একগুচ্ছ শুকতারা
শারমিন ইরান
৩২.
এই পৃথিবীতে বহু ধাঁচের, বহু প্রকৃতির মানুষ আছে। প্রতিটি মানুষ জন্মেছে নিজেদের আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়ে, আলাদা দোষ নিয়ে, আলাদা গুণ নিয়ে। কেউ কোনো অংশে কারোর থেকে কম নয়; বরং বেশি।
শ্রুতিও জন্মেছে তার ধাঁচে। সে হুটহাট রেগে ওঠে। অল্পতে চোখের পানিতে বন্যা বইয়ে দেয়। নিজের দোষ হলেও সে নিজের দোষ কম দেখে। ‘ক’ কে ‘কলকাতা’ বানানো তার প্রধান এবং প্রিয় কাজ। সবচেয়ে প্রধান কাজ অভিমান করা। তার অভিমান যৌক্তিক এর চেয়েও হয় বেশি অযৌক্তিক। এই যেমন এখন সে পার্থিবের ওপর এক আকাশ অভিমান নিয়ে ব্যাগে জামা-কাপড়ের স্তূপ বানাচ্ছে। পার্থিব অফিসে চলে গেছে। এখন সেও চলে যাবে। থাকবে না এখানে। মানছে সে ভুল করেছে তাই বলে চলে যেতে বলবে?
শ্রুতি কাউকে বলে বের হলোনা। বাড়ির গাড়িটাও সে নিলোনা। নিজেই কোনোরকমে ব্যাগ টানতে টানতে পৌঁছে গেল বাড়িতে। বাড়িতে? তার বাড়িতে? হ্যাঁ, তার বাড়িতেই। না, তার বাড়িতে নয় তো। এটা আমিন শিকদারের বাড়ি। শ্রুতি প্রথমে ভেবেছিল সে বিভার বাড়িতে যাবে। কিন্তু যায়নি। তার মাথায় এলো যে, সে যদি যায় তাহলে তো সেখানেই থাকতে হবে। আপা আসতে দিবেনা। আপার শ্বশুরবাড়ি তো তেমন বড় নয়। এমনিতেই হামিম আছে, আবার সেও যদি যায় হুলুস্থুল কান্ড হবে। কী দরকার! এর থেকে সে তার মায়ের ঘরেই থাকবে।
নিজের বাবার বাড়ি অথচ বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে শ্রুতির ভীষণ ভয় হলো। তাকে যদি থাকতেই না দেয়? তখন কী হবে?
শ্রুতির ভেতর থেকে কান্নারা ডুকরে এলো। তার কী বাড়ির এতোই অভাব! তার কী কোনো বাড়ি নেই যাওয়ায়? এতোবড় পৃথিবী অথচ তার থাকার কোনো জায়গা নেই ভাবতেই শ্রুতির চোখ ভরে উঠল, ঠোঁট ভেঙে গেল আপনা-আপনি। শ্রুতি নিজেকে ধাতস্থ করে কান্না গিলে ফেলল। ব্যাগ কোনোমতে টানতে টানতে ঢুকে গেল বাড়িতে।
বাড়িতে ঢুকেই শ্রুতি ভীষণ অবাক হলো। সোফায় বসা মায়ের আগের ঘরের তিন ছেলে, শাহিনা, শাহিনার ভাই। অন্য সিঙ্গেল সোফায় বসা আমিন সাহেব। শ্রুতির হাত-পা কেঁপে উঠল হালকা। তবুও সে নিজেকে শক্ত করে ঘরে ঢুকতে লাগল। আমিন সাহেব তা হতে দিলেন না। সামনে এসে দাঁড়াল,
‘ তুই এখানে কেন?’
‘ আমার তো এখানেই থাকার কথা, আব্বুউউউ।’ শ্রুতি তার বাবার সাথে খুশিমনে, হাসি হাসি মুখ করে কথা বলতে ভীষণ মজা পায়। মনে হয় সে তার বাবার গায়ে আগুন ছুঁড়ে মারে। আর সেই আগুনে আমিন সাহেব জ্বলে।
‘ ভালোভাবে বল তুই এখানে কেন?’
‘ এতো সহজে ভুলে গেলে হয়? আমি না কথা দিয়েছিলাম ছয় মাসের মধ্যে ফিরে আসব? এলাম আব্বু। তুমি দেখো আজকে সন্ধ্যা ৭/৮ টার দিকে কিন্তু ছয় মাস পূরণ হবে। আজ আমার আর আপার বিয়ের ছয় মাস পূরণ হবে। আমি আমার কথা রাখলাম। ছয় মাসের মধ্যে বাপের বাড়িতে ফিরে এসে তোমাকে হারিয়ে দিলাম।’ সব কথা শান্তভাবে বললেও শেষের কথাটায় প্রকাশ পেল জেদ, কঠিনত্ব।
আমিন সাহেব বলার ভাষা খুঁজে পেলেন না। তার চিন্তা ঘুরে গেল। শ্রুতি তারা সত্যি সত্যি বাড়ি থেকে বের করে দিল? কিন্তু কেন? শ্রুতি কী তাদের তার সম্পর্কে কিছু বলেছে নাকি? তবে কী ব্যবসা থেকেও তাকে বাদ দেওয়া হবে? আমিন সাহেবের চিন্তার মাঝেই শ্রুতি বলল, ‘ জিতে গেছি কিন্তু। সেই হিসেবে এখন আমি এখানে থাকব। যতোদিন মন চায় ততোদিন।’
বলেই যেতে নিল শ্রুতি। শাহিনা উঠে এসে তাকে বাঁধা দিতে নিলে আমিন সাহেব চোখের ইশারায় তাকে থামতে বলল। শ্রুতি চলে গেল নিজের ঘরে।
.
‘ শ্রুতি, এইসব কী করে ফেললি তুই? এমন কেউ করে? আচ্ছা….তুই আমাকে এখন ফোন করে এইসব না বলে সকালে ফোন করতি। তাহলেই আমি এইসব হতে দিতাম না।’
‘ আপা আমি চাইনি আমিন শিকদার তার ব্যবসায় এতো লাভ করুক। তাই ছিঁড়ে দিয়েছি।’
‘ মানলাম সেটা। তবে তোরও মানা উচিত তুই নিজের অজান্তেই ভুল করেছিস। মানা উচিত না? শুধু বল উচিত কিনা?’
‘ হ্যাঁ।’
‘ তাহলে? তাহলে….ভুল যেহেতু করেছিস তোর কী উচিত ছিলনা ক্ষমা চাওয়া? তার চেয়েও বড় ব্যাপার পার্থিব কষ্ট পেয়ে তোকে একটা কথা বলেছে আর সেটা মেনেই তুই চলে এলি? ওকি তোকে শাসন করার অধিকারও রাখেনা? তোর ভুল ধরিয়ে দেবে না?’
‘ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলাকে তুমি শাসন বলছো?’
‘ এমনি এমনি তো বলেনি, শ্রুতি। তুই এতোদিন শুধু বলতি চলে আসবি, চলে আসবি। সেটার সূত্র ধরেই বলেছে যে ভালো না লাগলে চলে আসতে পারিস। তোর উচিত ছিল বাড়িতে থেকে পার্থিবের রাগ, মান ভাঙানো। আর তুই সত্যি সত্যিই চলে এলি? ’
‘ এলাম।’
‘ উচিত হয়েছে ওই বাড়ি যাওয়া?’
‘ খুব হয়েছে।’ ভীষণ মন খারাপ, অভিমান থেকে উত্তর দিল শ্রুতি।
বিভা হতাশ হলো। তার বোন এমন করছে কেন? নিজের স্বাভাবিক জীবনকে এইভাবে নষ্ট করছে কেন? বিভা শাসন স্বরে বলল,
‘ শ্রুতি তোর কাজে আমি আমিন শিকদারের জেদ দেখতে পাচ্ছি। যেই জেদ কারোর ভালো করেনা। শুধু ধ্বংসই করে। তুই নিজের জীবন নিজে ধ্বংস করছিস। যা ইচ্ছা কর, আমি আর কখনো কিছু বলব না।’
বিভা ফোন কেটে দিল। শ্রুতি অবাক হয়ে চেয়ে রইল ফোনের দিকে। ঘরে ঢুকেই সে প্রথমে তানহা মাকে ফোন করেছিল। বলেছে সে এই বাড়িতে চলে এসেছে আর কখনো যাবেনা। তানহাকে এই কথা বলার কারণ শ্রুতি জানেনা। তবুও বলেছে। এরপরই বিভাকে ফোন দিয়ে কালকের সব ঘটনা বলেছে। ঘটনা শুনেই শুরু হলো বিভার রাগারাগি। শ্রুতি মন খারাপ করে ফোন ফেলে রাখল বিছানায়।
.
পার্থিব ভীষণ ক্লান্ত হয়ে রুমে ঢুকল। রুমে ঢুকে তার শরীরের ক্লান্তির থেকে মনের ক্লান্তিকেই বেশি ভারি মনে হলো। ঘরটা ফাঁকা। পুরো ফ্ল্যাট টাই ফাঁকা। কেন? শ্রুতি চলে গেছে বলে? পার্থিব নিজেকে বুঝাতে চেষ্টা করল একজন মানুষ কমে গেলে কখনো ঘর-বাড়ি ফাঁকা হয়ে যায়না।
নিজেকে অযথা সান্ত্বনা দিয়ে ফ্রেশ হলো সে। বেরিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল। আজ যখন সে অফিসে ছিল তখন তার মা তাকে ফোন করল। ফোন করে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে, গলায় আতংক ঢেলে বলল, ‘ বাবা, শ্রুতি নাকি চলে গিয়েছে। আর ফিরবে না ঘরে। বাবা? ওর সাথে কী ঝগড়া করেছো তুমি? মেয়েটা কাউকে না বলেই চলে গেল। এরপর গিয়ে ফোন করে জানাল। আমার ভীষণ চিন্তা হচ্ছে।’
মায়ের কথা শুনে পার্থিব মনে হলো দিন দুনিয়া এমন বিরক্তিকর কেন? এতো জঘন্য কেন? সে বিপরীতে তেমন কিছু বলতে পারেনি। শুধু শান্ত কণ্ঠে বলেছিল, ‘ তাকে নিয়ে চিন্তা করে নিজের প্রেশার বাড়িয়ো না। সে গেছে ভালো হয়েছে। আমি অনুমতি দিয়েছিলাম।’ এরপরই ফোন কেটে দিল।
পার্থিব নিজের সামনের ড্রেসিং টেবল থেকে পানি ভর্তি বোতল ছুঁড়ে মারল পিছন দিকে। ঠনঠন শব্দ তুলে কাঠের ফুলদানি পড়ে গেল। পার্থিবের মুষ্টিবদ্ধ হাত কাঁপতে লাগল। ঘরের চারদিকে চোখ বুলাতে বুলাতে বলল, ‘ এতো জেদ ভালো নয় শ্রুতি। একদমই ভালো নয়।’
.
শ্রুতি বসে আছে বারান্দায়। হাঁটু জড়িয়ে ধরে বসা। মুখ মলিন, শুকনো। সারাদিনে পেটে কিছু পড়েনি তার। দুপুরের দিকে রুম থেকে বেরিয়েছিল। আশেপাশে কাউকে তেমন দেখা যায়নি, হুট করেই কোথায় থেকে যেন শাহিনার ভাই এলো। লোকটা মধ্যবয়সী। ভদ্র চেহারা। অথচ শ্রুতির কাছে সবচেয়ে নোংরা চেহারা। তাকে কোনোমতে এড়িয়ে সে রুমে ঢুকে যে দরজা বন্ধ করল, আর খুললোই না। খুলবেও না।
শ্রুতি বারান্দা থেকে উঠে ঘরে এলো। তার মায়ের ঘরে। মৃত্যুর আগে তাহিরা এই ঘরে থাকত। আমিন শিকদার থাকতেন অন্য ঘরে। দ্বিতীয় বিয়ের পরে শাহিনাও আমিন সাহেবের রুমেই থাকে। এই রুমে কেউ আসেনা। হালকা ময়লা রুমটা। তবুও শ্রুতি পরিষ্কার করেছে যতোটা পারা যায়।
শ্রুতি দরজা, জানালা বন্ধ করে দিল। সে ভূতে ভয় পায়। ভীষণ ভয় পায়। হঠাৎ হঠাৎ মনে হয় লাল চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে। দরজা-জানালা বন্ধ করে তার ভয় আরোও বাড়তে লাগল। সে বিছানার মাঝামাঝি জায়গায় গিয়ে বসে পড়ল। বসে চোখ বন্ধ করে হাঁটুতে মাথা দিয়ে রইল। কিছু সেকেন্ড পরেই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে চমকে উঠল শ্রুতি।
‘ কে?’ ভয়কে ঢেকে রেখে প্রশ্ন করল শ্রুতি।
উত্তর এলোনা। আরোও দুইবার শব্দ হলো। শ্রুতি উঠে দরজার কাছে গেলে শুনতে পেল পুরুষালী কণ্ঠ, ‘ দরজা খোলো তো শ্রুতি। একটু গল্প করি। আমি তোমার মামা। অনেকদিন পর দেখা হলো তাই গল্প করতে এলাম।’
বাক্যগুলো শ্রুতির বোধগম্য হওয়া মাত্রই সে ছিটকে সড়ে গেল দরজা থেকে। মূহুর্তের মধ্যেই হাত-পা কাঁপতে লাগল অস্বাভাবিক ভাবে। মামা? মা…মা? ওই ভয়ংকর লোকটা! শ্রুতির মনে পড়ে গেল ছোটবেলার ঘটনা।
ছোটবেলায় এই লোক প্রায়ই আসতো শাহিনা এই বাড়ির বউ হওয়ার পরে। এমনই একদিন তাকে হুট করেই কোলে বসিয়েছিল। আদর করার নামে তাকে ভীষণ বাজে ভাবে স্পর্শ করেছিল পিঠে, বুকে। ছোট শ্রুতি বেশি কিছু ঘটার আগেই দৌড়ে গিয়েছিল দাদী, বিভার কাছে। বিভার কাছে সব বলতেই বিভা ভয়ানক ভাবে রেগে যায়। সবাইকে অবাক করে দিয়ে ষোলো বছর বয়সী শান্ত বিভা ছুটে আসে রান্নাঘর থেকে দা নিয়ে। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই লোকটাকে কোপ দিতে যায়। কিন্তু ভাগ্য তার সহায় হয়ে তাকে বাঁচিয়ে দেয়। বিভার কোপ তার লাগে না। তার আগেই সে সরে যায়। ততোক্ষণে লোকটার চিৎকারে সবাই এসে জড়ো হয় বাড়ির। বিভাকে থামানো হয়। সবার সামনে আমিন শিকদারকে চিৎকার করতে করতে বিভা ঘটনা বলে। চোখ থেকে পড়তে থাকে তার উত্তপ্ত অশ্রু। নিজের সর্বশক্তি দিয়ে বাবাকে আশ্রয় ভেবে সব কথা বললেও ভাগ্য বিভাকে আশ্রয় দেয়না। সবাইকে অবাক করে দিয়ে আমিন সাহেব বিভাকে থাপ্পড় দেয় গালে। থাপ্পড়ের সাথে সাথে ভেঙে দেওয়া হয় ষোলো বছর বয়সী কিশোরীর মনে থাকা বাবার প্রতি সব শ্রদ্ধা, সম্মানকে। সেই দিন থেকে বিভা আমিন শিকদারের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। আর কখনো বিভা আমিন সাহেবকে কিছু বলতে যায়নি, শুধু দাদীর ব্যাপার ছাড়া। দাদীও নিজের ছেলের ওপর থেকে হারিয়ে ফেলে সব আশা, ভরসা। দুই নাতনিকে নিয়ে এসে বুকে জড়িয়ে ধরে রাখেন আর চোখের পানি ফেলেন। দূরে ছোট দোলনায় ঘুমিয়ে থাকে ছোট্ট হামিম।
শ্রুতির সব মনে পড়তেই অসহ্য ব্যথা হতে লাগল বুকে। এই লোক আবার এসেছে কেন? আবারো সেই রকম কিছু করবে? এতোবছর তো বিভা ছিল, দাদী ছিল; এখন তো নেই। কেউ নেই। শ্রুতির মাথা হালকা ঘোরাতে লাগল। সে দুর্বল পায়ে রুমের টেবিল টেনে দরজার সামনে বাঁধা দিয়ে দিল। ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজে পরিবেশ হয়ে উঠল আরোও বিরক্তির!
শ্রুতি নিজেকে বুঝ দিল যে, দরজা ভাঙলেও টেবিলের কারণে আসতে পারবেনা। একদম পারবেনা। শ্রুতি ক্লান্ত হয়ে বিছানায় বসে পড়ল।
.
সবাইকে খেতে দিয়ে বিভা দাঁড়িয়ে রইল। মাহাথির বসতে গিয়েও বসল না। বিভার দিকে তাকালে দেখল বিভা ভীষণ অন্যমনস্ক হয়ে আছে। বিভা, মাহাথির, হাসিনা, সিদ্দীক সবাই একসাথে খাওয়া-দাওয়া করেন। হামিমকে আগে খাওয়ানো হয়। মাঝেমাঝে সিদ্দীক সাহেব অসুস্থতার কারণে আগে খেয়ে নেয়। সবাই একসাথে খায় বলেই বিভার এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকা মাহাথিরের ভালো লাগল না। বিভা মাহাথিরকে প্লেট দিলে সে প্লেট নিয়ে বসে গেল। বিভা মলিনমুখে চলে গেল ঘরে।
মাহাথির ঘরে ঢুকে দেখল বিভা জানালায় মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাহাথির বিছানায় বসতে বসতে বলল, ‘ খেলে না যে? শরীর খারাপ?’
‘ মন খারাপ।’
মাহাথির তাকাল বিভার দিকে। মেয়েটা এতো অসহায় হয়ে কেন বলল? মাহাথির তাকিয়েই রইল। বিভা বাইরে থেকে চোখ ঘুরিয়ে বলল, ‘ শ্রুতি না খেয়ে আছে মাহাথির। আমার গলা দিয়ে খাবার নামবে না।’
মাহাথির বুঝল বিভা কান্না গিলে ফেলছে। মাহাথির নির্নিমেষ চেয়ে রইল। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
‘ শ্রুতি খায়নি কেন?’
‘ ও বাবার বাড়িতে। ও আমাকে কিছু বলেনি। কিন্তু আমি বুঝেছি। ও কিছু খায়নি। জানি আমি।’
মাহাথির কিছুই বুঝতে পারল না। এরমধ্যেই বিভা মলিন স্বরে বলল, ‘ ও! আপনি তো চা খাবেন, নিয়ে আসছি দাঁড়ান।’
বিভা চলে গেল। মাহাথির বিভাকে দেখে আশ্চর্য হয়ে উঠল। এই মেয়েটা সবার কথা ভাবে কীভাবে? তাও আবার মন খারাপ নিয়ে? আচ্ছা, বিভার মন খারাপ দেখে কী মাহাথির কষ্ট পেল? সে কী ইদানীং বেশি ভাবছেনা বিভাকে নিয়ে? বিভার অসহায়ত্ব কী তাকেও স্পর্শ করল? মাহাথির শুয়ে পড়ল। ক্ষিদে লেগেছে, অথচ সে খায়নি।
.
শ্রুতি বসে আছে চুপচাপ। ঘুমানোর চেষ্টা করেছিল, আসেনি। এখন বাজে রাত দুইটার মতো অথচ তার ঘুম আসছেনা। শ্রুতির ভাবনার মাঝেই দরজায় আবার আঘাত হলো। আঘাত ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকল। ভয়ে শ্রুতি নেমে গেল খাট থেকে। এরমধ্যেই দরজার বাইরে থেকে বলা হলো, ‘ শ্রুতি মা, দেখো তো আমার ফোনে কী যেন হয়েছে। বুঝতে পারছিনা। সবাই ঘুমে। তাই অযথা তোমাকে বিরক্ত করতে এলাম।’
কিছু ঘন্টা আগের ভয় আবারো মাথাচড়া দিয়ে উঠল। শ্রুতি কী করবে ভেবে পেল না। খাট থেকে ফোন নিয়ে বারান্দার দরজা খুলল। বারান্দায় ঢুকে ভিতর থেকে আটকে দিল। শ্রুতির মনে হচ্ছিল দরজা ভেঙে ফেলবে। দরজা ভেঙে লোকটা ভেতরে ঢুকে যাবে। এখন ভয় নেই। দরজার সাথে টেবিল সরাতে অনেক কষ্ট হবে। আর কষ্ট করে ঢুকেও লাভ হবেনা। বারান্দার দরজা ভাঙতে হবে। শ্রুতির মনে হলো সেদিন যদি বিভা সত্যি সত্যি লোকটাকে কোপ দিত তাহলে আজ এইসব হতোনা। ফোনের সমস্যা নিয়ে রাত দুইটায় কেউ আসে? এতোই বোকা শ্রুতি? শ্রুতি মোটেও বোকা নয়। শ্রুতি বসে পড়ল দেয়াল ধরে।
বিভার কথা ভেবে, পার্থিবের কথা ভেবে ভীষণ অভিমান হলো।
আকাশের চাঁদের দিকে মুখ দিয়ে মায়ের কাছে নালিশ করল শ্রুতি,
‘ আমাকে কেউ ভালোবাসেনা, মা। কেউ ভালোবাসেনা। পার্থিব ভালোবাসে না। আপা ভালোবাসে না। কেউ ভালোবাসে না। সবাই আমাকে বকে। আমাকে তুমি কেন নিয়ে গেলেনা? আমার এখানে অনেক ভয় লাগছে। আমি মরে যাব এখানে।’ ডুকরে উঠল শ্রুতি।
পার্থিবকে ভীষণ মনে পড়ছে। মনে হচ্ছে এই মূহুর্তে পার্থিবের বুক সবচেয়ে নিরাপদ স্থান। পার্থিব পাশে থাকলে তার আর কাউকে লাগবে না। কিন্তু পার্থিব কোথায়? সে কেন তাকে চলে আসতে বলল? সব ভুলের মতো এইবারও কেন তাকে ক্ষমা করল না? শ্রুতি ফুঁপিয়ে উঠল।
.
পার্থিব টি-শার্ট পরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। ঘরে ভালো লাগছিল না। তাই সিদ্ধান্ত নিল বাইরে বের হবে। গাড়ি নিয়ে বের হয়েই সে নিজের অবচেতন মনে শ্রুতির বাড়ির সামনে এসেই থামল। এরপর….এরপর সেখানে দাঁড়িয়েই পার করল আড়াই ঘন্টা। এসেছিল রাত বারোটার দিকে। এখন রাত আড়াই টা। পার্থিব সিদ্ধান্ত নিল গাড়িতে গিয়ে বসবে।
গাড়িতে বসে চোখ বন্ধ করল। নিজের অবুঝ মনকে বুঝ দিল, সে শ্রুতির একদম পাশে না থাকুক, তবে কাছে আছে। তাদের মধ্যকার দূরত্ব কম না হলেও বেশি নয়। সে আর শ্রুতি এক আকাশের নিচে আছে — এই বা কম কী?
_____
চলবে~
শব্দসংখ্যা - ২০৬৭
#একগুচ্ছ_শুকতারা
#শারমিন_ইরান
[ চাঁদ রাতের ভালোবাসা, শুভেচ্ছা। কিছুক্ষণ পর আরেকটা আসছে পর্ব।]