ফন্ট সাইজ:
থিম:
সর্বনাশের হাসি

৫ম পর্ব

লেখক: Miju.Sheikh

#সর্বনাশের হাসি

#Miju.Sheikh
#পর্ব সংখ্যা ৫
এই গল্পটা তার জন্মের আগেই শুরু হয়েছিল।
কথাটা মাথার ভেতর বারবার ঘুরছিল নীরার। সে এখনও সেই ছোট্ট ঘরটার ভেতর দাঁড়িয়ে। মেঝেতে পড়ে থাকা ছবিটার দিকে তাকিয়ে আছে। হাত-পা যেন অবশ হয়ে গেছে। ছবিতে যে মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে, সেটা সে নিজেই। অথচ ছবির তারিখ ১৭ আগস্ট, ১৯৯৯। আর নীরা জন্মেছে তারও কয়েক বছর পরে।
এটা কীভাবে সম্ভব?
নীরা ধীরে ধীরে নিচু হয়ে ছবিটা তুলে নিল। ছবিটার পেছনের অংশটা এবার ভালো করে দেখতে লাগল। সেখানে কালো কালি দিয়ে মাত্র একটা লাইন লেখা।
“যেদিন ওকে দেখবে, সেদিন বুঝবে—সময় সবসময় সামনে এগোয় না।”
নীরার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
সে ছবিটা উল্টে আবার সামনে তাকাল। তার বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। পাশে সেই অচেনা লোকটা। আর তাদের মাঝখানে ছোট্ট নীরা।
কিন্তু এবার ছবিটার দিকে তাকিয়ে নীরার মনে হলো, মেয়েটা শুধু দাঁড়িয়ে নেই। সে যেন ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
একটা অস্বাভাবিক হাসি।
ঠিক সেই হাসি, যেটা নীরা গত দুই রাত ধরে শুনে আসছে।
হঠাৎ টেপ রেকর্ডারটা আবার চালু হয়ে গেল।
খট...
নীরা চমকে পিছিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ শোঁ শোঁ শব্দের পর বাবার কণ্ঠ শোনা গেল।
“যদি তুমি ছবিটা দেখে থাকো, তাহলে বুঝতে পারছি তুমি ঘরটা খুঁজে পেয়েছ।”
নীরা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
“আমি জানতাম একদিন তুমি এটা খুঁজে পাবে। কিন্তু আমি চাইনি তুমি কখনো এটা জানো।”
কণ্ঠটা কিছুক্ষণ থেমে গেল।
“কারণ সত্যিটা জানার পর আর আগের জীবনে ফিরে যাওয়া যায় না।”
নীরার চোখে পানি এসে গেল।
“বাবা...”
সে অজান্তেই ফিসফিস করে বলল।
রেকর্ডে আবার কণ্ঠ শোনা গেল।
“১৯৯৯ সালের ১৭ আগস্ট রাতে আমি প্রথমবার ওকে দেখেছিলাম।”
নীরার শ্বাস আটকে গেল।
“ওকে?”
বাবা বললেন, “ওর নাম আরমান। কিন্তু ওর আসল পরিচয় আমি কখনো জানতে পারিনি। শুধু জানতাম, ও এমন কিছু জানত যা আমাদের কারও জানার কথা ছিল না।”
নীরা ধীরে ধীরে চেয়ারে বসে পড়ল।
“সেদিন রাতে আমরা পাঁচজন ছিলাম।”
রেকর্ডে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
“আমি, আরমান, সাদিয়া, মাহিন... আর একজন।”
নীরার চোখ বড় হয়ে গেল।
“সেই পঞ্চম মানুষটার নাম আমি কখনো লিখিনি। কারণ তার নাম লিখলেই ও জানতে পারত আমি এখনও বেঁচে আছি।”
নীরা চারদিকে তাকাল।
তারপর হঠাৎ টেপে একটা অদ্ভুত শব্দ হলো।
খসখস...
যেন কেউ খুব কাছে এসে ফিসফিস করছে।
বাবার কণ্ঠ আবার শোনা গেল।
“নীরা, তুমি যদি এটা শুনে থাকো, তাহলে এখনই ঘর থেকে বের হয়ে যাও।”
নীরা উঠে দাঁড়াল।
কিন্তু ঠিক তখনই বাইরে করিডোরে একটা শব্দ হলো।
ঠক।
নীরা থেমে গেল।
আবার শব্দ।
ঠক... ঠক...
মনে হলো কেউ ধীরে ধীরে দরজায় হাত দিচ্ছে।
নীরা নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর বাইরে থেকে খুব আস্তে একটা কণ্ঠ ভেসে এল।
“নীরা...”
তার শরীরের সব রক্ত যেন এক মুহূর্তে ঠান্ডা হয়ে গেল।
কণ্ঠটা পরিচিত।
রাফির কণ্ঠ।
নীরা দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
“নীরা, দরজা খোল।”
সে এক পা এগিয়ে গেল।
তারপরই মনে পড়ল রাফির কথা।
“কেউ দরজায় এলে খুলবি না।”
নীরা থেমে গেল।
বাইরে আবার রাফির কণ্ঠ।
“নীরা, আমি রাফি। দরজা খোল।”
নীরা এবারও চুপ।
“নীরা?”
কণ্ঠটা এবার একটু বিরক্ত।
“তুই শুনতে পাচ্ছিস না?”
নীরা ধীরে ধীরে পেছনে সরে এল।
তারপর টেপ রেকর্ডারের দিকে তাকাল।
রেকর্ডারটা এখনও চলছে।
বাবার কণ্ঠ খুব নিচু স্বরে বলল,
“যে-ই বাইরে থেকে তোমাকে ডাকুক, দরজা খুলবে না।”
নীরার বুক ধক করে উঠল।
বাইরে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর সেই কণ্ঠটা বদলে গেল।
রাফির কণ্ঠ আর নেই।
এবার একটা মেয়ের কণ্ঠ।
“নীরা...”
নীরা জমে গেল।
কণ্ঠটা খুব ছোট একটা মেয়ের।
“তুমি আমাকে চিনতে পারছ না?”
নীরার হাত থেকে ছবিটা পড়ে গেল।
মেয়েটার কণ্ঠ আবার শোনা গেল।
“আমি তো তোমার অপেক্ষায় আছি।”
নীরা দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর হঠাৎ দরজার নিচ দিয়ে একটা কাগজ ভেতরে ঢুকে এল।
নীরা কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকার পর ধীরে ধীরে কাগজটা তুলে নিল।
কাগজে মাত্র তিনটা শব্দ লেখা।
“তৃতীয় দরজা খুলেছে।”
নীরার হাত কাঁপতে লাগল।
সে পিছনে তাকাল।
তারপর তার চোখ পড়ল দেয়ালের ছবিগুলোর দিকে।
একটা ছবিতে পাঁচজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
তার বাবা।আরমান।
সাদিয়া।মাহিন।
আর পঞ্চম মানুষটা...
ছবির সেই অংশটা ইচ্ছা করে কেটে ফেলা হয়েছে।নীরা ছবিটা হাতে নিয়ে আরও কাছে গেল।ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।
রাফি।
নীরা দ্রুত কল ধরল।
“হ্যালো?”
ওপাশ থেকে রাফির হাঁপানো কণ্ঠ।
“নীরা, তুই কোথায়?”
নীরা কিছু বলল না।
রাফি আবার বলল,
“আমি তোর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছি। দরজা খুলিস না।”
নীরার শরীর শিউরে উঠল।
“তুই... বাড়ির সামনে?”
“হ্যাঁ।”
নীরা দরজার দিকে তাকাল।
“তাহলে একটু আগে যে আমাকে ডাকছিল?”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর রাফি খুব নিচু স্বরে বলল,
“আমি তোকে ডাকিনি।”
নীরার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
রাফি বলল,
“নীরা, তুই এখন বাবার ঘরে আছিস?”
