#সে_ছিল_আমার_কল্পনায়
#পর্ব_৯
#লেখিকা_নাবিলা_আহমেদ সেহরিশ
১ মাস পর।
গত এক মাস ধরে নিয়মিত কথা হচ্ছে নওশীন ও অভ্যুদয়ের মধ্যে। এই এক মাসে কিছুই পরিবর্তন হয়নি অভ্যুদয়ের জীবনে, বরং একটা নতুন অধ্যায় হিসেবে যোগ হয়েছে নওশীন। যেখানে সে প্রতিদিন রাতে ১০টার পর থেকে ১২টা পর্যন্ত চ্যাটিং করে নওশীনের সাথে।
এই এক মাসে নওশীনও অনেকটা ফ্রি হয়ে গেছে অভ্যুদয়ের সাথে। সে তো মাঝে মধ্যে এটাও বলে—অভ্যুদয় তার বেস্ট ফ্রেন্ড। কখনো ভাবেনি ১৭ বছর বয়সী একজন ছেলের সাথে তার এতটা ভাব হয়ে যাবে। অভ্যুদয়ও কখনো ভাবেনি পৃথিবীতে এত এত মানুষ থাকতে সে একজন অচেনা, অদেখা মানুষের সাথে প্রতিদিন কথা বলবে, তাকে না দেখে বিশ্বাস করবে।
“আগামী পরশু আমার জন্মদিন” অভ্যুদয়ের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি। কেমন যেন কথাটা বলতেই এক্সসাইটমেন্ট কাজ করছে তার। অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে—কখন নওশীন তার মেসেজটা সিন করবে।
বিছানায় বসা সে। একটা পাতলা কাঁথা গায়ে জড়ানো। জড়ানো বললে ভুল হবে, কাঁথা মুড়ি দিয়ে রেখেছে। গতকাল হুট করেই অনামিকা চৌধুরী জিজ্ঞেস করলেন—কেন রাত ১১:৪০-এর দিকে তার ঘর থেকে আলো ভেসে আসছিল? না পারতে জীবনে প্রথম সে মিথ্যে বলেছে। পড়া শেখা হয়নি বলে রাত জেগে পড়ছিল জানায়। এভাবে রাত জাগতে নিষেধ করে চলে যান অনামিকা চৌধুরী। আজ সেই একই ভুল এড়াতে কাঁথা মুড়ি দিয়ে রেখেছে সে।
নওশীনের মেসেজ সিন হতেই স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ে অভ্যুদয়। ঠোঁটের কোণের হাসিটা এখনো বিদ্যমান।
“আহারে, তাই নাকি? তো পিচ্চির বয়স কত হবে? ১৫ নাকি ১৬?” অভিমানে হা করে রইল অভ্যুদয়। মেয়েটা তাকে খেপানোর একটা সুযোগও ছাড়ে না।
“মজা নিচ্ছ?” মেসেজ পাঠালো অভ্যুদয়।
“কে? আমি? কই, না তো!”
“হাহ্!”
“ওমা... পিচ্চিটা রাগ করেছে! রাগ করে না। তো কত তারিখ তোমার জন্মদিন?”
“২৫ জুলাই।” আবারও মৃদু হাসি অভ্যুদয়ের ঠোঁটে। কাঁথা মুড়ি দেওয়া অবস্থায় বিছানায় শুয়েছে সে। গরম লাগছে খুব। মোবাইলের স্ক্রিনের আলো নিভিয়েই কাঁথার মধ্য থেকে মুখ বের করল সে। পা'নিতে ডু'বে যাওয়া ব্যক্তির মতো মুখ বের হতেই বড় করে নিশ্বাস নিল সে, পরক্ষণেই আবারও কাঁথা মুড়ি দিয়েই মোবাইল হাতে নেয়।
“একটা বিকাশ নাম্বার দিও।” নওশীনের মেসেজ দেখতেই কপালে ভাঁজ পড়ল অভ্যুদয়ের। হঠাৎ করে কেন বিকাশ নাম্বার চাইল, তা বুঝতে পারল না।
“কেন?”
“পিচ্চিকে গিফট পাঠাব তাই।” নওশীনের উদ্দেশ্য বুঝতে পারল অভ্যুদয়।
“লল, গিফট দেওয়ার হলে সামনাসামনি এসে দাও। আর না হয় লাগবে না।”
“সামনাসামনি কীভাবে দেব? উড়ে আসব নাকি?”
“বাদ দাও, তুমি উড়তে পারবে না। বয়স্ক মানুষ তো, তাই উল্টো দেখা যাবে হুট করেই কারও ঘাড়ের ওপর গিয়ে পড়েছ। পরে হিতে বিপরীত হবে।”
“অভ্যুদয়ের বাচ্চা... সামনে থাকলে তোমার সবগুলো চুল ছিঁড়তাম আমি। না হয় কা'মড়ে দিতাম!” অভ্যুদয় হাসে নওশীনের মেসেজ দেখে। সে এই কয়দিনে একটা কথা ভালো করে বুঝে গেছে—নওশীনের একধরনের অদ্ভুত অবসেসন কাজ করে চুল আর কামড় দেওয়া নিয়ে। রেগে গেলেই সে এই দুটো কথা বলবেই বলবে। নওশীনকে রাগিয়ে তারও ভালো লাগে।
“না থাক ভাই, আমাকে কামড়াতে হবে না। পরে দেখা যাবে এত বয়স্ক মানুষের কামড় খেয়ে আমি ভ্যাম্পায়ার হয়ে গেছি!” নিজে নিজেই হাসছে অভ্যুদয়।
“অভ্যুদয়ের বাচ্চা... তোরে তো খাইছি আমি!” নওশীনের মেসেজ এল সঙ্গে সঙ্গে। তা দেখতেই কপালে ভাঁজ পড়ল অভ্যুদয়ের। গা-টা হুট করেই কেমন যেন করছে তার। চোখ গিয়ে আটকালো ‘তোরে’ লেখাটার দিকে। তুই করে মেসেজটা দেখতেই বিরক্তি কাজ করল নিজের মধ্যে। মেসেঞ্জার থেকে বেরিয়ে গেল নিমিষেই।
উঠে বসে অভ্যুদয়। স্থির হয়ে রইল। মোবাইল পাশেই রাখা। হঠাৎ করেই রাগ হচ্ছে তার। যেনতেন রাগ নয়, অসম্ভব রকমের রাগ। কী হচ্ছে তার সাথে, তা নিজেও জানে না।
একটু পর পর মোবাইলে আলো জ্বলছে। সে জানে নওশীন তাকে মেসেজ দিচ্ছে, তবুও তা সিন করার ইচ্ছা করছে না তার। উঠে দাঁড়ায় সে, সোজা চলে যায় ওয়াশরুমে।
ওয়াশরুমে থাকা আয়নার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে থাকল একদৃষ্টিতে। দাঁতে দাঁত চেপে ধরা তার। জোর করে হাসি ফুটালো মুখে।
“চিল অভ্যুদয়, চিল! বড় মানুষ, তুই করে বলতেই পারে” দাঁতে দাঁত চেপেই বলল সে। ঠোঁটের কোণে জোর করে ফোটানো হাসিটা বিলীন হলো মুহূর্তে।
“আই ফা'কিং হেট দ্যাট ওয়ার্ড!” কথাটা বলেই ঠাস করে দরজা বন্ধ করে সে। পুরো ওয়াশরুম কেঁপে উঠল উচ্চ শব্দে।
কয়েকবার ওয়াশরুমের মধ্যেই পায়চারি করল সে। পরক্ষণেই বেরিয়ে এল ওয়াশরুম থেকে। কেন গিয়েছিল সেটাও জানে না, এটাও লক্ষ্য করেনি যে—যেই ছেলে কখনো গালি দেয়নি, তার মুখে আজ গালি এসেছে। সে শুধু নিজের মেজাজ নিয়ে ধুঁকছে।
দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই মোবাইল তুলে নিল সে। মোবাইলের ঘড়িতে এখন ১২:৩০টা বাজে। এতক্ষণে তার ঘুমিয়ে থাকার কথা, অথচ তার মেজাজটা বিগড়ে আছে। লক খুলতেই নওশীনের আইডির চ্যাটহেড শো করল। মেসেজ দিয়েছে অনেকগুলো।
“কোথায় গেলে?”
“অনলাইনে থাকতেও মেসেজ সিন করছ না?”
“গার্লফ্রেন্ড পেয়ে গেলে নাকি?”
“ভালো ভালো, গার্লফ্রেন্ড পেতে না পেতে আমাদের ভুলে গেলে?”
“ঘুমিয়ে গেলে নাকি পিচ্চি?”
“অভ্যুদয়?”
“ওকে, ঘুমাও। গুড নাইট। কাল কথা হবে।”
অভ্যুদয় সবগুলো মেসেজ দেখল মন দিয়ে। তবুও তার চোখে যেন সেই ‘তুই’ করে কথাটা ভাসছে। নওশীনের নামের পাশে এখনো সবুজ চিহ্নটা দেখা যাচ্ছে। বিরক্তি বেড়ে গেল তার। এই মেয়েটা ঘুমায় না কেন? রাত জেগে কী করে? কী দরকার রাত জাগার! এসব ভাবতে ভাবতেই টাইপ করা শুরু করে সে—
“নওশীন” মেসেজ সিন হলো সঙ্গে সঙ্গে। অভ্যুদয় এখনো টাইপ করছে মেসেজ।
“একটা কথা শোনো। এই পৃথিবীতে যদি আমি কোনো একটা জিনিস বেশি অপছন্দ করি, তাহলে সেটা হলো ‘তুই’ করে কথা বলা। আমাকে নেক্সট টাইম ‘তুই’ করে কথা বলবে না। বিশ্বাস করো একদম ব্লক করে দেব আমি, জীবনেও খুলব না।” মেসেজ পাঠিয়েই বিছানায় বসল সে। নওশীন মেসেজ সিন করেছে, কিন্তু কোনো রিপ্লাই পাঠায়নি।
“এটা বললেই তো হয়! সেই জন্য এভাবে বলতে হয়?” নওশীনের মেসেজ দেখতেই দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল অভ্যুদয়। তাই তো, এভাবে রিয়্যাক্ট করার কী আছে?
“সরি... মেজাজটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিল।”
“আহারে! পিচ্চিটার আবার মেজাজ খারাপ হয়!”
“আহারে আহারে করিও না তো!”
“ওকে।”
“এবার বলো, বার্থডে গিফট কী দেবে?”
“কী চাই তোমার?”
“নাম ছাড়া তো আর কিছুই বললে না, তো আর কী চাইবো?”
“বললাম তো বিকাশ নাম্বার দাও, টাকা পাঠালে কিছু কিনে নিও।”
“দরকার নেই। এর চেয়ে ভালো হয় তুমি কিছু কিনে পাঠাও।”
“হ্যাঁ, এরপর তুমি জেনে যাও আমি কোথায় থাকি, তাই না?”
“জানলেই কী? আমি কী তোমাকে খুঁজতে যাব নাকি? আমাকে কী সেরকম ছেলে মনে হয় তোমার?”
“সেরকম মনে হয় না বলেই কথা বলি। কথাটা দুষ্টুমি করে বলেছি, বোকা।”
“আমিও গিফট পাঠানোর কথা দুষ্টুমি করে বলেছি। তুমি চাইলে আমাকে কল করেও উইশ করতে পারো।”
“কল?”
“হুম।”
“রাতে?”
“তোমার যখন ইচ্ছা।”
“আচ্ছা।”
“সত্যি তুমি কল করবে? কখন করবে?” হুট করেই অনেক খুশি খুশি লাগছে অভ্যুদয়ের। শোয়া থেকে কখন উঠে বসেছে নিজেও জানে না।
“ফ্রি সময় করে কল দেব। কাল কলেজ আছে, ফ্রি হলেই কল করবো।”
“কাল? আমার জন্মদিন তো পরশু।”
“কাল বের হচ্ছি, তাই কল করব। উইশ না হয় রাতে মেসেজ দিয়ে করলাম।”
“ওকে। আমার নাম্বার - ০১৯৮*****০০।”
“যাও, এখন ঘুমাও। অনেক রাত হয়েছে।”
“যাচ্ছি, কল করতে ভুলো না কিন্তু। আমি তোমার কলের অপেক্ষায় থাকব।”
“ঠিক আছে পিচ্চি, ভুলব না।”
“গুড নাইট।”
“গুড নাইট।”
নওশীনের মেসেজ সিন করেই ওয়াইফাই বন্ধ করে অভ্যুদয়। আগামীকালকের জন্য এখনই অস্থির লাগছে তার। প্রথমবার কারও সাথে কীভাবে কথা বলবে সে? মেয়েদের সাথে কীভাবে কথা বলতে হয়? এখনই নার্ভাস লাগছে তার। এপাশ-ওপাশ ঘুরেফিরে শুচ্ছে সে, তবুও অস্থির লাগছে। চোখ গিয়ে আটকালো ঘড়ির কাঁটার দিকে। ১টা বাজে। আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা, এরপরেই নওশীনের কল আসবে। চোখ বন্ধ করল সে, যত তাড়াতাড়ি ঘুমাবে তত তাড়াতাড়ি রাত শেষ হবে।
চলবে...
আজকের পর্বটা ছোট, কিন্তু এই পর্বে দেওয়ার মতো আর কিছুই ছিলো না। সবাই লাইক কমেন্ট করবেন, সব ঠিকঠাক থাকলে আগামীকাল সবচেয়ে বড়ো ও রোমান্টিক একটা পর্ব পাবেন।
আরেকটা কথা, ১০ নং পর্বে কিছুটা ১৮+ থাকবে, তাই সবাই গ্রুপে জয়েন হয়ে নিবেন। আমি ১৮+ সিনটা গ্রুপে দিবো। লিংক কমেন্টে থাকবে।