ফন্ট সাইজ:
থিম:
সে ছিলো অন্যরকম

৩৮তম পর্ব

লেখক: পুষ্পিতা মেহরীন তিশা

#সে_ছিলো_অন্যরকম

#পুষ্পিতা_মেহরীন_তিশা

#পর্ব- ৩৬ (অন্তিম পর্ব)

প্রতিটা সকালের নির্মল হাওয়া যেন শান্ত প্রকৃতির এক নতুন বার্তা! যা প্রতিটি মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়- রাতের আধার কেবলই ক্ষণস্থায়ী, একবার তাকে কাটিয়ে উঠতে পারলেই আমি হব তোমার নতুনসঙ্গী!

ভোরের এই নির্মল বাতাসের সাথে শোঁ শোঁ শব্দ তুলে ধীর গতিতে এগিয়ে চলেছে রুদ্রদের কালো জিপটা। বাইরের নিস্তব্ধতার সাথে তাল মিলিয়ে গাড়ির ভেতরটাও ডুবে আছে এক অদ্ভুত শান্তিতে। স্টিয়ারিংয়ে বসা রুদ্র যেমন ব্যস্ত স্টিয়ারিং সামলাতে, তেমনি হিয়াও ব্যস্ত আপনমনে জানালার বাইরে প্রকৃতি উপভোগ করতে!

"কিলারহার্ট..!" নামক ছোট্ট একটা মৃদু স্বর হিয়ার কর্ণকুহুর হতেই, সে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে স্বভাবসুলভ সাড়া দিলো—

"হুম…!"

রুদ্র স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে পুনরায় বলল,,

"আফসোস হচ্ছে!"

রুদ্রর এমন কথায় হিয়ার ভ্রু'দুইটা কিছুটা কুঁচকে এলো। একটু নড়েচড়ে বসে সে প্রশ্ন করলো,

"কেন..?"

"শুধু শুধু আমাদের লাইফ থেকে দুইটা বছর মাটি হয়ে গেলো। উইথআউট প্রোপার রিজন, উই সাফার্ড অ্যা লং টাইম!"

"হুহ, তুমি তো এমনভাবে বলছো যেন দুইবছর আগে আমি বললেই তুমি আমাকে বিশ্বাস করে নিতে। নতুন কোনো অপবাদ না দিয়ে সুন্দরভাবে আমার সাথে সংসার করতে!"

"করতেও তো পারতাম! একবার জাস্ট বলে দেখতে। শুরুতে হাঙ্গামা হতো হয়তো, কিন্তু পরে মেনেও তো নিতাম। এই যেমন এখন নিলাম!"

"হাহ, কতো যে মেনে নিতে সে আমার খুব ভালো করেই জানা আছে। দেখা গেলো, তখন নতুন কোনো দোষ দিয়ে আমাকে সোজা বাড়ি থেকেই বের করে দিলে।'

একটু থেমে হিয়া নিচু গলায় যোগ করলো,,

'এমনিতেই, তোমাকে বিয়ে করার জন্য নাটক আমি কম করিনি! তাই, পরে আর কোনো নতুন নাটক বাড়াতেও চায়নি!"

রুদ্র যেন কিছুটা ক্ষিপ্ত হলো। ঠোঁট বাঁকিয়ে একটু ভাব দেখিয়ে বলল,,,

"নাটক কম করোনি মানে? যাচ্ছিলে তো ওই রাবণ আহনাফরে বিয়ে করতে। ভাগ্যিস, সেদিন আমি জোর করে বিয়েটা তোমায় করেছিলাম। নয়তো, এতোদিনে তুমি তার বাচ্চা-কাচ্চা সামলাতে, আর আমি ঘুরতাম মদের বারে বারে..!"

হিয়া মুখ ভেংচিয়ে বলল,,

"হ্যাঁ, ওই আশাতেই ঘুম কামাই করো। যে তুমি জোর করে আমারে বিয়ে করছো! হাহ..!"

"তাইলে, কি তুমি স্বইচ্ছায় নাচতে নাচতে আমারে বিয়ে করছো..?" কথাটা রুদ্র দাঁত চেপে চেপে ব্যঙ্গ সুরেই বলল। চোখ ছোট ছোট করে তাকালো।

অন্যদিকে, তাকে সম্পূর্ণ অবাক করে হিয়া কাঠকাঠ গলায়, সোজা হয়ে বসে জবাব দিলো,, "অবশ্যই!"

