মায়ের সিদ্ধান্ত
দেশে ফেরার কয়েকদিন পর থেকেই জারিফ বুঝতে পারছিল, তার মা যেন তাকে নিয়ে কিছু একটা ভাবছেন।
মাহিরা চৌধুরী সরাসরি কিছু বলছিলেন না।
কিন্তু ছেলের সঙ্গে অকারণে ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলছিলেন।
কখনো বলতেন,
“দেশে ফিরে এবার নিজের কাজটাও একটু দেখাশোনা করো।”
আবার কখনো হঠাৎ জিজ্ঞেস করতেন,
“জারিফ, বিয়ে-শাদি নিয়ে কখনো ভেবেছিস?”
প্রশ্নটা শুনলেই জারিফ হেসে এড়িয়ে যেত।
“এখনই এসব নিয়ে ভাবতে চাই না, মা।”
মাহিরা তখন আর কিছু বলতেন না।
শুধু ছেলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসতেন।
কিন্তু সেই হাসির আড়ালে যে একটা সিদ্ধান্ত ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে, সেটা জারিফ বুঝতে পারেনি।
একদিন সন্ধ্যায় মাহিরা ছেলেকে নিজের ঘরে ডাকলেন।
জারিফ গিয়ে মায়ের সামনে বসতেই তিনি শান্ত গলায় বললেন,
“তোর জন্য একটা মেয়ে দেখেছি।”
জারিফ প্রথমে ভেবেছিল মা হয়তো মজা করছেন।
“মা, এসব শুরু করো না তো।”
“আমি মজা করছি না।”
মাহিরার গলায় এমন দৃঢ়তা ছিল যে জারিফ চুপ হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর সে বলল,
“আমি এখন বিয়ে করতে চাই না।”
মাহিরা ছেলের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“কেন?”
জারিফ কোনো উত্তর দিল না।
তিশার কথা তার মনে পড়ে গেল।
কিন্তু মায়ের সামনে সে কথাটা বলতে পারল না।
কারণ মাহিরার কাছে সে কখনো কোনো কথা লুকাতে চাইত না।
অথচ আজ প্রথমবার তার মনে হলো, এই একটা কথা হয়তো তাকে লুকিয়েই রাখতে হবে।
মাহিরা ধীরে বললেন,
“মেয়েটা খুব ভালো। পরিবারও ভালো। আমি কথা দিয়েছি।”
জারিফ অবাক হয়ে তাকাল।
“তুমি কথা দিয়ে ফেলেছ?”
মাহিরা মাথা নাড়লেন।
জারিফ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
“মা, তুমি যদি কথা দিয়ে থাকো...”
বাকিটা সে শেষ করল না।
কারণ সে জানত, মায়ের দেওয়া কথা সে কখনো ভাঙতে পারে না।
কিন্তু সেই মুহূর্তে তার মনে শুধু একজনের কথাই ঘুরছিল—
তিশা।
আর অন্যদিকে, কিছুই না জেনে আদিবা নিজের স্বাভাবিক জীবনেই ছিল।
সে জানতও না—
তার জীবনটা খুব শিগগিরই এমনভাবে বদলে যেতে চলেছে, যেটা সে কোনোদিন কল্পনাও করেনি।
যে মেয়েটি কিছুই জানত না
আদিবার কাছে বিয়ে মানেই ছিল অনেক দূরের কোনো বিষয়।
সবে এসএসসি পরীক্ষা শেষ করেছে সে।
সামনে পড়াশোনা, নতুন স্বপ্ন, নতুন জীবন—এসব নিয়েই ভাবছিল।
সন্ধ্যায় বারান্দায় বসে সে বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছিল।
আদিল পাশ থেকে বিরক্ত করে বলল,
“আপু, পরীক্ষা তো শেষ! এখনো বই পড়ছ?”
আদিবা হেসে বলল,
“বই পড়লেই কি পরীক্ষা দিতে হয়?”
“তাহলে কী?”
“পড়তে ভালো লাগে।”
আদিল মুখ বাঁকিয়ে চলে গেল।
আদিবা আবার বইয়ের দিকে তাকাল।
তার জীবনটা তখনও খুব সহজ ছিল।
সে জানত না, তার বাবা-মা তাকে নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
কামাল রহমানও মেয়েকে নিয়ে কখনো তাড়াহুড়ো করতে চাননি।
কিন্তু পরিস্থিতি এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছিল, যেখানে পরিবারের বড়দের সিদ্ধান্তকে আর সহজভাবে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না।
এক রাতে শায়লা বেগম মেয়ের পাশে এসে বসলেন।
আদিবা অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকাল।
“কী হয়েছে, মা?”
শায়লা কিছুক্ষণ মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর খুব ধীরে বললেন,
“আদিবা, তোকে একটা কথা বলব?”
“হুম।”
“ভয় পাবি না তো?”
আদিবা এবার বইটা বন্ধ করে মায়ের দিকে তাকাল।
“কী কথা?”
শায়লা মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।
তারপর বললেন,
“তোকে দেখতে একটা পরিবার আসতে চায়।”
আদিবা যেন কিছুক্ষণের জন্য কথা বলতেই ভুলে গেল।
তার চোখে বিস্ময়।
“আমাকে?”
শায়লা মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন।
আদিবা আর কোনো কথা বলল না।
তার মনে তখন একসঙ্গে অনেক প্রশ্ন।
কে তারা?
কেন তাকে দেখতে আসবে?
তার পড়াশোনা?
তার ভবিষ্যৎ?
আর সে কি সত্যিই এত তাড়াতাড়ি নিজের পরিচিত পৃথিবীটা ছেড়ে অন্য একটা পরিবারে চলে যাবে?
কোনো উত্তরই তার জানা ছিল না।
শুধু জানত—
তার জীবনের আগের অধ্যায়টা হয়তো এখানেই শেষ হতে চলেছে।
আর নতুন অধ্যায়ের প্রথম পাতায় যার নাম লেখা থাকবে, সেই মানুষটিকে সে তখনও একবারও দেখেনি।
জারিফ রহমান ইহান চৌধুরী।
অনিচ্ছার শুরু
জারিফ রহমান ইহান চৌধুরী কখনো ভাবেনি, একদিন তার নিজের বিয়ের কথা শুনে সে এতটা অস্বস্তি বোধ করবে।
সেদিন সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে মায়ের মুখটা দেখেই তার মনে হলো, কিছু একটা হয়েছে।
ড্রয়িংরুমে বসে তার মা চুপচাপ ছিলেন।
জারিফ জুতো খুলতে খুলতে বলল,
“মা, কী হয়েছে? তোমাকে এত চিন্তিত লাগছে কেন?”
মা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
“কাল আমরা একটা মেয়ে দেখতে যাব।”
জারিফ থমকে গেল।
“মেয়ে?”
“হ্যাঁ।”
“কীসের মেয়ে?”
মা এবার স্বাভাবিক গলায় বললেন,
“তোমার জন্য।”
কথাটা শুনে জারিফের মুখের হাসিটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
“আমার জন্য?”
“হ্যাঁ। একটা পরিবার মেয়েটাকে নিয়ে খুব ভালো। আমি মেয়েটাকে চিনি। খুব ভালো মেয়ে।”
জারিফ মাথা নাড়ল।
“কিন্তু মা, আমি এখন বিয়ে করতে চাই না।”
মা অবাক হয়ে তাকালেন।
“কেন?”
জারিফ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
“কারণ আমি অন্য একজনকে পছন্দ করি।”
মায়ের মুখটা শক্ত হয়ে গেল।
“ওই মেয়ের কথা আবার বলছ?”
জারিফ এবার শান্ত গলায় বলল,
“হ্যাঁ মা। তুমি তো জানো।”
“আমি জানি। আর এটাও জানি, ওই মেয়েকে আমি পছন্দ করি না।”
জারিফ আর কথা বাড়াল না।
মা বললেন,
“কাল শুধু দেখে আসবে। মেয়েটাকে দেখতে যাওয়াতে এত সমস্যা কোথায়?”
জারিফ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“আমি যদি না পছন্দ করি?”
“তাহলে পরে কথা হবে।”
“আর যদি পছন্দ করো?”
জারিফ মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“সেটা অসম্ভব।”
মা আর কিছু বললেন না।
কিন্তু তাঁর চোখের দৃষ্টিতে স্পষ্ট ছিল—এই বিয়ে তিনি সহজে ছাড়বেন না।
সেদিন রাতেই জারিফ তার ছোট বোন জারার ঘরে গেল।
জারা বই পড়ছিল।
ভাইকে দেখে বলল,
“ভাইয়া, কিছু বলবে?”
জারিফ বিছানায় বসে পড়ল।
“জারা, তুই তো সব জানিস।”
“কী?”
“আমি কাকে পছন্দ করি।”
জারা বইটা বন্ধ করল।
“হুম, জানি।”
“তুই মায়ের সঙ্গে কথা বল।”
জারা কিছুক্ষণ ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
“আমি চেষ্টা করব।”
জারিফ মৃদু হেসে বলল,
“চেষ্টা না, আমাকে বাঁচা।”
জারা হেসে ফেলল।
কিন্তু দুজনেই জানত—বিষয়টা হাসির নয়।
পরদিন জারা মায়ের কাছে গেল।
অনেক বোঝানোর চেষ্টা করল।
“মা, ভাইয়া যাকে পছন্দ করে, তাকে একবার দেখো না?”
মা স্পষ্টভাবে বললেন,
“না।”
“কেন?”
“কারণ আমি ওই পরিবারকে পছন্দ করি না।”
“কিন্তু ভাইয়া তো তাকে ভালোবাসে।”
মা এবার কঠিন গলায় বললেন,
“তোমার ভাই আমার ছেলে। ওর ভালো-মন্দ বোঝার দায়িত্ব আমার। আমি যাকে পছন্দ করব, ও তাকেই বিয়ে করবে।”
জারা আর কোনো উত্তর খুঁজে পেল না।
কথাটা যখন জারিফের কানে গেল, সে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
শেষে শুধু বলল,
“তোমাদের যা ভালো লাগে করো।”
তারপর কিছুক্ষণ থেমে যোগ করল,
“কিন্তু একটা কথা মনে রেখো—জোর করে বিয়ে দিলে আমি তাকে বউ হিসেবে মেনে নেব না।”
মা কষ্ট পেয়ে তাকালেন।
“তুমি আজ আমার কথার অবাধ্য হচ্ছ কেন? তুমি তো কখনো এমন ছিলে না।”
জারিফ কোনো উত্তর দিল না।
কারণ সে জানত—
তার সামনে এখন এমন একটা সিদ্ধান্ত দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সে একদিকে মায়ের কথা রাখতে পারছে না, অন্যদিকে নিজের ভালোবাসাকেও ছেড়ে দিতে পারছে না।