#সর্বনাশের হাসি
#Miju.Sheikh
#পর্ব সংখ্যা ৪
রাত তখন প্রায় বারোটা পেরিয়েছে। বাইরে বৃষ্টি থামেনি। কখনো জোরে, কখনো একটু ধীরে। জানালার কাচে বৃষ্টির ফোঁটা এসে পড়ছে, আর ঘরের ভেতর সেই শব্দটা একটানা বাজছে। নীরা এখনও বাবার ঘরে দাঁড়িয়ে। তার হাতে সেই ভেজা কাগজ। কাগজে লেখা ঠিকানাটা সে বহুবার পড়েছে। একই ঠিকানা। পুরোনো বাড়ি। রাত ২টা ১৭ মিনিট। এমন একটা সময়, যে সময়টার সঙ্গে গত দুই রাতের ঘটনাগুলো অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে। নীরা চেয়ার টেনে বসল। তার সামনে বাবার পুরোনো ডায়েরি। ডায়েরিটা খুলবে কি না, সেটা নিয়েই বেশ কিছুক্ষণ দ্বিধায় রইল। শেষ পর্যন্ত খুলল। প্রথম কয়েকটা পাতা দেখে তেমন কিছু বোঝা গেল না। বাবার ব্যবসার হিসাব, কিছু নাম, কিছু ফোন নম্বর, কয়েকটা তারিখ। তারপর কয়েক পৃষ্ঠা একেবারে ফাঁকা। নীরা পাতা উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ থেমে গেল। একটা পাতায় শুধু একটা নাম লেখা।
“আরমান।”
নামের নিচে একটা তারিখ। ১৯৯৯ সালের ১৭ আগস্ট। নীরা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“আরমান কে?”
সে জানে না। আরও নিচে লেখা ছিল, “ওকে বিশ্বাস করা যাবে না।” নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর পরের পাতাটা খুলল। সেখানে কয়েকটা লাইন লেখা। “আমরা সবাই ভুল করেছি। কিন্তু ভুলটা এত বড় ছিল, সেটা তখন বুঝিনি। ও বলেছিল ব্যাপারটা এখানেই শেষ। আমি বিশ্বাস করেছিলাম। এখন বুঝছি, কিছু ঘটনা শেষ হয় না। শুধু কিছুদিন চুপ করে থাকে।” এরপর আর কিছু নেই। নীরা আবার পাতা উল্টাল। আরেকটা নাম।
“সাদিয়া।”
তারপর কেটে দেওয়া। নীরা নামটা দেখে অদ্ভুত একটা অনুভূতি পেল। সাদিয়া নামটা কোথায় যেন শুনেছে। কিন্তু মনে করতে পারল না।
হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল। নীরা চমকে ফোনটা হাতে নিল। রাফি। এত রাতে রাফি ফোন করছে কেন?
কল ধরতেই ওপাশ থেকে রাফির কণ্ঠ।
“তুই জেগে আছিস?”
“হ্যাঁ।”
“তোর সঙ্গে একটু কথা ছিল।”
“কী হয়েছে?”
রাফি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল।
“আজ বিকেলে আমি তোর বাবার অফিসে গিয়েছিলাম।”
নীরা অবাক হলো।
“কেন?”
“তোর জন্য।”
“আমার জন্য কী?”
“কিছু পুরোনো কাগজ খুঁজছিলাম।”
নীরা উঠে দাঁড়াল।
“কী পেয়েছিস?”
“একটা ফাইল।”
“কীসের ফাইল?”
“জানি না। কিন্তু তোর বাবার নামের সঙ্গে একটা পুরোনো বাড়ির ঠিকানা আছে।”
নীরা জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
“কোন বাড়ি?”
রাফি ঠিকানাটা বলল। নীরার হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। একই বাড়ি।
“তুই নিশ্চিত?”
“হ্যাঁ।”
“ফাইলে কী আছে?”
“সবটা দেখতে পারিনি।”
“কেন?”
“কারণ ফাইলটা আমার হাতে আসার আগেই কেউ নিয়ে গেছে।”
নীরা চুপ।
“কে?”
“জানি না।”
“তুই দেখেছিস?”
“হ্যাঁ। একটা লোক ছিল।”
নীরার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
“কেমন লোক?”
“দূর থেকে দেখেছি। কালো জ্যাকেট পরা ছিল। মুখ ভালো করে দেখা যায়নি।”
নীরা কিছু বলল না। রাফি বলল,
“নীরা, একটা কথা বলব?”
“বল।”
“তুই আজ রাতে কোথাও যাবি না।”
“কেন?”
“কারণ আমি মনে করছি, কেউ ইচ্ছে করে তোকে এই বাড়িটার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।”
নীরা ধীরে বলল,
“আমিও তাই ভাবছি।”
“তাহলে ডায়েরিটা বন্ধ কর।”
নীরা তাকাল ডায়েরির দিকে।
“পারছি না।”
“কেন?”
“কারণ বাবা যদি এত বছর ধরে কিছু লুকিয়ে থাকে, তাহলে তার কারণ নিশ্চয়ই আছে।”
রাফি বিরক্ত হয়ে বলল,
“সব রহস্যের সমাধান করতে হয় না।”
নীরা হেসে ফেলল।
“এটা তুই বলছিস?”
“হ্যাঁ।”
“যে ছোটবেলায় আমার ডায়েরি লুকিয়ে রেখে আমাকে তিন ঘণ্টা খুঁজিয়েছিল?”
“ওটা রহস্য ছিল না। সেটা ছিল মজা।”
“তোর মজা খুব খারাপ ছিল।”
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। এই ছোট্ট কথোপকথনটা নীরার ভেতরের চাপটা সামান্য কমিয়ে দিল। তারপর রাফি বলল,
“কাল সকালে আমি আসব।”
“ঠিক আছে।”
“আর দরজা-জানালা বন্ধ রাখিস।”
“হ্যাঁ।”
“কেউ দরজায় এলে খুলবি না।”
“আচ্ছা।”
“নীরা?”
“হুম?”
“তুই ভয় পেলে আমাকে ফোন করিস।”
নীরা একটু থেমে বলল,
“করব।”
কল কেটে গেল। ঘরটা আবার নিস্তব্ধ। নীরা ডায়েরির দিকে তাকাল। তারপর আবার পাতা উল্টাল। একটা জায়গায় এসে তার চোখ আটকে গেল। পাতার মাঝখানে একটা ছোট্ট আঁকা চিহ্ন। একটা বৃত্ত। তার ভেতরে একটা অদ্ভুত বাঁকা দাগ। নিচে লেখা,
“তৃতীয় দরজা।”
নীরা কিছু বুঝল না। তৃতীয় দরজা কোথায়? সে ডায়েরির শেষের দিকের পাতাগুলো দ্রুত উল্টাতে লাগল। শেষের কয়েকটি পাতা ছেঁড়া। একটা পাতার অর্ধেক অংশ এখনও আছে। সেখানে লেখা,
“যদি কখনো ও ফিরে আসে, তাহলে প্রথমে—”
এরপর বাকিটা নেই। নীরা চুপ করে বসে রইল। তারপর ডায়েরিটা বন্ধ করে দিল। ঘড়ির দিকে তাকাল। রাত ১টা ২৬। আর মাত্র এক ঘণ্টারও কম সময়। তার মনে হলো, আজ রাতে না গেলেও হবে। সকালে যাবে। রাফিকে সঙ্গে নিয়ে যাবে। এটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
কিন্তু ঠিক তখনই বাইরে একটা শব্দ হলো।
টুপ।
যেন ছাদ থেকে পানি পড়ে বারান্দায় পড়ল। নীরা পাত্তা দিল না। আবার শব্দ।
টুপ।
এবার একটু কাছে। সে উঠে দাঁড়াল। বাবার ঘরের জানালাটা পুরোপুরি বন্ধ ছিল না। নীরা জানালার কাছে গিয়ে সেটা বন্ধ করতে হাত বাড়াল। তারপর বাইরে তাকিয়ে থেমে গেল।
রাস্তার ওপারে একজন দাঁড়িয়ে। কালো পোশাক। হাতে ছাতা নেই। বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। নীরা চোখ কুঁচকে তাকাল। লোকটা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মুখ দেখা যাচ্ছে না। তারপর ধীরে ধীরে লোকটা মাথা তুলল। নীরা পেছনে সরে গেল। লোকটা যেন সরাসরি তার জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। দূরত্ব অনেক। তবুও নীরার মনে হলো, লোকটা তাকে দেখছে। তারপর লোকটা হাত তুলল। কিছু একটা দেখাল। নীরা বুঝতে পারল না কী। লোকটা হাত নামিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। কয়েক পা হাঁটল। তারপর অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
নীরা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইল। তার বুকের ভেতর ধুকপুক করছে। কিছুক্ষণ পর সাহস করে নিচে নামল। বাড়ির সামনের দরজা খুলে বাইরে বের হলো না। শুধু বারান্দা থেকে রাস্তার দিকে তাকাল। কেউ নেই। তবে দরজার ঠিক সামনে একটা ছোট জিনিস পড়ে আছে। নীরা সেটা তুলে নিল। একটা পুরোনো চাবি। চাবিটার সঙ্গে ছোট একটা ধাতব ট্যাগ বাঁধা। ট্যাগে লেখা—
৩
নীরার বুকটা ধক করে উঠল।
“তৃতীয় দরজা...”
বাবার ডায়েরির কথা মনে পড়ল। সে চাবিটা শক্ত করে ধরে ঘরে ফিরে এল। এইবার আর ঘুমানোর প্রশ্নই নেই। সে রাফিকে ফোন করতে গেল। কিন্তু কল যাওয়ার আগেই ফোনে একটা মেসেজ এল। অচেনা নম্বর। নীরা মেসেজটা খুলল। মাত্র একটি বাক্য।
“তোমার বাবা যে দরজাটা বন্ধ করে গিয়েছিল, সেটাই খুঁজে দেখো।”
নীরা কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বাবার ঘরের দিকে তাকাল। তার মনে হলো, এতদিন ধরে যে ঘরটাকে সে শুধু বাবার পুরোনো ঘর বলে চিনত, সেখানে হয়তো এমন কিছু আছে যা সে কখনো দেখেনি। সে আবার ঘরে ঢুকল। দেয়ালগুলো একে একে দেখতে লাগল। বইয়ের তাক। আলমারি। পুরোনো টেবিল। খাটের নিচে রাখা বাক্স। কোথাও কিছু নেই। তারপর হঠাৎ তার চোখ পড়ল বইয়ের তাকের নিচের দিকে। তিনটা কাঠের তাক। প্রথমটা বইয়ে ভর্তি। দ্বিতীয়টাও। তৃতীয়টার পেছনে অস্বাভাবিকভাবে একটা কাঠের অংশ দেখা যাচ্ছে। নীরা হাত দিয়ে চাপ দিল। কাঠটা সামান্য নড়ে উঠল। তার বুকের ভেতর কেমন একটা অনুভূতি হলো। সে আবার চাপ দিল। এবার পুরো অংশটা একটু ভেতরে ঢুকে গেল। নীরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে কাঠের প্যানেলটা সরিয়ে ফেলল। পেছনে একটা সরু দরজা। খুব ছোট একটা দরজা। এতদিন ধরে তার চোখের সামনে ছিল, অথচ সে কখনো দেখেনি। দরজাটায় কোনো হাতল নেই। শুধু মাঝখানে একটা তালা।
নীরা হাতে থাকা চাবিটা বের করল। চাবির মাথাটা তালার সঙ্গে মিলিয়ে দেখল। মিলে গেছে। তার হাত কাঁপছিল। তবুও চাবিটা তালায় ঢুকিয়ে ঘুরিয়ে দিল।
ক্লিক।
তালা খুলে গেল। দরজা খুলতেই ভেতর থেকে পুরোনো, বন্ধ ঘরের গন্ধ বেরিয়ে এল। অন্ধকার। নীরা ফোনের টর্চ জ্বালাল। ঘরটা খুব ছোট। একটা কাঠের চেয়ার। একটা পুরোনো টেবিল। দেয়ালে কয়েকটা ছবি। আর টেবিলের ওপর একটা টেপ রেকর্ডার।
নীরা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। টেপ রেকর্ডারের পাশে একটা ক্যাসেট রাখা। তার ওপর বাবার হাতের লেখা।
“নীরা যেন এটা না শোনে।”
নীরার হাত থেমে গেল। কয়েক সেকেন্ড সে ক্যাসেটটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিজের অজান্তেই সেটা তুলে নিল। বাবা কেন চাইতেন না সে এটা শুনুক? কী আছে এতে?
নীরা টেপ রেকর্ডারটা চালু করার চেষ্টা করল। প্রথমে কিছু হলো না। দ্বিতীয়বার চাপ দিতেই যন্ত্রটা কেঁপে উঠল।
খট...
তারপর ভেতর থেকে শব্দ এল। কিছুক্ষণ শুধু শোঁ শোঁ শব্দ। তারপর একটা পুরুষ কণ্ঠ। খুব দুর্বল।
“যদি কেউ এই রেকর্ডটা শুনে থাকে...”
নীরা নিঃশ্বাস আটকে শুনতে লাগল। কণ্ঠটা আবার বলল,
“তাহলে বুঝতে হবে, আমি আর নেই।”
নীরার চোখে পানি এসে গেল। এটা তার বাবার কণ্ঠ। বহু বছর পরেও সে চিনতে ভুল করেনি।
রেকর্ডে বাবা কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। তারপর বললেন,
“নীরা, তুমি যদি এটা শুনে থাকো, তাহলে একটা কথা মনে রেখো...”
কণ্ঠটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
“কালো পোশাকের মানুষটাকে বিশ্বাস কোরো না।”
নীরা স্থির হয়ে গেল। তারপর রেকর্ডে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। হঠাৎ খুব দূর থেকে একটা শব্দ শোনা গেল।
হাসি।
সেই হাসি।
নীরা টেপ রেকর্ডারের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বাবার কণ্ঠ আবার শোনা গেল। এবার খুব নিচু স্বরে।
“কারণ সে একা নয়।”
রেকর্ডিং হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। নীরা কিছুক্ষণ নড়ল না। তারপর ঘরের দেয়ালে ঝোলানো ছবিগুলোর দিকে তাকাল। একটা ছবিতে তার বাবা। তার পাশে সেই অচেনা মানুষটি। আর তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট একটি মেয়ে।
নীরা ছবিটা হাতে তুলে নিল। মেয়েটার মুখ এবার পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। নীরা কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে ছবিটা হাত থেকে ফেলে দিল।
মেয়েটা...
সে নিজেই।
কিন্তু ছবির তারিখ ছিল—
১৭ আগস্ট, ১৯৯৯।
নীরা তখনও জন্মায়নি।
ঘরের ভেতর হঠাৎ একটা ঠান্ডা বাতাস ঢুকে গেল। আর কোথাও থেকে খুব আস্তে... সেই হাসির শব্দ ভেসে এল।
“হা... হা... হা...”
নীরা ধীরে ধীরে দরজার দিকে তাকাল। দরজাটা খোলা। করিডোর অন্ধকার। কেউ নেই। তবুও তার মনে হলো, অন্ধকারের ওপাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
আর সে এবার প্রথমবারের মতো বুঝল...
এই গল্পটা তার জন্মের আগেই শুরু হয়েছিল।
চলবে......