রুদ্রর কুঁচকে থাকা চোয়াল'টা যেন মুহুর্তেই ঝুলে এলো। স্টিয়ারিং-এ ঘুরতে থাকা হাত দু'টো হঠাৎ-ই থমকে গেলো। চোখ বড় বড় হয়ে গেলো।

হিয়া একবার তার দিকে তাকিয়ে, তারপর সিটে হেলান দিয়ে বলতে শুরু করলো,,

"আমি তো শুরু থেকেই তোমার সব খোঁজ খবর রাখতাম। কখন কোথায় যাচ্ছো, কি করছো, কি খাচ্ছো সব! যখন দেখলাম, যে তুমি হসপিটাল থেকে ছাড়া পেয়েছো আর মোটামুটি অনেক'টা সুস্থ ও হয়ে গেছো! তখনি আমি বুঝলাম, এবার সময় এসে গেছে তোমার ঘাড়ে উঠে ব্যাঙ লাফ দেওয়ার! আমি জানতাম, এতোকিছুর পর আমাকে ভালোবেসে বিয়ে না করলেও, আমার অনত্র বিয়ে হয়ে যাচ্ছে শুনলে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য হলেও তুমি আমাকে বিয়ে করবে! তাই, আহনাফ ভাইয়ের সাথে মিলে আমি আমার মিথ্যা বিয়ের নাটক সাজালাম, যার অস্কার স্বরুপ আজ আমি তোমার ঘরের বউ!! সুতরাং, অল ক্রেডিট গো'জ টু মি! নট টু ইউ..!" শেষ বাক্যটা বলতে বলতে গর্বের সহিত সিটে মাথা এলিয়ে দিলো হিয়া। ঠোঁটে বিজয়ীর হাসি।

অন্যদিকে, শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়ে রইলো রুদ্র। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে অসহায় ভঙ্গিতে আওড়াল,,

"সবটা মাথার উপর দিয়ে গেলো আমার।" কপাল চুলকে নিলো।

"ওই টুকুই তো পিঁপড়ার মাথা, ভেতরে আর কতো চাপ নিবে কও? থাক, কষ্ট পাইয়ো না। গাড়িটা চালাও!"

হিয়ার কথাটা শেষ হতে না হতেই তেলে-বেগুনে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো রুদ্র। স্টিয়ারিং খামচে ধরে ঝাঁঝাল কন্ঠে সুধাল,

"তাই, বলে ওই আহনাফের সাথে প্লান সাজাবে তুমি? ও না একটা বাস্টার্ড, যদি সত্যি সত্যি কোনো ক্ষতি করতো তোমার??"

"কিচ্ছু করতো না?" হিয়া ভ্রু উঁচিয়ে বলল।

"খুব কনফিডেন্ট না তোমার?"

"ওনি আমাকে সাহায্য করেছে!"

"আমাকে মারতে!"

"তোমাকে বাঁচাতে!"

হিয়ার কথায় রুদ্রর ভ্রু কুঁচকে যেতেই হিয়া পুনরায় ঘাড় নাড়িয়ে আশ্বস্ত করলো।

"হ্যাঁ! সেদিন রাতে যদি আহনাফ ভাই আমাকে পাহারা দিতে না যেতেন, তাহলে চাচ্চু সরি ওই জানোয়ারটা অন্য কাউকে পাঠাতো। যেটা তোমার জন্য আরো ভয়ংকর হতো। তাই, আমি নিজে আহনাফ ভাইকে সেখানে যেতে বলেছিলাম।"

"কিন্তু, তুমি নিজে ডায়েরিতে লিখেছিলে- আহনাফ তোমার চাচ্চুর লোক।" রুদ্র অবিশ্বাসের চোখে তাকালো।

"হ্যাঁ, কারণ আমি তখনো জানতাম না- আহনাফ ভাই চাচ্চুর এসবের ব্যাপারে কিছুই জানে না। কিন্তু, যখন লোকটা এই সবকিছু আমার থেকে জেনেছে, তখন সে নিজেই আমাকে সাহায্য করেছে চাচ্চুকে জেলে দেওয়ার জন্য!"

"ওহ!" বলে রুদ্র কিছুসময় চুপ থাকলো। এরপরে পুনরায় গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করলো,,

"তো ফের, হারামজাদা তো আচ্ছা নিকলা!"

হিয়া কিঞ্চিৎ হাসলো রুদ্রর কথা শুনে। "তুমি তো বললে না। তোমাকে আমার খোঁজ কে দিয়েছে?"

হিয়ার প্রশ্ন শুনে রুদ্র আচমকা বিষম খেলো। কাশতে কাশতে চোখ বড়বড় করে ফেলল। হিয়া দ্রুত তার দিকে পানির বোতল এগিয়ে দিয়ে পুনরায় আবার একই প্রশ্ন করলো।

রুদ্র পানি খেয়ে শান্ত দৃষ্টিতে তার দিকে একবার তাকিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, "বলা যাবে না সিক্রেট!"

হিয়া ব্যঙ্গ হেঁসে বলল, "বলতে হবে না। তুমি না বললেও আমি জানি।"

"জানোই যখন, তখন জিজ্ঞেস কেন করো?"

"ভালো লেগেছি তাই করেছি। কোনো সমস্যা?"

রুদ্র গাড়ি চালাতে চালাতে ভদ্রছেলের মতো এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়লো। অর্থাৎ, 'কোনোই সমস্যা নাই।' অন্যদিকে, হিয়া গাড়ির দরজার ওপর একহাত রেখে, দাঁত কিড়মিড় করে বলল,,

"শালারা সব কয়টা হারামির ছা!"

হিয়ার কথায় রুদ্র হালকা হেঁসে মনে ভাবলো, সেদিনের কথা। সেদিন যখন সব জায়গায় খোঁজা-খোঁজির পর রুদ্র ব্যর্থ হওয়ার পর, রুদ্র হতাশ হয়ে পথ চলছিলো। তখন জয়-ই তাকে কল করে হিয়ার বাসার ঠিকানা বলেছিলো। বিনিময়ে শর্ত ছিলো একটাই,,

"জান গেলেও যেন তার নাম বের না হয়।"

সেদিন জয়ের ভয়ের কথা মনে পড়ায় রুদ্র আরেকবার হাসলো শব্দ করে। এরপরে পূর্ণ মনোযোগ দিলো গাড়ির স্টিয়ারিং-এ।

-

কিছুক্ষণ পিনপতন নীরবতা। তারপরে হিয়া আবার জিজ্ঞেস করলো,,

"আচ্ছা সব তো হলো। কিন্তু, আমরা এখন যাচ্ছিটা কোথায়?"

"বাড়িতে!"

"বাড়িতে? কোন বাড়িতে?"

"কোন বাড়িতে মানে? অবভিয়াসলি আমাদের বাড়িতে!"

"আমাদের বাড়িতে"— কথাটা কানে যেতেই হিয়ার মুখটা নিমিষেই ছোট হয়ে গেলো। চোখের সামনে ভেসে উঠলো ওই বাড়িতে কাটানো তার শেষ দিনটা।

সাবিলা বেগমের তীক্ষ্ণ তিরস্কার আর অপমানের প্রতিটা কথা। কিছু মিথ্যা অভিযোগের রেশ ধরে সবশেষে, বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসা।

এসব কিছু ভাবতে ভাবতেই হিয়ার দু'চোখ পানিতে ভরে এলো। ক্ষণিকের জন্য মনে হলো, সবকিছু এখনো শেষ হয়নি। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করা, নিজের পক্ষে সাফাই দেওয়া, আর সব জখম ভুলে নতুন করে পথ চলার— অনেকটা পথ তার এখনো বাকি।

ভাবনার মাঝেই একটা বড় করে শ্বাস নিলো হিয়া। নিজেকে আশ্বস্ত করলো এইটা বলে, "আল্লাহ যা করে ভালোর জন্যই করে। যা হবে দেখা যাবে।"

--

প্রায় দুপুর নাগাদ বাড়িতে পৌঁছালো রুদ্র-হিয়া। বাড়িতে তখন পিনপতন নীরবতা। সদর দরজা খোলা থাকলেও ভেতরে সব ফাঁকা। কোথাও কেউ নেই। হয়তো সবাই যে যার রুমে বিশ্রাম নিচ্ছে।

এত সময় সাহস সঞ্চয় করে পথ পাড়ি দেওয়া হিয়ার পা দুটো চৌকাঠ বরাবর আসতেই সহসা থমকে গেল। বুকের ভেতর ঢিপঢিপ শব্দটা কানে বাজছে। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। সব সাহস হাওয়ায় উড়ে গিয়ে বুকের ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে উঠল।

হিয়ার অস্বস্তি বুঝতে পেরে রুদ্র পাশ থেকে এক পা এগিয়ে এসে তার হাতটা শক্ত করে ধরল। আঙুলের ফাঁকে আঙুল গলিয়ে দিল। হিয়া ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাতেই রুদ্র ঠোঁটের কোণে ভরসার হাসি রেখে আশ্বস্ত গলায় বলল,,

"ভেতরে চলো।"

অশান্ত হিয়া একটা ঢোক গিলল। গলা দিয়ে নামল না। পরপর ছোট্ট করে মাথা নাড়াল। রুদ্রর হাতটা খামচে ধরে সে চৌধুরী ভিলার চৌকাঠ পেরোল। কিছুদূর হেঁটে সে যখনই দোতলার সিঁড়িতে পা রাখবে- ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এলো সাবিলা বেগমের গম্ভীর গলা,,

"দাঁড়াও.."।

শব্দটা কানে যেতেই হিয়ার হৃদপিণ্ডটা ধক করে উঠল। যেন সহসাই শুকিয়ে গেল। অপমানিত হওয়ার ভয়েই হোক বা সওয়াল-জবাবের মুখোমুখি হওয়ার ভয়ে- হিয়ার গলা ক্রমশই শুকাতে লাগল। কপালের ওপর বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করল। পা দুটো মেঝের সাথে আটকে গেল।

হিয়া ধীরে ধীরে ভয়ার্ত চোখে রুদ্রর দিকে তাকাল। দেখল রুদ্রও তার দিকেই তাকিয়ে আছে। রুদ্র তার বাম হাতের ভেতরে থাকা হিয়ার ছোট্ট হাতটা আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরল। একবার চোখ দিয়ে "ভয় নেই" বুঝিয়ে সে পেছন ফিরতে বলল।

তবে যতক্ষণে হিয়া পেছন ফিরতে নিলো, ততক্ষণে সাবিলা বেগম তার একেবারেই নিকটে এসে দাঁড়ালেন। আর হিয়া ঘুরে দাঁড়াতেই তিনি এক মুহূর্তও দেরি না করে অকপটে হিয়াকে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরলেন। দুই হাতে পিঠ জড়িয়ে ধরলেন।

সাবিলা বেগমের হঠাৎ এমন কাজে হিয়া প্রথমে কেঁপে উঠল। দুই হাত অসাড়ের মতো দুপাশে ঝুলে রইল। চোখ বড় বড় হয়ে গেল। সে কোনোকিছু বুঝে ওঠার আগেই, সাবিলা বেগম তাকে বুকে নিয়ে কান্নাভেজা গলায় মোমোর উদ্দেশ্য বলল,,

"তাড়াতাড়ি মিষ্টি নিয়ে আয় মোমো। আমার বড় মেয়ে যে বহুদিন পর বাড়ি ফিরলো।"

হিয়ার বিস্ময় যেন আরেক দফা বাড়ল। কয়েক সেকেন্ড পর তার শক্ত হয়ে থাকা শরীরটা ধীরে ধীরে নরম হলো। নাকের কাছে মায়ের চেনা গন্ধ। চোখের কোণ চিকচিক করে উঠল। সে কাঁপা কাঁপা, নিষ্প্রাণ গলায় সাবিলা বেগমকে ডাকল,, "মা!"

হিয়ার ডাকে সাবিলা বেগম তাকে ছেড়ে দিলেন। পরপরই দুই হাতে হিয়ার বাহু ধরে মুখের দিকে তাকিয়ে আদুরে গলায় বলল,,

"এই কয়দিনে কতোটা শুকিয়ে গেছিস। চেহারার লাবণ্য তো একেবারেই হারিয়ে ফেলেছিস। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করিসনি নাকি? চেহারার এ কি হাল করে রেখেছিস?"

হিয়া শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। ঠোঁট কাঁপছে কিন্তু কথা বের হচ্ছে না। আগের মতোই নিষ্প্রাণ গলায় আওড়াল,,

"মা.. আপনি...!"

এরই মাঝে মোমো সেখানে মিষ্টি নিয়ে আসলো। হিয়া ঘোলাটে চোখে তাকালো তার দিকে, মোমোর মুখে সেই চিরচেনা আনন্দের হাসি। সাবিলা বেগম মোমোর থেকে একটা মিষ্টি নিয়ে, সেটা হিয়ার মুখের সামনে ধরতে ধরতে বলল,,

"কিচ্ছু বলতে হবে না আমাকে। আমি সব জানি। তুই আগে মিষ্টি মুখ কর তো দেখি।"

হিয়া যন্ত্রের মতো হা করল। বাধ্য মেয়ের মতো মিষ্টিটা মুখে নিতে নিতে আড়চোখে রুদ্রর দিকে তাকাতেই দেখল, রুদ্র দেয়ালে হেলান দিয়ে ঠোঁট কামড়ে শয়তানি হাসি হাসছে। দুজনের চোখাচোখি হতেই রুদ্র বাম চোখটা টিপ দিলো তাকে।

হিয়ার আর বুঝতে বাকি রইলো না, রুদ্র আগেই সবাইকে সব বলে ফেলেছে। যার দরুণ তার এতো সময়ের ভয় ভালোবাসায় রুপ নিয়েছে। বুকের ভেতরের পাথরটা নেমে গেল। আচমকা হিয়ার ঠোঁটেও খেলে গেলো এক অদ্ভুত তৃপ্তির হাসি।

সেটা খেয়াল করতেই রুদ্র কোমরে হাত দিয়ে বলল,, "মিষ্টি কি শুধু মেয়েকেই খাওয়াবে? অভুক্ত ছেলেটাকে কি চোখে দেখো না??"

"ফ্রিজ ভর্তি মিষ্টি রাখা আছে, গিয়ে যতো খুশি খা। কেউ মানা করবে না।"

মায়ের কথায় রুদ্র চোখ কুঁচকে তাকাতেই পাশ থেকে শুভ্র দুই হাত ছড়িয়ে বলল,,

"বুঝলে ভাইয়া, তুমি আর আমি হচ্ছি পরগাছা। ফ্রিজের মিষ্টি ছাড়া মায়ের হাতের মিষ্টি আমাদের কপালেই জুটে না।"

সাবিলা বেগম শুভ্রের কথায় উত্তর করলো না। বরং, হিয়ার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে মোমোকে নিয়ে এগিয়ে গেলো তার রুমের দিকে। যাওয়ার আগে একবার পেছন ফিরে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় "ধন্যবাদ" জানালেন।

আজ তার হিয়ার সাথে কত কথা বাকি..! নিজের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাওয়া বাকি। এতোদিন তাকে ছাড়া শূন্য বাড়ির কাহিনি বলা বাকি। সেগুলো শেষ করতে হবে না??

---

রাত প্রায় আটটা নাগাদ হিয়া প্রবেশ করলো তার রুমে। রুদ্র তখন ব্যালকনিতে ফোনহাতে দাঁড়িয়ে।

হিয়া এসেই কোনোরকম পূর্বাভাস ছাড়াই, চার হাত-পা চারদিকে ছড়িয়ে ধপাস করে শুয়ে পড়লো বিছানার ওপরে। ভারী একটা শব্দ হলো।

হঠাৎ আওয়াজে রুদ্র চমকে ফিরে তাকালো। রুমে হিয়াকে ওভাবে দেখে সে ফোন রেখে দ্রুত এগিয়ে এলো। সে কাছে আসতেই হিয়া বাচ্চাদের মতো হাত-পা ছড়িয়ে লাফিয়ে উঠলো। চোখ বন্ধ করে একটা লম্বা, মুক্তির শ্বাস নিজের ভেতরে টেনে নিয়ে বলে উঠলো,, "শান্তিহ!!!"

রুদ্র ডেস্কের ওপরে তার ফোনটা রেখে আচমকা গিয়ে শুয়ে পড়লো হিয়ার পাশে। হিয়ার মতো করেই, মাথার নিচে দু'হাত রেখে সিলিং-এর দিকে তাকালো সে।

ক্ষণবাদে হিয়া অত্যন্ত প্রশান্ত গলায় বলতে শুরু করলো,, "জানো রুদ্র.. আজ আমার নিজেকে অনেক হালকা লাগছে। মনের মধ্যে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ডানা মেলছে। এমন মনে হচ্ছে, যেন অনেক বড় কোনো পাথর সেখান থেকে সরে গেছে। ভেতরের প্রজাপতি গুলো ভীষণভাবে ডানা ঝাপটাচ্ছে। বিশ্বাস করো আমার লাইফে এমন অদ্ভুত প্রশান্তি আমি আগে কখনো অনুভব করিনি৷ মনে হচ্ছে এই পৃথিবীর সবথেকে সুখী আর হালকা ব্যক্তি আমি৷ ইস, যদি আমি তোমাকে আমার ভেতরটা দেখাতে পারতাম- যে সেখানে ঠিক কতোটা প্রশান্তি এখন ছেয়ে আছে..."

প্রফুল্ল গলায় এভাবে একের পর এক বাক্য দিয়ে হিয়া তুলে ধরছে তার শান্ত হৃদয়ের অনুভূতিকে। অন্যদিকে, আধশোয়া হয়ে হাতের ওপর মাথা রেখে নিষ্পলক চোখে রুদ্র তাকে দেখে চলেছে। হিয়ার প্রতিটা কথা, প্রতিটা নিঃশ্বাসে সে নতুন করে প্রেমে পড়ছে। হিয়ার কথার মাঝে রুদ্রর ঠোঁটেও এক মিষ্টি হাসির রেখা ফুটে উঠছে।

হঠাৎ সেই হাসির মাঝেই রুদ্র কখন যে বিমোহিত হয়ে হিয়ার ঠোঁটে ঠোঁট রাখলো, তা হয়তো সে নিজেও অনুভব করতে পারলো না। আচমকা এমন কান্ডে হিয়ার কথা বন্ধ হয়ে গেল। চোখ দুটো আপনা-আপনি খিঁচে এলো।

ক্ষণসেকেন্ড বাদে রুদ্র তার ঠোঁট ছেড়ে মুখ নিয়ে গেলো হিয়ার কানের খুব কাছে। গরম নিঃশ্বাস ফেলে ছোট্ট দু'টো শব্দ সেখানে খুব ফিসফিসিয়ে আওড়ালো।

"ভালোবাসি কিলারহার্ট!"

---

এক বছর পর....

Bashundhara Convention Center জুড়ে আজ এলাহি আয়োজন। আহনাফ মির্জা আর লারা রোজারিও-র রিসিপশন উপলক্ষে সেন্টার জুড়ে বিশাল আয়োজন। মাত্র তিন মাসের পরিচয়ে আজ তাদের বিয়ে, অথচ জাঁকজমকপূর্ণতা দেখলে যে কেউ মনে করবে বহুল প্রতীক্ষিত প্রেমের পূর্ণতা। কোথাও কোনো ত্রুটি নেই, আছে কেবল পূর্ণতা।

"এই ক্যামেরাম্যান! ক্যামেরা'টা এদিকে ঘুরাও। মাঝবয়সী নতুন বরের সাথে আমার দু'টো ছবি তুলে দাও। ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। বাচ্চা-কাচ্চা হলে দেখাতে হবে, তাদের বাবা বিয়ের সময় কতো ক'চি ছিলো যে।"*

বরচেয়ারে বসা আহনাফের পাশে দাঁড়িয়ে একজন ফটোগ্রাফারের উদ্দেশ্যে কথাটা বলল রুদ্র। হাত দুটো ভাঁজ করে দুষ্টু হাসি ঝুলছে ঠোঁটে।

তার কথা শুনে আহনাফ ঘাড় ঘুরিয়ে চোয়াল ঝুলিয়ে ফেলল। দুঃখী দুঃখী মুখ করে বলল,, "আমাকে অপমান করলে রুদ্র??"

আহনাফের কথায় চটজলদি জিহ্বায় কামড় দিলো রুদ্র। দুই কানে হাত দিয়ে তড়িঘড়ি করে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,, "ছি, ছি আহনাফ ভাই এসব কথা বলতে নাই। আমি যে তোমায় অপমান করবো সেই সাহস কি আমার আছে বলো? তোমার বউ জানতে পারলে, আমায় কি রাখবে আস্ত? গর্দান কেটে সে কাবাডি খেলবে না বলো??"

আহনাফ মুখ মলিন করে বলল, *"আমি কি সত্যিই বুড়ো হয়ে গেছি ব্রো?"

"কে বলল তুমি বুড়ো? তুমি তো..." রুদ্র কথা শেষ করার আগেই শুভ্র পাশ থেকে কাঁধে হাত রেখে বলল,,

"মানুষের গড় আয়ু ৬০-৭০+, সেখানে তোমার মাত্র ৩৭+ তাহলে, ৩৩+ এখনো বাকি না কাকা বলো??"

শুভ্রর কথায় আহনাফ আরও হতাশ হলো। কই সে নিজের বয়স কমিয়ে একটু প্রশংসা শুনতে চাইলো, তা না শুভ্র তাকে ডিরেক্ট কাকা বলে দিলো??

---

ড্রেসিং রুমে লার সাজ এলোমেলো হওয়ায় তা ঠিক করে দিচ্ছিলো হিয়া আর মোমো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করতে একসময় হিয়া বলল,,,

"আমাদের সবার মধ্যে থেকেই এই দুই টুনা আর টুনি কবে যে প্রেমে মজলো, আমরা কেউ টেরই পেলাম না বল মোমো?"

"হ, একদিন সকালে উঠলাম, আর হুট করে শুনলাম- লারা আপার বিয়ে। পাত্র কে তা খুঁজতে গিয়ে দেখতে পেলাম মির্জা বাঈকে।" মোমো লিপস্টিক এগিয়ে দিতে দিতে বলল।

তাদের এসকল ঠাট্টার মধ্যে লারা নোলক লাগাতে লাগাতে বলল,, "প্রেমে আর কই মজলাম বলো। তোমাদের বাড়ির অনুষ্ঠানেই তো আমাদের পরিচয় হলো।"

মোমো মুখ টিপে হেঁসে বলল, "আমাদের সে কাদের লারা'পা?"

লারা কোনো উত্তর দেওয়ার আগেই হঠাৎ হিয়ার মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠলো। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো। দাঁড়িয়ে থাকা স্থান থেকে সে কয়েকপা টলে পিছিয়ে গেলো। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম।

মোমো দৌড়ে এসে হাত ধরে ফেলল। হতদন্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলো, "এই হিয়া, কি হয়েছে তোর? এভাবে ঘামছিস কেন? তোর কি শরীর খারাপ লাগছে?"

হিয়া কোনো উত্তর দিতে পারলো না। মুখে হাত চাপা দিয়ে সে মোমোকে ছাড়িয়ে দৌড় লাগালো ওয়াশরুমের দিকে। কয়েক দফা ব'মি করার পর হিয়া তার ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিলো মোমোর কাঁধের ওপরে।

---

বিছানায় আধশোয়া হয়ে থাকা হিয়াকে কিছুসময় আগে ডাক্তার এসে পরীক্ষা করে গেলো। আর যাওয়ার আগে হেসে জানিয়ে গেলো, 'তাদের বাড়িতে নতুন অতিথি আসতে চলেছে!' অর্থাৎ, রুদ্র-হিয়া বাবা-মা হতে চলেছে।

কথাটা শোনার পর রুদ্র আর হিয়ার খুশিতে যে কি অবস্থা হয়েছিলো তা বলে বোঝানো যাবে না। 'ইয়া হুররেএ আমি বাবা হব' বলে রুদ্র তো একপ্রকার সবার সামনেই নাচতে শুরু করেছিলো।

আর হিয়া? সে তো 'আলহামদুলিল্লাহ!' বলে খুশিতে কান্নাই করে দিয়েছিলো। সাবিলা বেগম, শুভ্র, মোমোও ভীষণ খুশি হয়েছিলো। পরিবারের সবার আনন্দ আর উল্লাস দেখে ছোট্ট অভ্রও আদোআদো গলায় বলে দিলো।

"বাই আচবে বাই। চোত্তো চোত্তো বাই!"

কিছুসময় বাদে সবাই চলে যেতেই হিয়া রুদ্রকে কাছে ডাকলো। রুদ্র তার পাশে বসতেই হিয়া তার হাত দু'টো নিজের দুই হাতে জড়িয়ে ধরে শীতল গলায় বলল,, "কিছু বলতে চাও??"

মুখে এক তৃপ্তির হাসি নিয়ে, রুদ্র খুব ধীরে পলক ফেলল।

হিয়া আবার বলল, "তাহলে বলো!"

রুদ্র বেশ সময় নিয়ে তার মাথাটা নিয়ে গেলো হিয়ার কানের কাছে। গরম নিঃশ্বাস ফেলে তারপর খুব আস্তে করে বলল,,

"সিদরাতুল মুনতাহা রুহি!"

রুদ্র মুখ সরিয়ে আনতেই হিয়া ফিচেল হেঁসে বলল,, "কিন্তু যদি ছেলে হয়?"

রুদ্র খুব ধীরে জবাব দিলো,, "হবে না।"

"হতেও তো পারে।"

"কখনোই না।"

"এতো কনফিডেন্ট কিভাবে?"

রুদ্র হঠাৎ হিয়ার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো। পেটের কাছে মুখ গুঁজে হিয়ার কোমর জড়িয়ে বলল,, "বাবা হব যে!"

হিয়া হতাশ হয়ে মাথাটা এলিয়ে দিলো খাটের ওপর। "কিন্তু, আমি চাই আমাদের একটা ছেলে হোক। যাকে আমি সব সময় ড্যাশিং ডলের মতো সাজিয়ে রাখবো।"

রুদ্র যেন কিছুটা অবাক হলো। কপাল কুঁচকে তাজ্জব গলায় সে বলল,,

"আমাদের এতো এতো ছেলের মাঝেও তোমার আবার ছেলে চাই? আজব মহিলা তো তুমি।"

হিয়া কিছু না বলে মুখ গোমড়া করলো। ঠোঁট ফুলিয়ে অন্যদিকে তাকালো। যেটা দেখে রুদ্র আবার বলল,,

"তাহলে, আমি চাই আমাদের টুইন্স বেবি হোক।"

"শুভ্র-মোমোর অবস্থা দেখেছো? এক অভ্রকে নিয়েই ওদের ওই অবস্থা। আর দু'টো হলে আমাকে তো হারিকেন দিয়েও খুঁজে পাবে না।"

"চিন্তা করো না। তুমি হারিয়ে গেলে, আমি তোমাকে খুঁজব না।"

"খুঁজবে না কেন?"

"কারণ, বাচ্চাদের জন্য নতুন মা আনব!"

দুষ্টু হেঁসে চোখ টিপ দিয়ে রুদ্র কথাটা বলতেই হিয়া এক ঝটকায় তাকে কোল থেকে নামিয়ে দিলো। মুখ গোমড়া করে রইলো।

হিয়ার এমন ছেলেমানুষি দেখে রুদ্র কিছু সময় মুখ টিপে হাসলো। তারপর খুব সন্তর্পণে হিয়ার চোয়ালে হাত রেখে মুখটা নিজের দিকে ফেরালো। কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলল,,

"পুনর্জন্ম আর হবে না, তাই এই জীবনের এক সেকেন্ডের জন্যও আমি তোমাকে হারাতে দিবো না। খোঁজ তো অনেক পরের বিষয়, প্রতিটা ন্যানো সেকেন্ড আমি তোমাকে আমার সামনেই চাই!"

কথা শেষ করে সময় নিয়ে রুদ্র একটা ছোট্ট চুমু খেলো হিয়ার কপালে। আর তাতেই হিয়ার মুখে ফুটে উঠলো এক তৃপ্তিময় প্রেমের হাসি!

#সমাপ্তি...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন