#চারু-বৃত্ত
#তোমাদের আদুরিনী
#পর্ব_14
~~~
বৃত্ত খালি গায়ে উপুর হয়ে বেঘরে ঘুমাচ্ছিল । রুহি বেশ কিছু বার ডাকার পর সারা পেলো ,
"কে ?"
ঘুম জড়ানো ভারি কন্ঠে বৃত্ত আওরাল । রুহি বলল,
"আমি রুহি ,কফি এনেছি তোমার জন্য ।"
"লাগবে না তুই খা , আমায় ঘুমাতে দে ।"
"এটাতো তোমার জন্য বানিয়েছি । "
ভেতর থেকে কোন উওর এলো না । অনেক ডাকলো ,সাড়া না পেয়ে ঠোঁট উল্টে চলে গেল রুহি ।
------------''
দুপুরে সবাই সেজেগুজে অপেক্ষা করছে কখন বর আসবে । চারু বিন্দুদের কাছে ছিল । বাড়ি ভর্তি হইচই শুরু হলো ,
'বর এসেছে বর এসেছে '
সবাই সে দিক গেল । বৃত্ত গিয়ে সোনার চেন পড়িয়ে দিয়ে নামাল । বর পক্ষকে বেশ খাতির যত্ন করলো । রুহি বরের হাত ধোয়ালো । তা নিয়ে বেশ কিছুখন মজা হলো । ওদিকে বিন্দু আর বিন্তি মিলে জোর করে চারুকে শাড়ি পড়িয়ে দিয়ে হালকা সাজিয়ে দিয়েছে । একদম বাঙ্গালী বাঙ্গালী লাগছে , চুল ছেড়ে তাতে একটা গাঁদা ফুল গুঁজে দিয়েছে । বৃত্ত ও পিঙ্ক রঙের পাঞ্জাবি পড়েছে চারু তা জানে না । এটা নিয়ে যে ঝামেলা হতে পারে তাও চারুর ছিল না ।
বিয়ে পড়ানো শুরু হবে বলে বউ নিয়ে যাওয়ার ডাক এলো । বৃত্ত নিজে এলো বোনদের নিতে । ঘরে পা রাখতেই চোখ আটকে গেল দুই বোনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা স্নিগ্ধ, মায়াবি শ্যামবতীর দিক । চারু আচলের এক কোণা ধরে আঙ্গুলে পেচিয়ে খেলছে । বৃত্ত ভেজা ঢোক গিলে ভেতরে ঢুকে বলল,
"চ চল যাবি ।"
কথাটা চারুর দিক তাকিয়ে বলল। বিন্তি হাসলো । বিন্দু বলল,
"কাকে নিতে এসেছ আমাদের নাকি চারু কে?"
বৃত্ত চোখ ঝাকিয়ে উঠলো । চোখ ছোট্ট ছোট্ট করে জবাব দিলো,
"বিয়ে তোদের ওর দিক নজর দিচ্ছিস কেন ?"
"আমরা কখন দিলাম তুমিই তো ওর দিক তাকিয়ে কথাটা বললে ।"
চারু বেশ লজ্জা আর অসস্থি একসাথে নিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল । বৃত্ত বলল,
"এই চলতো বিদেই হবি ।"
বৃত্ত তাদের নিয়ে গেল । পেছন পেছন চারু ও গেল । বৃত্তের মায়ের চোখে পড়তেই ফস করে উঠলো । মানুষ দেখে কিছু বললো না ।
বিয়ে টা বেশ সুন্দর ভাবে সম্পূর্ণ হলো । চারু এক কোনে বিদায়ের পর্ব দেখছিল । এই প্রথম বৃত্তকে কান্না করতে দেখলো । দু বোনকে একসাথে বুকে আগলে কান্না করছিল । চারু কেবল তাকিয়ে থাকলো । বিন্দু আর বিন্তি কে গাড়িতে তুলে দিতে গেল বৃত্ত সাথে সাথে সবাই গেল । বৃত্তের মা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছিল তা দেখে চারু এগিয়ে গিয়ে পাশে বসলো । বলল,
"কাকিমা কান্না করো না।ওরা খুব ভালো থাকবে দেখো।"
বৃত্তের মায়ের তখনকার রাগ টা এসে মাথায় ঝেঁকে বসলো। ফসফস করে ডুকরে উঠে চারুকে নিজের থেকে দূরে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠলো,
"তুই আগে বাড়ি থেকে বিদেই হয় ছোটোলোকি। তোর চালাক আমি বুঝি না ? এমন সেজেগুজে আমার ছেলের আসে পাশে দাঁড়াতে বারণ করেছি না?কেন শাড়ি পড়েছিস?"
চারু বেশ ভয় পেয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিল।বৃত্তের মায়ের আওয়াজ পেয়ে রুহি আর চারুর মা দৌড়ে ভেতরে এলো।চারুর মা মেয়েকে এমন পরে থাকতে দেখে গিয়ে টেনে তুললো । রুহি ফুপির হাত ধরে বলল,
"কি হয়েছে ফুপি?"
বৃত্তের মা মারার জন্য হাত তুলে এগিয়ে যেতেই বৃত্ত এসে ধরে ফেললো । আস্তে আস্তে বাড়িতে মানুষ ভরে গেল। বৃত্তের বাবা এসেও জানতে চাইলো,
"কি হয়েছে বৃত্তের মা এমন করছো কেন।"
বৃত্তের মা মুখে বাজে ভাষা ব্যবহার করে বলল,
"এই খানকি টারে বাড়ি থেকে বিদেয় করো।আমার ছেলেটারে ফাঁসাচ্ছে ছোটলোকের বাচ্চা।এই জন্য ব...."
বৃত্ত তার মাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
"কি হয়েছে মা এমন বাজে ভাষায় কেন কথা বলছো? কি করেছে চারু?"
"কি করেছে হ্যা,আচ্ছা তুই সত্যিই আমার ছেলে তো?তোর রুচি এতো খারাপ কবে থেকে হলো যে এই ছোটলোকের পাল্লায় পরলি ?"
বৃত্ত এবার রেগে গেল ।গলার রগ ফুলে উঠলো।চারুর দিক তাকাতেই দেখলো চারু মুখ চেপে কান্না করছে । এতে যেন বৃত্ত আরো বিগরে গেল ।বাড়ি ভরতি লোককে তোয়াক্কা না করে বলল,
"মা তুমি এমন করে ওর সাথে কথা বলতে পারো না , তোমার পছন্দ না ভালো কথা সংসার আমি করবো আমার পছন্দ হলেই যথেষ্ঠ। "
বৃত্ত মা আরো বাজে ভাষা বলতে লাগলে বৃত্তের বাবা ধমকে বলল,
" থামো বলছি?এসব কথা পড়ে হবে বাড়ি ভরতি লোক কি বলবে ?"
"তুমি আমায় চুপ করাচ্ছ ? নিজের ছেলেকে কে তো মানুষ করতে পড়লে না আবার বড় বড় কথা বলছো?"
পরিবেশটা বেশ বিগরে গেল।এদের মধ্যে রুহি গিয়ে বৃত্তের কাছে ফোরন কেটে বলল,
"ছি বৃত্ত ভাই তোমার রুচি এতো খারাপ যে তু...."
পুরো কথা শেষ না হতেই রুহির গালে কষিয়ে একটা থাপ্পড় পড়লো। রুহি ফ্লোরে পড়ে গেল।
"চারুর বিষয়ে একটা বাজে কথা কারো মুখ থেকে শুনতে চাইছি না,নাহলে আমি কাউকে ছেড়ে কথা বলবো না।"
শেষের কথাটা বৃত্ত মায়ের দিক তাকিয়ে চোখ রাঙ্গিয়ে দাতে দাত পিষে বলল ।
চারু চমকে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলো। রুহির মা এসে ধরলো,রুহির বাবা বৃত্তের দিক হাত তুলে রুক্ষে যেতেই চারু এসে ধরলো ।
"আপনারা ঝামেলা করবেন না,আমি এখুনি এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছি। "
বৃত্ত হাত চেপে ধরে বলল,
"কোথাও যাবে না তুমি।"
বৃত্তের মা এসে বৃত্তকে সবার সামনে গায়ে হাত তুলতে গেলে বৃত্তের বাবা ধরে ধমকে সেখান থেকে নিয়ে ঘরে আটকে রেখে আসলো । পরিবেশ স্বাভাবিক করতে সবাইকে চলে যেতে বলল । বৃত্ত এখনো চারুর হাত ধরে আছে চারু হাত ছাড়ানোর শত চেষ্টা করে যাচ্ছে । রুহির বাবা মা মুখামুখি করে মেয়েকে নিয়ে চলে গেলেন আর বৃত্ত কে আঙ্গুল উচিয়ে শাষিয়ে গেলেন । উপর থেকে বৃত্তের মা গাল মন্দ করতে করতে চারুকে বলতে লাগলো ,
" খানকির মেয়ে তুই আমার বাড়ি থেকে এখনি বেড় হ । ছোটলোকের বাচ্চা বের হ বলছি ।"
চারু আর তার মা কেদেই যাচ্ছে । জোরে ঝেংটা দিয়ে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে এক কাপড়েই বাড়ি ছেড়ে চলে গেল চারু আর তার মা । বৃত্ত আটকাতে গেলে চারু চেঁচিয়ে উঠল,
" আপনি দয়া করে আমার পিছে আসবেন না , আপনি আমার জিবনটাকে আজ সবার সামনে জোঁকার বানিয়ে দিলেন । বারং করার শর্তেও পেছনে পড়ে আছেন ।"
"আ আমি সব ঠিক করে দিব আমার কথা শুনো ।"
চারু বৃত্তের কথা না শুনে কাজল লেপটে কান্না করতে করতে বাড়ি ছাড়লো । বৃত্ত ফ্লোরে বসে ক্লান্ত সুরে আওরাল,
" যেওনা চারু , শুনো !"
______
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত ছুঁইছুঁই, আকাশে চাঁদ বা তারার মেলা আজ বসে নি। আকাশে মেঘ করেছে, চারিদিক ঠাণ্ডা বাতাসও বইতে শুরু হলো, হাটতে হাটতে অনেকটা দূরে এসে পৌঁছাল, চারু তার মায়ের সাথে হাত ধরে হাঁটছিল , হঠাৎ করে চারুর মা রাস্তার পাশে বসে পড়লো। চারু চমকাল, মায়ের কাছে বসে বলল,
"কি হয়েছে মা ? "
চারুর মা মাথায় হাত দিয়ে বলল,
"ভাল লাগতাছে না, ভাল লাগতাছে না ।"
আর কিছু বলাই আগেই জ্ঞান হারিয়ে ফেললো । চারুর ভয়ের মাত্রা বাড়লো। চোখ বন্ধ করে ভায়কে আটকাল তখন চারুর পাশ কেটে চারুর বয়সি একটা মেয়ে হেটে যাচ্ছিল , কিন্তু এমন পরিস্থিতি দেখে দাড়িয়ে গেল । এগিয়ে এসে বলল,
" কি হয়েছে ওনার আপু ?"
চারু তাকাল, কান্না আওড়ানো কণ্ঠে বলল,
"বুঝতে পারছি না কি হলো হঠাৎ ।"
মেয়ে টা হাটু মুরে বসে বলল,
" কোথায় যাবেন বলুন এগিয়ে দিচ্ছি । "
চারু কি বলবে কি করবে বুঝতে পারলো না । আমতা আমতা করে বলল,
" একটু বিপদে পড়েছি , কোথায় যাব জানি না । "
"এ মা কি বলছেন ,আকাশের যে অবস্থা , তারপর ওনার যা অবস্থা কি করে যাবেন ।"
"একটু বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাবে । কিন্তু কি করবো বুঝতে পারছি না । "
মেয়েটা অনেকখন চুপ থেকে বলল,
"আপনার কোন সমস্যা না থাকে আমার সাথে আসুন , ওনি ঠিক হয়ে গেলে তখন যাবেন ।"
চারু চুপ ছিল দেখে মেয়েটা আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে বলল,
" ওই যে দেখা যাচ্ছে বিল্ডিং এই খানেই থাকি আমি । চলুন আপু ।"
চারু তার মায়ের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবতে পাড়লো না , এখন এই মেয়েকে বিশ্বাস করা ছাড়া কোন গতি নেই । তাই রাজি হয়ে গেল । দুজন মিলে ধরে নিয়ে গেল ।
--------------
" চারুকে এমন করে কেন আঘাত করলে মা ? ভালো তা আমি বাসি ও তো বাসে না । আমায় বলতে ।"
বৃত্ত সোজা তার মায়ের রুমে এসে চেঁচিয়ে বলল কথা গুলো । বৃত্তের মা মুখ ঘুরিয়ে বসে ছিল । বৃত্ত ফের চেঁচিয়ে উঠলো,
" হয় চারুকে এনে দিবে না হয় ছেলেকে হারাবে । আরেকটা কথা তুমি নিজে চারুকে আমার কাছে এনে দিবে , তার আগে আমি তোমার সাথে কথা বলবো না ।"
একটু আগে বৃত্তের বাবা বেশ কড়া কথা শুনিয়ে গেছে এমন ভাষায় গালাগালি করার জন্য , এছন বৃত্ত এসে মাকে কথা শোনালো । বৃত্ত যেতেই বৃত্তের মা চোয়ার শক্ত করে বৃত্তের যাওয়ার দিক তাকিয়ে থাকলো ।
বৃত্ত ঘরে গিয়ে মুখে পানি দিয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে চারুর নাম্বারে কল করতে করতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল ।
-----------
মায়ের পাশে বসে ছিল চারু । কাজল লেপটে গেছে । পেটে গুজে রাখা ফোনটা বাজতেই বের করলো । তাতে বৃত্তের নামটা জলজল করছে, বেশ কয়েকবার বাজলো তবে চারু ধরলো না । সেই মেয়েটা আসতেই ফোন উল্টো করে রেখে দিল , এসে পাশে বসে বলল,
" আপনার নাম কি ?"
"চারু ।"
"আরে বাহ !আমার নাম তো লতা , বেশ মানিয়েছে তাইনা? চারুলতা ।"
চারু মুখে হাসি টেনে বলল,
"তোমার বয়স কেমন? "
" আঠারো ছাড়িয়েছি ।"
"ওহ আমিও ।"
"আচ্ছা । একটা কথা বলি ?"
"বলো ?"
"এতো সুন্দর শাড়ি পড়ে সেজেগুজে কোথায় গিয়েছিলে? তুমি করেই বললাম কেমন ।"
চারু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল । বলল,
"এটা অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম । "
" ওহ ।"
" কাউকে দেখছি না যে ?"
"আমি একাই থাকি এখানে ,বাবা মা গ্রামে থাকে । আমি এখানে একটা স্টলে থাকি, কাজ করি । "
"ওহ , বুঝলাম ।"
অনেকখন চুপ থেকে চারু বলল,
" আমায় যখন এতো সাহায্য করলে তাহলে আর একটু সাহায্য করো ?"
" কি সাহায্য বলো ?"
" আমায় কিছু দিন এখানে থাকতে দিবে ? বাড়ি ভাড়া অর্ধেক আমি দিয়ে দিব ।"
" ঠিক আছে । আমার ও ভালোই হলো একা থাকতে হবে না ।"
চারু হাসলো, লতা বলল,
"আচ্ছা ঠিক আছে পড়ে কথা হবে , খাবার রান্না শেষ হলে ডাকবো চলে এসো ।"
"হুমমম ।"
চলবে...............