ফন্ট সাইজ:
থিম:
অন্তহীন প্রেম আমার

৬৮তম পর্ব

লেখক: Afifa Afnan

#অন্তহীন_প্রেম_আমার

#আফীফা_আফনান

#পর্ব_৫২(খ)

[কপি করা নিষিদ্ধ]

সোফায় দুই পা গুটিয়ে চুপচাপ বসে আছে রুহি। এদিকে বাইরে তখন হিমেল বাতাস আর মেঘলা আকাশের গুমোট ভাব বহমান কিন্তু তার ছিটেফোঁটাও যেন এই বাড়ির ভেতর নেই। বরং ড্রয়িংরুমের পরিবেশটা প্রতিদিনের মতোই বেশ ফুরফুরে। প্রতিদিনের মতোই বড় মা তানজিনা বেগম আর মেঝ মা ইয়াসমিন বেগম পাশাপাশি বসে আয়েশ করে কাঁচা মটরশুঁটি ছিলছেন; আগামীকাল দুপুরের মেন্যুতে কী কী পদ থাকবে, তা নিয়েই তাঁদের জল্পনাকল্পনার শেষ নেই। এদিকে নাসরিন বেগম আর রিমু মার্কেটে গিয়েছেন মুগ্ধর জন্য নতুন বই-খাতা আর স্টেশনারি কিনতে।

অন্যদিকে ​সোফায় মমতাজ বেগমও বসে আছেন। তাঁর ঠিক উল্টো দিকে রুবি যে গভীর মনোযোগে মোবাইলে স্ক্রল করছে। আর এক কোণে মুগ্ধকে নিয়ে বসেছে রুহি। মুগ্ধ আজ রুহির কাছে পড়তে বসেছে, যদিও পড়ার চেয়ে তাঁর জানালার বাইরের মেঘলা আকাশ দেখার ঝোঁকই বেশি। বাড়ির সবাই যখন যাঁর যাঁর কাজে ব্যস্ত, ঠিক তখনই কলিংবেল বেজে উঠল। দপ্তরের কাজ আজ একটু তাড়াতাড়ি শেষ হওয়ায় মোস্তফা কামাল ও কবির সাহেব একসাথে বাড়ি ফিরেছেন। তাঁদের পিছু পিছু শাহাবুদ্দিন চাচ্চু আর শাহাজও ভেতরে ঢুকল।

​স্বামীদের ফিরতে দেখেই চিরাচরিত বাঙালি নারীদের মতো তানজিনা আর ইয়াসমিন বেগম এগিয়ে গেলেন। পরম যত্নে তাঁদের হাত থেকে ব্যাগ আর কোটগুলো বুঝে নিলেন। অন্যদিকে শাহাজ আর শাহাবুদ্দিন চাচ্চু নিজেদের মতো উপরে নিজ নিজ রুমে চলে গেলেন ফ্রেশ হতে। রুহি স্থির দৃষ্টিতে বড় মা আর মেঝ মার এই চিরচেনা যত্নগুলো দেখছিল। তাঁর মনের ভেতর হঠাৎ এক পশলা দীর্ঘশ্বাস খেলে গেল। সে মনে মনেই বিড়বিড় করল— আজ যদি ছোট মা থাকতেন, তবে তিনিও নিশ্চয়ই বড় মা আর মেঝ মার মতোই চাচ্চুর কোটটা হাতে নিতেন, সাথে চাচ্চুর ক্লান্তির ভাগটুকুও নিতেন।

​ভাবতে ভাবতেই রুহি এক গভীর নিঃশ্বাস ফেলল। পাশ থেকে মুগ্ধ কনুই দিয়ে একটা খোঁচা দিয়ে জিজ্ঞেস করল, "কী হয়েছে আপু? এভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলছ কেন?"

মুগ্ধের এমন কথাতে রুহি সামলে নিয়ে একটু কড়া গলায় বলল, "কিছু না, তুই পড়তে থাক। এত দিকে চোখ যায় কেন তোর?" অতঃপর মুগ্ধ মুখটা একটু গোমরা করে আবারও বইয়ে পাতাতে মনোযোগ দিল।

​খানিক বাদে সবাই ফ্রেশ হয়ে ড্রয়িংরুমে এসে জড়ো হলেন। পিয়াসও নিজের রুম থেকে নেমে এসেছে সে এতোক্ষন তার ঘরেই ছিলো। ইদানিং কেমন চুপচাপ থাকে সে। এদিকে রান্নাঘরে আবার চুলাতে চা চড়ানো হয়েছে। কামাল সাহেব আর কবির সাহেব এসেই মমতাজ বেগমের সাথে গল্পে মেতেছেন। আর শাহাবুদ্দিন চাচ্চু ও শাহাজ এসে বসল রুহি আর রুবির পাশে। মুগ্ধর পড়া কতদূর হলো, কি কি পড়লো সেটাই পরখ করে দেখছিলেন চাচ্চু। একসসয় শাহাজ দুষ্টুমি করে বলে উঠল, "দেখি তো টিচার কেমন পড়ায়! নিজে কিছু পারে নাকি শুধুই সময় নষ্ট?"

​বলেই সে মুগ্ধকে চটপট কয়েকটা কঠিন প্রশ্ন করে বসল। মুগ্ধও দমে যাওয়ার পাত্র নয়, সে বেশ ঠিকঠাক উত্তর দিয়ে দিল। এবার শাহাজ রুহির দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলল, "টিচার তো দেখি ভালোই পড়ায়! গুড।"

এদিকে শাহাজের এমন কথাতে রুহি অবজ্ঞার ভঙ্গিতে একবার মুখ বাঁকালো, যা দেখে শাহাজের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে সূক্ষ্ম হাসি ফুটে উঠল।

এসবের মাঝেই ​হঠাৎ করেই বাইরে বাতাসের বেগ বাড়তে শুরু করল। সাথে জানালার কপাটগুলো সশব্দে নড়ে উঠছে। বাতাস দেখে তানজিনা বেগম চিন্তিত হয়ে পড়লেন নাসরিন আর রিমুর জন্য। রুবিকে বললেন রিমুকে ফোন করতে। মায়ের কথামতো রুবি ফোন করতেই জানা গেল, তারা বাড়ির পথেই আছে।

এদিকে চা পরিবেশ করা হলো। রুহি ইতিমধ্যে একবার চা খেয়েছে,তবে আজ শীতের দাপট বেশি থাকায় আবারও চা নিলো। ​চায়ের কাপে চুমুক পড়ার সাথে সাথেই রুহি মুগ্ধকে পড়া থেকে একটু বিরতি দিল। সুযোগ পেয়েই মুগ্ধ রিমোট তুলে নিয়ে টিভি অন করে দিল। রুহি বারবার বারণ করা সত্ত্বেও সে শুনল না। কিন্তু টিভি অন করেও বিশেষ লাভ হলো না কারন, বাতাসের তোড়ে ক্যাবল লাইনে সমস্যা হওয়ায় চ্যানেলগুলো সব ঝিরঝির করছে। মুগ্ধ একের পর এক চ্যানেল পাল্টেই যাচ্ছে কিন্তু ক্লিয়ার কোনো ছবি আসছে না। মুগ্ধের এমন বারবার চ্যানেল পাল্টানোতে রুহি একরকম বিরক্ত হয়ে এগিয়ে গিয়ে রিমোটটা ছিনিয়ে নিতে চাইল। আর ঠিক এই ধস্তাধস্তির মাঝেই হঠাৎ করেই রিমোটে চাপ পড়ে একটি খবরের চ্যানেল সামনে চলে এল।

​মুহূর্তেই পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। টিভির পর্দায় ফুটে উঠেছে সেই চিরচেনা তেজোদীপ্ত অবয়ব—রুপাঞ্জলি হাসান। একটি নামী চ্যানেলের টকশোতে তিনি খুব সুন্দরভাবে হাসিমুখে নিজের একটি সাম্প্রতিক মামলার সাফল্য নিয়ে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। আইনের বিভিন্ন ধারা আর কূটতর্ক নিয়ে অত্যন্ত সাবলীলভাবে কথা বলছেন তিনি।

​একটু আগে যে ড্রয়িংরুম কলতানে মুখর ছিল, সেখানে এখন পিনপতন নীরবতা। রুহি আড়চোখে সবার প্রতিক্রিয়া দেখার চেষ্টা করল। সবার চেহারায় যেন এক একটা অজানা ঝড়ের আভাস। একসময় রুহির দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো শাহাবুদ্দিন চাচ্চুর ওপর। চাচ্চু যেন চাতক পাখির মতো টিভির পর্দার দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁর চোখে এক অদ্ভুত হারানোর বিষাদ, আবার সেই বিষাদ ছাপিয়ে এক অসীম ভালোবাসার ছায়া স্পষ্ট ফুটে উঠছে।

​ঠিক সেই মুহূর্তেই মমতাজ বেগম এক হূঙ্কার ছাড়লেন। তাঁর কণ্ঠস্বরে রুহি সহ বাকিরাও যেন কেঁপে উঠল। তিনি কড়া গলায় মুগ্ধকে টিভি বন্ধ করার আদেশ দিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন। দাদির এই হঠাৎ রাগের কারণ বাড়ির অন্যদের কাছে জানা থাকলেও, রুহির কাছে সব এখনও অস্পষ্ট, অনেকটা ধোয়াশাতে ঘেরা। কিন্তু হঠাৎ রুহির চেম্বারে থাকা অবস্থায় তার ছোট মার বলা কথা গুলো মনে পড়ে গেলো। সে বুঝলো না দাদি কেন রুপাঞ্জলি হাসানের নামটাও এই বাড়িতে শুনতে চান না, তা বুঝতে না পেরে রুহির ভেতরটা এক অজানা হাহাকারে ভরে উঠল। দাদির ওপর আজ একটু রাগই হলো তার, কিন্তু শাহাবুদ্দিন চাচ্চুর সেই তৃষ্ণার্ত চাউনিটা রুহির মনে এক দীর্ঘস্থায়ী কষ্টের ছাপ ফেলে গেল।

এদিকে দাদি হুঙ্কার দিয়ে ড্রয়িং রুম থেকে বেরিয়ে গেলেও, রুহির হাত রিমোটের দিকে এগোল না। সে আড়চোখে শাহাবুদ্দিন চাচ্চুর দিকে তাকাল। চাচ্চু তখনো অবশ হয়ে টিভির পর্দার দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁর সেই তৃষ্ণার্ত চাউনি দেখে রুহির মনে হলো, এখন টিভি বন্ধ করা মানে চাচ্চুর শেষ অবলম্বনটুকু কেড়ে নেওয়া।

​ঠিক সেই মুহূর্তেই বাইরের ঝোড়ো হাওয়ার সাথে পাল্লা দিয়ে কলিংবেল বেজে উঠল। রুবি দরজা খুলতেই নাসরিন বেগম আর রিমু ঘরে প্রবেশ করলেন। রিমুর হাতে বেশ কিছু বিরিয়ানির প্যাকেট—যাওয়ার সময় মুগ্ধ বায়না করেছিল, তাই তার মা ফেরার পথে সবার জন্যই বিরিয়ানি নিয়ে এসেছেন। নাসরিন বেগম বেশ হাসিমুখেই ঘরে পা রেখেছিলেন, কিন্তু ড্রয়িংরুমের থমথমে পরিবেশ আর সবার পাথরের মতো জমে থাকা মুখ দেখে তিনি হকচকিয়ে গেলেন।

​তিনি কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবেন, তখনই তানজিনা বেগম ইশারায় তাঁকে চুপ করতে বললেন এবং ইশারাতে পেছনে দেখালেন। নাসরিন বেগম কৌতুহল নিয়ে পেছনে টিভির পর্দার দিকে তাকাতেই তাঁর ঠোঁট দিয়ে অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে এল একটি নাম— "অঞ্জলি!"

​পুরো বাড়ি তখন এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে থমকে আছে। এরই মাঝে দাদির রুম থেকে মোস্তফা কামাল আর কবির সাহেবের জোরালো কণ্ঠস্বর ভেসে এল। দুই ভাই মিলে তাঁদের মাকে কিছু একটা বোঝানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, কিন্তু মমতাজ বেগম যেন আজ রণচণ্ডী মূর্তি ধারণ করেছেন। তিনি কিছুতেই বুঝতে চাইছেন না, উল্টো ছেলেদের ওপরই সমানে চোটপাট করে চলেছেন। তাঁর গলার আওয়াজ ড্রয়িংরুম পর্যন্ত স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। অন্যদিকে ​শাহাজ সোফায় হেলান দিয়ে সবটা চুপচাপ দেখছিল আর শুনছিলো। তাঁর দৃষ্টি ছিল ভাবলেশহীন, কিন্তু চোয়ালের হাড় শক্ত হয়ে আছে।

একসময় শাহাবুদ্দিন সাহেব আর সহ্য করতে পারলেন না। তিনি যন্ত্রের মতো উঠে ধীর পায়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেলেন। তাঁর যাওয়ার পথে কেউ বাধা দিল না। তিনি চোখের আড়াল হতেই নাসরিন বেগম দ্রুত হাতে টিভিটা অফ করে দিলেন। যেন বিষাক্ত কোনো দৃশ্য থেকে সবাইকে মুক্তি দিলেন।

​এদিকে রুহি তার চাচ্চুর এমন বিমর্ষ প্রস্থান দেখে কিছু একটা বলতে চেয়েছিল, কিন্তু শাহাজ বিদ্যুৎগতিতে রুহির হাতের কবজি চেপে ধরল। সে রুহির চোখের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বারণ করল। রুহি যখন এই দৃশ্য দেখছিল, শাহাজ তখন তাঁর দিকে তাকিয়ে। শাহাজের চোখের ইশারা ছিল পরিষ্কার— ‘এখান থেকে যা, নিজের রুমে গিয়ে চুপচাপ বসে থাক।’

​মুহূর্তের মাঝে যেন হইচইয়ে মেতে থাকা বাড়িটা এক শ্মশানের নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। মটরশুঁটির বাটিটা তখনো সোফায় পড়ে আছে, কিন্তু তা ছিলার মানুষগুলো যেন আজ একেকটা বিমূর্ত ছবি। গরম বিরিয়ানির সুবাস তখন ঘর জুড়ে ছড়িয়ে পড়লেও, কারো মুখে এক দানাও রোচক খাবার তোলার রুচি অবশিষ্ট নেই। একসময় রুহি সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে এলো, ওঠার পরে একবার পেছন ঘুরে শাহাবুদ্দিন চাচ্চুর বন্ধ দরজার দিকে তাকাল না চাইতেও তার ভানাতে একটি কথা ভেসে উঠলো —অঞ্জলি নামের সেই নারীটি সত্যিই কি তবে এই বাড়ির প্রতিটি ইট-পাথরে একটা অদৃশ্য ক্ষতের নাম?

★★★

সময় গড়িয়ে চলল। রুহি নিজের রুমে চুপচাপ বসে আছে। আজকের দিনটা যতটা রোমাঞ্চকর আর অপ্রত্যাশিত ছিল, রাতটা যেন ঠিক তার জন্য ততটাই গুমোট আর অসহ্য হয়ে উঠেছে। মানুষের জীবনে হুট করে এমন অনেক কিছুই ঘটে যায় যা কল্পনাকেও হার মানায়। রুহি নিজের মনে অংক কষছে—তাঁর চাচ্চু আর ছোট মার দীর্ঘদিনের এই বিচ্ছেদের দেয়াল ভাঙাটা খুব একটা সহজ কাজ নয়, তবে অসম্ভবও নয়। কিন্তু কি এমন হলো যার জন্য আজ এই পরিস্থিতি?

​রুহি যখন গভীর ভাবনায় নিমগ্ন, ঠিক তখনই দরজায় হালকা টোকা পড়ল। সে ভেবেছিলো মা অথবা বোনদের সাঝে কেউ হবে তাই কিছু না জিজ্ঞেস করেই ঘোরলাগা গলায় বলল, "এসো।"

​রুহির অনুমতি পেয়ে হাতে বিরিয়ানির প্লেট নিয়ে রুমে প্রবেশ করল শাহাজ। রুহি এতটাই চিন্তার সাগরে ডুবে ছিল যে কে ঘরে ঢুকল, তা ভালো করে খেয়ালও করেনি। শাহাজ প্রবেশ করেই কিছুক্ষণ রুহির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে তাঁর মনের অস্থিরতা বোঝার চেষ্টা করল। তারপর নিঃশব্দে রুহির পাশে বিছানায় এসে বসল। প্লেটটা একপাশে নামিয়ে রেখে আলতো করে ডাকল, "রুহি?"

​রুহি চমকে উঠে শাহাজের দিকে তাকাল। শাহাজকে এভাবে পাশে বসে থাকতে দেখে সে একটু অপ্রস্তুত হয়ে নড়েচড়ে বসল। তা দেখে শাহাজ শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, "নিচে খেতে যাসনি কেন?"

​"ইচ্ছে করেনি," রুহি মুখ নিচু করে ছোট উত্তর দিল।

"কেন?"

"জানি না।"

"মন খারাপ?" শাহাজ আবারও প্রশ্ন করল।

রুহি এবার অপরাধীর মতো করে বলল, "হ্যাঁ।"

"কেন?"

"চাচ্চুর জন্য।"

​শাহাজ একটু সময় নিয়ে বলল, "এত অল্পতে মন খারাপ করলে কি চলে?"

​রুহি এবার সাহসের সাথে শাহাজের চোখের দিকে তাকাল। তাঁর চোখের কোণে একরাশ মিনতি আর কৌতূহল। সে ফিসফিস করে বলল, "আচ্ছা শাহাজ ভাই, চাচ্চুর জীবনে কি ছোট মাকে ফিরিয়ে আনা যায় না? আপনি কি চাচ্চুর চোখের চাউনি দেখেছেন? টিভিতে যখন ছোট মার সাক্ষাৎকারটা চলছিল, চাচ্চু ঠিক কীভাবে তাকিয়ে ছিলেন! আমার না দেখে খুব খারাপ লেগেছে শাহাজ ভাই।"

​শাহাজ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তার দৃষ্টি এখনো রুহির ওপরই স্থির। সে প্লেট থেকে এক লোকমা তুলে রুহির মুখের কাছে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "সবই বুঝলাম। এখন আগে তোর পছন্দের বিরিয়ানিটুকু খেয়ে নে।"

​"খাব না শাহাজ ভাই, একদম ইচ্ছে করছে না।"

"খেয়ে নে রুহি। তুই না খেয়ে থাকলে তো আর চাচ্চুর কষ্ট কমবে না, বরং এসব ঠিক হওয়ার বদলে আরও জটিল হবে।"

রুহি এবার উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল, "চাচ্চু কি খেয়েছেন? তিনি কি নিচে এসেছিলেন?"

"নাহ, তিনি নিচে আসেননি। তবে মা আর মেঝ মা ঘরে গিয়ে সামনে বসিয়ে খাইয়ে এসেছেন। এখন ওসব বাদ দিয়ে হা কর।"

​শাহাজ লোকমা তুলে রুহির মুখের সামনে ধরল। রুহি ছোট বাচ্চার মতো বাধ্য হয়ে মুখ খুলল। চিবোতে চিবোতে সে করুণ সুরে বলল, "চাচ্চু কি ওনার রুমে? আমি কি একটু যাব শাহাজ ভাই? উনি বোধহয় খুব কষ্টে আছেন।"

​"উনি এখন ওনার রুমে নেই। আমি যখন নিচে যাচ্ছিলাম, তখন দেখলাম উনি উপরে উঠছেন। সম্ভবত ছাদে গিয়েছেন।" শাহাজ উত্তর করলো।

রুহির চোখ দুটো চকচক করে উঠল। সে জেদ ধরে বলল, "তাহলে চলুন আমরাও ছাদে যাই। ওনার মনের কষ্টটুকু তো এই বাড়ির কেউ বুঝতে চায় না। আমরা তো অন্তত পাশে দাঁড়াতে পারি!"

এবার ​শাহাজ একটু হেসে বলল, "যেতে পারি, তবে আগে এই খাবারটুকু শেষ কর।"

​রুহি এবার আর না করল না, কারন সে জানে না খেলে সে যেতেও পারবে না। শাহাজ যেতে দিবে না। তাই সে বাধ্য মেয়ের মতো খেয়ে গেলো আর শাহাজও পরম মমতায় এক এক করে লোকমা তুলে দিতে লাগল, আর রুহিও চুপচাপ খেয়ে নিল। হুট করে রুহির মনে পড়ল শাহাজের কথা। সে জিজ্ঞেস করল, "আপনি খেয়েছেন?"

"নাহ, পরে খাব।"

"পরে কেন? এখনই খান," রুহি প্লেটটি শাহাজের দিকে একটু এগিয়ে দিল।

​অগত্যা শাহাজও আর না করতে পারল না। এক প্লেট থেকেই দুজনে ভাগ করে খেতে লাগল। বাড়ির থমথমে পরিবেশের মাঝে এই ছোট ঘরটিতে শাহাজ আর রুহির এই ভাগ করে খাওয়ার মুহূর্তটি যেন এক টুকরো প্রশান্তি হয়ে ধরা দিল।

অন্যদিকে আকাশ থেকে ঝিরঝিরে বৃষ্টি ঝরছে, সাথে হিমেল হাওয়ার ঝাপটা। ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে নিস্পলক দাঁড়িয়ে আছেন শাহাবুদ্দিন। যে মানুষটা সচরাচর সিগারেটে হাত দেন না, আজ তাঁর আঙুলের ভাঁজে একটি আধপোড়া সিগারেট। ধোঁয়ার কুণ্ডলীগুলো বাতাসের তোড়ে মিলিয়ে যাচ্ছে, আর তাঁর শূন্য দৃষ্টি কোনো এক অজানায় থমকে আছে।

এদিকে ​ছাদের দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে রুহি এই দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত। চাচ্চুর হাতের সিগারেট আর তাঁর এই ভেঙে পড়া অবয়ব রুহির ভেতরটাকে ওলটপালট করে দিল। সে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শাহাজের টি-শার্টের কোণাটা টেনে খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, “শাহাজ ভাই, চাচ্চু এখনো ছোট মাকে অনেক ভালোবাসেন, তাই না? তাহলে ওনারা আলাদা কেন হলেন?”

রুহির হঠাৎ এমন প্রশ্নে ​শাহাজ এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্ধকারের দিকে তাকাল। তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল পুরনো সব স্মৃতি। সে ধীর গলায় অতীতের সেই ধূসর দিনগুলোর বর্ণনা দিতে শুরু করল:

​“জানিস রুহি, দাদি চেয়েছিলেন তাঁর আপন বোনের মেয়ের সাথে ছোট চাচ্চুর বিয়ে দিতে। তিনি মনে মনে এক প্রকার কথা দিয়েও রেখেছিলেন। কিন্তু শাহাবুদ্দিন চাচ্চু তখন টগবগে যুবক; দাদির অমতে গিয়েই তিনি প্রেমে পড়েছিলেন কলেজপড়ুয়া রুপাঞ্জলির। তখন আমরা এক এলাকাতেই থাকতাম। রুপাঞ্জলি অর্থাৎ আমাদের বউ মার বাবা ছিলেন উকিল। আমাদের বাড়ির জমিজমা নিয়ে প্রতিবেশীদের সাথে তখন কিছু সমস্যা চলছিল, তাই আব্বাকে প্রায়ই ওনাদের বাড়ি যেতে হতো। চাচ্চুও যেতেন আব্বার সাথে, আর সেখান থেকেই তাঁদের প্রেমটা আরও গাঢ় হয়।”

​শাহাজ একটু থামল, যেন সেই দিনগুলো অনুভব করছে। তারপর আবার বলল, “এক সময় চাচ্চু বাড়িতে নিজের পছন্দের কথা জানান। কিন্তু দাদি প্রচণ্ড রেগে যান, কারণ তিনি বোনকে কথা দিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু চাচ্চু কারো পরোয়া করেননি। মায়ের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি রুপাঞ্জলিকে বিয়ে করে এই বাড়িতে নিয়ে আসেন। দাদি ক্ষুব্ধ হয়ে ছেলের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেন। পরে আব্বু আর মেঝ আব্বু অনেক বুঝিয়ে দাদিকে কিছুটা শান্ত করলেও দাদি এক কঠিন শর্ত জুড়ে দেন—অঞ্জলিকে পড়াশোনা বন্ধ করতে হবে। বাড়ির বাকি বউদের মতোই সংসারী হতে হবে।

দাদীর এমন শর্তে সবাই নাখুশ হলেও বউ মা মুখ বুজে সব মেনে নিয়েছিলেন কিন্তু বেঁকে বসেন চাচ্চু। তিনি বলতে গেলে দাদীর অবাধ্য হয়েই নিজের সর্বস্ব দিয়ে ওনাকে পড়াশোনা করান এবং ওনার স্বপ্ন পূরণের জন্য আইন শাস্ত্রে ভর্তি করান। কিন্তু ঝামেলার শুরু হলো এর পরেই।”

​শাহাজের কণ্ঠস্বর এবার কিছুটা ভারি হয়ে এল, “বাড়িতে আব্বুর সেই খালার এবং খালাতো বোনের আসা-যাওয়া শুরু হলো। তিনি যতোবারই আসতেন সবসময় হাহুতাশ করতেন। যার ফলে হাজার চেষ্টা করেও বউ মা দাদীর মন জিততে পারে নি। সময়ে অসময়ে দাদি সব সময় তাকে কথা শোনাতেন। তার ওপর বিয়ের অনেক সময় যাওয়ার পরেও বউমার কোন বাচ্চা না হওয়া। যেন তার ওপর আরো কাল হয়ে দাঁড়ালো।

এর পরেই একসময় বাড়িতে খুশির খবর এলো তুই নাকি পৃথীবিতে আসতে চলেছিস। এবার দাদী বউ মাকে আরো কোনঠাসা করলেন। কোন মতেই তাকে সেঝ মার কাছেও ঘেঁষতে দিতেন না। তিনি বলতেন সেঝমার কাছাকাছি গেলেই নাকি তার ক্ষতি হবে। সব সময় বলতেন তার বোনের মেয়েকে বিয়ে করালে এতোদিনে তার ছোট ছেলের ঘরে নাতিপুতি থাকতো।

একদিকে দাদির কটু কথা, আর অন্যদিকে খালাতো বোনকে নিয়ে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি—বউ মা ভেতরে ভেতরে ডিপ্রেশনে ভুগতে শুরু করেন। এক সময় তিনি আলাদা হওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেন, কিন্তু চাচ্চু রাজি হননি। এই তিক্ততা বাড়তে বাড়তে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাল যে, একদিন রুপাঞ্জলি হাসান কাউকে কিছু না বলেই এই বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন।”

​শাহাজ একটু থেমে আবার বলল, “সবাই যা-ই জানুক, আমার সব সময় মনে হয় বউ মার সেদিন হুট করে চলে যাওয়ার পেছনে অন্য কোনো বড় কারণ ছিল। যা আজও আমাদের সবার অজানা।”

​রুহি এতোক্ষন সবটা শুনলো তার চোখজোড়া ছলছল করছে। তার দাদী এমন কিছু করতে পারে তা যেন তার কল্পনাতেও ছিলো না। এবার সে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকা শাহাবুদ্দিন চাচ্চুর দিকে তাকাল। হঠাৎই তাঁর বুকটা ব্যথায় ভরে উঠল। সে আকুল হয়ে শাহাজকে জিজ্ঞেস করল, “শাহাজ ভাই, ওনাদের কি আর কোনোদিন মিল করা যায় না?”

​শাহাজ রুহির চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর ধীর অথচ প্রত্যয়ী কণ্ঠে বলল, “যায় রুহি। আন্তরিক চেষ্টা থাকলে পৃথিবীতে সব সম্ভব।”

​রুহি উৎসাহিত হয়ে শাহাজের হাতটা চেপে ধরল, “তাহলে চলুন না আমরা চেষ্টা করে দেখি!”

​শাহাজ এবার রুহির দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসল। তাঁর চোখের মণি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে রুহির কপালে হাত রেখে তার কপালে উড়তে থাকা অবাধ্য চুল গুলোকে কানের পাশে গুজে দিয়ে বলল,

—"সামনের দিনগুলো কিন্তু খুব একটা সহজ নয়, চঞ্চলা... ভয় পাবি না তো?"

শাহাজের আকস্মিক এমন কথাতে রুহি তার দিকে মাথা উঁচু করে তাকালো অতঃপর হাতের বাঁধন আরো শক্ত করে বলে উঠলো, —"আপনি আছেন না? আপনি থাকলে সব সহজ; আমার কোনো ভয় নেই। কোন ভয়'ই আমাকে ছুঁতে পারবে না।"

চলবে........

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন