টিতে ভুগতে থাকা চিংড়িটা তার পাতে তুলে দিলো। রুহি বার কয়েক নিজের পাতের দিকে তাকালো, সে কি ভুল দেখছে। কিন্তু না বারবার একই জিনিস দেখে একসময় অত্যন্ত অসহায় দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকাল। কিন্তু নাসরিন বেগম যেন আজ পণ করেছেন মেয়ের আবদার পাত্তা দেবেন না; তাই তো তিনি নির্বিকার মুখে নিজের কাজ করে গেলেন।
এদিকে মায়ের দিক থেকে কোনো সান্ত্বনা না পেয়ে রুহি মনে মনে ফুঁসতে লাগল। তবে তার শেষ আশা ছিল ‘ভাপা ইলিশ’। একটু পরেই তানজিনা বেগম যখনই এক টুকরো ইলিশ রুহির পাতে দিতে যাবেন, ঠিক তখনই নাসরিন বেগম অপর পাশ থেকে কড়া গলায় বলে উঠলেন, “বড় ভাবি, ওকে ইলিশ মাছ দিও না। ওর এমনিতেও এলার্জির সমস্যা আছে, তার ওপর এত কাটা বেছে খেতে পারবে না।”
রুহি আকাশ তার মায়ের কথাতে থেকে পড়ল। মায়ের দিকে এমনভাবে তাকাল যেন তাঁর সামনে আজ মা নয়, স্বয়ং হিটলার দাঁড়িয়ে আছেন! কিন্তু এতোকিছুর পরেও রুহি তবুও আশা ছাড়লো না, কারন রুজি জানে সে যদি তার বড় মাকে একটু অনুনয় করে বলে তবে তানজিনা বেগম তাকে ঠিক এই মাছটা তুলে দিবেই। তাই তো সবে সে তার বড় মাকে কিছু একটা বলতে যাবে কিন্তু তার আগেই নাসরিন বেগম তার দিকে এমন ভাবে তাকালেন যা দেখে রুহির যেন আত্মাটাই শুকিয়ে গেল। সে এমনভাবে চুপ হল যে একটি কথাও আর তার মুখ দিয়ে বের হলো না। এদিকে তানজিনা বেগম তবুও দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু নাসরিন বেগমের বারবার বারণে তিনি আর দিতে পারলেন না। এসব দেখে রুহির মুখটা মুহূর্তেই কালো মেঘের মতো অন্ধকার হয়ে গেল। প্রিয় সব খাবার চোখের সামনে অথচ পাতে কিছুই পড়ছে না—এই দুঃখ সে কোথায় রাখে!
ঠিক তখনই নিঃশব্দে একটি কাণ্ড ঘটল। রুহি যখন তার পছন্দের কিছুই খেতে পারছিলো না তখনই শাহাজ অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নিজের প্লেটে দুটি বড় ইলিশের টুকরো তুলে নিল। রুহি আড়চোখে একবার শাহাজের দিকে তাকাল, কিন্তু কিছু বলল না। অন্য সময় হলে হয়তো সে প্রতিবাদ করত বা অভিমান করে উঠে যেত, কিন্তু আজ বাড়িতে মেহমান, নতুন দুলাভাইয়ের সামনে নিজের মান-সম্মানটুকু বিসর্জন দিতে চাইল না সে। তাই চুপচাপ বসে থেকে সে মনে মনে নিজের ভাগ্যকে দোষ দিতে লাগল।
রুহির অবস্থা এখন তথৈবচ। ক্ষুধার চোটে পেট চুঁইচুঁই করছে, অথচ সামনে পছন্দের খাবার থেকেও পাওয়ার উপায় নেই। অভিমানে তার বুক ফেটে যাচ্ছে। মনে মনে সে এক কঠিন পণ করে ফেলল—"যেহেতু মা আজ আমাকে আমার প্রিয় খাবারগুলো খেতে দিল না, তাই আমি অন্য কোনো পদ স্পর্শও করব না। আজ শুধু সবজি দিয়েই ভাত খেয়ে টেবিল ছাড়ব।"
যেই ভাবা সেই কাজ। রুহি একটু ঝুঁকে সবজির বাটিটা নিজের দিকে টেনে নিল। উদাস মনে চামচ ভর্তি সবজি যখন সে নিজের পাতের কাছে এনেছে, ঠিক তখনই এক অভাবনীয় দৃশ্য সবার নজরে এল।
এতক্ষণ মোস্তফা কামাল সাহেব নিঃশব্দে সব খেয়াল করছিলেন। রুহি ইলিশের কাঁটা বেছে খেতে পারে না বলে বরাবরই তিনি বা তানজিনা বেগম ওকে বেছে দেন। আজকেও তিনি নিজের পাতের বড় এক টুকরো মাছ পরম মমতায় বেছে একপাশে সরিয়ে রেখেছিলেন রুহিকে দেওয়ার জন্য। তিনি যেই না হাত বাড়িয়ে রুহির পাতে মাছটুকু দিতে যাবেন, ঠিক তখনই দেখলেন পাশের চেয়ার থেকে শাহাজ ঠিক অবিকল তাঁর মতোই ক্ষিপ্র হাতে মাছের কাঁটা ছাড়িয়ে একদম পরিষ্কার একটা টুকরো রুহির পাতে তুলে দিয়েছে।
রুহি সবজি ভর্তি চামচটা হাতে নিয়েই থমকে গেল। সে অবাক চোখে শাহাজের দিকে তাকাতেই শাহাজ চোখের ইশারায় ওকে শান্তভাবে ওটুকু খেয়ে নিতে বলল।
এদিকে কিসের রাগ কিসের পণ শাহাজের হঠাৎ এমন কান্ডে রুহির মনের সব মেঘ যেন এক নিমিষেই কেটে গেল। অতঃপর সে একবার আড়চোখে ‘হিটলার’ রূপী মায়ের দিকে তাকাল, ঠোঁটের কোনে দুষ্ট হাসি ঝুঁলিয়ে তারপর পরম আয়েশে শাহাজের বেছে দেওয়া মাছটুকু ভাতের সাথে মাখিয়ে মুখে পুরল।
অপরদিকে শাহাজ সেখানে থেমে থাকেনি; সে একে একে দুই টুকরো ইলিশের কাঁটা নিপুণভাবে বেছে রুহির পাতে তুলে দিল, এমনকি নিজের ভাগের সেই বড় সাইজের চিংড়িটার খোসা ছাড়িয়েও ওর পাতে রাখল।
এই দৃশ্য ডাইনিং টেবিলের সবার চোখে না পড়লেও কয়েকজনের নজরে ঠিকই পড়ল। তানজিনা বেগম, সিমি আর মোস্তফা কামাল সাহেব অবাক হয়ে শাহাজের এই নতুন রূপ দেখছিলেন। তবে নাসরিন বেগমের কাছে বিষয়টা একদম স্বাভাবিক ভাই-বোনের আবদারের মতোই মনে হলো। তিনি একটু আফসোস করে বললেন, "শাহাজ বাবা, মাছের সবটুকুই তো তুই এই পেটুকটাকেই খাইয়ে দিলি, নিজে তো কিছুই খেলি না! আরেক টুকরো মাছ দেই আব্বা?"
নাসরিন বেগমের কথার বিপরিতে শাহাজ খুব শান্ত আর সরলভাবে জবাব দিল, "আমার খাওয়া হয়ে গেছে সেজো মা।" কথাটি বলেই সে উঠে দাঁড়ালো।
অন্যদিকে রুহির মনটা এখন শান্তিতে ভরে উঠেছে। প্রিয় খাবারগুলো পেট ভরে খেতে পেরে সে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে। কিছুক্ষণ পর খাওয়া-দাওয়ার পর্ব শেষ হলো। রুহি তৃপ্তির এক লম্বা নিশ্বাস ফেলে টেবিল থেকে উঠল। আজ তার কাছে মনে হচ্ছে, এই বাড়ির খাবারে আগের চেয়েও অনেক বেশি স্বাদ, পরক্ষণেই আবার তার মনে হলো হয়তো তাতে শাহাজের আদরের ছোঁয়া মিশে ছিল বলে। এসব ভাবতে ভাবতেই রুহি লজ্জিত ভঙ্গিতে হাসলো।
রান্নাঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে রুহি যখন হাত ধুয়ে নিজের মনেই হাসছিল, ঠিক তখনই নাসরিন বেগম হন্তদন্ত হয়ে সেখানে ঢুকলেন। তাঁর চোখেমুখে শাসন আর কপট রাগের ছোঁয়া। রুহির দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে তিনি বলে উঠলেন, "ঐ রাক্ষসী মেয়ে! লজ্জা করল না তোর? বেচারা ছেলেটাকে তো কিছুই খেতে দিলি না, নিজের ভাগের সবটুকু মাছ তোকে বেছে খাইয়ে দিল আর তুই দিব্যি গোগ্রাসে সব খেয়ে নিলি? কবে বড় হবি তুই? আক্কেল জ্ঞান কবে হবে তোর!"
মায়ের এমন অন্যায্য অপবাদে রুহির মেজাজটা এবার বিগড়ে গেল। সে নাক কুঁচকে নাসরিন বেগমের কাছে এগিয়ে এসে তার শাড়ির আঁচল কোমড় থেকে টেনে তাতে হাত মুছতে মুছতে তড়বড়িয়ে বলে উঠল, "শাহাজ ভাই দিয়েছে বলে আমি খেয়েছি, আমি কি ওনার প্লেট থেকে কেড়ে নিয়েছি নাকি? তুমিই তো বড় মাকে বারণ করলে আমাকে ইলিশ মাছ দিতে। আমার পাতে তো তুমি কিচ্ছু দাওনি! আর রাক্ষস বলছো কাকে আমি রাক্ষস হলে তুমি আমার মা মনে রেখো।"
রুহির শেষের দিকের কথা শুনে নাসরিন বেগম বেজায় ক্ষেপলেন হাত নেড়ে বলে উঠলেন, "হ্যাঁ, শাহাজ দিয়েছে ঠিক আছে, কিন্তু তোর তো নিজের মুখে ছিলো নাকি! মুখটা নেড়ে বারণ করা যেত না। তুই কি জানিস না শাহাজ কত পছন্দ করে ইলিশ মাছ? আজ শুধু একবার বলিস আমার এলার্জি বেড়েছে তবে তোর পিঠে আমি দেখিস কি কি ভাঙ্গবো।"
রুহি এবার একটু ভড়কালো কিন্তু দমলোনা বরং চড়া গলায় অভিমানী সুরে জবাব দিল, "কেন বারণ করব আমি? উনি আমাকে ভালোবেসে দিয়েছেন। আর তুমি তো জানো আমি এগুলো খেতে কত পছন্দ করি। উনি দিয়েছেন, আমি খেয়েছি—এতে তোমার এত সমস্যা কিসের? আমি কি তোমার ভাগেরটা খেয়েছি? তুমিই তো আমাকে আমার ভাগের মাছটুকু খেতে দিলে না!"
নাসরিন বেগম এবার একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, "বেশি কথা বলিস না। কাল থেকে একদম শাহাজের পাশে খেতে বসবি না তুই। ওর পাশে বসে বসে সারাক্ষণ আবদার করিস। সেই ছোট থেকে ছেলেটাকে শান্তি দিস নি এখনো অশান্তিতে রেখেছিস। মাঝে তো ঠিকই দূরত্ব রেখেছিলি এখন আবার কি হলো ভয় ডর সব মরে গেছে হে।"
হঠাৎ মায়ের এমন কথায় আর এই হুকুম শুনে রুহির বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। সে কেন তার শাহাজ ভাইয়ের পাশে বসবে না? কেন তাকে দূরে থাকতে হবে? রাগে আর অভিমানে রুহির দুচোখ ফেটে জল আসার উপক্রম হলো। সে জেদের বশে গলার স্বর সপ্তমে তুলে বলল, "কেন বসব না? ১০০ বার বসব! হাজারবার বসব! শাহাজ ভাই তো কিছু বলেনি, তুমি কেন মাঝখানে বাধা দিচ্ছ?
এরপরেই রুহি হঠাৎ থেমে গেলো অতঃপর কন্ঠস্বরকে একদম নামিয়ে বিড়বিড় করে বলে উঠলো,.... দুরে থাকবো উহু, বয়ে গেছে, দূরে থাকবে আমার কচু! ওনার মনের খবর যদি আগে জানতাম তাহলে জীবনেও দূরে থাকতাম না, বরং একদম গ্লু এর মতো চিপকে থাকতাম তখন চাইলেও ছোটাতে পারতে না।"
কথাটা বলেই রুহি আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। রাগে গজগজ করতে করতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল সে।
এদিকে নাসরিন বেগম যেন আহম্মক হয়ে গেলেন, তিনি হা হয়ে গজগজ করতে থাকা রুহিকে দেখছেন, প্রায় মাঝে মাঝেই তিনি রুহির সাথে এমন ছোটখাটো বিষয় নিয়ে অল্প বাকবিতন্ডায় লিপ্ত হন। তার অবশ্যই অনেক কারণ থাকে, কখনো হয়তো মুগ্ধের উপর বিরক্ত হয়ে তা রুহির ওপর ঝাঁড়েন তো কখনো হয়তো রিমুর রাগ রুহির ওপর গিয়ে পড়ে, কিন্তু এর আগে রুহি কখনো এমন আচরণ করেনি। কিন্তু আজ যেন মেয়েটা একটু বেশি রেগে গিয়েছে। আকস্মিক মেয়ের এমন রাগের কারন যেন তার মগজেও আসছে না।
অপরদিকে রুহি রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে মনে মনে ঠিক করল, মা কেন যে যতই বারণ করবে, সে তত বেশি করে শাহাজের ছায়ার নিচে থাকবে। কার সাধ্য তাকে শাহাজের পাশ থেকে সরিয়ে দেয়! সে যে এখন শাহাজের ‘ব্যক্তিগত চাঁদ’, আর চাঁদ তো আকাশেই শোভা পায়।
চলবে.................