“হ্যাঁ।”
“গোপন ঘরটা খুঁজে পেয়েছিস?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে আমার কথা খুব মন দিয়ে শোন।”
“বল।”
“ওখানে যে ছবিগুলো আছে, সেগুলোর কোনো একটা ছবির পেছনে একটা লাল দাগ থাকার কথা।”
নীরা ছবিগুলো একে একে দেখতে লাগল।
একটা ছবির পেছনে সত্যিই লাল কালি দিয়ে ছোট্ট একটা দাগ।
“আছে।”
রাফি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
“ওটা খুলিস না।”
নীরা থেমে গেল।
“কেন?”
রাফির কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
“কারণ ওই ছবির পেছনে যেটা আছে, সেটা আমি আজ বিকেলে তোর বাবার অফিসে দেখেছি।”
“কী আছে?”
“একটা নাম।”
“কার নাম?”
ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর রাফি বলল,
“তোর মায়ের।”
নীরা যেন কথাটা বুঝতেই পারল না।
“আমার মা?”
“হ্যাঁ।”
নীরা ধীরে ধীরে ছবিটা উল্টে দিল।
পেছনে লাল কালিতে লেখা—
“সাদিয়া — ১৭ আগস্ট ১৯৯৯।”
নীরার চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেল।
তার মা সাদিয়া?
কিন্তু তার মা তো কখনো এই নামের কথা বলেননি।
আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার...
নীরার মা মারা গিয়েছিলেন নীরার জন্মের কয়েক বছর পর।
তাহলে ১৯৯৯ সালের ছবিতে তিনি কোথায় ছিলেন?
হঠাৎ টেপ রেকর্ডার থেকে আবার বাবার কণ্ঠ শোনা গেল।
এবার কণ্ঠটা খুব ভাঙা।
“নীরা... যদি তুমি সাদিয়ার নাম দেখে থাকো, তাহলে একটা কথা মনে রেখো।”
নীরা নিঃশ্বাস আটকে শুনতে লাগল।
“সাদিয়া তোমার মা নয়।”
নীরার চোখ বড় হয়ে গেল।
রেকর্ডে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর বাবা বললেন,
“তোমার মা...”
হঠাৎ বিকট একটা শব্দ হলো।
খট!
টেপ বন্ধ হয়ে গেল।
নীরা ছুটে গিয়ে রেকর্ডারটা চাপতে লাগল।
কিছুতেই চালু হচ্ছে না।
ঠিক তখনই গোপন ঘরের বাইরে আবার সেই হাসির শব্দ শোনা গেল।
“হা... হা... হা...”
নীরা ধীরে ধীরে দরজার দিকে তাকাল।
দরজার ওপাশে এবার কারও পায়ের শব্দ।
এক পা...
দুই পা...
তিন পা...
তারপর শব্দটা থেমে গেল।
নীরা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল।
দরজার নিচ দিয়ে একটা ছায়া দেখা গেল।
কেউ দরজার ঠিক ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে।
তারপর খুব আস্তে দরজার হাতলটা নড়ল।
কিন্তু এই দরজায় তো কোনো হাতলই নেই।নীরা পিছিয়ে গেল।
আর ঠিক তখনই অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা কণ্ঠ ফিসফিস করে বলল—
“তোমার মা কে, সেটা জানতে চাও?”
নীরা কিছু বলতে পারল না।
কণ্ঠটা আবার হাসল।
“তাহলে কাল রাত ২টা ১৭ মিনিটে... পুরোনো বাড়িটায় এসো।”
তারপর সবকিছু নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
নীরা দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।তার হাতে এখনও সেই ছবিটা।
ছবির পেছনে লেখা একটাই নাম—
“সাদিয়া।”
আর ছবির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট মেয়েটা...
আবার হাসছে।
চলবে......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন