ফন্ট সাইজ:
থিম:
সে ছিল আমার কল্পনায়

১০ম পর্ব

লেখক: নাবিলা আহমেদ সেহরিশ

#সে_ছিল_আমার_কল্পনায়

#পর্ব_১০
#লেখিকা_নাবিলা_আহমেদ সেহরিশ
“অভ্যুদয়?”
“অভ্যুদয়?”
শিক্ষকের গম্ভীর কণ্ঠস্বরও যেন পৌঁছাল না অভ্যুদয়ের কানে। সে তখন সম্পূর্ণ ডুবে আছে নিজের মোবাইলের স্ক্রিনে। স্ক্রিনে ভেসে উঠছে সকাল ১১টা ৩০। এখনো পর্যন্ত একটি কলও আসেনি।
“ঐ শালা...”
হামিদের কনুইয়ের ধাক্কায় হঠাৎই সম্বিত ফিরে পেল অভ্যুদয়। বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকাল তার দিকে। আশ্চর্য! হামিদ দাঁড়িয়ে আছে। কপালে ভাঁজ ফেলতেই হামিদ চোখের ইশারায় সামনে তাকাতে বলল।
“কী?”
হামিদ কোনো উত্তর দিল না। শুধু ঘাড় ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকাল। অভ্যুদয়ও তাকাতেই বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। মুহূর্তের মধ্যেই এক লাফে দাঁড়িয়ে পড়তেই ব্যাগ থেকে তার মোবাইলটি মেঝেতে পড়ে গেল।
হামিদের পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন তাদের ক্লাস টিচার। স্যারের চোখ একবার নিচে পড়ে থাকা মোবাইলটির দিকে গেল, তারপরই মুখের গম্ভীরতা যেন আরও কঠিন হয়ে উঠল।
“এতক্ষণ কী পড়াচ্ছিলাম, বলো তো?”
প্রশ্নটা শুনেই হামিদের মুখে ফুটে উঠল অসহায় ভাব। অভ্যুদয় যখন স্যারের ডাকই ঠিকমতো শোনেনি, তখন এতক্ষণ কী পড়ানো হয়েছে, সেটা বলবে কীভাবে?
“ইম...”
কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল অভ্যুদয়। দ্রুত চোখ ফেরাল হোয়াইট বোর্ডের দিকে। বোর্ড একেবারে ফাঁকা। আর কোনো উপায় না দেখে চারপাশে বসে থাকা সহপাঠীদের দিকে তাকাল। সামান্য একটা ইঙ্গিত পেলেই বাকিটা সে সামলে নিতে পারবে।
তার চোখ গিয়ে থামল মোটা ফ্রেমের চশমা পরা ফারজানার ওপর। মেয়েটি তার দিকেই তাকিয়ে ঠোঁট নেড়ে কিছু একটা বলছে।
“কী হলো? বলো, এতক্ষণ কী পড়াচ্ছিলাম?”এবার স্যারের কণ্ঠস্বর আগের চেয়ে আরও কঠোর।
“জি, স্যার...”
মৃদু স্বরে উত্তর দিতে দিতেই আবারও ফারজানার দিকে তাকাল অভ্যুদয়। এবার শব্দটা স্পষ্ট বুঝতে পারল। বুকের ভেতর স্বস্তির ঢেউ বয়ে গেল। আত্মবিশ্বাস নিয়ে স্যারের দিকে তাকিয়ে বলল,
“স্যার... স্টইকিওমেট্রি।”
হামিদ বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
স্যার ভ্রু কুঁচকে বললেন–
“বাংলা ক্লাসে আমি রসায়ন পড়াচ্ছি?”
‘বাংলা ক্লাস?’ মুহূর্তেই যেন মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়ল অভ্যুদয়ের। তড়িঘড়ি করে দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটার দিকে তাকাল। ১১টা ৪৫ । আজ বুধবার। এই সময় তাদের বাংলা দ্বিতীয় পত্রের ক্লাস হওয়ার কথা।
রাগে চোখ লাল হয়ে উঠল তার। ফারজানার দিকে তাকাতেই দেখল, মেয়েটার ঠোঁটের কোণে ব্যঙ্গমিশ্রিত হাসি।
“আজই তোমার মায়ের সঙ্গে কথা বলব। একে তো ক্লাসে মোবাইল এনেছ, তার ওপর ক্লাসে কোনো মনোযোগই নেই। এই মোবাইলই তোমাদের মাথা খেয়ে ফেলেছে। তোমাদের বয়সে আমরা টিভি পর্যন্ত দেখতাম না, আর তোমরা...!”
মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল অভ্যুদয়। বলার মতো কোনো কথাই নেই। বাংলা দ্বিতীয় পত্রের পরেই তাদের রসায়ন দ্বিতীয় পত্রের ক্লাস হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আজ কেন যেন স্যার বাংলা ক্লাসে চলে এসেছেন। আর এই ফারজানা... স্যার সামনে না থাকলে আজ ওর গলাটা চেপে ধরতে পারলে হয়তো একটু শান্তি পেত সে।
“দাঁড়িয়ে আছ কেন? যাও, ক্লাসের বাইরে গিয়ে দাঁড়াও।”
“সরি, স্যার।”
“গেট আউট।”
আর কোনো কথা বলল না অভ্যুদয়। নিঃশব্দে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে গেল।
ক্লাসরুমের ভেতর আবারও পড়ানো শুরু করেছেন স্যার। কিন্তু কী পড়াচ্ছেন, তার একটি শব্দও কানে ঢুকছে না অভ্যুদয়ের। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অস্থিরতা ধীরে ধীরে শেকড় গেড়ে বসছে। মনে হচ্ছে, কোনো অজানা আশঙ্কা তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
তার মোবাইলটা এখনো বেঞ্চের নিচেই পড়ে আছে। হামিদ কি সেটি তুলে রেখেছে? নাকি স্যারই নিয়ে নিয়েছেন?মোবাইলটি সাইলেন্ট করা।
ঠিক এই মুহূর্তে যদি নওশীন কল করে? যদি একবার, দুবার, বারবার কল করেও তাকে না পায়?
ভাবনাগুলো মাথার ভেতর ঘূর্ণিঝড়ের মতো পাক খেতে লাগল। অস্থিরতা ক্রমশ অসহনীয় হয়ে উঠছে। এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকাও যেন কঠিন হয়ে পড়েছে তার জন্য। অজান্তেই হাত-পা অস্বাভাবিক দ্রুততায় নড়ছে। ঠোঁটের শুকিয়ে যাওয়া চামড়াগুলো একের পর এক ছিঁড়ে ফেলছে সে। কখন যে ঠোঁট রক্তিম হয়ে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে, সেদিকে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই।
টিফিন বিরতি।
“তোর কী হয়েছে বল তো?” হামিদের প্রশ্নে বাস্তবে ফিরল অভ্যুদয়।
“কোথায়? কী হয়েছে?”
“কিছু না হলে প্রতি বিশ সেকেন্ড পরপর মোবাইলের দিকে তাকাচ্ছিস কেন?” অভ্যুদয়ের চোখ আবারও চলে গেল মোবাইলের স্ক্রিনে। ঘড়িতে এখন ১টা ৪০। এখনো নওশীনের কোনো কল নেই। আচ্ছা, এই সময় কি ওরও ক্লাস চলছে? নাকি কলেজের কোনো কাজে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছে?
“এমনিতেই।”
“আমার তো তেমন মনে হচ্ছে না। কী হয়েছে বল তো? আজ সারাদিন তোকে কেমন যেন অন্যরকম লাগছে। অদ্ভুত আচরণ করছিস, আর বারবার মোবাইল দেখছিস।” অভ্যুদয় বিরক্ত হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“বিরক্ত করিস না তো। ভালো লাগছে না। যা, ক্যান্টিন থেকে সিঙ্গারা নিয়ে আয়।”
হামিদ আরও কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। অভ্যুদয়ের চোখ তখনও স্থির হয়ে আছে মোবাইলের স্ক্রিনে। বন্ধুর মুখের সেই অস্বাভাবিক অস্থিরতা দেখে আর কিছু বলল না সে। নিঃশব্দে ক্যান্টিনের দিকে হাঁটা দিল।
কলেজ থেকে ফিরে রুমে ঢুকতেই ক্লান্ত শরীর নিয়ে কাঁধের ব্যাগটা বিছানার ওপর ছুড়ে মারল অভ্যুদয়।
মনটা এত খারাপ কেন, সে নিজেও বুঝতে পারছে না। শুধু এটুকুই জানে—নওশীন এখনো তাকে কল করেনি। হঠাৎই বুকের ভেতর অকারণ এক শঙ্কা দানা বাঁধল। নওশীন কি তবে সত্যিই তার ব্যাপারে মত বদলে ফেলেছে? ভাবনাটা মাথায় আসতেই বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠলো।
শার্টের বোতাম খুলতে খুলতেই ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল সে।
রাতের খাবারের টেবিলে মুখোমুখি বসে আছে অভ্যুদয় আর অনামিকা চৌধুরী। একটু আগেই ইংরেজির শিক্ষক পড়িয়ে চলে গেছেন।
“স্যারের পড়ানো কেমন লাগছে তোমার?” মায়ের প্রশ্ন শুনে চমকে তাকাল অভ্যুদয়।
“ভালো।”
“ব্রিটিশ প্রোনান্সিয়েশন ঠিক আছে তো? নাকি অন্য কাউকে দেখব?”
“ঠিক আছে, আম্মু।”
“ওকে।” অনামিকা চৌধুরী আবার খাবারে মন দিলেন।
অভ্যুদয়ও প্লেটের দিকে তাকিয়ে খাওয়া শুরু করল। কিন্তু খানিক পরপরই অজান্তে চোখ চলে গেল দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটার দিকে। রাত ১০টা ৩০। এখনো নওশীন কোনো কল করেনি। হয়তো কলেজের কোনো কাজে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।সমস্যা নেই...আর একটু পরেই হয়তো অনলাইনে আসবে।
তখন খুব বকবে সে নওশীনকে। জিজ্ঞেস করবে, অন্তত একটি মেসেজ দিয়েও কি জানানো যেত না যে আজ কল করা সম্ভব হবে না? সে যে সারাটা দিন শুধু এই একটি কলের অপেক্ষাতেই কাটিয়ে দিয়েছে।
“কিছু কি হয়েছে?” হঠাৎ প্রশ্ন শুনে চমকে উঠল অভ্যুদয়। অপ্রস্তুত মুখে তাকাল মায়ের দিকে। অনামিকা চৌধুরীর কপালে চিন্তার ভাঁজ।
“ক... কোথায়? না তো...” হঠাৎই তার মনে হলো, স্যার কি তবে সত্যিই মোবাইলের ঘটনাটা মাকে জানিয়ে দিয়েছেন?
“তাহলে কিছুই খাচ্ছো না কেন? তোমাকে খুব চিন্তিত লাগছে। সব ঠিক আছে তো?” অভ্যুদয় দ্রুত নিজেকে সামলে নিল।
“না, আম্মু। তেমন কিছু নয়। আজ শুধু... খেতে ইচ্ছা করছে না।”
“ওহ...” আর কিছু বললেন না অনামিকা চৌধুরী।
অভ্যুদয় আবার খাবারের দিকে মন দিল। কিন্তু তার মন পড়ে রইল অন্য কোথাও।
করিডোর পেরিয়ে প্রায় ছুটে চলেছে অভ্যুদয়। তার মনে হচ্ছে, সামান্য দেরি হলেই হয়তো নওশীন অফলাইনে চলে যাবে। যতটা দ্রুত হাঁটা সম্ভব, ততটাই দ্রুত নিজের রুমে ঢুকে পড়ল সে।
টেবিলের ওপর রাখা মোবাইলটা হাতে নিয়েই বিছানায় বসে পড়ল। তড়িঘড়ি করে ওয়াই-ফাই চালু করল। লক খুলতেই সরাসরি ঢুকে গেল মেসেঞ্জারে। না, নওশীন কোনো মেসেজ দেয়নি।অনলাইনেও নেই।
এক নিমিষেই যেন মুখের সমস্ত আলো নিভে গেল অভ্যুদয়ের। বুকের ভেতর জমে থাকা ক্ষীণ আশাটুকুও ধীরে ধীরে মলিন হয়ে এল। নিঃশব্দে বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে পড়ল সে। মোবাইলটা অযত্নেই পাশে পড়ে রইল।
আজ নিজের ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা অনুভব করছে সে। হঠাৎ করেই নিজেকে ভীষণ মূল্যহীন মনে হচ্ছে।
একটা মানুষ কি সত্যিই এতটা ব্যস্ত থাকতে পারে, যে একটি ছোট মেসেজও পাঠানোর সময় পায় না? শুধু লিখে জানিয়ে দিলেও তো হতো—আজ কল করা সম্ভব হবে না।
সে কি সারাদিনে একবারও মোবাইল হাতে নেয়নি?
অভ্যুদয় নিজেই তো কঠোর শাসনের মধ্যে বড় হয়েছে। দিনের নির্দিষ্ট সময় ছাড়া মোবাইল হাতে নেওয়ার সুযোগই খুব একটা পায় না। তবু যতটুকু সময় পায়, চেষ্টা করে নওশীনের খোঁজ নিতে। তাহলে নওশীন কেন পারল না?
ভাবনাগুলো একটার পর একটা এসে তাকে আরও ভারী করে তুলছে। পরক্ষণেই নিজের মাথা ঝাঁকিয়ে সোজা হয়ে বসল সে। নাহ...এভাবে ভাবা ঠিক হচ্ছে না।
নওশীনেরও তো ব্যস্ততা থাকতে পারে। কলেজের কাজ, পড়াশোনা—কত কিছুই তো থাকতে পারে! হয়তো আজ অন্য দিনের মতো রাত এগারোটার পর অনলাইনে আসবে।
নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল অভ্যুদয়। গভীর করে কয়েকবার শ্বাস নিল। বুকের ভেতরের অস্থিরতাকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাল। কিন্তু আশ্বাসগুলো যেন নিজের কাছেই পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো না। তবু অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
হাঁটু দুটো মুড়ে ফ্লোরের বুকে নিস্পন্দ হয়ে বসে আছে অভ্যুদয়, শরীরটা সামনে সামান্য ঝুকে পড়া। তার স্থির চোখ দুটো নিষ্পলক আটকে আছে নিভে থাকা মোবাইলটার পর্দায়। দেয়ালঘড়ির কাঁটাটা এখন কাঁটায় কাঁটায় রাত ১১:৫০-এ এসে থেমেছে।
​নওশীন তাকে কল করেনি। যে মেয়েটা অনলাইনে না এসে এক মুহূর্তও থাকতে পারে না, সে মেয়েটা আজ প্রদীপের মতো নিভে আছে। কী হচ্ছে অভ্যুদয়ের ভেতর? সে নিজেও জানে না। রক্তের প্রতিটা বিন্দুতে যেন এক দমবন্ধ করা, উগ্র অস্থিরতা পাক খাচ্ছে। সে শুধু অপেক্ষা করছে, কীসের জন্য? সে নিজেও জানেনা।
​দেখতে দেখতে সময়ের চাকা ঘুরে ঘড়িতে রাত ১২টার ঘণ্টা বাজল। তবুও নওশীনের নামের পাশে সেই সবুজ আলোটা জ্বলে উঠল না। অভ্যুদয়ের চোখের পাতা পড়ে না; তার সমস্ত ধ্যানজ্ঞান গ্রাস করে নিয়েছে নীরব ওই স্ক্রিনটা। অবসন্ন আঙুলগুলো অসাড়ের মতো কেবল স্ক্রল করে চলেছে।
​হঠাৎ বাতাসে ভেসে আসা আজানের ধ্বনিতে তার আচ্ছন্ন ঘোরটা চুরমার হয়ে গেল। জানালার ওপারে ভোরের আলো ফুটছে, ফজরের আহ্বান কানে আসতেই চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল অভ্যুদয়ের। দাঁতে দাঁত চেপে বিষাদ আর অপমানের তীব্র স্বাদ অনুভব করল সে। নওশীন কল দেয়নি। একটা ভয়েসও পাঠায়নি, দূর থেকে শুভেচ্ছা জানানো তো বহুদূর, তার উপস্থিতির অস্তিত্বটুকু জানান দেওয়ার প্রয়োজনও বোধ করেনি।
​“ইউ ফা'কিং লায়ার...!”
​বুকের ভেতর থেকে এক হিংস্র গর্জন ফেটে বের হলো। ক্ষিপ্ত অভ্যুদয় পরক্ষণেই এক লাফে উঠে দাঁড়াল। মেঝেতে পড়ে থাকা আইফোনটাকে কুড়িয়ে নিয়ে নিজের সমস্ত গায়ের জোর এক করে আছড়ে মা'রল শক্ত ফ্লোরের বুকে। মুহূর্তের ভাঙ্গা টুকরোগুলো পুরো রুমে ছড়িয়ে পড়লো।
​“তুমি তোমার কথা রাখোনি নওশীন... তুমি কথা রাখোনি!” ​বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠে রক্তচক্ষু নিয়ে আবারও এগিয়ে গেল মোবাইলের ভাঙা টুকরোগুলোর দিকে। পায়ের উন্মাদ আঘাতে নির্দয়ভাবে থেঁতলে দিতে লাগল সেগুলোকে। 
“তুমি তাদের মতোই... তাদের মতোই...” উন্মাদের মতো একের পর এক আঘাত করে চলেছে অভ্যুদয়। যেন তার পায়ের আঘাত থামার নামই নিচ্ছে না।
“তাদের মতোই... তোমার কাছেও আমি মূল্যহীন!”
নিজেকে এমনভাবে হারিয়ে ফেলছে কেন সে? এত রাগই-বা কেন হচ্ছে? তার নিজের কাছেই উত্তর নেই। সে শুধু এটুকুই জানে—নওশীন তার কথা রাখেনি। নওশীনের কাছেও তার কোনো মূল্য নেই। ঠিক যেমনটা নেই তার নিজের মা-বাবার কাছেও।
প্রতি বছর সে দেখেছে, তার ভাইয়ের জন্মদিন ঘিরে কী অদ্ভুত উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন তার মা-বাবা। কত পরিকল্পনা, কত আয়োজন, কত ব্যস্ততা! অথচ তার জন্মদিন এলে সবকিছু যেন হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে যায়। না থাকে কোনো উৎসবের আবহ, না থাকে কোনো বাড়তি উচ্ছ্বাস। থাকে শুধু একটি কেক... আর থাকে নিজের অস্তিত্বকে মূল্যহীন মনে হওয়ার সেই পুরোনো, তীব্র অনুভূতিটা।
বুঝ হওয়ার পর থেকেই নিজেকে সে বোঝাতে শিখেছে—এসব নিয়ে তার কিছুই যায় আসে না। গভীর রাতে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালেও কিছু যায় আসে না। কপালে স্নেহভরা একটি চুমু খেয়ে শুভেচ্ছা জানালেও কিছু যায় আসে না। সে নিজেকে বারবার এ কথাই বিশ্বাস করিয়েছে।
তবে আজ...নওশীনের এতটুকু কথা না রাখাটা কেন এত গভীরভাবে নাড়িয়ে দিচ্ছে তাকে?
কেন বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে সেই পুরোনো ক্ষতগুলোকে?
কেন মনে হচ্ছে, অপরিচিত নওশীনের কাছেও সে যেমন গুরুত্বহীন, তেমনি গুরুত্বহীন ছিল নিজের পরিবারেও?
অভ্যুদয় আর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। বুকের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভ, অভিমান আর অসহায়তা যেন তাকে শ্বাস নিতেও দিচ্ছে না। দৌড়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল সে। নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করার একটাই উপায় সে জানে—ঠান্ডা পানির নিচে দাঁড়িয়ে থাকা। ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকা।
বাইরে প্রচণ্ড শীত হোক কিংবা অসহনীয় গরম, তাতে কিছুই আসে যায় না। বরফশীতল পানির ধারাগুলো ধীরে ধীরে তার উত্তপ্ত শরীরের সঙ্গে সঙ্গে অস্থির মনকেও শান্ত করে দেয়।
এই ঠান্ডা পানিই যেন তাকে নীরবে শেখায়—সব যুদ্ধ জিতে নেওয়াই সাহস নয়। কখনো কখনো হার মেনে থেমে যাওয়াও প্রয়োজন। সব কথার উত্তর দিতে হয় না; মাঝেমধ্যে চুপ করে থাকাতেই মঙ্গল।
এক সপ্তাহ পর।
কথায় আছে, চোখের আড়াল হলে নাকি মানুষ ধীরে ধীরে মনের আড়ালও হয়ে যায়। কথাটা কতটা সত্য, তার যেন জীবন্ত উদাহরণ অভ্যুদয়।
মাত্র এক সপ্তাহ আগেও যে ছেলেটি নওশীনের একটি কলের অপেক্ষায় সারাটা দিন অস্থির হয়ে কাটিয়ে দিয়েছিল, সেই অভ্যুদয়ই যেন ধীরে ধীরে আবার নিজের পুরোনো সত্তায় ফিরে এসেছে। ফিরে এসেছে বহুদিনের চেনা রুটিনে—সময়মতো খাওয়া, পড়াশোনা, ঘুম; সবকিছু আবার আগের মতোই চলছে।
এখন আর নওশীনকে নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। তার সঙ্গে যোগাযোগ করারও কোনো ইচ্ছা নেই।
মোবাইলটি ভেঙে যাওয়ার পর অনামিকা চৌধুরী যখন জানতে চেয়েছিলেন সেটি কোথায়, অভ্যুদয় নির্বিকার মুখে জানিয়েছিল—চলন্ত গাড়ি থেকে পড়ে গিয়ে সেটি ভেঙে গেছে। রাগ করার বদলে অনামিকা চৌধুরী বরং খানিকটা স্বস্তিই পেয়েছিলেন। 
এরপর আর একবারের জন্যও ফেসবুকে ঢোকার চেষ্টা করেনি অভ্যুদয়। মেসেঞ্জার খুলেও দেখেনি।
যে মানুষগুলো তাকে বারবার নিজের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করে, যারা তাকে মূল্যহীন মনে করিয়ে দেয়, তাদের থেকে কীভাবে দূরত্ব তৈরি করতে হয়—সেটা সে অনেক আগেই শিখে গেছে।
নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কিছু দূরত্ব প্রয়োজন হয়। কিছু দরজা একবার বন্ধ করে দিলে আর ফিরে তাকানো যায় না। অভ্যুদয়ও ঠিক সেটাই করেছে।
নিজের মনকে সে একটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে—এই জীবনে আর মোবাইল কিনবে না। আর যদি কোনো দিন কিনেও ফেলে, তবে প্রথমেই ফেসবুকে লগ-ইন করে নওশীনকে ব্লক করবে।
কোনো অভিযোগ জানাতে নয়, কোনো অভিমান দেখাতেও নয়। শুধু নিজের শান্তিটুকু বাঁচিয়ে রাখার জন্য।
চলবে....
১০ নং পর্বে যে কিছুটা ১৮+ আসবে বলেছিলাম, মনে হলো কাহিনিটা সাজাতে তা একটু পিছানো উচিৎ। তাই সেই পর্বটা ১১ নং এ পাবেন। ততোক্ষণ পর্যন্ত সকলে ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১০ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন