ফন্ট সাইজ:
থিম:
একগুচ্ছ শুকতারা

২৫তম পর্ব

লেখক: শারমিন ইরান

একগুচ্ছ শুকতারা

শারমিন ইরান

২৫.

দুপুর সাড়ে তিনটা।

সবে মাত্র বাসায় পৌঁছাল বিভা, মাহাথির ও তার আব্বা-আম্মা। ঘরে ঢুকেই সোফায় বসে শরীর ছেড়ে দিল মাহাথির। বিভা বসেও উঠে গেল। ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানি এনে দিল তার শ্বশুর, শাশুড়ি কে।

বিভা তাকাল মাহাথিরের দিকে। ধুলোতে চেহারা কালচে হয়ে গেছে, সাথে ক্লান্তিতে ঢেকে গেছে চেহারা। বিভা হাপ নিঃশ্বাস ছাড়ল। এই পৃথিবীর সবার জীবনই যেন এক একটা গল্প। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ এক একটি গল্প নিয়ে ঘুরে। কারোর গল্প পুরো পৃথিবী জানে, কারোর গল্প কেউ জানে না। কেউ না।

আজ ভার্সিটিতে এসেছিল বিভা। আজ যাওয়ার পথে হামিমের রিপোর্ট চেক করিয়ে নিয়ে যাবে। সেদিন শ্রুতি শুধু হামিমকে ডাক্তার দেখিয়েছিল, আজ রিপোর্ট দেবে সাথে বিভা ডাক্তারের সাথে কথাও বলে যাবে। মাঝে পেরিয়ে গেল একদিন। মাহাথির, আব্বা-আম্মা কারোর সাথেই তেমন কথা হয়নি। বিভা নিজেও তেমন কিছু জিগ্যেস করেনি বা বলেনি। নিজের কাছেই সব কেমন যেন ওলটপালট লাগছে। তার জীবনতো বিধ্বস্ত’ই; এখন কিনা জানছে তার স্বামীর জীবন তার চেয়েও বিধ্বস্ত।

.

‘ শ্রুতি, আমি অফিসে যাওয়ার পর আপনি প্রতিদিন কোথায় যান?’

পার্থিবের করা প্রশ্নে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল শ্রুতি। দেখল পার্থিব ঘরে ঢুকে এক হাত দিয়ে দরজা আটকে দিল। শ্রুতি কিছু বলল না। পার্থিব এগিয়ে গেল, ‘ আমি কিছু জিগ্যেস করেছি।’

‘ কাজে যাই পার্থিব। আর কোথায় যাব? এমনভাবে প্রশ্ন করছেন শুনে মনে হচ্ছে ডাকাতি করতে যাই।’

‘ কী কাজ সেটাই জানতে চাই।’ পার্থিবের গলাটা গম্ভীর শোনাল।

‘ আছে কোনো কাজ। সরুন।’ বলেই পা বাড়ালেও যেতে দিল না পার্থিব। হাত ধরে আটকে ফেলল, ‘আমি আমার প্রশ্নের উত্তর না পেলে আপনাকে ছাড়ব না।’

শ্রুতি এবার বেশ রেগে গেল আর বিরক্ত হলো। পেয়েছে টা কী লোকটা? দাঁত চেপে বলল, ‘ চাকরি খুঁজতে যাই। হ্যাপি?’

‘চাকরি কেন খুঁজবেন আপনি?’ পার্থিব এমন কথা আশা করেনি।

‘ খুঁজব না কেন? অবশ্যই খুঁজব। নিজের ভরণপোষণ করতে হবে না? আমার ভাইয়ের অপারেশন করতে হবে না? দুই বছর ভার্সিটি ড্রপ দিলাম। ভর্তি হব না?’

