#এক_মুঠো_অপূর্নতা পর্বঃ১২
#ফাতেমা_তুজ_জোহরা
বগুড়া, মেয়েটার নাম হলো আরোহী। একজন সরকারি হাসপাতালের নার্স।আর দুই বাচ্চার জননী। আরোহীর জমজ বাচ্চা। ছেলের নাম সাফওয়ান, আর মেয়ের নাম নুর। নূর বয়সের তুলনায় অনেক চালাক বাচ্চা। তার কথার মধ্যে কোনপ্রকার এতটুকু ভুল হয় না। আর সাফওয়ান শারীরিক ভাবে যেমন দূর্বল তেমনই মান*সিক ভাবে দূর্বল। বারো মাসে তেরো বার অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকে। দুজনের বয়স বর্তমানে পাঁচ বছর । নুর স্কুলে ভর্তি হলে ও সাফওয়ান কে আরোহী ভর্তি করাতে সাহস পায়নি। সাফওয়ান আলাদা পরিবেশ, ভিন্ন মুখ দেখে ভ*য় পেয়ে যায়। তাই আরোহী তাকে স্কুলে ভর্তি করাইনি। আরেক বছর যাক তখন তাকে ভর্তি করাবে। সাফওয়ান কে অনেক ডাক্তার দেখানো হয়েছে কিন্তু ডাক্তার কোন রোগ বের করতেই পারেনি। আরোহী ছেলের চিন্তায় দিনরাত পা*গ*ল হয়ে উঠে। কোথায় গেলে তার ছেলেটাকে স্বাভাবিক জীবন দিতে পারবে।
আরোহী বাড়িতে সেভাবে থাকতে পায়না। সারাদিন সারারাত ডিউটি আর ডিউটি করতে করতে বেচারী বাচ্চাদের সময় দেওয়ার সুযোগ পায় না। বাচ্চাদের দেখাশোনা করার জন্য আলাদা লোক রাখা আছে। আরোহী সপ্তাহে যে একদিন ছুটি পায় সেদিন বাচ্চাদের নিয়ে সারাদিন এখানে ওখানে ঘুরাঘুরি করে। আজকে ও তার ব্যাতিক্রম হয়নি। বিকাল চারটার সময় নিউ পার্কে ঘুরতে এসে এই ব*খাটেগুলোর সামনে পড়ে।কিন্তু আরোহী ও জানে এই কুকুর গুলোকে কিভাবে শিক্ষা দিতে হয় । আরোহী নিচু হয়ে বসে বাচ্চাদের উদ্দেশ্য বলল," চলো বাড়ি সোনা!আজকে আর কোথাও যাবো না?
নুর হাসিখুশি মুখটা দপ করে নিভে গেল। সে গাল ফুলিয়ে অন্যত্র মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। আর সাফওয়ানের তো হাসি ধরছে না। সে তো বাইরে ঘুরাঘুরি পছন্দ করে না। সাফওয়ান আরোহীর গলা ধরে বলল," আম্মু তলো (চলো)
বালি,, এতানেই ভালো লাগে না?
আরোহী নুরের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল, " যাওয়ার আগে ভাবছি আমরা সবাই আইসক্রিম খাবো কেউ কি খাবে নাকি চলে যাবো বাড়ি হু?
নুরের মুখটা আবারো হাসিতে ভরে উঠলো। সে দৌড়ে এসে আরোহী কে জড়িয়ে ধরে বলল," আম্মু আমি খাবো আইসক্রিম? সাফওয়ান ও জড়িয়ে ধরে বলল," আমিও তাবো আম্মু? আরোহী দুজনের মাথায় চুমু দিয়ে বলল," চলো সোনারা? আরোহী কথাটা বলে এগিয়ে গেল আইসক্রিমের দোকানের দিকে।
নুরকে ভ্যানিলা ফ্লেভারের নিয়ে দিলো। আর সাফওয়ান কে নিয়ে দিলো চকলেট ফ্লেভারের। দুই ভাইবোন আইসক্রিম খেতে শুরু করলো। আর আরোহী ফোন বের করে কাউকে কল দিয়ে সামনে তাকাতেই চমকে গেল। সাফওয়ান বমি পেট ধরে নিচু হয়ে বসে আছে। হাতের আইসক্রিম টা রাস্তা পড়ে আছে। আরোহী কোনরকমে ফোনটা ব্যাগে রেখে এগিয়ে গেল সাফওয়ানের কাছে। নুর ও তার আইসক্রিম ফেলে ভাইকে আগলে ধরে বলল," কি হয়েছে তোর?
সাফওয়ান নুরের দিকে তাকিয়ে ভাঙা ভাঙা কন্ঠে বলল," পেটে লাগতে অনেক? খুব তষ্ট( ক*ষ্ট)হচ্ছে!
আরোহী সাফওয়ান কোলে তুলে বলল, " কোথায় ক*ষ্ট হচ্ছে আব্বু? সাফওয়ান কিছু বলল না। মায়ের ঘাড়ে মাথা এলিয়ে রেখে ফুঁপিয়ে উঠলো। সাফওয়ানের কান্না শব্দ পেয়ে বুঝতে পারলো ছেলেটা অনেক ক*ষ্ট হচ্ছে। আরোহী নুরের হাতটাকে শক্ত করে ধরে হাসপাতালের উদ্দেশ্য রওনা হলো।
****
হ্যালো আসসালামু আলাইকুম স্যার, আপনি তাড়াতাড়ি করে ফিরে আসুন যে লোকটাকে কালকে রাতে হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন আজকে সকালে লোকটা পালিয়ে গিয়েছে…কথাটা ফোনে হাপাতে হাপাতে বলল একজন ওয়ার্ডবয়।মোবাইলের ওপাশ থেকে ব্যাক্তিটা বলল," তোমরা কি নাকে তেল দিয়ে ঘুমাও বাস্টার্ড, তুমি জানো আমার কত বড় ক্ষ*তি করেছো? তাড়াতাড়ি করে খুঁজে বের করো লোকটাকে না হলে তোমাদের ক*ব*র দিবো " কথাটুকু বলেই ফোনটা রেখে দেয়।
ওয়ার্ডবয় তার ফোনটার দিকে তাকিয়ে বিরবির করে বলল," শা*লা একটা পা*গ*ল লোককে নিয়ে এতো টেনশান তোর শা*লা তাহলে এই হাসপাতালে ফেলে না রেখে, বাড়িতে রাখলেই পারতি? কথাগুলো বলতে বলতে হাসপাতালের বাইরে চলে গেল।
***
আরোহী হাসপাতালে স্টিলের বেঞ্চে বসে আছে নুরকে নিয়ে। সাফওয়ান কেবিনে নেওয়া হয়েছে চিকিৎসার জন্য। আরোহী চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছে তার ছোট বাচ্চাটার জীবনে এত ক*ষ্ট কেন? আর পাঁচটা বাচ্চার মতো বাচ্চাটা কেন হেঁসে খেলে বেড়াতে পারেনা।
নুর আরোহীর কোল থেকে নেমে দৌড়ে গিয়ে একজন ডক্টর কে জড়িয়ে ধরে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল," মামা" ভাই আবার অসুস্থ হয়ে গেছে? আমার খুব ক*ষ্ট হচ্ছে মামা?
আরোহী মাথা তুলে দেখলো সামনে ডক্টর সরফরাজ দাঁড়িয়ে আছে। আরোহী কে নিজের জীবনের থেকে বেশি ভালোবাসে।কিন্তু আরোহী কে জানানোর ক্ষমতা হয়নি তার । কিন্তু আরোহী সরফরাজ কে ভাইয়ের চোখে দেখে। সরফরাজ বয়স ত্রিশ বছর, উচ্চতা ছয়ফুট, একজন হার্ট সার্জন ডক্টর। দেখতে অত্যন্ত সুর্দশন। সরফরাজ নুর কে কোলে তুলে আদুরে স্বরে বলল," সাফওয়ানের কিছু হবে না, ভাই সুস্থ হয়ে আবার তোমার সাথে খেলবে সোনা?
নুর চোখের পানি গুলো মুছে বলল," সত্যি!
সরফরাজ হাসি মুখে বলল," তিন সত্যি " কথাটুকু বলে এগিয়ে গেল আরোহীর দিকে। আরোহী এখনো কেঁদে যাচ্ছে। সরফরাজ আরোহীর মাথায় একহাত রেখে বলল," কান্না কেন করছিত, সব ঠিক হয়ে যাবে? আরোহী সরফরাজের হাতটা ধরে ডুকরে কেঁদে উঠে বলল,"আমার সাথে কেন এরকম হয় ভাইয়া,আল্লাহ কি আমার কপালে এতটুকু সুখ লিখে নি, কেন আমার বাচ্চাটা এত ক*ষ্ট পাচ্ছে ভাইয়া?সরফরাজ ভরসা দিয়ে বলল," কিছু হবে না সাফওয়ানের? আমি সবরকম চেষ্টা করবো!তুই চিন্তা করিস না?আরোহী কান্নাভেজা চোখ নিয়ে সরফরাজের দিকে তাকায়। এই একটা মানুষের জন্য সে আজ ও পৃথিবীতে টিকে আছে নাহলে, এই বাচ্চা দুটোকে নিয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়াতে হতো।সরফরাজ নুরকে আরোহীর কোলে দিয়ে চলে গেল কেবিনের দিকে। সরফরাজ এই হাসপাতালের একজন বড় ডাক্তার।
সরফরাজ কেবিনে যাওয়া একঘন্টা হয়ে গেল। হাসপাতালের নিস্তব্ধ করিডরে বসে আছে আরোহী। দুইহাত জোড়া করে মাথা নিচু করে বসে আছে। ঠোঁট নড়ছে কিন্তু কোন শব্দ বের হচ্ছে না। শুধু চোখের কোন বেয়ে এক বিন্দু করে অশ্রু মেঝেতে গড়িয়ে পড়ছে। নূর মায়ের পাশে চুপটি করে বসে আছে। বার বার কেবিনের দিকে তাকাচ্ছে নুর।
টিং…...
করিডরে নিস্তব্ধ ভেঙে ফোনে একটি মেসেজ ঢুকলো। আরোহী অন্যমনস্ক ভাবে ফোনটা হাতে নেয়। অচেনা নাম্বার।মেসেজের একটি লাইন " নিজের পরিচয় লুকিয়ে রাখলে বেঁচে যাবে তোমার ছেলে মেয়ে, কখনোই বাঁ*চ*বে না "। মুহুর্তেই আরোহীর শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। আঙ্গুল গুলো থরথর করে কেঁপে উঠলো তার। সে তাড়াতাড়ি করে নাম্বারটাতে কল দেয়। কিন্তু কোন লাভ হলো না। সংযোগ বিচ্ছিন্ন বলছে।
আরোহীর বুকটা ধড়ফড় করে উঠলো। বিরবির করে বলল," পাঁচ বছর "
এই পাঁচ বছর কেউ তার আসল পরিচয় জানে না। তাহলে কে জানল এটা। ঠিক তখনই হাসপাতালের করিডরে শেষ মাথায় কালো শার্ট পরা এক ব্যাক্তি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। লোকটার মুখ দেখা যাচ্ছে না। সে শুধু স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আরোহীর দিকে।
আরোহী লোকটাকে দেখে ভ*য়ে শিউরে উঠলো। ধীরে ধীরে বেঞ্চে থেকে উঠে এগিয়ে গেল আগুন্তকের দিকে। আরোহী ভ*য়ে ভ*য়ে বলল," এই যে শুনুন. …
আরোহী কদম এগোতেই লোকটা করিডোরের মোড় ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেল। আরোহী চারপাশে তাকালো। কেউ নেই। তার মনে হলো লোকটা এখানে ছিল না।
ঠিক সে মুহুর্তেই কেবিনের দরজা খুলে বেরিয়ে এলো নার্স বলল," সাফওয়ানের অভিভাবক কে?কথাটা শোনামাত্র আরোহীর বুক কেঁপে উঠলো। সে তাড়াতাড়ি করে এগিয়ে গিয়ে বলল," আমি ওর, মা!
নার্সের মুখটা অস্বাভাবিক গম্ভীর হয়ে বলল," ম্যাডাম আপনাকে সরফরাজ স্যার ডাকছে?
আরোহী নুরকে কোলে নিয়ে এগিয়ে গেল কেবিনের দিকে।
****
রাজশাহী সরকারি হাসপাতাল,,
আমায় ছে*ড়ে দিন… প্লিজ আমাকে ছে*ড়ে দিন । একবার যেতে দিন ও একা আছে, ও খুব ভ*য় পায়। আমার বাচ্চাটাকে ও খুঁজে বের করতে হবে ….. আমি না গেলে ওরা কাঁদবে। কেবিন জুড়ে বেরিয়ে আসছে বুকফাটা আ*র্ত*না*দ। দুজন ওয়ার্ডবয় শক্ত করে লোকটার হাত চেপে ধরে রেখেছে। তবুও বারবার ছটফট করছে। মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তে তাকে ছেড়ে দিলে খালি পায়ে পৃথিবীর শেষ প্রান্তে পর্যন্ত ছুটে আসবে। লোকটার খোলামেলা চুল, মুখভর্তি অগোছালো দাঁড়ি, চোখের নিচে কালি,ঠোঁট ফেটে র*ক্ত জমা হয়ে আছে। চোখ দুটো ফুলে লাল টকটকে হয়ে আছে। কত রাত মানুষটা না ঘুমিয়ে কেঁদেছে, সেটা দেখলেই বোঝা যায়।
হঠাৎ লোকটা চি*ৎ*কা*র করে বলল," মিথ্যা, সব মিথ্যা…. ও ম*র*তে পারে না…. আমার বিশ্বাস হয় না …. কেউ আমার কথা শুনছো না কেন আমাকে যেতে দিন …. আমি নিজেই ওকে খুঁজে নিয়ে আসবো ….
চি*ৎ*কা*র করতে করতে লোকটা হাঁপিয়ে গেল। বুকের ভেতর থেকে প্রতিটি নিঃশ্বাস র*ক্ত*ক্ষ*র*ণ হয়ে বের হচ্ছে। লোকটার দিকে তাকিয়ে একজন নার্স বিরবির করে বলল," আজ পাঁচ বছর….. অথচ মানুষটা একদিনের জন্য ও স্বাভাবিক হয়নি। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকজন নার্স বলল," প্রতিদিন একই কথা বলে, প্রতিদিন একই মানুষ গুলোর জন্য কাঁদে। যেন সময় ওর জন্য থেমে গেছে।
লোকটা হঠাৎ করে মেঝেতে বসে পড়লো। দুই হাত বুকে চেপে ধরে ফুঁপিয়ে উঠলো। ওয়ার্ডবয় গুলো লোকটার হাত ছেড়ে দাঁড়িয়ে রইলো। লোকটা কাঁদতে কাঁদতে বলল," আমি পারিনি…..আমি কাউকে বাঁ*চাতে পারিনি ….. আল্লাহ ….একবার …. শুধু একবার ওকে আমার সামনে এনে দাও …. আমি আর কোন অভিযোগ করবো না.. …
তার চোখের পানি গুলো টুপটুপ করে মেঝেতে পড়ছে। কেবিনের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসক নিঃশ্বাস দৃশ্যটা দেখছিলেন। তার পর খুব ধীরে ধীরে বলল," শরীরের ক্ষ**ত সেরে যায়….......কিন্তু কিছু মানুষের বুকের ভেতরের ক্ষ**ত কোনদিন ও শুকায় না….
কিছুক্ষণ পর নার্স লোকটার হাতে ঘুমের ইনজেকশন দিলো। ধীরে ধীরে চোখ দুটো বুঁজে এলো তার। ঘুমিয়ে যাওয়ার আগমুহূর্তে তার ঠোঁট জোড়া নড়ছিলো। দেখে মনে হচ্ছে কাউকে নাম ধরে ডাকছে। কিন্তু শব্দ গুলো এতটাই অস্পষ্ট ছিল যে, কেউ বুঝতে পারলো না কাকে খুঁজচ্ছে …...
কেবিনটা আবার ও নিস্তব্ধতা নেমে এলো…....
#চলবে….