একগুচ্ছ শুকতারা
শারমিন ইরান
২৮.
বিভা, শ্রুতি, হামিম। তিন ভাই-বোন।
বলা যায় তিনজনই পরিস্থিতির চাপে শান্ত প্রকৃতির। বিশেষ করে বিভা, শ্রুতি।
তাদের দুইবোনের আচার-আচরণে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। দু’জনেই প্রিয় মানুষদের সামনে চঞ্চল, আবার দু’জনেই শান্ত। অমিল নেই ব্যাপারটা তেমনও নয়। বিভা-শ্রুতির মধ্যে সবচেয়ে বড় অমিল শ্রুতি ছোট থেকে যতো ঝা মেলা পাকিয়েছে, বিভা তার একভাগও পাকায়নি। উলটো সমাধান করেছে।
শ্রুতির ঝামেলা পাকানো যেন রক্তে মিশে গেছে। তাইতো এখনো একটা ঝামেলা পাকিয়ে ফেলেছে। নিজে নিজেই হামিমকে বিভা-মাহাথিরের কাছে দিয়ে এসেছে। এই কাজের পেছনের কারণ হলো পার্থিবের ওপর রাগ। পার্থিব লোকটার ভাব বহু বেড়েছে। তার সাথে কথা বলেনা। প্রয়োজনীয় কথা ছাড়া মুখ দিয়ে কথা বেরই হয়না। তাকে এড়িয়ে চলে। শুধু হামিমের সাথে গল্প করে। মেনে নেওয়া যায় এইসব ভাব? তারওপর গতকাল নাকি আবার কোন কাজে চলে গেছে। তাই শ্রুতিও ভাইকে আপার কাছে দিয়ে এসেছে, পার্থিবকে না বলেই। এমনিতে পরিবারের সবার কাছেই বলেছে যে বিভা হামিমকে নিজের কাছে রাখতে চায়। বিভা কিছুদিন রাখার পর আবার সে নিয়ে আসবে। কেউ আর কিছুই বলেনি। আসাদ সাহেবও কেবল হামিমের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছে আর শান্তকণ্ঠে বলেছে, সাবধানে যেও, দ্রুত ফিরে এসো বোনের কাছে।
তানহা বেগম অবশ্য জিগ্যেস করেছিল পার্থিব জানে কিনা এই ব্যাপারে। শ্রুতি বানোয়াট কাহিনী বলে বুঝিয়েছে।
এখন সে গাড়িতে বসে আছে। বাড়ির গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছিল।
পার্থিব বাসায় ফিরবে পরশু। এই দু'দিনে নিশ্চয়ই জানবে হামিমের কথা। আর না জানলে আরোও ভালো। এসে হামিমকে না দেখে নিশ্চয়ই শ্রুতিকে জিগ্যেস করবে, রাগ করবে, তখন শ্রুতি সামনে থেকে দেখবে আর মজা নিবে। একদম ঠিক হবে। অস/ভ্য, বেয়া/দব, ফা/লতু লোকদের সাথে এমনই হওয়া উচিত।
শ্রুতি ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসল। এতো ভালো কাজ সে করে কীভাবে?
শ্রুতির হঠাৎ মনে পড়ল দাদীর কথা। ঠিক করল কিছু ফলমূল নিয়ে দেখতে যাবে দাদীকে। মানুষটাকে শ্রুতি ভীষণ ভালোবাসে। আগে তো এই মানুষটাই তাদের আগলে রেখেছে। অথচ এখন তেমন করে কথাও হয়না। দেখা হয়েছে তাও দেড় মাস হয়। আগে যেখানে সারাদিন দাদীর সাথে কাটতো, এখন সেখানে পাঁচ/দশ মিনিট ফোনে কথা বলে রেখে দিতে হয়। সামনে থাকা আর ফোনে কথা বলা এক হয় বুঝি?
.
মাহাথির, হামিম, হাসিনা, সিদ্দীক সাহেব বসে আছে একসাথে। বিভা রান্নায় ব্যস্ত তার ভাইয়ের জন্য। আজ হামিম যা পছন্দ করে বিভা তাই রান্না করবে। হাসিনাও এতোক্ষণ যাবত রান্নাঘরেই ছিল। মাত্র এসে বসল ফ্যানের নিচে।
হামিমের সাথে হাসিনা, সিদ্দীকের যাবতীয় পরিচয় পর্ব শেষ। বর্তমানে হামিম আর মাহাথির মিলে Subway Surfers গেমস খেলছে একসাথে। শুধু শুধু বসে থাকার চেয়ে গেমস খেলে সময় পার করা অনেক ভালো। হামিম প্রথমে খেলতে চায়নি, মাহাথির নিজে নিজে খেলার পর সে ফোন টান দিয়ে বলল, আমি খেলব। এরপর দুজন মিলেই খেলা শুরু করল।
মাহাথির তাকিয়ে আছে হামিমের দিকে। হামিমের মুখটা স্বাভাবিক। খুব মনোযোগ দিয়ে গেমস খেলছে। দেখতে ভালো লাগছে মাহাথিরের কাছে। এরইমাঝে মায়ের ডাকে চোখ তুলে তাকাল মাহাথির,
‘ কিছু বলবেন আম্মা?’
‘ তোমার সাথে কিছু জরুরি কথা আছে।’ হাসিনার কণ্ঠটা বেশ দৃঢ় শোনাল।
‘ বলেন আম্মা। শুনছি তো।’
হাসিনা একবার রান্নাঘরের দিকে তাকাল। এরপর মাহাথিরের দিকে দৃষ্টি নিয়ে বলল,
‘ তুমি এখনো সম্পর্কটা স্বাভাবিক করো নাই?’
মাহাথির তাকিয়ে রইল। সে বুঝেছে তার আম্মার প্রশ্ন। তবে এই ব্যাপারে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। তবুও বলল, ‘ আমাদের সম্পর্ক স্বাভাবিক আছে আম্মা।’
‘ মিথ্যা বলবানা মাহাথির। তোমার আচার আচরণে প্রকাশ পায় তুমি এখনো স্বাভাবিক হও নাই। মানো নাই বিয়াটা।’
মাহাথির কিছু বলল না। হাসিনা আবারো বলল নিষ্প্রভ কণ্ঠে, ‘ বিভা মাইয়াটা ভালো। অযথা কষ্ট দিও না। পরে পস্তাইবা।’
মাহাথির নিজের ঠাঁট বজায় রাখল, ‘ আমি তো বিভাকে কষ্ট দেই না আম্মা। ওকে কী আমি নির্যা/তন করি? জিগ্যেস কইরেন তো ওকে।’
ছেলের এমন কথায় আশাহত হলেন হাসিনা, ‘ শারীরিক নির্যা তনের থেকেও বড় মানসিক নির্যা তন। তুমি ওরে মানসিক ভাবে নি র্যাতন করতেসো।’
হাসিনার ভীষণ খারাপ লাগল। তার ছেলে এমন করছে কেন? সে কী বুঝতে পারছেনা যে এইভাবে সে নিজের জীবনটাকে নষ্ট করছে? হাসিনা দৃঢ় কণ্ঠে বলল, ‘ সময় থাকতে মূল্য দেও। মন থেকে উইঠা গেলে কাঁইদাও কুল পাইবানা।’
মাহাথির হতাশ শ্বাস ফেলল। সবাই তাকে পেয়েছেটা কী? জোড় করে ভালোবাসবে কীভাবে? কথাটা ভেবেই মাহাথির নিজেই আবার ভাবল সে কী কখনো বিভাকে মন থেকে কখনো মানার চেষ্টা করেছে? সে তো জেদ ধরেই বসে আছে।
নিজের জেদের মধ্যে দিয়ে মাহাথির বুঝতেও পারল না যে সে মনে মনে বিভাকে মেনে নিয়েছে, শুধু উপরেই নাকচ করে। ইতোমধ্যে বিভা তার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছে।
.
শ্রুতি বারান্দায় বসে আছে ভ্রু কুঁচকে। সে বর্তমানে তার মনের ইচ্ছেকে খু/ন করতে ব্যস্ত। তার মনের ইচ্ছা হলো পার্থিবকে খু/ন করা। অথচ সে এখন তা করতে পারছেনা। সকালে পার্থিব তাকে ফোন দিল। ফোন দিয়ে শুধু জিগ্যেস করল,
‘ শ্রুতি, আমি শুনলাম আপনি নাকি হামিমকে রেখে এসেছেন। কথাটা কী সত্যি?’
পার্থিব জানে, তবুও জিগ্যেস করা। শ্রুতিও গম্ভীরকণ্ঠে বলল, ‘ হ্যাঁ, সত্যি।’
‘ কাজটা কী ঠিক হয়েছে শ্রুতি? একবারো কী আমাকে বলা প্রয়োজন ছিলনা? মাহাথির ভাইকে বলেছিলাম আমি গিয়ে দিয়ে আসব। আমি আসা পর্যন্ত কী অপেক্ষা করা যেতনা?’
পার্থিবের প্রশ্নে শ্রুতির মনে হলো সে আসলেই ভুল করেছে। কিছুই বলল না সে। সত্যি বলতে আসলেই অনুতপ্ত বোধ হচ্ছে এখন।
অবশ্য এখন বোধ হয়েই বা কী হবে, যা করার তা তো সে করে ফেলেছে। শ্রুতি ভাবল সে সরি বলবে পার্থিবকে। শ্রুতির বলার আগেই পার্থিবের শান্ত কণ্ঠ ভেসে এলো, ‘ ভালো থাকবেন শ্রুতি। রাখছি।’
শ্রুতি অবাক এবং মন খারাপ করে নিজের ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
কিছুদিন ধরে শ্রুতি একটা কাজ করছে। কাজটা ভীষণ ভয়ং/কর। আর তা হলো — নিজের শ্বশুর অর্থাৎ আসাদ সাহেবের সাথে সময় কাটানো। লোকটা গম্ভীর হলেও নরম তা শ্রুতি বুঝেছে। সেই থেকেই উনার ঘরে এসে চুপচাপ বসে বসে কথা বলে। অন্যান্য দিন সাধারণত রাতে কিংবা সন্ধ্যায় আসত। আজ হামিম নেই, সময় কাটছে না, সেই সাথে তার শ্বশুরও বাসায়। তাই আজ শ্রুতি বিকেলবেলাতেই এলো। সাথে নিয়ে এলো দু কাপ কফি, বিস্কিট।
ঘরে ঢুকতেই শ্রুতি দেখল তার শ্বশুর পাঞ্জাবি পড়ে চোখে চশমা দিয়ে গভীর মনোযোগের সাথে কাজ করছে। এখনো শ্রুতিকে খেয়াল করেনি। শ্রুতি কী চলে যাবে? শ্রুতি ঘুরতে নিলেই তার গম্ভীর শ্বশুর সরল গলায় ডেকে উঠল,
‘ চলে যাচ্ছো কেন? আসো।’
শ্রুতি ঘুরে নিজের হাতের ট্রে সহ বসল ছোট টেবিলে।
আসাদ সাহেব শ্রুতির আনা কফি দেখে নিজের অপরপাশ থেকে চায়ের খালি কাপ নিচে নামিয়ে রাখল। কাজ করতে করতে সে চা খায়। চা তার ইতোমধ্যে খাওয়া শেষ। তবুও সে শ্রুতিকে কিছু বলল না। মেয়েটা শখ করে তার জন্য এনেছে, বাবা হিসেবে তার খাওয়া উচিত।
শ্রুতি ধীরে ধীরে কফির কাপ বাড়িয়ে দিল। আসাদ সাহেব তা দেখে হেসে ফেলল। মেয়েটা বাচ্চাদের মতো কাজ করে। আসাদ সাহেব ট্রে থেকে আরেক কাপ উঠিয়ে শ্রুতির দিকে দিয়ে বলল, ‘ বাবাও খাক, মেয়েও খাক।’
কথাটা শুনে শ্রুতি চমৎকার করে হেসে ফেলল। কী সুন্দর কথা!
কাগজপত্রের পাশে কিছু একটা লক্ষ্য করতেই আসাদ সাহেব ভ্রু কুঁচকে লাইন কেটে ফেলল।
পার্থিব এদিক থেকে অবাক হয়ে গেল। সে তার বাবার সাথে ভিডিও কলে ছিল। বাবার বয়স হয়েছে, অনেক কিছুই বুঝেনা। তখন পার্থিব তাকে সাহায্য করে। এতোবছর ধরে যে বাবা তাদের সাথে ব্যবসা সামলেছে এই কতোনা!
বাবার সাথে শ্রুতিকে নিয়ে পার্থিবে আগেও কথা হয়েছে। সে জানতে পেরেছে শ্রুতি তার বাবার সাথে গল্প করে। আজ চোখেও দেখে নিল। ভালোভাবে অবশ্য দেখেনি। ফোনের এংগেলটা ঠিক ছিলনা। শুধু শ্রুতির হাতের ট্রে দেখা যাচ্ছিল। আর টুকটাক কথা শুনতে পাচ্ছিল। পার্থিব কপালে ভাঁজ ফেলে ভাবল, তার বউ দেখি সে বাদে বাকি সবার সাথেই ভালো। তার মধ্যেই কী কোনো সমস্যা আছে নাকি?
আসাদ সাহেব কফি খেতে খেতে টুকটাক গল্প করতে লাগলেন। গল্পের মাঝেই আসাদ সাহেব বললেন,
‘ ভালো কথা মা। তোমার বাবা আসছে কয়েকদিনের মধ্যেই।’
শুনে শ্রুতির ভালো মনটা খারাপ হয়ে গেল। বুঝল না শ্বশুর এর কথা। ফট করে বলে দিল, ‘ তার আসার কী দরকার?’
উগ্র কণ্ঠে নয়, সাধারণ ভাবেই প্রশ্ন করল শ্রুতি। আসাদ সাহেব বলতে লাগলেন,
‘ বেয়াই আসবে আসলে বিজনেসের ব্যাপারে। অনেক বড় একটা প্রজেক্ট। এই প্রজেক্টের ব্যাপারেই তার সাথে আমার পরিচয় হয়। তবে এতোদিন শুরু করা হয়নি। কিছুদিন পর থেকে শুরু হবে। এই প্রজেক্টে ৭০% লাভ তোমার বাবার হবে। বাকি ২০% আমার সহ কিছু কম্পানির।’
শ্রুতি শুনে কিছু বলল না। মনে মনে আঁটতে লাগল কীভাবে তার বাবার বিরুদ্ধে নতুন ঝা মেলা পাকানো যায়।
____
চলবে~
শব্দসংখ্যা - ১১৪৫
#একগুচ্ছ_শুকতারা
#শারমিন_ইরান