#সে_ছিলো_অন্যরকম🍁
#পুষ্পিতা_মেহরীন_তিশা
#পর্ব–২৬
বিকাল, ঠিক পাঁচটা...
নিরিবিলি এক পাহাড়ি ঢিবির চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে হিয়া। চারপাশটা নীরব, অথচ বাতাসে এক অদ্ভুত ছোয়া! যেটাতে হিয়ার উড়নাটা উড়ছে, এলোমেলো চুলগুলো গাল ছুঁয়ে যাচ্ছে।
দূরের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে হিয়া—দৃষ্টিটা স্থির তবে ভেতরে ভীষণ ঝড়। কারণ, আজ স্রেফ দেখা নয়, আজ কিছু একটা শেষ করতে এসেছে সে। খুব ঠান্ডা ভাবে। খুব ভেবেচিন্তে!
হঠাৎ পেছনে কারো নিরব উপস্থিতি বুঝতে পেরে নিঃশব্দে মুচকি হাসলো সে। পেছন না ঘুরেই শান্ত গলায় প্রশ্ন করলো,,
"এসেছো?"
অপর ব্যক্তিটির কাছ থেকে কোনোরুপ উত্তর না আসায়, হিয়া আরো কিছুটা সময় নিয়ে পেছন ঘুরে দাঁড়ালো। সামনে দাঁড়িয়ে আছে রুদ্র— মাথা নিচু করে দু’হাত কচলাচ্ছে। যেটা দেখে হিয়া প্রশ্ন ছুড়লো,,
"তুমি কি নার্ভাস?"
"আ'ম সরি হিয়া..."
"সরি কেন?"
রুদ্র কাঁপা কণ্ঠে বলল,
"কাল রাতের ঘটনাটার... মানে..আ,আসলে আমি..."
হিয়ার মুখে নিঃশব্দ এক হাসি খেলে গেলো। তবে ঠোঁটের কোণে তীব্র বিদ্রূপ মিশে থাকলো কিনা—বোঝা গেলো না।
"কিন্তু, তার জন্য তো আমার তোমাকে সরি বলা উচিত রুদ্র। কারণ, আমি তোমাকে সিডিউস করেছিলাম!"
"কিন্তু, আমি জানতাম! তুমি নিজের মধ্যে নেই। সেক্ষেত্রে আমার আরো সর্তক থাকা উচিত ছিলো। নিজেকে সামলানো উচিত ছিলো। কিন্তু, আমি... আমি আসলে...আমি বুঝতে পারিনি, কিভাবে, কি থেকে কি হয়ে গেলো। আ'ম সরি হিয়া! আ'ম..."
হিয়া এবার ঠান্ডা গলায় বলল,
"আমার দিকে তাকাও রুদ্র।"
রুদ্র মাথা তুললেও চোখ রাখে না হিয়ার চোখে। এদিক-সেদিক তাকিয়ে নিচু স্বরে বলে,
"কিন্তু, আমি তোমার চোখে-চোখ রাখতে পারছি না।"
হিয়া ঘাড় ঘুরিয়ে নীচের ঠোঁট কামড়ে অদ্ভুত হাসলো, একটু গম্ভীর হয়ে বলল—
"তুমি আমাকে খুব ভালোবাসো তাই না?"
"নিজের অস্তিত্বের থেকেও বেশি!"
"আমার জন্য স'ব করতে পারবে?"
"তুমি পাশে থাকলে সব পারবো!"
হিয়া ঘাড় ঘুরিয়ে ঠোঁট কামড়ে হালকা হাসলো। এরপরে তীক্ষ্ণ চোখে আবারো প্রশ্ন ছুড়লো,,
"কাউকে খুন করতে পারবে? আমার জন্য!"
হিয়ার এমন কথায় তার দিকে চট করে তাকালো রুদ্র। কেন জানি মনে হলো, তার হৃৎপিণ্ড টা থমকে গেছে, সেই সাথে থমকে গেছে চারপাশের শীতল বাতাসও।
"কি হলো বলো। পারবে আমার জন্য কাউকে খুন করতে?"
রুদ্র কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকলো। এরপরে নিঃশব্দে এগিয়ে এসে— হিয়ার দু'হাত নিজের হাতে তুলে নিলো। অল্প হেঁসে জবাব দিলো,
"যদি পরিস্থিতি এমন হয়। তোমাকে পেতে কাউকে মারতে হয়, তাহলে আমি রুদ্র হাসতে হাসতে তার প্রাণ বের করে নিবো। নিজেকে আমি এমন ভাবেই তৈরী করবো।"
"আর যদি কখনো তোমার প্রাণটাই আমার প্রয়োজন হয়?"
হিয়ার এমন কথায় রুদ্র থমকালো। বিস্ময়ে আপনা-আপনিই ভ্রু দুইটা কুঁচকে এলো তার। তবে হিয়া তখনো স্বাভাবিক। চোখে কিছু অদ্ভুত আর মুখে সেই বাঁকা হাসি। তবে সেই হাসির উদ্দেশ্য রুদ্রর কল্পনারও বাইরে। রুদ্র কিছু বলার জন্য আলতো ঠোঁট নাড়ালো—
"হিয়া! তো-তোমার কথা আমি..আমি কিছুই..."
রুদ্র কে এভাবে তোতলাতে দেখে হিয়া ভ্রু সটান করলো। আর হঠাৎ-ই কিছু একটা ভেবে চট করে হেঁসে দিলো।
"নিজের জীবনের প্রতি খুব মায়া দেখছি তোমার। নিজেকে খুব ভালোবাসো তাই না?"
"তোমার কথাগুলো বড্ড অদ্ভুদ হিয়া। আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।"
হিয়া শব্দ করে হাসলো রুদ্রর কথায়। বেশ অনেকটা সময় নিয়ে হাসলো নিয়ে, আর তার হাসির দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকলো রুদ্র। কেন যেন হিয়ার এই আচরণ তার কাছে অদ্ভুত লাগছে। হিয়াকে আজ বড্ড রহস্যময়ী লাগছে তার।
"তোমাকে বোঝাবো তো রুদ্র। তোমাকে বোঝাতেই তো আমি এসেছি!"
এতোটুকু বলেই- হিয়া রুদ্রর চোখে চোখ রেখে হাত চালালো নিজের পেছনে রাখা পার্সব্যাগের ভেতরে। সেখানে কিছু সময় হাতড়ানোর পরে চাকুটা হিয়ার হাতের মধ্যে আসতেই হিয়ার ঠোঁটে খেলে গেলো এক অদ্ভুত হাসি। সে চাকুটাকে পার্সে থেকে বের করে শক্ত হাতে নিজের পেছনে চেপে ধরলো। এরপরে রুদ্রর উদ্দেশ্য ভ্রু সটান করে বলল,,
"কিন্তু, জানো তো রুদ্র। আজকাল না থিয়োরি খুব দুর্বল, এজন্য আমি তোমাকে প্রাকটেক্যালি বোঝাতে চাই। তুমি কি বুঝতে ইচ্ছুক?"
রুদ্র অবাক চোখে তাকালো হিয়ার দিকে। অন্যদিকে হিয়া তার পেছনে রাখা চাকুটা আরেকটু শক্ত করে ধরলো। মনে মনে ঠিক করলো, রুদ্র মুখ খুলতেই সে চাকুটা রুদ্রর বুকে গেঁথে দিবে।
রুদ্র অস্ফুট স্বরে কিছু একটা বলতে যাবে হিয়াকে। ঠিক তখনই হিয়া ছুরিটা শক্ত করে ধরে সামনের দিকে আনতে চাইলো তবে তার আগেই—
ওদের থেকে কিছুটা দূরে এক কোণার ঝোপ থেকে ভেসে এলো তালি দেওয়ার শব্দ। হঠাৎ করেই জোরে চিৎকার, হৈ-হুল্লোড় করতে করতে বেরিয়ে এলো চারজন। মোমো, সৌরভ, রাহাত আর রিফাত!
হিয়ার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেলেও মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিল সে। ছুরিটা নিঃশব্দে আবারো ব্যাগের মধ্যে রেখে হাতদুটো মুষ্টিবদ্ধ করে সামনে আনলো রাগে সারা শরীর কাঁপছিলো তার। চোখে মুখে জমে উঠেছিল এক অজানা আগুন। যেটা কেউ দেখলেও বুঝবে না। ঘটনাটা এতো তাড়াতাড়ি ঘটলো যে হিয়া বেশ অবাক৷ আরেকটু হলে-ই বড় সমস্যা হয়ে যেতো।
রুদ্র চমকে তাকালো মোমোদের দিকে। এরা এখানে কেন? তবে তার প্রশ্নের উত্তর মেলার আগেই হিয়া তাকে দাঁত চেপে ফিসফিসিয়ে বলল,,
"আমি তোমাকে একা আসতে বলেছিলাম রুদ্র।"
"বিশ্বাস করো। আমি এদেরকে ডাকি নাই। ইনফ্যাক্ট, আমি কাউকে কিছু বলিও নাই।"
তাদের কথার মাঝের বাকিরা তাদের খুব কাছে চলে এলো। সৌরভের কানে তাদের ফিসফিসানিটা যেতেই সে ক্যামেরা ঠিক করতে করতে বলল,,
সৌরভ: "আমাদের কে ডাকা লাগে না রে হিয়ারাণী। আমরা হলাম কাবাব মে হাড্ডি। কেউ না বললেও, স্বইচ্ছায় মাংসের মধ্যে মারি এন্ট্রি!"
রুদ্র : তোরা এখানে কিভাবে এলি?"
রিফাত: চান্দের দেশে শান্তিতে ঘুমাচ্ছিলাম! হঠাৎ মনে হলো তোরা পৃথিবীতে ভালোই নেই। তাই রকেট নিয়ে তোদের কে পিক এলাম। কিন্তু, হঠাৎ মাঝ আকাশেই রকেট টা ত্যাড়ামি শুরু করলো। ব্লাস্ট হওয়ার ভয়ে চোখ বন্ধ করে মারলাম এক ঝাপ।..."
মোমো : আর চোখ খুলতেই দেখলাম, ঝোপের আড়ালে তোদের আন্ডারপ্যান্ট!"
হুট করেই সেখানে একটা হাসির রোল পড়লো। না চাইতে রুদ্র ও মুখে হাত দিয়ে হাসলো। তবে হাসি ফুটলো না শুধু হিয়ার মুখে। সে মুখে গম্ভীরতা বজায় রেখে বলল,,
হিয়া : "তোরা কি ঝোপের আড়াল থেকে ফলো করছিলি?"
সৌরভ : "কেন রে? নিজেদের কি আন্ডারগ্রাউন্ড মাফিয়া মনে করিস? যে আমরা তোদের ফলো করতে যাবো।"
হিয়া : "তাহলে, তোরা এখানে কিভাবে এলি?"
রিফাত: "তোদেরকে অনুসরণ করে!"
হিয়া : তারমানে তো তাই-ই হলো। আমাদের কে ফলো করে কুত্তার মতো লেজ নাড়াতে নাড়াতে তোরা এখানে চলে এলি!"
মোমো : “চুপ থাক শালী! শুধু ফলো করছিলাম নাকি? ভিডিও করছিলাম রীতিমতো! কী সুন্দর ভিডিও হচ্ছিল—সব বরবাদ করলি! বালের পেঁচাল আনলি শেষে!”
হিয়া রাগটা গিলে ফেলল। মুখে স্বাভাবিক ভাব এনে জিজ্ঞেস করল,
হিয়া : “মানে? কিসের ভিডিও করছিস তোরা?”
রাহাত : "ভিডিও আর করলাম কই? ভেবেছিলাম তোদের চুম্মাচুম্মির একটা স্পেশাল ভিডিও কট হিসেবে রেখে দিবো। কিন্তু, সেটা আর হলো কই? শেষ মুহূর্তে খুন-খারাবির এনে তো চুম্মা-চুম্মির তেরোটা বাজাই দিলি তুই!"
রিফাত : “ধুর ভাই, পেটে খিদের যন্ত্রণায় ব্যথা করছে। আগেই তোদের বলেছিলাম, এখানে আসার আগে একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে বারবিকিউ খেয়ে নিই। তোরাই তো মানা করলি। বিশেষ করে এই মোমোর বাচ্চা।”
মোমো : “এখনো বিয়েই করিনি, বাচ্চা কি তোর নানা এসে দিয়ে যাবে নাকি? চুপ কর!”
বলেই মোমো হিয়ার দিকে তাকালো। হিয়ার কাঁধে হালকা একটা ধাক্কা দিয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
মোমো : “রোমান্টিক কথা না বলে উল্টোপাল্টা কথা কেন বলছিলি, হুঁ? ভিডিওটা ঠিকঠাক হলো না তো!”
হিয়া কিছু বলছে না। তার চোখ একবার মোমোর দিকে, আরেকবার রুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে।
এই মুহূর্তে মোমো এবার রুদ্রকে উদ্দেশ করে বলে উঠল,
মোমো : “ভাইয়া, আপনিও তো কিছু বলতে পারতেন!”
রিফাত : “দুলাভাইও বোধহয় সিরিয়াস মোমেন্টে ঢুকে গিয়েছিলেন! ধুর ভাই, আজ সিঙ্গেল বলে কেউ বুঝে না! না হলে রুদ্র আর হিয়াকে সামনে বসিয়ে দেখিয়ে দিতাম সরাসরি দেখা হলে রোমান্টিক কথা বলে রাগ-অভিমান কমাতে হয় কীভাবে!”
মোমো : “এ জন্মে আর তোর জন্য গফ জুটবে না।”
রিফাত : “কাওকে না পেলে তোকে নিয়ে নেব।”
মোমো : ওরেহ শালা! আমার ফুতুরে জামাইকে ফুতুরে বিধবা করার ধান্দা?"
হঠাৎ করেই সবাইকে অবাক করে দিয়ে রুদ্র এমন একটা কাজ করে ফেললো, যেটা কেউ কল্পনাও করেনি। হিয়ার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সে।
তার হাতে তখন একটা ছোট্ট গোল্ডেন রিং এর বক্স। বক্সটা খোলা আর তার ভেতরে রাখা রয়েছে একটা দারুণ সুন্দর রিং ঝকঝক করছে সূর্যের মৃদু আলোয়।
হিয়া একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল রুদ্রের দিকে,
ঠিক তখনই রুদ্র গভীর কণ্ঠে বলে উঠল,
"উইল ইউ ম্যারি মি হিয়া?"
চারপাশ হঠাৎ করে থমকে গেল যেনো। মোমো, রিফাত, সৌরভ আর রাহাত চারজনেই হা করে তাকিয়ে রইলো রুদ্রের দিকে। কারো মুখে কোনো শব্দ নেই। হঠাৎ করে কী হয়ে গেল! আর হিয়া? সে তখনো পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে।
রুদ্র: “আমার জন্য তুমি অনেক কষ্ট পেয়েছো হিয়া! আমি তোমাকে আর কোনো কষ্ট দিতে চাই না৷ তোমার সুখ-দুঃখ, ভালো থাকা -খারাপ থাকা সবকিছুর সঙ্গী হতে চাই৷ মেনে নিবে তো, আমায়? বিয়ে করবে আমাকে? তোমার পার্সোনাল রুডি বয় হতে চাই আমি! একবার সুযোগ দিবে আমাকে?"
হিয়া থম মেরে দাড়িয়ে রইলো সেখানে। সবকিছু যেন তার মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। সে কি করতে এসেছিলো এখানে? আর এখন কিসব হচ্ছে এখানে?
মোমো : কিরে হিয়া হাতটা বারা। ভাইয়ার হাটুতে ব্যাথ্যা হয়ে গেলো তো!"
নিজের কল্পনা থেকে বের হলো হিয়া। রাগটাকে সংবরণ করে মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করলো। যে হাতে সে রুদ্র মারতে চাকু ধরেছিলো, সেই হাতেই সে রুদ্রর দেওয়া রিংটা পড়ে নিলো।
তখনই পাশ থেকে ভেসে এলো করতালির শব্দ। মোমো, রাহাত, রিফাত আর সৌরভ জোরে জোরে হাততালি দিচ্ছে, যেন তারাও বহুদিন ধরে এই মুহূর্তটার জন্য অপেক্ষা করছিল। রিফাত ঠোঁটে ঠোঁট চেপে দিল একটা লম্বা বাঁশি, পুরো পরিবেশে ছড়িয়ে পড়লো খুশির রঙ।
সৌরভ হেসে বলল,
সৌরভ: তো দুলাবাঈ নিজের অন্ধকার বউকে তো একটা ডায়মন্ড রিং দিয়ে বিয়ের আগেই অর্ধেক মালিকানা নিয়ে নিলেন। তাহলে এবার একটা আমাদের ট্রিটের ব্যবস্থা করেন!"
হিয়া ভ্রু কুচকে বলল,, "অন্ধকার বউ মানে?"
সৌরভ মুখ ভেংচি দিয়ে বলল,, "তোর মতো কুত্তীরে যে হাঙ্গা করবে তার ভবিষ্যৎ মানে হলো অন্ধকার। সেক্ষেত্রে, তুই জিজুর অন্ধকার বউ!"
সৌরভের কথায় রুদ্র ঠোঁট কামড়ে মুখে হাত দিয়ে হাসলো। যেটা দেখে হিয়া দাঁত কিড়মিড় করে বলল,,
"খুব হাসি পাচ্ছে তাই না?"
রুদ্র দ্রুত হাসি থামিয়ে ডানে-বামে মাথা ঝাঁকালো। হিয়া তাকেও একটা মুখ ভেংচি দিয়ে ঘাড় ঘোরালো। রুদ্র হালকা হেঁসে সবার উদ্দেশ্য বলল,,
"তো বলো। তোমরা কি ট্রিট চাও?"
মোমো হঠাৎ উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠল,,
"আমরা ট্রুর ট্রিট চাই জিজু!"
সৌরভ,আর রিফাত একসাথে ভ্রু কুঁচকে বলে উঠলো,, "ট্যুর ট্রিট?"
হিয়া আর রুদ্র একবার একে-অপরের দিকে তাকালো। তারপর হিয়া বলে উঠলো,
হিয়া : "কিন্তু মোমো। এতোগুলো মানুষ কে ট্যুরে নিয়ে যাওয়া অনেক টাকার ব্যাপার!"
মোমো : "চিন্তা করিস না রে। তোর অন্ধকার জামাইয়ের খুব বেশি টাকা আমি খরচা করাবো না। আমরা কাছে-পিঠেই কোথাও যাবো।"
রুদ্র : "কাছে পিঠে কোথায় যেতে চাও?"
মোমো : সুন্দরবন!
হিয়া আর রুদ্র একসাথে বিস্ময় নিয়ে বলে উঠল,
"সুন্দরবন?"
রিফাত: "আরেহ ব্যাস মোমো! তুই তো ঝাক্কাস একটা কথা বলেছিস। রুদ্রদের বাসা তো খুলনা। আর খুলনা মানেই অর্ধেক সুন্দরবন। সেক্ষেত্রে, আমরা হিয়ার হবু শশুর বাড়ি ও দেখে আসতে পারবো। সাথে শালা আপ্যায়ন ফ্রি পাবো! কি বলিস সৌরভ?"
শেষ কথাটা চোখ টিপ দিয়ে বলল রিফাত। সৌরভ তাকে সঙ্গ দিয়ে বলল,, "অবশ্যই বড়ো ভাই!"
মোমো চোয়ালে মুখে হাত দিয়ে আফসোসের সুরে বলল,,
"হহ! তোরা যাবি হিয়ার শশুর বাড়ি দেখতে। আর আমি যাবো আমার ফুতুরে বর টাকে দেখতে।"
মোমোর কথায় সবাই ফিক করল হেঁসে দিলো। একটু বাদে রুদ্র বলল,,,
রুদ্র : ওকে। পরশু ফ্রাইডেতে তাহলে আমরা সুন্দরবন যাচ্ছি।"
~
দুইদিন পর.....
আজ শুক্রবার। হিয়াদের নিয়ে দুপুর বারোটার বাসে করে রওনা হয়েছিল রুদ্র। তবে খুলনাতে পৌঁছাতে পৌছাতে তাদের রাত ন'টা বেজে গেলো।
প্রায় সাড়ে নয়টা নাগাদ তারা সবাই হাজির হলো চৌধুরী মঞ্জিল এর সামনে। পরপর কয়েকবার কলিং বেল বাজাতেই সাবিলা বেগম এসে দরজাটা খুলে দিলো। দরজার এপারে নিজের বড়ো ছেলে দেখতেই আনন্দে বিমোহিত হয়ে উঠলেন তিনি। কন্ঠে উচ্ছাস নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন..
সাবিলা : "বাবা তুই?"
রুদ্র : জ্বি আম্মু। তুমি কেমন আছো?
সাবিলা বেগম কিছু বলবেন তবে তার আগে তার চোখ গেল- রুদ্রের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন শহুরে চালচলনের তরুণ-তরুণীর দিকে। সাবিলা বেগম কিছু বলার আগেই হিয়ারা সবাই একসাথে হাসিমুখে তাকে সালাম দিলো,,
"আসসালামু আলাইকুম আন্টি।"
সাবিলা বেগম খুশিমনে সালামের উত্তর দিলেন।
রুদ্রের দিকে তাকাতেই সে বলল,
রুদ্র : "আম্মু, ওরা আমার বন্ধু। ভার্সিটি থেকে এসেছে।"
আর কিছু বলতে হলো না। সাবিলা বেগম এমনিতেই মিশুক স্বভাবের মানুষ। তিনি সোজা এগিয়ে এলেন হিয়া আর মোমোর দিকে। আদরভরা গলায় ওদের দুজনের থুতনিতে হাত রেখে বললেন,
সাবিলা : "মাশাআল্লাহ, মেয়েগুলো তো ভারী মিষ্টি!"
মোমো : মিষ্টি নাকি টক। সেটা তো আপনার ছেলেরা বলবে আন্টি। আপনি বললে তো হবে না।"
কথাটা মোমো ফিসফিস করে বলতেই হিয়া তার হাতে ধাক্কা দিলো। বিষয়টা সাবিলা বেগমের চোখ এড়ালো না। তিনি শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,,
"তুমি কিছু বললে মেয়ে।"
মোমো জিহবাতে কামড় দিয়ে কানের পেছনে চুল গুজতে গুজতে বলল,,
"না মানে বলছিলাম, আপনার শরীর ঠিক আছে তো আন্টি। এতো বড়ো বাড়িতে আপনি একা থাকেন? ভয় লাগে না আপনার?"
সাবিলা বেগম মোমোর চঞ্চলতা বুঝতে পারলেন। তবে তিনি কিছু বলার আগেই রিফাত বলল,,
রিফাত: "খালি মেয়েগুলোকেই দেখলেন আন্টি? আমরা তিনজন কি হ্যান্ডসাম না?"
সাবিলা বেগম হেসে উঠলেন।
সাবিলা : "আজ থেকে তোমরাও আমার ছেলে-মেয়ে রে! জলদি ভেতরে এসো বাবারা। অনেকটুকু জার্নি করে এসেছো।"
তারপর রুদ্রর দিকে তাকিয়ে বললেন,
"আর তোকেও বলি রুদ্র। তুই যে সবাইকে নিয়ে আসবি, আমাকে আগে জানালি না কেন? তাহলে তো সেভাবে আয়োজন করে রাখতাম!”
~
রাত ১১টা। ডিনার সেরে উপরে উঠে এসেছে হিয়া আর মোমো। সাবিলা বেগম এক ঘণ্টার মধ্যেই বেশ ভালো আয়োজন করে ফেলেছেন রান্নার।
হিয়া আর মোমোর জন্য উপরের একটা রুমের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদের পাশের রুমেই থাকবে রাহাদ আর সৌরভ। আর রিফাত থাকবে রুদ্রের সঙ্গে।
বাড়িটা বেশ বড় হলেও, এখানে মানুষ বলতে কেবল রুদ্রের মা সাবিলা বেগম, ছোট ভাই শুভ্র, আর নানী থাকেন। রুদ্রের নানু আবার রাত আটটা বাজলেই ঘুমিয়ে পড়েন।
তাহলে রুদ্রের ছোট ভাই শুভ্র কোথায়?
মনেই মনেই ভাবলো মোমো। হিয়া আর মোমো রুমে ঢুকতেই সাবিলা বেগম এসে ঢুকলেন।
দুজনের কাছেই এসে বসলেন,
সাবিলা : "থাকতে কষ্ট হচ্ছে না তো তোমাদের?"
হিয়া : "না না আন্টি! কী বলেন এসব! একেবারে মায়ের মতো যত্ন করছেন।"
সাবিলা : "মায়ের মতো? তাহলে একটা কাজ করো। মা বানিয়েই নাও আমাকে!"
হিয়া মুচকি হেসে সাবিলা বেগমের হাতটা ধরে রাখলো।
এদিকে মোমোর মাথায় তখন ভেতরে ভেতরে শয়তান ঢুকে গেছে। এই বাড়িতে আসার পর থেকেই শুভ্রকে চোখে পড়েনি তার!
মোমো : "আন্টি, শুভ্র ভাই কোথায়?"
হিয়া বড় বড় চোখ করে তাকালো মোমোর দিকে।
সাবিলা : "তুমি শুভ্রকে চেনো?"
মোমো : "রুদ্র ভাইয়ার কাছে শুনেছিলাম আরকি! তাই জিজ্ঞেস করলাম।" (মোমো থতমত খেলো)
সাবিলা : "ও আজ ওর বন্ধুর বাড়িতে থাকবে। কিসের নাকি গ্রুপ স্টাডি আছে।"
মোমো মনে মনে ভাবলো,
"গ্রুপ স্টাডি না ছাই! নিশ্চয়ই গফের সাথে ইটিশ পিটিশ করতেছে শালারপুত!"
সাবিলা বেগম এরপর স্নেহভরে বললেন,
সাবিলা: "তোমরা শুয়ে পড়ো মা। অনেক রাত হয়েছে। আর জেগে থেকো না। কাল তো আবার ঘুরতে বের হবে!"
বলেই তিনি রুম থেকে বেড়িয়ে গেলেন। হিয়া মোমোর দিকে তাকিয়ে কিটকিট করে হেসে বলল,,
"চু চ্যাড! চু চ্যাড!"
~
সকাল আট'টা- মাথায় হেডফোন আর দু'হাতে ফোন চালাতে চালাতে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে শুভ্র। হঠাৎ কিছু একটার সাথে জোরছে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যেতে নিলো সে। তবে তার আগেই দ্রুত হাতে সিঁড়ির রেলিং ধরে নিলো সে।
অন্যদিকে, মোমো তাকে দেখে মুখটা হা করলো। চোখ দুইটা বড়ো বড়ো করে ডান হাতটা চেয়ালে ঢেকালো। ক্রাশ খাওয়ার মতো করে চোখে প্রেম নিয়ে তাকিয়ে রইলো শুভ্রর দিকে।
শুভ্র বিরক্তিতে চোখ-মুখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,,
"এই মেয়ে কে তুমি? আমাকে এভাবে ধাক্কা দিলে কেন?"
মোমো যেন কোনো একটা ঘোরের মধ্যে আছে। শুভ্রর কথা তার কানে গেলো কিনা কে জানে। সে অপলক তার দিকে তাকিয়েই রইলো। শুভ্র মনেমনে বলল,,
"পাগল-ঠাগল নাকি? আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছে কেন?"
এরপরে মুখে বলল, " এই মেয়ে! কে তুমি? আমাদের বাড়িতে কী করছো?"
শুভ্রর তাড়ায় একটি নড়ে উঠলো মোমো। গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,,
"আমি হলাম এই বাড়ির ছোট ছেলের ফুতুরে বউ!"
শুভ্র কপাল কুঁচকে বলল,, "ওয়াট ফুতুরে বউ মানে?"
হঠাৎ শুভ্রর মাথায় কিছু একটা আসায় সে কন্ঠ টেনে টেনে বলল,,
"ওওওও আচ্ছা! তো তুমিই সেই অসভ্য, বেয়াদব, বদমাশ, ছ্যাচরা মেয়েটা। যে কিনা বর্তমানে আমার ব্লকলিস্টে পড়ে আছে?"
শুভ যে মোমোকে অপমান করলো। মোমো সেটা বুঝলো। কিন্তু, রাগ না করে শুভর মতো কন্ঠ টেনে টেনে বলল,,
"জ্বি! আমিই সেই, সুন্দরী, রূপবতী, মায়াময়ী, শিক্ষিত মেয়ে। যে কি বর্তামানে এই বাড়ির ছোট ছেলের আন্ডারপ্যান্ট ধোঁয়ার দায়িত্ব নিতে এসেছে!"
শুভ্র : "What?! ফাজলামোর জায়গা পাও না, তাই না? এই বাড়ির ছোট ছেলেকে চেনো তুমি? তার আন্তারপ্যান্টে হাত দিতে চাচ্ছো?"
মোমো : "কি যে বলেন জামাই! নিজের স্বামীকে নিজে চিনবো না। এইটা আবার হয় নাকি?
শুভ্র: "কে তোমার স্বামী?"
মোমো: "শুভ্রনীল চৌধুরী।"
শুভ্র : “হাহ! আমি শুভ্রনীল চৌধুরী।”
মোমো না শোনার ভান ধরে বলল,
মোমো : “এ্যা? কে আপনি? সবুজ নীল? এমন নাম তো বাপের জন্মেও দেখিনি।”
শুভ্র : “তোমার বাপের জন্মের সময় তুমি উপস্থিত ছিলে? বাব্বাহ! বাবা আসার আগেই বাবার ডিএনএ পৃথিবীতে…”
মোমো: “তা আপনার কষ্ট করে ভেবে প্যান্ট লুজ করতে হবে না সবুজ নীল মশাই!”
শুভ্র : “এই মেয়ে! ঠিক মতো কথা বলো।”
মোমো: “এই ছেলে.. সরি এই দামড়া বেটা সবুজ নীল বাড়ির বউয়ের সাথে ভালো মতো কথা বলুন।
শুভ্র : “কি চাই? পরিচয় কি? কার সাথে এসেছো তুমি?”
মোমো : “ওসব বাদ দিন তো… বাই দ্য ওয়ে আপনার আর আমার height difference টা কিন্তু দারুণ!"
শুভ্র ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
শুভ্র : "তোমার তো দেখছি নজরে-ও দোষ আছে! কুনজর দিচ্ছ নাকি আমার শরীরের উপর? পেতনীর মতো চুল ছেড়ে কোথায় যাচ্ছ? কে তুমি? পরিচয় দাও, নাহয় নিচে আম্মুকে ডেকে জিজ্ঞেস করি!"
মোমো : "উহু, আর বলবেন না! স্বামী আদর করেছে রাতে। আহাম আহাম! তাই সকাল সকাল গোসল করলাম! আর, কতবার বলবো এ বাড়ির ছোটো ছেলের বউ আমি।"
শুভ্র : "অসভ্য মেয়ে একটা! আম্মু,, আম্মু কোথায় তুমি?"
মোমো : "ওরে আমার সভ্য পুরুষ! সারারাত গফের সঙ্গে ইটিশ-পিটিশ করে এসে এখন আমাকেই অসভ্য বলছেন !"
শুভ্র : "আবার বাজে কথা!”
মোমো : “ এক্কেবারে খাঁটি কথা।”
তখনই সেখানে সাবিলা বেগম আসেন৷
সাবিলা : “শুভ্র, কথা বল৷ তোর ভাইয়ার সাথে এসেছে ওর জুনিয়র রা৷ ও মোমো।”
মোমো তখন বাঁকা হেঁসে শুভ্রর দিকে তাকালো৷ শুভ্রর মনে পরে গেলো কিছুদিন আগে তার ফোনে মেসেজ করা সেই মোমো নাকি এটা?এজন্যই তো এভাবে কথা বলছে শুভ্রর সাথে। শুভ্র বিরক্তিতে বলল,
শুভ্র : “এবার বুঝতে পারলাম আম্মু। খুব ভালো করেই চিনি তোমার এই অতিথি কে আমি৷ তুমিই কথা বলো আম্মু৷ আমার ইচ্ছে নেই। মাথা নষ্ট করে দিলো আমার।”
শুভ্র চলে গেলো উপরে৷ মোমো ভ্রু কুঁচকে বিড়বিড় করে বলল,
মোমো : “এতো বড় সাহস? আমাকে ইগনোর করা? রুপে গুনে কোথা থেকে কম মনে হয় আমাকে? নিজেকে কি ভাবিস তুই?”
সাবিলা : “কিছু মনে করিস না মা! ও একটু এমন ই।”
মোমো (মনে মনে) : “ তোকে যদি আমি বড় একটা বাঁশ না খাইয়েছি! আমার নাম ও মোমো না। দেখে নিস তুই! এমন বাঁশ খাওয়াবো তুই কল্পনাও করতে পারবি না৷”
#চলবে~