একগুচ্ছ শুকতারা
শারমিন ইরান
৩৩.
সূয্যিমামার মিষ্টি আলো ধরনীতে ছড়িয়ে পড়তেই লালিমা কেটে গেল। পৃথিবীর বুক ভরে উঠল স্বচ্ছ, পবিত্র আলোয়। আলোর বাড়ার সাথে সাথে বাড়ল আলোর তীব্রতা, কমে গেল কোমলতা।
সূযের তীক্ষ্ণ আলো চোখের পাতায় পড়তেই চোখ জ্বলে উঠল। পার্থিব আড়মোড় ভেঙে উঠতে গিয়ে আবিষ্কার করল তার ঘাড়ে চাপ ধরা ব্যথা। বেহালে ঘুমিয়ে পড়ার কারণেই হয়তো। পার্থিব গাড়ি থেকে নেমে হাত-পা ছড়িয়ে ব্যয়াম করল। উদ্দেশ্য শরীরের ভাঁজে ভাঁজে থাকা ঘুমকে দূর করা। মাথাটাও ঝিম ধরে আছে। ঘুমটা ভালো হলো না। অবশ্য চোখ লেগেছেই সাড়ে তিনটা/চারটার দিকে। কানের উপরের অংশ থেকে মাথাটা ভীষণ ব্যথা অনুভব হচ্ছে।
পার্থিব নিজের কাজ শেষ করেই একবার বাড়িটার দিকে তাকাল। তাকিয়ে থেকে চোখ সরিয়ে নিল। তার কী ভেতরে যাওয়া উচিত? শ্রুতিকে ফিরিয়ে আনা উচিত? মন বলল, যাওয়া উচিত। সে বকেছে বলেই তো মেয়েটা চলে এলো। মস্তিষ্ক বলল, যাওয়া উচিত না। শ্রুতি তার সাথে থাকতে চায়না। কী দরকার মেয়েটাকে কষ্ট দেওয়ার?
মন-মস্তিষ্কের যুদ্ধে জিতে গেল মস্তিষ্ক। পার্থিব একরাশ অসহ্য ব্যথা নিয়ে উঠে পড়ল গাড়িতে। গাড়ি ঘুরিয়ে চলে গেল বাড়ির উদ্দেশ্যে। তার অফিস যাওয়া প্রয়োজন। গত কালকের ঘটনার পর তার কাজ বেড়ে গেছে শতগুণ ।
শ্রুতি ভাবে তাকে কেউ ভালোবাসে না। অথচ সে জানতেও পারল না, তার জন্য কেউ সারারাত ভরে অপেক্ষা করেছে।
.
শ্রুতির ঘুম ভাঙল সকাল সকালই। দেয়াল থেকে মাথা তুলে সূর্যের আলোতে চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলল। তবুও শ্রুতি তাকিয়ে রইল নির্নিমেষ। সূর্যের কী সুন্দর তেজ! শ্রুতির মন ভীষণ ভালো হয়ে গেল। মনে হলো এই আলোর তেজের সাথে সাথে সে নিজের ভেতরেও তেজ অনুভব করছে। মনের সব অন্ধকার কেটে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। শ্রুতি উঠে দরজা খুলল। ফ্রেশ হয়ে গোসল করে নিল। দরজার সামনের টেবিলটা কষ্ট করে সড়িয়ে নিল। এরপর বড় করে একটা শ্বাস ছাড়ল এবং নিল। শ্বাস ছাড়ার সাথে সাথেই যেন তার মধ্যে থেকে বেরিয়ে গেল সব ভয়, যন্ত্রণা; ভেতরে ঢুকল সাহস, তেজ।
দিনের আলোর কী সুন্দর ক্ষমতা! মানুষের মনের ভয়কে দূর করার সাথে সাথে জোগায় বাঁচার নতুন সাহস, প্রেরণা। দেয় আশ্বাস, বিশ্বাস, ভরসা। শ্রুতি ঘর থেকে বের হতে নিয়েও হলোনা। বের হওয়া মানেই ঝামেলা। কী দরকার শুধু শুধু! তবে হ্যাঁ, দাদীআম্মুর ঘরে যাওয়া যায়।
শ্রুতি দাদীর ঘরে ঢুকে সব দেখতে লাগল। মানুষটা নেই, আর কখনো আসবে না — ভাবতেই ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। মৃত্যু এতো ভয়ংকর কেন? একটা মানুষের মৃত্যুর সাথে সাথে কতো মানুষ যে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে তা কী ওই মানুষটা কখনো জানবে?
শ্রুতি খাটের দিকে তাকাল। ভেসে উঠল শৈশবের স্মৃতি। এই ঘরেই তো তার দাদী একহাতে তাকে, অন্যহাতে বিভাকে জড়িয়ে ধরে রাখত।
দাদীর ছবি হাতে তুলে নিল। শাড়িতে মোড়ানো সাধারণ একটা মুখ। কিন্তু শ্রুতির মনে হলো এই পৃথিবীতে যদি সৌন্দর্যের তালিকা করা হয় তাহলে তার মা, দাদী, আপা থাকবে সবার উপরে। ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ দাদী, ফিরে আসো। দেখো আমি এসেছি। এই বাড়িতে এসেছি। কতো বড় বাড়ি! কতো মানুষ! অথচ তোমার শুতির জন্য এই বাড়িতে কেউ নেই। তোমার কী উচিত না ফিরে আসা?’
শ্রুতির ভীষণ ঘুম পেল। সে এগিয়ে গিয়ে দরজাটা ভালোভাবে বন্ধ করে ফিরে এলো। দাদীর বিছানায় শুয়ে দাদীর বালিশ জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে গেল।
.
মাহাথির বসে আছে নিজের টেবিলে। মুখভাব স্বভাবতই গম্ভীর, শান্ত। একমনে কম্পিউটার টাইপ করে চলেছে। এরইমাঝে মনে পড়ল বিভার কথা। বিভার কথা এখনই মনে পড়ল — এটা ভুল। এখন সবসময়ই মনে পড়ে। মাহাথির মনে করতে চায়না, তবুও মনে পড়ে। সে কী কোনোভাবে মেয়েটাকে ভালোবেসে ফেলল? ভালোবাসা? ভালোবাসা আবার কী? ভালোবাসা কী এতোই সহজ?
মাহাথির নিজের কাজে প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে কাজে মন দিল। তাও যেন মন মানতে চাইছে না। দিন যাচ্ছে আর সে কেমন যেন বিভা কেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। এই তো, আজকে সকালবেলা সে রেডি হয়ে বসে রইল। এমনকি নিজেই রান্নাঘরে গিয়ে বিভার হাত থেকে টিফিন নিল। টিফিন নেওয়ার পরেও সে গেলনা, আবার এসে বসেই রইল। মন বলল, এখনো গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ বাকি। বিভার আয়তুল কুরসি পড়ে ফুঁ দেওয়া বাকি। বিভা রান্নাঘর থেকে বেরিয়েই প্রশ্ন করল, ‘ যান নি?’
বলতে বলতেই এগিয়ে এসে মাহাথির এর মাথায় এসে ফুঁ দিয়ে দিল। মাহাথির লক্ষ্য করল, বিভা তার দিকে তাকিয়ে মলিন ভাবে হাসল। এতেও মাহাথিরের ভীষণ আপত্তি হলো। বিভা মলিন হাসবে কেন, অন্যান্যদিন তো কতো সুন্দর করে হাসে। একদম মনের ভেতর থেকে হাসে। মাহাথিরের মনে পড়ল শ্রুতিকে নিয়ে কিছু একটা হয়েছে। তবে সে ব্যাপারটা জানে না। জানতে হবে। তাতে যদি বিভার মন ভালো হয়।
বিভার মন ভালো? মাহাথির, যে কিনা কাজের সময় নিজের খাওয়ার কথাও ভাবেনা সে কিনা কাজের সময় কাজ বাদ দিয়ে ভাবছে বিভার কথা? ভাবতেই পারে। বিভা তার বউ। সংসার করছে দু'জন। তার তো ভাবা উচিত। সাধারণ কারণেই ভাবছে মাহাথির। এখানে বিশেষ কোনো কারণ নেই। ওইসব ভালোবাসা, টালোবাসা কিচ্ছু না। মাহাথির নিজেকে বুঝ দিয়ে কাজে মন দেওয়ার চেষ্টা করল। কতোটুকু সফল হলো কে জানে!
.
শ্রুতির ঘুম ভাঙল একদম বিকেল বেলায়। ঘুম থেকে উঠতেই মাথা চক্কর দিল। চারদিক হালকা অন্ধকার মনে হলো। ঠাসস হয়ে আবারো শুয়ে পড়ল সে। গতকাল থেকে সে না খাওয়া। পানি ছাড়া পেটে কিছু পড়েনি। মাথা তো ঘুরবেই। অস্বাভাবিক কিছু নয়।
শ্রুতি বিছানায় ঠাস হয়ে পড়ে রইল আরোও কতোক্ষণ। এরপর শক্তি জোগাড় করে উঠে বসল। সিদ্ধান্ত নিল বাহির থেকে কিছু কিনে আনবে। শ্রুতি উঠে গেল হাতমুখ ধুতে।
যেই ভাবা সেই কাজ। টাকা দিয়ে বাহির থেকে খাবার কিনে নিয়ে এলো শ্রুতি। হালকা খাবার। খাবার নিয়ে টেবিলে বসে গেল। আশপাশে মানুষ বলতে শাহিনাকে দেখা গেল। মুখ শক্ত করে কাজ করছে নিজমনে। বাকিরা কোথায় কে জানে!
শ্রুতি খেতে শুরু করল। খাওয়ার মাঝখানেই শুনতে পেল,
‘ ইবলিশ শয়তানের ঘুম ভাঙল তবে?’
শ্রুতি তাকিয়ে দেখল আমিন শিকদার দাঁড়ানো। বাসার কাপড়েই আছে। অফিসে যায়নি নাকি? শ্রুতি উত্তর দিল,
‘ শয়তান আমাকে বললেন? আমি শয়তানের ঘুম তো ভেঙেছে সবার আগে। কিন্তু ঘর থেকে বের হইনি। কারণ আপনাদের চেহারা দেখতে ঘেন্না লাগে। এরচেয়ে রুমে বসে মুরগির মতো ঝিমানো অনেক ভালো কাজ। তাই রুমে ঘুমাচ্ছিলাম। কেন? আমাকে মিস করছিলেন নাকি আমিন শিকদার?’
‘ এক টা যে চড় দিব না গাল একদম ফাটাই দিব। বান্দির বাচ্চা। শ্বশুরবাড়ি থেকে চইলা আসিস, আবার বড় বড় কথা? বাপের মুখ, আমাদের মুখ দেখতে ঘেন্না লাগে?’ শাহিনা গর্জন করতে করতে এগিয়ে এলো। এমনিতেই সে শাহিনাকে সহ্য করতে পারে না তারউপর গালাগালি। গালাগালি শুনে শ্রুতির মুখ শক্ত হয়ে গেল। এতো বিশ্রী কেন এই মহিলা? তাও হেসে দিল,
‘ বান্দি টা কে শাহিনা বেগম? আমিন শিকদার? আমিন শিকদার বান্দি হলে আমার কোনো সমস্যা নেই। সে বান্দি আই মিন গালি হওয়ারই যোগ্য।’
আমিন শিকদার এইবার অস্বাভাবিক রেগে গেল। নিজের এমন অপমানে বোধজ্ঞান হারিয়ে চিল্লিয়ে উঠল,
‘ বান্দি তোর মা।’
শ্রুতি খাবার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। নিজের বাবার এমন নোংরা ব্যবহারে, অশ্রাব্য মুখের ভাষায় বমি পেয়ে গেল শ্রুতির। ঘৃণার শরীর রি রি করে উঠল। সাথে নিজের মৃত মায়ের কথা উঠিয়ে যেন গরম তেলে পানি ছিঁটানোর মতো কাজ করা হলো। শ্রুতি চিৎকার করল, ‘ একদম আমার মাকে নিয়ে কথা তুলবেন না। আপনার মুখে আমার মায়ের নাম মানায় না। আপনার মতো একটা নোংরা, পিশাচ, জঘন্য মানুষ যদি আর একবার আমার মাকে নিয়ে কথা বলেন তাহলে আমি আপনার জিহ্ব টেনে ছিঁড়ে দিয়ে রাস্তার কুকুরদের খাওয়াব।’
আমিন সাহেব তেড়ে এলো। শ্রুতির সামনে থেকে খাবার নিয়ে উল্টে ফেলে দিল মেঝেতে। আমিন সাহেবের আর কিছু বলার আগেই কলিংবেল বেজে উঠল অনেক জোড়ে। কমপক্ষে আট/নয় সেকেন্ড ভরে বাজল। মনে হল কেউ ভীষণ ক্ষোভ নিয়ে বাজাল। শাহিনা দ্রুত গিয়ে সদর দরজা খুলে দিল। দরজার সামনে সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত মীর আসাদুজ্জামান দাঁড়ানো। শ্রুতি, শাহিনা, আমিন সবার দৃষ্টিই তখন আসাদ সাহেবের দিকে। হতবাক হয়ে চেয়ে রইল সবাই।
আসাদ সাহেব ভদ্রভাবে সালাম দিয়ে ভেতরে ঢুকল।
ভেতরে ঢুকে সে তার তীক্ষ্ণ চোখে সব পর্যবেক্ষণ করল। নিচে খাবার পড়া, শ্রুতির হাতে খাবারের অংশ লেগে থাকা, আমিন সাহেবের রাগের রেশভরা চেহারা। সব বিবেচনা করে সে চুপ করে রইল।
শ্রুতি আসাদ সাহেবকে দেখে মাথা নিচু করে ফেলল। এই মানুষটাকে সে অসম্ভব শ্রদ্ধা করে। তবুও, নিজের অজান্তেই কীভাবে যেন ভুল হয়ে গেছে। শ্রুতি জানলে এমনটা কখনোই করতো না। শ্রুতির ভীষণ ভয় লাগছে। আসাদ সাহেব কী তাকে বকবে? বকার জন্যই বুঝি এসেছে? অজানা ভয়ে শ্রুতির চোখে পানি জমা হতে শুরু করল।
আসাদ সাহেব এগিয়ে গেল শ্রুতির দিকে। কালই তাকে তানহা বলেছিল যে শ্রুতি চলে গেছে, আর নাকি আসবেনা এমন বলেছে শ্রুতি। সাথে ছিল তানহা বেগমের দুশ্চিন্তা ভরা কিছু কথা। তানহা বেগমের দুশ্চিন্তা দেখে তাকে ধীরেধীরে সে ঘটনা বললে তানহা বেগম ভীষণ অবাক হয়। সাথে সরল মনে নিজের মত দেয় যে, শ্রুতির কোনো দোষ নেই। বেচারি হয়তো বাবার ওপর অনেক রাগ। তাছাড়া আমিন সাহেবও শ্রুতি-বিভার সাথে স্বাভাবিক ভাবে কথা যে বলেনা তাও জানাল। নিজের স্বামীকে শ্রুতির দাদীর মৃত্যু দিনে করা আমিন শিকদারের ব্যবহার এর কথা বলতেও ভুলল না তানহা। সব শুনে আসাদ সাহেব বুঝলেন যে আমিন সাহেবের মাঝেই সমস্যা। সেই তাদের সন্তানদের আগলে রাখতে পারেনি। যার ফলস্বরূপ শ্রুতি, বিভা, হামিম সবাই তার থেকে দূরে চলে গেছে। এছাড়া আমিন শিকদার তাকে অনেক মিথ্যে কথা বলেছে। তাকে বলা হয়েছিল শ্রুতি, বিভা, হামিম শাহিনা আর তার ছেলে-মেয়ে। অথচ বিয়ের পরে সে জানতে পেরেছে শাহিনা বেগম তার দ্বিতীয় ঘরের বউ। এমনভাবে অনেক মিথ্যে কথাই আমিন সাহেব তাকে বলেছে। সব ভাবতেই আসাদ সাহেবের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
এরপর আজ সকালেই আসাদ সাহেব অফিসে গিয়ে ভাবছিল শ্রুতির কথা। শুধু শুধু মেয়েটা চলে গেছে রাগ করে। না জানি ওই ঘরে কতো ঝামেলা হচ্ছে! একটা ভুল করেছে তাই বলে বাড়ি ছেড়েই চলে যেতে হবে নাকি? সব মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সে যাওয়ার পথে শ্রুতিকে নিয়ে যাবে। তাই তো ছেলেকে অন্য গাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে সে এসে পড়ল। আসতে আসতে ঠিক করেছে বাড়িতে গিয়ে পার্থিবের গালে একটা চড় বসাবে। বউ চলে এসেছে অথচ তার কোনো চিন্তাই নেই? চিন্তা নেই ব্যাপারটা এমন নয়। পার্থিব আজ অফিসে অনেক অন্যমনস্ক ছিল যা আসাদ সাহেব লক্ষ্য করেছে। আসলে ঘরে শান্তি না থাকলে কোথাওই শান্তি নেই।
‘ বাবা, তুমি এখানে?’
সবাই পিছন ফিরে দেখল পার্থিব দাঁড়ানো। শ্রুতিসহ সবাই ভীষণ অবাক হয়ে চেয়ে রইল পার্থিবের পানে।
‘ তুমি এখানে কী করছো?’ আসাদ সাহেব গম্ভীরভাবে প্রশ্ন করল।
পার্থিব কী বলবে ভেবে পেল না। সকালে অফিসে গেলেও কোনোমতে মন কাজে বসেনি। শুধু ভেবেছে শ্রুতি কেমন আছে, খেয়েছে কিনা, তার বাবা তার সাথে অতিরিক্ত খারাপ ব্যবহার করছে কিনা, শ্রুতি কাঁদছে কিনা। সব দুশ্চিন্তা মিলে তার অবস্থা ছিল নাজেহাল। তাই সকাল বেলা মস্তিষ্ককে জিতিয়ে দিলেও দুপুরবেলা অফিসে বসে মনকে জিতিয়ে দেয় পার্থিব। মনে মনে ঠিক করে যাওয়ার পথেই শ্রুতিকে নিয়ে ফিরবে। লাগবেনা শাস্তি দেওয়া। তাছাড়া শ্রুতি তো এতোদিন ভালোই ছিল, সেই শুধু শুধু মেয়েটাকে কষ্ট দিয়েছে। ভেবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল শ্রুতির কাছে আসবে। অফিস শেষ হতে বাবার অন্য গাড়িতে যাওয়া যেন হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো আনন্দ দিল পার্থিবকে। এইবার সে শ্রুতিকে নির্দ্বিধায় আনতে যেতে পারবে। বাবাকে একশোটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হবেনা। কিন্তু একি! এখানে এসে বাবাকে দেখে নিজেই চমকে গেল পার্থিব।
‘ তেমন কিছুনা বাবা। শ্রুতির কাছে এসেছিলাম।’
আসাদ সাহেব আর ঘাঁটল না। শ্রুতির দিকে ফিরে বলল, ‘ এই বাড়িতে এসেছো কেন কাউকে না বলে?’
এতোক্ষণ শ্রুতি, আমিন, শাহিনা নিরব দর্শক হয়ে থাকলেও এখন শ্রুতিকে নিরব দর্শকের আসন ছেড়ে দিতে হলো। তাকে প্রশ্ন করা হয়েছে। উত্তর দেওয়া প্রয়োজন। অথচ শ্রুতি কিছু বলল না।
আসাদ সাহেব ফের প্রশ্ন করল, ‘ রাগ করে চলে এসেছো?’
শ্রুতি মাথা নিচু করে বলল, ‘ সরি।’
‘ সরি কোন কারণে।’
শ্রুতি আবারো নিরব রইল।
‘ সরি কীসের জন্য? চলে আসার জন্য নাকি গতপরশুর বোকামোর জন্য?’
‘ দু'টোর জন্যই।’ মিনমিন কণ্ঠে বলল শ্রুতি। কথা গলা দিতে বেরই হতে চাইছেনা। কেমন আটকে আসছে।
‘ দু'টো কাজের জন্য একটা সরি?’
শ্রুতি চোখ তুলে তাকাল। আসাদ সাহেবের মুখভঙ্গি গম্ভীর। মজা তো করছে না। শ্রুতি বলল, ‘ সরি। সরি।’
‘ আরেকটা সরি তোমার বলা উচিত কাউকে না বলে আসার জন্য। বিপদ হতে পারত।’
‘ সরি।’
আসাদ সাহেব ঠোঁটে হালকা হাসি ফোঁটাল। মেয়েটা যেমন কঠিন, তেমন নরম। একটু আগে বাহির থেকে সব কথাই সে শুনেছে। আমিন শিকদার, শাহিনা বেগম, শ্রুতির সব কথাই তার কানে এসেছে। শ্রুতির কোনোপ্রকার দোষ আসাদ সাহেব দিবেনা। শ্রুতি তার জায়গায় ঠিক বলেই মনে হলো আসাদের। সে শ্রুতির মাথায় হাত দিয়ে গম্ভীরমুখে বলল, ‘ আমি তোমাকে বকা দিয়েছিলাম? রাগারাগি কিংবা ধমক দিয়েছিলাম?’
শ্রুতি তাকিয়ে না বোধক উত্তর দিল।
‘ তাহলে? রাগারাগি, ধমকাধমকি কিছুই করিনি। শুধু বলেছিলাম এমনটা আশা করিনি। এটাই কী বাবা হিসেবে ভুল হয়েছে?’
শ্রুতি আবারো না বোধক মাথা নাড়ল। আসাদ সাহেব বলল, ‘ তাহলে চলে আসা কী উচিত হয়েছে বিনাকারণে?’
শ্রুতি আসাদ সাহেবের পাশে দাঁড়ানো পার্থিবের দিকে তাকাল। পার্থিব শ্রুতির দিকেই তাকিয়ে ছিল। শ্রুতি পার্থিবকে চারশো বিশ বোল্টের শক দিয়ে পার্থিবের দিকে আঙুল তাঁক করে উত্তর দিল,
‘ উনি। উনি আমাকে বকা দিয়েছে।’
শ্রুতির কথায় পার্থিব ভ্রু কুঁচকে ফেলল। শ্রুতি কারোর ধার ধারল না। পার্থিবের দিকে আঙুল তাঁক করে বলতেই থাকল,
‘ উনি আমাকে সেদিন অনেক বকেছে। রাগারাগি করেছে। ধমকাধমকিও দিয়েছে। বলেছে আমি যাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাই। আর কোনোদিনো যাতে ওই বাড়িতে না যাই। আরোও বলেছে ওই বাড়িতে দেখলে আমাকে মারবে। মেরে খুন করবে।’
শ্রুতির অনর্গল মিথ্যে কথায় পার্থিব মুখ হা করে ফেলল। কী বলা যায় তার ভাষা খুঁজে পেল না। একবার নিজের বাবা, একবার শ্রুতির দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে কিছু বলতে চেষ্টা করলেও হলোনা।
অন্যদিকে আসাদ সাহেব যেন আকাশ থেকে পড়ল শ্রুতির কথা শুনে। তার ছেলে এইসব করেছে তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। আসাদ সাহেব মনে মনে হেসে ফেলল। শ্রুতি মেয়েটা একটু বেশিই বলে ফেলেছে। রাগারাগি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকলে আসাদ সাহেব বিশ্বাস করতো। কিন্তু মারামারি পর্যন্ত চলে যাওয়ায় সে বুঝল শ্রুতি মিথ্যা বলছে। আসাদ সাহেব পার্থিবের দিকে শক্ত কণ্ঠে বলল,
‘ তোমার থেকে এমনটা আশা করিনি। এই শিখিয়েছি এতোদিন? নিজের বউকে মারতে চাও? ধমক দাও? এই তোমার ব্যক্তিত্ব? যাও ক্ষমা চাও।’
পার্থিব নিজের বাবার দিকে একবার তাকিয়ে শ্রুতির দিকে তাকাল। কী পরিমাণ বদমাইশ মেয়ে! মিথ্যা বলে নিজের স্বামীকে বকা খাওয়াচ্ছে। পার্থিব রা করল না। যদি বিনাদোষে ক্ষমা চাইলে শ্রুতি তার সাথে যায় তবে তাই সই। পার্থিব শ্রুতিকে বলল,
‘ ক্ষমা করে দিন শ্রুতি। রাগ করে ঠিক করিনি।’
শ্রুতি মাথা নিচু করে নিল। একদম উচিত কাজ হয়েছে। আমাকে বাসায় চলে আসতে বলা তাইনা? অসভ্য লোক!
‘ এইবার বাড়ি যাওয়া যাক?’ নরম কণ্ঠে বলল পার্থিব। শ্রুতি কিছু বলল না। অভিমান, রাগ নিয়ে মাথা নিচু করে রইল। এইবার আসাদ সাহেব বলল,
‘ যাবেনা বাড়ি?’
‘ আপনার সাথে যাব বাবা। উনার সাথে না। উনি আমাকে গাড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিবে।’
পার্থিব অস্বস্তিতে বার কয়েক চোখের পলক ফেলল। এই মেয়ে শুরু করেছেটা কী! মান-সম্মান তো কিছু রাখবেনা দেখছি।
‘ আচ্ছা তাহলে আসো।’ আসাদ বলল।
‘ দাঁড়ান। হাত ধুয়ে আসি।’
শ্রুতি হাত ধুয়ে এসে বলল, ‘ চলুন, বাবা।’
দু’ কদম এগিয়ে গিয়েও থেমে গেল শ্রুতি। পিছন ফিরে বলল, ‘ বাবা, আমার ব্যাগ আনতে হবে। উনাকে বলুন আম্মুর রুম থেকে ব্যাগ নিয়ে আসতে।’
শ্রুতির বাধ্য বাবা হয়ে আসাদ সাহেব পার্থিবকে তাই বলল। পার্থিবও উঠে গেল উপরে।
পার্থিব ব্যাগ নিয়ে ফিরতেই শুনতে পেল আসাদ সাহেবের কণ্ঠ, ‘ বেয়াই, আমাদের সম্পর্ক পারিবারিক, ব্যবসায়িক দুই ভাবেই। তবে আমি আর চাইছিনা ব্যবসায়িক সম্পর্ক রাখতে। আজ থেকে আপনার সাথে আমার ব্যবসায়িক কোনোপ্রকার লেনদেন নেই। যা আছে পারিবারিক। আশাকরি বুঝতে পারছেন কী বলছি। আর শুনুন, সময় থাকতে নিজের ভিত্তি গড়তে হয়। যাতে মৃত্যুর সময় ভিত্তির উপর বাঁচা যায়। আমরা মানুষেরা বৃদ্ধ বয়সে ভালোবাসা, যত্ন খুঁজি। অথচ তার জন্যেও যৌবন বয়সে সময় ব্যয় করতে হয় পরিবারের পিছনে। মৃত্যুর সময় আমি এইটার হিসাব নিবনা যে কোন ব্যাংকে কতো টাকা আছে, কতো জমি কিনেছি। মৃত্যুর সময় আমি খুঁজব ভালোবাসা। স্ত্রীর ভালোবাসা, সন্তানের ভালোবাসা, ভাই-বোনের ভালোবাসা। তাদের ভালোবাসাতে আমার মৃত্যু সুন্দর হবে। টাকা, পয়সাতে নয়। তাছাড়া ধার্মিক নিয়মাবলি তো আছেই। টাকার পেছনে না ছুটে আমাদের উচিত সম্পর্কের পিছনে ছুটা। একটা সময় পরে গিয়ে আমার সম্পর্কের ভালোবাসার জন্য মরিয়া হয়ে উঠি, টাকার জন্য না। আসছি, ভালো থাকবেন। এমন কিছু আমাদের করা উচিত নয় যাতে পরে ধুঁকে ধুঁকে মরতে হয়।’
শ্রুতি, পার্থিব, আসাদ সাহেব বেরিয়ে গেল একসাথে।
আমিন, শাহিনা রণমূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আমিন সাহেবের মন চাইল আসাদ সাহেবকে থাপ্পড় মেরে তার জ্ঞানী কথা বের করে দিতে।
.
শ্রুতি বেরিয়ে দেখল দু'টো গাড়ি। পার্থিব শ্রুতির ব্যাগ নিয়ে নিজের গাড়ির পেছনের অংশে তুলল। তা দেখে শ্রুতি আসাদ সাহেবের কাছে এসে বলল, ‘ বাবা, আপনার গাড়িতে যাই?’
ব্যাগ রেখে ভ্রু কুঁচকে তাকাল পার্থিব। এই মেয়েটা শুরু করেছে কী!
পার্থিবকে অবাক করে দিয়ে আসাদ সাহেব তার আদরের পুত্রবধূকে নিয়ে গায়েব হয়ে গেল। পার্থিব আহাম্মক বনে দাঁড়িয়ে রইল। ভ্রু কুঁচকে বসতে বসতে বলল,
‘ দোষ করেও জিতবে, রাগ দেখিয়েও জিতবে। ভাগ্যগুণে বউ পেয়েছি।’
______
চলবে~
শব্দসংখ্যা - ২৪১৯
#একগুচ্ছ_শুকতারা
#শারমিন_ইরান
[ ঈদের থেকে তার আগের রাত বেশি প্রিয় আমার। সেই রাতের ভালোবাসা হিসেবে দু'টো পর্ব। ইদ (ঈদ) মোবারক।
মাহাথির প্রেমীরা কাঁদবেন না। শ্রুতি-পার্থিব তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী ছিল, বিভা-মাহাথিরও থাকবে। আমি চাইবোনা কাউকে কম-বেশি রাখতে। মেহেদী পরছেন তো?]