‘ আমি আছি কী করতে? আর আমি নিজেই তো আপনাকে পড়াশুনা করতে বলেছি। বলিনি? আপনাকে আগেও বলেছি, এখনো বলছি আমার ওপর ভরসা রাখুন।’

‘ আপনি টাকা দেবেন?’ শ্রুতি কৌতূহলী গলার প্রশ্ন করল। পার্থিব উত্তর দিল না, কেবল শান্ত চোখে তাকিয়ে রইল। শ্রুতি নিজে নিজেই বলল, ‘ গুড! প্রথমে টাকা, দ্যান খোটা। নাইস কম্বিনেশন।’

পার্থিব এগিয়ে গেল এক পা। শ্রুতির মুখোমুখি দাঁড়াল। ভরাট কণ্ঠে বলল,

‘ এতো অবিশ্বাস ভালো নয় শ্রুতি। সবাই এক নয়। নিজের বাবার ভালোবাসা থেকে প্রতারণা পেয়ে স্বামীর ভালোবাসায় আঙুল তুলছেন।’

‘ কারোর ভালোবাসায় আঙুল তুলছিনা আমি। আমি চাকরি করব ব্যাস! শেষ কথা। আপা বিজনেস করছে। সে একা করবে কেন? আমিও করব। আমি আপনার টাকা নেব না পার্থিব। আপনার দয়া আমার চাই না।’

‘দয়া, দয়া, দয়া। কী পেয়েছেন টা কী শব্দটার মধ্যে? আপনার মনে হয় আমি দয়া দেখাই? নিজের স্ত্রীকে দয়া দেখাব কোন দুঃখে আমি? শ্রুতিইই….দয়া আর সম্মান শব্দ দুটো আলাদা। আকাশ পাতাল তফাৎ। দুটোকে এক করবেন না। ভুলেও না। আমি আপনাকে সম্মান করি। নিজে নিজের অসম্মান করবেন না।’ নিজের কণ্ঠে রাগ মিশিয়ে কথাগুলো বলল পার্থিব। পার্থিবের কথায় শ্রুতি একটু পিছিয়ে গেল। পার্থিব চিৎকার করেনি, শুধু রাগের সাথে কথাগুলো স্বাভাবিক স্বরে বলেছে, সাথে চোখে মুখে রাগের রেশ তো আছেই। এতেই ভয় পেয়ে গেল শ্রুতি। এর আগে পার্থিবের এমন কণ্ঠ শোনেনি সে। সবসময় মিষ্টি, সরল কণ্ঠে কথা বলেছে। তাই এখনের সামান্য উচ্চস্বরের কথাই শ্রুতির কাছে বিশাল কিছু মনে হলো। চোখ নামিয়ে নিল সে।

পার্থিব ঘুরে গেল অন্যদিকে। শ্রুতি স্পষ্ট দেখতে পেল পার্থিবের মুষ্টিবদ্ধ হাত। অন্যদিকে ঘুরে পার্থিব জোড়ে জোড়ে শ্বাস নিল। নিজেকে শান্ত করে ফিরল শ্রুতির দিকে। আলতো হাতে দু গাল ধরল,

‘ আমাকে রাগাবেন না শ্রুতি। আপনার ওপর রাগতে চাইনা। আমার রাগ আপনি সহ্য করতে পারবেন না। সামান্য ধমকেই ভয়ে পিছিয়ে গেলেন। আর যদি রাগ করি তাহলে আরোও কষ্ট পাবেন। আমি আমার বউকে কষ্ট দিতে চাচ্ছি না। কারণ আমি জানি সে যতোই ওপরে ওপরে নিজেকে শক্ত দেখাক না কেন, সে একদমই শক্ত কোনো ব্যক্তিত্ব নয়।’

শ্রুতি তাকাল পার্থিবের দিকে। পার্থিব সরলভাবে হাসল। শ্রুতি মনে মনে বেজায় রেগে গেল। পার্থিবের কথাকে নেতিবাচকভাবে গ্রহণ করল। এই গুণটা তার বাবা আমিন শিকদার প্রদত্ত। কারোর কথা সহজে সে মানে না, মানতে পারেনা। রাগ, হয়, জেদ হয়, নিজেকে ছোট মনে হয়।

ভিতরের জেদ ছিটকে বেরিয়ে আসতে চাইল। দুই হাত দিয়ে ধাক্কা দিল পার্থিবের বুকে, ‘ আমার ব্যাপারে নাক গলানো বন্ধ করুন পার্থিব। আমি আপনাকে ভয় পাইনা। আর শুনেন….নাতো আমি আপনার সাহায্য চাই, নাতো আপনাকে চাই, আর না আপনার সংসার। আপনার সংসার আমি করব না। খুব তাড়াতাড়িই চলে যাব।’

জেদের বশে কথাগুলো বলে চলে গেল শ্রুতি। পার্থিব স্থির তাকিয়ে রইল মেঝের দিকে। তার গা/ধাবউ এর ব্যবস্থা এইবার করতেই হবে।

.

হাসিনা বিভার ঘরের দরজায় দাঁড়াল। অনেক স্নেহ মিশিয়ে ডাকলেন, ‘কাজ করো আম্মা?’

বিভা তাকাল। এমন ডাক আশা করেনি। সুন্দর হেসে বলল, ‘না, আম্মা। ভেতরে আসেন।’

হাসিনা ঢুকলেন। দেখলেন বিভার হাতে চিরুনি। হাসিমুখে হাত থেকে চিরুনি নিজের হাতে নিল, ‘চলো একটু গল্প করি। ওই ঘরে আসো?’

বিভা সায় দিল। গেল নিজের শাশুড়ির ঘরে। শ্বশুর ঘুমাচ্ছেন। জ্বর, ঠান্ডায় কাহিল হয়ে পড়েছেন লোকটা।

মাহাথির কোথায় যে গেছে কে জানে!

শাশুড়ি খাটে বসে বিভাকে চোখের ইশারা দিল। চোখের ইশারায় বিভা নিচে বসে গেল। বিভার চুলগুলো ধরে ধরে দেখতে লাগল হাসিনা। কিছুসময় পর চুলে চিরুনি দিল সাথে প্রশ্ন করল,

‘ আমারে মনে আছে তোমার? ছোটোবেলায় আমারে দেখসিলা।’

‘ না, নেই।’

‘ আমি তোমার মায়ের দূরসম্পর্কের চাচতো বোন লাগি। শরিক ছিলাম তোমার মায়ের। বিয়ের আগে কতো খেলসি দুইজন। বিয়ের পরেও বাপের বাড়ি আসলে দেখা হইতো। আর আমার তো গ্রামেই বিয়া হইল। তোমারে ছোটোবেলায় কোলেও নিসি। ছোটোবেলায় অনেক চঞ্চল ছিলা। এখন তো একদম নদীর মতো শান্ত হইসো।’

বলেই সামান্য শব্দ তুলে হাসল হাসিনা। এরপর কিছু সময় পার হলো নিঃশব্দে। হাসিনা শ্বাস ছাড়লেন। গল্প বলার মতো খুব আগ্রহ নিয়ে বলতে লাগলেন, ‘ তখন আমার সংসারের চার বছর চলে কেবল। ভালো সময়ই কাটতেসিল সবার। সমস্যার মধ্যে সমস্যা ছিল আমার কোলে বাচ্চা ছিল না তাই’ই। শাশুড়ি উঠতে, বসতে কথা শুনাইতো। পাড়া-প্রতিবেশি তো আছেই। সিদ্দিকীর বউ বন্ধ্যা আরোও কত কী যে বলতো! সব শুনতাম আর সন্তানের দোয়া করতাম। কোনো কবিরাজি ঝাড়-ফুঁক বাদ রাখিনাই। এমন করতে করতে যখন পাঁচ বছরে গিয়া পড়লাম, তখন সিদ্ধান্ত নিলাম এতিমখানা থেকে বাচ্চা আনুমু। তোমার শ্বশুরও রাজি। আল্লাহ আমারে ভাগ্য কইরা স্বামী দিসিলো। কতোজন যে তারে বুঝাইছে দ্বিতীয় বিয়ার কথা; সে করে নাই।’

এই পর্যায়ে এসে শ্বাস নিলেন হাসিনা। হতাশা, দুঃখ, যন্ত্রণা গুলো যেন বেরিয়ে এলো। বিভার চুল ভাগ করল। হয়তো বেনি পাকাবে। সাথে শুরু করল নিজের জীবনের গল্পের পরবর্তী অংশ, ‘ দুইজন মিলা একদিন টাঙ্গাইল শহরে গেলাম। আশপাশ বলতে ওই জায়গাটা কাছে মনে হইল। এতিমখানার সামনে দাঁড়াইয়া আবারো থম ধইরা ভাবলাম যে আসলেই যা করতাসি তা ঠিক কিনা। তোমার শ্বশুর আমার হাত ধইরা সাহস দিল। আমিও ভরসা পাইয়া পা বাড়াইলাম তোমার শ্বশুরের সাথে। ওইখানেই আবার তোমার শ্বশুরের চেনা পরিচিত ভাই ছিল। তার সাথে কথা হইল। সে এক বাচ্চার দিকে দেখাইয়া বলল, ‘এই বাচ্চারে নেন, ভাবী। ছোট, কিছু বুঝব না। আপনাদের আদবে বড় হবে। কখনো জানবেও না আপনারা ওর আসল বাপ-মা না।’ আমি তার কথা শুনলাম কিন্তু তাকাইলাম না বাচ্চাটার দিকে। আমি তখন তাকাই আছি দূরে এতিমখানার পুকুর পাড়ে বসা একটা বাচ্চার দিকে। সাত/আট বছর বয়স। বাচ্চাটার মুখ কী শান্ত, মায়া মায়া ভাব। আমি জিগ্যেস করলাম ওই বাচ্চারে নিতে পারব কিনা। ভাই বলল পারব। আমি গেলাম বাচ্চাটার কাছে। বাচ্চাটা মুখ তুইলা তাকাইল। শান্ত বাচ্চার চোখে ভাসা ভাসা পানি দেইখা নিজেরে ঠিক রাখতে পারলাম না। ঠিক করলাম ওরেই দত্তক আনব। সিদ্দীকও রা করল না। দুইজনে মিলা যা কাগজপত্রের কাজ ছিল সব করলাম। এরপর বাচ্চাটারে আমাদের সাথে কইরা নিয়া আসলাম। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক কথা বাচ্চাটা তখন পর্যন্ত একটা কথাও বলে নাই। হইয়া গেলাম আমি মাহাথিরের মা। বাচ্চাটার কাগজপত্রে নাম ছিল মাহাথির। আমি ভালো নাম দিলাম মাহাব। তাও মুখ দিয়া মাহাথিরই বাইর হয়।’

থামলেন শাহিনা। কিছু সময় পর আবার বলতে লাগলেন, ‘ বাচ্চাটারে নিয়া বাসায় আসার পর ঝামেলার ওপর ঝামেলা হইল। বাচ্চাটা কেবল দেখল সবার ঝগড়া। একদম কথা বলতো না জানো? কথা বলল তিন/চারদিন পর। তাও কী বলল- আপনারা আমার কী লাগেন? ওরে বললাম বাবা-মা লাগি। শুইনা কিছুই বললনা। থম ধরে জায়গায় জায়গায় বইসা রইল। হাজার বুঝাইলাম, কাজ হইল না। এমন কইরাই এক্কেবারে ছয় মাস কাটল। ছয়মাস চৌদ্দ দিন পর প্রথম ডাকল আব্বা, আম্মা বইলা। কী যে খুশি হইসি সেদিন! তোমার শ্বশুর তো মসজিদে যাইত মাহাথির রে নিয়া আর সবাইরে ডাইকা ডাইকা বলত - আমার ছেলে, আমার ছেলে। সে যে এতো খুশি হবে বুঝি নাই। তার দুইমাস পরেই আসল আরেক খুশির খবর। মাহিম আসল পেটে। আমি ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এই খবরে শাশুড়িও অনেক খুশি হইল। সে মাহাথিররে প্রথমে না মানলেও মাহিমের খবর শুইনা মানল। আমার খালি সংসার ভরা সংসার হইয়া ধরা দিল।’

বেনি পাকানো শেষ। তবুও মাথায় হাত বুলাতে থাকলেন হাসিনা। বিভা ঘুরল। হাসিনা মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল। শান্ত কণ্ঠে বলল, ‘ মাহাথির মুখে প্রকাশ করে কম। সে প্রকাশ করেনা তাও আমি বুঝি যে আমাদের কতো ভালোবাসে! কত কাহিনী যে আছে ওর। বড় হইয়াও ছোটবেলার অভ্যাস গেলনা। এখনো আগের মতো চুপচাপ।’

হাসিনা কথা চালাতে পারছে না, কষ্ট হচ্ছে। তবুও বলল, ‘ মাহাথির আমার পেটে না হইলেও ও আমার ছেলে বিভা। ওরে একুশ বছর পালছি আমি। তুমি আমাদের ভুল বুইঝ না, মা।’

বিভা চোখ তুলে তাকাল, ‘ভুল কেন বুঝব?’

‘তোমার স্বামী এতিম বইলা তোমার খারাপ লাগতে পারে। ও এতিম না, ও আমাদের ছেলে। ও খুব ভালো। শুধু বিয়ে করতে চাইতো না, মাহিম ভালোবাইসা ২১ বছরেই বিয়ে করল, ওর বিয়ার খবর নাই। সম্পর্কে বিশ্বাস করতে পারেনা। তাই বন্ধুবান্ধব ও নাই। একজন আছে কেবল। আনাস। ওর দুনিয়া খুব ছোট। ভালোবাসার মানুষ কম।

বিয়াতে জোড় করে রাজি করাইসি আমি। শেষে নিজেই সম্মতি দিসে। ও একটু রাগ দেখাইলেও ভালো বিশ্বাস করো। একটু মানাই চলো আর অনেক ভালোবাসো। দেখবা ও তোমারে হাজারগুণ বেশি ভালোবাসব। ভালোবাসবা না মা?’

বিভা মাথা নাড়ল। হাসিনা উত্তর পেয়ে হাসলেন। বিভার মাথায় হাত বুলালেন।

মাহাথির এতিম, অনাথ — এটা জানার পর বিভার মনে মাহাথির সম্পর্কে নতুন কোনো ধারণা তৈরি হয়নি, কিংবা সে নতুন কিছু ভাবেওনি। শুধু তার সবকিছু এলোমেলো লেগেছে। হয়তো এমন কিছু আশা করেনি সে।

বিভা কেবল ভাবল, তার শৈশব সুন্দর ছিল কিন্তু এর পরের জীবনটা না। অন্যদিকে, মাহাথিরের শৈশব সুন্দর ছিলনা। বাদ বাকি জীবন কেমন কাটিয়েছে তা বিভা জানেনা। কেবল জানে, সে মাহাথিরকে ভালোবাসবে। অনেক ভালোবাসবে। ভালোবেসে তার বর্তমান, ভবিষ্যত সুন্দর করে দেবে। একদম অন্ধকার রাতে তারার আলোর মতো সুন্দর।

.

ভাইয়ের রুমে বসে ছিল শ্রুতি। শাশুড়ির ডাকে নিচে নেমে এলো। নেমে আসতেই দেখতে পেল সবাই আছে। শ্রুতি তার শাশুড়ির কাছে যেতেই তিনি বললেন, ‘শ্রুতি, দেখো তোমার শ্বশুর কী এনেছে তোমার জন্য?’

শ্রুতি তাকাল। দেখল একটা বড় বোলের মধ্যে ৩/৪ টা কাঁঠাল। সামনেই তার শ্বশুর বসা। শ্রুতি অবাক হলো। চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকাল তানহা বেগমের দিকে। তানহা বলল, ‘ তুমি কালকে বললে না যে তোমার ফলের মধ্যে কাঁঠাল প্রিয়। সেটা শুনেই তোমার শ্বশুর কাল সন্ধ্যায় গ্রামে গেল। গাছে যত কাঁঠাল ছিল, নিয়ে এলো। ঢাকার কাঁঠালে তো মজা নাই। তাই কাল রাতে গেল, এক রাত থেকে আজ নিয়ে এলো। আসতে আসতেই সন্ধ্যা। আরোও আনবে বুঝলে? এখন তো কাঁঠাল ছোট ছোট তাই। বড় হোক, আরোও আনবে।’

হিয়া এসে উৎসাহের সাথে শ্রুতির হাত ধরল। বলল, ‘ বড়বাবা এমনই শ্রুতি। একবার বললাম আমার ড্রাগন ফল পছন্দ। সকালে উঠে ফ্রিজ খুলে দেখি ফ্রিজ ভর্তি ড্রাগন ফল।’

শ্রুতি হাসল। মন থেকে হাসল আসাদ সাহেবের দিকে তাকিয়ে। আসাদ সাহেব গম্ভীর গলায় বলল, ‘ তোমরা কথাই বলবে, নাকি কাঁঠাল ভেঙে দিবে ওকে?’

তানহা, রুমা বেগম কাজে লেগে পড়লেন। শ্রুতি পার্থিবের দিকে তাকাল। পার্থিব শান্ত ভঙ্গিতে উপরে চলে গেল।

শ্রুতি তাকালে পার্থিব হাসে। এখন হাসল না। হাসতে কী ভুলে গেছে? শ্রুতি বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল। তার কী পার্থিবকে গিয়ে জিগ্যেস করা উচিত যে, আপনি আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন না কেন? নাহ! জিগ্যেস করা উচিত নয়। তার আচরণের পরে এইসব জিগ্যেস করতে চাওয়ার ইচ্ছা আনাও অন্যায়।

.

বিভা রুমে ঢুকল। রাত ১১ টা ২০ বাজে। প্রতি রাতে মাহাথির চা খায়। চা ছাড়া তার চলেনা। বিয়ের প্রথম প্রথম নিজে বানিয়ে খেত। এরপর একদিন বিভা দেখতেই বিভা বানিয়ে দেয়।

বিভা নিজের হাতের কাপের দিকে তাকাল। চা টা সে খুব যত্ন নিয়ে বানিয়েছে। শুধু আজ নয়, প্রতিদিনই বানায়।

বিভা চা নিয়ে মাহাথিরের সামনে ধরল।

মাহাথির বাইরের দিকে তাকিয়েই কাপ ধরল। বিভাও বাইরের দিকে দেখতে লাগল। চায়ে চুমুক দিয়ে মাহাথিরের প্রশ্ন,

‘ কেমন লাগল এতিম স্বামীর জীবনকাহিনী শুনতে?’

প্রশ্ন করেই ভ্রু কুঁচকে তাকাল নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে। বিভা বুঝল হাসিনা যে তাকে এইসব বলেছে তা মাহাথির শুনেছে। বিভা স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, ‘ ভালো লাগলো। তবে জেনেও তেমন কিছু হলোনা। আগে আপনি আমার যা ছিলেন, এখনো তাই আছেন।’

কিছু মনে পড়ল বিভার। মাহাথিরের দিকে তাকিয়ে উৎকন্ঠিত হয়ে বলল, ‘ বিকালেও আপনার মাথাব্যথা ছিল। মাইগ্রেনের ঔষধ খেয়েছেন? নয়তো রাতেও ব্যথা করবে। ঔষধ নিয়ে আসি এখানে?’

বিভার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল, ‘ আমার এতো যত্ন কেন করো?’

‘ ভালোবাসার যত্ন করতে হয় মাহাথির।’

‘ আমাকে ভালোবাসো?’

বিভা উত্তর দিল না। এই প্রশ্নের উত্তর সে সরাসরি দিতে পারে না। মাহাথির আকাশে তাকিয়ে বলল, ‘ তুমি আমাকে ভালোবাসো না বিভা। ইনফ্যাক্ট কেউ কাউকে এই পৃথিবীতে ভালোবাসে না। সবাই স্বার্থপর। তুমিও, আমিও, সবাই।’

কিছুক্ষণ থেমে ফের শুরু করল, ‘ সবার টা অবশ্য জানিনা। তবে তোমার আমার মাঝে যে ভালোবাসা নেই এইটা সত্যি। ভালোবাসতে সম্পর্কের প্রয়োজন হয়। যেমন ধরো বাবা-মায়ের সাথে সন্তানের রক্তের সম্পর্ক। তাই বলা যায় একটা টান থেকে ভালোবাসা হয়েই যায়। কিন্তু তোমার সাথে আমার কীসের সম্পর্ক? তুমি বলছো তুমি আমাকে ভালোবাসো। কেন ভালোবাসো, কেন যত্ন করো বলো? আমাদের মাঝে কোনো রক্তের সম্পর্ক তো নেই। হ্যাঁ, আছে। শারীরিক সম্পর্ক। আমি কী ধরে নিব তুমি এই কারণে আমাকে ভালোবাসো? কে হই আমি তোমার?’

বিভা চোখ তুলে তাকাল মাহাথিরের দিকে। তার কণ্ঠে কী বিদ্রুপ ছিল? এই পর্যায়ে এসে বিভার মনে হলো মাহাথিরকে সে ভালো না বাসলেও পারতো। ভালোবাসা বলে কয়ে আসে না, হয়ে যায়। কীভাবে হয়, কী দেখে হয় বিভা তা জানেনা। যদি বিভা জানতো তবে মাহাথিরকে ভালোবাসা মতো কাজ সে করতো না। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। বুক ভার হয়ে আসছে। বিভাকে ভালো না বাসুক, বিভার ভালোবাসাকে কেমন করে অসম্মান করে সে?

আজ এখানে দাঁড়িয়ে মাহাথির নামক পুরুষ টাকে ভীষণ দূরের মনে হলো। অচেনা, অজানা, এক পাষাণ লোক যার কাছে বিভার কষ্ট, ভালোবাসা কিছুই পৌঁছায় না।

কিছুসময় পর মাহাথিরের চোখে চোখ রেখে নিজের চোখে ভাসা অশ্রু নিয়ে বিভা বলল, ‘ আপনি আমার অনেক কাছের পরমানুষ।’

মাহাথির গম্ভীর চোখে দেখল বিভার চোখ থেকে পড়ে যাওয়া এক বড় অশ্রুকণাকে।

বিভা কাপ হাতে নিয়ে মাহাথিরের দিকে তাকিয়ে মলিন হাসল। এরপর চলে গেল ঘরে। মাহাথির বিভার চোখের অশ্রু দেখল, তার চলে যাওয়া দেখল, কেবল অনুভব করতে পারল না বিভার কণ্ঠের যন্ত্রণা। যদি পারত তবে হয়তো তার বুক কেঁপে উঠত। মাহাথির আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন ছুঁড়ল,

‘ অনেক কাছের পরমানুষ?’

______

চলবে~

শব্দসংখ্যা - ২২১০

#একগুচ্ছ_শুকতারা

#শারমিন_ইরান

[ মনমতো হলোনা লেখা। দুঃখিত। ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন