ফন্ট সাইজ:
থিম:
চারু বৃত্ত

১৫তম পর্ব

লেখক: তোমাদের আদুরিনী
#চারু-বৃত্ত
#তোমাদের আদুরিনী 
#পর্ব_15
~~~
লতা যেতেই চারু মায়ের পাশে মাথা গুঁজে শুলো । ওদিকে বৃত্ত একের পর এক ফোন করেই যাচ্ছে, তবে চারু ধরলো না । বৃত্ত ক্লান্ত হয়ে রাস্তার পাশে ফুটপাতে বসলো আর চিন্তিত সুরে বলল,
"কোথায় তুমি ?"
----------------
আজ ফিরুনি, বিন্তি বিন্দু আসবে বলে বৃত্ত কে যেতে বলল কিন্তু বৃত্ত কোন কথা না বলে কলেজে চলে গেল । আজ চারুর ও ব্যবহারিক পরীক্ষা আছে তবে খাতা সব ওবাড়িতে, খাতা ছাড়া  পরীক্ষা দিতে পারবে না । কাল রাতে লতাকে বিশ্বাস করে সব খুলে বলেছে চারু । লতা এসে জানতে চাইলো কি হয়েছে  । চারু সব বলল ,  ঠিকানা দিল লতা বলল ,
"তুমি খাবার খেয়ে তৈরি হও বাকিটা আমি দেখছি।"
লতা ঠিকানাটা হতে করে বৃত্তদের বাড়িতে গেল । বাড়িতে ভালোই লোকজন । চারু যেমন ভাবে বলেছিল ঠিক সে ভাবেই পা টিপে টিপে বাড়ির পেছনে গিয়ে জানালা দিয়ে  একটা ঘরে টুকে পড়লো। ঘরে তেমন জিনিস নেই দেখে বই খাতা দেখতে লাগলো , কোথাও নাম লেখা আছে কিনা ,  খাতাতে চারুর নাম দেখে বুঝলো এটা চারুর রুম । তাই চারু যা যা বলেছিল তাই তাই নিয়ে  ধীরে বেড়িয়ে এলো । চারিদিকে মানুষ জন্য কেউ তেমন সন্দেহ করে নি। 
চারুর আজ সকালে পরীক্ষা বৃত্ত তা জানতো না । সে জানতো বিকালে তাই হল থেকে বেরিয়ে সেদিন চারু গাড়ির জন্য যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল বৃত্ত সেখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করো । সন্ধ্যা ওবদি দাঁড়িয়ে ছিল কিন্তু চারুর দেখা মিললো না ,  মলিন মখে ক্লান্ত পায়ে বাড়ির পথ ধরলো ।
বসার ঘরে সবাই বসে ছিল , বৃত্ত ঢুকতেই বিন্দু উঠে বলল,
"ভাইয়া আমরা তোমার ওপর রাগ করেছি । তুমি আনতে গেলে না কেন ?"
বৃত্ত  কিছু বলল না । বিন্তি এগিয়ে গিয়ে বৃত্তের হাত ধরে বলল,
" আমাদের রাগ ভাঙ্গাতে হলে টাকা দিয়ে  ভাঙ্গাতে হবে বলে দিলাম ।"
মেয়েদের এমন বাহানা শুনে বৃত্তের মা হাসলেন বৃত্ত একবার তার মায়ের দিকে তাকিয়ে ওপরে ধীর পায়ে চলে গেল । 
বৃত্ত রুমে গিয়ে  ধপ করে বিছানাতে শুয়ে পড়লো, পেছন পেছন বিন্দু এসে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ডাকলো, 
"ভাইয়া ।"
ভেতর থেকে উওর এলো না দেখে বিন্দু দরজা ঠেলে ভেতরে মাথা ঢুকিয়ে দেখলো বৃত্ত  শুয়ে আছে । এগিয়ে  গিয়ে গায়ে হাত দিয়ে ডাকলো, 
"ভাইয়া কি হয়েছে ? "
এবার ও কোন উওর এলো না 
" ভাইয়া কি হয়েছে বলো ?"
বৃত্ত তখনো চুপ । বিন্দু পাশে বসে ভাইয়ের মাথায় হাত রেখে বলল,
" চারুকে খুজে পাওনি ?"
বৃত্ত চারু কথা শুনে উঠে বোনকে জড়িয়ে ধরে নিঃশব্দে কাদলো । বিন্দু বেশ আবাক হলো ,  তার ভাইকে বেশি কষ্ট না পেলে কাদতে দেখেনি । অনেক দিন পর কাল তাদের বিদায়ের সময় কাদতে দেখেছিল । আর এখন চারুর জন্য কান্না করছে ? বিন্দু ভারি শ্বাস ছেড়ে  ধীরে শুধলো ,
"তোমায় আমি এভাবে বাচ্চাদের মত হাঁউমাউ করে কান্না করতে কখনো দেখিনি ভাইয়া। "
বৃত্ত তখনো চুপ। বিন্দু ফের ভারি শ্বাস ছেড়ে আওরাল, 
"ভাইয়া .....?"
বৃত্তর তখনো কোনো হেলদোল নেই, ওভাবেই কেদে যাচ্ছে । বিন্দু ফের একাএকাই বলল,
"আশ্চর্য! তোমাকে আমি এভাবে কখনো কারো জন্য  কান্না করতে দেখিনি বৃত্ত ভাইয়া।"
বৃত্ত আসলে এভাবে কখনোই কান্না করেনি। তবে আজ যেন বৃত্তের চোখে বৃষ্টি নেমেছে । যার থামার কোন নাম নেই । 
---------
"কি করবে ভেবেছ কিছু? "
"ভাবছি যে একটা ছোট্ট ফুড কার্ডের দোকান দিব । ওই সামনে দেখলাম বেশ ভির জমে বিকাল থেকে রাত ওবদি । সকালের দিক ছোট্ট বাচ্চাদের পড়াবো আর বিকাল থেকে দোকানটা চালাব মায়ের সাথে । এছাড়া তো কোন উপায় নেই ,মাত্রই পরীক্ষা দিলাম চাকরি কে দিবে?তারচে ভালো কিছু করি।"
"এটা কিন্তু ভালো আইডিয়া, দরকার হলে আমিও তোমাদের কাজে হাত লাগাব।"
"ঠিক আছে । তবে সব ব্যবস্থা করার জন্য  তো টাকা লাগবে,আমার কাছে বেশি টাকা নেই।তোমার কাছে থাকলে কিছু ধার দাও ,আমি পড়ে ফেরত দিয়ে দিব। "
"ঠিক আছে নিও । "
চারুর মায়ের আজ কাল অসুক টা বেশ বেড়ে গেছে,চিকিৎসার জন্য টাকাও দরকার,পার্ট টাইম কিছু না করলে টাকা আসবে না হতে । এমন অনেক কিছু ভাবছিল বেলকুনিতে রেলিং ঘেষে দাঁড়িয়ে । তখন লতা এসে ভাবনায় ব্যাঘাত ঘটালো। মেয়েটা বড্ড ভালো ,দু দিনেই কেমন আপন করে নিয়েছে। তাই সবটা লতার সাথে শেয়ার করলো। এমন সিদ্ধান্তে লতাও সম্মতি দিল। 
এভাবেই পার হলো বেশ কিছু দিন । বৃত্ত বাড়ির কারো সাথে কথা বলে না। মায়ের সাথে তো দেখা পর্যন্ত করে না। এখনো চারুকে খুজে যাচ্ছে। ফোন দিলে ফোন সবসময়ই বন্ধ দেখায় । এ কদিনে বেশ বেহাল দশা হয়েছে বৃত্তের। ঠিকমতো খাওয়া দেওয়াটা ও করে না। 
ওদিকে চারুর বৃত্তের কথা মনে পড়লেও কখনো কারো কাছে প্রকাশ করে না , নিজের মধ্যেই ভালো লাগাটা চেপে রাখে।  
একদিন বৃত্ত হাটতে হাটতে ঘুড়তে ঘুড়তে এদিক ওদিক যাচ্ছিল। চারুও সেই পথে ময়লা ফেলার জন্য যেতেই দুজন দুজনের মুখোমুখি হলো। চমকাল দুজনি। দুজন দুজনের থেকে বেশ খানিকটা দূরে থমকে দাঁড়িয়ে ছিল । বৃত্তের চোখে পানি ছলছল করে উঠলো। আচমকা অস্থির হয়ে চারুকে ডেকে উঠলো,
" চারু শুনছো .......!"
ভ্যাপসা গরম । চারদিকে মানুষের ভীড় নেই । চারু এখনো থমকে আশ্চর্যে কপালে ভাজ ফেলে আবাক চোখে তাকিয়ে আছে । বৃত্ত চারু নামটা নিয়ে, এলোমেলো পায়ে দৌড়ে এসে আচমকা চারুর হাতের নিচ দিয়ে দু হাত পেচিয়ে জড়িয়ে ধরলো । বৃত্তের বা কাধে চারুর ঠোঁট ছুইছুই হলো । বৃত্ত সস্থির শ্বাস ছেড়ে বলল,
" আই এম সরি ।"
চারুর চোখ দুট বন্ধ ছিল ,  বৃত্তের কণ্ঠে হারিয়ে ফেলার ভয় । হাতে থাকা ময়লার ব্যাগটা হাত থেকে পরে গেল । এক ধাক্কায় সরিয়ে দিল বৃত্তকে । বৃত্ত দু পা পিছিয়ে গেল । চারু কিছু বলতে গিয়েও বৃত্তের মুখের দিক তাকিয়ে থেমে গেল । 
সাদা শার্ট টা ঘামে ভিজে গেছে । চোখে মুখে ঘাম চিকচিক করছে । চুলগুলো কেমন এলোমেলো অগছালো । কেমন রুক্ষ্ণ দেখাচ্ছে, কেমন বেহাল দশা হয়েছে । চারুকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বৃত্ত এক পা এগিয়ে এলো, চারু এক পা পিছিয়ে গেল । চার দিকটা চোখ বুলিয়ে কম্পিত সুরে বলল,
" আ আ আপনি এ এখানে ? "
বৃত্তের সুরে পরিবর্তন দেখা দিল । সেই আগের মতো করে বলল,
" বা রে তুমি এখানে আমিও তো এখানেই থাকবো , এটা কি স্বাভাবিক না? "
" কেন এসেছেন ?"
বৃত্ত একটু ঝুঁকে বলল, 
" যদি বলি তোমার জন্য  ?"
চারুর চোখ ছলছল হলো, ঠোঁট কামরে কান্না আটকে তাকাল । বৃত্ত হাসলো , চারুর মাথার দুল গুলো অনুমতি ব্যতীত ছুইয়ে এলোমেলো করে বলল,
"আমার থেকে পালিয়ে এই ওবদি এলে ? "
চারু মাথাটা সরিয়ে নিয়ে বলল,
" আমার খোঁজ পেলেন কি করে ?"
" সাত দিল হলো তোমায় দেখি না ,  আর আমার থেকে দূরেও তো যেতে পাড়লে না ,  খুঁজে পাওয়া কি স্বাভাবিক না? "
" তাহলে এবার অনেক দূরে যাব , যেখানে আপনি যেতে পারবেন না । "
" ট্রাই করতেই পরো । "
চারু গা ঘুড়িয়ে উল্টো পথে পা বাড়াল, দু পকেটে হাত গুজে বৃত্ত পেছন পেছন ছুটলো । চারু আড় চোখে পেছনে দেখলো ,  হুট করে বৃত্ত বলে উঠলো ,
"পেছন ঘুরেই ভালো করে দেখতে পারো ,  সামনে থেকে আড় চোখে দেখে শান্তি পাবে না । "
চারু কেশে আওরাল, 
" আমি কখন দেখলাম ?"
বৃত্ত শব্দ করে হেসে চারুর সামনে গিয়ে উল্টো পায়ে চারুর মুখোমুখি হাটতে হাটতে বলল,
" এবার দেখতে পারো । তুমি চাইলে আমি দাড়াতেও পারি , যেভাবে দেখে সুবিধা । "
সেই আগের হাসি চোখে মুখে আঁচরে পড়লো বৃত্তের । চারু তাকালো না ,  বেশ হাসফাস করছিল । বৃত্ত ওভাবে হাটতে হাটতে রাস্তায় হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে নিলেই চারু হাত বাড়িয়ে ধরে ফেললো । বৃত্ত হাতটা ধরে দুষ্ট সুরে ব্যাঙ্গ করে বলল,
"ওহো , চারু ।"
চারু হাত ছেড়ে দিল । চটপট করে বলল,
"আপনি আমার পেছন পেছন আসবেন না ।"
" তোমার কথা কেন শুনবো ?"
" কারণ ......."
বৃত্ত ঠোঁটে হাসি টেনে মুখটা একটু চারুর দিক এগিয়ে এনে ফিসফিস করে বলল,
" কারণ কি ......?"
চারু মুখ দিয়ে একটা শ্বাস ছেড়ে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলল,
" দেখুন ..."
" এ মা ছিঃ আমি এতো খারাপ্ও না চারু ।"
চারু তোঁতলালো ,
" আ আমি কখন ... আপনার ভাবনা গুলো বাজে ।"
"আমি কি করলাম , তুমিই তো দেখাতে চাচ্ছ ।"
"দেখেন আমার পিছু পিছু আসবেন না । "
"ওওওওওওও ,  ঠিক আছে । যাও ।"
চারু পায়ের গতি বাড়িয়ে চলে যেতেই বৃত্ত চেঁচিয়ে বলল,
" শুনো চারু, আবার দেখা হবে , যখন তখন ।"
চারু আরো জোরে পা চালিয়ে চলে গেল । বৃত্ত মুখ থেকে হাসি সরছেই না । মাথা চুলকে একাএকাই হাসলো । 
---------------
"কি হয়েছে চারু , হাপাচ্ছ কেন ?"
"এ একটু পানি দাও ।"
লতা পানি এনে দিতেই এক নিমিষে শেষ করে, বুকে হাত রেখে জোরে শ্বাস নিয়ে ধীরে ধীরে ছাড়লো । লতা ফের বলল,
" ও চারু ,কি হয়েছে গো , এমন করছো কেন ? ভুঁত দেখলে নাকি ?"
" হ্যা, ভুঁতের ও বড় ভুঁত । "
"কি বলো , তাবিজ লাগাতে হবে নাকি ?
"কেন ?"
"ওমা ভুঁত তারানোর জন্য ।"
চারু দাত বের করে হেসে ফেললো । তারপর কথা ঘুরিয়ে বলল,
" কাস্টমার কেমন আসছে ?"
"তুমি নিজের চোখেই দেখো ।"
চারু উঠে গিয়ে উঁকি দিল ,  বেশ লোকের ভীড় । চারু আবাক হয়ে বলল,
"অন্য দিনের থেকে আজ বেশি মানুষ মনে হচ্ছে ।"
"হ্যা, সবার খাবার ভালো লেগেছে । "
"হুমমম । মা কোথায় ।"
"মা তো রান্না করছে ।"
" চলো আমরাও এবার হাত লাগাই ।"
"ওকে বস ।"
দুজনি অট্ট হাসিতে মেতে উঠলো । তারপর কোমড়ে ওড়না বেধে কাজে লেগে পড়লো । বেশ কিছু খাবারের অর্ডার এলো । চারু তা নিজ হাতে বানিয়ে বানিয়ে দিতে লাগলো ,  আর লতা তা দিয়ে  আসলো । চারু মাকে বসিয়ে রাখলো । 
কিছু দিন হলো ফুড কার্ডের দোকান টা দিয়েছে । বেশ চলছিল , লতা কাজ ছেড়ে দিয়ে চারুর হাতে হাতে সাহায্য করে । একটা খোলামেলা জায়গা  ,  গাছের নিচে কিছু টেবিল আর চেয়ার পেতে রেখেছে । 
------------
"বৃত্ত, খাবি আয় ।"
বৃত্ত ঘরের ভেতর পয়চারি করছিল , এমন সময়ে তার মা এলো , ভেতরে না ঢুকেই বাইরে থেকে আওয়াজ দিল । চারু যাওয়ার পর থেকে মায়ের সাথে কথা বন্ধ করে দিয়েছে । খাওয়া -দাওয়া টাও বাইরেই বেশি করা হয় । আজও বাইরে থেকেই খেয়ে এসেছে । মা ডাকতেই বিছানায় বসে ফোনটা হাতে নিয়ে গম্ভীর হয়ে বলল,
"আমি বাইরে খেয়ে এসেছি।"
চলবে.............

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন