#চারু-বৃত্ত
#তোমাদের আদুরিনী
#পর্ব_16
~~~
"বৃত্ত, খাবি আয় ।"
বৃত্ত ঘরের ভেতর পয়চারি করছিল , এমন সময়ে তার মা এলো , ভেতরে না ঢুকেই বাইরে থেকে আওয়াজ দিল । চারু যাওয়ার পর থেকে মায়ের সাথে কথা বন্ধ করে দিয়েছে । খাওয়া -দাওয়া টাও বাইরেই বেশি করা হয় । আজও বাইরে থেকেই খেয়ে এসেছে । মা ডাকতেই বিছানায় বসে ফোনটা হাতে নিয়ে গম্ভীর হয়ে বলল,
"আমি বাইরে খেয়ে এসেছি ।"
বৃত্তের মা সল্প সময় চুপ থেকে দরজায় টোকা দিয়ে বলল,
"একটু ভেতরে আসি ?"
বৃত্ত উওর দিল না । দরজা ঠেলে ভেতরে এসে দাঁড়ালো, বৃত্ত ওভাবেই ফোনে মুখ গুঁজে আছে । ছেলের পাশে বসে বলল,
"এমন কেন করছিস বাবা, কার জন্য করছিস ? আমি তোর মা হই , একটা বাইরের মেয়ের জন্য মায়ের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিচ্ছিস ? ওই সব মেয়েরা ভালো হয় না , তোর মতো ছেলেকে ফা......."
পুরো কথা শেষ করতে দিল না বৃত্ত । পাশ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ঘৃণা নিয়ে মায়ের দিক তাকিয়ে বলল,
" তুমি এখনো তেমনি আছো ? মানুষকে নিয়ে তোমার মনে এতো বাজে ধারনা ? সিরিয়াসলি? "
বৃত্তের মা তেলে বেগুনে তেঁতে উঠলো । দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
" ওই সব মেয়ে ভালো না বৃত্ত । চারু একটা ......."
"তুমি চারুর নামে আর একটা বাজে কথা বললে আমি এই মূহুর্তে বাড়ি ছেড়ে চলে যাব । "
" মাকে হুমকি দিচ্ছিস , এমন কবে হলে ?"
" আমি তো এমনি । "
"তোরা বাপ ছেলে এখন বুঝবি না , যখন বুঝবি তখন কপাল চাপড়াবি ।"
মা ছেলে অনেকটা সময় নিয়ে কথা কাটাকাটি করলো । বৃত্তের মা এক প্রকার চারুর ক্ষতি করবে বলে হুমকি দিয়ে গেল । বৃত্ত মাথা ধরে ধপ করে বসে পড়লো ।
--------------
রাত হলো বেশ, আকাশে তারা ঝকঝক করছে । ছোট্ট দোকানটা দুজন মিলে বন্ধ করে সবে ঘরে এসেছে । রাত তখন এগারোটা ছুইছুই, হাত মুখ ধুয়ে এক সাথে খেতে বসলো । খাওয়া শেষে চারু আর লতা টাকা গুনছিল কেমন রোজগার হলো । গুনে দেখলো চার হাজার আশি টাকা । টাকা তিন ভাগ করে দু ভাগ তারা নিলো আর বাকি এক ভাগ টাকা দিয়ে কিছু জিনিস কিনতে হবে বলে রেখে দিল ।
"আচ্ছা চারু , ভালোই তো চলছে দোকান টা , কিছু নতুন খাবারও যোগ করি , ভালো হবে না ?"
"ঠিক বলেছে । একটা কাজ করো , নতুন কিছু আইটেম খাতায় লিখ আমিও লিখি তারপর ভেবে ভেবে দেখা যাবে ।"
"ঠিক আছে ।"
লতা ঘরে চলে গেল । চারুর মা ঘুমচ্ছে , চারু বেশ কিচ্ছুখন মায়ের দিক তাকিয়ে থেকে বলল,
"কাল তোমায় একবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব ।"
কিছু একটা মনে করে বেলকুনিতে গিয়ে দাঁড়াল চারু । রাতের পরিবেশটা বেশ ভালো ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা । মনটাও বেশ ফুরফুরে । হঠাৎ বৃত্তের কথা মনে পড়লে । তখনকার কাণ্ড মনে এলো । আনমনেই কখন যে মুচকি হেসে উঠলো খেয়ালটি নেই তার । আচমকা পেছন থেকে কেউ কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
"হাসছো কেন চারু ?"
চারু বুকে হাত দিয়ে থতমত খেয়ে তাকাল । চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে ভীত সুরে বলল,
"লতা তুমি ? ভয় পাইয়ে দিয়েছো ।"
লতা হিহি করে হাসলো ।বলল,
"আমি তো নতুন খাবারের কিছু তালিকা এনেছিলাম । এসে দেখলাম তুমি মুচকি হাসছো । "
চোখের পাতা বেশ কয়েক বার ফেললো চারু । তারপর হাসফাস করে বলল,
"কই হাসছি না তো ।"
লতা চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারুকে দেখে বলল,
"তোমার চোখ মুখ বলে দিচ্ছে তুমি হাসছো । "
" কই না তো ।"
"উহু ।"
"হুমমম ।"
"আবার মিথ্যে বলে ? বলো হাসছো কেন ?"
"হাসছি না আমি । অনেক রাত হয়েছে এখন ঘুমাতে যাও ।"
এই বলে চারু লতার হাতে থাকা কাগজটা নিয়ে লতাকে ঠেলে বের করে দিয়ে ঘর আটকে দিল । লতা যেতে যেতে বলে গেল ,
"বললে না হাসছো কেন !"
চারু দরজা আটকে দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করলো ,
"আশ্চর্য! আমি হাসছি ?"
______
সকালের সতেজ শীতল আবহাওয়া, শীতকাল আসতে এখনো দেড়ি অথচ হালকা কুয়াশায় চারপাশের পরিবেশ যেন তরতাজা হয়ে উঠেছে । সেই কাক ডাকা ভোরে ঘুম থেকে চারু উঠে পড়েছে । সকাল ছয়টা থেকে একটা টিউশন আছে , তারি প্রস্তুতি নিচ্ছে । চারু ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে মাকে ডাকলো ,
"মা ,ওমা শুনছো ।"
চারুর মা নড়ে উঠলো , টিপটিপ করে তাঁকাল , ঘুম জড়ানো কন্ঠে বলল,
" যাইতাছো ?"
"হ , আসতে দেরি হবে , অনেক কিছু কিনতে হবে তাই ফিরতে লেট হবে তুমি খেয়ে নিও তারপর আমি এসে তোমায় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব কেমন?"
"সাবধানে যাইস মা "
"ঠিক আছে , আসছি ।"
চারু যাওয়া আগে লতাকে বলে গেল , যেন রান্না করে মাকে খাইয়ে দেয় । তারপর চারু গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেল তার গন্তব্যের দিকে ।
।
।
।
কালো শার্ট কালো প্যান্ট, চুলগুলো গোছালো, হাতা কুনই ওপদি ফোল্ড করা , পায়ে জুতা , একদম ইন করে কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে যাবে তখন বৃত্তের মা বাবা দুজনি এলো । বৃত্ত তখন আয়না থেকে মুখ সরিয়ে ঘর থেকে বের হতে যাবে বাবা এসে ঘরে ঢুকে পড়লো, আর মা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তা দেখলো । বৃত্ত বাবাকে দেখে হেসে বলল,
" আব্বু কিছু বলবে ?"
"চলো খাবে ।"
বৃত্ত তারাতারি মায়ের দিক একবার তাকাল , চোখ সরিয়ে কোন কিছু না ভেবে সোজা বলল,
"হ্যাঁ চলো ।"
বৃত্তের মা কপালের মৃদু ভাজ ফেললো , এতো ডাকাডাকির পরেও যায় না আর আজ এতো সেজেগুজে কোথায় যাচ্ছ? বাবা ডাকতেই হ্যাঁ বলে দিল ?মুখ বাঁকিয়ে চলে গেল । বৃত্তের বাবা বৃত্তের কাঁধে হাত রেখে বলল,
"বউমাকে তাহলে খুঁজে পেয়েছ ?"
বৃত্ত ঘার ঘুমিয়ে তাকালো , মেকি সুরে বলল,
"তুমি কি করে বুঝলে ?"
"ছেলের চোখ সব বলে দিচ্ছে।"
বৃত্ত মাথা চুলকে হাসলো, বলল,
"ইয়ে মানে ...."
"আরে চলো কিছু বলতে হবে না । এবার বাড়িতে নিয়ে আসলে একদম বিয়ে করে আনবে ।"
"ঠিক আছে আব্বু ।"
বেশ হাসি মুখে বাবার সাথে গল্প করতে করতে খাওয়া শেষ করে উঠলো ।
কলেজের জন্য বের হলো , একটু হেটে গিয়ে সামনে একটা গাড়ি থামিয়ে উঠতে যাবে তখন বেশ কিছু টা দূরে চারুর মতো দেখতে কাউকে নজরে এলো , গাড়ি ছেড়ে দিল । দু হাত ভর্তি বাজার নিয়ে হেটে যাচ্ছি অন্য পাশ দিয়ে, বৃত্ত মৃদু হেসে সেদিকে পা বাড়ালো । ঘড়ির কাঁটায় তখন নয়টা ছুইছুই , সেদিকে তার খেয়াল নেই । চারু কোন দিক না তাকিয়ে যাচ্ছি, পেছন পেছন কাউ যেন ফলো করছিল এমন মনোভাব নিয়ে পেছন ফিরলো, কাউকে নজরে এলো না , সামনে ঘুরতেই 'ওমা 'বলে চিৎকার দিয়ে উঠলো , বৃত্ত দাঁড়িয়ে আছে । বৃত্ত হাসলো, একটু চারুর দিক ঝুঁকে বলল,
"ভয় পেয়েছ? "
চারু একটু পেছন দিক মাথাটা ঝুঁকিয়ে বলল,
"আপনার এই স্বভাব টা বড্ড অসহ্যকর । যখন তখন সামনে এসে দাঁড়ান । "
বৃত্ত এবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
"তার মানে ভয় পেয়েছ ?"
হাতটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
"নাও ছুঁইয়ে দাও ।"
চারু ছুলো না উল্টে প্রশ্ন করলো,
"আপনি এখানে কেন ।"
বৃত্ত হাত ঘুরিয়ে তার প্যান্টের পকেটে হাত গুজে বলল,
"তোমায় দেখতে এলাম ।"
চারু এদিক ওদিক আড় চোখে তাকাল । তারিঘরি করে বলল,
" সরুন সামনে থেকে ,যেতে দিন ।"
বৃত্ত চারুর হাত থেকে বাজারে ব্যাগটা হাতে নিয়ে নিল । বলল,
"চলো একসাথেই যাই ।"
চারু বাজারের ব্যাগ টা কেড়ে নিয়ে বলল,
" আমার হেল্প লাগবে না , আপনি আপনার কাজে যান ।"
পাশ কেটে চারু চললো । বৃত্ত ঘুরে চেঁচিয়ে ডাকলো ,
"চারু শুনছো? "
চারু দাড়িয়ে গেল , ঘার ঘুড়িয়ে পেছনে তাকাল , বৃত্ত ঠোঁট এলিয়ে হেসে বলল,
" দেখা হবে চিন্তা করো না ।"
চারুও চেঁচিয়ে বলে উঠলো ,
" দেখা না হওয়াই ভলো । "
"দেখা তো হবেই ।"
চারু গম্ভীর নিঃশ্বাস নিয়ে ফের হাটা ধরলো । বৃত্ত হেসে ঘড়িটার দিকে তাকালো, তখন নয়টা ত্রিশ বাজে । কপালে বিকট চিন্তা ফেলে একটা গাড়ি ধরলো ।
-----------------
এখন দুপুর, চারু তার মাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেল, ডাক্তার বলল,
"আপনার মাকে একদম বেড রেস্ট নিতে হবে, নিয়মিত খাওয়াতে হবে । আর পারলে আগের কিছু কিছু কথা মনে করতে সাহায্য করবেন । এতে সমস্যা টা তারাতারি দূর হয়ে যাবে । "
"ঠিক আছে ডক্টর আমি খুব করে খেয়াল রাখবো । "
"দুই সপ্তাহ পরে আবার আসবেন ।"
"আচ্ছা ।"
তারপর চারু মাকে নিয়ে বেরিয়ে একটা গাড়ি করে বাড়ি গেল ।
ঘড়িটার কাঁটায় যখন বিকেল চারটে নাগাদ তখন চারু আর লতা দোকান খুলতে বেরুল । চারুর মাকে বাড়িতে রেখেই গেল তার যে রেস্টের দরকার । দোকান এখনো খুলেই নি অথচ কয়েকটা মেয়ে এসে দাঁড়িয়ে দোকান খোলার অপেক্ষা করছিল । চারু আসতেই হেসে এগিয়ে গেল । বলল,
" আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম , জোরে ক্ষুদা পাইছে, তারাতারি দোকান খুলেন । "
চারুর বেশ ভালো লাগলো, চারু লতার দিক তাকিয়ে হাসলো । লতা বলল,
"আপু আপনারা ওই খানটাতে একটু বসে অপেক্ষা করুন , আমরা এখনি রান্না শুরু করে দিব ।"
মেয়ে গুলো গিয়ে বসলো । চারু দোকান খুলে চুলা জ্বালাল , তা দেখে একটা মেয়ে বলল,
"দিদি চুই ঝাল পাওয়া যাবে ?"
"হ্যাঁ আপু পাওয়া যাবে "
তাদের মধ্যে একজন হিন্দু ছিল সে বলল,
"গরুর মাংস ও কি এখানে রান্না হয় ?"
লতা এগিয়ে এসে বুঝিয়ে বলল,
"না আপু , এখানে অনেক হিন্দু ছেলে মেয়ে খেতে আসে তাই গরুর মাংস এখানে রান্না হয় না । চিন্তা করবেন না , কি খাবেন বলুন ?"
"খাসি হবে ?"
"হ্যাঁ হবে ।"
"আচ্ছা তাহলে খাসির চুই ঝাল আর ছেটানো রুটি ।"
অন্য মেয়েদের উদ্দেশ্যে বলল,
"আপনাদের কি দিব ?"
"আমাদের ও ।"
"আচ্ছা আপু আর একটু অপেক্ষা করুন । "
লতা জলদি গেল । চারুকে সব বলল । চারু একটা মিনিটও সময় নষ্ট না করে রান্না বসিয়ে দিল ।
আস্তে আস্তে লোকজন আসতে লাগলো । ,সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত ছুঁইছুঁই, এমন সময়ে লতা এসে কপালে বিরক্তির রেখা টেনে বলল,
" একটা কাস্টমার এসেছে ।"
"কি অর্ডার দিল ?"
"আমায় বলছে না কিছু বললো যে তোমার কাছে অর্ডার দিবে ।"
"আমার কাছে ?"
"হুমম , যাও অর্ডার নিয়ে এসো আমি এদিকটা দেখছি ।"
চারু হাতটা কোমরে বাঁধা গামছাতে মুছতে মুছতে গেল ।অন্য দিক মুখ ঘুরিয়ে বসে ছিল । চারু পেছন থেকে বলল,
" হ্যালো, আপনার অর্ডার দিন ?"
ঘুড়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে দাঁত বের করে হেসে বলল,
"বলেছিলাম না আবার দেখা হবে ?কেমন আছো শ্যামবতী ?"
চলবে ............