#সে_ছিলো_অন্যরকম❣️
#পুষ্পিতা_মেহরীন_তিশা
#পর্ব- ২৪
"আমার কি নিজের ওপর ঘৃণা করা উচিত রুদ্র?"
মুখে হতাশার ছায়া আর ঠোঁটে বিদ্রুপ হাসি নিয়ে প্রশ্ন করলো হিয়া। তার দু-চোখ ভর্তি পানি অপেক্ষা করছে গড়িয়ে পড়ার! তার কথায় রুদ্র মাথা নিচু করে চোখ বন্ধ করে নিলো। ডানহাতে ধরে থাকা হিয়ার হাতটা যেন শক্তির অভাবে সরে গেলো।
-
ঘড়ির কাটা রাত আট-টা ছুঁইছুঁই। হাতে থাকা ফোনটা ঘুরাতে ঘুরাতে রুমের এক মাথা থেকে অন্য মাথা পায়চারি করছে মোমো। মনটা তার অস্থির হয়ে আছে। সেই কোন বিকালে সে শুভ্রনীল চৌধুরীকে ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট পাঠিয়েছে অথচ, লোকটা এখনো তাকে ঝুলিয়ে রেখেছে? একসেপ্ট করার নামই নেই।
মোমো অবশ্য এর মাঝে কয়েক শতবার শুভ্রর প্রোফাইল চেক করেছে। ছেলেটা খুব বেশি ম্যাচিউর আর স্মার্ট ও। একেবারে রুদ্রর অপোজিট। তার প্রোফাইলে আলতু-ফালতু কোনো পোস্ট-ই নেই। আছে শুধু মেয়েদের কিডনি এ্যাটাক করানোর মতো তার কিছু পিক আর কাব্যিক মার্কা ক্যাপশন।
"ধুরু মিয়া! এই হতচ্ছাড়া টা এখনো আমাকে একসেপ্ট করে না কেন? আর কতো সময় অপেক্ষা করবো এই সিংগা-লা-লা হুহু এর জন্য!"
বিরক্ত হয়ে কথাগুলো বলতে বলতে বিছানার ওপর এসে বসলো মোমো। দু'হাটুতে হাত বাঁধিয়ে কিছু সময় মুখ ফুলিয়ে রইলো। চোখ বন্ধ করে পা দোলাতে দোলাতে কিছু একটা ভাবলো। তারপর হঠাৎ চোখ খুলেই ফোনটা হাতে নিলো। শয়তানি হেঁসে নিজেই নিজেকে বলল,,
"জোঁকার কাকু ঠিক জানতো। ফ্রেন্ড হয়ে প্রেম করতে গেলে, অর্ধেক প্রেমই অচিরে ঝড়ে পড়তো! তাই তো সে বুদ্ধি করে, ম্যাসেজ রিকুয়েষ্ট অপশান চালু করেছিলো!"
ভাবনা শেষ করে, মোমো দ্রুত শুভ্রর ইনবক্সে গেলো। প্রথমেই একটা লম্বা সালাম দিলো তাকে। "আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!"
ম্যাসেজটা সেন্ট করেই মোমো ধপ করে বিছানায় শুয়ে পড়লো। কিছু একটা ভেবে হঠাৎ লজ্জা পেতেই কাভারলেটের ভেতরে মুখ লুকালো।
-
"আমার আব্বু ঠিকই বলে জানো তো রুদ্র! যে, আবেগ দিয়ে দুনিয়া চলে না। দুনিয়ার সাথে চলতে হলে, আমাদের কে আবেগী নয় বাস্তবধর্মী হতে হবে। বাস্তবতার সাথে মিল রেখে আমাদের ভবিষ্যৎ কে সাজাতে হবে। আর আবেগ? সেটা তো কল্পনার রাজ্যেই মানানসই!"
সেই সময়ের হালকা বৃষ্টি এখন প্রবল বৃষ্টির রূপ নিয়েছে। তারই মাঝে মাথা নিচু করে রুদ্র দাঁড়িয়ে আছে। তার নাক আর থুতনি বেয়ে টপাটপ পানি পড়ছে। তবে সেটা কি শুধুই বৃষ্টির পানি— নাকি তার মাঝে চোখের নোনা পানিও মিশে আছে সেটা বোঝা যাচ্ছে না। কারণ, রুদ্র নির্বাক, নির্বোধ্য। তার মুখে কোনো শব্দ না থাকলেও, লজ্জা, অসহায়তা আর অপরাধবোধের অভাব নেই!
হিয়া এক ধাপ এগিয়ে এলো রুদ্রর দিকে। তার চোখে একরাশ অভিমান। আর গলায় রাগ চেপে রাখা কঠিন একটা স্বর।
"আর আমি আজ বুঝতে পারছি, আমার আব্বু ঠিকই বলতো! কোনো শান্ত আর বোকাসোকা ছেলের প্রতি সহানুভূতি তো প্রদর্শন করাই যায়। কিন্তু তার সাথে সারাজীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না! সারাজীবন পাশে রাখার জন্য একজন শক্ত আর সাহসী পুরুষের প্রয়োজন হয়! (একটু থেমে) আমার আব্বু ঠিকই বলে তাইনা রুদ্র!"
হিয়ার এমন কথায় রুদ্র চট করে তাকালো তার দিকে। শুষ্ক ঢোক গিলে ভাঙা গলায় কিছু একটা বলতে নিলো সে,
"হিয়াহ! আমি তো..."
"আমি তো..? আমি তো.. কি রুদ্র? এটাই বলবে না, যে হিয়া আমি তো তোমার কোনো ক্ষতি হতে দেয়নি! আমি তো সেইফ করেছি তোমাকে! কিন্তু, কিভাবে করেছো সেইফ? সেটা কি একবারো ভেবে দেখেছো?
হিয়া একটু থামলো। দম নিয়ে তাচ্ছিল্য হেঁসে আবারো বলল,,
"নিজের সাহসিকতা বা দাম্ভিকতার জোরে কিন্তু, তুমি আমাকে সেইফ করোনি রুদ্র! বরং, মিথ্যা বলে ছলনার আশ্রয় নিয়ে সেইফ করেছো আমাকে! কিন্তু এভাবে কতোদিন রুদ্র? একমাস, দু’মাস সর্বোচ্চ একবছর। তারপর? তারপর তুমি কি করবে রুদ্র?"
এতো সময়ের শান্ত হিয়া যেন মুহুর্তেই গর্জে উঠলো। হঠাৎই তার গলার স্বর পরিবর্তন হলো। নিজের ভেতরে চেপে থাকা একটা তীব্র রাগ আর অবহেলা নিয়ে কর্কশ কন্ঠে দ্রুততার সঙ্গে বলতে শুরু করলো,,
"আরে এই লোক গুলো তো নিহাত-ই বোকা আর গর্দভ ছিলো রুদ্র। তাই তারা তোমার কথার জালে ফেঁসেছে। কিন্তু বাকিরা তো এমন নাও হতে পারে। তারা তো আরো শক্তিশালী আর চালাকও হতে পারে রুদ্র!, তারা তোমার এই চালাকিকে বিশ্বাস না-ও করতে পারে! দু'টো থাপ্পড় মেরে চুপ করিয়ে দিতে পারে তোমাকে! তখন? তখন তুমি কি করবে রুদ্র? তাদের হাতে ছেড়ে দিবে আমাকে? পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকবে? নাকি তখনও তোমার এই সস্তার নাটক চালিয়ে যাবে। অপেক্ষা করবে সেই সময়ের জন্য যে, কখন তারা আমার ছিন্ন ভিন্ন শরীরটা রেখে চলে যাবে। আর তখন তুমি দৌড়ে গিয়ে আমাকে তুলে বলবে- "এসব কি হয়ে গেলো হিয়া। এমন তো হওয়ার কথা ছিলো না। আমি.. আমি তোমাকে রক্ষা করতে পারলাম না! আআআআআআ!"
হিয়া থামলো। হঠাৎ রাস্তার মাঝেই হাত-পা ছুড়ে একটা জোরে চিকিৎকার দিলো। কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে বলল,,
"ইউ আর এ লুজার মিস্টার রুদ্রনীল চৌধুরী। তুমি একজন কাওয়ার্ড। তোমার ভেতরে কোনো সাহসিকতা নেই, কোনো দাম্ভিকতা নেই..। একজন কাপুরুষের থেকেও অধম তুমি। আরে যে পুরুষ নিজের গার্লফ্রেন্ডের সম্মান রক্ষা করতে পারে না। সে আবার কোনো পুরুষ হলো নাকি? পুরুষ জাতির কলঙ্ক তুমি। একজন কাপুরুষের চেয়েও অধম তুমি রুদ্র। তুমি একটা লুজার....!"
কথাগুলো বলতে বলতেই হিয়া কাঁদতে কাঁদতে রাস্তায় হাঁটু ভেঙে বসে পড়লো। অন্যদিকে, রুদ্র লজ্জায় চোখ-মুখ খিঁচে বন্ধ করে হিয়ার অপমান গুলো হজম করতে লাগলো। তার কাছে হিয়ার বলা একটা কথাও, অযৌক্তিক বা মিথ্যা মনে হয়নি। আসলেই তো—
যে পুরুষ নিজের শখের নারীর সম্মান রক্ষা করতে পারে না, যে পুরুষের মাঝে নিজস্ব কোনো সাহসিকতা নেই, কোনো দাম্ভিকতা নেই, কোনো পাওয়ার নেই, সে আবার কোনো পুরুষ হলো নাকি? হিয়া তো ঠিকই বলেছে, সে একজন কা-পুরুষ! উমহু, সে কি শুধুই কাপুরষ? না, বরং তার থেকেও নিকৃষ্ট যদি কিছু থেকে থাকে তাহলে রুদ্র সেটাই। কিন্তু, সেটা কি??
রাস্তায় বসে থাকা হিয়া হঠাৎ-ই যেন তার কান্না থামিয়ে দিলো। কিছু একটা ভেবে চিন্তায় ভ্রু'জোড়া কুঁচকে ফেললো। দ্রুত হাতে চোখের পানি মুছতে মুছতে উঠে দাড়ালো। তড়িঘড়ি করে রুদ্র শরীর ঝাড়তে ঝাড়তে ব্যস্ত গলায় বলল,,
"ওহ সরি, সরি, আ'ম এক্সট্রিমলি সরি রুদ্র! আমার তোমাকে ওই কথাগুলো বলা একদমই উচিত হয়নি।"
হিয়ার হঠাৎ এমন ব্যবহারে রুদ্র ভ্রু'কুচকে তাকে খেয়াল করলো। একমুহূর্তের জন্য রুদ্রর মনে হলো, হিয়া হয়তো রাগের মাথায় কথাগুলো বলে, এখন বিষয়টা উপলব্ধি করতে পারছে। তবে তার এই ধারণা বেশি সম স্থায়ী হলো না। হিয়ার পরবর্তী কথাতেই, রুদ্র কুঁচকে যাওয়া ভ্রু'যুগল আবারো সটান হলো। দুই ঠোঁটের মাঝখানে কিঞ্চিৎ ফাঁকা হলো। হিয়া বলল,,
"কারণ, আসল লুজার তো তুমি নও রুদ্র। আসল লুজার তো আমি। আমি-ই তো আহনাফ ভাইয়ের মতো পারফেক্ট কাউকে ছেড়ে তোমাকে ছেড়ে ভালোবাসতে চেয়েছিলাম। আবেগে গা ভাসিয়েছিলাম কিনা! তাইতো, গল্পের নায়িকাদের মতো করে ভোলাভালা একটা ছেলেকে নিজের মতো করে গড়তে চেয়েছিলাম। তাকে নিয়ে একটা আলাদা জগতে থাকতে চেয়েছিলাম। মাঝখানে, ভুলেই গিয়েছিলাম- যে বাস্তবতা বলে একটা শব্দ আছে! কিন্তু দেখো, আজকের বাস্তবতা আমার সেই আবেগ কে তাড়িয়ে দিলো। বাস্তবতার ধাক্কায় দূরে ছুটে পালালো আমার আবেগ! তবে পালানোর আগে বুঝিয়ে দিয়ে গেলো—
~'একটা মেয়ে আগলে রাখার জন্য একজন 'রুদ্রনীল চৌধুরী' নয় একজন 'আহনাফ মির্জার' প্রয়োজন হয়!~`
শেষ কথাটা হিয়া অত্যন্ত নম্র আর শান্ত স্বরে বললো। আর তাতেই রুদ্রর চোখ দুটো বড়ো বড়ো হয়ে গেলো, ভেতর থেকে কয়েকটা কান্না চাপা গরম শ্বাস বেরিয়ে এলো। টলতে থাকা পায়ে সে কয়েক কদম পিছিয়ে গেলো। তার গলাটা যেন শুকিয়ে আসছিলো। বুকের ভেতরটা কেন জানি খুব অস্থির অস্থির লাগছিলো৷ যেন খুব প্রিয় আর কাছের কিছু হারিয়ে ফেলছে সে।
অন্যদিকে, হিয়া নিষ্পলক চেয়ে রইলো তার দিকে। আচ্ছা, হিয়া কি তার বলা কথাটার সঠিক অর্থ বুঝে বলল? সে বুঝতে পারলো, এতো সময়ে তার করা অপমানের মাঝে, শেষ অপমান টুকু রুদ্রর জীবনে শ্রেষ্ঠ অপমান হয়ে থাকবে! সে কি বুঝতে পারলো?- তার কথারা রুদ্রর হৃদয়ে কতোটা ক্ষতের সৃষ্টি করলো?
~
বেশ কিছু সময় পর মোমো ধীর হাতে কাভারলেট টা টেনে নাক বরাবর এনে রাখলো! লজ্জার রেশ সম্পূর্ণ রুপে না কাটায়, মুখটা পুরাপুরি বের করতে পারলো না। আস্তেধীরে ফোনটা হাতে নিলো, শুভ্র তাকে রিপ্লাই করেছে কিনা দেখার জন্য। কিন্তু, বেডা যে এখনো তার ম্যাসেজ সিন-ই করে নাই। এটা দেখা মাত্রই যেন তার লজ্জারা মুখে দম নিয়ে পালালো।
মোমো এক চোটে উঠে বসলো। চোখে-মুখে বিরক্তি আর চাপা রাগ। নাহ! এবারে বিষয়টা তার আত্মসম্মানের দিকে যাচ্ছে। সে একটা ছেলের সাথে কথা বলার জন্য এতোকিছু করছে। আর ছেলেটা কিনা তাকে পাত্তাই দিচ্ছে না। মোমোর ইচ্ছা করলো শুভ্রকে ব্লক মেরে উড়িয়ে দিতে। কিন্তু, সে এটা করতে পারবে না। কারণ, সে হিয়াকে কথা দিয়েছে, হিয়ার দেবরকে সে পটিয়েই ছাড়বে। নিজেকে শান্ত করতে কয়েকটা লম্বা শ্বাস নিলো মোমো। নিজেই নিজেকে বলল,,
"কুল..কুল মোমো! রিলাক্স! এতো তাড়াতাড়ি তুই রেগে যাস না। কারণ, রেগে যাওয়া মানে হেরে যাওয়া। আর তুই হারতে পারিস না!"
এভাবে নিজেকে আরো কিছুটা নাম-ছাম বুঝিয়ে মোমো আরও একটা টেক্সট করলো শুভ্রকে-
"সালামের উত্তর দেওয়া ওয়াজিব। আর ওয়াজিব মানে প্রায় ফরয। আর ফরয কাজ আদায় না করা মানে হলো, আল্লাহ কে অসন্তোষ করা জান্নাতকে ছেড়ে দেওয়া!"
প্রায় দেড় মিনিট মোমো ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলো। কিন্তু এবারেও কোনো রিপ্লাই আসলো না। মোমোর ইচ্ছে করলো ফোনটাকে ধরে একটা আছাড় মারতে। কিন্তু, এবারেও নিজেকে আবার বোঝালো! নিজেকে শান্ত রাখতে বলল,,
"মনে রাখিস মোমো! জীবনে প্রথম তুই ছেলে পেটানোর.. থুক্কু.. পটানোর মিশনে নেমেছিস। এই মিশনে হেরে যাওয়া মানেই জীবন যুদ্ধে চারধাপ পিছিয়ে যাওয়া। সো গো অ্যাহেড!"
কথাটা শেষ করেই সে আবারো টেক্সট দিলো শুভ্রকে।
"এইযে! গোলামের পুত! আমি আপনার ফুতুরে বিবি বলছি। দয়া করে আমার ম্যাসেজ গুলো সিন করুন। নয়তো, আমি ভবিষ্যতে আপনাকে সিনারি বানিয়ে রাখবো!"
ম্যাসেজটা দিয়ে মোমো ফোন টা রাখতে না রাখতেই ওপাশ থেকে শুভ্রুর রিপ্লাই এলো। সে প্রথমেই মোমোর সালামের উত্তর দিলো। এরপরে শেষ ম্যাসেজের জবাবে বলল,,
"কে আপনি?"
শুভ্রর রিপ্লাই পাওয়া মাত্রই যেন মোমোর বুকের ভেতরে ধুরুম ধুরুম আওয়াজ শুরু হলো। সে নিচের ঠোঁট কামরে, ঘনঘন কয়েকটা পলক মারলো।
"দেখছোনি কান্ড! এতো সময় ওনাকে সম্মান দিয়া কথা কইলাম, ওনি পাত্তা দিলেন না। যেই একটা, ফাউল ম্যাসেজ দিলাম, ওমনি সাথে সাথে রিপ্লাই দিলো! খাড়াও ব্যাডা তোমারে মজা দেখাইতাছি।" এবারে মোমো তাকো রিপ্লাই করলো,
"আপনার ফুতুরে ওয়াইফ!"
"মানে?"
"Fu-ফু,tu-তু,re-রে Wife. মানে ভবিষ্যৎ বউ!"
"সরি! আই হ্যাভ এ গার্লফ্রেন্ড!"
"গার্লফ্রেন্ড আছে তো কি হয়েছে? আমি তো আর আপনার গার্লফ্রেন্ডের ভাগ নিতে আসিনি মশাই! এসেছি আপনার ফুতুরে বউ হতে!"
"আমার বর্তমান গার্লফ্রেন্ড-ই আমার ফিউচার ওয়াইফ হবে।"
"সে ফিউচারে আপনার বউ হবে। আর আমি অলরেডি আপনার বউ হয়ে বসে আছি। ফিউচার বউ আর বর্তমান বউয়ের মাঝে অনেক পার্থক্য থাকে। সে-গুলো বুঝেন তো নাকি?"
"ফালতু কথা রাখেন। নয়তো, এখনই আপনাকে ব্লক করে দিবো!"
"সমস্যা নাই। ফেইক আইডি খোলাতে ব্যাপক এক্সপার্ট আমি!"
"আর সেই আইডি ঝুলিয়ে রাখতে আমি মারাত্মক এক্সপার্ট!"
"ঝুলিয়ে রাখলে, রাখবেন। তখন আপনার বড়ো ভাইয়ের ফোন থেকে আপনাকে কল করবো। নো সমস্যা!"
"আমার বড়ো ভাই মানে?" (অবাক হওয়ার ইমোজি)
"মিস্টার 'রুদ্রনীল চৌধুরী' ইউর বিগ ব্রাদার তো?"
"তাকে আপনি কিভাবে চিনেন?"
"কি-যে বলেন! চারটা না পাঁচটা না একটা মাত্র ভাসুর আমার। আর তাকে আমি চিনবো না?"
"এই কে আপনি বলুন তো?"
"ওইযে, বললাম। আপনার ফুতুরে বউ!"
"দেখুন! বাজে প্যাচাল মারা বন্ধ করুন। নিজের পরিচয় নিয়ে সামনে আসুন। নাম কি আপনার?"
"আইডি'তে জ্বলজ্বল করছে!"
"আচ্ছা! আপনি কি আমাকে চেনেন?"
"চিনি মানে? খুব ভালো করে চিনি! ইনফ্যাক্ট, আপনার কোথায় কয়টা তিল আছে সেটাও আমি জানি!"
"ওয়াট দ্য..."(সাথে একটা বিরক্তি ইমোজি)
" আচ্ছা! আপনি লয়াল? নাকি দয়াল?"
"মানে?"
"দূর চুল! এতো মানে মানে করেন কেন? আমি কোনো ডিকশনারি নইযে, আপনাকে সবকিছুর মানে বোঝাবো! যেটা জিজ্ঞেস করেছি, সেটার ঠিকঠাক উত্তর দিন তো!"
"সুন্দরী মেয়েদের ক্ষেত্রে তো ছেলেরা সবসময়-ই দয়াল। আর লয়ালিটি, সেটা তো শুধু তাদের পরিবারের প্রতিই কাজ করে।"
"আর বউয়ের প্রতি...?"
"বউয়ের প্রতি তো তারা সবসময়ই কেরাসিন সরি উদাসীন!"
"বুঝেছি! এই আমার অভাবে আপনি দিনদিন খুব ফাজিল হয়ে যাচ্ছেন! আপনার সাথে আমাকে তাড়াতাড়ি একটা সাক্ষাৎকার করতে হবে। সেটাও বাসরঘরে...!"
"আরেহ! ব্যাস! বিয়ে করার খুব তাড়া দেখছি আপনার?"
"আমার ফুতুরে জামাই আমাকে রেখে, অন্য মেয়েদের সাথে টি-টোয়েন্টি খেলে বেড়াচ্ছে। তাহলে, বিয়ে করার তাড়া আমার থাকবে না। তো কি আপনার থাকবে?"
-
রাত প্রায় সাড়ে নয়টা। চারপাশে তখনো টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। তারই মাঝে বৃষ্টিতে পুরো ভিজে নাওয়া অবস্থায় বাসায় প্রবেশ করলো হিয়া। তবে নিজ রুমে যাওয়ার আগেই—
"হিয়া!" পেছন থেকে গম্ভীর কণ্ঠে ডাক দিলেন তার বাবা— মো.মুশফিকুর রাহমান।
ডাকটা শুনে হিয়া থেমে গেলো। চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইলো। যেন নিজেকে প্রস্তুত করছিল।
তারপর ধীরে ধীরে পেছন ফিরে দাঁড়াতেই, তার বাবা এক ধাপ এগিয়ে এসে কপাল কুঁচকে পর্যবক্ষণ করলো হিয়াকে!
মেয়ের ভেজা চুল, মলিন মুখ, কাঁপতে থাকা শরীর, আর হাওয়ায় লেপ্টে থাকা পোশাক— সেই সাথে চোখেমুখে ভয়ের ছাপ দেখে স্পষ্ট বিচলিত হয়ে উঠলেন তিনি। কণ্ঠে বিস্ময় আর দুশ্চিন্তার সুর নিয়ে একদমে প্রশ্ন করলেন,,
"এই কী অবস্থা তোমার হিয়া? এতো রাতে এই বৃষ্টির মাঝে কোথা থেকে ফিরছো তুমি? তোমার চোখ-মুখের অবস্থা এমন কেন? কি হয়েছে তোমার?"
আব্বুর পরপর এতোগুলো প্রশ্নে হিয়া অপ্রস্তুত হয়ে গেলো। আমতা আমতা করে বলতে নিলো,,
"আম.. আসলে আব্বু আমি.."
"তোমার তো আজরাতে মোমোদের বাসায় থাকার কথা ছিলো তাই না? তাহলে, তুমি এভাবে ভিজলে কি করে?"
"আ..আসলে আব্বু। মোমোর নানু হঠাৎ-ই খুব বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। মোমোকে দেখতে চাইছিলেন, তাই ওর আম্মু এসে ওকে নিয়ে গেছে। আর আমাকেও ওনারা এগিয়েই দিয়েছেন। শুধু ভেতরের গলিটা একা আসতে গিয়ে একটু ভিজে গিয়েছি। এই যাহ!"
হিয়ার কথায় কপালে ভাজ ফেললো তার বাবা। কেন জানি তার হিয়ার কথাগুলোকে অযৌক্তিক লাগলো। চিন্তিত ভঙ্গিতে হিয়ার অবস্থা দেখে হয়তো একবার রাগারাগি করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু মেয়ের ভেজা কাপড়, কাঁপুনি ধরা শরীর আর কুয়াশাভেজা চোখের দিকে তাকিয়ে আর কিছু বলতে পারলেন না। কণ্ঠটা একটু নরম করে বললেন—
"আচ্ছা, ঠিক আছে। আগে যাও গিয়ে চেঞ্জ করে নাও । এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকলে তোমার ঠাণ্ডা লেগে যাবে। আমি রহিমাকে বলছি তোমাকে গরম দুধ দিতে।"
হিয়া ধীরে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে নিঃশব্দে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালো। পেছনে আর তাকায়নি। ভেজা পায়ের ছাপ ফেলে সে নিজ রুমের দিকে এগিয়ে গেলো— পায়ের সাথে যেন ভেজা এক ব্যাথাও বয়ে চলেছে নিঃশব্দে।
-
সেই রাতে প্রায় দেড় ঘন্টা ধরে ঝর্ণার নিচে দাঁড়িয়ে রইলো হিয়া। লম্বা একটা সাওয়ার নিয়ে বের হলো সে।এক নিঃশ্বাসে রুমের লাইট টা বন্ধ করে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। চোখটা বন্ধ করতেই সামনে ভেসে উঠলো— রুদ্রর সেই বিষন্ন আর অপমানিত মুখটা! বারবার কানে বাজতে লাগলো, তার নিজের বলা শেষ কথাটা—
"একটা মেয়ে আগলে রাখার জন্য একজন 'রুদ্রনীল চৌধুরী' নয়, একজন 'আহনাফ মির্জার' প্রয়োজন হয়!"
বুকের ভেতরটা যেন হঠাৎই মোচড় দিয়ে উঠলো তার।
"আমি কি সত্যিই ঠিক বলেছি...? নাকি... নিজের আবেগকে নিজেই বিশ্বাসঘাতক বানিয়েছি?"
হিয়ার দুচোখ বেয়ে এবার অনায়াসে গড়িয়ে পড়লো নোনা জল।
#চলবে~