গল্প : সুইসাইড নোট
পর্ব : ০২
লেখক : শহিদুল ইসলাম রাজন
নীলা দুরে চলেও গিয়েছিল। তবে দুরে গিয়েছিল শ্রাবনের অতিরিক্ত অধিকার দেখানোর কারণে। অতিরিক্ত অধিকার দেখানোটা একসময় নীলার মনে তার জন্য বিরক্তির জন্ম দেওয়া শুরু করে, তার সেই বিরক্তি থেকে বাঁচতেই তৃতীয় ব্যাক্তির উদয়। তৃতীয় ব্যাক্তিটি আসাতে নীলা অনিচ্ছাকৃত ভাবে ঝুলে পড়ে তার উপর আর শ্রাবন - তার পুরনো একাকিত্বের।
শ্রাবনের একাকিত্ব ছিল ছোটবেলা থেকে। তার বাবা ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। সারাদিন বাহিরে বাহিরে থাকতেন, বউ আর ছেলেকে তেমন সময় দিতেন না তিনি। শ্রাবনের বাবা মায়ের মাঝেও তেমন ভালো সম্পর্ক ছিল না তখন, সম্পর্ক ভালো না থাকার পিছনে প্রধান কারণ এক পরনারীর উপর লোভ ছিল শ্রাবনের বাবার। টাকার কারণে পরনারীকেও হাতের মুঠোয় পেয়ে গেলেন তিনি। এ নিয়ে স্বামী স্ত্রী দু'জনের মাঝে ঝগড়া হতো প্রায়, অনেক মারধর ও করতেন শ্রাবনের মা'কে। রাতে যখন ঘুম ভেঙে গিয়ে মারধরের শব্দ কানে আসতো শ্রাবনের, তখন সে বিষয়টা মেনে নিতে পারতো না। শ্রাবনের মা যখন একা একটি রুমে এসে কান্না করতেন সে তখন আড়াল থেকে দাড়িয়ে দাড়িয়ে মাকে দেখতো, কখনো কাছে যেতো না মায়ের। বাবাকেও ভয়ে কিছু বলতে পারতো না কখনও। যখন পরনারীর উপর বাবার লোভ বিষয়টা বুঝতে পারল তখন থেকে বাবার উপর ঘৃনা জন্মালো তার, একটু ঘৃনা জন্মেছিল মায়ের উপরও, ঠিক তখন- যখন তিনি দ্বিতীয় বিয়েতে মত দিলেন। মত দেওয়া ছাড়া আর কিছু করার ছিল না মায়ের।
শ্রাবনের মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে হয়েছিল ছাড়াছাড়ি হওয়ার কয়েকমাস পর শ্রাবন তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বাবা মায়ের ছাড়াছাড়ি হওয়ার আগ পর্যন্ত সে তার বাবা মায়ের রুম থেকে সবচেয়ে দুরের রুমে থাকার চেষ্টা করতো, যেন মায়ের কান্নার আওয়াজ তার কানে আর না আসে, সবকিছুর পরেও প্রায় প্রতিদিন ঘুম ভেঙে যেত তার, প্রতিদিন মায়ের রুমের পাশে দাড়িয়ে থাকা হতো অনেকক্ষণ, এ যেন এক নিত্যদিনের অভ্যাস, এ যেন এক না বলা দায়িত্ব। শ্রাবনের মা আরো আগেই ভাইদের কাছে চলে যেতেন যদি শ্রাবন না থাকতো, শ্রাবনের কথা ভেবেই তিনি যন্ত্রণা বয়ে এসেছিলেন, মায়ের কষ্ট শ্রাবন বুঝতো, শুধু মুখ ফুটে মাকে কিছু বলতো না।
মা চলে যাওয়ার পর শ্রাবন আরও একা হয়ে গেলো, তবে একটা কথা ভেবে শ্রাবন নিজেকে সান্ত্বনা দিত।
সান্ত্বনা দিতো এই বলে যে মায়ের মার খাওয়ার শব্দ কিংবা তারপরের কান্নার শব্দ তাকে শুনতে হবে না আর। তবুও প্রতি মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে যেত শ্রাবনের, মা-মা বলেই চিৎকার দিয়ে জেগে উঠত সে। শ্রাবনের মা চলে যাওয়ার কয়েকদিন পর তার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করলেন, সেই পরনারীকেই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু বন্ধু, যারা জেনে গিয়েছিল শ্রাবনের সব তারা প্রায় নিজেদের মাঝে শ্রবনকে নিয়ে হাসাহাসি করতো, হাসাহাসি করতো তার বাবাকে নিয়ে, বাবার সেই পরনারী এমনকি তার মাকে নিয়েও।
বন্ধুদের কথাগুলো বুঝতে পেরে কারো সাথে মিশতে চাইতো না শ্রাবন, একা একা থাকতো। মা চলে যাওয়ার পর বাসা তার কাছে এক যন্ত্রণা এবং দু:স্বপ্নের নাম হয়ে দাঁড়ালো। যে বাসায় তার মায়ের সকল স্মৃতি, যে বাসা মধ্যরাত হলে ঘুমের ঘোরে তাকে নিয়ে যেত মায়ের রুমের কাছে, যে বাসায় পরবর্তীতে তার মায়ের আসন দখল করল সেই পরনারীটি সে বাসাতে আর কোনভাবেই থাকতে পারছিল না শ্রাবন। তাই বাবাকে জানালো তার প্রথম চাওয়া ----
'আমি কিছু কথা বলতে চাই, কথাগুলো হয়তো আপনি জানেন, কিংবা না জানলেও আমি বলার পর খুব সহজে বুঝতে পারবেন কথাগুলোর কারণ। এ বাসায় থাকতে আমার একটুও ভালো লাগছে না আর, এবং কেন লাগছে না তা আপনি খুব ভালো করে জানেন আশা করি কিছু বলতে হবে না এ বিষয়ে। আমি চাই আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে একটি মেশ কিংবা একটি ছোটখাটো বাসা ভাড়া করে সেখানে থাকার সুযোগ করে দিন। এতে আমি অনেক উপকৃত হব।'
সবকিছুর পরে বাবাও ছেলের কষ্ট বুঝতো, তাই ছেলের কথা- মতো এক পাচঁতলা দালানের চিলেকোঠার ঘর ভাড়া করে দিলেন, ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলে দিলেন, নিয়ম করে প্রতি মাসে টাকা পাঠাতেন তিনি। চিলেকোঠার ঘরটি খুব পছন্দ হলো শ্রাবনের, নিজের মতো করে একাকী থাকতে চাইতো বলেই ঘরটি তার খুব বেশি পছন্দের, ঘরটি পছন্দ হওয়ার আরো বড় দু'টি কারণ হলো -
তার আগের ঘরে অনেক বেশি অন্ধকার ছিল, আলো আসতো না তেমন। আর চিলেকোঠার ঘরটিতে অন্ধকারের পাশাপাশি মাঝেমাঝে কিছু আলোও আসতো। এবং এ ঘরে মায়ের কান্নার জন্য আলাদা কোনো রুম বরাদ্দ ছিল না।
মায়ের বিয়ের পর মাকে বলা তার প্রথম প্রশ্নটি ছিল,
'আপনাকে এতো করে বললাম তার পরেও বিয়েটা করলেন, এ বিয়েটা না করলে হতো না? কথার জবাব হিসেবে সেদিন মা কোনো উত্তর দেননি শ্রাবনকে, চুপ করেই ছিলেন, এ উত্তর মায়ের জানা নেই। '
বাবা থেকে আলাদা হওয়ার পর শ্রাবন মাকে প্রায় দেখতে যেতো, মায়ের কাছে কিছুদিন থেকেও গিয়েছিল প্রথম কয়েকদিন। তবে যেদিন থেকে মায়ের দ্বিতীয় বর আসা - যাওয়া শুরু করল সেদিন থেকে মায়ের কাছে যাওয়া কমে গেল শ্রাবনের।
যেদিন প্রথম মায়ের দ্বিতীয় বরকে শ্রাবন দেখলো তখন সে কথা বলছিল মায়ের সাথে। সেদিন শ্রাবনের মা শ্রাবনকে তার বাবা সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করতে গিয়ে বললেন,
' তোমার বাবা কেমন আছেন? '
চলবে.......