ফন্ট সাইজ:
থিম:
বিয়ে এবং একাকীত্ব

৪র্থ পর্ব

লেখক: সিদরাতুল মুনতাহা

দেখতে আসা মানুষগুলো

অন্যদিকে আদিবার বাড়িতে তখন অন্যরকম ব্যস্ততা।
সকাল থেকেই শায়লা বেগম মেয়েকে নিয়ে ব্যস্ত।
“আদিবা, চুলটা ঠিক করে নে।”
“মা, এত কিছু করার কী আছে?”
“চুপ কর। আজ মানুষজন আসবে।”
আদিবা আয়নার সামনে বসে নিজের মুখের দিকে তাকাল।
নিজেকেই যেন অপরিচিত লাগছিল।
সে খুব বেশি সাজতে চায়নি।
সাদামাটা একটা পোশাক, হালকা সাজ আর মাথায় ওড়না—এইটুকুই তার কাছে যথেষ্ট।
কিন্তু বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধুকপুক করছিল।
সে জানে না মানুষগুলো তাকে পছন্দ করবে কি না।
আর পছন্দ করলেও—
তার নিজের জীবনটা কোথায় যাবে?
কিছুক্ষণ পর বাড়ির সামনে গাড়ির শব্দ হলো।
আদিবার বুকটা ধক করে উঠল।
বড় বোন আর দুলাভাইও এসেছেন।
কামাল রহমান অতিথিদের স্বাগত জানালেন।
জারিফের মা, বাবা এবং পরিবারের আরও কয়েকজন বসার ঘরে বসলেন।
কথাবার্তা শুরু হলো।
আদিবার সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলো।
পড়াশোনা কোথায় পর্যন্ত করেছে।
কী করতে চায়।
কেমন স্বভাব।
শায়লা বেগম একে একে সব প্রশ্নের উত্তর দিলেন।
কিন্তু আদিবা তখন পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল।
তার হাত দুটো ঠান্ডা হয়ে আসছিল।
কিছুক্ষণ পর তাকে ডাকা হলো।
“আদিবা, মা, এদিকে আয়।”
আদিবা ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকল।
মাথা নিচু করে সালাম দিল।
তারপর চুপ করে বসে রইল।
জারিফের মা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেলেন।
মেয়েটার মধ্যে কোনো অহংকার নেই।
চেহারায় অদ্ভুত এক মায়া।
কথাবার্তায় ভদ্রতা।
তিনি মনে মনে ভাবলেন,
“মেয়েটা আমার ছেলের জন্য খুব ভালো হবে।”
আদিবা মাথা নিচু করে বসে থাকলেও সবার চোখের দৃষ্টি সে অনুভব করছিল।
তার ভয় আরও বেড়ে গেল।
সে জানে না—
এই মানুষগুলোই কি তার ভবিষ্যতের পরিবার হতে যাচ্ছে?
কিছুক্ষণ পর জারিফের মা হঠাৎ নিজের গলার সোনার হারটি খুলে আদিবার হাতে পরিয়ে দিলেন।
আদিবা চমকে উঠল।
“এটা কেন?”
মা মৃদু হেসে বললেন,
“তোমাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে।”
আদিবার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
সে শুধু মাথা নিচু করে রইল।
তার চোখের কোণে তখন অজানা এক ভয় জমতে শুরু করেছে।
কারণ সে বুঝতে পারছিল—
এই হারটা শুধু একটা উপহার নয়।
এটা হয়তো তার জীবনের নতুন সম্পর্কের প্রথম চিহ্ন।
যে ছেলেটি ছিল না
আদিবা বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিল।
মনের ভেতর একটা প্রশ্ন ঘুরছিল—
“ছেলেটা কোথায়?”
সবাই এসেছে।
ছেলের মা এসেছে।
বাবা এসেছে।
পরিবারের মানুষ এসেছে।
কিন্তু যার সঙ্গে তার জীবন কাটানোর কথা—
সে আসেনি।
আদিবা কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেল না।
শুধু চুপচাপ বসে রইল।
অন্যদিকে জারিফ তখন নিজের ঘরে।
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে।
তার মায়ের ফোন একাধিকবার এসেছে।
সে ধরেনি।
কিছুক্ষণ পর গীতা ঘরে ঢুকল।
“ভাইয়া?”
জারিফ ফিরে তাকাল।
“কী?”
“ওরা মেয়েটাকে পছন্দ করেছে।”
জারিফ কিছু বলল না।
জারা ধীরে বলল,
“মেয়েটা নাকি খুব ভালো।”
জারিফ মৃদু হেসে বলল,
“ভালো হলেই তো আমার পছন্দ হতে হবে না।”
জারা চুপ করে গেল।
তারপর বলল,
“ভাইয়া, অন্তত একবার দেখে নাও।”
জারিফ মাথা নাড়ল।
“আমি জানি আমার মন কোথায়।”
জারা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
কিন্তু সে জানত না—
এই মুহূর্তে যে মেয়েটি জারিফের বাড়ির মানুষের সামনে মাথা নিচু করে বসে আছে, সেই মেয়েটিই খুব শিগগির জারিফের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়ে উঠবে।
আর আদিবা?
সে তখনও কিছুই জানত না।
সে জানত না, তার জীবনের সবচেয়ে বড় সুখ আর সবচেয়ে বড় কষ্ট—দুটোর সঙ্গেই এই পরিবারের নাম জড়িয়ে যেতে চলেছে।
জারিফ নিজের ঘরে চুপচাপ বসে ছিল।
তার মাথার ভেতর শুধু একটাই কথা ঘুরছিল—
মা কীভাবে এমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারলেন?
এই প্রথম মায়ের কোনো সিদ্ধান্ত তার কাছে এতটা অপছন্দের মনে হচ্ছে।
ছোটবেলা থেকেই মা তার ভালো-মন্দের কথা ভেবে সব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মায়ের কোনো কথায় সে কখনো প্রশ্ন তোলেনি।
কিন্তু এবার?
এবার মায়ের সিদ্ধান্ত তার ভালোবাসার মানুষটাকে তার কাছ থেকে কেড়ে নিতে চলেছে।
হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল।
“ভাইয়া?”
জারিফ বুঝতে পারল, জারা এসেছে।
“ভেতরে আয়।”
জারা ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকল।
ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারল, তার মন ভালো নেই।
“ভাইয়া, তুমি এত রাগ করে আছো কেন?”
জারিফ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“তুইও কি মায়ের সিদ্ধান্তকে ঠিক মনে করিস?”
জারা একটু থেমে বলল,
“আমি শুধু বলছি, মেয়েটা তো কোনো দোষ করেনি।”
“আমি জানি।”
“তাহলে অন্তত একবার ওকে দেখো।”
জারিফ তৎক্ষণাৎ মাথা নাড়ল।
“না।”
“কেন?”
“কারণ আমার মন অন্য একজনের কাছে।”
জারা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“কিন্তু মা তো তোমার ভালোই চায়।”
জারিফ এবার একটু কঠিন গলায় বলল,
“সব সময় ভালো চাইলে কি মানুষের ইচ্ছেটাও জিজ্ঞেস করতে হয় না?”
জারা আর কিছু বলল না।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে মায়ের ডাক শোনা গেল।
“জারিফ, বাবা, আমার সঙ্গে একটু কথা বলবি?”
জারিফ চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল।
তারপর ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে মায়ের সামনে দাঁড়াল।
“মা, আমি এই বিয়েটা করতে চাই না।”
মা শান্তভাবে বললেন,
“আমি জানি।”
“তাহলে আমাকে জোর করছো কেন?”
মা কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
“কারণ আমি জানি, তুই এখন যা ভাবছিস, সেটা একদিন বদলে যাবে।”
জারিফ মাথা নাড়ল।
“না মা। এবার বদলাবে না।”
“তুই যদি এই বিয়ে না করিস…”
মা কিছুক্ষণ থেমে গেলেন।
তারপর কাঁপা গলায় বললেন,
“তাহলে হয়তো তোর মাকে আর বেঁচে থাকতে হবে না।”
জারিফ স্তব্ধ হয়ে গেল।
“মা!”
“আমি তোকে জোর করতে চাই না বাবা। কিন্তু তুই যদি আমার এই শেষ কথাটাও না রাখিস, তাহলে আমি নিজেকে খুব অসহায় মনে করব।”
জারিফ অসহায় চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর ধীরে বলল,
“ঠিক আছে মা… তোমার জন্য আমি বিয়ে করব।”
মায়ের চোখে স্বস্তি ফুটে উঠল।
কিন্তু জারিফের চোখে?
সেখানে ছিল শুধু কষ্ট আর অভিমান।
“তবে একটা কথা মনে রেখো মা…”
মা তাকালেন।
“আমি ওকে ভালোবাসতে পারব না। কারণ আমি অন্য একজনকে ভালোবাসি।”
মা মৃদু হেসে বললেন,
“আগে বিয়েটা তো কর বাবা। তারপর দেখবি, সব ঠিক হয়ে যাবে।”
তিনি মনে মনে ভাবলেন—
তোর বাবাও তো একসময় অন্য কাউকে ভালোবাসত। কিন্তু বিয়ের পর সে আমাকে ছাড়া আর কারও দিকে তাকায়নি। তুইও একদিন বুঝবি।
 
মায়ের ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে ঢুকেই দরজাটা বন্ধ করে দিল জারিফ।
তার বুকের ভেতরটা যেন আগুনের মতো জ্বলছে।
একদিকে তার ভালোবাসার মানুষ।
অন্যদিকে মায়ের আবেগ।
সে বুঝতে পারছে না কী করবে।
টেবিলের ওপর রাখা পানির গ্লাসটা হাতে তুলে নিল।
কয়েক মুহূর্ত গ্লাসটার দিকে তাকিয়ে থাকার পর হঠাৎ—
ঠাস!
গ্লাসটা মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেল।
জারিফের রাগ যেন আরও বেড়ে গেল।
ভাঙা কাচের একটা টুকরো তার হাতে বিঁধে গেল।
হাত থেকে রক্ত ঝরতে শুরু করল।
কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই।
সে বিড়বিড় করে বলল,
“সবাই মেয়েটাকে এত পছন্দ করল কেন?”
তারপর নিজের হাতের রক্তের দিকে তাকিয়ে তিক্ত হেসে উঠল।
“মা, বাবা, জারা… সবাই যেন ওকে দেখেই পাগল হয়ে গেছে।”
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর তার চোখে রাগ জমে উঠল।
“কিন্তু আমি?”
সে জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি তো অন্য কাউকে ভালোবাসি।”
তার কণ্ঠ ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে গেল।
“আমি যদি ওকে বিয়ে করতেও বাধ্য হই…”
সে থেমে গেল।
তারপর নিচু গলায় বলল,
“আমার ভালোবাসাকে যদি আমি না পাই, তাহলে ওকেও সুখে থাকতে দেব না।”
কথাগুলো বলতে বলতে জারিফ নিজেই জানত না, সে কতটা অন্যায় কথা বলে ফেলছে।
সে শুধু নিজের কষ্ট আর রাগের মধ্যে ডুবে ছিল।
সে জানত না—
যে মেয়েটাকে সে এখনো ভালোভাবে দেখেনি, সেই আদিবাই একদিন তার সমস্ত রাগ, অভিমান আর অহংকারের কারণ হয়ে উঠবে।
আবার সেই আদিবাই হয়তো একদিন তার সমস্ত শান্তির কারণও হবে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন