একগুচ্ছ শুকতারা
শারমিন ইরান
৩১.
সোফাতে বিমর্ষ মুখে বসে আছে শ্রুতি। মাথার পিছন দিকে অসহ্য ব্যথা করছে। সবকিছু বিষাক্ত, তেঁতো, পানসে লাগছে। অথচ তার আশেপাশের মানুষের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন। সবাই কাজে ব্যস্ত। তার শাশুড়ি, চাচিশাশুড়ি থেকে সবাই টুকটাক কাজে আছে।
আজকে সবথেকে বেশি ব্যস্ত হওয়ার কথা ছিল শ্রুতির। এর কারণ আমিন শিকদার আসছে। বাবা মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে এলে মেয়ের ব্যস্ততাই হয়তো সকলের কাম্য থাকে।
ধুর! যা করার তা তো সে করেই ফেলেছে, তবে এতো তিক্ততা কেন? বরং তার বাবা না এলেই তার চিন্তা হবে।
শ্রুতি পাশে তাকাল। প্রভা-প্রত্যাশা বসে আছে। দু'জনের সাথে তার ভাব অনেক আগেই হয়েছে। প্রত্যাশা মেয়েটা একটু রাগী ধাঁচের হলেও ভালো। শ্রুতি দেখল প্রভা-প্রত্যাশার সামনে বাদাম ছড়ানো। অথচ তারা খাচ্ছেনা। দুইজন একসাথে ফোনে কিছু একটা করছে। শ্রুতি সরল প্রশ্ন করল, ‘ খাচ্ছো না কেন?’
‘ মা এলে খাব।’ প্রভা উত্তর দিল।
‘ কেন? মায়ের কী বাদাম খুব প্রিয়? তাহলে রেখে দাও। এলে দিয়ে দিও।’
‘ না। বাদাম প্রিয় না। আমাদের ছুলে দিবে। ছুলে খেতে ইচ্ছে করেনা। তাই বসে আছি।’
শ্রুতি তাদের কথা শুনে একবার প্রভা-প্রত্যাশার জায়গায় নিজেকে বসাতে চেষ্টা করল। হলো না। তবে শ্রুতির মা না থাকলেও তার আপা আছে। তার আপা তাকে যথেষ্ট আদর-যত্নে রেখেছিল, সাথে তো দাদী ছিলই। দাদী….? শ্রুতির মনটা ভীষণভাবে খারাপ হয়ে গেল। শ্রুতির ইচ্ছে করল উঠে চলে যেতে। সে গেল না।
ভয়ংকর মন খারাপ নিয়ে সে নিজের দুই ননদকে বাদাম ছুঁলে দিতে লাগল। শুধু ছুঁলেই ক্ষান্ত হলোনা, উঠে গিয়ে পাশে বসে মুখে তুলে দিল। প্রভা-প্রত্যাশা অবাকের পাশাপাশি ভীষণ খুশি হলো। দু'জনে ফোন রেখে তাদের ছোটভাবির সাথে গল্প করতে করতে বাদাম খেতে লাগল।
পার্থিব তৈরি হচ্ছিল। এরমধ্যেই শ্রুতি রুমে ঢুকল। শ্রুতিকে দেখে পার্থিব স্বচ্ছ এক হাসি উপহার দিল। শ্রুতি ঢোক গিলে অন্যদিকে তাকাল। এরপর আবার পার্থিবের দিকে তাকালে দেখল পার্থিবের চোখ এখনো তার উপরই নিবদ্ধ। শ্রুতিও ঠোঁট এলিয়ে হাসার চেষ্টা করে বারান্দায় চলে গেল।
শ্রুতি বারান্দায় এসে শ্বাস নিল। এতোক্ষণ যেন কেউ তার শ্বাস আটকে রেখেছিল। শ্রুতি আবিষ্কার করল, সে এখন শুধু পার্থিবকে লজ্জা নয় সাথে ভয়ও পায়। অজানা এক ভয়। যেই ভয়ে পার্থিব আশেপাশে থাকলে তার ভীষণ লজ্জা লাগে। শ্রুতি চোখ বন্ধ করল। সে আরেকটা ভয়ংকর বিষয় আবিষ্কার করেছে। আর তা হলো — সে পার্থিবের প্রতি দুর্বল। যেন তেন দুর্বল নয়; ভয়ংকর রকমের দুর্বল। এখন পার্থিব ঘুমালে সে বেহায়া, নির্লজ্জের মতো পার্থিবের দিকে তাকিয়ে থাকে। আবার হাসলেও না তাকিয়ে পারে না। পার্থিবের চেহারা না দেখলে তার একটু অস্থির অস্থির লাগে। একারণে পার্থিব বাসায় যতক্ষণ থাকে শ্রুতি তার আশেপাশেই থাকে। তবে পার্থিবের অগোচরে, যাতে পার্থিব বুঝতে না পারে। সে পার্থিবকে এড়িয়ে চলেও কাছাকাছি থাকে — ব্যাপারটাকে কী নাম দেওয়া যায় তা শ্রুতি ভেবে পেল না।
আমিন শিকদার সহ তিন জন লোক এসেছে বাড়িতে। সবাই তাদের আপ্যায়নের জন্য ব্যস্ত। শ্রুতিও এটা সেটা এগিয়ে দিচ্ছে। সবাই ভীষণ তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছে। দৃশ্যটা দেখতে শ্রুতির যত ভালো লাগছে ততো রাগ হচ্ছে। শ্রুতি পার্থিবের দিকে তাকাতেই দেখল পার্থিব খেতে খেতে তার দিকে একপলক তাকিয়ে খাওয়ায় মনোযোগ দিল। শ্রুতি উপলব্ধি করল পার্থিবের তাকানোও সে সহ্য করতে পারছেনা। কালো পাঞ্জাবিতে তার স্বামীকে ভয়ংকর সুন্দর লাগছে। সে বেরিয়ে গেল রুম থেকে। ড্রইংরুমে বসে অপেক্ষা করতে লাগল খাওয়া শেষ হওয়ার। ব্যবসা করতে এসেছে, ব্যবসা করবে। এতো খাওয়া-দাওয়ার কী আছে আশ্চর্য! খেয়েই যদি সময় পার করে, কথা বলবে কখন?
শ্রুতিকে নিজের অজান্তেই খুশি করে দিয়ে ড্রইংরুমে বসা হলো ব্যবসা বিষয়ক কথা বলতে। শ্রুতি সরাসরি সোফায় না বসলেও দূরে কাঠের দোলনায় বসল প্রভাকে পাশে বসিয়ে। শ্রুতি দেখতে পেল কথার এক পর্যায়ে আসাদ সাহেব উঠে গেলেন। নিশ্চয়ই তার ঘরে যাবে। শ্রুতি খুশি হয়ে গেল। সুন্দর সময়টা বোধহয় চলেই এলো। ভেবেই শ্রুতির মুখ হলো হাসি হাসি। এইবার সে নিজের মনে গল্প করতে শুরু করল প্রভার সাথে।
আসাদ সাহেবের পরে, পার্থিবও উঠে গেল। পরিবেশটা বেশ শান্ত হয়ে এলো। আসাদ সাহেব আবার এসে তানহার সাথে কথা বলতে লাগলেন। শ্রুতির ধারণা তার শাশুড়িকে কাগজ বিষয়ক প্রশ্ন করা হচ্ছে যে শ্রুতি জানে কিনা। কিছুক্ষণ পর আমিন সাহেবও উঠে গেল। কেবল বসে রইল বাকি তিনজন লোক। শ্রুতি বুঝল এইবার তার যাওয়া উচিত।
শ্রুতি শ্বশুরের ঘরে যেতে যেতে ভাবতে লাগল সে আশা করেছিল কাগজ না পেয়ে বাড়িতে ভীষণ চিৎকার চেঁচামেচি হবে। হয় করবে আসাদ নাহয় আমিন। আশ্চর্যের বিষয় কোনো চিৎকার চেঁচামেচি হলোনা।
শ্রুতি ঘরে গিয়ে দেখল কাগজ ছড়ানো-ছিঁটানো। কিছু ফাইল টেবিলে, কিছু চেয়ারে, কিছু খাটে। পার্থিব, আসাদ, নিয়াজ সবাই মিলে কিছু খুঁজছে। পার্থিব ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলল,
‘ বাবা, ঠিক করে মনে করো কোথায় রেখেছিলে? এখানে এই প্রজেক্টের কোনো অংশও নেই।’
আমিন শিকদার শক্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে। শ্রুতি এগিয়ে গেল। বলল,
‘ শুধু শুধু খুঁজে কষ্ট করতে হবেনা। কাগজ আমি ছিঁড়ে ফেলেছি। ছিঁড়ে মোয়া বানিয়েছি।’
পার্থিবের হাত থেমে গেল। শ্রুতির দিকে তাকাল। পার্থিবের মনে হলো সে শ্রুতির কথাটা স্পষ্ট শুনেনি। হয়তো ভুল শুনেছে। মাথাটা কেমন নিমিষেই ফাঁকা হয়ে গেল। কাগজ ছিঁড়ে ফেলেছে? পার্থিবের মাঝে কেমন প্রতিক্রিয়া এলো পার্থিব বুঝল না। সে নিজেকে ধাতস্থ করার জন্য আওড়াল,
‘ গত একমাস ধরে যেই প্রজেক্টের জন্য আমি এতোকিছু করেছি সেটা শ্রুতি ছিঁড়ে ফেলেছে!’
পার্থিব শান্তচোখে তাকিয়ে রইল।
আসাদ সাহেব বললেন, ‘ তুমি এখানে কী করছো? আর কী আজেবাজে বকছো সে কাগজ ছিঁড়ে ফেলেছো? শুধুশুধু কাগজ ছিঁড়ে তোমার কী লাভ?’
শ্রুতি নমনীয় কণ্ঠে বলল, ‘ আমি সত্যিই ছিঁড়ে ফেলেছি, বাবা। শুধুশুধু খুঁজে লাভ নেই।’
‘ কেন ছিঁড়েছেন, শ্রুতি?’ পার্থিবের ঠান্ডা প্রশ্ন।
‘ এই প্রজেক্টে আমার বাবা আছে তাই ছিঁড়ে ফেলেছি। ভালো করেছিনা আব্বু?’
উত্তর দিয়েই আমিন শিকদারের দিকে তাকাল। আমিন সাহেব লক্ষ্য করলেন তার হাত-পা কাঁপছে। তার কোটি টাকার প্রজেক্ট ছিল, আর এই মেয়ে কিনা কাগজপত্র ছিঁড়ে ফেলেছে? সবার কাছে ব্যাপারটা আজব লাগলেও আমিন সাহেবের কাছে লাগল না। সে নিজের মেয়ের ব্যবহারে পরিচিত।
‘ শ্রুতি, আমি তোমাকে নিজের মেয়ে ভাবি। স্নেহ করি। তাই বলে এই নয় তুমি এমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নিয়ে মজা করবে।’ আসাদ সাহেব বললেন।
‘ আমি মজা করছিনা বাবা। আমি সত্যিই ছিঁড়ে ফেলেছি। আমিন শিকদার আছে বলে ছিঁড়েছি। সে লাভবান হোক তা আমি চাইনা। যার কাছে ছেলেমেয়ের জন্য টাকা থাকেনা, নিজের মায়ের জন্য টাকা থাকেনা তার কাছে টাকা যাওয়ার প্রয়োজনও নেই। তাকে রাজার আসনে নয়, ভিক্ষুকের আসনে ভালো মানাবে।’
আমিন সাহেব শ্রুতির বাহু ধরে ঘুরিয়ে গর্জে উঠল, ‘ খুব বেশি বার বেড়েছিস! আজ বুঝতে পারছি জন্মের পরপরই তোকে গলা টিপে খুন করা উচিত ছিল জা নোয়ার কোথাকার!’ বলেই নিজের হাত উঠিয়ে থাপ্পড় মারতে এল।
শ্রুতি কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখল একটি নাটকীয় ঘটনা ঘটে গেল তার সামনে। পার্থিব ‘থামুন’ বলে ধমক দিয়ে আমিন সাহেবের হাত আটকে ফেলল। ঘটনার আকস্মিকতায় শ্রুতি বুঝতে পারল না সে যে পার্থিবের চিৎকার ছিটকে উঠেছে।
‘ আমার বাড়িতে দাঁড়িয়ে আমার বউকে অসম্মান করার অধিকার আপনার নেই। সে ভুল করুক, অন্যায় করুক কিংবা মানুষ খুন করুক; যা শাস্তি দেওয়ার আমি দেব। আপনি না। আপনি বাবা হলেও আমি স্বামী। অধিকার কোনো অংশে কম নয়, বরং বেশি।’ শান্তভাবে শক্তকণ্ঠে নিজের কথা শেষ করল পার্থিব।
শ্রুতি পার্থিবের শক্ত মুখে তাকিয়ে মাথা নিচু করে ফেলল। আসাদ সাহেব গম্ভীর মুখে চেয়ারে বসলেন। নিজের ভাই নিয়াজকে বলল নিচে গিয়ে সব সামাল দিতে। তাদের বলতে আজ কোনো মিটিং হবেনা। নিয়াজ সাহেব বেরিয়ে গেলেন। এমনিতেও তার মাথা ঘুরছে।
আসাদ সাহেব আমিন শিকদারকে বলল,
‘ আপনি চলে যান আজকের মতো। ব্যবসা নিয়ে পরে কথা হবে।’
আমিন শিকদার মনে মনে একটু ভয় পেল। যদিওবা তার রাগ এখনো কমেনি, তবুও এতো বোকার মতো কাজ সে করল কীভাবে? আসাদ সাহেবের সামনে এমন ব্যবহার করা ঠিক হলোনা। তাকে কতো ভালো জানতো, অথচ আজ যদি শ্রুতি তাকে উল্টোপাল্টা কিছু বলে ফেলে?
আমিন শিকদার কিছু বলতে গেলেও আসাদ সাহেব শুনল না। অগত্যা তাকে বেরিয়ে যেতে হলো। আমিন শিকদার যেতে যেতে নিজেকে গালি দিতে লাগল। বিজনেসের শেয়ার থেকে যদি কোনোভাবে আসাদ সাহেব তার কম্পানি সড়িয়ে নেয়, তাহলে বিশাল লস হয়ে যাবে। তাছাড়া এই কম্পানির সাথে থাকার লোভেই তো শ্রুতিকে বিয়ে দিয়েছিল যাতে সম্পর্ক পাকাপোক্ত হয়। এখন যদি সব ভেস্তে যায়? ভাবতে ভাবতেই আমিন সাহেব ঘেমে উঠল চিন্তায়।
পার হলো কিছু মিনিট। পিনপতন নীরবতা ভীষণ ভয়ানক লাগল শ্রুতির। আসাদ সাহেব উঠে এসে তার সামনে দাঁড়াল। শান্তকণ্ঠে গম্ভীরভাবে বলল, ‘ এমন কিছু তোমার থেকে আশা করিনি। একবার বলতে পারতে।’
শ্রুতি কেঁপে উঠে চোখ তুলে তাকাল। কিছুক্ষণ আগের তার বাবার গর্জনেও সে কাঁপেনি, অথচ শ্বশুরের গম্ভীর কণ্ঠ যেন তার বাবার চিৎকার চেঁচামেচির থেকেও ভয়ানক ঠেকল! আসাদ সাহেব রুম থেকে বের হয়ে গেল।
পার্থিব শান্ত কণ্ঠে বলল, ‘ কাজটা কী ঠিক হলো শ্রুতি?’
শ্রুতি মিনমিন কণ্ঠে বলল, ‘ আমার বাবার সফলতা আমি চাইনা।’
‘ বাবার সফলতায় ব্যাঘাত ঘটাতে গিয়ে, নিজের স্বামী-শ্বশুর এর সফলতায় বাঁধা হয়ে গেলেন।’
শ্রুরি অশ্রুসিক্ত চোখে চাইল, ‘ মানে?’
‘ এই কাজের দায়িত্বে ছিলাম আমি। এই প্রজেক্টে আমার কতোটুকু শ্রম গেছে তা আপনি জানেন না। এই কাজ কমপ্লিট হলে হয়তো আপনার বাবা লাভবান হতো কিন্তু এর সাথেই জড়িয়ে আছে আমাদের আরেকটা প্রজেক্ট। যেটা আমার ড্রিম। আমার বাবার ড্রিম। আপনি আপনার বাবাকে ভাঙতে গিয়ে আমাকে ভেঙে দিলেন শ্রুতি।’
পার্থিব তার স্বভাব অনুযায়ী শান্তভাবে চলে গেল। রুমে দাঁড়িয়ে রইল কেবল শ্রুতি। মাথা আপনাআপনি নিচু হয়ে গেল। সে কী সত্যিই তার আব্বুকে কষ্ট দিতে গিয়ে বাবা, পার্থিবকে কষ্ট দিয়ে ফেলল? কিন্তু সে তো কাজটা করেছে বাবার প্রতি রাগ থেকে। যে বাবা তার ভাইয়ের অপারেশনে টাকা দিতে নারাজ, যে বাবা নিজের মাকে চিকিৎসা করাতে নারাজ তার সফলতা চায়না শ্রুতি। সে তো চায়নি অন্যকারো ক্ষতি হোক, তবুও কেন হলো? সে সবসময় কেন ভুল কাজ করে ফেলে? আচ্ছা সে তো কাগজগুলো না ছিঁড়লেও পারতো! তাহলে তো পার্থিব এতো কষ্ট পেত না। পার্থিবের কষ্ট তাকে এতো কেন কষ্ট দিচ্ছে? আর বাবা! সেও নিশ্চয়ই ভীষণ কষ্ট পেয়েছে?
সময়গুলো খুব দ্রুতই পার হলো। দুপুর থেকে বিকেল, বিকেল থেকে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা থেকে রাত। প্রতিটা সময় শ্রুতি আতংকে রইল কেউ তাকে বকবে — এই ভেবে। একবার মাথায় এলো, তানহা তাকে ভীষণ বকবে। আবার মনে হলো আসাদ সাহেব তাকে বকবে। অথচ কেউ বকলোই না। আচ্ছা বাড়ির বাকি সবাইকে কী জানানো হয়েছে যে সে এতোবড় একটা অন্যায় করেছে? শ্রুতির মনে হলো জানানো হয়নি।
শ্রুতির মন খারাপ হলো। আজ বিকালে সে আসাদ সাহেবকে চা দিয়ে যায়নি। অন্যান্য দিন যায়। কাজটা তার কাছে আবশ্যিক ধরনের একটা কাজ। কাজটা করে সে ভীষণ আনন্দ নিয়ে, যত্ন নিয়ে। অথচ আজ করতে পারেনি। আরোও কষ্টের ব্যাপার আসাদ সাহেব ডাকেনওনি। কেন ডাকল না? রাগ করেছে ভীষণ? রাগ করেছে বলেই ডাকেনি নয়তো ডাকতো। কিছুদিন আগেও তো সে ভুলে গেছিল চা নিয়ে যেতে। তানহা বেগম এসে তাকে ডেকে নিয়ে গেছে। শ্বশুর এর রুমে ঢুকতেই প্রশ্ন করেছিল, ‘ আজ আসছিলে না কেন, মা? ব্যস্ত ভীষণ?’
শ্রুতির ভীষণ রকমের মন খারাপ হলো।
শ্রুতির পাশে নিঃশব্দে এসে দাঁড়াল পার্থিব। শ্রুতি বুঝেও কিছু বলল না। লজ্জা লাগছে ভীষণ! এতো বড় অন্যায় সে না করলেও পারত। পার্থিব শ্রুতির দিকে তাকিয়ে বলল,
‘ গল্প শুনবেন শ্রুতি?’
শ্রুতি প্রশ্নটা বুঝেও বুঝলনা। কেবল তাকিয়ে রইল পার্থিবের দিকে। পার্থিব কৃত্রিম হেসে বাইরে তাকিয়ে বলতে লাগল,
‘ শ্রুতি, আমি আপনাকে ভালোবেসে বিয়ে করিনি। বিয়ের পর ভালোবেসেছি। একটু একটু করে। প্রথমে ভালোলাগা, পরে মায়া। এরসাথে যত্ন, দায়িত্ব, রাগ, অভিমান সব মিলে কীভাবে যেন ভালোবাসা হয়ে গেল শ্রুতি! আমি বুঝতেই পারলাম না। বুঝলাম চট্টগ্রাম গিয়ে। চট্টগ্রাম গিয়ে বুঝতে পারলাম আপনাকে ছাড়া আমার চলবে না। মানুষ বলে প্রথম দেখায় হুট করে যে ভালোবাসা হয় সেটাই নাকি গভীর ভালোবাসা। আমি কথাটা মানিনা। প্রথম দেখায় হয়তো ভালোবাসা হয় তবে সেখানে কোনো মায়া থাকেনা।’
কথার এই পর্যায়ে পার্থিব থেমে গেল। শ্রুতির দিকে তাকিয়ে আবারো বলতে শুরু করল, ‘ আমি আপনাকে অনেক যত্ন নিয়ে ভালোবেসেছি শ্রুতি। আপনার প্রতি নিজের ভালোবাসা রেখেছি একদম স্বচ্ছ পানির মতো। নিজের সবটুকু দিয়ে খেয়াল রেখেছি আমার ভালোবাসাতে যাতে ছোট্ট ময়লাও না পড়ে। অথচ… অথচ আমি হয়তো আপনাকে ঠিকঠাক ভাবে ভালোবাসতে পারিনি।
আপনি আজ যা করেছেন তা তে আমার বাবা কতোটুকু কষ্ট পেয়েছে তা আর বলতে চাইছিনা। আমার কাছে আপনি যেমন সত্য, তেমনি আবার বাবা, আমার পরিবারও সত্য। আমি কখনো চাইনি আমার পরিবার আমার কারণে কষ্ট পাক। অথচ আজ তাই হলো। আমার উছিলায় আপনার কারণে কষ্ট পেল। আপনি আমাকে ভেঙে দিলেন শ্রুতি…। বাবার সামনে আমাকে ছোট করলেন।’
পার্থিব ভীষণ বড় করে শ্বাস নিল যার আওয়াজ এলো শ্রুতির কান পর্যন্ত। শ্রুতি বারান্দায় রেলিং ধরল শক্ত করে। পার্থিব রুমে যেতে গিয়েও থেমে গেল। শ্রুতিকে ঘোরাল নিজের দিকে।
শ্রুতি এতোক্ষণ পার্থিবের দিকে তাকায়নি। তাকিয়ে দেখল পার্থিবের গায়ে এখনো সেই পাঞ্জাবি। পার্থিব শ্রুতির গালে ভীষণ আদুরে ভঙ্গিতে হাত রেখে বলল,
‘ আপনি এখানে ভালো নেই শ্রুতি। খারাপ থাকুন কখনো চাইনি, চাইবোওনা। আপনি চাইলে চলে যেতে পারেন। আমি আপনাকে অনুমতি দিলাম। কেউ আপনাকে কিচ্ছু বলবে না। আপনি শুধু ভালো থাকুন। তাছাড়া আপনিতো আমাকে ভালোওবাসেন না….শুধু শুধু এখানে থেকে কষ্ট করছেন।’
শ্রুতি স্তব্ধ হয়ে পার্থিবের কথা শুনল। পার্থিব যেতেই দু'চোখ বেয়ে নেমে গেল ঢল। এটা কী বলল পার্থিব? তাকে চলে যেতে বলল? এতো রাগ তার! ভীষণ অভিমান হলো শ্রুতির। ঠিক করল সকালবেলাতেই চলে যাবে। থাকবে না সে এখানে, লাগবে না কারোর ভালোবাসা। ভাবতে ভাবতেই নিজের চোখের পানি মোছার চেষ্টা করল। একি! এতো পানি পড়ছে কেন?
_____
চলবে~
শব্দসংখ্যা - ১৮৫৬
#একগুচ্ছ_শুকতারা
#শারমিন_ইরান
[ ড্রামাটিক হয়ে গেল। দুঃখিত! আর বিজনেসের ভুজুংভাজুং ব্যাপার বলেছি গল্পের প্রয়োজনে।]