ফন্ট সাইজ:
থিম:
সে ছিলো অন্যরকম

১৯তম পর্ব

লেখক: পুষ্পিতা মেহরীন তিশা

#সে_ছিলো_অন্যরকম🥀

#পুষ্পিতা_মেহরীন_তিশা

#পর্ব- ১৯

"তোমরা কি আজকের অ্যাসাইনমেন্টটা শুরু করেছো?"

নীলের গলা?ক্লাসরুমে যেন হঠাৎ করেই একটা অদৃশ্য নিস্তব্ধতা নেমে এল। চেয়ার ঘষার আওয়াজ বন্ধ, ফিসফাস থেমে গেল, পেনের খটখট আওয়াজ পর্যন্ত হারিয়ে গেল কোথায় যেন।

কারণ, নীল কথা বলছে! সে—এই ক্লাসের সবচেয়ে চুপচাপ, নিঃশব্দ ছেলেটি। সচরাচর কারো সঙ্গে কথা বলে না। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলেও উত্তর দেয় না সহজে। মাথা নিচু করে থাকে, ক্লাসের এক কোনায় বসে নিজের মতো থাকে।আর আজ? আজ সে নিজে থেকেই কথা বলছে?

চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল সবাই। কেউ ঘাড় ঘুরিয়ে আবারও নিশ্চিত হলো ঠিক দেখছে কিনা। হ্যাঁ, ঠিকই দেখছে।

নীল দাঁড়িয়ে আছে সামনের সারিতে, গায়ে ছাই রঙের হালকা সুতি পাঞ্জাবি, সাদা পা'জামা, পায়ে সাদামাটা বেল্টের স্যান্ডেল। মাথায় বেলীফুলের ঘ্রাণ মাখা চুল—ঝাঁট দেওয়া, এক পাশে সিঁথি করে আঁচড়ানো। চোখে মোটা ফ্রেমের সাদা কাচের চশমা। মুখটা যদিও একেবারে হাস্যোজ্জ্বল নয়, তবে আগের মতো নিস্তেজও নয়। আজ একটু অন্যরকম লাগছে ওকে।

এই দৃশ্য দেখে কিছুক্ষণের জন্য বোবা হয়ে গেল সবাই, তারপর হঠাৎ যেন একসাথে সব গলে পড়ল ঠাট্টার রোলের মধ্যে।

"ও মা! চশমা ওয়ালা কাকু দেখি কথাও বলে?"

"আরে! আমি তো ভাবছিলাম কাকু বোবা!"

"আর আমি তো ভাবছিলাম, মেসো মশাইয়ের মুখে দুর্গন্ধ তাই কথা বলে না!"

এমন কথায় সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। অন্য দিকে নীলের মাথা নিচু হলো। অপমানিত বোধ করলো খুব। চোখের কোণে পানি জমে গেলে তার।

"তো কাকু! প্রেমে-ঠ্রেমে পড়েছেন নাকি? মাথা গরুর চ্যানার মতো করে তেল দিয়ে এসেছেন যে!"

"হ! সাইডে আবার সিঁদুর দেওয়ার জন্য সিঁথি ও কাটছে। আজ মনে হয় কাকুর বাসরসজ্জা হবে!" আবারো হাসলো সবাই।"

"কিন্তু, এই হাঁদারাম কাকুর সাথে বাসরটা করবে কে?"

হো হো করে হাসলো সবাই আরেক দফা। হঠাৎ একটা মেয়ে একটু ন্যাকামি সুরে বলল,,

"আরে। তোরা এমন কথা বলছিস কেন রে! দেখ না কাকুটা পাঞ্জাবি পরে, চোখে চশমা দিয়ে, চুলে তেল দিয়ে আমাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে এসেছে। আর তোরা তাকে অপমান করছিস? অপমান না করে, চশমাটা খুলে নিলেও তো পারিস।"

একদম হেঁসে মেয়েটা তার চশমাটা খুলে নিলো। নীলের অশ্রুভেজা চোখ এবার সবার সামনে এলো। যেটা দেখে সবাই কিছু সময় মুখ হা করে চুপ থাকলো। এরপরে আবারো কটাক্ষ করে বলল,,

"এই ব্যাডা দেখি মেয়েদের থেকেও বেশি ন্যাকা। কথায় কথায় চোখের জল ফেলে! ব্যাডা হি*জরা নাকি কে জানে?" হো হো করে হাসলো সবাই।

"হ, ঠিক কইছোস। লেবুর রস সব সময় রেডি থাকে। সুযোগ পাইলেই গড়াই পড়ে।"

চোখ দুইটা খিঁচে বন্ধ করে নিলো নীল। তার মনে হলো, মাটিটা একটু ফাক হয়ে যাক, সে তার ভেতরে আশ্রয় নিবে। হাত-পা কাঁপতে শুরু করলো তার। মনে মনে ভাবলো,,

"এভাবে আর কতোদিন সে মানুষের অপমান সহ্য করবে? এতো ভীতু কেন সে? তার ভেতরে কেন কোনো সাহস নেই? সে কেন এসব কাঁপা-কাঁপি বাদ দিয়ে তাদের কথার মুখ্য জবাব দিতে পারে না? কই আরো তো কতো মানুষ আছে। তারা তো তার মতো ভীতু না। তাহলে, সে-ই কেন? কেন ভয়ের ক্ষেত্রে সব সময় তার নামটাই উঠে আসে। আল্লাহ কি তাকে একটু সাহস দিতে পারলো না?"

"আরে মেসো মশাইরে কেউ থামা। নয়তো ক্লাস রুমটা সমুদ্র হয়ে যাবে তো। আমি আবার সাঁতার জানি না।"

আরেক দফা হাসির রোল পড়লো ক্লাসরুমে। হঠাৎ পেছন থেকে একটা ছেলে উঠে আসলো। মেয়েটার হাত থেকে চশমাটা কেড়ে নিয়ে নীলকে পড়িয়ে দিলো। গম্ভীর স্বরে বলল,,

"এই সমস্যা কি তোদের? তোরা কারো ভালো দেখতে পারিস না তাই না? আজকাল, মানুষকে অপমান করাটা তোদের পেশা হয়ে দাড়িয়েছে? সম্মান দিতে ইচ্ছে করে না কাউকে?"

"তোর এতো জ্বলছে কেন রে? কে হয় ও তোর? ভাব তো এমন নিচ্ছিস যেন তোর বোনের জামাই লাগে ওয়!"

এভাবে এক কথা দু'কথায় তাদের মাঝে তর্কের শুরু হলো। যেটাতে নীলের বিরক্ত আরো বেড়ে গেলো। সে আর এক মুহুর্তও অপেক্ষা করলো না। মাথা নিচু করে ধীরে পায়ে বেরিয়ে গেলো ক্লাস রুম থেকে। সোজা গিয়ে বসলো,সেই আম গাছ তলায়। যেখানে প্রথমবার হিয়া তাকে এনেছিলো।

-

অফ পিরিয়ডে ক্লাসরুম থেকে বের হলো হিয়া। নীলদের ক্লাসের সামনে গিয়ে উঁকি দিলো, কিন্তু নীলকে পেলো না। একটু অবাক হলো হিয়া, ক্লাস টাইমে আবার এই ছেলে কই গেলো? নিচে নেমে এদিক-ওদিক ঘুরতে লাগলো। হঠাৎ নীলকে চোখে পড়লো—

আম গাছের নীচে হাঁটুতে দু'হাত রেখে বসে আছে সে। মাথাটা নিচু। মুখটা মলিন। হিয়া তাকে দেখেই ছুটে গেলো সেদিকে। কোমরে দু'হাত রেখে শাসনের সুরে বলল,,

"আপনি এখানে বসে আছেন? আর আমি আপনাকে সেই কখন থেকে খুঁজছি।"

নীল কোনো জবাব দিলো না। মাথা নিচু করেই রইলো সে। হিয়া আবারো বলল,,, "ডেয়ার কমপ্লিট করেছেন আপনি? কথা বলেছেন পাঁচ জনের সাথে?"

নীল এবারেও কোনো জবাব দিলো না। হিয়া তার সামনে বসতে বসতে বললো,, "কি হলো কথা বলছেন না কেন?"

হিয়া মুখ নিচু করে তাকালো নীলের দেখে। নীল মুখ ঘুরিয়ে নিলো। হঠাৎ তার চশমার নিচ দিয়ে টুপ করে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো। তাকে কাঁদতে দেখে হিয়া অবাক হয়ে গেলো। ব্যস্ত হয়ে বলল,,

"নীল আপনি কাঁদছেন? কি হয়েছে আপনার?কেউ কিছু বলেছে আপনাকে?আবার টিজ করেছে ওরা? কি হলো কথা বলছেন না কেন? বলুন না। কি হয়েছে আপনার।"

নীল ধীরে মাথা তুলে তাকালো তার দিকে। ভাঙা গলায় কাঁপতে কাঁপতে বলল,,

"দেখুন না হিয়া! আপনার কথা শুনে আমি ওদের সাথে কথা বলতে গিয়েছিলাম বলে, ওরা আমাকে যা-তা বলেছে। অনেক অপমান করেছে। আমার চশমাটাও খুলে নিয়েছে। আমি আর কারো সাথে কথা বলবো না হিয়া। আমি আর পরিবর্তন হতে চাই না। আমি যেমন আছি, তেমনই ঠিক আছি।"

নীলের কথায় হিয়ার চোয়াল মুখ শক্ত হয়ে এলো। বড়ো বড়ো নিঃশ্বাস ফেলে সে উঠে দাড়ালো। শক্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো,,

"কি কি বলেছে ওরা আপনাকে?"

নীল নরম গলায় বলল,, "বলেছে আমি নাকি হিজরা।আমার মুখে গন্ধ থাকায় আমি কারো সাথে কথা বলি না।", কথাটা বলেই ভেঙে পড়লো নীল। একটু পর আবার বলল,,

" জানেন! ওরা আমার চশমাটা ও খুলে নিয়েছিলো। আমার চোখে তখন ব্যাথা করছিলো।"

হিয়া আর শান্ত থাকতে পারলো না। শক্ত হাতে টেনে ওঠালো নীলকে। কোনো কথা না বলেই তাকে নিজের সাথে টেনে নিয়ে যেতে থাকলো। হিয়া এতোটা জোরে তাকে টানছিলো যে নীল বারবার ঝুকে যাচ্ছিলো। সে ভয়ার্ত স্বরে বলল,,

"আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন হিয়া! ছাড়ুন আমাকে। আমি কোথাও যেতে চাই না। আমার পরিবর্তনের দরকার নাই। আমি যেমন আছি তেমনই ঠিক আছি।"

হিয়া তার কথার কোনো জবাব দিলো না। নীল বারবার তাকে ছাড়ার জন্য বলছিলো। শেষে হিয়া বিরক্ত হয়ে শক্ত গলায় বলল,,

"মুখটা বন্ধ রেখে চুপচাপ আমার সাথে চলুন। ফারদার কোনো কথা বললে প্যান্ট খুলে হাতে ধরিয়ে দিবো।"

-

"হিয়াাাা!" হঠাৎ পেছন থেকে একটা তীক্ষ্ণ গলায় নিজের নাম শোনায়, সময় নিয়ে পেছন ফিরে তাকালো হিয়া। আহনাফ এগিয়ে আসছে তাদের দিকে।

"কিছু বলবেন আহনাফ ভাই!"

আহনাফ হয়তো তার কথাটা কানে তুলল না। তীক্ষ্ণ চোখে সন্দেহ নিয়ে তাকালো, হিয়ার ডান হাতের দিকে। যেটা এই মুহূর্তে শক্ত করে ধরে আছে নীলের হাতটা। আহনাফের হয়তো বিষয়টা ভালো লাগলো না। গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করলো,

"কোথায় যাচ্ছো তুমি?"

"ক্যাম্পাসের বাইরে!"

"কেন?"

"আমার কিছু দরকারী কাজ আছে!"

"কাজটা কি এই ছেলেটার সাথে?" কপালে ভাজ ফেলে গম্ভীর স্বরে বলল আহনাফ। হিয়া কোনো জবাব দিলো না। পুনরায় আহনাফ আবার বলল,,

"এই ভার্সিটিতে তোমাকে দেখে রাখার দায়িত্ব, তোমার আব্বু আমাকে দিয়েছেন। আশা করি তুমি এমন কোনো কাজ করবে না, যাতে তোমার আব্বু আমার ওপর থেকে তার ভরসা হারায়।"

"ভরসা যদি নিজের রক্তে না থাকে, অন্যের ওপর ভরসা করে লাভ কী? আর সেই ভরসা ভেঙে গেলে আমার-ই দোষ কি? আহনাফ ভাই!"

"তুমি আমার কথার ভুল মিনিং বের করছো হিয়া।"

হিয়া হেঁসে জবাব দিলো, "হুম, সেটা আমিও জানি। যাইহোক, আহনাফ ভাই আমার এখন কিছু কাজ আছে। আমি গেলাম, আপনার সাথে পরে কথা হবে।"

হিয়া আর দাঁড়ালো না। পুনরায় নীলের হাতটা ধরে সামনের দিকে এগোলো। আহনাফ ঘাড় ঘুরিয়ে মৃদু গলায় বলল,,

"হিয়া! আমি কি তোমাকে বিশ্বাস করতে পারি?"

"কি যে বলেন, আহনাফ ভাই! আমি নিজেই তো নিজেকে বিশ্বাস করতে পারি না। সেখানে আপনাকে কিভাবে বলি আমায় বিশ্বাস করতে? আমার ওপর ওসব ট্রস্ট-ফ্রাস্ট রাখবেন না, আই থিংক আমি সেটা রাখতে পারবো না।"

নীলের হাতটা শক্ত করে ধরে হিয়া এগিয়ে চলল সামনের দিকে। পেছনে পড়ে রইল আহনাফের গলা, তার সন্দেহের ছায়া। হিয়ার দৃষ্টিতে এখন একরকম দৃঢ়তা।

~

ক্যাম্পাসের গেট পেরিয়ে হিয়া সোজা একটা রিকশা থামিয়ে নীলকে বললো,, "ভেতরে উঠুন।"

"কোথায় যাচ্ছি?" নীল ভয়ার্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো।

"গেলেই দেখতে পাবেন।"

নীল আর কোনো কথা না বলে, রিকশায় উঠে বসলো।রিকশার ভিতরে বসে নীল বেশ কিছুক্ষণ চুপ ছিলো। তারপর হঠাৎ বললো,,

"আচ্ছা, আপনি কি আমার ওপর রাগ করেছেন?"

হিয়া চোখ সরিয়ে বললো, "না।"

নীল মাথা নিচু করে বিড়বিড় করে বললো,

"কিন্তু মনে তো হয় রাগ করেছেন। আপনি আমার হাত এমন শক্ত করে ধরেছিলেন যে, আমার একদিক অবশ হয়ে গেছে।"

হিয়া এবার মুখ চেপে হেঁসে বলল, "ভাগ্যিস ভেঙে যায়নি। নয়তো এখন মার্কেটের বদলে আমায় ডাক্তার খানায় ছুটতে হতো।"

"তারমানে আমরা মার্কেটে যাচ্ছি।"

"জ্বি!"

"কিন্তু কেন?"

নীলের এমন প্রশ্নে হিয়া চোখ পাকিয়ে তাকালো তার দিকে। দাঁত চেপে বলল,, "আপনার আন্ডার প্যান্ট কিনতে!"

হিয়ার এমন কথায় নীলের চোখ ছানাবড়া হলো। কাশি উঠে গেলো তার। এমন ধরনের কথা বা মশকরাতে সে অভ্যস্ত নয়। এগুলো তার কাছে খুবই লজ্জার বিষয়। মুখ নিচু করে চুপ রইলো সে। আর কোনো প্রশ্ন করার সাহস পেলো না।

-

শহরের একটা ছোট, পরিচ্ছন্ন মার্কেটে হিয়া নীলকে নিয়ে প্রবেশ করলো। প্রথমেই ঢুকলো একটা কাপড়ের দোকানে।

"এই শার্টটা কেমন লাগছে?" হিয়া একটা সাদা-নীল চেক শার্ট বের করে দেখালো।

নীল শার্টটা হাতে নিয়ে বললো, "ভালো। কিন্তু এটা কার জন্য?"

হিয়া অন্য একটা শার্ট দেখতে দেখতে বলল, "আপনার জন্য। আজ থেকে আপনি এগুলোই পড়বেন। শার্ট,প্যান্ট,টি-শার্ট।"

নীল চোখ বড়ো করে বলল,, "কিহহ!"

হিয়া তার দিকে তাকাতেই সে শান্ত হয়ে বলল,, "ক্ষমা করবেন হিয়া। আমি এগুলো পরতে পারি না। অস্বস্তি হয় আমার।"

"পরতে না পারলেও আর অস্বস্তি হলেও, এবার থেকে আপনাকে এগুলোই পরতে হবে।"

"আর যদি না পরি?"

"তাহলে আমাকে হারাবেন!"

"এমন কথা বলবেন না হিয়া প্লিজ। আপনি ছাড়া আমার আর কোনো বন্ধু নেই।"

"তাহলে বন্ধুর কথা শুনুন। এখনি এই শার্টটা পরে আসুন।" নীলের হাতে একটা চেক শার্ট দিয়ে বলল হিয়া।

"আমি এগুলো পরতে পারি না। আমার....."

"আর একটাও বাজে কথা বললে, এখানেই আপনার মাথা ফাটিয়ে দিবো বলে দিলাম। আমাকে চেতাবেন না প্লিজ!"

নীল চুপ হয়ে গেলো। কিছু সময় সেখানে দাড়িয়ে থাকলো। হিয়া আবারো রেগে বলল,,

"কি সমস্যা এখানো যান নি কেন?"

নীল আমতা আমতা করল বলল,, "কিন্তু, এগুলো পড়লে কি আমাকে ভালো লাগবে?"

হিয়া বিরক্ত হয়ে বললো, "গায়ে না দিয়ে বোঝার চেষ্টা না করলেই চলবে। আগে পড়ে দেখুন।"

নীল একটু থমকে গিয়ে বললো, "কিন্তু দোকানের ভেতরে গায়ে দিলে পেছনের আয়নাগুলো এমন ভাবে থাকে যে, নিজেকে একটু বেশি হ্যান্ডসাম লাগে। আবার বাসায় গিয়ে আয়নায় দেখি, আমি আমি-ই। আগের মতোই বোকা দেখতে।"

হিয়া এবার হো হো করে হেসে ফেললো। নীল একটু লজ্জা পেলো। নিঃশব্দে মাথা নিচু করে শার্টটা নিলো।

এরপর একে একে হিয়া তাকে কিনে দিলো। দুইটা প্যান্ট, দুইটা টি-শার্ট, তিনটা শার্ট একজোড়া হালকা ধূসর স্নিকার্স, একটা মাইল্ড পারফিউম, আর নতুন ফ্রেমের একটা স্মার্ট চশমা। এরপর তারা চলল পার্লারে চুল কাটার উদ্দেশ্য।

-

চুল কাটানোর সময়, পার্লারের আয়নায় নিজেকে দেখে যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলো না নীল। তার তেল দেওয়া ছোট ছোট চুলগুলো কেমন যেন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চওড়া কপালের পুরোটা এখন দৃশ্যমান। সে চুলে হাত দিয়ে দুঃখী হয়ে বলল,,

"আমাকে না কেমন কেমন জানি লাগছে।"

"হুমমমমমম! আগে ন্যাকা-কাকু ছিলে, আর এখন বেশ কিউট-ভীতু ভাইব দিচ্ছো!"

চোখ টিপ দিয়ে মুচকি হেঁসে বলল হিয়া। নীল ঠোঁট উল্টিয়ে তাকালো তার দিকে। হিয়ার মুখে তখন এক ধরনের প্রশান্তি—যেন তার চেষ্টার ফসল ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে।

-

দেখতে দেখতে দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে গেলো। এরই মাঝে হিয়ার বাসা থেকে তার বাবা তাকে কয়েকবার কল করেছে। হিয়া বলেছে, সে মোমোর সাথে মার্কেটে আছে। ফিরতে দেরী হবে। এতে তার বাবা আর কথা বাড়াননি।

হিয়া আর নীল দুজন হাঁটছে ধীরে ধীরে, হাতে ছোট ছোট শপিং ব্যাগ। শহরের এতো এতো কোলাহলে তারা দুজনেই ক্লান্ত হয়ে গেছে। কারো মুখে কোনো কথা নেই

আছে শুধু হাঁটার ধীরতা।

"আপনি আমার জন্য এতো কিছু কেন করছেন হিয়া?"

নীলের শান্ত স্বরে, হিয়া তার দিকে তাকালো সময় নিয়ে। মুচকি হেঁসে বলল,,

"কারণ, আমি চাই আপনি নিজের মাঝে নিজেকে খুঁজে পান! শুধু ওই একটা ক্লাসরুমের দেয়ালের ভিতর নয়, বাইরেও আপনার একটা আলাদা জগৎ হোক!"

"আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ হিয়া।"

"বন্ধুকে ধন্যবাদ দিতে নেই, শুধু ভালোবাসা দিতে হয়!"

টেনে টেনে পা ফেলতে ফেলতে বলল হিয়া। তার কথায় হকচকিয়ে তাকালো তার দিকে নীল। কথাটা কেমন জানি লাগলো তার। বুকের ভেতর কিছু একটা অনুভব করলো সে। কেমন একটা অচেনা অনুভূতি। হিয়ার কথাটা বার কয়েক তার কানে বাজলো, "বন্ধুকে ধন্যবাদ দিতে নেই, শুধু ভালোবাসা দিতে হয়!"

কিছু সময়ের জন্য নীল চুপ থাকলো। তারপর আবার বলল,,

"আপনি আজকে একবার আমাকে ‘তুমি’ বলেছিলেন।”

হিয়া কেঁপে উঠলো, মাথা চুলকে লজ্জা পাওয়ার ভঙ্গিতে বলল,, "ওইটা ভুলে যান প্লিজ। আমি ভুল করে বলেছিলাম।"

"কিন্তু ভালো লাগছিলো।"

হিয়া চট করে তাকালো তার দিকে। সে লজ্জা পেয়ে আমতা আমতা করলো,,

"না মানে, ইয়ে,আসলে, আমাকে কেউ তুমি করে বলে না তো। আজ হঠাৎ আপনি 'তুমি' ডাকায় কেমন জানি আপন আপন লাগছিলো তাই। মানে আরকি..."

"আপনার এই 'হ্যাঁ মানে হুম মানে' টোনটা না—একদম অ্যাডমিশন টেস্টে ফেইল করা ছাত্রদের মতো!"

হিয়ার কথায় নীল নিঃশব্দে হাসলো, হিয়াও সঙ্গ দিলো তাতে। একটু থেমে নীল আবার বলল,,

"আপনি চাইলে আমাকে ‘তুমি’ করে বলতে পারেন। আমি কিছু মনে করবো না। মানে, মনে করবো না না মানে... মানে, খারাপ লাগবে না, বলছিলাম..."

হিয়ার মুখে এবার একটুকরো প্রশ্রয়ের হাসি ফুটে উঠলো। সময় নিয়ে বললো,,

"হ্যাঁ, আমি আপনাকে 'তুমি' বলে সম্মোধন করি। আর আমাকে 'আপনি' বলে সম্মোধন কইরেন। হাজার হোক, আপনার খালা লাগি আমি!"

হিয়া যে কথাটা ব্যঙ্গ করে বললো সেটা বুঝতে আর নীলের সময় লাগলো না। মুখে হাত দিয়ে হো হো হাসলো সে। তার হাসির শব্দ শুনে চট করে পাশে তাকালো হিয়া। অবাক হয়ে দেখলো তাকে। এতোগুলা দিনে হিয়া আজই তাকে এভাবে প্রাণ খুলে হাসতে দেখছে।

হাসিটার মধ্যে একটা অদ্ভুত খুশি, আর অবাক হওয়া আর চঞ্চলতা মিশে ছিল। যেন অনেক দিন পর প্রাণ খুলে হাসতে পেরেছে সে। চোখে চিকচিকে আনন্দ। হঠাৎ হিয়াকে তার দিকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে হাসিটা থামালো। হিয়া নরম সুরে বলল,,

"থেমে গেলেন কেন? আবার হাসুন না প্লিজ! আপনার হাসিটা মারাত্মক সুন্দর, রুদ্র মশাই!"

এই এতোগুলা কথার মাঝে নীলের মস্তিষ্ক যেন শুধু একটা কথাই ক্যাচ করলো 'রুদ্র মাশাই'। মনের মাঝে কেমন একটা অনুভূতির শিহরণ বয়ে গেলো। ভ্রু কুচকে নরম গলায় বলল,,

"রুদ্র মাশাই?"

হিয়া মুচকি হেঁসে আবারো হাঁটা শুরু করলো। টেনে টেনে বলল,,,

"জ্বি রুদ্র মশাই! আপনি নিজে থেকে আমাকে 'তুমি' বলে ডাকার অনুমতি দিয়েছেন। আর 'রুদ্র' বলে ডাকার অনুমতি টা আমি চেয়ে নিচ্ছি! কি অনুমতি পাবো তো সিনিয়র?"

নীল মুগ্ধ চোখে তাকালো তার দিকে। যেন তার চোখ অনেক কিছু বলতে চাচ্ছে হিয়াকে। মৃদু হেঁসে হিয়াকে বলল,,

"তুমি আসলেই অন্যরকম হিয়া!"

হিয়া হেসে বললো, "আর তুমিও!

---

দু'দিন পর নীল ভার্সিটিতে পা রাখলো একেবারে নতুন রূপে। কাল পর্যন্ত যে ছেলেটা ছিলো একঘেয়ে পাঞ্জাবি আর মলিন ব্যাগের ভেতর লুকানো, আজ সে যেন নিজেকে ভেঙে গড়েছে নতুন করে।

আজ তার পরণে একটি ক্লিন কাট, নেভি ব্লু ফিটেড শার্ট—হালকা রোল আপ করা হাতা, কলার ঠিকঠাক ভাবে গোঁজা। নিচে স্লিম ফিট ব্ল্যাক জিনস, সাথে একজোড়া চকচকে সাদা স্নিকার্স। চোখে পাতলা ফ্রেমের রিমলেস চশমা। কাঁধে সুতি ব্যাগটার জায়গায় আজ রয়েছে, স্টাইলিশ ব্যাগ।

তবে এতো কিছুর মাঝেও সবচেয়ে আলাদা ছিলো তার চোখের ভাষা। তার বাহ্যিক লুক বদলালেও, ভেতরের ভয় বা সংকোচ টা এখনো বদলাইনি। তার চোখে-মুখে আজও সেই পুরনো ভয়,সংকোচ, দ্বিধা আছে। তবে সেটা আগের তুলনায় কমই।

বেশ কিছু টা সময় নিয়ে, মাথা থেকে সব রকম নেগেটিভ চিন্তা বের করে, অনেকটা সাহস নিয়েই সে ক্যাম্পাসে ঢুকলো—চোখের কোণে ভয় থাকলেও পায়ে ছিলো দৃঢ়তা।

-

আজ ক্লাসরুমে নীল ঢোকা মাত্রই সবাই অবাক হয়ে তাকালো তার দিকে। তার এমন নতুন রুপ দেখে আশ্চর্য হলো সবাই। কেউ কেউ তার এই পরিবর্তনে খুশি হয়ে তাকে সাদরে গ্রহণ করলো, আর কেউ কেউ বা জ্বলে উঠে ঠাট্টা করল।

"এইটা কে রে?"

"কাকুটা নাকি চশমা বদলেছে? চুলও দেখি আলাদা কাটছে!"

"পাঞ্জাবি গেলো কই রে? শার্ট প্যান্ট পড়ছে যে!"

"চশমা খুলে দেখ দেখি, কনফার্ম করতে হবে—কাকুই তো?"

সবাই হেসে হেসে একে অন্যকে কনুই দিয়ে ইশারা করলো। কিন্তু আজ কারো হাসি নীল নিজের গায়ে মাখলো না। সবাইকে উপেক্ষা করে নিজের সিটে গিয়ে বসলো। বই বের করে মুখ গুজলো তাতে। হাত ঘড়িতে টাইমও দেখলো কয়েকবার।

#চলবে~

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন