#এক_মুঠো_অপূর্নতা পর্বঃ৩
#ফাতেমা_তুজ_জোহরা
ইয়াশ সমুদ্রের পাড়ে বসে একের পর এক ম* দের বোতল শেষ করে দিচ্ছে। চোখের সামনে ভেসে উঠছে রুশমিতার বড় বড় অক্ষিপুট। যা ইয়াশ কে আরো অস্থির করে তুলছে। ইয়াশ কে। সে ঝটপট উঠে একটা বোতল কে ছুড়ে মারলো সমুদ্রের পানিতে। হাত দিয়ে মাথার চুল গুলো আকড়ে ধরে বলল," আমার সাথে কি হচ্ছে এটা? কেন তার চোখ দুটো আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। আমি তাকে শেষ করতে চাই, যেভাবে আমার আব্বুকে কেড়ে নেয় নিয়েছিলো। কেড়ে নিয়েছিলো আমার আরেক মাকে । ওই কায়সার ফ্যামেলী কে আমি শেষ করতে চাই " বলেই হনহন করে সমুদ্রের পানিতে নেমে গেল। মাথায় তার দপদপ করে আগুন জ্বলছে। গোসল না করলে কিছুতেই ঠান্ডা হবে না। তাই এক মুহূর্ত দেরি করতে চাইলো না ইয়াশ। হরহর করে পানিতে নেমে গেল।
******
সকাল সাতটা,, রুশমিতা পিটপিট করে চোখ খুলে দেখল কোথাও ইয়াশ নেই। আশেপাশে চোখ ঘুরিয়ে ও দেখতে পেল না ইয়াশ কে। রুশমিতা অস্থির হয়ে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ায়। ইতিমধ্যে রুশমিতার চো* খে পানি জমতে শুরু করেছে। সে বুঝতে পারছে না ইয়াশ কোথায় গেল। এদিক সেদিক ঘাড় ঘুরিয়ে একটা চিরকুট তার নজর কাড়লো। চিরকুটটা ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সাথে আঠা দিয়ে আটকানো আছে।
ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে কাগজ টাকে টেনে হাতে নেয়। কাগজে লেখা আছে,"আমার খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ পরে গেছে কিটেন। তোমাকে জানাতাম কিন্তু তুমিতো ঘুমাচ্ছিলে। তোমার ঘুম ভাঙাতে খুব ক* ষ্ট হতো আমার। তাই চিরকুট লিখে রেখে গেলাম। জানিনা কখন দেখা হবে। কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি তোমার কাছে ফিরে আসার চেষ্টা করবো। তুমি নিয়মিত খাওয়া দাওয়া করবে। সময় মতো তোমার রুমে ফিরে যাও কিটেন। না হলে কেউ সন্দেহ করবে।
চিরকুটের লেখা টুকু পড়ে রুশমিতার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো। চো* খে পানি আর মুখে হাসি।
রুশমিতা আলগোছে চুল গুলো খোঁপা করে ওয়াশরুমে ছুটলো। আজকে সাজেক থেকে যাওয়ার শেষ দিন। তার বান্ধবীরা সবাই এলো বলে। তারা অন্য এক জায়গায় ঘুরতে গিয়েছে। সেখানে তারা কালকের রাতটা অতিবাহিত করেছে । রুশমিতা ইয়াশের সাথে থাকার জন্য বাহানা দিয়ে সরে যায়।
কিয়তক্ষন পর বেরিয়ে এলো ওয়াশরুম থেকে পরনে হলুদ কালারের গাউন। একবার নিজের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে গেল তার ঘরের দিকে।
******
ঢাকার বুকে ছয়তলা বিল্ডিং মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে কায়সার ভিলা। এই বাড়িটি তৈরি করেন সাজ্জাদ কায়সার বর্তমানে তিনি মৃত!এই ছয়তলা বিল্ডিং এ তার তিনজন ছেলে থাকে। তবে কেউ আলাদা নন। সবাই একসাথে মিলেমিশে থাকে। এই যুগে ভাইয়ে ভাইয়ে কত শ* ত্রুতা।আর এই তিন ভাইয়ের মধ্যে খুবই মিল। কেউ কাউকে ছাড়া থাকতে পারবে না। উপরের দুটো বিল্ডিংয়ে থাকে রবিন কায়সার, সাজ্জাদ কায়সারের বড় ছেলে তার । তার পরের দুই বিল্ডিং থাকেন রাশেদ কায়সার, সাজ্জাদ কায়সারের মেজো ছেলে। আর তারপরের দুইতালায় থাকে রাইয়ান কায়সার। মানে রুশমিতার বাবার নাম রাইয়ান কায়সার৷
তিনভাই আর তাদের মা রোকেয়া বেগম সোফায় গম্ভীর মুখে বসে আছে। পাশে রবিন কায়সারের স্ত্রী আমেনা আর রাশেদ কায়সারের স্ত্রী ইসরাত বেগম দাঁড়িয়ে আছে। আর রুশমিতার নেই। রুশমিতাকে জন্ম দিতে গিয়ে মা* রা যায়।
ইসরাতের মুখ জুড়ে চিন্তার আভা আর আমেনা বেগম ঠোঁটে বাঁকা হাসি বিদ্যমান।
এমন সময় রুশমিতা প্রবেশ করলো কায়সার ভিলায় সাত আট ঘন্টার জার্নি শেষ করে । রোকেয়া বেগম মানে রুশমিতা তার দাদি দেখে একদৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে। রোকের ঠোঁটে একচিলতে হাসি ফুটে সে ও রুশমিতার মাথায় হাত বুলাতে লাগলো। রুশমিতার বাবা রাইয়ান কায়সার উঠে তার মেয়ের দিকে আসতে নিবে এমন সময় আমেনা বেগম রুশমিতার ডান হাতটা ধরে হেঁচকা টান দিয়ে মেঝেতে আছরে ফেলল।কংক্রিটের মেঝেতে পড়ে সাথে সাথে রুশমিতার কপাল কেটে র * ধারা বইতে লাগলো।
কপালে এক হাত দিয়ে সবার দিকে তাকায়। রুশমিতার বাবা অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যেন কিছুই হয়নি এমন একটা ভাব ধরে আছে।ইসরাত বেগম দৌড়ে এসে রুশমিতাকে বুকে আগলে ধরলো। ইসরাতের চো* খ দিয়ে অনবরত পানি গড়িয়ে পড়ছে। রোকেয়া রা* গি কন্ঠে বলল," তোমার সাহস দেখে আমি অবাক হচ্ছি বড় বৌমা। ছোট মেয়েটাকে এইভাবে মেঝেতে আছরে ফেলতে তোমার হাতটা কেঁ* পে উঠলো না।
আমেনা কাটকাট গলায় বলল," না মা হয়না? এই মেয়ের জন্য এগুলো কিছু না আম্মা?
আমেনা রাগে ফোঁস ফোঁস করে কিছু বলতে যাবে তখন।
রবিন কায়সার রাগী কন্ঠে বলল," তুমি আর একটা কথা ও বলবে না আমেনা। না হলে আমার থেকে খা* রাপ কেউ হবে না। কিয়তক্ষন থেমে আবার বলল , " আর আমাদের বাড়ির মেয়ের গা* য়ে হাত তোলার সাহস হলো কিভাবে তোমার? নিজেকে বাড়ির মালকিন মনে করছো নাকি?
আমেনা বেগম আর কিছু বলল না। স্বামীর রাগী কন্ঠ শুনে দমে গেল সে। ভ * আর কিছু বলল না। কিন্তু রুশমিতাকে চোখ দিয়ে শাসাতে ভুললো না।
রুশমিতার রোকেয়ার কাছে গিয়ে হাত নেড়ে বলল," কি হয়েছে দাদু? বড় আম্মু কেন আমার গা * হাত তুললো।আমি তো সাজেক থেকে এইমাত্র ফিরলাম। আমি বড় আম্মুর কোন কিছুতেই হাত দেয়নি তাহলে……
আমি তোকে বলছি কেন আম্মু তোর গা * হাত তুললো.. কথাটা বলল রবিন আর আমেনার মেয়ে রিয়া কায়সার।
রুশমিতা ঝট করে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখে রিয়া দাঁড়িয়ে আছে। পরনে ওয়েস্টার্ন ড্রেস। চুল গুলো খোলা আছে।
রাশেদ রিয়ার উদ্দেশ্য বলল," থাক মামুনি তুমি আর কিছু বলো না। মেয়েটাকে আর কষ্ট দিওনা?
রিয়া রহস্যময়ী হাসি দিয়ে বলল," তার তো জানা উচিত চাচ্চু সাজেকে গিয়ে কি করে এসেছে" ব্যাগ থেকে কিছু ছবি বের করে রুশমিতার শরীরের উপরে ছুঁড়ে মারলো৷ একটা দুটো ছবি না, প্রায় দুই তিনশ ছবি ছুড়ে ফেলল।
ছবিগুলো সাদা পায়রার মতো উড়তে উড়তে রুশমিতার পায়ের কাছে গিয়ে ঠেকলো। রুশমিতা কৌতুহল দৃষ্টিতে ছবিগুলোর দিকে তাকাতেই তার মস্তিষ্ক বিকল হয়ে গেল। হা পা গুলো অনবরত কাঁপা কাঁপি করছে। ছবি গুলোতে রুশমিতা আর ইয়াশের ঘনিষ্ঠ সময়ের কিছু ছবি। ইয়াশের মুখ অতটা বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু রুশমিতার মুখ পুরোটাই বোঝা যাচ্ছে। নিজের শরীরে ভারসাম্য ধরে রাখতে পারলো না ধপ করে ছবিগুলো ওপরে বসে পড়লো রুশ। বড় বড় অক্ষিপুট দিয়ে অ* শ্রু ধারা গড়িয়ে পড়ছে।
আমেনা টিটকিরি দিয়ে বলল," দেখ তোকে কেন বলেছিলাম কথা গুলো। আরে তুই তো এখন দেখলি ছবিগুলো। আর আমার সকালে উঠে দেখছি কেউ আমাদের দরজার মেঝেতে ছবিগুলো বিছিয়ে রেখে গেছে । তাহলে ভাব আমাদের কি অবস্থা হয়েছিলো। হয়তো তোকে আমি দেখতে পারিনা। কিন্তু কোনদিন ভাবেনি এমন একটা কাজ করবি তুই ছি ছি ছি এতদিনে সম্মান, গৌরব সব কিছু ধুলেতে মিশিয়ে দিলি" বলেই মুখ ঝামটা দেয়।
রাশেদ আর রবিন সোফা থেকে উঠে এসে রুশমিতার সামনে দাঁড়ায়। রাশেদ তার স্ত্রীর ইসরাতকে বলল," তাড়াতাড়ি ফাস্ট এইড বক্সটা নিয়ে এসো। কতর * পড়ছে কপাল বেয়ে যাচ্ছে।
ইসরাত রুশমিতাকে রেখে চলে গেল ফাস্ট এইড বক্সটা আনতে। রাশেদ এগিয়ে গিয়ে রুশমিতাকে আগলে ধরে বসে বলল," ক* ষ্ট হচ্ছে মামুনি?
রুশমিতা কা* ন্নাভেজা চোখে তার মেজো আব্বুর দিকে তাকিয়ে রইলো কিছু বলল না। রুশমিতার বুঝতে পারছে ছবি গুলো তার আর ইয়াশের। কিন্তু এটা বুঝতে পারছে না কে তুললো ছবি গুলো। সে মাথা নিচু করে বসে রইলো। চোখে পানি দেখে রাশেদের বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠলো। ইসরাত তাড়াতাড়ি বক্সটা এনে দিতেই রবিন বক্সটা নিয়ে কপালে ব্যান্ডেজ করতে লাগলো। রাশেদ মাথা তুলে তার ছোট ভাইয়ের দিকে তাকায়। তার কি মনে এতটুকু ক* ষ্ট হচ্ছে না মেয়েটার জন্য। রাশেদ মাথা নিচু করে রুশমিতার মাথা টাকে বুকে আগলে ধরলো।
******
দেখতে দেখতে একমাস কেটে গিয়েছে এই একমাস রুশমিতা তার ঘর থেকে বের হয়নি কোনমতে। ইসরাত বেগম তাকে ঘরে এসে টাইম টু টাইম খাবার দিয়ে গিয়েছে। রুশমিতা এই একমাস ইয়াশের সাথে নানা ভাবে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে। বাট ফলাফল শূন্য। রুশমিতার চোখ মুখ আগে থেকে অনেক শুকিয়ে গিয়েছে। চোখের নিচে মোটা কালি পড়ে গেছে। তাকে দেখে কেউ অনায়াসে বলে দেবে মেয়েটা সারারাত জেগে পাড় করে। এরইমধ্যে ইসরাত বেগম রুশমিতার খাওয়ার নিয়ে প্রবেশ করতে করতে বলল," তাড়াতাড়ি খেয়ে নে মা? আজকে রিয়াকে দেখতে আসবে পাত্রপক্ষ কত কাজ আছে হাতে " বলেই খাবার টুকু রেখে একটা ব্যাগ বের করে আবার বলল," আজকে এই জামাটা পড়ে তৈরি হয়ে থাকবি? ওনারা যখন আসবে তখন নিচে যাবি আজ কোন বাহানা শুনবো না " কথাটুকু বলেই
ইসরাত বেগম তড়িৎ গতিতে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
রুশমিতা হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে রইলো সেদিকে ….
চলবে