গল্প : সুইসাইড নোট
পর্ব - ০১
লেখক : শহিদুল ইসলাম রাজন
মাঝারি আকৃতির আবদ্ধ রুমে তখনো বেজে চলছে হাঙ্গেরিয়ান সুইসাইড সং- দ্য গ্লুমি সানডে। ভেসে আসছে কিছু লাইন, যেগুলোর ভাবার্থ ছিল এমন -
'প্রিয়তমা আমি চাই
আমার স্বপ্নরা তোমাকে আর জেঁকে না বসুক
এ হ্নদয় তোমাকে বলে যাচ্ছে আজ
ঠিক কতটা চেয়েছিলাম তোমায়...। '
ধীরে ধীরে ভেতরে প্রবেশ করে পুলিশ। শুরুতে হালকা আলো বাকিটা আবছা অন্ধকার। মেঝেতে রক্তের ফোয়ারা, সাথে ছোট ছোট মাংসের টুকরো, টেবিলে বৃহৎ হাত -পা - মাথা, চোখ। টুকরো টুকরো করে সাজানো সব। যেনো সাজিয়ে রাখা হয়েছে কোনো প্রদর্শনীর জন্য। কাটা অংশগুলো দেখে বোঝার উপায় নেই অংশগুলো ঠিক কার শরীরের।
নিচে পড়ে আছে 'উদারিং হাইটস, ট্রাজেডি প্লাস টাইম, ' মাই ফাদার বিফোর মি', 'বাই দ্য টাইম ইউ রিড দিজ আই উইল বি ডেইড', 'আই ওয়াজ হেয়ার', কাভারে লেগে আছে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত। আরো পড়ে আছে কয়েকটা ব্যর্থ আঙুল। সিলিঙে ঝুলে আছে রশি, অন্য ফ্যানের বাতাসে ঝুলছে ধীরগতিতে। মেঝে এবং টেবিল ছাড়াও বইয়ের তাক, দেয়াল, চেয়ার সবকিছুতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে রক্তের দাগ, কোথাও এঁকে আছে মানুষ, কোথাও এঁকে আছে বিরহ, কোথাও এঁকে আছে প্রেম।
নীলা বাধাঁ পড়ে আছে চেয়ারে, অজ্ঞান অবস্থায়। নীলার মাথা নেতিয়ে পড়ার ধরন, তার চোখ -মুখ দেখে মনে হচ্ছিল বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত কোনো ঘুম ঘুমিয়েছে সে। সে তখনও জানে না শ্রাবন কোথায়, কেমন আছে, বেঁচে আছে না-কি মরে গেছে। শ্রাবন তার প্রেমিকের নাম, যে তাকে ভয়ানকভাবে ভালোবাসতো। নীলা তার ভালোবাসা সঠিকভাবে বুঝতে পারেনি কখনোই। তার কিছু চুল কপাল বেয়ে চোখ ছুঁয়ে এমনভাবে পড়েছিল ঠিক যেমনটা শ্রাবন চাইতো, যখন তাদের সম্পর্ক ভালো ছিল, তখন এভাবে চুল পড়া দেখলে সে নীলার সামনে বসে নীলার হাটুতে হাতের ভর দিয়ে নীলার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখতো আর বলতো,
'আমাকে কখনো ছেড়ে যেও না প্লিজ।'
বলেই নীলার কোলে মাথা রেখে বসে থাকতো, নীলা তখন শ্রাবনের মাথা সোজা করে তুলে ধরে চোখে চোখ রেখে বলতো,
'আমি চলে গেলে আমার পাগলটা কার কোলে এভাবে মাথা রাখবে?' এবং শ্রাবনের দিকে তাকিয়ে হাসতো, ভালোবাসার হাসি। বিয়ের পর চোখের উপর চুল পড়ার দৃশ্য দেখার মতো কখনও কোনো আবদার করেনি শ্রাবন, তখন নীলা ইচ্ছে করে চোখের উপর চুল ফেলে রাখলেও ফিরে তাকাতো না সে।
নীলার সাথে পরিচয় পর থেকে তার পুরোটা জুড়ে ছিল নীলা, নীলা আর শ্রাবনের পরিচয় ভার্সিটি জীবনে, দু 'বছরের জুনিয়র ছিল নীলা। আন্ত:বিভাগীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় গ্রিক চরিত্র হেক্টর আর একিলিসকে নিয়ে কথা বাড়াতে গিয়ে তাদের বাড়তি পরিচয়। প্রতিযোগীতার টপিক ছিল
'ইলিয়াড মহাকাব্যে কাকে বেশি পছন্দ এবং কেন?'
নীলা একিলিস আর শ্রাবন হেক্টরের পক্ষ নিয়ে লড়েছিল। প্রথমদিকে অনেক এগিয়ে থাকলেও পরে চুপসে গেল শ্রাবন কারণ, তখন তার পুরো মনোযোগ ছিল নীলার চোখ বেয়ে চুল পড়ার উপর। নীলার কন্ঠের উপর, নীলার হাসি এবং নীলার খোলা চুলের উপর। চুপসে যাওয়ার পর বিতর্কে হেরে গেলেও পরে লাভই হয়েছিল শ্রাবনের কারণ, তার হঠাৎ চুপসে পড়া নজরে পড়েছিল নীলার। তাইতো বিতর্ক শেষে নীলা শ্রাবনকে বলে উঠল,
'আপনি এভাবে থেমে গেলেন কেনো ভাইয়া?' কিছুটা নিচের দিকে তাকিয়ে শ্রাবন উত্তর দিল,
'এমনি, কথা খুজে পাচ্ছিলাম না।'
পেছন থেকে শ্রাবনের বন্ধুরা হাসতে হাসতে কী যেন বলতে চাইলো। নীলার সেটা বুঝতে বাকি রইল না, সে লজ্জায় পড়ে গেল, শ্রাবনও। তাই শ্রাবন বলল,
'আচ্ছা আমি আসি।'
'আমিও। '
বলেই দু'জন দু'দিকে চলে গেল, পেছন ফিরে তাকাতে গিয়েও কেউ তাকায়নি। ডিপার্টমেন্টে জুনিয়র মেয়েদের মাঝে এমনিতেই শ্রাবন সম্বন্ধে অনেক ভালো ধারণা। সে অনেক ভদ্র, হাসিখুশি আর শান্ত স্বভাবের, কয়েকজন জুনিয়র ওকে অনেক পছন্দও করে, সেসব জুনিয়রের একজন হলো নীলা। চোখের উপর চুল পড়া ছাড়াও নীলার প্রতি শ্রাবনের আরো কিছু আবদার ছিল।
শ্রাবন ছিলো অনেক গোছানো স্বভাবের, তবে যখন থেকে নীলার সাথে পরিচয়, তখন থেকে অগোছালো হয়ে গেল, সে চাইতো নীলা তাকে বকাঝকা করে গুছিয়ে নিবে, আর তাই সে ইচ্ছে করেই অগোছালো থাকতো। শ্রাবন বলতো,
' কেবল তুমি গুছিয়ে নিবে বলে
আমি অগোছালো হয়ে যাব আবার,
তুমি নিয়ম করে শাসন করবে বলে
আমি অনিয়ম করবো বারবার। '
নীলাও শ্রাবনকে নিজের মতো করে গুছিয়ে নিতে লাগলো, নীলার প্রতি শ্রাবনের আরো একটি আবদার হলো, নীলা যেন তার সাথে অনেক ঝগড়া করে, রাগ কিংবা অভিমান করে। তাই সে মাঝে মধ্যে ইচ্ছে করেই নীলার অবাধ্য হতো, নীলাকে ক্ষেপাতো, ঝগড়ার এক পর্যায়ে নীলা যখন কান্না শুরু করতো তখন শ্রাবন পিছন থেকে নীলাকে জড়িয়ে ধরে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলতো,
'সরি, ইচ্ছে করে রাগানোর জন্য। '
এতে নীলার রাগ না কমে বরং বেড়ে যেত, আর বলতো,
'এরকম ঝগড়া করলে আমি সত্যিই একদিন দুরে চলে যাব।'
চলবে..........