#সে_ছিল_আমার_কল্পনায়
#পর্ব_৫
#লেখিকা_নাবিলা_আহমেদ সেহরিশ
“কেমন আছো, পিচ্চি?”
৫ মিনিট পর।
“অনলাইনে থেকেও রিপ্লাই দিচ্ছো না, ব্যস্ত নাকি?”
বিছানায় বসা অভ্যুদয়। হাতে তার চানাচুরের প্যাকেট। সামনে ল্যাপটপে চলছে ‘ডার্ক’ সিরিজের লাস্ট এপিসোড। পাশেই থাকা পানির বোতলটার ঢাকনা ভালো করে লাগানো হয়নি।
অভ্যুদয়ের পুরো মনোযোগ ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে। হাতে থাকা চানাচুর মুখের কাছে নিয়ে হা তো করেছে, তবে মুখে নিতে ভুলে গেছে।
“গো, গো, গো...” এক দৃষ্টিতে তাকিয়েই নিজে নিজে বলতে শুরু করল অভ্যুদয়। ঝুঁকে গেছে অনেকটাই ল্যাপটপের দিকে।
“গো, গো, গো... আরেকটু... আরেক...”
“ইয়েস...” উল্লাসে ফেটে পড়া অভ্যুদয়ের আনন্দ বেশিক্ষণ টিকল না। পানির বোতলটা বিছানায় পড়তেই ঢাকনা খুলে গড়গড়িয়ে ভিজে গেল বিছানা।
“শি'ট!” তাড়াহুড়ো করে উঠতে গিয়ে চানাচুরের প্যাকেটটাও নিচে ফেলে দিল অভ্যুদয়। আহাম্মকের মতো তাকিয়ে থাকল সে। কী করবে বুঝতে পারল না, তবে চোখে-মুখে রাগ স্পষ্ট বিদ্যমান।
“বা'ল!” ঠপাস করেই ল্যাপটপ অফ করে দিল সে। চার্জে লাগানো তারটা একটানে খুলে ফেলল। রাগে শরীর গিজগিজ করছে, মন চাইছে... মন চাইছে... কী মন চাইছে তা বুঝতে পারল না সে।
ল্যাপটপ তুলে নিয়েই পড়ার টেবিলের ওপর রাখল সে। বিছানার একপাশ ভিজে গেছে বোতলের পানি দিয়ে, কী করবে বুঝতে পারছে না; আর এই নিচে পড়ে থাকা চানাচুর? এটারই বা কী করবে সে। হঠাৎ করেই মাথায় বুদ্ধি এল তার। ওয়ারড্রব খুলে বের করে আনল পুরনো একটা টি-শার্ট।
টি-শার্ট নিয়েই মেঝেতে বসে পড়ল সে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকা চানাচুরগুলোকে টি-শার্ট দিয়ে ঠেলে খাটের নিচে ঢুকিয়ে দিল সুন্দর করে। পরক্ষণেই তার মুখে প্রশান্তির ছাপ।
“বাকিটা রুমি আপু সামলাবে।” উঠে দাঁড়াল অভ্যুদয়। এতটুকু কাজ করেই ক্লান্ত হয়ে গেছে সে। বিছানায় ধপাস করে শুয়ে পড়ল, কিন্তু লক্ষ্য রাখল যেন ভেজা দিকটায় ছোঁয়া না লাগে।
মাথার কাছে থাকা মোবাইল নিতেই নজর গেল নওশীনের আসা মেসেজের দিকে—হামিদ তাকে মেসেজ আর কল দুটোই করেছে।
“আমি পিচ্চি না।” অভ্যুদয় জবাব দিল নওশীনের মেসেজের।
“আগে ব্যস্ত ছিলাম, এখন নই।”
“তাই নাকি? তো পিচ্চিটা কী নিয়ে ব্যস্ত ছিল?” একটু পরেই জবাব এল নওশীনের।
“আপনার বয়স কত?”
“তুমি থেকে আপনি? ইন্টারেস্টিং!”
“যেহেতু পিচ্চি ডাকছেন, সেহেতু বুড়িদের সম্মান দিতেই হবে। এখন বয়স বলুন।”
“কত সহজে বুড়ি ডেকে ফেললে! একটু দয়া-মায়াও নেই তোমার, তাই না?”
“না, নেই। বুড়িদের সাথে দয়া-মায়া দেখাই না।” মেজাজ খারাপ হচ্ছে অভ্যুদয়ের। ‘পিচ্চি’ শব্দটা দেখলেই মেজাজ খারাপ হচ্ছে। তার বয়স ১৭, মাসখানেক পরই ১৮ হবে—তাহলে সে পিচ্চি হলো কীভাবে?
“২২।” রিপ্লাই এল নওশীনের।
“হা হা হা হা... লল।”
“এতো হাসির কী আছে?”
“এমন ভাবে পিচ্চি ডাকছিলে, আমি ভাবলাম বয়স বুঝি ৩২!”
“:/”
“যদিও ৫ নয়, তবুও তোমার মন রাখতে ৫ ধরলাম। ৫ বছরের বড়ো কোনো বড়ো হওয়া? হা হা হা।”
“:/”
“এখন কথা বন্ধ কেন ম্যাডামের? কথা বলেন।”
“কথা বলে লাভ নেই। তোমার সাথে কথায় পারব না, বুঝে গেছি।”
“গুড গার্ল।” মেসেজ সেন্ড করতেই চমকে গেল অভ্যুদয়। ‘গুড গার্ল’? এ কোন ধরনের ওয়ার্ড ব্যবহার করছে সে? তাও একজন বড়ো মানুষের সাথে? নিজের মধ্যেই দ্বিধা তৈরি হলো তার।
নওশীন মেসেজ সিন করলেও অন্য সময়ের মতো সঙ্গে সঙ্গে রিপ্লাই করল না। খারাপ লাগল অভ্যুদয়ের। মাঝে মধ্যে যে কী হয় তার! দ্বিধা ভুলে নিজেই আবারও মেসেজ পাঠাল নওশীনকে।
“কী করো? আর কোন ক্লাসে পড়ো তুমি?”
একটু পরেই মেসেজ সিন করল নওশীন। টাইপিং-এর চিহ্ন উঠতেই শ্বাস ছাড়ল অভ্যুদয়।
“শুয়ে আছি। তুমি? অনার্সে পড়ি আমি।”
“আমিও শুয়ে আছি। কোন সাবজেক্টে?”
“ইতিহাস।”
“ওয়াও। ভালো সাবজেক্ট। এতো এতো সাল মুখস্থ করতে পারো?”
“চেষ্টা করি, কিন্তু মনে থাকে না।”
“কোন ভার্সিটি?”
“বরিশাল কলেজ।” অভ্যুদয় মেসেজ দেখতেই থাকল কয়েক মিনিট। পরক্ষণেই ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। টাইপিং শুরু করে আবারও—
“ও মনু, ডাইলে লবণ দেছো নাকি দেবা?” মেসেজটা পাঠাতেই হাসতে লাগল সে। হাসতে হাসতে উপুর হয়েই বালিশে মুখ গুঁজেছে সে। জীবনেও ভাবেনি একজন বরিশালের মেয়ের সাথে তার কথা হবে।
“: )”
“আহারে, সেন্টি খাইও না। ডাইলে লবণ দিয়ে দেও, তাহলে আর সেন্টি খাইতে হবে না।” আবারও হাসতে শুরু করে অভ্যুদয়।
“তুমি আমার সামনে থাকলে তোমার চুল টে'নে ছিঁ'ড়ে দিতাম।” উত্তর দিল নওশীন। হাসি সরে গেছে অভ্যুদয়ের।
“তাই নাকি?”
“হ্যাঁ, তাই।”
“তোমার হাইট কত?”
“মেয়েদের হাইট জিজ্ঞেস করতে নেই, জানো না?”
“মেয়েদের জিজ্ঞেস করতে নেই। কিন্তু তুমি তো বুড়ি।”
“অভ্যুদয়...” নওশীনের রিপ্লাইয়ের সাথে অনেকগুলো রাগের ইমোজি। সে যে রেগে যাচ্ছে, তা ভালোই বুঝতে পারছে সে।
“ইয়েস ম্যাম?” মৃদু হেসে জবাব দিল অভ্যুদয়।
“তুমি এতো পাজি তা ভাবতেও পারিনি। প্রথমে তো খুব শান্ত মনে হয়েছিল। এখন দেখি, যেকোনো সময় মানুষের মেজাজ খারাপ করে দেওয়ার মেধা নিয়ে জন্মেছো তুমি।”
“হে হে হে হে।”
“আচ্ছা, বাদ দেই সে সব। আজ এখনো ঘুমাচ্ছো না যে?” নওশীনের মেসেজ দেখতেই টাইমের দিকে চোখ ফেরাল অভ্যুদয়। পরক্ষণেই বসে পড়ল এক লাফে। ঘড়িতে ১১:৩০টা বাজে, অথচ সে লক্ষ্যই করেনি এতোক্ষণ। একটু আগেই তো ১০:৪৫ ছিল, ১১:৩০টা বাজল কখন? এতোক্ষণ ধরে মেসেজ করছিল সে?
“ঘুমিয়ে গেলে নাকি?” আবারও নওশীনের মেসেজ আসতেই ঘোর কাটল তার।
“নাহ।” সংক্ষিপ্ত জবাব দিল অভ্যুদয়।
“ঘুমাবে?”
“কেন?”
“এমনিতেই... না ঘুমালে কিছুক্ষণ থাকো। চ্যাট করি।” অভ্যুদয় এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেসেজটার দিকে। একবার চোখ ফেরাল প্রোফাইলে থাকা ছবিটার দিকে—লাল ফুলটা চোখে লাগছে।
আগামীকাল থেকে আবারও নিজের আগের জীবনে ফিরে যাবে সে। এরপর হয়তো টেস্ট পরীক্ষায় আশানুরূপ সাফল্য আনতে পারলেই আবারও ছুটি পাবে। তবে তার জন্য তাকে আরও ২ মাস অপেক্ষা করতে হবে। সকাল ৬টায় উঠতে হবে, চোখের কোণে ঘুম ঘুরঘুর করছে।
“আছি কিছুক্ষণ।” আপনা-আপনিই যেন টাইপ হলো মেসেজটা।
“তোমার কলেজ নেই কাল?”
“আছে।”
“আচ্ছা থাক, তাহলে ঘুমাও।”
“বললাম তো আছি কিছুক্ষণ। কী বলবে, বলো।” বসে থাকা অভ্যুদয় আবারও শুলো, তবে আগের মতো করে নয়। এবার বুকের নিচে বালিশ দিয়ে উপুর হয়ে শুয়ে হাতে মোবাইল নিল।
“ভাই-বোন কয়জন তোমরা?” জানতে চাইল নওশীন।
“দুই ভাই। তোমরা?”
“দুই বোন।”
“তুমি বড়ো?”
“উহু... ছোট।”
“আমার মতো।”
“এতো রাত অবদি জেগে থাকো, ঘুম আসে না তোমার?” আবারও মেসেজ দিল অভ্যুদয়।
“উহু, রাত জাগা অভ্যাস।”
“কেন? বয়ফ্রেন্ডের সাথে কথা বলো নাকি?”
“বয়ফ্রেন্ড থাকলে তোমার সাথে কথা বলতাম নাকি? আর বয়ফ্রেন্ডের ভেজালে না জড়ালেই ভালো। জীবন হে'ল হয়ে যাবে।”
“তাই নাকি?”
“হ্যাঁ, তাই।”
“আগে এভাবে কেউ হে'ল করেছিল নাকি জীবন?”
“করেনি।”
“তাহলে কীভাবে বুঝলে যে হে'ল করবে?”
“বুঝতে প্রেম করা লাগে না। নিজের চোখে অনেককেই দেখি।”
“ও হ্যাঁ, আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম তুমি বুড়ি। তোমার অনেক অভিজ্ঞতা আছে।” আবারও হাসতে শুরু করে অভ্যুদয়। কী হয়েছে তার? কবে থেকে এরকম হাসির কথা বলতে শিখেছে সে?
“: )”
“ভাই, তোমার অনলাইনে থাকা লাগবে না, তুমি যাও। আমার মেজাজটা খারাপ করে দিচ্ছো তুমি।”
“চিল পেঁচা চিল, মেজাজ তান্ডা করো, থানায় কেচ করো।”
“অভ্যুদয়ের বাচ্চা...” আবারও কতগুলো রাগের ইমোজি এল মেসেজের সাথে। অভ্যুদয় তবুও হাসছে।
“আচ্ছা, সরি...” হাসি থামল না তার। মেসেজ সিন করল না নওশীন।
“এ ভাই, সরি বললাম তো... সরি।” এবারও সিন করল না নওশীন। অভ্যুদয়ের চোখে ঘুম, চোখের পাতা যেন আপনা-আপনি লেগে যাবে। ঘড়ির দিকে তাকাতেই অবাক হলো। ঘড়িতে ১২:৫৫ বাজে।
“আচ্ছা ঘুমাতে গেলাম। আবারও কথা হবে, গুড নাইট।” মেসেজ পাঠালেও অন্যদিনের মতো আজ সাথে সাথে আর ওয়াইফাই অফ করল না অভ্যুদয়। অপেক্ষা করল নওশীনের সিন হওয়ার। তার তরফ থেকে রিপ্লাই আসার, কিন্তু মেসেজ সিন হলো না।
আচ্ছা, নওশীন কী আর তার সাথে কথা বলবে না? খুব বেশি রাগিয়ে ফেলেছে নাকি?
“নওশীন?” আবারও মেসেজ পাঠাল অভ্যুদয়। এবার আর ডেলিভার হয়নি মেসেজ। অনলাইন থেকে চলে গেছে নওশীন। মুখটা গোমড়া হলো তার।
“সরি।” মেসেজটা পাঠাতেই দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সে। ওয়াইফাই অফ করেই উপুর হয়ে শুলো। আজকেই কী তাদের শেষ কথা বলা? মেয়েটার সাথে কথা বলে তার ভালো লাগে। মনে হয় অনেক দিনের পরিচয়।
“গুড নাইট।” বিড়বিড় করেই থামল অভ্যুদয়। চোখ বন্ধ করেই বলে উঠল—
“নওশীন”
চলবে...