#সে_ছিলো_অন্যরকম🤍
#পুষ্পিতা_মেহরীন_তিশা
#পর্ব- ৩৫
পরেরদিন সকালে খুব ভোর ভোর থাকতে, রুদ্র বেরিয়ে পড়লো হিয়ার উদ্দেশ্য। যদিও সে জানে না- হিয়া আসলেই সৌরভ বা জয় এদের কারো বাসায় আছে কিনা। তবে, এই মুহূর্তে এই দু'জন-ই তার শেষ আশা। বাকি সব জায়গায় সে হিয়াকে খুঁজে ফেলেছে এতোদিনে।
তবে, এই ব্যস্ততম ঢাকা শহরে বিভিন্ন অলি-গলির ভেতরে- সৌরভ আর জয়ের বাসা খুঁজে বের করতে করতে রুদ্রর প্রায় দুপুর গড়িয়ে গেলো! আর এতো কষ্টের পরও যখন ফলাফল শূন্য বের হলো! অর্থাৎ- সৌরভ বা জয় কেউ-ই হিয়ার কোনো সন্ধান দিতে পারলো না। তখন যেন রুদ্র'র দম'টাই আটকে আসতে লাগলো।
সব খোঁজা-খুঁজির শেষে- দুপুর প্রায় তিন টার দিকে রুদ্র এলোমেলো পায়ে রাস্তা বেয়ে হাঁটতে লাগলো। এই সময়ে নিজেকে দোষারোপ করা আর আঘাত করা ছাড়া আর কোনোকিছুই রুদ্র'র মাথায় আসছে না। বুঝতে পারছে না, তার ঠিক কি করা উচিত এই মুহুর্তে। তার চারপাশ'টা বড্ড শূন্য শূন্য লাগছে তার কাছে।
চলতি পথে একটা গাছের নিচে, হঠাৎ ধপাস করে বসে পড়লো রুদ্র। কাল রাত থেকে কিছু না খাওয়ায়, হুট করে মাথার ভেতরে চক্কর দিয়ে উঠেছে তার। সারাদিনের ক্লান্তিতে রুদ্র মাথাটা এলিয়ে দিলো গাছের সাথে। কিছু সময়ের মধ্যে তার চোখটা লেগে আসতেই, হঠাৎ তার মুঠোফোন'টা উঠলো বেজে।
রুদ্র কোনোভাবে এলোমেলো হাতে তার ফোনটা ধরে 'হ্যালো' বলতেই- ওপাশ থেকে কেউ একজন গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,,
"তুমি হিয়াকে খুঁজছো তো- মিস্টার রুদ্রনীল চৌধুরী! আমি জানি হিয়া কোথায় আছে!"
ব্যাস! এই কথাটুকু শুনতেই যেন রুদ্রর সারাদিনের ক্লান্তি একছুটে পালালো। সে তড়িঘড়ি করে উঠে বসে, তাড়াহুড়োর সাথে জিজ্ঞেস করলো,,
"তুমি.. তুমি সত্যি জানো আমার হিয়া কোথায় আছে? তুমি আমাকে ওর ঠিকানা'টা দিবে প্লিজ! বিনিময়ে তুমি আমার কাছে, যা চাইবে আমি তোমােকে তাই দিবো!"
"আমি তোমাকে হিয়ার ঠিকানা দিবো! কিন্তু, আমার একটা শর্ত আছে।"
রুদ্রর মুখটা যেন মুহুর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। সে কিছুটা চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করলো,,
"কী শর্ত??"
-
ঢাকা শহরটা যেমন বিশাল, ঠিক তেমনি এই শহরে টিকে থাকার সংগ্রাম'টাও বিশাল। এই শহর যেমন মানুষকে স্বপ্ন দেখাতে জানে, তেমন আশ্রয়হীন মানুষের থেকে স্বপ্ন কেড়ে নিতেও জানে। এখানে বেঁচে থাকতে হলে মানুষকে সময়ের চেয়েও কঠিন হতে হয়— কখনো নিজের অনুভূতিকে লুকিয়ে, আবার কখনো চোখের জলকে আটকিয়ে!
রুদ্র নামক আশ্রয়টা কে ছেড়ে আসার পর, হিয়াও এই শহররের এমন নিয়মকে সাদরে গ্রহণ করে নিয়েছে। এখন তার জীবন'টা শুধু কাজ আর দায়িত্বের মাঝেই সীমাবদ্ধ। রোজ, সকাল ৮টায় কর্মস্থলে পৌঁছানো এবং রাত ৮টায় ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাসায় ফেরাটাই— যেন এখন তার নিত্যদিনের রুটিন! যার ব্যতিক্রম ঘটেনি আজও!
-
রাত প্রায় সাড়ে ৮টা নাগাদ- হিয়া মলের ডিউটি শেষ করে বাসায় ফিরলো। তবে, দরজার লক খুলে ভেতরে ঢুলতেই তার সারা শরীর কেমন জানি ঝাঁকি দিয়ে উঠলো। পুরো বাসাটা একেবারে অন্ধকারে ছেঁয়ে আছে। হিয়া কোনোরকমে হাতড়ে বাসার লাইটগুলো অন করলো। বাসাটা এবার তার কাছে কিছুটা স্বাভাবিক লাগলেও, অস্থিরতা যেন ঠিক কেটে উঠলো না।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে- হিয়া কাঁধের ব্যাগটা ঝুঁলিয়ে দিলো আলনাতে। এরপরে একটা তোয়ালে নিয়ে পা বাড়ালো বাথরুমের দিকে। কিন্তু, দু'পা বাড়াতেই সে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো। মেরুদণ্ড দিয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেলো তার। মনে হলো, কেউ একজন বসে আছে বেডের উপরে! অস্ফুটে হিয়ার গলা দিয়ে বেরিয়ে আসলো,,
"রুদ্র'হ!"
সন্দেহটা সত্য কিনা, সেটা দেখার জন্য যখন সে পুনরায় ঘাড় ঘুরালো। ততক্ষণে রুদ্র তার একদম পেছনে এসে দাঁড়ালো। হঠাৎ, এই সময়ে রুদ্রকে এভাবে, এখানে দেখায় বেশ কিছুটা ঘাবড়ে গেলো হিয়া। তার কাছে মনে হলো, যেন তার হাত-পা ক্রমশ অবশ হয়ে আসছে। কাঁপা গলায় একবার জিজ্ঞেস করলো সে!
"রুদ্র! তুমি। এখানে..কিভাবে.."
রুদ্রর চোখ দুটো লাল। যেন অনেকক্ষণ ধরে না ঘুমানো ক্লান্তি আর অপরাধবোধ সেখানে জমে আছে। একটু বাদে রুদ্র নিচু, আর ভাঙা গলায় উত্তর দিলো,,
"আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছি!"
"ক্ষমা.? কিসের ক্ষমা?"
হঠাৎ রুদ্র হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো, হিয়ার পায়ের কাছে। আর মুহুর্তেই দু'হাতে জড়িয়ে নিলো হিয়ার দু'পা কে। রুদ্রর এমন কাজে আচমকা কেঁপে উঠলো হিয়া। ভেঙে যাওয়া রুদ্র কান্নাজড়িত কন্ঠে বলল,,
"আমি অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি হিয়া। অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি আমি। সত্যটা না জেনে, না বুঝে.. আমি দিনের পর দিন তোমাকে দোষ দিয়ে গেছি! অথচ, কখনো তোমার থেকে সত্যটা জানার চেষ্টা করিনি!তোমাকে বোঝার চেষ্টা করিনি! ভেতরে ভেতরে তুমি ভেঙে যাচ্ছিলে, কিন্তু তোমার সেই ভাঙন আমি দেখতে পারিনি!"
রুদ্রর এমন আচরণে হিয়া যেমন অবাক হচ্ছিলো, তেমনি রুদ্রর কান্নায় তার ভেতর টাও পুড়ছিলো। একই সাথে রুদ্রর কথাগুলোও তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছিলো। একটা সময়, সে রুদ্রকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে কিছুটা দূরে সরে দাঁড়ালো। আমতা আমতা গলায় রুদ্রকে জিজ্ঞেস করলো ,,
"এ..এসব তুমি কি বলছো রুদ্র? কোন ভুলের কথা বলছো তুমি? তুমি তো কোনো ভুল করোনি! উল্টো আমি তোমার সাথে অন্যায় করেছি। তুমি কি ভুলে গেছো- আমি তোমার সাথে ঠিক কি কি অন্যায় করেছি!"
"কোনো অন্যায় করোনি!" বেশ শক্ত গলায় কথাটা বলল রুদ্র। এরপরে, হিয়ার কাছে এগিয়ে গিয়ে পুনরায় বলল,,
"আমার সাথে কোনো অন্যায় তুমি করোনি। সবটা না জেনে, না বুঝে উল্টো আমি-ই তোমার সাথে দিনের পর দিন অন্যায় করে গেছি! আর তুমি চুপচাপ আমার সব অন্যায় সহ্য করে গেছো! আমার রাগ, আমার অবিশ্বাস, আমার শাস্তি… সব। অথচ, একটা বারের জন্যও আমাকে সত্যটা বলার চেষ্টা পর্যন্ত করোনি!"
রুদ্রর কথায় হিয়া বেশ আশ্চর্য হলো। সে কিছুতেই বুঝতে পারলো না, রুদ্র কোন সত্যের কথা বলছে। কোন সত্য সে জেনেছে!
"কোন সত্যের কথা বলছো তুমি? কি সত্য জেনেছো তুমি?"
রুদ্র তাচ্ছিল্যের হাসিতে কিঞ্চিৎ ঠোঁট প্রসারিত করে বলল,,
"আমি তোমার ডায়েরিটা পড়েছি হিয়া!"
কথাটা শোনা মাত্রই বিস্ময়ে হিয়ার চোখ দুইটা হয়ে গেলো। কিছুটা পিছিয়ে একটা টেবিলে গিয়ে ঘেঁষল সে। তার হার্ট এতো দ্রুত বিট হতে শুরু করলো, যেন বাইরে থেকেও তার আওয়াজ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিলো।
তাকে এতোটা ঘাবড়াতে দেখে, রুদ্র এগিয়ে গেলো তার কাছে। হিয়ার দুইটা হাতকে নিজের দু'হাতের মাঝে নিলো। জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে অনুতপ্ত গলায় বলল,,
"এই দুইটা বছরে- আমি তোমার সাথে কতো খারাপ আচরণ করেছি, তোমাকে কতো কষ্ট দিয়েছি। এরপরেও তুমি আমাকে কেন বলোনি হিয়া, যে তুমি ওইসব কিছু করোই-নি যা কিছুর জন্য আমি তোমাকে দিনের পর দিন শাস্তি দিয়েছি। কেন বলোনি, যে তুমি আমাকে কখনোই মারতে চাওনি, তুমি আমার কোনো বাচ্চাকে হ*ত্যা করোনি। পরিস্থিতির চাপে পড়ে, তুমি এসব কিছু করতে বাধ্য হয়েছো। ভেতরে ভেতরে তুমি আমার থেকেও হাজার গুণ বেশি কষ্ট বয়ে বেরিয়েছো। কেন একবারের জন্যও এসব কিছু বলোনি আমাকে!"
হিয়ার চোখে তখন পানি টলমল করছিলো। ঠোঁট দুইটা অনবরত কাঁপছিলো, কিন্তু মুখ দিয়ে শব্দ বের হচ্ছিলো না। যেন সে খুব করে তার কান্না আটকানোর চেষ্টা চালাচ্ছে!
হঠাৎ-ই সে খুব আস্তে বলল উঠলো,, "কারণ… তুমি শুনতে চাওনি! রুদ্র।"
হিয়ার কথায় রুদ্র যেন একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেলো। কিছুক্ষণ থেমে হিয়া কাঁপা কাঁপা গলায় আরো যোগ করলল,,
"আমি চেষ্টা করেছিলাম রুদ্র! একবার না বহুবার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু, প্রতিবারই আমি তোমার চোখে আমার প্রতি ঘৃণা দেখেছি… অবিশ্বাস দেখেছি.. অবহেলা দেখেছি..! প্রতিটা দিন, প্রতিটা মুহুর্ত আমি নিজেকে দোষ দিয়েছি। এইভেবে, যে হয়তো সত্যিই সব দোষ আমার ছিলো। যখন তুমি আমাকে ইগনোর করেছো, অপমান করেছো, তাচ্ছিল্য করেছো- আমি তখনও তোমার পক্ষেই দাঁড়িয়েছি! কারণ আমি জানতাম— তুমি কষ্ট পেয়েছো!"
ব্যাস! এতোটুকু বলে থামলো হিয়া। নিজেকে আর আটকাতে পারলো না। হঠাৎ হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো সে। তার কাঁধ কাঁপছে। আঙুলগুলো শক্ত হয়ে আসছে! নিজেকে শক্ত রাখার এই লড়াইয়ে অবশেষে, সে হার মেনেছে!'
হিয়াকে এভাবে কাঁদতে দেখে, রুদ্ররও খুব কষ্ট হচ্ছিলো। বেশকিছু সময় ইতস্তত করার পর- রুদ্র খুব সাবধানে হিয়াকে নিজের বুকে টেনে নিলো! তবে, সেই মুহূর্তেও নিজেকে বেশ শক্ত করে রাখলো হিয়া।যেন নিজেকে সামলে রাখার শেষ চেষ্টা।
কিন্তু, কয়েক সেকেন্ড পর ধীরে ধীরে তার হাত দুটো উঠে এলো, রুদ্রর পিঠে। একটা সময় সে খুব শক্ত করে, রুদ্রর শার্ট'টা আঁকড়ে ধরলো। সেই মুহুর্তে তার কান্নার মাত্রও অনেকটা বেড়ে গেলো। মাঝখানে শুধু একবার সে আওড়াল,,
"আমি খুব ক্লান্ত, রুদ্র… খুব ক্লান্ত আমি..!"
-
বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর....
হিয়ার কান্না ততোক্ষণে থেমে গেছে। নির্জন ঘন রুমটাতে কেবল রুদ্র-হিয়ার নিশ্বাসটুকুই যা একটু শব্দের সৃষ্টি করছে। তবে মাঝেমাঝে সেই শব্দের সাথে যোগ হচ্ছে- হিয়ার নাক টানার শব্দটা। অতিরিক্ত কান্নার ফলে মেয়েটার সর্দি এসে গেছে। সাথে মাথাব্যাথা তো আছেই।
রুদ্রর বুকে মাথা রেখে এখনো ফুপাচ্ছে সে। অন্যদিকে, রুদ্র পরশ আবেশে তার মাথায় হাত বুলিয়ে চলেছে! পিনপতন নীরবতা কাটিয়ে, হালকা গলা খাকাড়ি দিয়ে রুদ্র যত্নসহকারে বলল,,
"আমার সাথে তোমার বাড়িতে ফিরে চলো, আমার কিলার-হার্ট। তোমাকে ছাড়া বাড়িটা শূন্য শূন্য লাগছে! আমার কষ্ট হচ্ছে তোমাকে ছাড়া থাকতে। তুমি ছাড়া আমি ভালো নেই। একটুও....'
রুদ্র পুরো কথাটা শেষ করতো, কিন্তু তার আগেই রুদ্রর পেটে ছোঁচা দৌড়াদৌড়ি শুরু করলো। যার কারণে, তার পেটের ভেতরে থেকে গুরুম-গুরুম আওয়াজ বেরিয়ে এলো। প্রথমবার আওয়াজ বেরোতেই রুদ্রর কথা বলা বন্ধ হয়ে গেলো। আর লজ্জায় চোখ বড়বড় হয়ে গেলো।
দ্বিতীয়বার আওয়াজ আসতেই- হিয়া রুদ্রর বুক থেকে মাথা তুলে, আড়চোখে তার দিকে চাইলো। রুদ্র তখন লজ্জায় কেবল এদিক-ওদিক চাইলো। হিয়া কোনো কথা বলে সোজা তার পাকঘরের দিকে এগিয়ে গেলো। কিছুক্ষণ পর, রুদ্রও সেখানে নাচতে নাচতে হাজির হলো।
হিয়া দু'হাতে কাজ চালাতে চালাতে রুদ্রর উদ্দেশ্য বলল,,
"কতোদিন না খেয়ে আছো আমার অভাবে?"
হিয়ার এমন প্রশ্নে রুদ্র কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলো। একবার গলা খাকারি দিয়ে ভাব নিয়ে বলল,,
"কাল দুপুর থেকে!"
কথাটা শোনা মাত্র, হিয়া তরকারি কাটা বন্ধ করে রুদ্রর দিকে ফিরে চাইলো। রুদ্র ভাবলো হিয়া হয়তো তার জন্য কেয়ার করবে! যেহেতু, সে হিয়ার জন্য পাঁচ'টা ওয়াক্ত না খেয়ে আছে। তবে তাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করে হিয়া আফসোসের স্বরে বলল,,
"অথচ,আমি ভেবেছিলাম- তুমি পুরো কুড়িটা দিনই আমার জন্য না খেয়ে থাকবে। কিন্তু, তুমি আমার বিশ্বাস কে ভঙ্গ করলে।"
কথা শেষ করে সে আবার কাজে মনোযোগ দিলো। রুদ্র তার দিকে কিছুটা এগিয়ে বলল,,
"তুমি ক'দিন না খেয়ে ছিলে আমার জন্য?"
হিয়া মুখ ভেংচি কেটে উত্তর দিলো,, "বালাই সাধ! আমি কেন তোমার জন্য না খেয়ে থাকতে যাবো?"
-
খোলা জানালার ধারে বুকে দু-হাত বেঁধে বিনয়ী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রুদ্র। দৃষ্টি তার বিশাল আকাশের ছোট্ট তারাদের দিকে। মাঝেমধ্যে হালকা হাওয়া এসে নাড়িয়ে দিয়ে তার চুলগুলো! আপাত, দৃষ্টিতে তাকে দেখতে বেশ আর্কষনীয় লাগলেও, তার মাথায় চলছে হাজারো চিন্তার ছাপ!- হিয়া কি তাকে ক্ষমা করতে পারবে? নাকি কোনো চাপা কষ্ট তাকে তিলেতিলে নিঃশেষ করে দিবে! বারবার এই কথাটাই ঘুরপাক খাচ্ছে তার মাথায়।
বেশ কিছু সময় ধরে রুদ্রকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে- ধীর পায়ে হিয়া এগিয়ে এলো তার কাছে। তার পাশে জানালা ধরে দাঁড়িয়ে নম্র গলায় প্রশ্ন করলো,,
"কি ভাবছো? আকাশের দিকে তাকিয়ে!"
রুদ্র কিঞ্চিৎ হাসলো তার প্রশ্নে। এরপরে তার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল,,
"ভাবছি..! আমি কি তোমার ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য?"
"তোমার কি মনেহয়?"
"আমি তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই!"
"আমার মতে, আমরা কখনোই সেইসব মানুষকে ঘৃণা করতে পারি না! যাকে আমরা মন থেকে ভালোবেসেছি!"
কথাটা শোনা মাত্রই, যেন রুদ্রর চোখে আলোর ঝিলিক নেমে এলো। মুখে দেখা দিলো এক তৃপ্তির হাসি! মনে মনে হাজারটা প্রজাপতি ডানা মেললো তার। যেন, কোনো চাপা পাথর আজ হালকা করলো তাকে!
রুদ্র দু'কদম এগিয়ে গিয়ে পেছন থেকে আলতো করে জড়িয়ে ধরলো হিয়াকে! হিয়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে ধীর কন্ঠে বলল,,
"তাহলে, কি আমি ধরে নিবো! আমার কিলার-হার্ট আমাকে আজও প্রথমদিনের মতোই ভালোবাসে!"
হিয়া কিঞ্চিৎ হাসলো রুদ্রর কথাতে। এরপরে রুদ্রর দিকে ঘুরে তার বুকে মাথা রেখে আবেগী স্বরে বলল,,
"অলরেডি, আমাদের জীবন থেকে অনেকগুলো সোনালী দিন হারিয়ে গেছে। এখন আমি আর আমাদের ভবিষ্যতের দিনগুলো'কে হারাতে চাই না। আমি সবসময় তোমার পাশে থাকতে চাই! আমার সুখ-দুঃখ, অনুভূতি সবকিছু তোমার সাথে ভাগ করে নিতে চাই। দিনশেষে, আমাকেই তোমার গন্তব্য বানাতে চাই। তোমার বুকে মাথা রেখে সকল ক্লান্তি দূর চাই!"
হিয়ার কথায় রুদ্র বেশ অনেকটা খুশি হলো। তার প্রতি হিয়ার গভীর ভালোবাসা উপলব্ধি করলো। আলতো একটা চুমু রাখলো হিয়ার কপালে। অতঃপর, হিয়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,,
"হিয়াহ! মে আই...?"
কথাটা কর্ণকুহর হতেই- কোনো এক অচেনা ভয়ে, হিয়ার বুকটা কেঁপে উঠলো। রুদ্রর বুকে থাকা হাতের আঙুলগুলো অনিচ্ছাকৃতভাবে মুঠো হয়ে এলো! লজ্জায় রুদ্রর থেকে চোখ নামিয়ে নিলো সে। তবে, পুরোপুরি সরেও গেল না।
হঠাৎ কাঁপনে হিয়া কিছুটা পেছতেই- রুদ্র দক্ষ হাতে তার কোমর জড়িয়ে নিলো। গভীর দৃষ্টি রাখলো হিয়ার চোখে- যেন কোনো অনুমতির অপেক্ষায় আছে সে!
কয়েক সেকেন্ডের নীরাবতায়, দুজনের নিশ্বাসের শব্দ যেন আরো গাঢ় হয়ে উঠলো! হিয়া ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকালো রুদ্রর চোখে। যেই চোখে কোনো তাড়াহুড়ো ছিলো না। ছিল কেবল বিশ্বাস, ভরসা আর ভালোবাসা!
হিয়া খুব ধীর গতিতে চোখ বুজতেই, রুদ্র যেন তার সম্মতি পেয়ে গেলো। আলতো করে হিয়ার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে, সবশেষে স্থির হলো হিয়ার ঠোঁটে!!
-
পরের দিন সকালে, জানালা দিয়ে ভেসে আসা স্নিগ্ধ আলোর কোমল ছোঁয়ায় ঘুম ভাঙলো হিয়ার। ধীরে ধীরে চোখ মেলে একটু আড়মোড়া দিতেই, তার নজর গেলো ঘুমন্ত রুদ্রর দিকে!
ঘুমন্ত অবস্থায় অনেক বেশি আর্কষনীয় লাগছে রুদ্রকে। শান্ত মুখশ্রীতে দীর্ঘ ক্লান্তির ছাপ একেবারে লেপ্টে আছে! রুদ্রকে এমন নির্মলভাবে দেখে হিয়ার ঠোঁটের কোণে একটুকরো মৃদু হাসি ফুটে উঠলো।
তবে, হঠাৎ মাথায় কোনো বদবুদ্ধি আসতেই হিয়া তড়িঘড়ি করে উঠে পড়লো। একজগ ঠান্ডা পানি এনে ঢেলে দিলো বিছানার উপরে! এরপরে চেঁচিয়ে উঠে ডাক দিলো,,
"এমা..! রুডি বয়। তুমি বিছানায় হি*সু করে দিয়েছো! কি বিশ্রী গন্ধ বের হচ্ছে তোমার শরীর থেকে। ছিহঃ রুদ্র, ছিহঃ"
হিয়ার এমন হঠাৎ চিৎকারে ঘুমের মধ্যে এক প্রকার আঁতকে উঠলো রুদ্র! তবে চোখ মেলার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সে বুঝতে পারলো, এসব কিছু হিয়ার দুষ্টামি। তাই সে, এসবে খুব একটা পাত্তা না দিয়ে ঘুম ঘুম কন্ঠে বলল,,
"গুড মর্নিং!"
"হিসু মর্নিং!"
হিয়ার কথায় তেমন কোনো প্রতিউত্তর না করে, রুদ্র আবার চোখ বুজলো ঘুমের উদ্দেশ্য। তা দেখে হিয়া আরো কিছুটা চেঁতে বলল,,
"কতোদিনের হিসু জমিয়ে রেখেছিলে তুমি? যে এক হিসুতেই বেড ভেসে গেলো। এতোবড় ব্যাটা হয়েছো, আর এখনো হিসু কন্ট্রোল করতে পারো না? এ কেমন ব্যাটা তুমি?"
রুদ্র আড়মোড়া দিয়ে পাশ ফিরে শুতে শুতে বলল,,
"জ্বালানোর জন্য অনেক সময় পাবে তুমি। আপাতত, একটু শান্তিতে ঘুমাতে দাও। খুব ক্লান্ত আমি।"
"কেন রাতে চুরি করতে গিয়েছিলে নাকি?"
বলতে বলতে হুট করে কি কথা বলে ফেলেছে হিয়া। এটা মাথায় আসতেই লজ্জায় জিহ্বা কামড়ালো সে। ততক্ষণে, রুদ্র উঠে বসেছে।
"কি হিয়া! কই রোমাঞ্চের পরেরদিন সকালে, চা-কফি হাতে নিয়ে জামাইয়ের ঘুম ভাঙাবে! তা না, তখন থেকে আমাকে জ্বালিয়েই চলেছো! এখন যদি আমি তোমাকে জ্বালানো শুরু করি, তাহলে সেটা কি খুব ভালো হবে?"
একটা শুষ্ক ঢোক গিলে, হিয়া ভয়ার্ত গলায় বলল,,
"এবারের মতো ভুল করে দেন ভাইজান! এরকম মাফ আর কখনো হবে না!"
#চলবে~