#সে_ছিলো_অন্যরকম
#পুষ্পিতা_মেহরীন_তিশা
#পর্ব- ২০
দেখতে দেখতে কেটে গেলো কয়েকমাস.....
পরিস্থিতি এখন কিছুটা রুদ্রর অনুকূলে। আগের থেকে বেশ অনেক চালাক চতুর হয়েছে। কথা বলার ধরণ থেকে চাল চলন, সবেতেই তার পরিবর্তন এসেছে। নীল থেকে এখন সে রুদ্র হয়ে উঠেছে। নীল নামে এখন তাকে খুব কম মানুষ-ই ডাকে। ভার্সিটিতে এখন তার নিজের একটা অবস্থান তৈরী হয়েছে। এখন আর কেউ তাকে সচারাচর টিজ করতে পারে না। করার সুযোগই পায় না। ভর্সিটিতে এখন তার বেশ অনেক বন্ধু-বান্ধব ও আছে।
যে রুদ্র একসময় নিজের ছায়াকেও ভয় পেতো, ভিড় এড়িয়ে চলতো, নিজেকে আড়াল করে রাখতো—হিয়ার সাহচর্যে সেই রুদ্র এখন নিজের জায়গা করে নিতে শিখেছে। হিয়ার সাথেও তার সম্পর্কটা বেশ গভীর হয়েছে। তাদের সম্পর্কটা এখন আর আগের মতো শুধুই সহানুভূতির সীমায় আটকে নেই। একে অন্যের ছায়া হয়ে উঠেছে তারা।
রুদ্র এখন হিয়াকে শুধু শ্রদ্ধা করে না, নিঃশব্দে ভালোও বাসে। তবে এই ভালোবাসায় জোর নেই, দাবি নেই—আছে কৃতজ্ঞতা আর একরাশ মমতা। অন্যদিকে হিয়াও বোঝে, রুদ্র তার জীবনের একটা বিশেষ জায়গা দখল করে ফেলেছে, যেটা আর কেউ নিতে পারবে না।
~
ক্যাম্পাসের মাঠের ধারে সবুজ ঘাসের ওপর পিঠ এলিয়ে দিয়ে বসে আছে হিয়া। পাশে অবহেলায় পড়ে আছে ব্যাগটা। দূর থেকে তাকে দেখলো রুদ্র, এরপর নিঃশব্দে এগিয়ে গেলো তার দিকে। পেছন থেকে শান্ত স্বরে সালাম দিলো হিয়াকে..
"আসসালামু আলাইকুম ম্যাম!"
"ওয়ালাইকুমুস সালাম, রহমাত কি কালাম, কিসমিস কি বাদাম, আপনি যার বান্দা আমি তার গোলাম!"
"সালাম হিসাবে সালামের জবাবটা একটু বেশিই লম্বা হয়ে গেলো না?"
হিয়ার পাশে বসতে বসতে বলল রুদ্র। হিয়া তার দিকে তাকিয়ে হাত ঝারা দিয়ে বলল,,
"ছোট-খাটো জিনিসে আমি অভ্যস্ত নই, লম্বাচওড়া জিনিসই আমার পছন্দ!"
"সেই হিসাবে, তোমার আরো একটু লম্বা হওয়া উচিত ছিলো!" কপাল সটান করে বলল রুদ্র।
"পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি আছি। এর বেশি লম্বা হলে লোকে কলাগাছ বলতো!"
"তাহলে, এখন কি আঙুর গাছ বলে ডাকে?"
ইনোসেন্ট ফেস করে বলল রুদ্র। তার বলতে দেরী হলেও, তাকে ভস্ম করে দেওয়ার মতো চোখে তাকাতে হিয়ার দেরী হলো না। রাগে ফুসতে ফুসতে বলল,,
"আর একটা উল্টাপাল্টা কথা কইলে, বোতল দিয়ে মাথা ফাটিয়ে দিবো কিন্তু।"
"থ্রেট দিচ্ছো?"
"না ওয়ার্নিং দিচ্ছি!"
রুদ্র একটা লম্বা শ্বাস ছাড়লো। একটু সময় নিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,, "কি হয়েছে? এভাবে চেতে আছো কেন?"
হিয়া শান্ত চোখে তাকালো রুদ্র দিকে। ঠোঁট উল্টিয়ে হাঁটুর ওপর হাত রেখে হাতের মাঝে আবার তার ছোট্ট মুখটা রাখলো। করুন স্বরে বলল,,
"সামনের মাসে আমার এক্সাম!"
"আলহামদুলিল্লাহ! এটা তো ভালো কথা। এতে মন খারাপ করার কি আছে?"
"এক্সামে ফেইল নিশ্চিত!" কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল হিয়া।
"ওয়াট! ফেইল কেন?" অবিশ্বাস্য কন্ঠে চোখ-মুখ ছোট করে বলল রুদ্র।
"তো ফেইল হবে না? সারাবছর না পড়ে যদি, তোমার সাথে চিপায়-চাপায়, গাছে-গলিতে, ঘাসে-নীচে বসে আজাইরা গল্প করি। তাহলে, ফেইল না হয়ে কি ফার্স্ট ক্লাস হবে?"
"বলতে চাচ্ছো, তোমার না পড়ে ফেইল হওয়ার জন্য আমি দায়ী?"
"হান্ড্রেড পারসেন্ট!" গর্বের সহিত বুক ফুলিয়ে বলল হিয়া।
"হুমমমমম!" বলতে বলতে একটা লম্বা শ্বাস ছাড়লো রুদ্র। স্বাভাবিক হয়ে আবার বলল,,
"আচ্ছা, তাহলে তোমাকে পাশ করানোর দায়িত্বটা আমি নিলাম।"
"কিভাবে?" কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করলো হিয়া। রুদ্র মুখ বেঁকিয়ে বলল,, "পড়িয়ে পড়িয়ে নকল করিয়ে করিয়ে নয়!"
"তুত...তুমি পড়াবে আমাকে?"
"হুম। তোমার কোন কোন সাবজেক্টে সমস্যা আছে বলো। আই থিংক আমি সলভ করতে পারবো!"
"হিসাববিজ্ঞান!" মুখ ছোট করে বলল হিয়া।
"আর?" রুদ্রর 'আর' কথাটায় ভ্রু কুঁচকে চেতে উঠলো হিয়া। রাগে গিজগিজ করতে করতে বলল,,
"আর? এই আর মানে কি? একটা সাবজেক্টে সমস্যা আছে বলেছি তাতে হচ্ছে না। আরও সাবজেক্ট চাই? আমাকে অগা প্রমাণ করতে চাইছো তুমি? ব্যাড বেঞ্চাচার মনে হচ্ছে আমাকে?"
একদমে বলা হিয়ার কথাগুলো রুদ্র বিস্ময় নিয়ে হজম করলো। হিয়ার কথার শেষে কপাল চাপড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,, "হায়রে মেয়েজাতি! ক কইতেই কলকাতা বুঝলি?"
-
পরের দিন রুদ্র ক্যাম্পাসে গেলো। গেইট পার হতেই তার চোখে পড়লো মানুষের গোলাকার স্তুপ। মাঠের শেষ প্রান্তে বেশ অনেক মানুষ একসাথে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। কিছু চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ ও শোনা যাচ্ছে, তবে তা স্পষ্ট নয়। বিস্ময়ে রুদ্রর কপালটা কুঁচকে গেলো। কৌতূহল নিয়ে পা বাড়ালো সেদিকে। দু কদম এগিয়েই হাত ঘড়ির দিকে তাকালো। ৯:০৫বাজে এখন। আর মাত্র পাঁচ মিনিট পরই তার ক্লাস শুরু হবে।
একটা শ্বাস ছেড়ে সে নিজের গন্তব্য বদলালো। ফের পা বাড়ালো ক্লাস রুমের দিকে। হঠাৎ রিফাত এসে তার কাঁধে চাপড় দিলো। উৎফুল্ল হয়ে বলল,,
"কিরে ব্রো। কি অবস্থা তোর?"
রুদ্র জিহবা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে শান্ত হয়ে বলল,
"এইতো ভালোই। তোমার কি অবস্থা?"
"আর অবস্থা!" একটু থামলো রিফাত। মাঠের মানুষের মাঝে চোখ যেতেই থুতনিতে স্লাইড করতে করতে বলল,,, "এই ওখানে কি হচ্ছে রে? এতো মানুষ কেন ওখানে?"
"আমি জানি না। হয়তো কোনো আলোচনা চলছে!"
"চলতো, দেখে আসি কিসের পরামর্শ চলছে ওখানে!" কথাটা শেষ করেই রিফাত রুদ্রর হাত ধরে তাকে নিয়ে যেতে লাগলো। যেতে যেতে রুদ্র বলল,,
"আরে আমার ক্লাস আছে।"
"একটু লেট হলে, কিছু হবে না। তুই চল!"
-
রুদ্র আর রিফাত গিয়ে এগিয়ে মাঠের শেষ প্রান্তে। যেখানে সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রুদ্র আর রিফাতের মনে হলো, সেই গোলের একটা কোন্দ্রবিন্দু আছে। ভেতরে হয়তো কিছু আছে। একমুহূর্ত তারা ভাবলো হয়তো কোনো Accident হয়েছে। কিন্তু, তখনই তাদের কানে আসলো।
"একসেপ্ট করে নাও প্লিজ।' প্লিজ একসেপ্ট করে নাও।' তোমাদের দু'জনকে একসাথে খুব মানাবে।' দারুণ কাপল হবে তোমরা।"
আশেপাশের মানুষ গুলো এসবই বলছে। অনেকে হাতে তালি ও দিচ্ছে। সবার মুখে একটা উৎফুল্লতা। রিফাত আরো কাছে যেতে যেতে বলল,,
"এখানে মনেহয়, নিউ কাপল তৈরীর প্রসেসিং চলছে।"
রুদ্র কপাল কুঁচকে বলল, "কাপল তৈরীর প্রসেসিং মানে?"
"আরেহ! প্রোপোজিং-ঠিং হচ্ছে মনে হয়।"
"ওহ আচ্ছা। তাহলে আমি যাই।" বলেই রুদ্র পা বাড়ালো। রিফাত তার হাত টেনে ধরলো। সিটকিয়ে বলল,,
"আরে কষ্ট করে এতোটা পথ আসলাম। আর কে কার পায়ে কুড়াল মারছে সেটা না দেখেই চলে যাবো?"
"কিন্তু, ওদের প্রেম দেখে আমাদের লাভ কি?"
"তুই আগে চলতো!"
রিফাত রুদ্র কে নিয়ে একেবারে সবার মাঝে গিয়ে দাঁড়ালো। ভেতরে দুইটা ছেলে-মেয়েকে দেখা যাচ্ছে। তবে লোকের ভিড়ে তাদের ফেস বোঝাটা দায়। রিফাত হাত দিয়ে ঠেলে কয়েকজন কে সরিয়ে দিলো।
একেবারে দ্বিতীয় সারিতে গিয়ে দাঁড়ালো তারা। হঠাৎ-ই রুদ্র চোখ দিলো সামনে। আর আপনা-আপনি তার চোখ দুইটা বড়ো হয়ে গেলো। ভ্রুটা কুঁচকে পড়লো সে। চোখ থেকে চশমাটা খুলে, কয়েকটা পলক ফেলে আবার তাকালো সেদিকে। না এটা তার চোখের ভুল না, সে ঠিকই দেখছে।
~হিয়া দাঁড়িয়ে আছে সবার মাঝখানে। তার পরণে পিংক রঙের একটা স্নিগ্ধ ফ্লেয়ার ড্রেস, চুলগুলো খোলা, হালকা বাতাসে উড়ছে। মুখটা একটু অবাক, একটু বিব্রত। হাতদুটো সামনের দিকে, যেন কিছু থামাতে চায়—কিন্তু পারছে না।
আর হিয়ার ঠিক সামনে, হাঁটু গেড়ে বসে আছে আহনাফ। হাতে লাল গোলাপে ভরা একগুচ্ছ তোড়া। মুখে লাজুক হাসি সেই সাথে একরাশ সাহস আর নাটকীয় আত্মবিশ্বাস।
নিরবতা ভাঙলো হঠাৎ— আহনাফ চুলে হাত বুলিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে আবার বলতে শুরু করলো—
"হিয়া, তোমায় প্রথম দেখার দিন থেকেই জানতাম তুমি স্পেশাল! কিন্তু সময়ের সাথে বুঝেছি, তুমি শুধু স্পেশাল না। তুমি সেই মানুষ— যাকে দেখলেই আমার ধুকপুকানি বেড়ে যায়! যাকে আমি আমার বাকি জীবনটায় পাশে চাই!"
ভিড়টা নিস্তব্ধ, কেবল আহনাফের কণ্ঠই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
"তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর একটা অধ্যায় হিয়া! আর..আর আমি তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি! তোমাকে আমি আমার জীবনে চাই! একান্তই আমার করে! উইল ইউ বি মাই গার্ল?"
কথাটা শেষ করেই আহনাফ গোলাপের তোড়াটা হিয়ার দিকে এগিয়ে দিলো।
যেটা দেখেই সাইডে দাড়িয়ে থাকা, রুদ্রের বুকটা ধপ করে উঠলো। হালকা কাঁপুনি দিয়ে উঠলো তার কাঁধে। চোখেমুখে বিস্ময় আর চাপা রাগ ফুটে উঠলো। সে নিজের অজান্তেই মুঠো করে ফেললো হাতটা।
এদিকে..... হিয়া একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। মুখটা ঘামছে তার রীতিমতো। নার্ভাস লাগছে নিজের কাছে। সে দু'হাতে উরুর কাছের জামাটা শক্ত করে চেপে ধরলো। কিছু সময় নীরব থাকলো।
এই মুহূর্তে কেউ জানে না, হিয়া কী বলবে। কিন্তু রুদ্র জানে—এই দৃশ্যটা তার ভেতরটাকে তোলপাড় করে দিচ্ছে।
রুদ্র বুঝতে পারছে না তার এই মুহূর্তে কি করা উচিত। সে শান্ত থাকতে চাইলো, কিন্তু সময় হয়তো তার ইচ্ছাকে সঙ্গ দিলো না। সে হিয়ার দিকে এগোনোর জন্য একপা ফেললো সামনে— ঠিক তখনই সে আবারো থমকে দাঁড়ালো। পায়ের নিচ থেকে যেন মাটিটা সরে গেলো তার।
হিয়া মুচকি হেঁসে আহনাফের হাত থেকে ফুলের তোড়াটা নিয়ে নিলো। আর সঙ্গে সঙ্গে আহনাফের বন্ধুগুলো করতালি দিয়ে উঠলো। সবার মুখে হাসির রেশ খেলে গেলো। অন্যদিকে, রুদ্রর ভেতরটা ভেঙে গেলো।
আহনাফ ও হাসলো। খুশিতে তার চোখে পানি চলে আসলো। সে সময় নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। হিয়া মুখে হাসি নিয়ে তাকালো আহনাফের দিকে। তার দেওয়া ফুলের তোড়াটাতে আলতো হাত বোলাতে লাগলো হিয়া। আহনাফ ততোসময় পকেট থেকে একটা ছোট্ট ডায়মন্ড রিং বের করলো। আলতো স্বরে ডাকলো,
"হিয়াা!"
আহনাফের ডাকটা যেন রুদ্রর বুকে তীরের মতো বিধঁলো। মনে হলো, তার ভেতরটা ভেঙে যাচ্ছে। কলিজাটা ছিঁড়ে বের করে নিচ্ছে কেউ। সে বুকটা চেপে ধরলো খুব জোরে। একটা চাপা আর্তনাদ করে। পেছন ফিরলো। চারিপাশে কোথাও আর না তাকিয়ে, চোখের পানি মুছতে মুছতে বেরিয়ে গেলো ক্যাম্পাস ছেড়ে।
#চলবে~